ভূত শোধন যজ্ঞ

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

‘মালয়েশিয়ায় প্রচুর রবার গাছ জন্মায় এটা বোধহয় তোরা জানিস।’

শুরু হল পটাদার গল্প। এই রবার টেনে এখন কত বড়ো করে সেটাই আজ দেখার।

‘জানি।’ রনেন বলল।

‘কিন্তু তলা থেকে কিসের খোশবাই ছাড়ছে বল তো? তোদের পাল্লায় পড়ে ভেজিটেরিয়ান মানুষটা গোল্লায় যাচ্ছে। তোরা তো কখনো হরিণের মাংস খাসনি। মাটির তলায় দিনকতক রেখে পচিয়ে খেতে হয়। এখন এ মাংস পাবিই বা কোথায়। হরিণ, কচ্ছপ সবই এখন মারা নিষিদ্ধ।’

রুবি বলল, ‘আজ তোমার অনারে মাটন কাটলেট হচ্ছে।’

পটাদা বলল, ‘বেশ! মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসি তাহলে। মালয়দের সভ্যতা-সংস্কৃতি অনেকটাই ভারতবর্ষ দ্বারা প্রভাবিত। আমাদের দুটো মহাকাব্যের প্রভাব মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার জনজীবনে লক্ষ্য করা যায়। অতীত ভারতবর্ষ ওদের দেশে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। ইতিহাস বই খুললে দেখতে পাবি চম্পা রাজ্যের কথা, আঙ্কোরভাট, বরবুদুরের ছবি।’

রুবি বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেখেছি বৈকি।’

আমিও ঘাড় নেড়ে সায় দিলাম রুবির কথায়।

রনেন বলল, ‘তাহলে অতীত ভারতবর্ষও ইমপেরিয়ালিস্ট ছিল?’

পটাদা বলল, ‘অতীতকালে ভারতবর্ষের রাজারা সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হতে চাইতেন। অতি প্রাচীনকালে নাকি গোটা পৃথিবীটারই নাম ছিল ভারতবর্ষ। আর ভারতবর্ষের নাম ছিল জম্বুদ্বীপ। মেক্সিকো, পেরুর যে মায়া সভ্যতা—যে সভ্যতার ক্যালেণ্ডার নিয়ে হৈ-চৈ বেধেছে সম্প্রতি, সে সভ্যতাও নাকি আদতে ভারতীয় সংস্কৃতি।’

আমি বললাম, ‘পটাদা মালয়েশিয়ার রবার...।’

পটাদা বলল, ‘হ্যাঁ, ছোটোবেলায় আমাদের কেউ কেউ রবারকে বলত রবাট, যেমন পেনাল্টি শটকে বলত প্ল্যান্টিক।’

মাতব্বর ভুতটা বলল,আমাদের অপরাধ ?

পটাদার এই স্বভাবটা বেজায় খারাপ। গল্পের একটা লাইন বলে আমাদেরকে উত্তেজিত করে তারপর সম্পূর্ণ অন্য প্রসঙ্গে চলে যাবে। আমরা বুঝি, এটা হচ্চে ‘সাসপেন্স মেকিং’। আমরা গল্প শোনার জন্য কতটা উদগ্রীব হয়েছি সেটা যাচাই করে নেবার পন্থা আর কি। এই সময়টা আমাদের সাধারণতঃ পটাদাকে তোয়াজ করার মোমেন্ট। তোয়াজ এক্ষেত্রে অগ্নিতে ঘৃতাহুতির কাজ করে। কিম্বা বাজির সলতেয় আগুন লাগানোর কাজ।

ভনিতা ছেড়ে পটাদা শুরু করল তার গল্প।

‘কিছুদিন আমি একটা রবার বাগানের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছিলাম। ওখানে প্রচুর ইণ্ডিয়ান কুলি আছে। ইণ্ডিয়ায় শ্রমিক সস্তা। কুলি-কামিনরা তাঁবুতে থাকত। সন্ধের পর একদল কুলি ভাতপচানো মদ খেয়ে হল্লাগুল্লা করত, আরেকদল রামচরিতমানস পাঠ শুনতে যেত। মদ্যপ কুলিদের একটা দল এসে একদিন আমায় বলল, ‘ম্যানেজার সাহেব, আমাদের তাঁবুতে খুব ভূতের উপদ্রব হচ্ছে। রাতে ঘুমোতে দিচ্ছে না। কানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, আচমকা চাঁটি মারছে। কানের কাছে ফিসফিস করে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তুলে গালাগাল দিচ্ছে। এককথায়, যা নয় তাই করছে। এর একটা বিহিত না হলে তো চলছে না। এরকম চলতে থাকলে আমরা কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যাব।’

লোকগুলো গজগজ করতে লাগল, যেন আমারই দোষ। এখানে একটা কথা বলা দরকার— ঐ সময় ওখানে কিছু জঙ্গলে লেবার শ্রেণীর লোকের দরকার ছিল। ভারতবর্ষ-বাংলাদেশের কিছু এজেন্ট কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক সংগ্রহ করে পাঠাত। কিন্তু সেই সময়টা কাজের লোক ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা অন্য কোনো মালিকপক্ষের আমাদের লোক ভাঙিয়ে নিয়ে যাবার মতলব হতে পারে। কেননা, এর আগে আমাদের একজন কুককে বেশি মাইনে দেবার প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ভাল রান্নার ঠাকুর বা বাবুর্চির চাহিদা সর্বত্র। উড়িষ্যার ঠাকুরদের রান্নার যশ আছে। মুসলিম এক বাবুর্চির তৈরি গোস্ত কাবাব, শিক কাবাব আর কোপ্তা খেয়েছিলাম যা থেকে উপলব্ধি হয়েছে, রান্না একটা শিল্প। আর এই শিল্পটা আনাড়ির হাতে পড়লে জীবনটা ভিজে বারুদের মতো হয়ে যায়। আমাদের উড়ে বামুন একটা চমৎকার বাটি চচ্চড়ি বানাতো যেটার রেসিপি আমি কিছুতেই বাগাতে পারিনি। কোনো ভুজুং ভাজুং-এই বশ হয়ে নিজেদের গোপন অস্ত্র হাতছাড়া করার পাত্র ওরা নয়। যাই হোক, আমি নিশ্চিন্ত হতে চাইলাম, সত্যিই ভূত না অন্য কিছু।

কিন্তু ওরা যে ভূতই দেখেছে তার একগাদা প্রমাণ দাখিল করল আমার কাছে। ভূতেরা সানুনাসিক স্বরে কীর্তন করে তা রেকর্ডে টেপ করে এনে শোনাল। তাঁবুর ত্রিপলে ভূতের ওল্টানো পায়ের ছাপও দেখাল আমায়। এরপর আর অবিশ্বাস করার কোনো অবকাশ রইল না। ঐ কীর্তন এমন কিম্ভূত যে শুনলে সাতদিন ঘুমের দফারফা হয়ে যাবে। ভূতেদেরও উপাস্য দেবতা আছে জানিস তো? যাদের আমরা অপদেবতা বলি। মালয় কুলীরা একদিন আমায় নিয়ে গেল জঙ্গলের একটা অপরিষ্কার জায়গায়। গানের ক্রিশেনডো আর মীড়ের কাজ বুঝিস? হাফনোট কিম্বা অশুদ্ধ স্বরও বোধহয় বুঝিস না।

কড়ি ‘মা’ কোমল ‘মা’ এসব যে বুঝিস না তা বলাই বাহুল্য। আমাদের যেটা ‘সি-শার্প’ স্কেল, ভূতেদের সেটা ব্যারিটোন ভয়েস। তাহলে সুপার টেনর ভয়েস কি রেঞ্জের হতে পারে একটু কল্পনায় আন্দাজ কর। তারপর আছে গলা কাঁপানো এবং বেসুরো, বেতালা স্বর। কিছু-কিছু রাগের চর্চা ওদের মধ্যেও আছে। তার মধ্যে প্রসিদ্ধ হল ‘ভূতরঞ্জনী’। মৎস্যবিলাপ, কোমলচণ্ডাল, কঙ্কালবাহার নামক রাগিনীগুলোও ওরা খুব যত্নের সঙ্গে সাধনা করে থাকে।

সেটা ছিল অমাবস্যার রাত। কুলীরা আমায় দেখাল ভূতের অপদেবতার বিকট কদাকার একটা পাথরের মূর্তি। মূর্তিটার একটা চোখ ছোট, একটা বড়ো। বড়ো চোখটা বাইরে ঠেলে বেরিয়ে আসছে। দুদিকে দুটো বড়ো গজ দাঁত। কপালের ডানদিকে একটা আব। দুর্গন্ধ আর পচা খাবার দিয়ে ওকে সন্তুষ্ট করতে হয়। ওর নাকি খারাপ কাজ করার বিরাট ক্ষমতা। দেখলাম, মূর্তিটার পাদদেশে ভূতেরা সার বেঁধে বসে আছে। একটা আঁশটে দুর্গন্ধ কায়েম হয়েছে চারদিকে। একটা গামলায় ছাগলের রক্ত দিয়ে ওরা ভোগ নিবেদন করেছে। এটা নাকি ওদের বাৎসরিক উৎসব। ভোর পর্যন্ত ভূতেদের নৃত্য-গীত-বাদ্য আর পূজা প্রকরণ দেখলাম। নৃত্যের কথা আর বলে কাজ নেই। ‘ভূতের নেত্য’ কথাটাই তোরা শুনেছিস, চোখে দেখিস নি। দেখলে বুঝতিস ‘ধেই ধেই’ নৃত্য কিম্বা ‘ধাই ধপা ধপ’ তবলাবাদন ওর কাছে শিশু। বেসুরো গান আর বেতালা বেহদ্দ নাচ একটা তুমুল চর্চার বিষয়। যেখানে ‘গা’ নোটটা লাগবে সেখানে ‘ধা’ নোট লাগানো চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। নিখুঁত অনুশীলনের বিষয়। আমাদের যেমন সাতটা স্বর সা-রে-গা-মা...ওদের তেমন হাঁ-রে-যা-মাঁ-লা-ফা-পিঁ-ছা। যেমন, ডো-রে-মি-আ ...ওদের তেমন শো-রে-খোঁ-কা ইত্যাদি। ওদের ঘুমপাড়ানি গান অবশ্য ভালো করে শোনা হয়নি। তবে আশা করা যায় তিমি মাছের চিৎকারের মতোই শোনাবে।

রনেন বলল, ‘পটাদা তুমি কিন্তু ভূতেদের আণ্ডার-এস্টিমেট করছো।’

পটাদা বলল, ‘সরি! এবার মূল গল্পে ফিরে আসি।’

রুবি বলল, ‘সেটাই ভালো!’

আমি বললাম, ‘অপদেবতার খারাপ করার ক্ষমতাটা কেমন?’

পটাদা বলল, ‘ওরেব্বাবা! সব কুকর্ম ঘটাবার কর্তা ওরা। তবে এখানে একটা কথা আছে। তুই যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকিস, পচা-বাসি না খাস, সোজা পথে চলতে পছন্দ করিস তবে ওরা তোর অনিষ্ট করতে পারবে না। দেখবি, কোনো কোনো রেলওয়ে বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে ‘ক্লিনলিনেস ইজ নেক্সট টু গডলিনেস।’ মালয় কুলীগুলো ভালো করে স্নান করত না, দাঁত মাজতো না, নোংরা পোশাকেই দিনের পর দিন কাটিয়ে দিত, অখাদ্য-কুখাদ্য খেত—এজন্যই ওদের তাঁবুতে ভূতের উপদ্রব হতো। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমি ওদের স্বভাব বা জীবনযাত্রার রীতি দ্রুত বদলে দিতে পারব না। তবে সাময়িকভাবে ভূতুড়ে তাণ্ডব দূর করার একটা উপায় ভাবতে লাগলাম।

একদিন দেখলাম ইলেকট্রিক তারে শক লেগে একটা কাক মরে পড়ে আছে। তাকে ঘিরে একশোটা কাক কা-কা রবে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে মাথায় একটা মতলব এল।

যেই ভাবা, সেই কাজ। ভূতের একটা ছাঁচ বানাতে দিলাম। সেই ছাঁচে গলিত রবার ঢেলে একটা চমৎকার ভূত বানিয়ে নিলাম। তারপর অপেক্ষা করতে লাগলাম জোৎস্না রাতের জন্য। লোকে বলে, জোৎস্না রাতে তাজমহল দেখার মজাই আলাদা। কিন্তু আমি বলব, ভূত দেখার মজাও কিছু কম নয়।

পরিকল্পনামাফিক সমস্ত সাজ-সরঞ্জাম গুছিয়ে ফেলা গেল। সরঞ্জাম বলতে একটা বড়ো নেট। সূক্ষ্ম নাইলন দিয়ে তৈরি। টিয়ার গ্যাস অর্থাৎ কাঁদানে গ্যাস। আর রবারের ডামি ভূতটা। দেখতে দেখতে অপারেশনের দিনটা চলে এল। জালটা বিছিয়ে আটজন কুলীকে আমি আটটা গাছের মাথায় তুলে দিলাম। তাদের হাতে রইল জালের আট মাথায় বাঁধা আটটা দড়ি। আমি বসে রইলাম মাঝামাঝি একটা গাছের মাথায়। জালের ওপর রবারের ডামি ভূতটাকে তেল মাখিয়ে শুইয়ে দিলাম। পাম তেল মাখানো রবারের ভূতটা চকচক করতে লাগল জোৎস্নার আলোয়। কথা রইল আমি হুইশল বাজালেই কুলীরা দড়ি ধরে টানবে। তাতে জালটা গুটিয়ে খাঁচার মতো হয়ে যাবে।

আমরা গাছে বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। মশার কামড়ে তিষ্ঠোতে পারছিলাম না। বড়ো বড়ো রাক্ষুসে মশা। গায়ে নিমতেল মেখে বসার ব্যাপারটা মাথায় আসেনি। অপেক্ষা করতে করতে ঘণ্টাদুয়েক কেটে গেল। গোটা পরিকল্পনাটাই মাঠে মারা যাচ্ছে নাকি সেটাই ভাবছিলাম। সব বুঝি বানচাল হয়ে গেল। কিন্তু তখন দেখলাম একটা সিড়িঙ্গে চেহারার ভূত গুটি-গুটি পায়ে এসে উপস্থিত হল। প্রথমে রবারের ভূতটাকে শুঁকল তারপর ফিচ-ফাচ করে কাঁদতে লাগল। তার কান্নার শব্দ শুনে আরো গোটা পনেরো ভূত ক্রমান্বয়ে হাজির হল। ভূতেদের নানারকম কান্নায় জায়গাটা একেবারে নরক হয়ে উঠল। বেপাড়ার কোনো ভূত মরেছে ভেবেছিল ওরা। আমরা এক রাউণ্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রে করাতে ওরা আরো ভয়ানক কাঁদতে শুরু করল। তবে এখানে একটা দর্শনীয় ব্যাপার হচ্ছে ওরা কান্নাকাটি করলে চোখ দিয়ে জল বেরোয় না। ধোঁয়া বের হয়। মানুষের শরীরে সত্তরভাগ জল। কিন্তু ওদের সত্তরভাগ ধোঁয়া। বাকি ত্রিশভাগ কি তা বলতে পারব না। আলকাতরা হলেও হতে পারে।

জাল গুটিয়ে ফেলার পর ওরা বুঝতে পারল ওরা ফাঁদে পড়েছে। পুরো ব্যাপারটাই গটআপ কেস।

মাতব্বর গোছের ভূতটা জিজ্ঞেস করল, ‘আমাদের অপরাধ?’

আমি বললাম, ‘তোমাদের অপরাধ ঘোরতর। মালয় কুলীদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছ তোমরা। আমাদের কাজকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ছ-মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে তোমাদের।’

ফচকে একটা ভূত বলল, ‘ওসব না করলে আমরা টাইম পাস করব কি করে? তাও তো কারো পিঠে সুড়সুড়িও দিইনি, চিমটিও কাটিনি। এতেই যদি কারাবাস হয় তাহলে কিছু বলার নেই।’

একটা সিরিয়াস ভূত বলল, ‘এই কালাকানুনের আমি প্রতিবাদ করছি। ভূতগণ, এটা আমাদের একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। ফাইট ফর রাইট।’

আরেকজন বিচক্ষণ ভূত বলল, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের একটা মাঝামাঝি রফা কি আমরা করতে পারি না?’

আমি বললাম, ‘শুনি তোমার মুখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিকল্পনাটা কি রকম?’

সে বলল, ‘আমরা আপনাদের ব্যাপারে মাথা গলাব না তেমন আপনারাও আমাদের ব্যাপারে মাথা গলাবেন না।’ কথাটা বলে ধড়িবাজ ফিচেলের মতো হাসতে লাগল ভূতটা। বুঝলাম তার কথার মধ্যে একটা ফাঁক আছে। পরে সে বলবে হয়তো ‘মাথা গলাব না কথা ছিল, হাত-পা গলাব না এমন তো প্রতিশ্রুতি দিইনি।’

আমি বললাম, ‘তোমাদের পিসফুল কো-অপারেশনের মানে আমি জানি। তোমরা যা ইচ্ছে তাই করবে আর আমাদের মুখ বুজে সব সহ্য করতে হবে। তাই না?

এমন ঠ্যাঙানি দেব, চোখে সর্ষেফুল দেখবে। তোমাদের ঐ অপদেবতা সহ তোমাদের বাণ্ডিল করে পর্বতের কোটরে ঢুকিয়ে পাথর দিয়ে সিল করে দেব। বুঝবে মজা তখন।’

কেঁদো ভূতটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল, ‘আপনি পারবেন না।’

আমি তখন বের করলাম আমার তুরুপের তাস। তিব্বতের এক লামা তান্ত্রিক বন্ধু আছে আমার। তার প্রধান কাজ হচ্ছে জঙ্গলের বাঘদের নিরামিষাশী করে ছেড়ে দেওয়া। হিংস্র জীবকুলকে অহিংস করে দেওয়াই তার জীবনের ব্রত। তিনি একসময় আমায় বলেছিলেন, ‘জীবনে একটা বিদ্যা এখনো প্রয়োগ করতে পারিনি। ভূত শোধন যজ্ঞ। এ প্রক্রিয়ার উপকরণ হল তিন ছটাক গঙ্গাজল আর দুশো গ্রাম গুগ্গুল মিশ্রিত ধুনো। আর যজ্ঞের কিছু শুকনো কাঠ তো লাগবেই। যদি কখনো সুযোগ আসে আমায় জানাবেন।’

জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা। ঐ তান্ত্রিক বন্ধুর কথা মনে পড়া মাত্রই ফ্যাক্টরি থেকে ফোন করলাম। তান্ত্রিক বন্ধুবর খেচরি মুদ্রা করে আকাশমার্গে উড়ে চলে এলেন।

রুবি বলল, ‘খেচরি মুদ্রাটা কি জিনিস, খিচুড়ি নাকি?’

পটাদা বলল, ‘ওসব যোগীদের ব্যাপার। জিভটাকে উল্টে দিয়ে টাকরায় লটকে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব শূন্য করে দিতে পারেন ওঁরা। তারপর যেখানে মনঃসংযোগ করেন সেখানে পৌঁছে যান। এসব দীর্ঘ-দীর্ঘকালের সাধনসাপেক্ষ ব্যাপার। এসব চিকেন-মাটন-এগরোল খেয়ে ওপথে যাওয়া যায় না। প্রচুর সংযম দরকার। ধাপ্পাবাজির পথ একদম পরিহার করে চলতে হবে। তোদের মতো চ্যাটার বক্স হলেও চলবে না। বছরের পর বছর মৌন থাকতে হবে। তাছাড়াও আরো অনেক ব্যাপার আছে।’

রনেন বলল, ‘নেটে চ্যাট করলে অসুবিধা আছে?’

পটাদা বলল, ‘ভালো বলেছিস! হিমালয়ের গুহায় বসা সাধু মাউন্ট আবুর সাধুর সাথে ইন্টারনেটে চ্যাট করছে ব্যাপারটা কল্পনা করতেই কেমন গা ‘রি রি’ করে উঠছে। ওয়ান্না ডু ইউ নো বাড্ডি, হাউ ইন্টারেস্টিং ডুড মাই গড ইজ।’

আমি বললাম, ‘পটাদা গল্পটা হোক না।’

রুবি বলল, ‘তিব্বতের লামার সঙ্গে তোমার পরিচয় হল কিভাবে?’

পটাদা বলল, ‘সে অনেক কাহিনী। তবে সংক্ষেপে বলছি তোদের। দীর্ঘদিন চিন ঘুমিয়ে ছিল আফিম খেয়ে। ভারতবর্ষের দু-বছর পর স্বাধীনতা লাভ করল। ব্রিটিশ সূর্য তখন ধীরে ধীরে অস্ত যাবার মুখে। গা ঝাড়া দিয়ে উঠে চিন তার অর্থনীতি ঘুরিয়ে ফেলল। কমিউনিস্ট শিবিরেও দুটো ভাগ হয়ে গেল। একদিকে লাল চিন অন্যদিকে সোভিয়েট রাশিয়া। একাত্তরের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল। যেহেতু ভারতের বন্ধুদেশ রাশিয়া তাই পাকিস্তানের বন্ধু হয়ে গেল চিন। যুদ্ধের সময় গুজব রটেছিল চিন পাকিস্তানকে সেনাবাহিনী পাঠাবে। সেইসময় আমার এক বন্ধু ভারতীয় স্পাই হিসেবে তিব্বতে যাবার আদেশ পেল। সে সঙ্গে আমাকে নিয়েছিল। চিন দাবি করে তিব্বত তাদের, অরুণাচল প্রদেশও তাদের। তিব্বত চিনের অন্তর্ভুক্ত হতে রাজি নয়। ঐ গুপ্তচর বন্ধুর অনুরোধেই আমি তিব্বতের কয়েকজন বৌদ্ধ শ্রমণের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। অদ্ভুত ক্ষমতাধর সব মানুষ আছেন ওখানে। দলাই লামা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন জানিস তো?’

রনেন বলল, ‘পটাদার কাহিনীতে তথ্যগুলো সঠিক থাকে কিন্তু গল্পগুলো গাঁজা। রুবি সব যেন গুলিয়ে ফেলিস না। ভূতের কারবারটুকু ‘আপনমনের মাধুরী মিশায়ে’ এডিট করে নিবি।’

রুবি বলল, ‘পটাদা এবার গল্পটা শেষ করো।’

পটাদা বলল, ‘হ্যাঁ, তারপর শুরু হল ভূত শোধন যজ্ঞ। ভূতগুলো সব ছটফট করতে লাগল মন্ত্রের প্রভাবে। কাপড় কাচলে যেমন ময়লা বেরোয় তেমন ওদের গা থেকে দুর্গন্ধ আর কালো ধোঁয়া বেরোতে লাগল। ত্রাহি-ত্রাহি রব উঠল চারদিকে। ভূতগুলো বলল, ‘আর কখনো আমরা নাকি সুরে রাগ-রাগিনীর চর্চা করব না। আর কোনোদিন চাঁটি মারব না কারুকে।’

আধ ঘণ্টার ভিতর ভূতগুলো ভদ্র-শান্ত-সভ্য হয়ে গেল।

তিব্বতী প্রভু বললেন, ‘আর চিন্তা নেই। ওদের বিষ ঝেড়ে দিয়েছি। বায়ুমণ্ডল খানিকটা দূষিত হল বটে। তবে সে দূষণকেও রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটিয়ে অনুকূলে আনা যায়। সে কাজ বৈজ্ঞানিকদের।’

‘তারপর কি হল?’ রুবি প্রশ্ন করল।

পটাদা বলল, ‘তারপর আর কখনো ওরা মালয় কুলীদের জ্বালাতন করেনি।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%