হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
পটাদা বলল, ‘পলিড্যাকটাইল’ মানে জানিস? রুবি আর রনেন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। শব্দটার মানে আমার জানা ছিল। আমাদের পাড়ার রথীনের হাতে ছ-টা আঙুল। একটা বাড়তি থাম্ব অর্থাৎ হাতের বুড়ো আঙুল আছে ওর।
আমরা কিছু জানি শুনলে পটাদা খুশি হয়। শুরু হল তাঁর কথকতা। ‘সেভেন্টি এইটের কথা বলছি। তখন আমি মাসদুয়েক দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে ছিলাম। ওখানে প্রচুর বাঙালী আছেন। আমাকে একটা ফাঁকা ফ্ল্যাটে থাকতে হয়েছিল। ফ্ল্যাটটা আমার বন্ধুর। বন্ধুটা তখন অস্ট্রেলিয়ার ভারতীয় দূতাবাসে পোস্টেড। তাঁরই অনুরোধে মেলবোর্ন টাইমসে ইণ্ডোলজির ওপর আমি দুটো একটা ফিচার লিখছি। আচ্ছা দূতাবাস, হাইকমিশন অফিস, অ্যামবাসাডার বা অ্যাটাশে—এগুলোর পার্থক্য বুঝিস? বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে তোদের নিয়ে যাব একদিন। যাই হোক, মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি। তখন বসন্তকাল। সকাল-বিকালগুলো বেশ! দিল্লির ফ্ল্যাটটায় দিব্যি খেয়ে-দেয়ে আর এক-আধটা ফিচার লিখে দিন কাটছে। মুকুন্দ নামের চাকরটা বেশ ভালো ছেলে। ওর বাড়ি মেদিনীপুর। ওই বাজার করে, রান্না করে। ফাই ফরমাশ খাটে। ওর রান্নার হাত বেশ ভালো। একটা কইতেল খুব ভালো রান্না করত। নতুন-নতুন শাক খুঁজে আনত বাজার থেকে। ঘাড়ে গামছা রেখে সারাদিন ও টুকটাক কাজের মধ্যেই ব্যস্ত রাখত নিজেকে। সন্ধ্যের পর টিভিতে খবর দেখার নেশা ছিল। তবে ন’টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ত। তখন গায়ে জল ঢেলে দিলেও ওর ঘুম ভাঙবেনা এমন সাউণ্ড শ্লিপ ছিল ওর। উঠত ভোর চারটেয়। সেই সময় একদিন ও আমাকে খবর দিল, ‘জীবনবাবুর হাতঘড়ি চুরি গিয়েছে।’ জীবন বসাক আমাদের কাছাকাছি একটা ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। ফুলিয়ার তাঁতের শাড়ির হোলসেলার। পয়সার অভাব নেই তাঁর। অকৃতদার এবং অকশনে মাল কেনার বাতিক আছে। নেশাভাঙের ঘোর বিরোধী। একদম টিটোটেলার। তবে ভদ্রতাবশতঃ ঘরে অ্যাশট্রে রাখেন ধূমপায়ী অভ্যাগতদের জন্য। তিনি বিশিষ্ট ভদ্রলোক। যেহেতু ভোরবেলায় ওঠে, মুকুন্দও নাকি দেখতে পেয়েছে দুটো মুখোশ পরা লোক জীবনবাবুর দোতলার ফ্ল্যাট থেকে লাফ মেরে গাড়িবারান্দার ছাদের ওপর নেমে দ্বিতীয় লাফে একদম গেট টপকে পালিয়েছিল। একটা লোক বেজায় ঢ্যাঙা, একটা রাম বেঁটে। দোতলায় ওঠার সময় ওরা রনপা ব্যবহার করেছিল। তারপর সেটাকে গাড়িবারান্দার ছাদে ভাঁজ করে রেখে কাজ হাঁসিল করে ওটা বগলদাবা করে কেটে পড়েছিল। ফোল্ডিং রনপা।

ওয়াং চু লোকটা প্রচন্ড ধুর্ত্ত....
আমি ভাবলাম, একটা মামুলি রিস্টওয়াচ চুরি করার জন্য এত মেহনত করা ওদের পোষালো?
জীবনবাবু পরদিন আমাকে আমন্ত্রন জানালেন তাঁর ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটা বেশ বড়োসড়ো। দু-হাজার বর্গফুট সেটার আয়তন। দেশের বাড়িতে অনেকটা খোলামেলা জায়গায় থাকার অভ্যাসটা তিনি এখানেও বজায় রেখেছেন। একা একটা মানুষ মাত্র একজন পরিচারক নিয়ে এতবড়ো ফ্ল্যাটে থাকাটা বিলাসিতা বইকি। তিনি বেশ শৌখিন মানুষ ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়। ঝকঝক-তকতক করছে মেঝে থেকে সিলিং পর্যন্ত। ঘরে ঢুকেই আমার একটা খটকা লাগল। খটকাটা কিসের তা নিজেও ঠিক বুঝতে পারলাম না। অনেকসময় অবচেতন মন কি বলতে চাইছে সচেতন মন তা বুঝতে পারেনা। অধিকাংশ সময়ই এটা ঘটে। জীবনবাবু চোর ধরার ব্যাপারে আমার সাহায্য চান বলে জানালেন। আমি বিষয়টা পুঙ্খানুপুঙ্খ জানার জন্য তাঁকে জেরা করতে শুরু করলাম। এর মধ্যে তার পরিচারক মদন চা আর হালকা স্ন্যাকস পরিবেশন করে গেল। তার মুখটা লক্ষ্য করলাম আমি।
—বলুন কি জানতে চান?
—চুরিটা ঠিক কখন হয়েছে?
—ভোরের দিকে।
—কি করে বুঝলেন?
—আমার চাকর মদন শব্দ পেয়েছিল।
—ও কতবছর কাজ করছে?
—প্রায় সাত-আট বছর হবে।
—ওকে বিশ্বস্ত মনে হয়?
—ওর আগে মন্মথ নামে একজন ছিল। তার হাতটানের স্বভাব ছিল। খুচখাচ জিনিস সরিয়ে ফেলত। তাকে ছাড়িয়ে দিই। তবে মদনকে বিশ্বস্ত বলেই মনে হয়।
—ঘড়ি চুরি করার জন্য সাধারনত রাতবিরেতে কারো বাড়ি হানা দেবার ঘটনা শোনা যায়না। ঘড়ি ছিনতাই হয়। আপনার কি ধারনা চোর অন্য কিছু চুরি করতে এসেছিল?
—বুঝতে পারছিনা। দেখুন ঘরে অন্যান্য অনেক মূল্যবান জিনিস ছিল। সেসব যেমনকার তেমনই আছে। এই ফ্লাওয়ার ভাসটা দেখুন। এটা ঐ ঘড়ির তিনগুন দাম। আর পেইন্টিংগুলো তো দেখে বুঝতেই পারছেন সব অরিজিন্যাল।
—ঘড়িটা আপনি ব্যবহার করতেন?
—না।
—কেন?
—ওটা সময় দেখার জন্য আমি কিনিনি।
—তবে কি জন্য কিনেছিলেন?
—আমাদের পরিবারে একেকজনের বিচিত্র শখ ছিল। আমার পিতামহ হরিণের সিং সংগ্রহ করতেন। বাবা বত্রিশ রকমের গনেশের মূর্ত্তি সংগ্রহ করেছিলেন। জ্যাঠামশায়ের কালেকশনে ছিল বিভিন্ন দেশ থেকে প্রকাশিত বাইবেল। জেনেটিক্যালি স্বভাবটা আমিও ইনহেরিট করেছি। আমার ডিসপোজালে বাহান্ন রকমের হাতঘড়ি আছে। আপনি দেখতে চাইলে খুশি হবো। সব ঘড়িই ঠিকঠিক আছে নতুন কেনা ঘড়িটা বাদে।
—ঘড়িটা আপনি কোথা থেকে কিনেছিলেন?
—জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারির কাছে একটা বাড়িতে। খবরের কাগজে ক্ল্যাসিফায়েড কলামে আমার নজরে আসে ব্যাপারটা। একজন ডেনিশ সাহেবের প্রপার্টি। অকশনে গিয়ে বিডিং করার ব্যাপারটায় আমি অভ্যস্ত নই। নিলাম থেকে মাল কেনার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। বাজারে একটা সাধারন ঘড়ির যা দাম তার বেশি নেয়নি আমার কাছে। ঐ ঘড়িটাই চোরেদের কেন দরকার হল বুঝতে পারছি না।
আমি গোয়েন্দাদের মতো ঘরটর খুঁটিয়ে ঘুরে দেখার প্রয়োজন বোধ করলাম না। জীবনবাবু ধূমপায়ী নন। কিন্তু দেখলাম অ্যাশট্রেতে মার্লবরো সিগারেটের পোড়া টুকরো পড়ে আছে। তার মানে চোর এই ড্রয়িংরুমে ঢুকেছে। আয়েশ করে নিশ্চিন্তে সিগারেট খেয়েছে। বেশ টেনশন-ফ্রী ছিল বোঝাই যাচ্ছে।
—আপনার বাড়িতে শেষ করে গেস্ট এসেছিল?
—তা মাস ছয়েক আগে।
—তাদের মধ্যে কেউ কি মার্লবরো সিগারেট খেত?
—যারা এসেছিল তারা দুজন মহিলা আর একজন শিশু। যদিও মহিলারাও আজকাল কেউ কেউ ধূমপান করেন। কিন্তু ওরা কেউ মার্লবরো সিগারেটের নামই শোনেনি। আমার পিসতুতো ভাইয়ের পরিবার। দেশের গ্রামে থাকে।
—মদন কি স্মোকার?
—না। ও লুকিয়ে-চুরিয়ে মাঝেমধ্যে এক আধটা বিড়ি খায়। দাঁড়ান মদনকে ডাকছি।
জীবনবাবু ঘরে গেলে আমি জিনিসটা তুলে নিলাম যেটার মুণ্ডুটা উঁকি মারছিল সোফার তলা থেকে। একটা কোল্ড ড্রিংকসের বোতল। আমি সন্তর্পনে ওটার মুখটা ধরে খালিচোখেই বুঝতে পারলাম বোতলটার গায়ে করতলের স্পষ্ট ছাপ আছে। তবে ম্যাগনিফাইং লেন্স দিয়ে পরীক্ষা করলে এর বিশেষত্ব ধরা পড়বে। মদন আসার আগেই বোতলটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিলাম।
—বলুন বাবু কি জানতে চান?
—চুরি হচ্ছে তুমি টের পেলে কখন?
—আজ্ঞে বাবু তামুকের কড়া গন্ধে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তড়াক করে নাফিয়ে উঠি। ততক্ষনে চোরেরা পগার পার।
—আজকাল কাজকর্মে বেশ ফাঁকি দিচ্ছ, তাইনা মদন?
—কেন বলছেন বাবু একথা?
—সোফার তলা-টলাগুলো ঝাঁটপাঁট ভালো পড়ছে না।
—কি করে বুঝলেন বাবু?
বোতলটা সোফার তলা থেকে আমি বের করলাম। জীবনবাবুও মদনের পেছন-পেছন এসে দাঁড়িয়েছেন।
—এই বোতলটা তুমি খাওনি আমি জানি মদন। এটা আমি নিয়ে যাচ্ছি জীবনবাবু। একটা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ দিন। এর মধ্যেই সমস্ত সমাধানসূত্র আছে। আর হ্যাঁ, আমার শেষ প্রশ্ন ঘড়িটার ব্র্যাণ্ড কি ছিল?
—অ্যাংলো সুইস।
আমি বললাম, ‘দেখি কি করা যায়।’
বাড়িতে বোতলটাকে এনে ভালো করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলাম। অনেকগুলো ইনফরমেশন পাওয়া গেল সেখান থেকে। প্রথমতঃ লোকটা পলিড্যাকটাইল। দ্বিতীয়তঃ লোকটা একজন কনফার্মড ক্রিমিনাল। খুব জখমে অভ্যস্ত।
রুবি বলল, ‘কি করে বুঝলে খুনে?’
পটাদা বলল, ‘গুড কোশ্চেন! ফর ইওর কাইণ্ড ইনফর্মেশন, আমি কিছুদিন পামিস্ট্রির চর্চা করেছিলাম। ব্রেনলাইন আর থাম্ব দেখে এটা আঁচ করা যায়।’
রনেন বলল, ‘কিন্তু ওরা একবারও ভয় পেলনা জীবনবাবু বা মদন জেগে যেতে পারেন ভেবে?’
পটাদা বলল, ‘মদনকে ওরা হাত করেছিল।’
রুবি বলল, ‘মদনকেই যদি হাত করল, তাহলে মদনই তো ঘড়িটা চুরি করে ওদের দিতে পারত।’
পটাদা বলল, ‘না, পারত না। অত সোজা নয়। জীবনবাবু দেওয়াল আলমারীর তালাটা বানিয়ে ছিলেন আলিগড় থেকে একজন বিশেষ নির্মাতাকে ডেকে। নম্বর মিলিয়ে লক খুলতে হত। নম্বরটা ছিল ৭৮৬। এই নম্বরটা হচ্ছে মুসলিমদের একটা পবিত্র সংখ্যা। এই গোপন নম্বরটা মদন জানত না। চোরেরা কি করে জানল সেটাই আশ্চর্য।’
রনেন বলল, ‘কিন্তু একটা সাধারন ঘড়ির জন্য এতসব ব্যাপার বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
পটাদা বলল, ‘ঘড়িটা সাধারন হতে পারে। তবে ঘড়ির ভিতর যে বস্তুটা লুকনো ছিল সেটা এই পৃথিবীর পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক। জিনিসটা না জেনেই কিনেছিলেন জীবনবাবু। অন্ততঃ তাঁর তাই বক্তব্য ছিল।’
রুবি বলল, ‘কি ওটা?’
পটাদা বলল, ‘বলছি। তার আগে বল প্রথম পরমাণু বিভাজন করেছিলেন কে?’
রনেন বলল, ‘হেনরি রাদারফোর্ড।’
পটাদা বলল, ‘কারেক্ট। পরমাণুর ধারণা প্রথম করেছিলেন গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস। রুটির গন্ধ শুঁকে তার মনে হয়েছিল, এই গন্ধটা আসলে রুটির ক্ষুদ্রতম কনা।
আজকের পরমাণু গবেষনা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে সে তোরা কল্পনাও করতে পারবি না। প্রথম পরমাণু বোমা বিস্ফোরনের পরীক্ষা কোথায় হয়েছিল চারু?’
আমি বললাম, ‘লস অ্যালামস মরুভূমিতে। ডঃ ওপেনহাইমারের নেতৃত্বে।’
পটাদা বলল, ‘রাইট! এখন পরমাণু শক্তিধর দেশের তালিকায় অনেক নাম। আরেকটা নতুন বোমার নাম যুক্ত হতে চলেছিল তাদের মারনাস্ত্রের তালিকায়।’
রুবি বলল, ‘হল না কেন?’
পটাদা বলল, ‘জীবনবাবু যে পটল উপ্যাধ্যায়কে ডেকে বসলেন।’
রনেন বলল, ‘সো হোয়াট?’
পটাদা বলল, ‘হোয়াট? সেটাই আজকের গল্পের সেন্ট্রাল থিম।’
ঘরে ফিরে টোকিও ট্রিবিউনের জার্নালিস্ট ওকাকুরার ফিচারটা আমি মনযোগ দিয়ে পড়তে শুরু করলাম। সে মূলতঃ একজন বিজ্ঞান প্রতিবেদক। সায়েন্স রিপোর্টার আর কি। সেটার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে মেলবোর্ন টাইমসে।
‘সাম্প্রতিককালে উত্তাপ বেড়ে যাওয়া বিশ্বের একটা বড়ো সমস্যা। বিজ্ঞানীকূল কার্বনমনোঅক্সাইডভূক একপ্রকার ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পেয়েছেন যাদের দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে তুলতে পারলে এই সংকট রোধ করা যাবে বলে মনে করছেন অনেকেই। তবে এই কৃত্রিম প্রজননের কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা এখনই বলার সময় আসেনি। বিদ্যুৎ সাশ্রয়কারী ল্যাম্প নি:সন্দেহে সমসাময়িক ফলিত বিজ্ঞানের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। কিন্তু বিজ্ঞানের যে শাখা মারনাস্ত্র উদ্ভাবনের জন্য নিরন্তর গবেষনা করে চলেছে তাতে করে অন্যান্য শুভকারক প্রচেষ্টা বিফলে যেতে বাধ্য। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, বিশ্বের কয়েকটি গোপন ল্যাবরেটরিতে টাইটেনিয়াম বোমা আবিষ্কারের জোর গবেষনা চলছে। এই গবেষনাগারগুলি মাটির নীচে অথবা জলের ওপর ভাসমান জাহাজে। এই বোমার ফর্মূলা একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফারকে দিয়ে একটি ঘড়ির সুক্ষ যন্ত্রপাতির তলায় রাখার মতো বানানো হয়েছে। বিশ্বের শক্তিধর সাতটি দেশ ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই নক্সা হস্তগত করার জন্য। দুর্ভাগ্য অথবা সৌভাগ্যের বিষয় নক্সাটির কোনো দ্বিতীয় নকল রাখা হয়নি। রাষ্ট্রশক্তির নির্দেশে যেসব গবেষক বিজ্ঞানীরা এই প্রোজেক্টে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন তাঁদের ইচ্ছা নয় এই ফর্মূলা কারো হাতে যাক। ফর্মূলাটি গায়েব হওয়ায় তাঁরা স্বভাবতঃই খুশি। শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ কখনোই চাইবেন না হিরোশিমা-নাগাসাকির ঘটনা দ্বিতীয়বার ঘটুক।’
শুরু করে দিলাম আমার কাজ। চাঁদনীচকে আমার একজন পরিচিত পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানদার আছে। তার নাম হাবিব। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় বসে থাকা ভিখারি, বিড়ি-সিগারেটের দোকানদার, সেলুন ওয়ালা-এরা অনেক খবর রাখে। বিশেষ করে ক্রাইম দুনিয়ার। পুলিশ-জার্নালিস্টরা এইসব সোর্স কাজে লাগায়। হাবিব পাঁচ-সাত বছর দোকানদারি করছে। ওর কাছে এক প্যাকেট মার্লবরো সিগারেট চাইলাম। ও বলল, এই মুহূর্তে বেনসন হেজেস আর ডানহিল ছাড়া কোনো বিদেশী সিগারেট নেই। একটু দাঁড়ান, আনিয়ে দিচ্ছি। হাবিব একটা ছেলেকে পাঠাল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মার্লবরোর চাহিদা কেমন?’
হাবিব বলল, ‘রেগুলার কাস্টমার দু-তিনজন আছে।’
এর মধ্যে বাঁ-হাতি ছয় আঙুলওলা কেউ আছে?
হাবিব বলল, ‘আপনি মি: জনসনের কথা বলছেন?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, নামটা ভুলে গিয়েছিলাম। কোথায় পাব ওকে?’
হাবিব বলল, ‘ওকে কোথায় পাবেন জানিনা তবে ওর বন্ধু ওয়াং চু-কে পেয়ে যাবেন ‘মধুশালা’ নামে একটা নতুন বার কাম রেস্টুরেন্ট হয়েছে না, ওইখানে।’
আমি বললাম, ‘ঐ বাঁটকুল চিনেটা?’
হাবিব বলল, ‘হ্যাঁ।’
আমি কখনো মদ খাইনা। তবু কাজ এবং সময় কাটাবার স্বার্থে এক পেগ ব্লাডমেরি আর একটা ভডকার ককটেল বানিয়ে তার সাথে এক প্লেট স্যালাড নিয়ে বসলাম। দেখলাম, ওয়াং চু আছে। মদে চুর হয়ে তার ছোটো চোখদুটো আরো ছোটো দেখাচ্ছে। নিশ্চিন্তে মদ্যপান করছে সে। জানেনা, একটু পরে কি ঘটতে চলেছে। সাক্ষাত শমন বসে আছে তার দশ হাত দূরেই।
আমি রেস্টুরেন্টের ফোনটা থেকে মি: পটেলকে একটা ফোন করলাম। ফোন রিং হচ্ছে। রিসিভার তুলল কেউ।
—হ্যালো।
—মে আই স্পিক টু মি: পটেল?
—আপ কউন বোল রহে হো?
—ম্যায় উনকা এক খাস দোস্ত হুঁ। বোলিয়ে মি: উপাধ্যায় বাত করনা চাহতা হ্যায়।
ডিটেকটিভ স্কোয়াডের সিনিয়ার একজন অফিসার মি: পটেল। তিনি এসে ফোনটা ধরলেন।
—হাই! মি: উপাধ্যায় হাউ আর ইউ?
—আই’ম ফাইন। আপ বিজি হো ইয়া না হো, দশ মিনিট কে অন্দর ‘মধুশালা’ বার মে আপকো আনা পরে গা। লেট মত করনা।
—কিউ, বাত ক্যা হ্যায়?
—ম্যায় আপকো এক তোফা দেনা চাহতা হুঁ।
—রহস্য ছোড়িয়ে। জরা খুলকে বাতাইয়ে না।
—আপকা প্রোমোশন হোনেবালা হ্যায়।
—আতা হুঁ।
ক্রেডলে রিসিভার রাখবার শব্দ পেলাম। আমি জানি রাস্তায় জ্যাম থাকলেও মি: পটেলের দশ মিনিট মানে দশ মিনিট। এবং পুলিশ ফোর্সকে খবর দিয়েই তিনি ময়দানের রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হবেন।
ওয়াং চু লোকটা প্রচণ্ড ধূর্ত। আমাকে ফোন করতে দেখে তার কিছু একটা সন্দেহ হয়ে থাকবে। আশ্চর্য ব্যাপার, প্রচুর মদ্যপান করেও তার চুর-চুর নেশা ফর্সা হয়ে গেল। কাউন্টারে বিল মিটিয়ে দিয়ে কেটে পড়বার ধান্দা করছিল। আমি আস্তে করে তার কাঁধে হাত রাখলাম। সে চমকে উঠল।
—মি: ওয়াং চু, গ্ল্যাড টু মিট ইউ। ইউ টেল মি প্লিজ হ্যোয়ার ইজ ইওর ফ্রেণ্ড মি: জনসন?
—নো, আই দোন্ত নো। লেত মি গো।
—সে কি! এত তাড়াতাড়ি?
সবে তো কলির সন্ধ্যে। আসুন আরো দু-চার পেগ পাকস্থলিতে চালান করি। তবে না মরদ।
ওয়াং চু আমাকে একটা ঘুঁষি মারল। চোয়াল ঘেঁষে বেরিয়ে গেল ঘুষিটা। তারপর সে চুচুংশুকি পজিশন নিয়ে দাঁড়াল। বুঝলাম লোকটা জুডো জানে। ক্যারাটের বিদ্যা অল্পসল্প আমারও আয়ত্তে ছিল। কিন্তু তা প্রয়োগের ফুরসৎ মিলল না। তার আগেই মি: পটেলের একটা কিক খেয়ে চিনেটা ছিটকে গেল দশ হাত দূরে। মি: পটেল ব্ল্যাক বেল্ট প্রাপ্ত একজন ক্যারাটে বিশারদ। ‘ক্যারাটে’ মানে জানিস তো ‘খালি হাতে’।
চিনাটা মেঝেয় শুয়ে পকেট থেকে পিস্তল বের করে একটা গুলি চালিয়ে দিল ঝাড় লন্ঠনটায়। আলোটা নিভে গেল। ঝুর-ঝুর করে মেঝের ওপর খসে পড়ল কাঁচের টুকরো। তাই দেখে ভয়ে উপস্থিত ভোক্তারা এক জায়গায় জড়ো হয়ে গেল। ছটা গুলি ব্যবহার করে সে ছটা আলো নিভিয়ে দিয়িছে। তখন জ্বলে উঠল এমার্জেন্সী লাইটটা।
মি: পটেল উপস্থিত ক্রেতাদের বললেন ‘আপনারা ভয় পাবেন না। আমি সরকারী লোক। আর হেই চিনেম্যান! পালাবার চেষ্টা কোরোনা। এই রেস্টুরেন্টর চতুর্দিক এখন পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ। হ্যাঁ, এইবার বলুন মি: উপাধ্যায়।’
আমি বললাম, ‘এই লোকটা আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী র্যাকেটের একজন পাণ্ডা। টাইটেনিয়াম বোমার ফর্মূলাটা নিয়ে এরা এখন একটা বোমা বানাবার মতলব করছে। বোমা বানাবার আস্তানাটা একটা ডোমেস্টিক এরিয়ায়। ভাগ্য ভালো ওদের দলে ভালো সায়েন্টিস্ট নেই তাই বোমাটা এখনো তৈরি হয়ে ওঠেনি। জীবনবাবুকে আমার চাকর মুকুন্দ তার বাড়িতেই বন্দী করে রেখেছে। এদের দু-জনকে জেরা করলেই আপনি গোটা চক্রের সন্ধান পেয়ে যাবেন। তারপর বিষয়টা চলে যাবে ইন্টারপোলের হাতে। এদের বিচার হবে হেগ শহরে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস-এ।’
মি: পটেল বললেন, ‘উরিব্বাস! টাইটেনিয়াম বোম্ব?’
‘জীবনবাবুর কাপড়ের ব্যবসাটা ফেক। চুরির গল্পটা ফেঁদে তিনি বিরোধী ফেউদের আই ওয়াশ করতে চেয়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন এইরকম একটা স্টোরি একজন সাংবাদিক পেলে কাগজে ছেপে দেবে। আর সেটা পড়ে শত্রুরা ঘাড় নীচু করে সুবোধ বালকের মতো বাড়ি ফিরে যাবে। তিনি জানতেন ভোরবেলায় মুকুন্দ ব্যালকনিতে জপমালা নিয়ে বসে থাকে। চুরির দৃশ্যটা তার চোখে পড়বে। চুরির ঘটনাটা তাহলে এস্টাব্লিশ হবে। কিন্তু বাদ সাধলো পানীয়ের বোতলটা। চোর ঠাণ্ডা মেজাজে বসে ড্রিংকস নেবার যুক্তিটা কি? অ্যাশট্রেটা ভর্তি না হলে মদন সাফ করেনা। অতশত তলিয়ে ভেবে দ্যাখেননি জীবনবাবু। ইনফ্যাক্ট আমি ওবাড়ি যাবার আধঘন্টা আগে জনসন ওখানে ছিল। জীবনবাবু একা মানুষ। অতবড়ো একটা ফ্ল্যাট কেনার পেছনে তাঁর কোনো উদ্দেশ্য কাজ করে থাকতে পারে বলে আমার মনে হয়েছিল। আর ফর্মূলাটা আদৌ তাঁর কাছে থাকত না। ওটা থাকত ওয়াং চু-র হাতঘড়ির মধ্যে।’
এই পর্যন্ত বলে থামল পটাদা।
রুবি জানতে চাইল, ‘তারপর?’
পটাদা বল, ‘ওদের কোমরে দড়ি পড়ল। মি: পটেল বললেন, আপনি গোয়েন্দাগিরির কাজটা করলে ভালোই পারতেন মি: উপাধ্যায়।’
আমি বললাম, ‘জীবনে দুটো কাজ বাদে প্রায় সবই করেছি মি: পটেল।’
—কি কি?
—জুতো সেলাই আর চণ্ডিপাঠ। তবে কোনোটাকেই পেশা হিসেবে নিইনি তার জন্য আমার কোনো আফশোষ নেই।
রুবি বলল, ‘তারপর?’
পটাদা বলল, ‘তারপর আর কি, তোদের এই বাবুরাম বাগান লেনে ফিরে এলাম।’
রনেন বলল, ‘কিন্তু ফর্মূলাটা কি হল?’
পটাদা বলল, ‘যখন চিনেটা আমায় ঘুঁষি মেরেছিল তখন হাতঘড়িটা ওর হাত থেকে খুলে ছিটকে পড়ে। আমি ওটা ক্যাচ লুফে নিই। তারপর রাস্তার ম্যানহোলে ফেলে দিই ওটা। সাবধানের মার নেই।’
রুবি মুখটা তোম্বা করে বসে রইল। গল্প বিশ্বাস করো না করো তার দায় পটাদার নয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন