ভূতের ঢিল

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

বাজারহাট করার প্রতি সেজোমামার কোনোকালে আগ্রহ ছিল না। কারণ তিনি কবিতা লেখেন। সে কবিতা কেউ পড়ুক ছাই না পড়ুক। ‘কবিদের বাজার করা শোভা পায় না’ এমন একটা বদ্ধমূল ধারণা সেজোমামা বাল্যকাল থেকে পোষণ করেন। ‘কিন্তু কবিদের খেতে হয় এটাই বড়ো পরিতাপের বিষয়’ বড়োমামার কালজয়ী উক্তি।

মাঝেমধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেজোমামা সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতেন, ‘সেকসপীয়ার সবজি বাজারে ঢুকে পটলঅলার সাথে দরকষাকষি করছেন কি মেছুনির দাঁড়িপাল্লার কাঁটার দিকে খর নজরে তাকিয়ে আছেন, দৃশ্যটা ভাবা যায়? ছ্যা: ছ্যা:!’

সেজোমামাকে বাজারে পাঠাবার ঝুঁকিও কেউ নেয় না। কেনাকাটা করতে গেলে তিনি নানান কাণ্ড বাধিয়ে আসেন। একবার বাজার সাঙ্গ হবার পর কোথায় আড্ডা মারতে গিয়ে ব্যাগ বদলে নিয়ে এসেছিলেন। সেজোমামার ব্যাগে থাকার কথা আখের গুড়, ঘি, বাসমতী চাল আর ইলিশ মাছ। সেদিন ছিল টুকাইয়ের জন্মদিন। তো বদলি ব্যাগে এসেছিল এক কাঁদি —থুড়ি, একছড়া কাঁচকলা (লোকটা প্রকারান্তরে কলাই দেখাতে চেয়েছিল বোধহয়), একটা ঝুনো নারকোল আর এককেজি সুঁটকি মাছ। বড়োমাসি ঐ শুকনো মাছের গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। ব্যাগ খুলতেই ভক করে গন্ধ উৎসারিত হয়ে আক্রমণ করে বসে তাঁকে। তিনি প্রায় মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিলেন। নাক টিপে ধরে তিনি সেজোভাইকে অভিসম্পাত করেছিলেন — ‘তোর কবিতা ভূতে পড়বে।’

বেচারি টুকাইয়ের জন্মদিন সেবার ঠিক ভালো করে জমল না। আমরা ছোটোরা ইলিশের অভাবে বালিশই আশ্রয় করলাম। নিধেদার আবার সেদিন গায়ে একশো চার টেম্পারেচার। জ্বরের ঘোরে মাঝে মাঝে তিনি অকাট্য এবং দুর্বোধ্য সুরে দেশোয়ালি সঙ্গীত পরিবেশন করছিলেন। অথচ হুঁশ থাকতে গাইতে বললে কিছুতেই গাইবেন না। ‘নোতুন নোতুন পেরজাপতি মৌ খেতেছে।’ এইটুকু বাক্য শুধু ডিটেকটিভ ছোড়দা মর্মোদ্ধার করতে পারল। বাকিটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস অ্যাপ্লাই করেও কিছু হল না।

সেজোমামার এত ভুলো মন, তার জন্য মাঝে মাঝে সত্যিই খুব বেকায়দায় পড়তে হয়। ফর্দ মিলিয়ে বাজার করলেও দু-একটা ভুল তিনি করবেনই। সেজোমামা ব্যাগ হাতে বেরোলে বাড়িতে দুটো পক্ষ ভাগ হয়ে যায়। নির্ভুল বাজার করার পক্ষে একটা শিবির, ‘ভুলসহ বাজার করার’ পক্ষে আরেক শিবিরে বাজির লড়াই হয়। কেউ বলে, ‘ধনের বদলে মৌরি আনবে সেজোমামা।’ কেউ বলে, ‘জিরে আনবেই না।’ শুধু সেজোমামার ব্লাইণ্ড সাপোর্টার নিধেদা বলে, ‘আমি বাজি রাখতি পারি সেজোদাভাই আজ জেবনে পেত্থমবার নের্ভুল বাজার করবেই করবে।’ পুরনো লোক নিধেদা সেজোদাভাইকে কোলেপিঠে মানুষ করেছে যে। তার নামে নিন্দেমন্দ সইতে পারবে কেন? দুই প্রজন্মের নিধেদা কারো সমর্থন পাক না পাক নিজের মতামত থেকে সরতে চায় না। বাড়িতে কম্পিউটার আসার দিন নিধেদা খুব আনন্দ পেয়েছিল। দেখে বলল, ‘খুব সোন্দর জিনিস, একেবারে টিভির ভায়রাভাই। সেজোদাভাইরি মানাবে খুব জিনিসটা। ওর মাঝে বুঝি কোবিতের কলকাঠি সেঁধুনো আছে?’

আমদের অত মিনিরেলের প্রয়োজন নেই বাপু...

এই কথা শুনে তিনদিন হেসেছিল ছোটোমাসি। আর নিধেদাকে দুটো পাকা কলা উপহার দিয়েছিল। সেজোমামার নামে অপবাদ দিলে নিধেদা কানে আঙুল দিয়ে বসে থাকে। আর যদি নিজের বুদ্ধিতে বাজার করতে বলা হয় সেজোমামাকে তবেই হয়েছে। সক্কলের কপালে জুটবে নিরম্বু উপোষ। একবার আড়াই কেজি লঙ্কা আর পৌনে চার কিলো লালডাঁটা এনে হাজির করেছিলেন। সবজি বিক্রেতা বলেছিল, ‘বাবু এত লঙ্কা কি করবেন? শুকিয়ে যদি রাখেন তো আলাদা কথা। না হলে পচে যাবে কিন্তু।’ সেজোমামা বলেছিলেন, ‘তুমি থামো তো। লঙ্কার বৈজ্ঞানিক নাম জানো? জানো, এর কি কি উপকারিতা আছে? দুনিয়ার কিছুই তো খোঁজ রাখো না। এ দিয়ে কত ওষুধ বানাচ্ছেন সায়েন্টিস্টরা তার খবর রাখো?’

বাড়িতে অত লালডাঁটা দেখে মেজোমাসি সবাইকে ডেকে কাঁদতেই বসে যেতেন কিন্তু তখন সেজোমামা খোলা স্লুইস গেটের জলের মতো তোড়ে বক্তৃতা শুরু করেছেন। এতে আছে এত শতাংশ প্রোটিন, তত শতাংশ ভিটামিন, এত শতাংশ কার্বোহাইড্রেট, এত শতাংশ মিনারেলস...’ শুনে বড়মামী বলেছিলেন, ‘আমাদের অত মিনিরেলের প্রয়োজন নেই বাপু। তুমি ওগুলো তোমার কাব্যসাধনার ঘরে বসে কাঁচা চিবিয়ে খাও গিয়ে। (বড়োমামী পরোক্ষভাবে গোরু বলেছিলেন কিনা এ নিয়ে আমরা ছোটোরা তদন্ত কমিশন বসিয়েছিলাম)। তোমার জন্যে আজ তাহলে ভাতের চাল মাপছিনে।’

প্রত্যুত্তরে সেজোমামা বলেছিলেন, ‘নোবেল প্রাইজ পেলে একহাত দেখে নেব সব্বাইকে। কমসে কম বুকার প্রাইজ তো বাঁধাবই। সবাই সেদিন বুঝবে কত গমে কত ময়দা। যখন দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট আমার ইন্টারভিউ নিতে আসবে, সারা দেশের লোক আমায় সম্বর্ধনা দেবে তখন তোদের সাথে কথা বলারই ফুরসৎ থাকবে না। তখন বুঝবি লালডাঁটা বিষয়ে আমি যা যা বলেছিলাম তা সত্য কিনা। প্রাকৃতিক জিনিসের প্রতি আজও তোদের ভালোবাসা জন্মাল না।’ ক্লাস টেনে পড়া ছোটোমাসি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে সব কথা শুনল। তারপর বলল, ‘দাদা নোবেল প্রাইজ পাওয়া এমন কিছু কঠিন নয়। বুকার আর কুকার প্রাইজে একটা মাত্র শুঁড়ের তফাৎ।’

টুকাই জিজ্ঞাসা করল, ‘কিভাবে?’

ছোটোমাসি বলল, ‘সর্বপ্রথমে আমাদের বাবা বিশ্বনাথের নাম নিয়ে পুকুরের ধারের গাছ থেকে একটি বড়োসড়ো বিল্বফল পেড়ে আনতে হবে।’

গোয়েন্দা মনোভাবাপন্ন ছোড়দা কোমরে হাত রেখে শুধাল, ‘বিল্বফলের অপর নাম শ্রীফল নয় কি?’

‘কারেক্ট।’ ছোটোমাসি বলল।

‘তারপর ওটাকে ভালোভাবে ধৌত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুদ্ধিকরণ করা আবশ্যক। অতঃপর ওটার গায়ে আমাদের কালু আর্টিস্ট প্রযত্নসহকারে ‘নো’ লিখে দিলেই কেল্লা ফতেপুর সিক্রি। সুইডেনের চেয়ে এখানকার নোবেল অনেক সুস্বাদু। কতিপয়...’

‘দেখাচ্ছি তোর কতিপয়।’ সেজোমামার এগিয়ে যাওয়া হাতটা দেখে ছোটোমাসি বেণী দুলিয়ে দৌড় দিল। আমরা ছোটোরা যে যেখানে পারলাম সেঁধিয়ে গেলাম। কারণ রেগে গেলে সেজোমামা বিক্রম বেতালের মতোই। হাতের চাঁটি মাথায় তাল পড়ার মতো বেদনাদায়ক।

সেজোমামার বাজার করা সংক্রান্ত একটা মজার ঘটনা আছে। তিনি একবার নিজেই আগ্রহ করে বাজার গিয়েছিলেন। সেদিন কি কারণে তাঁর মনে হয়েছিল কবিদেরও বাজার করার অভিজ্ঞতা থাকা উচিৎ। নচেৎ কাব্য পরিপূর্ণতা পায় না। একাই বেরিয়ে পড়েছিলেন। সাথে কাউকে নিতে তাঁর আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছিল। ‘আমি একাই নিরানব্বই প্লাস হাতের একটা ব্যাগ নিয়ে মোট একশো’ অ্যাটিচুড নিয়ে তিনি থলি হাতে মিলিটারি মার্চ করার ভঙ্গিতে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন।

মামার বাড়ি থেকে বড়োবাজারের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। পাকা সড়ক ছাড়াও একটা সর্টকাট রাস্তা আছে। রেললাইন টপকে মাঠের ভিতর দিয়ে কাঁচা রাস্তা। দু-পাশে চাষের খেত। নির্জন পথ। শুধু ফসল কাটার সময় ঐ রাস্তা দিয়ে গোরুর গাড়ি যায়। ঐ সর্টকাট রাস্তায় প্রায় সিকিভাগ দূরত্ব কমে যায়। প্রবাদ আছে, ‘সর্টকাট ইজ অলওয়েজ লং কাট।’ তো সেজোমামা বাজার সাঙ্গ হবার পর দেখলেন, আকাশে মেঘ জমেছে। গতিক সুবিধের নয়। তিনি ধরলেন ঐ সর্টকাট পথ। দেখতে-দেখতে সারা আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। রাস্তায় কোনো লোকের টিকিটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। সেজোমামা দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটতে লাগলেন। দমকা বাতাসে ধুলো উড়ে চোখেমুখে ঢুকতে লাগল। তার সাথে বিকট আওয়াজের বজ্রপাত। সেজোমামার দ্রুত হাঁটা প্রায় দৌড়ে পরিণত হল। মিলখা সিংকে মনে পড়ে গেল তাঁর। অলিম্পিকে হেঁটে উনি দেশকে রূপো না ব্রোঞ্জ কি যেন এনে দিয়েছিলেন। যখন তিনি বসে-বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, সাংবাদিক গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘আর ইউ রিল্যাক্সিং?’ উনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নো, আই অ্যাম মিলখা সিং।’ এইসব কথা ভেবে সেজোমামা ঝড়কে উপেক্ষা করার চেষ্টা করলেন। তীব্র রোদকেও উপেক্ষা করার কায়দা আছে। মনে মনে তেঁতুলের কথা ভাবতে হয়। তাতে গায়ে রোদ লাগে না। ভাবেন কবিমামা।

এইবার ঝাঁপিয়ে নামল বৃষ্টি। বড়ো-বড়ো ফোঁটায় চারদিক সাদা হয়ে গেল। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় মনে হল পায়ের গোড়ালিতে কে একটা ঢিল মারল যেন। বড়োমাসির অভিশাপের কথাটা মনে পড়ে গেল সেজোমামার। ‘তোর কবিতা ভূতে পড়বে।’ না, ভূতেদের কবিতা শোনাতে তিনি নারাজ। ওরা বুঝবে না, মিথ্যে মিথ্যে প্যাচাল পাড়বে। আলতু ফালতু মন্তব্য করবে। একদিন একটা গেঁয়ো ভূত বলেছিল, ‘ঘরে এত বই জমিয়ে রেখে কি লাভ? ওজন দরে বেচে দিলেই তো হয়।’ ওদের দাবি মেনে কবিতা লিখতে গেলে তা আর কবিতা থাকবে না, বিয়ে বাড়ির বাজারের ফর্দ হয়ে যাবে। খবরের কাগজের খবরের দু-পাশ সমান করে মুছে দিলে যেটা অবশিষ্ট থাকে তাকে বরং আধুনিক কবিতা বলে চালালে ওর চে ভালো হবে।

এমন ভাবতে ভাবতেই সেজোমামা নাকি সুরে নিজের নামটা শুনতে পেলেন। ব্যস, আর কোনো সন্দেহই রইল না, এ কাদের কাজ। আবার একটা ঢিল পড়ল পায়ের গোড়ায়। সেজোমামা তীব্র গতিতে দৌড়াতে লাগলেন। হাতের ব্যাগ সহ। ব্যাগ ফেলে দৌড়ানো যাবে না। কারণ এটা প্রেস্টিজ ফাইট। যত জোরে তিনি দৌড়াতে লাগলেন, তত বেগেই ঢিল পড়তে লাগল পায়ের কাছে। শোনা যায়, কার্ল লুইসের স্পীডে দৌড়ে সেজোমামা বাড়ির ভিতরের চাতালে পৌঁছেই মূর্ছা গিয়েছিলেন। একটিমাত্র বাক্য তাঁর মুখ থেকে স্ফূরিত হয়েছিল। ‘ভূতে মারে ঢেলা।’

ততক্ষণে বৃষ্টি ধরে এসেছে। আমরা ছোটোরা-বড়োরা সক্কলে ঘিরে দাঁড়িয়েছি সেজোমামাকে। বড়োমামা গর্জন করে বললেন, ‘এয়ার প্লিজ! ডোন্ট মেক সাফোকেশন। সরে দাঁড়াও সব।’

ছোড়দার কানের কাছে ফিস ফিস করে টুকাই জিজ্ঞাসা করল, ‘মিষ্টু, গর্জন তেল একফোঁটা খেলে সিংহের মতো গর্জন করা যায় না কি রে?’

‘তোর মাথা। গর্জন তেল দেবী দুর্গার চোখে দেয় দেখিস নি?’

বড়োমামা নাড়ি টিপে রায় দিলেন, ‘বেঁচে আছে।’

আমরা ছোটোরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

মামী, মাসিরা সব পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসে গিয়েছিলেন। বড়োমামী সূদন ওঝাকে ডাকবার পরামর্শ দিলেন। চটজলদি ওঝা এসে হাজির। এমন একটা বৃষ্টির দিনে হঠাৎ কাজ জুটে যাওয়ায় সূদনের মহা উৎসাহ। বড়োমামা দূর থেকে সূদনকে দেখে ‘বুজরুক’ বলে ডাক্তার ডাকতে চলে গেলেন। ছোটোমাসি ততক্ষণে হাতে পায়ে গরম তেল মালিশ করতে লেগে গেছে। নিধেদার সন্ধান করে কোথাও পাওয়া গেল না। কাজের সময় ওকে পাওয়া যাবে না বলাই বাহুল্য। সূদন ওঝা হাতে একটা গোরুর লেজ লাগানো লাঠি নিয়ে বাঁই-বাঁই করে ক-পাক ঘুরে বিচিত্র সব মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। ছোড়দার কান খুব তীক্ষ্ণ। ও নাকি মন্ত্রের কথাগুলো হুবহু ধরতে পেরেছিল।

কাল ছিল ব্যাগ খালি আজ চালে যায় ভরে বল দেখি পীর আলি কায়দাটা কোন দরের?

পীর আলি দক্ষিণ পাড়ার আরেক ওস্তাদ। সূদনের কম্পিটিটর। নেক-টু-নেক ফাইট দুজনের। এ ভূতের, ও সাপে কাটার। দুজনের কে বড়ো তা নিয়ে তর্কেরও শেষ নেই দুই গুরুর চেলা চামুণ্ডার ভিতর।

বড়োমামী শুধালেন, ‘বাবা, ভূত ছাড়বে তো?’

সূদন বিজ্ঞের হাসি হেসে বলল, ‘বলেন কি? এটা কোনো সমিস্যে সূদনের কাছে? যার নাম শুনে ভূতের চোদ্দপুরুষ কাঁপে। বেম্মাদত্যি বলুন কি মামদো, সূদনের হাতে সব টাইট। তবে কিনা আমাদের সেজোকত্তাকে ধরেছেন শাঁকচূন্নি। টিভি সিরিয়াল দেখে এনারা আয়েসি হয়ে গেছেন। সাবান, শ্যাম্পু মাখার লোভ না দেখালে এনারা নড়তে চাননা। শুধু কলাটা, মূলোটায় আজকাল আর কাজ হয়না। আগেকার ওষুধে যেমন এখনকার রোগ সারে না।’

বড়োমামী বললেন, ‘সব দেব বাবা। চাল, ডাল, আলু, কলা যা চাও। টাকাও দেব। কি সাবান লাগবে বলো?’

‘লাইফবয় বা লাইফগার্ল কোনো একটা দিলেই হবে।’ ছোড়দা বলল। সূদন তাকে সমর্থন করে বলল, ‘ঠিক বলেচেন ছোটোদাদাবাবু।’

‘যত তাড়াতাড়ি পারো শাঁকচূন্নিকে তাড়াও।’ বড়োমামীর নির্দেশ।

সূদনের মন্ত্র পড়ার গতি বেড়ে গেল। এমন সময় নিধেদা এসে হাজির। কবিমামা ততক্ষণে পাশ ফিরেছেন। সোৎসাহে মামী মাসিরা বলছেন, ‘ওষুধ ধরেছে, ধরেছে।’ নিধেদা কিন্তু তাকিয়ে আছে। সূদন ভয়ে-ভয়ে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। আর ততোধিক জোরে মন্ত্র ঝাড়ছে।

মেজোমামা চাতালে প্রবেশ করেই পকেটে হাত ঢোকালেন। আমরা ছোটোরা ভয়ে দূরে সরে দাঁড়ালাম কানে আঙুল দিয়ে। আমাদের ধারণা মেজোমামা এমন কিছু বের করবেন যাতে খুব জোরালো শব্দ হবে। ছোড়দা কিন্তু বেপরোয়া। কোমরে হাত তার। চারদিকে থমথমে আবহাওয়া। কি জানি, কি বেরিয়ে আসে পকেট থেকে। পিস্তল না চাবুক। বেশ কিছুক্ষণ প্রতীক্ষার পর অবশেষে মেজোমামার পকেট থেকে বেরোল ক্ষুদে একটা ডিব্বা। নস্যির নাকি স্মেলিং সল্টের শিশি? বড়োমামাও তখন গোপাল ডাক্তারকে নিয়ে ঢুকছেন।

মেজোমামা বললেন, ‘ডাক্তার, বদ্যি, ওঝা, পুরুত কাউকে লাগবে না।’ এই বলে তিনি নস্যির ডিব্বাটা সেজোমামার নাকে ধরলেন। একটা বিরাট হ্যাঁচ্চো দিয়ে কবিমামা ধড়মড় করে উঠে বসলেন। উঠেই তার প্রথম ঔপনিষদীয় প্রশ্ন: ‘আমি কোথায়?’

‘তোমার মুণ্ডুতে।’ উত্তর দিয়ে মেজোমামা ঘরে চলে গেলেন।

সেজোমামার দ্বিতীয় প্রশ্ন : ‘ভূতটা কি কবিতা শুনতে চায়?’

চোখ দিয়ে দরদর করে জল ঝরছে সেজোমামার।

ছোড়দা বলল, ‘সাধুভাষায় একেই বলে দরবিগলিত ধারে। আসলে এটা নস্যশ্রু। অর্থাৎ নস্য জনিত অশ্রু। বুঝলি টুকাই।’

বড়োমামা বললেন, ‘হ্যাঁ, ভূতটা তোমার কাব্যগ্রন্থ ওদের সমাজে প্রকাশ করতে চায়। অকম্মার ধাড়ি কোথাকার।’

সেজোমামা উঠে বসতেই চারপাশে হৈ-চৈ পড়ে গেল। কি হয়েছিল, কিভাবে হয়েছিল, জিজ্ঞাসা করতে লাগল সবাই। সেজোমামা সটান নিজের ঘরে গিয়ে খিল তুলে দিলেন। গোপাল ডাক্তারকে ফিরে যেতে দেখে দিদা বললেন, ‘ও গোপলা, চা খেয়ে যাবানা তাও কি হয়? বি.সি.এস. ডাক্তার-বদ্যির বুঝি এমনধারা আক্কেল?’

ক্লাস এইটের ছোড়দার শার্লক হোমসের প্রায় সব সিরিজ পড়া শেষ। এখন হেমেন্দ্রকুমার রায় ধরেছে। তার দিকে তাকিয়ে ছোটোমাসি বলল, ‘এই ঘটনার সাথে নিধেদা জড়িত আমি ড্যাম সিওর। কিন্তু বাজারের ব্যাগ এত হাল্কা কেন?’

ছোড়দা ফেলুদার স্টাইলে বলল, ‘প্রথমতঃ, ব্যাগের ডানধারে তলায় একটা আড়াই ডায়ামিটারের ছ্যাঁদা ছিল। আলুর চাপে ঐ ছ্যাঁদা তিন ডায়ামিটারে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ, বাজার যাবার সময় তাড়াহুড়োয় ভদ্রলোক যে ব্যাগটা নিয়েছিলেন, ওটা যে বাতিল তা মি: মিত্রের অজানা ছিল। একেকটা আলু পড়েছে আর মি: মিত্র ভেবেছেন...।’

ছোটোমাসি ধমক দিয়ে বলল, ‘তুই থাম এঁচড়ে পাকা গোয়েন্দা।’

দিদা সূদনকে বললেন, ‘ও মদন, তুই আজ চাল-ডাল নিয়ে যা। বাকি সব কাল নিয়ে যাস। কি যেন নামটা তোর ভুলেও যাই। বদনা না?’

ঠিক তখন খিড়কির দরজার আড়ালে উঁকি দিল দুটো কটমটে চোখ। সূদনের ছাঁদা বাঁধার প্রতি তার দৃষ্টি। চাদরে গিঁট বাঁধাও সারা, সূদনও পত্রপাঠ এলাকা থেকে হাওয়া।

মেজোমামী বললেন, ‘কি করেছিস, খুলে বল তো নিধে। তুই সব জানিস।’

নিধেদা হাঁউমাঁউ করে আচমকা কলাগাছ পড়ার মতো কেঁদে উঠল। ‘অপরাধ নেবেননি মা জননী, আমি নিস্পরাধ। আপনাদের নের্দেশ মতো আমি সেজোদাভাইরি ফলোত করিছি। পথে এট্টু বিড়ির নেশা চাপলি, গেঁজের মদ্যি শলাই খুঁজে দেখি নেই। হেঁইরে গেছে। পথে বিড়ি টানা লোক আর আসেই না, পিতিক্ষাই সার...।’

বড়োমামী বললেন, ‘খাওয়া-দাওয়ার পর অনেক সময় পাবি। তখন মন খুলে কান্নাকাটি করিস। এখন কথাগুলো স্পষ্ট করে বল তো।’

নিধেদা হাত কচলে, মাথা চুলকে বলল, ‘সেজোদাভাইরি অকাতরে কত ডাকাই না ডাকলেম। উনি কানেই নেল না। কানে ঠুঁসো হলেও নয় বাক্যি ছিল। গলা ছেইড়ে হাঁক পেড়েছি। কিন্তু হলি কি হয়? শোনে কিডা? শুনলেও বা থামেন ক্যাম্বায়? উনি ঝেড়ে দোড় মারলে। সে কি বিভচ্চ দোড়। দেখলি পরাণ জুড়িয়ে যায়, আহা! মাতার কেশ খাড়া হয়ে যায়। কি দোড়টা দোড়োতে পারেন আমাদের সেজোকত্তা আজ দু-চোখ ভরে দ্যাখলাম।’

ছোটোমাসি বলল, ‘তা তো দেখবাই, ও যে তোমার অল ডে আইডল।’

স্বগতোক্তির মতো কথাটা অবশ্য ছোড়দা আর আমি ছাড়া অন্য কেউ শুনতে পেল না।

‘বিষ্টির মদ্যি অমন মনভোলান দোড় কি ক্যালি না থাকলি যে সে পারে? নাহলি কি কোবতে লিখতি পারা যায়? উনি দোড় মারিচেন দেকে আমার আর কি করা? ওদিকি বিড়িটাও খাওয়া হল নে। পেট ফুলে উঠিচে...।’

কবি হতে গেলে ভালো দৌড়বীর হতে হয় আমরা ছোটোরা নিধেদার মুখ থেকে জানতে পারলাম। এভাবেই তো মানুষের মুখে শুনে মানুষের কত জ্ঞান সঞ্চার হয়।

মেজোমামা গোপাল ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কচুরি আলুরদম সহযোগে ভুতুড়ে দিনটাকে সেলিব্রেট করলে কেমন হয়?’

কথাটা শুনে আমাদের জিভে জল থইথই। দেখলাম দরজা খুলে বেরচ্ছেন সেজোমামা। হাততালি দিয়ে মেজোদার প্রস্তাবটাতে ভোট অফ থ্যাঙ্কস জানিয়ে বলছেন, ‘তার সাথে পোয়াটাক গরমাগরম চা আর সান্ধ্যকালীন কবিতাপাঠের আসর।’

ছোড়দা ছোটোমাসির কানে-কানে বলল, ‘নিধেদা সাধুভাষায় কথা বলতে চাইছে।

ছোটোমাসি বলল, ‘শুধু তাই না, ও প্রতীক্ষাকে পিতিক্ষে আর বিভৎসকে বিভচ্চ বলেছে। ওরকম অনেক বলে ও। মাথা ঘামাস না। তোর ভাষাও গুবলেট হয়ে যাবে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%