হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
‘আমি একজনকে দেখেছিলাম যাঁর বয়সের কোনো গাছপাথর নেই।’
পটাদা এমন একজন গল্পবলিয়ে যার কাহিনির প্রথম লাইনটা শুনলে আর নিস্তার নেই। শেষ পর্যন্ত শুনতেই হবে। পটাদার আসরে অন্যেরা রোজ উপস্থিত থাকে না। কিন্তু আমরা তিনজন—রনেন, রুবি আর আমি চারু, থাকবই।
‘কত বয়স লোকটার?’ রুবি জানতে চাইল।
‘একটা লোক যদি সক্রেটিসের বন্ধু বলে নিজেকে দাবি করে তবে তার বয়স কত হওয়া সম্ভব হিসেব করে দ্যাখ।’ অনন্য ভঙ্গিতে বক্তব্য পেশ করল পটাদা।
রুবি আজকাল আর তেমন আপত্তি করে না। বরং গল্পটা শুনতেই আগ্রহ প্রকাশ করে।
রনেন বলল, ‘তাহলে মূল প্রসঙ্গে আসা যাক পটাদা।’
পটাদা শুরু করল। আজ তার বসার ভঙ্গিটা স্বাভাবিক।
‘গাড়োয়াল অঞ্চলের একটা গ্রামে আমরা কয়েকজন বন্ধু বনভোজন করব বলে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় একটা লোক ভেড়ার মাংস কেটে আর বিক্রি করতে পারছিল না। প্রায় সাত কেজি মাংস আমাদের সামান্য মূল্যে দিয়ে দিতে চাইল। অতটা মাংস আমাদের দরকার নেই তবু ওর উপরোধে নিতে বাধ্য হলাম। যে মাঝিটা নৌকায় আমাদের এপারে এনেছে তাকে প্রায় অর্ধেক মাংস দিয়ে দিলাম। মাংস নিয়ে যাবার পাত্র নেই। মাঝিটা ঝোপ থেকে কয়েকটা বড়ো-বড়ো জংলী পাতা জলে ধুয়ে মাংসটা মুড়িয়ে নিল। তারপর নৌকা বেয়ে ওপারে চলে গেল। আমরা চারবন্ধু গল্প-গুজব করছি। আধঘন্টা পর দেখি মাঝিটা দৌড়াতে-দৌড়াতে আসছে। তার হাতে মাংসটাও রয়েছে। সে এসে বলল, ‘বাবুজী, এটা দেখুন।’ আমরা সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি, ওটা দলা পাকিয়ে একটা মণ্ডে পরিণত হয়েছে। মাংসের খণ্ডগুলো জুড়ে গেছে পরস্পরের সাথে। স্মিথ বলল, ‘যে পাতাটা দিয়ে মুড়েছে, ঐ পাতাই দায়ী এর জন্য।’ স্মিথ একজন আমেরিকান রসায়নবিদ। দুর্লভ ভেষজের সন্ধানে ও বছরে দুবার হিমালয় এবং আফ্রিকার দুর্গম জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। ঐ গাছটাকে চিনে রাখল স্মিথ। ফটো তুলল এবং একটা পাতা নমুনা হিসেবে জমিয়ে রাখল। মাঝিটাকে বললাম, ‘তুমি ঐ মাংসটা আর বাড়ি নিয়ে যেও না। বলা যায় না, পাতাটা বিষাক্ত হয় যদি। তুমি বরং আমাদের এখানেই খেয়ে যেও।’ নেপালী এক বাহাদুর রান্না করছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, মাংস রান্না কতদূর?

গ্রীক সভ্যতার বিকাশ হয়েছে তখন...
সে বলল, ‘দশ বাজনে আটে কো ছা। গ্যারা বাজনে কে অন্দর হো যায়গা।’
অর্লাণ্ডো এসেছে পশ্চিম জার্মানী থেকে। সে পাহাড়ের ঘাম সংগ্রহ করে। তার নাম শিলাজতু। ব্যাপারটা সোজা নয়। পাহাড়ের ঘাম বিশাল বলশালী মোষ আর চমরি গাই, পাহাড়ি ভল্লুকরা চেটে-চেটে খায়। তাছাড়া আছে স্থানীয় লোক। এর দাম অনেক। চমরি গাইগুলো অনেকসময় পাথরের ওপর দুধ ফেলে যায়। সূর্যকিরণে সেই দুধ শুকিয়ে যায়। গুহাবাসী সাধু-সন্ন্যাসীরা ঐ শুকনো দুধ চিমটে দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে নিয়ে যান। একরকম জংলী পাতা দিয়ে জলে ফুটিয়ে চায়ের মতো করে খান। স্মিথ শুনেছে, হিমালয় অঞ্চলে এমন একটা গুল্ম গাছ আছে যার পাতা একটা চিবোলে শীতে ঠকঠক করে কাঁপা লোকের গা দিয়ে ঘাম ছুটবে।
মাংস খেতে বসলাম সবাই মিলে। চমৎকার রান্না করেছে বাহাদুর। ওই আমাদের কুক এবং হিমালয় ভ্রমণের গাইড। স্মিথ বলল, ‘ওয়াণ্ডারফুল! মশলা কি দিয়েছো বাহাদুর।’ বাহাদুর বলল, ‘লুগাধুনি পাউডার।’
অর্লাণ্ডো সাধারণতঃ মাংস খাওয়া পছন্দ করে না। ‘কেভম্যান ডায়েট আর প্যালিওলিথিক ডায়েট’ নামে দুটো নতুন কথা শুনলাম ওর মুখে।
আমি বললাম, ‘বাহাদুর তুমিও বসে খাও। খেয়েদেয়ে ঘন্টাখানেক তাঁবুতে বিশ্রাম নিয়েই আমরা বেরোব।’ বাহাদুর বলল, ‘ঠিক ছা।’
অর্লাণ্ডো বলল, ‘গুহামানবের জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এখনো আমাদের ভিতর অনেকটাই রয়ে গেছে। আমরা যদি তাদের মতো খাদ্য খাই তাহলে শরীর ভালো থাকবে।’ এই থিয়োরিটা স্মিথ মানতে চায় না। সে প্রচুর ফাস্ট ফুড আর জাঙ্ক ফুড খায়। হাই প্রোটিন আর ফ্যাটের দৌরাত্ম্যে সে মোটা হয়ে গেছে। অর্লাণ্ডো বলল, ‘স্মিথের শরীরে ত্রিশ কেজি ওজন বাড়তি। এই ওজনটা ওর জীবনযাপনে অসুবিধা সৃষ্টি করবে। এখনো সময় আছে। সবে তেত্রিশ। ইচ্ছা থাকলে সামলে নিতে পারবে। ফল হজম করার জন্য লিভারকে কোনো পরিশ্রমই করতে হয়না। কিন্তু মাংস হজম করতে সাতদিন সময় লাগে।’
স্মিথ অর্লাণ্ডোর কথা হেসে উড়িয়ে দিল। ও একাই প্রায় দু-কেজি মাংস সাবড়ে দিল। তারপর তাঁবুর ভেতর ঢুকে পাম্প বালিশে হাওয়া ভরে ঘুমিয়ে পড়ল। ওকে দেখে বুঝলাম আজ আর ওপরে ওঠা হবে না।
বাহাদুর বলল, ‘কাল ভোর-ভোর বেরোতে হবে তাঁবু গুটিয়ে।’ আগামী পনেরো দিন খাওয়ার বিলাসিতা ত্যাগ করতে হবে। জঙ্গলের পাখি আমি মারতে পারব না। দুর্গম পথে যেতে গেলে কলজের জোর থাকা চাই।’
ওখানে একটা গ্রাম আছে, সেখানকার মানুষ শীতকালে গ্রাম থেকে নিচে নেমে আসেন। গোটা গ্রামের ঘরবাড়ি খোলা পড়ে থাকে কিন্তু একটা জিনিসও খোয়া যায় না। মেগাস্থিনিসের ‘ইণ্ডিকা’ বইটাতে চন্দ্রগুপ্তের আমলের ভারতবর্ষের কথা বলা আছে। সে সময় নাকি সকলে ঘরের দরজা খুলে রেখে ঘুমোত। সে যাই হোক, বাহাদুর উড়ন্ত একটা পাখি দেখিয়ে বলল, ‘এই পাখির নাম হোমা। এ আকাশে উড়তে-উড়তে ডিম পাড়ে। ডিম মাটিতে পড়বার আসেই বাচ্চা ফুটে বেরিয়ে আকাশে উড়ে যায়। কখনো মাটিতে নামে না ওরা।’ একদিন বাহাদুর রান্না করতে করতে পুরনো কাঠের মধ্যে একাট পোকা দেখিয়ে বলেছিল, ‘এই পোকাটার খাদ্য হল আগুন। অতি প্রাচীন কাঠের মধ্যে এরা থাকে।’ দেখলাম, বাহাদুর অনেক কিছু জানে। আমাদের সার্থক গাইড হতে পারবে ও।
আমি বললাম, ‘এই পাখিটার কথা বেদ-এ উল্লেখ আছে।’
হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল স্মিথ। এক জায়গায় দেখলাম একটা বিশাল মোটা জাম গাছ। বড়ো বড়ো জাম পাথুরে মাটির ওপর পড়ে রয়েছে। খাবার কেউ নেই। এত বড়ো জাম আমি কখনো দেখিনি। স্মিথ দু-একটা চেখে দেখার পর গপাগপ গিলতে লাগল। অর্লাণ্ডো বলল, ‘সিজিজিয়াম জাম্বোলিয়াম ব্লাডসুগারের ওষুধ। এই গাছের পাতা থেকে হয়।’ ভরপেট জাম খেয়ে স্মিথ বলল, ‘এইখানে কিছুক্ষণ রেস্ট নেওয়া যাক।’ আমরা বসলাম। বাহাদুর নানারকম গল্প করতে লাগল তখন।
সে বলল, ‘একটা হরিতকি গাছ সে দেখেছে। যে গাছের ফল বারো বছরে একটা পাকে। যখন পাকে তখন মহাকুম্ভ মেলা হয়।’
অর্লাণ্ডো বলল, ‘প্রকৃতিতে অনেক রহস্য আছে। যার কিছুই প্রায় আমরা জানি না। এক-একটা সভ্যতায় একেক ধরনের জ্ঞানের বিকাশ হয়। প্রাচীন মিশরীয়রা অনেক কিছু জানতেন। পিরামিড সৃষ্টির রহস্য আজও অজানা রয়ে গেছে। মমি বা স্ফিংকস এক আশ্চর্য বিজ্ঞানের সন্ধান দেয়। আমি শুনেছি, জিনসেঙ বা নোনি নামক গুল্মের সব ব্যাধি সারাবার ক্ষমতা আছে।’
সেদিন যেখানে আমরা তাঁবু গাড়লাম সেখান থেকে চিতা বাঘের আস্তানা খুব বেশি দূরে নয়। তার একটা আওয়াজেই আমাদের রাতের ক্ষিদে উড়ে গেল। স্মিথ বলল, ‘খাওয়া মাথায় থাক। যাতে অন্যের খাদ্য না হই সেই ব্যবস্থাটাই আগে নেওয়া দরকার। বেঁচে থাকলে খাওয়ার অভাব হবে না। আর ঐ গাছটা যদি খুঁজে পাই তাহলে শীতবস্ত্রের ব্যবসা লাটে তুলে দেব। তখন আমার পয়সায় খাবে কে?’
বাহাদুর আপন মনে বিড়-বিড় করে বলল, ‘সব মাটিতে সব গাছ হয় না। রুক্ষ মাটিতে গোলাপের রং হলুদ হয়ে যায়। বাংলার মাটিতে আপেল হয়ে যায় টক।’
একটা জায়গায় বাহাদুর আমাদের সৈন্ধব লবণ দেখাল। ও বলল, ‘পুজো-আচ্চায় সর্বদা সৈন্ধব লবণের ব্যবহার হয়। এই লবণ হৃদরোগীদের পক্ষে ততটা ক্ষতিকারক নয়।’
পটাদা বলল, পথকষ্টের কথা তোদের বলব না। শুধু গল্পের সারাংশটুকুই শোনাব তোদের। বাহাদুর আমাদের এমন এক ব্যক্তির কাছে নিয়ে গেল যিনি বারো বছর কথা বলেননি। সাত-আট দিন অন্তর কিছু খাবার ইচ্ছা হলে সমতলের দিকে যান। বয়স বললেন, একশো বাইশ। কিভাবে পথ চললে আমরা দুর্লভ ভেষজ পেতে পারি তার সুলুকসন্ধান জানার জন্যই ওনার কাছে যাওয়া।
তিনি প্রথমেই বললেন, ‘তোমাদের দলে এমন একজন ব্যক্তি আছে যে অর্থের লোভে ভেষজের সন্ধান করে বেড়াচ্ছে। এইসব মানুষ দুর্লভ ভেষজের সন্ধানই পাবে না কোনোদিন। মানবহিতৈষীরা এসবের সন্ধান পেয়ে থাকেন। তবে সমতলে এইসবের চাষ হলেও তা পূর্ণগুণসম্পন্ন হবে না। কেউ কেউ এসবের সন্ধান পেলেও নিয়ে যেতে পারে না। কোন না কোন বাধা এসে জোটে।’
বাহাদুর বলল, ‘শুনলে হুনুন্তিত্ত?’
বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, ‘ওসব না করে এই নিসর্গের তন্ময় সৌন্দর্যে নিজেকে বিলিয়ে দাও। বদলে যাবে জীবন। সার্থকতার বোধ আসবে।’
কথাগুলো স্মিথের পোষাল না। সে বলল, ‘ওল্ড হ্যাগার্ড!’ কথাটা অস্ফুটে বলল। এর বাংলা মানে করলে বোধহয় ‘বুড়ো ভাম’ হবে। আমার মনে হল, বাহাদুর অনেক কিছুই জানে। কিন্তু দেশের সম্পদ আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে সে দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে রাজি নয়। স্মিথকে সে মোটেই পছন্দ করছে না। বরং অর্লাণ্ডো তার অনেক বেশি পছন্দের।
বাহাদুর বলল, ‘যত ওপরে উঠব, অক্সিজেন তত কমবে। শ্বাসকষ্টের ভয়ে মানুষ যেতে সাহস পায় না। এমন একটা পথ আছে যেখানে ছ-মাস দিন, ছ-মাস রাত। রাতের পথটা আগে পার হতে হবে তবে দিনের পথের সন্ধান পাওয়া যাবে। রাতের পথে কেউ কেউ মাসখানেক হেঁটে আর পারেনি। তার দেহ সবুজ হয়ে গিয়েছে। ক্লোরোফিল জমেছে তাঁর দেহে। সমতলে নেমে মাসদুয়েক সেবাযত্ন পেয়ে তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পেরেছে। ওসব চিন্তা আমাদের না করাই ভালো। এক জন্মে কেউ তার উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।’
অর্লাণ্ডো স্বভাবতঃই শান্ত প্রকৃতির মানুষ। কথা বলার চেয়ে সে শোনে বেশি। মাঝে-মাঝে অন্যের কথা মনঃপূত হলে সে ডায়েরিতে লিখে রাখে। খুব ভালো শর্টহ্যাণ্ড জানে সে। নিজের পকেট ডায়েরিটাকে সে সর্বদা আগলে আগলে চলে। বাহাদুরের দু-তিনটে ইনফর্মেশন আর ঐ বৃদ্ধ সাধকের বলা কথাগুলো সে নোট নিল দেখলাম। অর্লাণ্ডোর লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে। সে অধ্যাপনাও করেছে কিছুদিন।
বাহাদুর আগেই বলে দিয়েছিল, ‘ক্ষুৎপিপাসা আর ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য কাতর হলে চলবে না। তবে, দুনিয়ায় সবার সাথে সবার দেখা হয় না, সবাই সবার বন্ধু হয় না, সবার সবকিছু ভালো লাগে না, সবাই সবকিছু বুঝতে পারে না। সবকিছুর মূল্য সবার কাছে সমান নয়। কোনো কোনো মানুষের দেখা পাওয়াটা বহু বহু জন্মের শুভকর্মের ফল। যদি আপনার ভাগ্যে না থাকে শত চেষ্টা করেও আপনি একটা লোকের দেখা পারেন না। ভাগ্যে থাকলে অপ্রত্যাশিতভাবে তার সাথে আপনার দেখা হয়ে যাবে। এমনকি সে নিজে এসেও আপনাকে দেখা দিয়ে যেতে পারে।’
বাহাদুর ঘোর অদৃষ্টবাদী। স্মিথ পুরুষকারপন্থী। সে বলল, ‘আই’ল ক্রিয়েট মাই ওন ফেট।’
অর্লাণ্ডো বলল, ‘নেপোলিয়ন বলেছিলেন ‘দেয়ার উইল বি নো আল্পস।’ এই ওভার কনফিডেন্সের ফলাফল কি হয়েছিল তা আশা করি স্মরণ করিয়ে দেবার প্রয়োজন নেই। ওয়াটার্লুর যুদ্ধের কথাটা নয় নাই বললাম। কনফিডেন্স ভালো জিনিস। কিন্তু যে কোনো জিনিসেরই বাড়াবাড়িটা ক্ষতিকর।’
স্মিথ বলল, ‘তোমরা জার্মানরা পরমাণু গবেষণা করবে আর তার ফল নেব আমরা। দিস ইজ দ্য নেট রেজাল্ট অফ ইওর কনফিডেন্স এণ্ড ফ্যাটালিজম।’ অর্লাণ্ডো তর্ক করে না। চুপ করে যায়। বাহাদুর মাথা নাড়ে। টানা আটদিন আমরা চড়াই-উৎরাই ভেঙে পথ হারিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ালাম। স্মিথ আর অর্লাণ্ডো মিলে রাতের নক্ষত্র দেখে ম্যাপ বানাতে বসল। কিন্তু সে ম্যাপ কোনো কাজেই দিল না। একদিন রাতে চমৎকার একটা সুগন্ধ নাকে এল আমাদের। জোৎস্না রাত। বিশেষ কোনো তিথি হবে হয়তো। শুয়ে-শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিন্তা করছিলাম, আর কখনো দেশে ফিরতে পারব কিনা। সবার মনই বিষন্ন। বাহাদুর বাদে।
অর্লাণ্ডো বলল, ‘এই সুগন্ধের উৎস কি?’
বাহাদুর বলল, ‘পারিজাতের দু-একটা গাছ এখানে আছে মনে হচ্ছে। বিশেষ তিথি-নক্ষত্রে ওরা এই সুগন্ধ উৎসারণ করে। অর্থাৎ এমন কিছু ঘটনা ওরা দেখতে পায় যাতে খুব আনন্দ হয় ওদের। ঐ সুগন্ধটাই আনন্দের প্রকাশ।’
বাহাদুরের কথা শেষ হবার সাথে সাথে আমরা দেখতে পেলাম আমাদের সামনে একটা জলাশয়। ঠিক পাঁচশো মিটার দূরে। জোৎস্নাকিরণে তার জল ঝকঝক করছে। অপূর্ব তার শোভা।
অর্লাণ্ডো বলল, ‘ঐ জলাশয়টাকে তো আগে দেখিনি।’
বাহাদুর বলল, ‘আমরা এমন জায়গায় চলে এসেছি যেটা ঠিক পৃথিবীর ভৌগোলিক সীমার মধ্যে ধর্তব্য নয়।’
স্মিথ বলল, ‘কই আমি তো কিছু দেখতে পাচ্ছি না।’
বাহাদুর বলল, ‘সবার সবকিছু দেখার চোখ থাকে না।’
আমরা দেখলাম, ‘আকাশমার্গে একটা স্বর্ণরথ ধীরে ধীরে ঐ জলাশয়ের ধারে অবতরণ করছে। তারপর কয়েকটি দেবশিশু ঐ জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। চোখের পলক ফেলতে পারছিলাম না এতই মনোহর ঐ দৃশ্য।
আমাদের দশা দেখে স্মিথ বলল, ‘তোমরা কি দেখছো?’
অর্লাণ্ডো অস্ফুটে বলল, ‘বেদিং অফ অ্যাঞ্জেলস।’
স্মিথ বলল, ‘মিথ্যা, মিথ্যা। তোমরা লায়ার। আমাকে বোকা পেয়েছ না, যা বলবে তাই বিশ্বাস করব? ক’দিন ধরে লক্ষ করছি তোমরা কেমন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছ আর ভুলভাল কথা বলছ। আসলে কিছু খুঁজে না পেয়ে তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তোমরা মরার দিন গুনছো। কাল থেকে আমি একাই ঘুরব। ভেষজ আমার চাই।’
স্মিথের চেঁচামেচিতে সুন্দর দৃশ্যটা আমাদের চোখের সামনে থেকে অবলুপ্ত হয়ে গেল।
বাহাদুর বিড়বিড় করে বলল, ‘কাবাব মে হাড্ডি।’
স্মিথ কিছু বুঝল না কথাটার মানে।
পরদিন স্মিথ একটা সোনার হরিণ দেখতে পেল। যেটা আমরা কিন্তু দেখতে পেলাম না। ওটার পিছু ধাওয়া করল স্মিথ। আমরা ভাবলাম স্মিথ সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে যাচ্ছে। সেদিন রাতে স্মিথ আর তাঁবুতে ফিরল না। খুব দুশ্চিন্তায় কাটালাম আমরা রাতটা। তার পরদিন সমানে তল্লাশি চালালাম আমরা। কিন্তু খোঁজ পেলাম না স্মিথের। সেদিনও তাঁবুতে ফিরল না সে। তার পরদিন বিকেলের দিকে সন্ধান পেলাম স্মিথের। একটা চোরা বালির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে সে। একটা গাছের ঝুরি ধরে কোনোরকমে প্রাণটাকে টিকিয়ে রেখেছে। কুইকস্যাণ্ড মারাত্মক জিনিস। বাহাদুরের তৎপরতায় স্মিথের বিরাশি কেজি দেহটা আমরা তুলতে সমর্থ হলাম আধ ঘন্টা কসরতের পর। তারপর সবাই মাটিতে বসে হাঁফাতে লাগলাম।
বাহাদুর বলল, ‘সবাই সবকিছু বিশ্বাস করেনা, সবার সবকিছু ভালো লাগে না, এই দুনিয়ার সব জিনিস সবার জন্য নয়। তবে জগতের নিয়ম সকলের জন্যই এক। কর্ম এবং তার ফল—এটা ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হয় না। আগুনে হাত দিলে সকলেরই হাত পুড়বে।’
অর্লাণ্ডো বলল, ‘ও কি সত্যিই সোনার হরিণ দেখেছে?’
বাহাদুর বলল, ‘আমরা কি সত্যিই দেবশিশুদের স্নান দৃশ্য দেখেছি?’
ঠিক এইসময় আমরা দেখলাম দীর্ঘকায় এক রূপবান পুরুষ বসে আছেন। তাঁর পায়ের কাছে গোটাচারেক বাঘ বেড়ালের মতো শুয়ে আছে। দেখে আমাদের নড়াচড়া এবং বাক্যস্ফূর্তি বন্ধ হয়ে গেল। ‘থ’ হয়ে যাওয়া যাকে বলে।
উনি বললেন, ‘ইধার আ যাও বেটা। ডরো মৎ। আদমি কো জিন্দেগী মে দুর্ভোগ আতে হ্যায় ভালাই কে লিয়ে। তুমহারি দোস্ত জলদ সে জলদ শুধার যায়েগা। বাকি জিন্দেগী মে তুমসে তেজ দৌড়েগা।’
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপ কউন হ্যায়?’
উনি হাসলেন। তারপর বললেন অদ্ভুত একটা কথা।
—মেরা ভি সওয়াল ইয়ে থা ম্যায় কউন হুঁ। গুরুদেব একদিন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, চুপ করে বসে থাক। তাই থাকলাম। চোখ যেদিন খুললাম, দেখলাম গ্রীক সভ্যতার বিকাশ হয়েছে তখন পৃথিবীতে। ঘুরতে ঘুরতে অ্যাথেন্সের পথে সক্রেটিসের সাথে দেখা হয়ে গেল একদিন। তারপর আবার এসে চোখ বুজলাম। তোর বন্ধুর বালির মধ্যে খাবি খাওয়া দেখে চোখটা খুলতেই হল।
আমি বললাম, ‘ওকে বাঁচালেন না কেন, বসে বসে মজা দেখলেন? বলিহারি যাই আপনাদের!’
উনি বললেন, ‘সেরকম নিয়ম নেই। সবটা ভুগতে দিতে হয়। এখন যা তোরা। আমি চোখ বুজবো।’
বাহাদুর বলল, ‘সবার জীবনের গল্প এক নয়, সবার রুচি এক হয় না, সবাই মহাপুরুষের দর্শন পায় না। তবে সুযোগ সবার জীবনেই আসে।’
স্মিথ বলল, ‘হিমালয় ভ্রমণ আমার জীবনের একটা সেরা অভিজ্ঞতা। আর কখনো এখানে দুর্লভ ভেষজ খুঁজতে আসব না।’
বাহাদুর স্বগতোক্তির মতো করে বলল, ‘সেই ভালো!’
উঠতে যেমন বেগ পেতে হয়েছিল, নামবার বেলায় পথ ততটা দুর্গম মনে হয়নি।
রুদ্ধশ্বাসে গল্পটা শুনছিল রুবি। পটাদা থামলে সে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কথাগুলো বিশ্বাস করেছে কিনা ঠিক বোঝা গেল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন