বদ্যিবুড়োর ফিসফিসানি

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

বোঁচা খেতে বড্ড ভালোবাসে তবে তাকে পেটুক বলা অন্যায়। ভাত খাবার আগে একবাটি ডালমুট কিম্বা এক বয়াম বিস্কুট সে খেয়ে থাকে। তাতে তার ক্ষিদে মরে যায় একথা ভাবলে ভুল হবে। জ্যাম মাখিয়ে মোগলাই পরোটা, টম্যাটো সস দিয়ে ছাতু অথবা চাউমিনে দই ফেলে হামেশাই সে খেয়ে থাকে। তাতে তার কস্মিনকালেও শরীর খারাপ করেনি। ঘন্টায়-ঘন্টায় ক্ষিদে পায় তার। আর তখন হাতের কাছে যা পায়—ডাঁশা পেয়ারা কিম্বা আস্ত ফুলকপি, সে কারো তোয়াক্কা না করে কচকচ করে খেয়ে নেয়। একবার সে কাঁচা বেগুন কাঁচা লংকা দিয়ে পরিতৃপ্তি সহকারে খেয়েছিল। অনুষ্ঠান বাড়িতে সচরাচর ভরপেট ক্ষুধা নিবারণের পর গোটা সত্তর রসগোল্লা তাকে খেতেই হয়। নতুবা তার মান থাকে না। হাতে-পায়েও বাড়ছে সে দেখবার মতো। ক্লাস সিক্সে উঠেই তার হাইট পাঁচফুট পাঁচ। আর ওজন আটচল্লিশ কিলো।

অন্যদিকে চিকু ঠিক উল্টো ধাতের। একেবারে পেটমরা মানুষ। তিন গ্রাস ভাত খেতে পাঁচ ঢোঁক জল খায়। এটা খাব না, ওটা চাখব না, নানান বায়নাক্কা। এরকম পাখির আহার করে যে মানুষ বাঁচে সেটাই আশ্চর্য। ওল, নিমপাতা আর লংকায় ভীষণ ভয় চিকুর। লংকায় কামড় পড়লেই হেঁচকি তুলতে শুরু করে ও। ওল খেয়ে একবার গলা ফোলার পর থেকে আর ওলের দিকে তাকায় না। নিমবেগুন খেয়ে সেই যে বমি করেছিল তারপর থেকে আর স্পর্শ করে না জিনিসটা। দুধে তার অরুচি আর মাছে আঁশটে গন্ধ লাগে। তাহলে আর ভূ-ভারতে খাবার জিনিস থাকল কি?

কিন্তু যেদিন ‘বি’ সেকশনের ঘরে মেঝের ওপর চিকু চিৎপাত করে ফেললো বোঁচাকে, সেদিন ক্লাস সিক্সের সবাই ঢোঁক গিললো। প্রথমে হতবাক তারপর বিস্মিত অবশেষে হাততালি দিল সবাই। সুজয় বলল, ‘এটা অযৌক্তিক, যাই বলিস। বোঁচার জেতা উচিৎ ছিল। এ যেন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিল তেলিপাড়া তরুণ সমিতি।’

বুম্বা বলল, ‘ফল্গু নদীর তলায় জল থাকে টের পাওয়া যায় না। আমরা যারা রোগাপাতলা চিকু তাদের গর্ব।’

কিন্তু সবচেয়ে তাজ্জব বনে গেল বোঁচা নিজে। চিকু তাকে পেড়ে ফেলবে এটা সে কখনো ভাবেনি। চিকুকে সে কখনো হিসাবের মধ্যেই রাখেনি। যাকে বলে নগণ্য। হিসেবের বাইরের ব্যাপার।

ছোটো-ছোটো কথা কাটাকাটি থেকে মারামারির সূত্রপাত। বোঁচা বলেছিল, ‘ভূত বলে কিছু হয় না। হলে চিড়িয়াখানায় ঠিক একটা ভূত রাখা থাক থাকতো’ ।

দুর্বল লোকেদের মারবার আগে বারকতক ভেবে দেখা ভাল...

চিকু বলেছিল, ‘যদি নাই থাকবে তাহলে লোকে ভূতের ভয় পায় কেন?’

বোঁচা বলেছিল, ‘ও তুই বুঝবি না। ওসব মনস্তাত্বিক ব্যাপার।’

চিকু বলেছিল, ‘কেন বুঝব না? আমি কি তোর চে কিছু কম বুঝি?’

বোঁচা বলেছিল, ‘নিশ্চয় কম বুঝিস। বেশি তর্ক করলে গাঁট্টা খাবি।’

চিকু বলল, ‘মেরে দ্যাখ একবার।’

বোঁচা সত্যিই গাঁট্টা মেরেছিল। আর তৎক্ষণাৎ চিকু সবার বদ্ধমূল ধারণা নস্যাৎ করে দিয়ে বোঁচাকে জাপটে ধরে ল্যাং মেরে মেঝেতে শুইয়ে দিল।

বোঁচা স্তম্ভিত হয়ে, অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে, গোল গোল দুটো চোখে, কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল চিকুর দিকে। তারপর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বলল, ‘তুই সত্যি সত্যি আমায় ল্যাং মেরে ফেললি? না, এ কখনো হতে পারে না। আমি নির্ঘাৎ স্বপ্ন দেখছি। তুই জানিস আমি গতকাল এক শিশি গুঁড়ো হরলিকস খেয়েছি?’

চিকু মিচকি মিচকি হাসতে লাগল। ছোটন আর সবুজ চিকুর দলে নিজেদের ভিড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যে পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

সুজয় বলল, ‘তাহলে আমরা সবাই স্বপ্ন দেখছি নাকি?’

এমতাবস্থায় নিত্যানন্দ স্যার চক-ডাস্টার নিয়ে ঢুকতেই প্রসঙ্গ আপাততঃ মুলতুবি রইল। তবে ক্লাশে সারাক্ষণ বোঁচা আড়ে-আড়ে চাইতে লাগল চিকুর দিকে। চিকু তার প্রেস্টিজে চিটেগুড় ঢেলে দিয়েছে।

ইস্কুল ছুটি হলে বোঁচা চিকুর পাশে পাশে হাঁটতে লাগল।

চিকু বলল, ‘কিছু বলবি?’

বোঁচা বলল, ‘কিন্তু তুই আমাকে কি করে মাটিতে শুইয়ে ফেললি বল তো? কমপ্ল্যানের বদনাম হয়ে যাবে যে।’

চিকু বলল, ‘আমি তো ফেলিনি।’

বোঁচা আশ্বস্ত হয়ে বলল, ‘তাই বল। বাঁচালি।’

কিন্তু পরক্ষণেই বোঁচা বলল, ‘তাহলে আমি মাটিতে পড়লাম কি করে?’

চিকু বলল, ‘ভূতে ফেলেছে।’

বোঁচা বলল, ‘যা:! তাই আবার হয় না কি?’

চিকু বলল, ‘তাহলে আর কি বলি বল? না হয় আমিই ফেলেছি এই কথাটা মেনে নে। তাহলেই গোল চুকে যায়।’

বোঁচা বলল, ‘আমি মেনে নেব না।’

চিকু বলল, ‘আমি যে তোকে ল্যাং মেরে ফেলিনি তার কোনো প্রমাণ আছে তোর কাছে?’

বোঁচা বলল, ‘আছে।’

চিকু জানতে চাইল, ‘কি প্রমাণ?’

বোঁচা বলল, ‘যখন আমি মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলাম তখন কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘দুর্বল লোকেদের মারবার আগে বারসাতেক ভেবে দেখা ভালো।’

চিকু বলল, ‘ওটা বদ্যিবুড়োর ফিসফিসানি।’

বোঁচা বলল, ‘বদ্যিবুড়ো কে?’

চিকু বলল, ‘আমিও ঠিক জানিনা সে কে। তবে নিজেকে সে বদ্যিবুড়ো বলেই পরিচয় দেয়।

—জীবিত না মৃত?

—ভূত যখন, তাহলে নিশ্চয় মৃত।

—তুই আমায় চিন্তায় ফেললি দেখছি। লোকটার ফিসফিস করে বলা কথা আমি স্বকর্ণে শুনেছি। ফলে, ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে পারছি না। কিন্তু লোকটার সঙ্গে দেখা করার উপায় কি?

—উপায় নেই। আমিও কোনোদিন দেখিনি তাকে।

—একটা উপায় আছে।

—কি?

—তোকে যদি ফের গাঁট্টা মারি লোকটা নিশ্চয় ফিরে আসবে।

—তা আসবে।

—তুই সিওর?

—হান্ড্রেড পার্সেন্ট।

কিন্তু গাঁট্টা মারার আগেই একটা ঘূর্ণি হাওয়া এসে বোঁচাকে ধাক্কা মারল। বোঁচা হুমড়ি খেয়ে পড়বার আগেই তাকে অবশ্য টেনে ধরল চিকু।

বোঁচা বলল, ‘ভূতটা আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই আছে।’

ফিসফিস করা কন্ঠ বলল, ‘আমি প্রবল প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি মোটেই ভূত নই। তবে ‘অশরীরী’ বলা যেতে পারে আমাকে।’

বোঁচা বলল, ‘ঐ একই কথা। ঝোলে যাকে লাউ বলা হয়, অম্বলে তাকেই কদু বলে।’

লোকটা বলল, ‘না, একই কথা নয়। আমি ট্র্যাডিশনাল পথে অশরীরী হইনি। স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে আমার।’

বোঁচা বলল, ‘কি আপনার ইতিহাস, বলুন শুনি।’

লোকটা বলল, ‘আমি বদ্যিবুড়ো। বদ্যি মানে ডাক্তার। আসলে আমি ছিলাম সায়েন্টিস্ট।’

বোঁচা কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘মানে বৈজ্ঞানিক?’

বদ্যিবুড়ো বলল, ‘কিভাবে মানুষকে অদৃশ্য করা যায় সেটাই ছিল আমার গবেষণার বিষয়বস্তু। সেই গবেষণায় আমি সফল হয়েছিলাম। আবিষ্কার করেছিলাম একটা ট্যাবলেট। কিন্তু সেটা প্রয়োগ করে পরীক্ষা করার জন্য কোনো লোককে রাজি করাতে পারছিলাম না। শেষকালে অগত্যা নিজেই খেয়ে বসলাম ঝোঁকের মাথায়। তারপরেই উপলব্ধি করলাম পুনরায় দৃশ্যমান হবার ট্যাবলেটটা আমি আবিষ্কার করিনি। সেই হঠকারিতার ফল আজও ভুগে চলেছি।’

বোঁচা বলল, ‘কিন্তু অদৃশ্য হবার ট্যাবলেটটা আপনি আবিষ্কার করলেন কেন?’

বদ্যিবুড়ো বলল, ‘দুনিয়ার বদমাশ লোকগুলোকে আমি ভ্যানিশ করে দিতে চেয়েছিলাম।’

বোঁচা বলল, ‘তাহলে আপনি বর্তমানে মানুষ না ভূত?’

বুড়ো বলল, ‘ট্যাবলেটটা আমি খেয়েছিলাম দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধের সময়। সে হিসাবে এতদিনে আমার ভূতই হবার কথা। কিন্তু অদৃশ্য হবার আগে আমি যেমন ছিলাম এখনও তেমনই আছি। আলাদা কিছু বুঝছি না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমাকে ভূত বলা চলে না ঠিকই। তবে মানুষও বলা চলে কি? ওই মাঝামাঝি একটা রফা করে নিজেকে ‘অশরীরী’ বলে চালাই আর কি।’

চিকু বলল, ‘অন্য ভূতেদের সঙ্গে আপনার দেখা হয়?’

লোকটা বলল, ‘ওরা ঠিক কোথায় থাকে আমি জানি না। ওরা অন্য ওয়েভ লেংথের বাসিন্দা। ওদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না।’

চিকু বলল, ‘তাহলে তো আপনার খুব কষ্ট।’

বদ্যিবুড়ো বলল, ‘তা মাঝে-মধ্যে একটু হয় বৈকি। আবার আনন্দও পাই। যখন বদমাশ লোকের কান মুলে দিই, থাপ্পড় কষাই তখন বেড়ে লাগে। বেঁচে থাকলে আমি মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রিমোট কন্ট্রোল বানাতাম। অধিকাংশ মানুষকে মিউট করে রাখতাম। রাস্তাঘাটে বড্ড বেশি বাজে বকে লোকগুলো।’

বোঁচা বলল, ‘আমি আর দুর্বল মানুষের গায়ে হাত তুলব না। ক্ষমা চাইছি।’

বদ্যিবুড়ো বলল, ‘সাবাশ! এই তো ভালো ছেলের মতো কথা।’

বোঁচা বলল, ‘দেখলি তো উনি ভূত নন। ভূত বলে কিছু হয় না।’

চিকু বলল, ‘ঠিকই। ভূত বললে ওনাকে অসম্মান করা হয়।’

বোঁচা বলল, ‘কিন্তু ওনার আর মরা হল না। ব্যাপারটা কেমন গোলমেলে হয়ে রইল না?’

বুড়ো বলল, ‘কিছু গোলমাল হয় নি। ট্যাবলেটের কার্যকারিতার একটা মেয়াদ আছে। ওটার এক্সপায়ারি ডেট ছিল আজ পর্যন্ত। বিকেল পাঁচটার পরই টের পাব আমি মানুষ না ভূত, নাকি অন্য কোনো উন্নত প্রজাতির অস্তিত্ব। ঘড়িতে কটা বাজে দ্যাখো তো ছোকরা।’

চিকু বলল, ‘পাঁচটা বাজতে দু-মিনিট বাকি।’

বদ্যিবুড়ো বলল, ‘হ্যাঁ, ভালো কথা। বোঁচাকে বলছি, আমি নেই ভেবে ফের যেন কারো ওপর গায়ের জোর ফলাতে যেও না। মোট একান্নটা ট্যাবলেট আমি বানিয়েছিলাম। সেগুলো কিন্তু চকোলেট মনে করে খেয়ে বসে আছে একদল মিলিটারি। প্রচণ্ড বদরাগী তারা। অন্যায় অধর্ম কোথাও দেখলেই তারা দমাদ্দম কিলোতে শুরু করে। সুতরাং অধিকন্তু ন দোষায়ঃ। বিদায় বন্ধু! সকলের ভালো হোক।’

বোঁচা দেখল, ‘ঘড়িতে ঠিক কাঁটায় কাঁটায় পাঁচটা।’

চিকু ‘বদ্যিবুড়ো’, ‘বদ্যিবুড়ো’ বলে গলা ফাটিয়ে ডাকল অনেকবার। কিন্তু সাড়া মিলল না।

বোঁচা বলল, ‘থ্যাংক ইউ চিকু। আজ থেকে তুই আমার বেস্ট ফ্রেণ্ড। মন খারাপ করিস না। বরং ভালোই হলো। উনি একটা ভালো ওয়েভ লেংথে যেতে পারবেন।’

চিকু ছলছলে চোখে বলল, ‘ঠিক বলেছিস।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%