হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
শেষরাতে অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখতে দেখতে নোলকের ঘুম ভেঙে গেল। গা ঘামে ভিজে জবজব করছে। বিছানাও ভিজে সপসপে। পাখা ঘুরছে না। কখন লোডশেডিং হয়ে গেছে কে জানে। বিছানায় বসে স্বপ্নটা মনে করতে থাকে নোলক। যেন স্বপ্ন নয়। এই ঘুম ভেঙে বসে থাকাটাই বুঝি স্বপ্ন। প্রায় বাস্তবের মতোই স্পষ্ট ছিল স্বপ্নটা। এখনো জ্বলজ্বল করছে দৃশ্যগুলো। এমন সুন্দর স্বপ্ন—কে এর রচয়িতা কেউ জানে? আর কি দেখতে পাব এমন?
কি চমৎকার ছিল উড়ন্ত যানটা। চারপাশে যে আলোর ছটা বিচ্ছুরিত হচ্ছিল তাকে অলৌকিক না বলে উপায় নেই। সাতটা রং-এর আলো চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। কয়েকটা ফুটফুটে ছেলেমেয়ে ছিল ঐ যানের ভেতর। ওদের মধ্যে একটি মেয়ে কত কথাই না বলল নোলককে। তার নাম ‘মম’। সে বলল, ‘পরীক্ষার পর এখন আমাদের ছুটি চলছে তাই তোমাদের গ্রহে এক্সকার্শানে এসেছি। আজই চলে যাব। ঘুরলাম এস্কিমোদের দেশ আন্টার্কটিকা, আফ্রিকার জঙ্গল থেকে নিয়ে যাচ্ছি কিছু দুষ্প্রাপ্য গাছ। তোমাদের গঙ্গানদীর পুণ্যতোয়া জল নিয়েছি। হিমালয়ের অমূল্য পাথরের রস নিলাম। ঘুরলাম দক্ষিণ মেরু। ওখানে এত বরফ জমছে যে পৃথিবীর অক্ষ বদলে ডিগবাজি খাইয়ে দিতে পারে পৃথিবীকে। বহুকাল আগে আমাদের গ্র্যাণ্ড পা একবার এসেছিলেন এই গ্রহে। তখন তোমাদের কলকাতায় ইংরেজ, ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর আমল। তখন আমাদের এত উন্নত প্রযুক্তির যান অবশ্য ছিল না। তবে ব্ল্যাকহোলের ভিতর দিয়ে পথ সংক্ষেপ করার প্রণালী জানা ছিল। এখন অবশ্য আমরা ওভাবে আসিনি। এবারে এসেছি অ্যান্টি গ্র্যাভিটেশন্যাল ফোর্স কাজে লাগিয়ে। জানো তো নোলক, তোমাদের তুলনায় আমাদের আয়ু অনেক বেশি। তোমাকে নিয়ে যেতে পারতাম আমাদের গ্রহে। কিন্তু তোমার মন বড়ো নরম। মা, বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। খুব সুন্দর তোমাদের এই বিশ্ব। দূর থেকে দেখে মনে হয় একটা সবুজ আলোর বল। জানো নোলক, পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের পাশের গ্রহ লুব্রিখট ধ্বংস হয়ে গেছে। মাত্র কুড়ি আলোকবর্ষ দূরের ঐ গ্রহে টেকনোলজি চরম উচ্চতায় পৌঁছেছিল। বায়ুস্তরের ওজোন লেয়ার ফুটো করে দিয়েছিল কার্বন মনোক্সাইড। হু হু করে আলট্রাভায়োলেট রশ্মি ঢুকে যাচ্ছিল ঐ গ্রহে। ওজোন স্তর মেরামত করার আগেই গলে গিয়েছিল সমস্ত বরফ। মহাপ্লাবনে ভেসে গেল ঐ গ্রহ। কি দুঃখজনক ঘটনা! মানুষের অসংযমই এর জন্য দায়ী। অনেকেই আমাদের গ্রহে শরণার্থী। যাদের পার্সনাল স্পেস শাটল ছিল তারাই বেঁচেছেন। এখন আবার গ্রহ পুনর্নিমাণের কাজ চলছে। তোমাদের এই সুন্দর গ্রহটাকে যেন নষ্ট কোরো না। ভালো থেকো নোলক। আবার যদি আসি, তোমাকে নিয়েই ভ্রমণ করব। পাক খেতে-খেতে উড়োযানটা মূহুর্তের মধ্যে মহাশূন্যে মিলিয়ে গেল স্কুলের মাঠ থেকে। আলোর রোশনাই-এর মধ্যে বেজে উঠল রাগসংগীত কোন অজানা বাদ্যযন্ত্রে। অনেকটা সানাই আর বেহালার মিশ্রণে বেজে ওঠা কোনো বিদায়ী করুণ রাগ। মন খারাপের পাকে-পাকে সুরটা মিশে যাচ্ছিল।

পর্দায় ভেসে উঠলো স্বপ্নে দেখা মেয়েটা...
বিস্মিত নোলকের ঘুম ভেঙে গেল। এমন স্বপ্ন কোথা থেকে এল? দু-দিনের মধ্যে তেমন কোনো সায়েন্স ফিকশনের বইও পড়া হয়নি। কারো সাথে আলোচনা তো নয়ই। আপন মনে বসে বসে কিছু যে ভেবেছি তাও নয়। ক্লাসে ফিজিক্যাল সায়েন্সের মধু স্যর মাসখানেক আগে বলেছিলেন ‘অন্য গ্রহে প্রাণী থাকা বা না থাকা দুটোই সমান বিশ্বাসযোগ্য।’
কারেন্ট এল। ফ্যানটা বাঁই-বাঁই করে ঘুরছে। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নোলক দেখলো আকাশ ফর্সা হয়ে আসছে। এখনো পাঁচটা বাজেনি। আজ না হয় একটু আগেই বেরনো যাক। ছটার সময় মাঠে ফুটবল কোচ আসবেন। কেউ মাঠে পা দেবার আগেই যাওয়া যাক। সবার আগে মাঠে পৌঁছবার আলাদা একটা মজা আছে। ভোরবেলার শিশিরভেজা মাঠ কেমন একটা পবিত্রতার মোড়কে আবরিত থাকে। ঐ ছাতিম গাছটার পাশে নেমেছিল উড়ো যানটা। আর কি কোনোদিন ঐ স্বপ্ন দেখা যাবে? মনের মধ্যে এখনো জাপটে আছে দৃশ্যগুলো। টেবিলের ওপর রাখা জলটা পান করে কেডস পরে নিল নোলক। আর একটু বাদে ঘড়ির অ্যালার্ম বাবাকে তুলে দেবে। পনেরো মিনিট আগে তাঁকে ডেকে তুলে লাভ নেই। ঘরের ছিটকিনি খুলে নোলক বাইরে থেকে দরজা ভেজিয়ে দিল। রুকুও লেজ নেড়ে গেটের সামনে অপেক্ষা করছে। রোজ গোলকের সাথে দৌড়ে মাঠে যায়। আবার তার সাথেই ফিরে আসে।
কি এক আশ্চর্য সৌন্দর্যে ছেয়ে আছে ভোরবেলাকার প্রকৃতি। কত নাম-না-জানা বিচিত্র পাখি ডাকছে চারদিকে। ভোরবেলার প্রেমে না পড়ে উপায় নেই। একেই কি ব্রাহ্মমূহুর্ত বলে? এক দৌড়ে নোলক ছাতিম গাছটার তলায় গিয়ে দাঁড়াল। স্বপ্নে যেখানে উড়নযানটা নেমেছিল। রুকু ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছে মাঠে। কখনো কাগজের ঠোঙা মুখে, কখনো একটা কাপড়ের টুকরো পা দিয়ে চেপে ধরে টেনে টেনে ছিঁড়ছে। আবার সেটা ফেলে অন্য কিছু একটাকে লক্ষ্য করে ছুটছে। ওর কি আনন্দ হয়েছে কে জানে। একপাক দৌড়ে নোলক পি.টি. করায় মন দিল। কাল্পনিক ড্রিবলিং শুরু করল। এমন সময় রুকু ছুটে এল তার কাছে। তারপর ছাতিম গাছটাকে ঘিরে দশপাক দৌড়ে নিল। কি সব শোঁকাশুঁকি করতে লাগল। তারপর হঠাৎ ছুটে এসে গোলকের ট্রাকস্যুট কামড়ে ধরে টানতে লাগল। টেনে নিয়ে গেল ছাতিমতলায়। নোলক বলল, ‘কি রে রুকু, সাপ নাকি?’ রুকু ল্যাজ নেড়ে আরো জোরে টানতে লাগল নোলকের প্যান্ট। নোলক কাছে গিয়ে দেখল ঘাসের মধ্যে কি একটা চকচক করছে, ধাতব পাতের মতো উজ্জ্বল। তুলে নিল নোলক। জিনিসটা কি? একটা চতুষ্কোণ চ্যাপ্টা বক্সের মতো। গায়ে কি সব লেখা আছে দুর্বোধ্য ভাষায়। ভারতীয় কোনো ভাষা নিশ্চয়ই নয়। কোনো এশিয়ান ভাষা কিনা সেটাও সন্দেহের। ল্যাটিনজাত তো নয়ই। ক্লাস এইটের ফার্স্টগার্ল নোলক এমনকি ব্রাহ্মীলিপি বা খরোষ্ঠি লিপিও দেখেছে। আফ্রিকার বান্টু ভাষায় কিছু লেখা নাকি? স্যরকে দেখাতে হচ্ছে তো। স্যর যদি কোন ভাষাতত্ত্ববিদের কাছে নিয়ে দেখাতে পারেন। ধন্যবাদ রুকু। তোর যা আই কিউ তাতে তুই মানুষ হলে কেউ আপত্তি করতো না। কিন্তু খাপটার মধ্যে আছেটা কি? একদম সিডির কভারের মতো দেখতে। আরে জিনিসটা সিডি নয়তো? রুকু দু-আঙুলের চাপে ঢাকনাটা তুলে ফেলল। সিডিই তো। কি আশ্চর্য! কিসের সিডি? ওপরে যে লোগো ছাপা আছে বড়ো অদ্ভুত। ত্রিভুজ, বৃত্ত আর বর্গ ভেঙে-ভেঙে কিছু লেখা আছে। মাঝে-মাঝে ফুটকি, হাইফেন আর রেফের মতো। একটা ফুল অথবা সূর্য আঁকা আছে। গোলের মধ্যে একটা ঢেউ তার ওপর সূর্য অথবা ফুলটা। না:, আজ প্র্যাকটিস বাদ। কেটে পড়ি। রাস্তায় কারো সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে পেটব্যথার ঢপ মারতে হবে। এখনই এটাকে চালিয়ে দেখা দরকার। যা আছে কপালে। রুকু কোচ এসে গেলেন বলে। চল পিটটান দিই।
নোলক একটু আধটু কম্পিউটার অপারেট করা শিখেছে। সে সন্তর্পণে বাবার ঘরে ঢুকলো। বাবা এখন বাথরুম সেরে ড্রয়িংরুমে চা, সংবাদপত্র নিয়ে বসবেন। এক ঘন্টার মামলা। তার মধ্যে কাজ সেরে নিতে হবে। নোলক সিডি ড্রাইভে সিডি চাপিয়ে দিয়ে মাউস ক্লিক করলো। মনিটরের পর্দায় ফুটে উঠলো রংয়ের বিচ্ছুরণ আতসবাজির মতো। রুদ্ধশ্বাসে নোলক অপেক্ষা করতে লাগল কি ঘটে। কুলকুল করে ঘাম বেরোতে লাগল তার শরীর থেকে। সিডি দেখে নিয়েই স্নানে যেতে হবে। পর্দায় ভেসে উঠলো স্বপ্নে দেখা মেয়েটা। মম। স্নিগ্ধ হেসে নোলককে স্পষ্ট পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘সুপ্রভাত! আমিও বাঙালী। আমার দাদুর বাবার দাদু ছিলেন পশ্চিমবাংলা এক অখ্যাত গ্রামের ততোধিক অখ্যাত তন্ত্রসাধক। তিনি বুঝেছিলেন, এই পৃথিবীর আয়ু ফুরিয়ে আসছে। সুতরাং যঃ পলায়তি সঃ জীবতি। আমাদের গ্রহ নন্দলীলায় শুধু বাঙালীদের বাস। এক বিরাট ঐতিহ্যশালী সভ্যতা এখানে গড়ে উঠেছে। পরমাণু শক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছে মানুষের অন্তরভূমির বিকাশে। এখানে যুদ্ধ নেই। মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে পারলে নিজেকে সার্থক মনে করে। ঋষি অরবিন্দের ‘সুপারম্যান’ কনসেপ্ট এখানে বাস্তবায়িত হয়েছে। যাই হোক, তোমাদের মঙ্গলের জন্য কতগুলো তথ্য দিই মন দিয়ে শুনে রাখো। বৈজ্ঞানিক ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা যাতে এ সমস্যা সমাধানে মন দেন তার চেষ্টা কোরো।’
১। আগামী দিনে বিশ্বে নেমে আসছে পানীয় জলের সংকট।
২। ওজোন স্তর মেরামত হওয়া প্রয়োজন।
৩। প্লাস্টিক প্রোডাক্ট-এর বিধিনিয়ম নির্দিষ্ট করা দরকার।
৪। সীসাদূষণ রোধ হওয়া বিশেষ জরুরী।
৫। নির্মমভাবে গাছ কাটা ঠেকাতে হবে।
৬। যে এলাকায় পানীয় জলে আর্সেনিক তা শুদ্ধ করতে হবে।
৭। পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী।
এইবার পর্দায় দ্যাখো, পরমাণু বিস্ফোরণে একটি গ্রহ মুনস্যাডিনো কিভাবে ধ্বংস হয়েছে তার দৃশ্য। ভয় পেও না। পৃথিবীর মানুষ খুব বুদ্ধিমান। ওরা সচেতন হলে এই পরিণতি অবশ্যই এড়াতে পারবে। ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা দেখে এই প্রখর গ্রীষ্মেও নোলকের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। মন ভরে উঠল বিষাদে। পরক্ষণে পর্দায় ফুটে উঠলো মমের সুন্দর হাসিমুখ। ‘প্রিয় নোলক, মন খারাপ কোরো না। তোমাদের সবুজ গ্রহ পৃথিবী বড়ো সুন্দর। যাতে আরো সুন্দর হয়ে ওঠে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা তার চেষ্টা করছেন। বড়ো হয়ে তুমিও চেষ্টা কোরো। সিডির সব দৃশ্য এইবার মুছে যাবে। তার বদলে ওখানে তুমি পাবে তোমার পাঠ্য সিলেবাসের সমস্ত প্রশ্নোত্তর। এটাই তোমার জন্য আমার নববর্ষের উপহার। বিদায় নোলক।’
নোলক শুনতে পেল, বাবা চুপিচুপি মাকে বলছেন, ‘মেয়েটা কম্পিউটার অ্যাডিক্টেড না হয়ে যায়। যেভাবে ক্ষিদে তেষ্টা ভুলে বসে আছে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন