ড.কূলকার্নীর সময়যান

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

পটাদা শুরু করল গল্প।

সান্তাক্রজ এয়ারপোর্টে, খবরের কাগজে নিজেকে আড়াল করে থাকা লোকটাকে দেখে আমার সন্দেহ হল। কোথায় যেন দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে। নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর বরাবরই আমার আস্থা আছে। আর অ্যানথ্রোপলজি শাস্ত্রটাও অল্পবিস্তর নাড়াচাড়া করেছিলাম একসময়। লোকটার পেছন দিকটা আমি দেখতে পাচ্ছি। মানুষের সামনের দিকটা পরিচিত হলেও অনেকসময় পেছনদিক দেখে তাকে সনাক্ত করা নাও সম্ভব হতে পারে। কিন্তু আমি চিনে ফেললাম। মাত্র আড়াই সেকেণ্ড সময় লাগল লোকটাকে চিনতে। কিন্তু এখানে ও কি করছে? ওর নাম হ্যারি। আমাদের বাংলায় যেমন বাপি, খোকন, বুড়ো, এগুলো খুব কমন নাম। ওদের তেমন টম, হ্যারি, পল ইত্যাদি। এই হ্যারি খুব ধুরন্ধর মানুষ। ও বলে, ওর পেছনেও দুটো চোখ আছে। আর ওর বাম হাতটা ডান হাতের বিশ্রামের সময় কাজে লাগে। আমি পেছন থেকে ওর চোখ দুটো চেপে ধরব বলে পা টিপে-টিপে এগোতে লাগলাম। কিন্তু হাতখানেক দূরে থাকতেই ও কথা বলে উঠল। ‘ওয়েলকাম মি: পটল উপাধ্যায়। চলাফেরা, হাঁচি, কাশি, গেট খোলার শব্দ মানুষে-মানুষে ভিন্ন হয়। আমি আপনাকে আগেই দেখেছি। শুধু অপেক্ষা করছিলাম আমার প্রতি আপনার টানটা আগের মতোই আছে কিনা জানার জন্যে।’

করমর্দনের পর জানতে চাইলাম, এদেশে ওর আগমনের কারণ কি?

উত্তরে ও বলল, ‘আপনি কি জানেন, গুবরে পোকা ওড়ার সময় এরোপ্লেনের মতো গোঁ-গোঁ আওয়াজ করে?’

বললাম, ‘খেয়াল করিনি।’

হ্যারি বলল, ‘কিন্তু আরশোলা আর গুবরেপোকা উল্টে গেলে তাদের পরিস্থিতি খুব করুন হয়ে যায়। ওরা কিন্তু নিজে-নিজেই উল্টে যায়।’

মাথা চুলকে বললাম, ‘বুঝলাম না।’

হ্যারি বলল, ‘ব্যাবিলনের মানুষ টাইম মেশিনের ব্যবহার জানতেন। এবং প্রযুক্তি এতদূর অগ্রসর হয়েছিল যে মেশিনটা ইউজ এণ্ড থ্রোর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। স্ক্র্যাপ অর্থাৎ ভাংড়ির দোকানে পাওয়া যেত টিভির মতোন।’

তাও বললাম, ‘ঠিক বোঝা গেলনা। বি ক্লিয়ার।’

ঠিক বোঝা গেলনা। বি ক্লিয়ার ।

হ্যারি বলল, ‘বাঙালী আর ইহুদীরা মাছ খায় বলে শুনেছি ওদের বুদ্ধি বেশি হয়। এখন দেখছি কথাটার কোনো সারবত্তা নেই। আই মিন, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি।’

বললাম, ‘আমি মাছ খাইনা। সেজন্যই বোধহয় বুদ্ধিটা ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। এবার বলুন।’

হ্যারি বলল, ‘বৈজ্ঞানিক রামানুজন একবার অঙ্ক কষে বলে দিয়েছিলেন একটা গাড়ির অ্যাক্সিডেন্ট হবার ক্ষন। আমি বৈজ্ঞানিক নই, স্কুলে অঙ্কে ফেল করার জন্যে একবার ক্লাস টিচার আমাকে থান ইঁট হাতে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। তাতে আমার একটা উপকার হয়ে গেল। জগতে সব জিনিসেরই ভালো-মন্দ দুটো দিক আছে জানেন তো? আমি ইঁট হাতে উপলব্ধি করলাম, অঙ্ক পারার চেয়ে ইঁট হাতে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক স্বাস্থ্যকর। এতে হাতের গুলি শক্ত হয়। তারপর থেকে ক্লাসে শিক্ষক ঢোকার আগে থেকেই আমি থান ইঁট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতাম। অঙ্ক না পারাটা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। আমি শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে শিখেছি সবকিছু।’

আমি আবার বললাম, ‘এবারেও বুঝলাম না। খুলে বলুন।’

হ্যারি বলল, ‘এই প্লেনে একটা টাইম মেশিন আসছে। কিন্তু যারা আনছে তারা জানেনা কি বয়ে আনছে তারা। ভেবেছে ওটা একটা মামুলি ওয়াশিং মেশিন। সেকেণ্ড হ্যাণ্ড আইটেমের দোকান থেকে সস্তায় কিনেছে। কিন্তু ওটা আসলে একটা ওল্টানো টিএম। সোজা করে বসিয়ে নিয়ে লাল বাটনটা টিপলেই ম্যাজিক শুরু হয়ে যাবে। আড়ে-বহরে জিনিসটা হয়ে দাঁড়াবে প্রায় আট ফুট। ভেতরে সর্বাধিক তিনজনের স্থান সংকুলান হতে পারে। ভেতরে ঢুকে ডানদিকে লিফটের মতো একাধিক বোতাম দেখতে পাওয়া যাবে। আর বামদিকে ডিজিটাল মিটার বক্স। ভুলভাল সুইচ টিপলে কিন্তু ব্ল্যাক হোলের মধ্যে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা আছে। একবার আমি পুরাতন প্রস্তর যুগে ঢুকে গিয়ে সে কি নাকানি-চোবানি খেয়েছি তা আর কহতব্য নয়। টাইম মেশিনটা চালু হলেই হুবহু গুবরে পোকার মতো আওয়াজ ছাড়বে। তাতেই আপনি নিশ্চিন্ত হতে পারবেন যে মেশিনটা ওকে। কিন্তু ওল্টানো অবস্থায় ওটা নিতান্ত একটা পাতি ওয়াশিং মেশিন। এবার বোঝা গেল?’

শুনে আমি বললাম, ‘তা টাইম মেশিনটা আপনার কি কাজে লাগবে?’

হ্যারি ভ্রূ কুঁচকে কিছুক্ষন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর বলল, ‘বলতে পারি তবে একটা শর্ত আছে। আগে কথা দিন কাউকে বলবেন না?’

আমি বললাম, ‘এই চোখ ছুঁয়ে বলছি কাউকে বলব না। মা কালীর দিব্যি।’

হ্যারি বলল, ‘অনলি টাইম ইজ নাথিং। ইট ক্যান অ্যাক্ট হোয়েন ইট কানেক্ট উইথ স্পেস। ইওর মা কালী ইজ টাইম এণ্ড স্পেস ইজ শিবা। টাইম ইজ ইনভিজিবল।’

আমি বললাম, ‘তোমার দরকারটা বোঝা গেলনা।’

হ্যারি বলল, ‘আমি একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছি উনিশশো পঞ্চান্ন সালে। জিনিসটা আমি খুঁজে পেতে চাই।’

জানতে চাইলাম, ‘জিনিসটা কি?’

হ্যারি বলল, ‘আমার গ্র্যাণ্ড পা জন্মদিনে আমায় দিয়েছিলেন। বড়ো হয়ে বুঝতে পারি ওটা মায়া সভ্যতার গর্বের জিনিস। একটা আতসকাঁচ। যা শরীরের সুক্ষাতিসূক্ষ্ম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কলকবজা দেখতে সাহায্য করে।’

কিঙ্কিনী বলল, ‘কিন্তু ভদ্রলোক মুখটা আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন খবরের কাগজ দিয়ে?’

আজ রনেন নেই। আমি রুবি আর তার মাসতুতো বোন কিঙ্কিনী উপস্থিত রয়েছি শ্রোতা হিসেবে। রনেন গিয়েছে তার মাসতুতো দাদার পইতের অনুষ্ঠানে। আমরা কেউ কখনো কোন রবিবার মিস করলে অন্যের কাছে ঘটনাটা শুনে নিই। ক্লাস ফাঁকি দিলে বন্ধুর কাছে নোট টুকে নেবার মতো। তবে বইপড়ার আমেজ যেমন টিভি দিতে পারেনা, আমরাও তেমন পটাদার অননুকরনীয় স্টাইলসহ গল্প পরিবেশন করতে পারিনা। পার্থক্যটা গাছের পাকা আম আর মাজা ম্যাঙ্গোর মতো হয়ে যায়।

পটাদা বলল, ‘সো সুইট! এণ্ড ইনটেলিজেন্ট কোশ্চেন।’ আমিও এই প্রশ্নটাই করলাম হ্যারিকে। ও বলল, ওর বাল্যবন্ধু পল একজন ডাক্তার। সেও এই এয়ারপোর্টের আশেপাশে কোথাও ঘাপটি মেরে আছে। সেও জানে এই বোয়িং বিমানটায় একটা টাইম মেশিন আছে। আতসকাঁচটা তারও দরকার। কেননা বাল্যবয়সে ওটা নিয়ে আমরা খেলতাম। ও ওর ডাক্তারি প্রফেশনে ওটাকে কাজে লাগাতে চায়। আর আমি অপরাধী খুঁজবার কাজে ওটা ব্যবহার করতে ইচ্ছুক। পল আমার বন্ধু হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, ও একজন অসাধু চিকিৎসক। হিপোক্রেটিক ওথ মানেনা। ওর হাতে আমি আতসকাঁচটা যেতে দিতে পারিনা।’

কিঙ্কিনী প্রশ্ন করল, ‘হিপোক্রেটিক ওথ কি?’

পটাদা বলল, ‘গুড! হিপোক্রিটাস ছিলেন একজন গ্রীক দার্শনীক। তাঁকে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার জনক বলা হয়। তিনি চিকিৎসকদের জন্য কতগুলো কোড অফ এথিক্স বেঁধে দিয়েছিলেন। ডাক্তারী ডিগ্রি নেবার সময় ওটা শপথের মতো পাঠ করতে হয়। আমার বন্ধু পল যদি দ্যাখে কিডনি ড্যামেজ হয়েছে তাহলে নির্ঘাৎ ও প্যাংক্রিয়াসের দাওয়াই দেবে।’

রুবি বলল, ‘মিস্টার হ্যারির সঙ্গে তোমার আগে কোথায় দেখা হয়েছিল?’

পটাদা বলল, ‘লজিকাল কোশ্চেন। ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল জাটিঙ্গায়। ওখানকার পাখিরা কেন স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দেয় এই বিষয়টা খতিয়ে দেখার জন্য হ্যারি একদল ইউরোপিও বার্ডওয়াচার নিয়ে এসেছিল। ওরা সব পক্ষিবিশারদ। পাখির ছবি তোলে আর তাদের আচার-আচরন নিয়ে বইপত্র লেখে। ওদের একজন ইন্টারপ্রেটারের দরকার হয়ে পড়েছিল। সেই কাজটা আমি করে দিয়েছিলাম। কেননা, ফরাসী আর নেপালী ভাষায় আমার কিঞ্চিৎ অ্যাকসেস আছে। ওদের বলা হয় অরনিথোলজিস্ট।’

আমি বললাম, ‘তারপর গল্পটা শুর হোক পটাদা।’

পটাদা বলল, ‘রুবি মোচার চপ কি সত্যিই হচ্ছে?’

রুবি বলল, ‘এখনই এসে যাবে। সঙ্গে মেঘি ধানের মুড়ি আর তোমার পছন্দমতো ইনফিউশন। আমরা অবশ্য কালো কফি খাব না।’

কিঙ্কিনী বলল,‘কিন্তু তুমি সান্তাক্রজ এয়ারপোর্টে কি করতে গিয়েছিলে?’

পটাদা বলল, ‘আমি আমার এক গবেষক বন্ধুকে রিসিভ করতে গিয়েছিলাম। তোরা বোধহয় জানিস আকাশে অনেক এয়ারপকেট আছে। আর পৃথিবীতে এমন জায়গা আছে যেখানে মাধ্যাকর্ষন অচল। আবার সমুদ্রগর্ভে এমন জায়গা আছে যেটা উচ্চ শক্তির ম্যাগনেটিক ফিল্ড। এসব বিষয় নিয়ে তোদের অন্যদিন বলব। এসব নিয়েই আমার বন্ধুবর গবেষনা করে থাকেন।’

রুবি বলল, ‘বাবার মুখে আমি বারমুডা ট্র্যাঙ্গলের গল্প শুনেছি।’

প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে আমার মুখেচোখে বোধহয় অসহিষ্ণু ভাব ফুটে উঠল। সেটা পটাদার নজর এড়াল না। হ্যারির প্রসঙ্গে ফিরে এল পটাদা।

হ্যারিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মেশিনটা কোথা থেকে আসছে?’ হ্যারি বলল, ‘হংকং থেকে।’

আমি বললাম, ‘লোকটা এদেশে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনে নিতে পারত না?’

হ্যারি বলল, ‘ব্যাপারটা তা নয়। মানুষের কত বিচিত্র খেয়াল থাকে তা জানেন না? ‘মেড ইন মেক্সিকো’ ব্যাপারটা ওর নজর কেড়েছে। লোকটা কোনো ভুঁইফোঁড় আপস্টার্ট নয়। সাত পুরুষের বনেদিয়ানা ওর রক্তে। ও তুর্কির তোয়ালে ব্যবহার করে, বসরার গোলাপ থেকে তৈরি ইরাকের সুগন্ধী, প্যারিসের কসমেটিক্স। গোসল করে স্পেশাল হামামে, পারস্যের কাপের্ট দিয়ে মেঝে মুড়েছে। মহীশূরের চন্দনকাঠের পালঙ্কে শোয়। ওর স্নানের জল আনা হয় ঝরনা থেকে। ঘরের ফার্নিচারগুলো বার্মার সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরি। ঘরের ফ্যানগুলো জাপানের। বিকানীরের মিছরির সরবৎ খাও ও। ব্রাজিলের কফি। দেশী-বিদেশি সেরা অব আকর্ষনীয় জিনিস সংগ্রহের বাতিক আছে ওঁর। নাম কিষান রাও সিন্ধিয়া।’

আমি বললাম, ‘ওটা যে টাইম মেশিন জানা গেল কি করে?’

হ্যারি বলল, ‘ইজরায়েলের একটা অখ্যাত সংবাদপত্রে প্রফেসর কূলকার্নী নামে এক ইণ্ডিয়ান এ বিষয়ে একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর। কাগজটার তেমন কাটতি নেই। আর গ্রাহকরা মূলতঃ কৃষিজীবি সম্প্রদায়ের মানুষ। তাই বিষয়টা তেমন সাড়া ফেলেনি বা হৈ-চৈ বাঁধেনি। আর ভেবেছে টাইম মেশিন মানে ঘড়ি। দেড়মন ওজনের ঘড়ি হাতে কে বাঁধতে চাইবে? দেয়ালেও ঝোলাতে চাইবে না। টেবিলের ওপর রাখলে টেবিল মচকে যাবার সম্ভাবনা। চলেন, বাকি কাহিনী এয়ারপোর্টের রেস্টুরেন্টে বসে বলা যাক। প্লেন আজ পাক্কা একঘন্টা লেটে রান করছে।’

আমি আর হ্যারি কফি ভেনডিং মেশিন থেকে মিল্ককফি নিয়ে কোণের দিকে একটা টেবিল পছন্দ করলাম। দু-একটা কথাবার্তা হবার পর লক্ষ্য করলাম পাশের টেবিলে একটা লোক আমাদের দিকে পিছন ফিরে বসে আছে। কখন এসে বসেছে খেয়াল করিনি। একটা খবরের কাগজ পড়ছে না কি মুখটা আড়াল করে রেখেছে সেই জানে। তবে লোকটার কানদুটো খাড়া। আর আমাদের কথাবার্তাই যে শুনছে সেটা একশোভাগ নিশ্চিত। হ্যারির দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই সে বলল, ‘সর্বনাশ! এ তো পল হারামজাদাটা। ওর বরাতে দেখছি ধোলাই আছে।’ লোকটা তার মুণ্ডুটা আমাদের দিকে ঘোরাল। তাপর বলল একটা আশ্চর্য কথা। বলল, ‘আমি পল নই।’

হ্যারি বলল, ‘হতেই পারে না। পলকে আমি হাড়ে-হাড়ে চিনি।’

লোকটা বলল, ‘পারে। আমার নাম পল হলেও আমি তোমার বন্ধু বল নই।’

হ্যারি বলল, ‘আমি ড্যাম শিওর তুমিই সেই পাজি পল এবং তোমার পকেটে একটা কোল্ট অটোমেটিক পিস্তল আছে।’

লোকটা বলল, ‘তোমার অনুমান নির্ভূল। আমার ডান পকেটে সত্যিই একটা কোল্ট অটোমেটিক আছে। তবে আমি পল হলেও তোমার বাল্যবন্ধু পল অন্যজন। আমাদের শুধু দৈহিক সাদৃশ্যই আছে।’

হ্যারি বলল, ‘তাহলে তুমি কে? পল কোথায়?’

লোকটা বলল, ‘আমি পলের ক্লোন। আর পল তোমার ক্লোনকে ধাওয়া করেছে।’

হ্যারি অবাক বিস্ময়ে বলল, ‘ক্লোন? মানে তুমি প্রফেসর কূলকার্নির লোক?’

লোকটা বলল, ‘তোমার অনুমান অভ্রান্ত। প্রফেসর কূলকার্নি আমায় পাঠিয়েছেন তোমায় সাহায্য করার জন্য। আর নকল হ্যারিকে পাঠিয়েছেন আসল পলকে দিকভ্রান্ত করার জন্য।’

কিঙ্কিনী জিজ্ঞেস করল, ‘ক্লোন কি?’

পটাদা বলল, ‘বলতে পারিস জেরক্স কপি।’

রুবি বলল, ‘জানি। একটা ভেড়ার প্রথম ক্লোন করা হয়েছিল।’

‘তারপর কি হল পটাদা?’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

ডঃ কূলকার্নীর প্রতিভার কথা ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। দু-দুটো ক্লোনকে উনি পাঠিয়ে দিয়েছেন টাইম মেশিনটাকে রক্ষা করার জন্য? কিন্তু হ্যারি কিষান রাও সিন্ধিয়ার কাছে থেকে জিনিসটা হস্তগত করবে কি করে?

প্রশ্নটা করলাম ওকে। হ্যারি বলল, ‘সেটা কার্যক্ষেত্রে দেখতেই পাবেন। এখানে আমাকে একটু চালাকির আশ্রয় নিতেই হবে। যদিও আপনি বলবেন, ‘চালাকির দ্বারা লাকি’ হওয়া যায়না। তবু এক্ষেত্রে অন্ততঃ একবার জীবনে আমাকে ঘুরপথের আশ্রয় নিতেই হচ্ছে একটা মহৎ সম্ভাবনার স্বার্থে। যদি আমার সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেন তাহলে আপনাকে টাইম মেশিনে চড়াব এবং আপনার পছন্দমতো সময়ে নিয়ে যাব।’

আমি ক্লোন পলকে বললাম, ‘মি: কফি চলবে?’

নকল পল বলল, ‘নো, আমি আমার ইচ্ছামতো কিছু করতে পারি না। ডঃ কূলকার্নী যেমন প্রোগ্রাম ফিড করে দিয়েছেন তার বাইরে আমি যেতে অপারগ। এখন আমায় বাথরুমে গিয়ে স্নান করতে হবে মাথা ঠাণ্ডা রাখার জন্য। আমি চলি। প্রয়োজনমতো দেখা হবে।’

হ্যারি বলল, ‘একটা সমস্যা থেকেই যাচ্ছে, টি.এমটা উদ্ধার হবার পরেও।’

আমি জানতে চাইলাম, ‘কি সমস্যা?’

হ্যারি বলল, ‘টিএম’ এর ফুয়েল। অর্থাৎ জ্বালানী। ভেরেণ্ডার তেল ছাড়া মেশিনটা অচল।’

আমি বললাম, ‘লোকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার জন্য বলে, ‘ভেরেণ্ডা ভাজো গিয়ে’, সেই ভেরেণ্ডা?’

হ্যারি বলল, ‘ইয়েস! দুনিয়ার কোনো জিনিসই ফেলনা নয়। মানুষের আপাত স্বার্থই নির্দ্ধারন করে কোনটা তার কাছে জরুরী, কোনটা নয়। ব্যক্তি মানুষের স্বার্থ আর দুনিয়ার স্বার্থ আলাদা। এই তেলের জন্য আমাকে আপনার দ্বারস্থ হতেই হতো। শুনেছি বাংলাদেশে এই আগাছার বড়ো বাড়। ইল ওয়েডস গ্রো অ্যাপেস।’

কথা বলতে বলতে আমাদের সামনে এক ব্যক্তি এসে হাজির হল। তার পরনে লুঙ্গি ও কাঁধে গামছা। তার দন্তবিকাশের পদ্ধতি বলে দিল, সে একজনের বিশ্বস্ত ভৃত্য।

হ্যারি বলল, ‘এ হল গুনডু। কিষান রাও সিন্ধিয়ার খাস চাকর। তবে আসলে এ গুনডু নয়। এ একজন রোবট। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে যে গাড়িটায় সিন্ধিয়া স্যার উঠবেন সেটাতে ড্রাইভারের আসনে বসবে এই রোবট গুনডু। আসল গুনডু তখন পিছমোড়া করে বাঁধা, মুখে টেপ মারা অবস্থায় গাড়ির ডিকিতে থাকবে। কারো ক্ষতি করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা আমাদের নেই। আমরা যেটা করব, হুবহু ঐ রকম একটা ওয়াশিং মেশিন সিন্ধিয়া স্যারের বাড়িতে পৌঁছে দেব। আর আসলটা থাকবে আমাদের জিম্মায়। এখানে আমাদের কাজ শেষ। চলুন, আপনার গবেষক বন্ধুর জন্য একটা মেসেজ ড্রপ করে যান ‘আপনি যথা সময়ে এয়ারপোর্ট হোটেলে পৌঁছে যাবেন।’

আমি ওদের কাণ্ডকারবার দেখে চমকিত হলাম। হ্যারির সঙ্গে যাবার প্রলোভন সম্বরন করতে পারলাম না। এর পরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। সী বিচে গিয়ে দেখি ধুন্ধুমার কাণ্ড। দুটো ল্যাণ্ডরোভার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। দুটো হুবহু একরকম দেখতে ওয়াশিং মেশিন বালির ওপর নামানো। হ্যারির ক্লোন পলকে বেধড়ক পেটাচ্ছে। আর পলের ক্লোন গুনডুর রোবটের সঙ্গে বেদম হাতাহাতি লাগিয়েছে। আর সিন্ধিয়া সাহেবের সঙ্গে হ্যারি বেজায় তর্কাতর্কি জুড়ে দিল।

—মেশিনটা আমায় দেবেন কি না?

—না দেব না।

—জীবনের চেয়ে মেশিনটা কি আপনার কাছে দামী হল?

—দুটোই আমার কাছে দামী।

—আপনার ভবলীলা সাঙ্গ করে দেব।

—তুমি পারবে না। এখনো বাচ্চা আছো সেটা জানোনা।

—আমার কাছে এ কে ফিফটি সিক্স আছে।

—ওসব হল মান্ধাতার যুগের আগ্নেয়াস্ত্র।

—তার মানে?

—আমার কাছে এমন চশমা আছে যা তোমায় পরিয়ে দিলে আমায় পাঁচজন দেখবে। ঠাহর করতে পারবেনা কোনজন আসল আমি। মানুষ মারার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই হে ছোকরা।

—চশমার কথা মিথ্যা। মেশিনটা আমার চাই।

—চশমাটা একটু পরে দেখবে নাকি খোকন? তবে বলে রাখি এ চশমা পরা যেমন সোজা খোলা তেমন কঠিন। ডাঁটি দুটো কানের ত্বকের সঙ্গে জুড়ে যাবে সারাজীবনের মতো। তখন হাতির পাঁচ পা নয়, পঁচিশটা পা দেখবে।

এমন সময় জলের ওপর দুটো ফেরি বোট এসে দাঁড়াল। ক্লোন হ্যারি আর রোবট গুনডু একটা মেশিন ধরাধরি করে বোটে নিয়ে গিয়ে তুলল। অন্য মেশিনটা ক্লোন পল আর সিন্ধিয়া সাহেব দ্বিতীয় বোটে নিয়ে গিয়ে তুললেন। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল পল। বোট দুটো তুরন্ত গতিতে মাঝ সমুদ্রের দিকে ছুটে গেল। হ্যারিও তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে। এমতাবস্থায় ল্যাণ্ড রোভার গাড়ি দুটোর একটা থেকে নামলেন ডঃ কূলকার্নী অপরটা থেকে স্যার কিষান রাও সিন্ধিয়া।

হ্যারি আর পল ডঃ কূলকার্নীকে দেখে যতটা না চমকাল তার চেয়ে বেশি চমকাল সিন্ধিয়া সাহেবকে দেখে। ডঃ কূলকার্নীর হাতে একটা রিমোট কন্ট্রোল বক্স। উনি একটা সবুজ বাটনে আঙুল ছোঁয়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের ওপর বোট দুটোতে বিস্ফোরন ঘটল। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। জলের ওপর আগুন দেখতে দারুন রোমাঞ্চকর। হ্যারি পাংশু মুখে তাকিয়ে রইল সেদিকে। পল তার মাথার চুল ছিড়তে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম, বোটের সিন্ধিয়া সাহেব তাহলে ডঃ কূলকার্নীর সৃষ্ট নকল। আসল গুনডুর বাঁধন খুলে দিল হ্যারি। তারপর ডঃ কূলকার্নীকে বলল, ‘মহামূল্যবান জিনিসটা ধ্বংস করে দিলেন? আমি কি সত্যিই আপনাকে মারতাম?’

কূলকার্নী মৃদু হেসে বললেন, ‘যার প্রয়োজন হবে সে আবার বানিয়ে নেবে।’

রুবি বলল, ‘এবার মনে পড়েছে। প্রথম ক্লোনিং করা ভেড়াটার নাম ডলি। তাই না পটাদা?’

কিঙ্কিনী বলল, ‘চশমার ব্যাপারটা ভোগা দিয়েছে। রনেন থাকলে বোধহয় বলত...কি বলত সেটাই ভাবছি।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%