বিটকেলে লোকটা

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

সেবার নয়নসুখ গ্রামে পুজোর আগে একটা অদ্ভুত লোক এল। তাকে শুধু রাতে দেখা যায়। দিনের বেলায় তার টিকিটারও সন্ধান পাওয়া যায় না। গ্রামে অনেক ভবঘুরেই আসে। দিনকতক থাকে, তারপর আবার কোথাও চলে যায়। কিন্তু এই লোকটা একদম অন্যরকম। অন্য ভবঘুরেদের সঙ্গে এর তুলনাই চলেনা। লোকটা কারো কাছে কিছু চায়না। কেউ তাকে কখনো কিছু খেতে দ্যাখেনি। ব্যাপারটা প্রথমে নজরে পড়ল রাইমোহন রায়ের। লোকটা শিবমন্দিরের চাতালে একভাবে শুয়ে থাকে। নড়ে চড়েও না। গায়ে বসা মশা-মাছি-ডেঁও পিঁপড়ে পর্যন্ত তাড়ায় না। তাহলে কি বোধশুন্য মানুষ?

রাইমোহনবাবু যৌবনে খুব ডাকাবুকো ছিলেন। দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যখনই একঘেয়ে লাগত তিনি তখন ঝোলাঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন অজানার উদ্দেশ্যে। বিশেষতঃ, পাহাড়ের দিকেই ঝোঁক ছিল তার। সেই সময় তিনি একজন ব্যক্তির সন্ধান পেয়েছিলেন, খাওয়াটা যাঁর বাহুল্য মনে হত। কিন্তু অটুট স্বাস্থ্য। প্রাচীনকালের বায়ুভূক মুনিঋষিদের কথা শোনা যায় বটে। কিন্তু এ কালে কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলেই মনে হয়েছিল রাইমোহন বাবুর। একজন মানুষের না খেয়ে বেঁচে থাকাটা বিজ্ঞান অবশ্যই সমর্থন করবেনা। মানুষের জীবনীশক্তির প্রধান উপকরনই তো খাদ্য।

বকুল মিত্র একজন অ্যামেচার ফটোগ্রাফার। তার তোলা দু’চারটে ছবি খবরের কাগজেও ছেপেছে। সে সর্বদা একটা পেনট্যাক্স ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ভাল বিষয় পেলে ক্যামেরা বন্দী করে ফেলাটা তার নেশা। রাইমোহনবাবুকে সে একটা অদ্ভুত খবর দিল। ভবঘুরে লোকটার নাকি ফোটো ওঠেনা। সে দু’বার চেষ্টা করে দেখেছে। তার হাতে আজ পর্যন্ত কোন ছবি মিস হয়নি। কিন্তু এই অদ্ভুত লোকটার ছবি তুলতে সে ব্যর্থ হয়েছে। কেন এমন হচ্ছে, ব্যাপারটা কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না তার। আজব তথ্যটা পেয়ে খুব একটা চমকালেন না রাইমোহনবাবু। এমন একটা ঘটনা আগেও তাঁর শোনা ছিল। তবে তখন কথাটা বিশ্বাসের অযোগ্য বলেই মনে হয়েছিল। এবারে তিনি বললেন, ‘চলো তো হে, পরীক্ষা করে দেখা যাক। ফিল্মের রোলটা না হয় আমিই দিচ্ছি।’

ফ্ল্যাশগানটা সঙ্গে নিল বকুল। ব্যাটারিও নতুন ভরে নিল। মন্দিরের চাতালে শুয়ে আছে লোকটা নির্বিকারভাবে। বকুলের হাতে ক্যামেরা দেখেও তার কোন হেলদোল নেই। পটাপট ছবি তুলল বকুল। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলতে বকুলের জুড়ি নেই। মাটিতে শুয়ে পড়ে, গাছের ডালে উঠে সবরকম ভাবেই ছবি তোলার অভিজ্ঞতা তার আছে। সব মিলিয়ে গোটা কুড়ি শট নিল সে। রাইমোহনবাবু বললেন, ‘রোলটা আজই ল্যাবে ওয়াশ করে ফ্যালো। সকালের মধ্যেই আমি ছবিগুলো দেখতে না পেলে পেটের ভিতর হাঁসফাঁস করবে। ফটো উঠবে না, এ আবার হয় নাকি?’

তুই আমাকে আপনি আঁজ্ঞে করছিস ?

ফিল্ম ওয়াশ করার পর দেখা গেল রোলভর্তি গাধার ছবি। একদম অবৈজ্ঞানীক আজগুবি ব্যাপার স্যাপার। বকুল দৌড়াল কলকাতায়। এ হেন অভিজ্ঞতা তার জীবনে প্রথম। ফোটোগ্রাফীর গুরুর কাছে জানতে হবে এর রহস্য। রাইমোহন বাবু বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে চা পান করতে-করতে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। তখন রাগে মসমস করতে করতে হাজির হলেন বিরজা গাঙ্গুলী। তিনি একটু দাম্ভিক মানুষ। সচরাচর কারো বাড়িতে তাঁর পদধূলি পড়েনা। এককালে গাঁয়ের জমিদারীটা তাঁদেরই ছিল। নয়-নয় করে এখনো যা আছে তাতে হাতি পুষতে না পারলেও দূর্গাপূজোটা শ তিনেক লোককে খাইয়ে (মোষবলিটা মুলতুবি রেখে) চালিয়ে দেওয়া যায়। তিনি বিরজাবাবু এসে ধপ করে রাইমোহন বাবুর পাশে বসে পড়লেন। অবাক কাণ্ড! তারপর অদ্ভূত এক প্রশ্নও করে বসলেন।

—আচ্ছা, বলুন তো আমি কি যে সে?

—কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে একথা বলে?

—আমি কি যথেষ্ট দানশীল নই?

—একথা বলে কার এমন আস্পর্দা?

—ঐ লোকটার।

—কোন লোক?

—মন্দিরের চাতালে যে শুয়ে থাকে রাতে।

—কি বলেছে ও ?

—আমি দু’টাকার একটা কয়েন ছুঁড়ে দিলাম। লোকটা বলল, ‘তুলে নাও হে।’

—তারপর?

—তারপর আমি থমকে দাঁড়িয়ে দু’দণ্ড লোকটাকে ভাল করে দেখে নিলাম। লোকটা বলে কিনা যার তার... জিনিস আমি নিইনা। আমাকে ভাল করে দেখে বলুন তো গরীব মনে হচ্ছে কিনা? আরে বাবা নতুন মডেলের গাড়ি কিনতে না পারলেও একটা অ্যামবাসাডার তো আছে আজো নাকি?

—দাঁড়ান, দাঁড়ান। মাথা ঠাণ্ডা করে আগে এক কাপ চা খান। কথাটা আপনার একার ঘাড়ে পেতে নেবার দরকার নেই। পয়সা ছাড়া কার চলে বলুন? আপনাকে তো লোকটা দরিদ্র বলেনি। যে সে বলেছে।’

—তা ঠিক। এইজন্যই শিক্ষিত মানুষের সঙ্গ করা দরকার। আপনার যুক্তি শুনে মেজাজটা কিঞ্চিৎ শীতল হল। তাইতো পয়সা ব্যতিত চলে কার। কিন্তু ঐ লোকটার চলে কি করে? আমরা চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি করি। ওর তো কোন বৃত্তিই নেই। তবু তো বেঁচে আছে।

—একদম নেই বললে ভুল হবে। ওঁরও একটা বৃত্তি আছে।

—আছে? কি সেটা? চুরি-ছ্যাচড়ামি নিশ্চয়?

—না আকাশবৃত্তি।

—সেটা কি ধরনের পেশা মশাই?

—সে আপনি বুঝবেন না।

—কেন বুঝবো না?

—সবাই সবকিছু বুঝতে পারবেই এমন নিশ্চয়তা নেই।

—থাক থাক। নয় দু-পাতা বেশিই পড়েছো আমার চে। আমি না হয় তোমার মতো ইংরিজি বুলি কপচাতে পারিনে। কিন্তু তোমার চে কিছু কম বুঝি এমন তো মনে হয়নি কখনো। বেশ ঠাণ্ডা হচ্ছিলুম। দিলে তো আবার মেজাজটা বিগড়ে। তোমার কথাটাও তো ঐ হতভাগাটার মতোই শোনাচ্ছে। উঠি তাহলে। কাজ আছে।

তা বিরজা গাঙ্গুলী বলতে পারেন। স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমান দশটা গাঁয়ের মধ্যে শীর্ষেই থাকবে। লোকে বলে, ‘বেরজাবাবুর মোৎলা আছে।’ মোৎলা না থাকলে কাউকে ‘হতভাগা’ বলার সাহস হবে কি করে। কিন্তু ঐ লোকটার সাহস বলিহারি। বিরজাবাবুর দান প্রত্যাক্ষান করেছে।

বকুল কলকাতা থেকে ফিরে এসে বলল, ‘জ্যাঠামশাই, বোধহয় ফিল্মটাতে আগে থেকেই গাধার ছবি তোলা ছিল। কিন্তু তাই বা হয় কি করে? যাই বলুন, মন্দিরে শোওয়া লোকটা বিটকেলে আছে। চলুন তো যাই ওর কাছে। লোকটা জাদুকর নয় তো? ফিল্মটা আমি নিজে হাতে ওয়াশ করেছি। বদলাবদলি হবার কোন চান্সই নেই।’ লোকটা যে বিটকেলে আছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই রাইমোহনবাবুর। তিনি বললেন, ‘চলো’।

দেখা গেল লোকটা এখন শুয়ে নেই। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। বিড়বিড়ে উচ্চারনে কি যেন বলছে। বকুল কান পেতে শুনল কথাটা। ‘মানুষকে ‘গাধা’ বলে গালাগাল দিলে গাধাদের অসম্মান করা হয়।’ বকুল ভাবল, কথাটা খাঁটি। গাধারা কখনো কাউকে কামড়েও দেয়নি, গালাগালও করেনি। বরং নি:শব্দে প্রভুর চাপিয়ে দেওয়া মোট বয়ে নিয়ে যায়। এমন নিরীহ ভদ্র, সহিষ্ণু, বাধ্য জীব আর কেউ নেই। হ্যাঁ, আরেকটা আছে। ভেড়া। কথায় বলে ভেড়ার পাল। ওরা রাস্তায় জায়গা থাকা সত্ত্বেও গায়ে গা ঠেকিয়ে হাঁটে। কিন্তু দেখতে বড্ড সুন্দর। রাস্তায় একটু এদিক-ওদিক করলেই মালিক ওদের লাঠি দিয়ে মারে। অমন সুন্দর নিরীহ জীবকে মারতে ইচ্ছা করে কি করে? অথচ ‘গাধা’ আর ‘ভেড়া’ সবচেয়ে জনপ্রিয় গালাগাল। এই দুটো গাল খেয়ে মানুষের সম্মানিত বোধ করা উচিৎ। কিন্তু যেই একজন অসম্মানিত হয় তাই তার দেখাদেখি বাকিরাও অসম্মানিত হয়। এই হল মানুষের দস্তুর।

রাইমোহনবাবু বকুলকে বললেন, ‘বুঝলে হে, মনে হচ্ছে লোকটা ঘোর বিটকেলে। আজ কিছু সুবিধে হবে না। ছবি-টবি আর তুলতে যেওনা। কেরামতির দরকার নেই। শেষকালে খচ্চর-ফচ্চরের ছবি উঠে গেলে বিপদ। প্রেস্টিজ নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। আজ থাক। ওকে ঘাঁটাবার দরকার নেই।’

রাতে একটু দেরি করেই শুতে যান রাইমোহন। বহুদিনের অভ্যাস। ভোরে ওঠার চেয়ে রাত জাগতেই তিনি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। ভোরে হাঁটা শুরু করেছিলেন একসময়। বছর তিনেক হেঁটেও ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত পোষালো না। স্কুলে যেমন সহপাঠী, প্রাতঃভ্রমণেও তেমন কিছু সহহাঁটি জুটে যায়। তারা বিস্তর বকবক করে। আর রোগবালাই নিয়ে আলোচনা করে। তারপর থেকে রাইমোহন বিকেলের দিকে নিজের বাড়ির ছাদেই খালি হাতে ব্যায়াম আর দু-তিনটে যোগাসন করেন। তাই রাত করে শুলেও কোনো অসুবিধা বোধ করেন না।

রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ সবে শুয়েছেন। ঘুম এসেছে কি আসেনি, এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলেন। মনের ভুল নয়। সত্যি সত্যি। এই অসময়ে কার আসার দরকার পড়ল আবার। চোর হলে তো আর জানান দিয়ে আসবেনা। আত্মীয়স্বজন রাতের লেট করা ট্রেনে এলে আগে ফোন করে দিত। আর ভূতের যে কড়া নাড়া কিম্বা কলিং বেলের সুইচ টেপা নিস্প্রয়োজন তা বলাই বাহুল্য। ভয়ে সিটিয়ে যাবার মানুষ রাইমোহন নন। তার দরজায় আই হোল নেই। সটান দরজাটা খুলে ফেললেন রাইমোহন।

দরজার ওপারে সেই লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। যে শিবমন্দিরের চাতালে শুয়ে থাকে। বেশ! মাঝরাত ছাড়া তাঁর মতো ভদ্রলোকের আর কখন সময় হবে। দিনের বেলা তো সে বোধহয় মাটির তলায় সেঁধিয়ে যায়। প্রকাশ্য দিবালোক তাঁর পছন্দের জিনিস নয় বোধহয়।

—তোর মাঝে-মাঝে ঘুম আসতে রাত তিনটেও বেজে যায়, এটা আমি জানি। বই-টই পড়িস। চিন্তাশীল মানুষ। এরকম হতেই পারে।

বাংলায় কথা বলছে লোকটা। দ্বিতীয়তঃ ‘তুই’ বলে সম্বোধন করছে। আচ্ছা আস্পর্দা তো! অভদ্র নাকি?

—পড়াশোনা জিনিসটা নেহাৎ মন্দ নয়। কিছু জানা যাক চাই না যাক, তরতরিয়ে সময় কেটে যায়। এই ‘সময়’ জিনিসটা মানুষের একটা বালাই। যৌবনে এটা যেমন হালকা বার্দ্ধক্যে ততটাই ভারি। অথচ এই ‘সময়’ হারামজাদাটাকে তুমি দেখতেই পাচ্ছনা যে লাঠিপেটা করবে।

রাইমোহন বললেন, ‘ভেতরে এসে বসুন। বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলার দরকার কি?’

লোকটা বলল, ‘বেশ! তাই ভালো। তবে আমি তোকে ‘তুই’ বলছি আর তুই আমাকে আপনি আঁজ্ঞে করছিস। ভারি মজা!’

—না, ঠিক আছে। আপনি যে-সে লোক নন বোঝাই যাচ্ছে। একটু আগে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্বের কথা বললেন।

—আইনস্টাইন? নাম শুনিনি তো। শুনব কি করে? আমার বিদ্যে ফোর পাশ।

—ঠিক আছে। এবার বলুন, আপনি কি জন্য এসেছেন?

—ধর গাড়ি আছে অথচ রাস্তা নেই। বড়ো বাড়ি, ল্যাপটপ কম্পিউটার, মোবাইল ফোন সব আছে অথচ খাবার নেই, তাহলে সেই লোকটাকে গরীব বলবি না বড়োলোক?

—পৃথিবীতে খাদ্যসংকট আসতে পারে সেই কথা বলছেন আপনি।

—হ্যাঁ। তবে এখনো সময় আছে আগল দেবার।

—আপনি কে বলুন তো?

—আমি একটা যে-সে লোক। ‘হতভাগা’ও বলা যায়।

—শুনেছি আপনি কিছু খাননা, এ কি করে সম্ভব?

—খাদ্য তো আসলে কিছু এনার্জি তাইনা? এই এনার্জিটা আসলে বস্তুরই একটা পরিবর্তিত রূপ।

—এটা আইনস্টাইনের E = mc2 থিয়োরি।

—তা হবে। তবে কিনা ঐ নামের কোনো ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার আলাপ-পরিচয় নেই। আমি ঐ এনার্জিটা সরাসরি সূর্য থেকে গ্রহন করি। বাজারে গিয়ে মাল কেনোরে, রান্না করো রে, চিবোও রে, হজম করো রে, অত হ্যাপা আমার পোষায় না। খাদ্যের ভেতরের এনার্জিটা তো সূর্য থেকেই আসে। আমি ভায়া-মিডিয়া ছেড়ে আসল জায়গা থেকে দরকার মতো নিয়ে নিই।

—আপনি সূর্যবিজ্ঞান জানেন?

—আমি কোনো বিজ্ঞান জানিনা। বললাম তো, আমার বিদ্যে ফোর পাশ।

—কিভাবে শিখলেন এসব?

—সেকথাই আজ বলতে এসেছি তোকে। তবে শোন। তখন আমি ক্লাশ ফোরে পড়ি। গ্রামের জমিদারের বাড়িতে জাঁকজমক করে দূর্গাপুজো হত। আর দশমীর দিন হত কাঙালী ভোজন। খুব খিদে পেয়েছিল সেদিন। ভদ্রলোকদের সঙ্গেই পংক্তি ভোজনে বসে পড়েছিলাম। ছোটো জমিদারবাবু এসে আমায় গলা ধাক্কা দিয়ে তুলে দিলেন। বললেন, ‘তোদের এখন নয়, সবার শেষে। বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাক, খুব দুঃখ পেলাম কথাটায়। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। ছোটো থেকে বাবা, মা-র মুখ দেখিনি। পরের বাড়ি মানুষ হচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হল, দুনিয়াটা অনেক বড়ো। এই ছোটো গ্রামটায় আমার অন্ন নেই। তারপর যেদিকে দু-চোখ যায় হাঁটতে লাগলাম। ট্রেনে চেপে একটা বড়ো রেলস্টেশনে গিয়ে পড়লাম। আবার ট্রেনে চাপলাম। দু-দিন দু-রাত ট্রেনে-ট্রেনেই কাটালাম। তারপর এক মাঝরাতে প্রচণ্ড জলতৃষ্ণায় একটা স্টেশনে নেমে পড়লাম। ট্রেনটা ছেড়ে গেল। আকন্ঠ জলপান করে পিপাসা মিটল। তারপর সকাল পর্যন্ত হেঁটে একটা পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছে দেখলাম একজন সাধুবাবা আমায় ডাকছেন। গেলাম তার কাছে। উনি ঝোলা থেকে লাড্ডু বের করে আমায় সামনে এগিয়ে ধরলেন। আশ্চর্য ব্যাপার! আমি বুঝতে পারলাম, আমার খাবার লোভ হচ্ছে না। ক্ষিদে নেই। সাধুবাবা বললেন, ‘বহোৎ আচ্ছা বেটা! তোর খিদে জয় হয়ে গেছে।’

গল্পটা শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন রাইমোহন। তার মুখ দিয়ে অনেকক্ষন কোনো বাক্য সরছিল না। তারপর মনের ভিতর থেকে ফটোর প্রশ্নটা ঠেলে উঠল। কৌতূহল মরে না সহজে।

—কিন্তু একবার ছবি উঠল না। একবার গাধার ছবি উঠল। এরকম হবার কারণ?

—আছে। নিশ্চয় কারণ আছে। দ্বিতীয়বার শাটার টেপার সময় আমি গাধার কথাই ভাবছিলাম। চিন্তার পরমাণু ঐ নেগেটিভে ফুটে উঠেছে। আমার দেহের ছবি তো উঠবে না। এই দেহের প্রতিফলন হয় না। প্রতিবিম্ব নেই আমার।

—গাধার কথা ভাবছিলেন কেন?

—ভাবছিলাম, তার কারণ ক্লাশে একবার অঙ্ক না পারার জন্য হেডমাস্টারমশাই আমার কান মলে দিয়ে ‘গাধা’ বলেছিলেন।

—আমার একজন সহপাঠী ছিল তার নাম রামচরন। সেও ক্লাস ফোর থেকে হাওয়া। তারও কান মলে দিয়েছিলেন হেডমাস্টারমশাই। কেন যে বেপাত্তা হয়ে গেল ছেলেটা।

—আমাকে তুই চিনতে পারিস নি রাইমোহন?

—তুইই কি তাহলে সেই রামা?

—বটে।

—সেই জমিদার তাহলে বিরজা গাঙ্গুলী?

—বটে।

—তাহলে এরপর?

—আমি এখনই চলে যাব এই গাঁ ছেড়ে। তুই আমাকে আটকে রাখতে পারবি না। চলি রে রাইমোহন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%