গোপেন দারোগার সমস্যা

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

ব্রীজপুকুর এলাকায় সম্প্রতি আবার ছিঁচকে চোরের উপদ্রব শুরু হয়েছে। বেশ অনেককাল চুরি-ছ্যাচড়ামি বন্ধ ছিল। চোরেরা সব লাইফটাইম হরতাল ডেকেছে এমনটাই ভাবা হচ্ছিল। আর সেই সূত্রে গোপেন দারোগার দিবানিদ্রার অভ্যাসটা আরো পোক্ত হয়ে উঠছিল দিনকে দিন। কিন্তু তার এই ভালোটা সইবে কেন চোর বাটপাড়দের। গোঁফটা চুমড়ে টেবিলের ওপর গোবদা দুটো পা তুলে এই কথাটাই ভাবছিলেন গোপন দারোগা।

নতুন দফায় যে চুরিটার সূচনা হয়েছে তার প্রকৃতিও একটু অন্য ধরনের। খুব দরকারি কিম্বা মূল্যবান জিনিস কিন্তু চোরে নিচ্ছে না। একেবারে মামুলি জিনিসের প্রতিই তাদের নজর। একটা সাবান বা ইলেকট্রিক বাল্ব কি গামছা অথবা ফতুয়া এইসব আর কি। তবে দ্রষ্টব্য বিষয় হল, চুরি যাবার আগে সেই বাড়িতে ডিটিপি করা একটা কাগজ দেখা যাচ্ছে। তাতে লেখা থাকছে ‘আপনার বাড়িতে কিছু একটা চুরি হবে। সনির্বন্ধ অনুরোধ, গোপেন দারোগাকে ঠেকাতে বলবেন।’

মূল কথাটা হল, গোপেন দারোগা কিছুদিন আগে বড়োমুখ করে বলেছিলেন, ‘আমার এলাকায় সবচেয়ে বেশি শান্তি বিরাজ করছে। পূর্বতন দারোগাদের সব রেকর্ড ব্রেক করে আমি ঐতিহাসিক নজির স্থাপন করেছি। অতএব সকলের জয়ধ্বনী দিয়ে একবাক্যে বলা উচিৎ, ‘গোপেন দারোগা যুগ যুগ জীও’।

ঠিক তার পরদিনই প্রথম চুরিটা হল খোদ থানাতেই। থানা সংলগ্ন নারকেল গাছের এক কাঁদি ডাব আর কনস্টেবল হারাধনের চশমার খাপ। সবাই ভাবল, ডাব গুনতিতে ভুল হয়েছে। আর হারাধন বেবাউরো লোক, খাপটা হারিয়ে ফেলেছে। অতঃপর দ্বিতীয় চুরিটা হল মল্লিকদার সাইকেলের বেল। একে সাইকেলটার ব্রেক খারাপ। যেখানে সেখানে তাল মেরে দেয়। নেই সামনের চাকার মাড গার্ড। টায়ারে পা চেপে ধরে সাইকেল থামায় মল্লিকদা। রিংসহ টায়ারটা অভিভাবকহীন বালকের মতো টালমাটাল হয়ে ঘোরে। এর ওপর যদি বেল না থাকে তবে তা কী আর সাইকেল পদবাচ্য থাকে? মিউজিয়ামে রাখার মতো একটা অ্যান্টিক সামগ্রী হয়ে দাঁড়ায়। বেল না থাকাতে মল্লিকদাকে এলাকার লোক শাসিয়েছে। এ সাইকেলে চেপে ফের কাউকে ধাক্কা মারলে থানায় নালিশ জানানো হবে। কিন্তু এয়ো বাহ্য। আরো ভয়ানক কাণ্ড হল তৃতীয় চুরিটায়। নেতাই ঘোষের একপাটি পাম-শ্যু। বংশানুক্রমিক কিপটে মানুষ নেতাই। নবীনগঞ্জের হাটে কড়কড়ে একশো টাকা অপব্যয় করে পামশ্যুটা কিনতে হয়েছিল। শীত জাঁকিয়ে বসতেই কিনা জুতোজোড়া হাওয়া! তাও চ্যালেঞ্জ জানিয়ে? এযে কলিরও বাড়া সুপার কলিকাল। আড়াইয়ের ওপর সাড়ে তিন প্যাঁচ। তথাপি গোপেন দারোগা কিনা দাবি করছে তার চাকরিকালেই সুশাসনের রেকর্ড?

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন গোপেন দারোগা...

গাছের পাকা কলা খাওয়াবার প্রলোভন দেখিয়ে নেতাই পাড়ার পাঁচটা ডাকাবুকো ছেলে নিয়ে থানা ঘেরাও করে বসল। আবার হুমকি দিল, জুতো উদ্ধার না করে দিলে লাগাতার অনশন ধর্মঘট চলবে। আমরন হত্যে দিয়ে পড়ে থাকবে সপরিবারে। ‘জুতো দাও, পদ বাঁচাও’ শ্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠল থানা চত্বর।

গোঁফটা চুমড়ে গোপেন দারোগা ভাবলেন, তলে-তলে নির্ঘাৎ ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে কেউ। কোনো গুপ্তশত্রুই হবে। তাকে সনাক্ত করাটাই এখন প্রধান প্রায়োরিটি। এইসব ভাবনায় কাঁচা ঘুমটা সটকে গেল। ভারি ভাবনায় পড়লেন গোপেন দারোগা। চোর নেই অথচ চুরি হচ্ছে। ভারি গোলমেলে ব্যাপার। নেই তাই খাচ্ছ, থাকলে কোথায় পেতে। ধাঁধাটার মতো। এত বড়ো সঙ্কটে জীবনে প্রথমবার পড়লেন গোপেন দারোগা। মগজটা কোন দিক দিয়ে খেলান উচিৎ ভেবে কিছু কুলকিনাড়া করতে পারলেন না। বাতিল পাইপটা আবার নামিয়ে আনলেন আলমারির মাথা থেকে। ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করেছিলেন চুরি-চামারি বন্ধ হবার পর। কিন্তু নতুন করে উপলব্ধি করলেন ত্যাগ সহজ বস্তু নয়। পাউচের তামাক আনতে পাঠালেন পটলাকে। চোর পাকড়াতেই হবে। আর ধূমপানের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। পরশুরাম একুশবার পৃথিবীকে নি:ক্ষত্রিয় করেছিলেন। গোপেন দারোগার সামনে সেকেণ্ড চান্স।

এমন সময় তার নজরে এল টেবিলের ওপর ভাঁজ করা একটা কাগজ। খুলে দেখলেন, ডিটিপি করে লেখা আছে ‘চোর চুরি করিবেই লেকিন গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবে।’ সর্বনাশ! দিনে বারো ঘন্টা না ঘুমোলে ঘুম হয়না গোপেন দারোগার। এমন অনাবিল ঘুম দেখে ট্র্যাংকুইলাইজারও লজ্জা পাবে। আর এই কোন অনামুখোর ব্যাটা বলে কিনা সজাগ থাকিতে হইবে? মামা বাড়ির আবদার। সজাগ থাকবি তোরা, চোখের ঘুম ঘুচিয়ে দেব। হাতে নাতে পাকড়াই একবার। একথা ভাবতেই টেবিলের ওপর রাখা মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। ও প্রান্তের কন্ঠ বলছে—‘আপনার চোখের সামনে থেকে কোন একটা জিনিস আজই চুরি হবে। তবে যদি বলেন, নিজের সম্পর্কে যে কথা আপনি প্রচার করেছেন তা ফিরিয়ে নেবেন, তাহলে আর ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করব না। বড়ো কেস আমার হাতে আছে।’

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন গোপেন দারোগা। ঘোরটা কাটতে কিছুক্ষন সময় লাগল। দুটো ঢোক গিলতে পেরে তবে মুখ ভেদ করে কথা বেরোল তার।

—আপনি কে?

—আপনার নাম যেমন গোপেন, সবই গোপন আপনার। আমার নাম তেমন উপেন। সবই ওপেন আমার। খোলাখুলি কাজ সব। গোপন করার কিছু নেই।

—কি খোলেন আপনি?

—এই ধরুন সিন্দুক, বাক্সপ্যাঁটরা, তালা এইসব।

—খোলেন কেন?

—বড্ড ভালোবাসি যে। না খুলে থাকতে পারিনে। ঘুম চলে যায়।

—তা এতদিন কি করা হচ্ছিল?

—একই কাজ। তবে ভিনদেশে। গেঁয়ো যোগী তো ভিখ পায় না।

—দেশে ফেরার দরকার কি ছিল?

—আপনার গুমর ভাঙতেই ফিরতে হল।

—কেন? তাতে আপনার লাভ?

—দারোগার চাইতে চোরের বুদ্ধি বেশি সেটি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দেবার একটা নি:স্বার্থ তাগাদা অনুভব করছিলাম কিনা, বুকের মাঝখানটায়। তাই ফিরতেই হল।

চটে গেলেন গোপেন দারোগা। বুদ্ধির খোঁটা দেবার হিম্মৎ এ তাবৎ তার স্ত্রী ছাড়া আর কারো হয়নি। আর এ কিনা কোথাকার অলবড্ডে লোক দৃষ্টিকটু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে? তবে আয়। দেখা যাক ভেঙে দেবার মতো অতিরিক্ত ঠ্যাং কয়খানা গজিয়ে এনেছিস বিদেশ থেকে। তবে হয়ে যাক টক্কর।

গোঁফটা চুমড়ে ভাবলেন গোপেন দারোগা। তবে গোঁফ চুমড়ানোর সাইড এফেক্ট হল চোখে চটজলদি ঘুম এসে যাওয়া। গোপেন দারোগা পড়লেন মহা বিপাকে। এই মধ্যবয়সে ছোটাছুটি আর ভালো লাগে? ছোটা ভালো নয় তবে ছুটি অবশ্য মজাদার। সেই বেতের মতো ছিপছিপে চেহারাটা কী আর আছে? পেটের তল্লাট আর বপুর এলাকাতে এখন থাক থাক চর্বি। ছুটতে গেলেই ওরা আপত্তি জানিয়ে বলে, থাক, থাক। তাই তিনি ভাবলেন দৌড় ঝাঁপের চেষ্টা ছেড়ে মগজ খাটিয়ে চোর ধরাই বুদ্ধিমানের কাজ। ফাইলের ধূলো ঝেড়ে সর্বপ্রথমে তিনি প্রাক্তন চোরেদের একটা প্যানেল তৈরি করলেন। কে ঠিক বয়সে অবসর নিয়েছিল, কে বয়স ভাঁড়িয়ে ডিউটি চালিয়ে যাচ্ছিল, সব তথ্য আঙ্গুলের ডগায় আনলেন তিনি। একটু কষ্টও স্বীকার করলেন জিপে উঠে রামকান্তর সাইকেল সারাইয়ের দোকান পর্যন্ত গিয়ে। রামকান্ত একজন গোরুচোর ছিল। গোপেন দারোগা দেখলেন মন দিয়ে টিউবের লীক সারাচ্ছে রামকান্ত। প্রথমে টিউবের ফুটো জায়গাটা ঝামা ঘষে জলে চুবিয়ে লীকটা দেখে নিল। তারপর লীকের ওপর সলিউশনের আঠা দিয়ে রাবারের পটি মেরে নজেলে পাম্পারের নলের মুখ এঁটে হাওয়া ভরে দিল। ওকে কণ্ডিশন। চোখ তুলে তাকাল রামকান্ত।

—ওমা! সার যে। এদিকে কি মনে করে?

—এলাম ঘুরতে ঘুরতে। আজকাল চুরি কে কে করে রামকান্ত?

—চুরি কেউ করে না সার। ওসব সেকেলে গল্প।

—তাহলে কি আমরা স্বর্গরাজ্যে বাস করছি ইদানীং?

—হক কথা সার। তবে কিনা ব্যাপারটা মোটেই ওরকম না।

—কি রকম ব্যাপার শুনি?

—আগে সার দু-পাইপের কলের জলে খাসা দিন কেটে যেত। এখন সার সব জায়গায় মিনিমাম বাইশ পাইপের কল।

—কি বলতে চাস?

—চুরির ধরনও ঐ পাইপের মতোই ডিপ সার।

—তার মানে?

—মানে বুঝলেন না সার, ছিঁচকে চোরের জামানা এটা না।

—হুম বুঝলাম। তুই আমাকে কোন সাহায্যই করতে পারলি না।

একে-একে সব প্রাক্তন চোরেদের ভিসিট করলেন গোপেনবাবু। কেউ খাসি কাটে। কেউ গোডাউন থেকে সবজি কিনে হাটচালিতে বসে, কেউ ভাঙাচোরা জিনিস, শিশি-বোতল সংগ্রহ করে স্ক্র্যাপের দোকানে সাপ্লাই দেয়। কেউ জমিতে জন খাটে, কেউ টিন ঘিরে পঞ্চায়েত অফিসের সামনে চায়ের দোকান খুলেছে। চুরি করেনা কেউ। দরকারই হয়না কারো চুরি করার। আটা কলে গম ভাঙায় শিবে। গায়ে-মাথায়, গেঞ্জিতে আটার গুঁড়ো লেগে আছে ওর। গোপেন দারোগা ডাকতেই ত্রস্তপদে বেরিয়ে এল শিবে। তাকে দেখে ভারি সহানুভূতির উদ্রেক হল গোপেন দারোগার।

—হ্যাঁরে শিবে, চুরি টুরি করিস না কেন রে আজকাল?

—কি যে বলেন সার। চুরি করব কোন দুঃখে?

—কেন রে শিবে চুরির প্রতি বৈরাগ্য এল কেন? এই বয়সে?

বড়ো হতাশ হলেন গোপেন দারোগা একটা চোরের সন্ধান না পেয়ে। মাঝখান থেকে পাক্কা দু-দু ঘন্টা ঘুমের লোকসান হল তাঁর। তাহলে চোরটা কে?

পটলা তামাকের পাউচটা টেবিলেন ওপর এনে রাখলো।

—পুনরায় ধূমপান স্টার্ট করলেন সার?

—তোর তাতে কী?

—না, আমার আর কী। আপনি স্মোক ছাড়াতে আমাকেও ছাড়তে হয়েছিল কিনা। আবার নতুন উদ্যমে শুরু করা যাবে তাই বলছিলাম। আবার মাঝপথে ছেড়ে দেবেন না তো সার?

—তোর মতলবটা কী বল দিকিনি?

—তেমন কিছু না সার। আপনার পেসাদ পাব আবার তাই।

—পেসাদ পা, আমার আপত্তি নেই। কিন্তু বেয়াদব চোরটাকে কায়দা করা যায় কি করে বল দিকিনি?

—সেসব আমার ওপর ছেড়ে দ্যান সার। আপনি আর কবে কি করলেন। যা করার সে তো আমাকেই করতে হয়েছে।

—তা মন্দ বলিস নি। শুধু মাসমাহিনেটাই আমার পকেটে ঢোকে কী বল?

—সে কথা আর ইগনোর করি কি করে।

—এই নতুন মডেলের চোর সম্পর্কে তোর কি ধারনা বল দিকিনি?

—রিমেক সার রিমেক। নতুন বোতলে পুরনো কাসুন্দির মতো।

—রিমেক চোর?

—তবে আর বলছি কী। সেই একই হস্তশিল্প শুধু তার সাথে একটু আধুনিক কুঁচির কাজ।

—তাহলে আমার ঘুমের কি হবে?

—যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আপনার বদলাবার কোনো দরকার নেই। আপনি যথানিয়মে দস্তুরমতো তেল দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমোবেন। আমরা আছি কি করতে। শুধু সার এই অধমের একটা বিনীত নিবেদন আছে। যদি জানতে যান—

—তাড়াতাড়ি বলে ফ্যাল। হাই উঠছে।

—সার, তামুকের প্যাকেট আরেকটা বাড়াতে হবে।

—সে হবে খন। তুই চোর খুঁজে বার কর।

এমন সময় দেখা গেল টেবিলের ওপর একটা ডিটিপি করা কাগজ। তাতে লেখা — ‘চোর নিজে থেকে ধরা না দিলে গোপেন দারোগা আর তার স্যাঙাৎ পটলার সাধ্য নেই তাকে ধরা। আগামীকাল বেলা বারোটার সময় চোর আসবে স্বয়ং। উপযুক্ত প্রমাণসহ তাকে ধরবার চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে।’

গোপেন দারোগার নবাগত ঘুম চটকে গেল। তিনি হুকুম করলেন, ‘পটলা, পাইপটায় তামাক ভরে দে। কাল দুপুর বারোটায় চোর আসবে। সাবধান!’

—এমনও তো হতে পারে সার, আপনাকে চুক্কি দিয়েছে?

—দেখাই যাক।

—তবে আমার মনে হয় চোর হলে আপনি তাকে ধরতে পারবেন না। আগের মতোই।

—কেন রে?

—আপনার সেই এলেম নেই সার। কোনো প্রমাণও নেই আপনার হাতে। ধরলে আমাকেই ধরতে হবে।

—হ্যাঁরে পটলা তুই নিজেই চোর না তো?

—ছি:! ছি:! কি যেন আনকথা বলেন সার।

পরদিন বেলা বারোটা বাজল। গোপেন দারোগা অবশ্য ভাতঘুমের ঘোরে ভুলেই গিয়েছেন গতদিনের চিঠির কথা। আর সেইদিন সত্যিই গ্লোবটা একঘন্টার মধ্যে কিভাবে যে চুরি হল টেবিলের ওপর থেকে।

একটা নীরিহ মতো লোক লম্বা ছাতি বগলে থানায় এসে উপস্থিত হল। পটলা এসে বলল, ‘সার আপনাকে একটু কাইণ্ডলি চোখ খুলতে হবে যে।’

—কাইণ্ডলি কে? ঘুমের ঘোরে বলে বসলেন গোপেন দারোগা। কার নাম?

—কেউ না সার। একজন হ্যাংলা মতন লোক দেখা করতে চায়।

—থানাটা হ্যাংলামোর জায়গা না। মিষ্টির দোকানে যেতে বল।

—সে হ্যাংলা না সার। এ হল রোগাপানা হ্যাংলা।

—ঠিক আছে ডাক। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় অ্যালট হবে না। নতুন সরকারী সার্কুলার এসেছে। কথা কম কাজ বেশি।

কুঁচিয়ে ধুতি পরা ছাতা বগলে লোকটা বিনয়ের অবতার হয়ে বসল।

—কি চাই?

—আঁজ্ঞে, একটা ডায়েরি লেখাব।

—কিসের?

—আঁজ্ঞে চুরির।

টেবিল থেকে পা দুটো মাটিতে নামিয়ে সোজা হয়ে বসলেন গোপেন দারোগা।

—চুরি? এ অঞ্চলে কখনো চুরি হয়না। সব বাজে কথা। শাটাপ।

—না, স্যার বাজে কথা নয়। সিওর শট।

—আপনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারবেন? তথ্য-পরিসংখ্যান?

—আমারো সেই কথা। চোর এমন সেয়ানা, যে কোনো প্রমাণ রাখে না। প্রমাণই যদি থাকবে তবে বাহাদুরি কিসের?

কুতকুতে চোখদুটো সরু করে ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন গোপেন দারোগা। লোকটার মুখাবয়ব আংশিক চেনা-চেনা মনে হচ্ছে।

—কাকে সন্দেহ হয় আপনার?

—আঁজ্ঞে উপেন্দ্রনারায়ন চাকলাদারকে।

—যা:! উপেন্দ্রনারায়ন নামে কোনো চোর হয় নাকি?

এ তো জমিদারের নাম।

—হয়, মশায় হয়। এ দুনিয়ায় সব হয়। নামটা দেওয়া হয়েছিল সে রাজা হবে ভেবেই। কিন্তু গ্রহনক্ষত্রের ফাজলামিতে শেষকালে চোর হয়ে পড়ল সে। কি আর করা। গ্রহবৈগুন্যের জের টানতে হচ্ছে।

—রাজটীকা কপালে নিয়ে জন্মালে রাজা হয় শুনেছি। কপালে তস্করটীকা থাকে কী? চিন্তায় ফেললেন দেখছি।

—আপনি বসে বসে বেধড়ক চিন্তা করলে চোর ধরা পড়বে বলে মনে হয় আপনার?

—ডায়েরি নেবার আগে ভাবছি আপনার অভিযোগ কতখানি যুক্তিযুক্ত। এমন একটা জাঁদরেল নামে চোর হওয়াটা অনুচিত।

—তা আপনি কি ভাবেন নামে শুধু ভদ্রলোকেদের একচেটীয়া রাইট আছে? চোর কি ভদ্রলোক নয়? মানে বলতে চাইছি চোর বলে কি ভদ্রমানুষ হতে পারে না সে?

—আপনি আজব কথা শোনালেন মশায়। চোরের সঙ্গে ভদ্রলোকের তুলনা? দুটো আলাদা স্পেসিস। তুলনাই হতে পারে না।

—একজন সিঁদেল চোরের আলট্রামডার্ন নাম হওয়াটা তার গণতান্ত্রিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। ধরুন তার নাম হল গে বজ্রসুন্দর সাঁপুই। তাহলে কি তার বিদ্যেতে ঘাটা পড়ে যাবে? না মশায়, তা হয়না। ধরা না পড়লে এর চে বড়ো বিদ্যে যে আর নেই, তা কে না জানে?

—কিন্তু ধরা পড়বেই। চুরি বিদ্যার অন্তিম পরিণতি হল ধরা পড়া। সব চুরির গল্পই ধরা পড়াতেই শেষ হয়।

—তা পড়ুক। তবে ল্যাপটপ নিয়ে যখন চুরি করছে সে তখন তার আলট্রামডার্ন নাম হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

—ল্যাপটপ নিয়ে চুরি করছে?

—তবে আর দারোগার পোশাকটা পরে বসে আছেন কেন? খুলে ফেলুন। সে দিন কি আর আছে, সর্বাঙ্গে তেল মেখে, মুখে ভুষোকালি ঘষে রাতবিরেতে চুরি করতে বেরবে? নিজেকে আপ-টু-ডেট করাই তো মাথাঅলা লোকেদের লক্ষণ। আর চোর সর্বদা মাথাওলা হয়। অন্ততঃ তার নিজের কাজের ফিল্ডে, দারোগাদের চেয়ে। এটা চিরন্তন ব্যাপার।

—খামোশ! বাংলায় ততটা জোড়াল হবে না ভেবে হিন্দী শব্দই আশ্রয় করলেন গোপেনবাবু।

—মোটেই বাজে বকবেন না। দারোগাদের চে চোর কখনো বুদ্ধিদীপ্ত হতে পারে না। ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়না।

—থামুন মশায়। ঢের হয়েছে। চোরেদের সেভাবে কোনো ইতিহাস লেখা হয়েছে কী? হলে বুঝতেন। ইতিহাস তো বায়াস। রাজারা চিরকাল নিজেদের পক্ষে লিখিয়ে নেয়।

—ছো:! চোরদের নিয়ে কে লিখবে? খেয়ে দেয়ে কাজ নেই নাকি?

—লিখবে। আলবৎ লিখবে। এবার লেখা হবে। চোরদের নিজেদেরই হাতে কলম ধরতে হবে। কবে কোথায় কার সাথে টক্কর দিয়ে আমাদের জ্ঞাতিভাই, গুরুভাইরা বংশীয় স্ট্যাটাস রক্ষা করেছিল সে কথা বিস্তারিতভাবে ফলাও করে লেখা হবে। প্রথমে তিন ভল্যুমে বেরোক। তারপর চাহিদা বুঝে খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হতে থাকবে। ‘চোরচরিতমানস’।

—আপনি কে বলুন তো। চোরেদের হয়ে ওকালতি গাইছেন?

—আমি তাদের একজন পেট্রোনাইজার। পৃষ্ঠপোষক বলতে পারেন। বিলুপ্ত প্রজাতিকে রক্ষা করাই আমার আদর্শ। যেমন ধরুন, বিরল প্রজাতির কচ্ছপ কিম্বা বন্যপ্রাণী—এইসব মারলে পেটা আইনে পেটাই করা হয় তাই না? কেননা, ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স নষ্ট হয় এতে—তার ফলে সভ্যতা বিপন্ন হয়ে পড়ে আর অসভ্যতা কায়েম হয় তাইতো? ঠিক তেমন ছিঁচকে চোর বিরল হয়ে গেলে বড়ো চোরের বাড়বাড়ন্ত হয়, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, কেমন কিনা? সলিড যুক্তি নয়?

অর্থাৎ কিনা প্রকৃতির স্বার্থেই আমার বর্তমান কার্যকলাপ। বোঝা গেল?

—আপনাকে লক-আপে পুড়বো।

—আইনতঃ তা পারেন না। কেননা উপযুক্ত প্রমাণ নেই আপনার হাতে। আবার দেখুন ডায়েরি নিতেও ভয় পাচ্ছেন আপনি। এই চাকরিটা আপনার করা বেআইনি।

—দেখুন বাল্যকাল থেকে দুটো জিনিসে আমার খুব আপত্তি। ভূত আর চোর। এ দুটোকে দুনিয়া থেকে নির্মূল করে দেওয়া দরকার। বিরলের তস্য বিরল প্রজাতি হয়ে যাক এসব। প্রাকৃতিক ভারসাম্যের নিকুচি করেছে। আমার বারোঘন্টার তোফা ঘুম বজায় থাকলেই হল। দিনে চার রাতে আটঘন্টা, দুই কিস্তিতে। আর এক কিস্তি ঘন্টা দুয়েকের বিকেলের দিকটায় বাড়িয়ে নিতে পারলে হত। সেই কায়দাটাই রপ্ত করার তালে আছি রিসেন্টলি।

—বাল্যকালে ইস্কুলে পড়া বিদ্যাপতির কবিতাখানা মনে আছে? আধাজনম হাম নিদে গোঙাইলু। আপনার তো থ্রী-কোয়ার্টার হয়ে গেল দেখছি।

—আপনার মুখটা চেনা-চেনা লাগছে। কে বলুন তো আপনি?

—মনে পড়বে। আমি চলে গেলে মনে পড়বে। ব্যস্ততার কি আছে? মানুষের সবই মনে পড়ে। তবে কিনা, বড়ো অসময়ে। আমি চলি এখন, কেমন?

ডায়েরি নিতে যখন অস্বীকার করছেন, তখন কী আর করা। যঃ পলায়তি সঃ জীবতি।

ছাতা বগলে ভদ্রলোক চলে গেল। গোপেন দারোগা হাঁক পাড়লেন পটলার উদ্দেশ্যে।

—পটলা এদিকে আয়।

—বলেন কত্তা।

তিনরকম পরিস্থিতিতে তিনরকমভাবে গোপেন দারোগাকে সম্বোধন করে থাকে পটলা। তার নর্মাল ডেলিভারি হল ‘সার’। একটু চাপের মধ্যে থাকলে ‘কত্তা’ আর পুরোপুরি চাপের মুহূর্তে ‘হুজুর’। এখন সেমিচাপের টাইম বুঝতে পারল পটলা। তাই কত্তা বলে সম্বোধন।

—লোকটাকে ভালো করে খেয়াল করেছিস?

—করেছি কত্তা।

—ক্যামন বুঝলি?

—সজ্জন মানুষ কত্তা। কোনো ডাঁট নেই।

—তোর মাথা। তামুক সাপ্লাই তোর আজ থেকে বন্ধ যা।

—এমন অনেয্য কর্ম করবেন না কত্তা, কাইণ্ডলি। তামুক স্টপ করে দিলে আমি বেঘোরে জলে পড়ে যাব হুজুর।

—লোকটা কোথায় থাকে গিয়ে দেখে আয়। পেছন পেছন ফলো কর লোকটাকে। জলদি যা। যদি ননস্টপ তামুক চাস।

হাত কচলাতে লাগল পটলা। তার ভাবগতিক দেখে গোপেন দারোগা তার মতলবের হদিস পাবার চেষ্টা করলেন।

—আবার কি?

—তামুকের ব্যাপারটা কত্তা, আগে কথা দেন ভালো করে।

—ওটা পাবি, যা। লোকটা পালিয়ে যাবে যে। দৌড়া।

মাথার ভিতরের আঁটুনিতে একটা প্যাঁচ খুলল গোপেন দারোগার। স্কুল লাইফে এক ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল তার। সরস্বতী পুজোর দিন ইস্কুলের নারকোল গাছের সব ডাব নামিয়ে দিয়েছিল রাতের বেলায়। তারপর হেডমাস্টারের বেত খেয়ে গায়েব হয়ে গিয়েছিল। তারপর পুলিশ লাইনে দেখা হয়েছিল তার সাথে। বুকের ছাতি এক ইঞ্চি কম পড়ে যাওয়ায় চাকরিটা হলনা তার। তখন গোপেনকে বলেছিল তবে তাই হোক। যাতে আমার দক্ষতা সেটাই পেশা হিসেবে বরণ করে নিলাম। আর তুই দারোগা হবার মজা টের পাবি। হুমায়ুনের বাবার নাম না বলে দিলে ইতিহাসে তুই গেড়ে যেতিস। তাহলে থানার ডাব চুরি সেই বিস্মরনীয় অতীতকেই মনে করিয়ে দেবারই প্রয়াস কী?

বেজে ওঠা মোবাইল ফোনটা তুলে নিলেন গোপেন দারোগা।

—পটলা কিছু করতে পারবে না রে। ও অন্য লোকের পেছনে দৌড়চ্ছে। চাঁটি খেল বলে। ছাগল দিয়ে জমি চাষ হয়?

—তুই উপেন না?

—মনে পড়ল তাহলে?

—কেমন আছিস বন্ধু?

—তোকে দেখে বড়ো মায়া হল রে গোপেন দেশে ফিরে। খোদার খাসির মতো চেহারাটা বানিয়েছিস। দ্যাখ তো, আমার কেমন কর্মময় জীবন আর স্লিম ফিগার। চল নতুন করে আরেক রাউণ্ড শুরু করা যাক দৌড়ঝাঁপ। আমি চুরি করব, তুই ছুটে মরবি। একমাসে তোর কুড়ি কেজি মেদ ঝরাতে চাই আমি। বন্ধুসুলভ কাজ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%