হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
ল্যাবরেটরিতে দিনরাত গবেষণা করেন কালোবরণ পাড়ুই। আহার, নিদ্রা, স্নান ভুলে তিনি গবেষণা করে করে মাথার মিশমিশে কালো চুল এই অনুর্ধ চল্লিশেই সাদা করে ফেলেছেন। কি যে গবেষণা করেন, আর কি করেন না এবং সেই গবেষণা কাদের কাজে লাগে এ এক কালোত্তীর্ণ জিজ্ঞাসা প্রতিবেশীদের। তিনি বৈজ্ঞানিক না লেখক না ডাক্তার এ নিয়েও বিতর্কের অন্ত নেই। কেউ বলেন, তিনি টাক-স্পেশালিস্ট। কেউ বলেন ‘বৈজ্ঞানিক উপায়ে ভুঁড়ি সংকোচনের পথ’ নামক গ্রন্থটির তিনিই প্রণেতা।
শেষ পর্যন্ত রটে গেছে তিনি ভূতের ডাক্তার। গভীর অমাবস্যা রাত্রে নাকি তাঁর ঘর থেকে নানারকম বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজ আর নাকি সুরের সঙ্গীত সাধনা শোনা যায়। ‘ভৌতিক শিল্পকলার ইতিহাস’ নামে কালোবরণ পাড়ুইয়ের চার খন্ডের একটি বই আছে। ভূতেদের সমাজে সেটা নাকি একমাত্র প্রামাণ্য পুঁথি হিসাবে দারুণ সমাদৃত এবং বীভৎস জনপ্রিয়। যদিও বলা বাহুল্য কালোবরণ পাড়ুই এসব শোনামাত্র রটনা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন। ওঁর বাড়ির গেটে একটা বিবর্ণ নেমপ্লেট ঝোলানো আছে—তাতে লেখা প্র কে বি পি। ‘প্র’ শব্দটি এককালে ‘প্রফেসর’ বোঝানোর অর্থে না ‘প্রোপ্রাইটর’ বোঝানোর অর্থে লেখা হয়েছিল সে নিয়ে পাড়ার বালক মহলে উচ্চস্তরের গবেষণা চলে। আরও কয়েকটা ডিগ্রি বা অন্য কিছু নিচে বসানো ছিল। তার মধ্যে এন এম (এম) শব্দ কটি পাওয়া যায়। পাড়ার বালকেরা অতিকষ্টে তার মানে উদ্ধার করেছে—‘নন ম্যাট্রিক ফ্রম মঙ্গলগ্রহ। পাড়ার কচি-কাঁচারা মাঝে মধ্যে জানলা দিয়ে উঁকি ঝুঁকি মেরে নতুন নতুন তথ্য হাজির করে পাড়ার দাদাদের কাছে পেশ করে। ভূতেরা নাকি একটা সংবাদপত্র প্রকাশ করে, তার নাম ‘ভূতভবিষ্যৎ’। কে. বি. পি হলেন তার অবিসংবাদী সম্পাদক। ওই পত্রিকার দায়িত্বের গুরুভার তাঁর কাঁধেই অর্পিত হয়েছে। তাঁকে নিয়ে পাড়ায় যতই বিতর্ক থাকুক না কেন ভূতেদের সমাজে তিনি বিতর্কের ঊর্ধ্বে এক ব্যক্তিত্ব।
কালোবরণবাবু কিন্তু জিজ্ঞাসা করলে বলেন, ‘আমি ভূতেটুতে বিশ্বাস করি না। মানুষে বিশ্বাস করাই দায় হয়ে উঠেছে। আমি বৈজ্ঞানিক মানুষ। একা থাকি। কে কি বলল না বলল তা নিয়ে আমার মাথা ঘামালে চলে? সময় কোথায়? কত কাজ পড়ে আছে। আপনারা কি জানেন, আকাশের গায়ে ফুস্কুড়ি গজাচ্ছে আণবিক বিস্ফোরণের ফলে? সেই ফুস্কুড়ি থেকে কি না হতে পারে? সারা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে ছড়িয়ে যেতে পারে দুরারোগ্য কালব্যধি। শ্রাবণ মাসে দখিনা বাতাসের ফোঁপানো কান্না শুনেছেন কোনোদিন? কেন কাঁদে জানেন? পরিবেশ দূষিত করার পাপের ফল একদিন টের পেতে হবে আপনাদের। কয়েকদিন আগে তিলের মতো সাইজের একটা ব্ল্যাকহোল আমার উঠোনে এসে পড়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা না করলে গোটা শহরটাকে গ্রাস করে ফেলত। এই তো মশায় দেশের অবস্থা। কোথায় বিজ্ঞান-চেতনা!

ল্যাবরেটরিতে কয়েকটা বিভিন্ন বয়সের ভুত...
তো একদিন হল কি, সত্যি সত্যিই কে বি পি দেখলেন কালোকোলো গোপলাগাপসা কটা ভূতের ছানা তাঁর ল্যাবরেটরির চেয়ারে গ্যাঁট হয়ে বসে আছে। পিছনে আরও কয়েকটা বিভিন্ন বয়সের ভূত। কে বি পি-কে দেখে টকাটক প্রণাম ঠুকে বলল—‘আমরা আপনার নাম অনেক শুনেছি। আমাদের জড়িয়ে সবাই আপনার বদনাম করে তা শুনে আমাদের ভারি দুঃখ হয়। আপনি আমাদের অবহেলা করবেন না। আর জন্মে আপনি আমাদের কুটুম ছিলেন হয়তো। তাই সব্বোদা একটা নাড়ির টান উপুলুব্ধি করি।’ একজন বৃদ্ধ মতো ভূত বলল, ‘দ্যাখেন তো বাঠাকুর ওই ছোঁড়াগুনুকে। এবারের বর্ষায় ভিজে ভাইরাসের উৎপাতে বেজায় সর্দি হয়েছে ওগুলোর। আমনাকে সারিয়ে দিতে হবে।’
কে বি পি দেখলেন, কালো পাঁকের মতো সর্দিতে ঘরের মেঝে ভরিয়ে ফেলেছে ভূতের খোকাগুলো। কে বি পি চটজলদি চার ফোঁটা সালফিউরিক অ্যাসিড এনে ঢেলে দিলেন ওদের নাকের ফুটোয়। কি আশ্চর্য! ভোজবাজির মতো চোখের পলকে সর্দি সেরে গেল ওদের। বৃদ্ধরা আরেক প্রস্থ টপাটপ প্রণাম সেরে কৃতজ্ঞতার সুরে বলল, ‘আমনি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী, কি দিয়ে যে ঋণ শুধবো আমনার?’ গম্ভীর মুখে কে বি পি বললেন, ‘আপাতত তোমরা বিদেয় হলেই আমার ঋণ শোধ হবে।’
‘প্লিস, এমন অবহিলা করবেন না। ভূত বলে কি আমাদের পিস্টিজ নেই?’ আরেকজন পাড়াগেঁয়ে ভূত বলে উঠল, ‘তা বলে কি আমরা ইনজিরি জানিনে?’ আরেকটা বিচক্ষণ ভূত বলল, ‘গুরুদেব, আমারে ইনডিশান দেন। ভারি শখ ইনডিশান নেবার। জেবনের শক আহ্লাদ বলতে তো কিছুই ছিল না। এই বেদ্ধ বয়সে যদি মরতেই হয় তবে যেন পিচকিরি-পানা ওই ইনডিশান নিয়েই মরতে পারি। আমনারে পরানভরি আশিব্বাদ করে যাবো।’
কে বি পি মশার ওষুধ স্প্রে করতে একহাতি নলের ডগা এনে ঢুকিয়ে দিলেন বৃদ্ধের হাতে। নলের ভিতরে ছিল গোবর-গোলা জল। বৃদ্ধ পরম তৃপ্তিতে চোখ বুঝে ইঞ্জেকশন নিলেন। মুখে খুশিখুশি সার্থক ভাব। তারপর উঠে যাওয়ার সময় কে বি পি’-র মাথায় হাত দিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে বললেন, ‘বাওয়া ঠাকুর, আমাদের দ্যাশে তো বিজ্ঞানী নেই। আমরা শত চিষ্টা করলেও ও হতি পারিনে। পিরানভরে আশিব্বাদ করি তুমি বিজ্ঞানীক হোয়ো। দেখো, বেদ্ধ ভূতের আশিব্বাদ বেফলে যাবে না।’
সে চলে যেতেই আরেকটা প্রবীণ ভূত উঠে দাঁড়াল, ‘বাবাজীবন, চোকে ভালো দেকিনে। রেটায়াড না করতেই চোকে চালশে পড়ে গেল। গত হাটে এক মেছুনির কাঁখ থেকে ঝুঁড়ি কেড়ে নিয়ে যাচ্চিলাম। একটা গাড়ি আমার দেহের নীচের দিকটা চাপা দিয়ে চলে গেল। বাবাজীবন, লো পোরশান অথথাৎ নীচের দিকে চাপ পড়লে তবেই কি লো-প্রেসার হয় না? বাবাজীবন আমায় বাঁচাও। একে চোকে চালশে তার ওপর লো-পিচার। বাবাজীবন আমি বাঁচবো তো?’ বলেই হাউমাউ কেঁদে উঠল।
কে বি পি বললেন, ‘আপনার চোক আমি বদলে দিচ্চি। ফিলিপসের চোক লাগান। অনেকদিন টিকবে।’ এই বলে কে বি পি পুরনো টিউবলাইটের একটা চোক প্রবীণের গলায় মাদুলির মতো ঝুলিয়ে দিলেন। বোতলের কাঁচের দুটো টুকরো হাতে দিয়ে বললেন, ‘এই হল আপনার চশমা।’ প্রবীণ খুব খুশী হল সেগুলো পেয়ে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগল। কে বি পি আরো বললেন, ‘শুনুন লো-প্রেশারও সেরে যাবে। আপনার দেহে আপ পোরশান অর্থাৎ ওপরের দিকটা তো চাপা পড়েনি। একদিন রাস্তায় শুয়ে থেকে ওপরর দিকটা ভালো করে চাপা দিয়ে নেবেন। তাহলে সমস্ত দেহের প্রেশার নর্মাল হয়ে যাবে।’ প্রবীণ ভূতটা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বাবাজীবন, কি বলে যে আশিব্বাদ করি। বড়ো জায়েনটিস্ট হও। দেকো, ওর আশিব্বাদ না ফললেও আমারটা ফলবে। চশমা পেয়ে যে কি খুশিই হলাম বাপধন। কলেজ লাইফে আমার চশমা ছিল।’
কে বি পি শুধালেন, ‘কত ছিল পাওয়ার?’
‘থাউজেণ্ড হর্স পাওয়ার।’ প্রবীণ ভূত ঝটিতি উত্তর দিল। আরেকজন থপথপে কোলা ব্যাঙের মতো ভূত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার বাত হয়েছে গোঁসাই। একদম নড়তে পারিনে।’
কে বি পি শুধালেন, ‘মুখে না পেটে?’
‘পেটে নয়, গেঁটে। গেঁটেবাত।’ থপথপে ভূতটা বলল। কে বি পি বললেন, ‘বাত অনেক সময় পেটেও হয়। মুখেও বড়ো বড়ো বাত হয় অনেকের।’
‘কেন যে লজ্জা দেন। আমাদের কি আর সে বয়স আছে? আমাদের মুখেভাত হয় না। হয় মুখেমাছ।’ একটা হলুদ রঙের ভূত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার জণ্ডিস হয়েছে। দেখুন, গায়ের রঙ কেমন হলুদ হয়ে যাচ্ছে।’
গম্ভীর মুখে কে বি পি বললেন, ‘গায়ে একটিন আলকাতরা মেখে নাও, ঠিক হয়ে যাবে। আজ আর আমি পেশেন্ট দেখতে পারব না। বেলা পড়ে আসছে। আপনারা উঠুন।’ একজন ভূত শুধাল, ‘গুরুদেব এতক্ষণ কি ওষুধ দিলেন? হোমোপাথি না এলোপাথারি?’
কে বি পি বললেন, ‘ওসব না, ওসব না। আমার স্ব-আবিস্কৃত মেডিসিন। যার নামকরণ হয়েছে ডিমপ্যাথি।’
‘কি সিমপ্যাথি? সে তো শুনেছি মানুষের একটা রোগ।’
‘ওরে না পাগলা। এ হল হর্স এগোপ্যাথি। সাদা বাংলায় যাকে বলা হয় অশ্বডিম্ব চিকিৎসা প্রণালী।’
কি? নিশিকুটুম্বের বিতিকেচ্ছা ছিনালী?
এটা দেখছি শুধু ভূতই নয়, গর্দভও বটে। যা যা তোরা, ওসব বুঝবিনে। আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।
গুরুদেব, এই ওষুধে সাইড এফেক্ট হবে না তো?
মেলা বকিসনে। তোদের আবার সাইড এফেক্ট। ব্যাঙের আবার সর্দিকাশি।
নধরপানা ইয়ং ভূতটা প্রতিবাদ করে উঠল, ‘ব্যাঙ না, আমরা ভূত।’
কালে কালে কত কি হলো—পিঠেপুলির ন্যাজ গজালো। কবে শুনব তোদের স্ট্রোক হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে।
ও গল্পটা আমরা জানি। ওটা আমাদের ওপর খাটে না।
জানিস মানে? কেমন জানিস বল তো শুনি? আমি দোতলায় পোশাক বদলাতে বদলাতে শুনব, বল। ফ্যাকসা মতন ভূতটাকে একজন ঠেলা দিয়ে বলল, ‘তুই বল। তুই ভালো বলতে পারবি। তুই তো শ্যাওড়াতলায় বসে বসে লিকচার ঝাড়িস।’
ফ্যাকসা ভূতটা বলতে লাগল, ‘এক মাতাল রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল। অতচ সে ভাবছে সে বাড়িতেই বিছানায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। হঠাৎ তার হাতে নরম মতন কি একটা ঠেকল। তার মনে পড়ল, বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সে দেখেছে, তার বৌঁ পিঠে ভাজছে। নরম নরম হাতে ঠেকতেই সে ভাবল, তার বৌ তাকে পিঠে খেতে দিয়েছে। আসলে তার হাতে আটকে পড়েছিল একটা ধেড়ে ইঁদুর। তার ন্যাজ ধরে সে ঐ কথা বলেছিল।’
গল্পটা শেষ হলে নাকিসুরে হাসতে লাগলে ভূতের বাচ্চারা। শুনে মনে হল একশো ছুঁচো যেন কোরাসে কেত্তন ধরেছে। একতলার ওপরে কোঁচার পত্তন সম্পূর্ণ করে কে বি পি নীচে নেমে এসে দেখলেন ভূতের বাচ্চাগুলো ল্যাবরেটরির বকযন্ত্র, জার ইত্যাদি নাড়াচাড়া শুরু করে দিয়েছে। যত অ্যাসিড আর গ্যাস ছিল সব খেয়ে ফেলেছে।
‘কে বি পি প্রচণ্ড রেগে বললেন, ‘তোরা গেলি? ব্রহ্মদৈত্যরা তাদের প্রাগৈতিহাসিক ঐতিহ্যের ওপর একটা সেমিনারে আমায় ডেকেছে। না হলে দেখতাম তোদের একদিন কি আমার একদিন।’
ব্রহ্মদৈত্যের নাম শুনে ভূতের বাচ্চাগুলো ভয়ে রামনাম জপতে জপতে নিমেষের মধ্যে কর্পূরের মতো উবে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন