বিদঘুটে প্রদীপ

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

মামুন পড়তে বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছিল। ছোটোমামা বলল, ‘গালে হাত দিয়ে কবি সুকান্তর মতো কি ভাবছিস র‌্যা? হাতটা নামা।’

মামুন বলল, ‘ভাবছি কবে বড়ো হবো।’

ছোটোমামা প্রথমে হো হো করে একচোট হাসল। তারপর জিজ্ঞাসা করল, ‘বড়ো হয়ে কি করবি?’

মামুন বলল, ‘কত কাজ! সময় পাব কি করে।’

কথাটা শুনে ছোটোমামা বেদম হাসিতে ফেটে পড়ল। মামুন ভাবল, বড়োরা ছোটোদের কথা বুঝতে পারে না কেন?’

মা বললেন, ‘মামুন, স্কুল ব্যাগের মধ্যে কি আছে বের করে নে। কাচতে হবে।’

আজ রবিবার। বড়ো কাচাকাচির দিন। মামুনের মনে পড়ে গেল ব্যাগের মধ্যে সেই জিনিসটা আছে। প্রদীপটা। গতকাল ইস্কুল থেকে ফেরার পথে সে ভাঙা পাঁচিলের খাঁজে কুঁড়িয়ে পেয়েছে। জমিদার বাড়ি ভাঙা হচ্ছে। প্রায় আড়াই-তিনশো বছরের প্রাচীন বাড়ি। শরিকরা সকলেই এখন কলকাতাবাসী। বাড়িটা অন্য বাড়ির ঘাড়ে ভেঙে পড়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নাটমন্দির-সংলগ্ন অংশটুকু রেখে বাকি সব ভাঙা হবে।

ছোটোমামার মুখেই আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের গল্পটা শুনেছিল মামুন। তার ধারনা, ঐ প্রদীপটাই কোনোভাবে বন্যার জলে ভেসেটেসে এখানে এসে থাকবে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠল মামুন। ছুটল স্কুলব্যাগটার দিকে। সবচেয়ে প্রিয় ছোটো মামাকেও সে এখনো বলেনি যে সে ওটা পেয়েছে। প্রদীপটা টুক করে কুড়িয়ে ব্যাগে ভরার সময় তার বুকের ভিতরটা ঢিপ ঢিপ করছিল। কেউ অবশ্য দেখে ফেলেনি। লিচুতলার কাছাকাছি এসেই সে দিয়েছিল এক ছুট। পিটি উষা দেখলে পিঠ চাপড়ে দিতেন নির্ঘাৎ। কিন্তু এখন কি চাওয়া যায় প্রদীপটার কাছে সে মনস্থির করতে পারছে না। ক্রিকেটের ব্যাট না রং পেন্সিলের বাক্স সে ভেবে পাচ্ছে না কিছুতেই।

সন্ধ্যেবেলায় খেলার মাঠ থেকে ফিরে হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসল মামুন। কিন্তু মনটা আজ ভারি চঞ্চল বারবার মন সরে যাচ্ছে বইয়ের পাতা থেকে। মা ধমক দিলেন একবার, ‘খাটের তলায় হাত ঢুকিয়ে বারবার কি খুঁজছিস রে? কি মণিমানিক্য আছে ওখানে শুনি?’

ধোঁয়ার কুন্ডলী ভেদ করে হাজির হল একটা জিন ।

মামুন ঢোঁক গিলে বলল, ‘কিছু না, একটা ইয়ে...।’

—ইয়েটা কি?

—লাল পেন্সিলটা খুঁজে পাচ্ছিনা।

—স্কুলেই হারিয়ে এসেছো তাহলে।

প্রতিদিন হোমটাস্ক শেষ হতে না হতেই ঘুমে চোখ ঢুলে আসে মামুনের। আধা ঘুমের মধ্যেই মা তাকে কোলে বসিয়ে গোল গোল গ্রাস বানিয়ে মুখের ভিতর ঢুকিয়ে দেন। তারপর মুখ ধুইয়ে তুলে দেন বিছানায়। আজও তাই করলেন। শিথিল হয়ে আসা শরীরটা নিদ্রায় তলিয়ে গেল।

মামুন প্রদীপটাকে হাতে নিয়ে তিনটে ঘষা দিল ছাদের কার্নিসে। আর সাথে সাথে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ভেদ করে হাজির হল একটা জিন। মামুন একটু ভয় পেল বটে তবে মুখে প্রকাশ করল না।

দৈত্যটা মাজায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমায় খেতে দাও, ক্ষিদে পেয়েছে।’

মামুন ভাবল, ‘এ কেমন জিন রে বাবা!’

কিন্তু মুখে বলল, ‘বাবলগাম খাবে?’

জিনটা বলল, ‘ওসবে আমার পেট ভরে না।’

‘নাড়ু আর কমপ্ল্যান খেলে এনে দিতে পারি।’

জিনটা যেন আকাশ বিদীর্ন করে হাসল। তারপর বলল, ‘থাক, তোমার দৌড় আমার বোঝা হয়েছে। তোমার পরীক্ষা করছিলাম। এবার বল কি চাও?’

‘বাবার ক্রেডিট কার্ড এনে দিই হোটেলে গিয়ে খেয়ে নাও।’

‘না রে পাগলী। আমি তোর মনটা টেস্ট করছিলাম।’

‘কি রকম মনটা আমার? খুব খারাপ বুঝি?’

‘না, মনটা ভালই, তবে দোষের মধ্যে হল গোঁজামিল দিয়ে অঙ্ক করিস আর খাতা হারিয়ে ফেলিস।’

‘পড়তে আমার ভালো লাগে না।’

‘তবে কি ভালো লাগে?’

‘ক্রিকেট খেলতে।’

‘এ-মা, মেয়েরা ক্রিকেট খেলে নাকি?’

‘তুমি কিচ্ছু জাননা, মান্ধাতা আমলেই পড়ে আছ।’

জিনটা মাথা চুলকে বলল, ‘তা হবে। আমি তো টিভি দেখিনা তাই লেটেষ্ট খবর জানা নেই। যাই হোক, একটা ব্যাট তোর জুটে যাবে।’

জিনটাকে দেখে বড়ো মায়া হল মামুনের। তার পরনের আলখাল্লায় বেশ কয়েকটা তাপ্পি মারা। কানের দু-পাশে সিং দুটোর কোনা ভাঙা। সে বলল, ‘চেহারার যত্ন নাও না কেন?’

জিনটা বলল, ‘তুই যদি ভালোবেসে হাত বুলিয়ে দিস তাহলে সব আগের মতো হয়ে যাবে। কথাটা সত্যি কিনা পরীক্ষা করে দ্যাখ।’

মামুন জিনটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। আর সত্যি সত্যি তার চেহারাটা ঝকঝকে হয়ে উঠল।

জিনটা বলল, ‘তাহলে আমি চলি মামুন।’

মামুন বলল, ‘আবার আসবে তো?’

জিন বলল, ‘তোর ডাকে আমি সাড়া না দিয়ে থাকতে পারব? কিন্তু একটা শর্ত আছে।’

মামুন বলল, ‘কি শর্ত?’

জিনটা বলল, ‘খেলাধূলার সঙ্গে লেখাপড়াও একটু করা চাই।’

‘ওরে মামুন ওঠ আর ঘুমোস না। এখনই দীপা ম্যাডাম পড়াতে চলে আসবে।’

মা-র ডাকে ঘুম ভাঙল মামুনের। বিছানা থেকে উঠে প্রথমেই তার মনে পড়ল খাটের তলায় প্রদীপটার কথা। সে প্রদীপটা বের করল। তারপর মেঝেতে জব্বর ঘষা দিল তিনটে। একটা ফুটো দিয়ে বিড়বিড় করে লাল পিঁপড়ে বেরিয়ে এল। পিঁপড়েগুলোই জিন হয়ে যাবে নাকি?

খানিকক্ষন অপেক্ষা করল মামুন। না:, পিঁপড়েদের রূপ বদলের কোনো লক্ষন নেই। হতাশ হয়ে প্রদীপটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিল মামুন। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল ‘দুত্তোরি!’

কিন্তু তখন তার নজরে পড়ল একটা ক্রিকেট ব্যাট শোওয়ানো আছে বইয়ের টেবিলে। তাতে লেখা : নতুন বছরে নতুন শুরুর জন্যে—ছোটোমামা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%