স্যামসনের ভোগান্তি

হিরণ্ময় ভট্টাচার্য

আমরা পটাদার গল্প শুনছিলাম। রুবি, আমি, রনেন। পটাদা একটা আমলকীর টুকরো মুখে পুরে গল্প শুরু করল।

মুড়ি জংশনে চাদর মুড়ি দিয়ে বসেছিলাম ট্রেন বদল করব বলে। শীতকাল। কুয়াশা নেমে এসেছে মাটি পর্যন্ত। কুয়াশার জন্যই সেদিন ট্রেন চলাচল বিপর্যস্ত। আমার ট্রেনের কোনো অ্যানাউন্সমেন্ট নেই। এইসব সময়গুলোকে বলা হয় ‘টাইম হ্যাংস হেভি ইন হ্যাণ্ড’। পটাদা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিল আমরা গল্প গিলতে শুরু করেছি। এমতাবস্থায় একজন ব্যক্তি আমার সামনে দণ্ডায়মান দেখতে পেলাম। গ্রীক দেবতার মতো চেহারা ছিল এককালে বুঝতে পারলাম। কিন্তু বাংলাভূমির জলহাওয়ার গুণে কিছু ব্যাকটেরিয়াঘটিত রোগ ওকে কাহিল করেছে সেটাও বোঝা যাচ্ছিল।

সে প্রথমে হিব্রু ভাষায় আমায় কিছু বলল। বলা বাহুল্য, বুঝতে পারলাম না। তারপর ল্যাটিন। তারপর পালি। কোনো ভাষাই আমার বোধগম্য হল না। অবশেষে দেবনাগরী হরফে সে লিখে দেখাল। তখন বুঝলাম সে জানতে চাইছে ‘গ্যাস’ মানে কি?

প্রথমতঃ বুঝলাম লোকটা পলিগট। বহু প্রাচীন ভাষা জানে। দ্বিতীয়তঃ আধুনিক পরিভাষা জানে না। এতেই আমার সন্দেহ দানা বাঁধল। লোকটাকে বসতে বললাম। আপ্যায়িত বোধ করল সে। কাগজে লিখে লিখে আমাদের কথোপকথন চলতে লাগল।

—‘গ্যাস’ শব্দটার ব্যঞ্জনা বাংলা ভাষায় ব্যাপক। গ্যাস মানে বায়বীয় পদার্থ, গ্যাস খাওয়ানো মানে ইগোতে পালিশ দেওয়া। আপনি ঠিক কি জানতে চাইছেন?

—কচুরি খেয়ে পেট আইঢাই করছিল। ডাক্তারের কাছে যাওয়াতে তিনি বললেন, ‘গ্যাস হয়েছে।’ এই নামে কোনো অসুখের কথা আমার জানা নেই। যদি কখনো দেশে ফিরতে পারি নোয়াস্যরকে জিজ্ঞাসা করব।

—নোয়াস্যর কে?

—বাইবেল পড়েননি বুঝি? সেই যে গো, যাঁর নৌকায় ইত্যাদি ইত্যাদি। নৌকোটা এখনো ইউরাল পর্বতের গায়ে বাঁধা আছে।

চক্রাকারে ঘুরছিল একটা উড়োযান...

বলে কি লোকটা? দেখে তো পাগল মনে হচ্ছে না। বরং অতিমাত্রায় সুসভ্য এবং অতিশয় সুবোধ বলেই মনে হচ্ছে।

—কোথায় বাঁধা আছে বললে?

—ইউরাল পর্বতের গায়ে একটা ফার গাছের সাথে।

—কেন?

—কেন আবার কি, এখন ওদিকে সব জলমগ্ন না? সবে জলটল সরচে। নোয়াস্যর জলপাই গাছটা একটা ভালো জায়গায় লাগিয়েছেন। নতুন চাষবাসের কাজ শুরু হচ্ছে ওদিকে। নবযুগের বিস্তার বলে কথা।

আমি রাঁচির পাগলাগারদে একটা ফোন করে জেনে নেব ভাবছিলাম কোনো ব্যক্তি পাঁচিল টপকে পালিয়েছে কিনা। কিন্তু ও মনে হয় টেলিপ্যাথি জানে।

—আপনি যা ভাবছেন, তা নয়।

—তাহলে কি?

—আমি ইডেনের সিটিজেন। আমার নাম স্যামসন। ডিল্যুজের আমি একজন প্রত্যক্ষদর্শী। আমি ডরোথি আর তার কাকা ক্রিপটন টাইম মেশিনে চেপে একবিংশ শতকে পাড়ি দিয়েছিলাম। রাত্রিবেলায় বঙ্গে একটা মিষ্টির দোকানের সামনে আমরা ল্যাণ্ড করলাম। রসগোল্লা দেখে ওরা সেটা ‘নিষিদ্ধ ফল’ মনে করে খেতে ঢুকল। পরে শুনলাম, ডায়াবেটিসের রুগীদের কাছে ওটা নিষিদ্ধ ফলই বটে। আমি পূর্বপুরুষের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে সামনে তাকালাম। নজরে পড়ল একটা লম্বা ঘরের মধ্যে অনেক লোক ঢুকছে। কাপড়ের পর্দার মতো জিনিস, মানুষ নড়াচড়া করছে তার ওপর। লোকে বলছে ওর নাম মুভি। পালাটার নাম কি যেন ঠিক মনে নেই। ঢুকে পড়লাম ওখানে। পর্দার ওপরে লোকগুলো ঠিক কি করতে চাইছে বুঝতে পারলাম না। বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে। ফিরে দেখি মিষ্টির দোকানে ওরা নেই। ‘টাকা’ নামে একটা কাগজ চেয়েছিল দোকানদার। ওরা বুঝতেই পারেনি কি চাইছে। দোকানদারের ঝি ডরোথির হাত থেকে ব্রেসলেটটা খুলে নিয়েছে। ওরা এইসব ভাবগতিক দেখে মেশিনে চেপে কেটে পড়েছে। ভবিষ্যত যে এত ঝরঝরে ওরা কল্পনা করতে পারেনি। দোকানদার বলল, ‘ওহে ব্রেসলেট বাবদ কিছু টাকা তোমাদের পাওনা হয়। তুমি টাকাও নিতে পার, খাবারও খেতে পার। যেমন তোমার ইচ্ছা।’ টাকা নিয়ে আমি কি করব? তাই খাবারই খেলাম। কিন্তু কত খাব? দোকানদার কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘যা খেলে তাতে তোমার আগামী দিনসাতেক হাতের জল শুকুবে না। একটা গামছা কিনে নাও আর ঐ যে সামনেই বঙ্কু ডাক্তারের চেম্বার। আমরা একে অপরের স্বার্থ রক্ষা করি। তবে ওর ওষুধেরও গ্যারান্টী আছে এমন দাবি করছি না। যাও, অবস্থা বুঝে কি ব্যবস্থা নেবে সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমরা নাক গলাই না। এটা গণতান্ত্রিক দেশ।’ আচ্ছা গণতন্ত্র কি?

—ওটা তন্ত্রমন্ত্রের একটা আচার। চুষে খেতে হয়।

—আমায় তো ওটা দেয়নি খেতে।

—কি কি দিয়েছিল?

—জিভেগজা, কচুরি, ল্যাংচা আর বোঁদে। এরকম বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি নাম কেন জিনিসগুলোর? ঐসব খেয়ে ইস্তক আমি ইডেনের স্মৃতি ভুলতে বসেছি। আচ্ছা, গামছা কি কাজে লাগে?

—গামছা? ওর অনেক কাজ। আদায়-উশুলের ব্যাপারে গলায় গামছা দেবার ব্যাপারটা নাকি ফলপ্রসূ। গলবস্ত্র হয়ে আমন্ত্রণ জানাবার ক্ষেত্রেও গামছার ব্যবহার হয়ে থাকে। গামছা কোন কোন নরের জাতীয় পোশাকের মতো। এ ছাড়াও অতীতকালে গামছায় চিঁড়েমুড়ি বেঁধে কয়েক ক্রোশ পথ পাড়ি দেবার বহুল প্রচলন ছিল। গামছা পেতে কেউ কেউ নৈশ নিদ্রার ব্যাপারটা সমাধা করেন। বলতে পারেন, গামছা হল সর্বঘটের কাঁঠালি কলা।

—বোঁদে খেতে এত বিচ্ছিরি কেন, নামটাই বা এমন দেওয়া হয়েছে কেন?

—শারোদোৎসবের মরশুমে এই বোঁদে বস্তুটি এককালে নয়নের মণি স্বরূপ সমাদৃত হত। বিয়ে-পৈতে-অন্নপ্রাশনের প্রাক্কালে ও পরবর্তী দিনগুলোয় এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। মুড়ি সহযোগে বোঁদে একটি অ্যান্টিক খাদ্যসম্ভার। বর্তমানে রোল ও চাউমিনের ধাক্কায় উহার সেই কৌলিন্য গত হয়েছে।

—খাদ্য খাবার পর আপনারা ওষুধ খান কেন?

—আসলে আমরা ওষুধ খাব বলেই খাদ্যটা খাই।

—বুঝলাম। আচ্ছা, আপনারা মানুষের মতই দেখতে। কিন্তু আমাদের সাথে মিলছে না কেন? তাহলে কি আপনারা সত্যিকারের মানুষ নন? দৃষ্টি বিভ্রম?

—না, ইলিউশন নয়। এককালে মানুষের মতোই ছিলুম বটে। কালের প্রবাহে জেনেটিক বিবর্তনের ফল এটা।

এরপর ইডেনের ঐ নাগরিক বলল, ‘এখানে এসে দেখলাম সবাই গায়ে একটা জিনিস মুড়িয়ে রাখে সেটার নাম নাকি জামা। সভ্য হতে চাইলে ওটা নাকি পরতেই হবে। তা গেলাম একটা দোকানে জামা কিনতে। কিন্তু কি দিল দেখুন। এই বলে দেবকান্তি ছেলেটা পকেট থেকে একটুকরো ঝামা বের করল।

আমি বললাম, ‘ওরকম হয়, দেবতা পেয়ে আপনার মুখে ঝামা ঘষে দিতে চেয়েছে নিশ্চয়। আপনি ঠিকই ধরেছেন। আমাদের এখন মানুষ না বলে ঝামানুষ বলা চলতে পারে। প্রযুক্তির বিপুল প্রসার ঘটলে এরকম হয়।’

—নোয়াদা’র জন্যে আমি একটা চিমসে গন্ধের লাড্ডু আর একপাতা অ্যান্টাসিড নিয়েছি। গোরু তৃণভোজী, বাঘ মাংসাশী কিন্তু মানুষ ওষুধভোজী প্রাণী তাই না? আচ্ছা, ‘গামছা’ পাব কোথায় বলতে পারেন?

—গামছার আরো দুটো কাজ মনে পড়ল। নিমন্ত্রণ বাড়িতে ওটা ঘাড়ে রেখে পরিবেশন করতে হয়। আর নারকোল গাছে উঠে কোমরের সঙ্গে ওটাকে বেঁধে নিলে কাজের সুবিধে হয়। এককথায় গামছা ব্যাতিরেকে সভ্যতার অগ্রগতি অসম্ভব।

—আমি সভ্য হতে চাই। আমার একটা গামছা চাই।

—এই রে! সভ্য হয়োনা বাপু। ওর অনেক ঝক্কি। বিস্তর হ্যাপা। ইডেনে ফলপাকুড় খেয়ে বেশ আছো। দিব্যি আছো। বানের গল্পটা শোনাও দিকি একটু।

—হ্যাঁ, শোনাই। আচ্ছা তার আগে একটা ছোট্ট প্রশ্ন সেরে নিই। হোটেলটায় বলল, গ্যাসে রান্না হচ্ছে। ‘গ্যাস’ জিনিসটাও কি সভ্যতার অপরিহার্য পরিণাম?

—বটে। সে জন্যই সভ্য হতে নিষেধ করছি। তুমি বরং গল্পটাই শোনাও বাছা।

—শোনাব, কিন্তু একটা উপকার করে দিতে হবে আমার।

—কি উপকার?

—টাইম মেশিনটাকে কাছে আনার একটা মন্ত্র আছে। শুদ্ধবস্ত্রে দুজন বসে ঐ মন্ত্রটা একশো আটবার জপ করতে হবে। আমি দোসর পাচ্ছি না তাই ফিরতেও পারছি না। ওরাও তো আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। নোয়াস্যর বলেছিলেন, আমায় একটু নিরিবিলিতে কাজ করতে দে। তোরা একটু বেড়িয়ে আয়। টিম. এম. স্কুটিটা গ্যারাজ থেকে বের করে নে। কি কুক্ষণে যে এই একবিংশ শতকে পাড়ি জমিয়েছিলাম। ভাগ্যিস আপনাকে পেয়ে গেলাম। আপনি আমার সঙ্গে চলে চলুন। আদম দাদু আর ইভ দিদিভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।

—ঠিক আছে। সে আর এমনকি উপকার। তোমার মন্ত্রজপের জন্য উপোষ করা কি বাধ্যতামূলক?

—না। এক্ষেত্রে শুদ্ধবস্ত্রও ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। মনের একাগ্রতাই আসল। আসলে মন্ত্রটা হল চাবির মতো। নির্দিষ্ট চাবিতে নির্দিষ্ট তালাই খুলবে। তরঙ্গ বিজ্ঞানে আপনারা এখনো দেখছি বেশ পিছিয়ে আছেন।

—তা ঠিক। আসলে আমরা পিছন দিকে কতটা নিজেদের ঠেলা যায় সেটা নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।

স্যামসনের বড়োসড়ো শরীর। যে গামছাটা ওকে গছিয়ে দিয়েছে তাতে লজ্জা নিবারণ করা দুষ্কর। শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা। জ্যালজেলে কাপড়ের টুকরোটা দু-হাতি।

স্যামসন জানতে চাইল, ‘এটা এমন কেন?’

আমি বললাম, ‘চালকলা-র সাথে এটা পুরোহিতের প্রাপ্য।’

—হোয়াট ডু ইউ মিন বাই চালকলা? আই ওয়ান্ট টু নো হোয়াট ইজ পুরোহিত?

কোথা থেকে শুরু করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ওকে চালকলা আর পুরোহিত বোঝাতে আমার কালঘাম ছুটে গিয়েছিল। দেবতার উদ্দেশ্যে অত ছোটো গামছা কেন দেওয়া হয় কোনো যুক্তি দিয়েই ওকে বোঝাতে পারছিলাম না।

বোঝাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছি, এমন সময় দেখলাম আমার সামনের আকাশে চমৎকার আলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। চক্রাকারে ঘুরছিল একটা উড়োযান। সেখান থেকে নেমে এলেন দেবদর্শন দুজন মানুষ। ওটা দেখে স্যামসন উল্লসিত হয়ে উঠল। বলল, ‘ঐ যে ডরোথি আর তার আঙ্কল ক্রিপটন।’

ক্রিপটন বললেন, ‘তুমি বড্ড ছেলেমানুষ স্যামসন। আমরা এক গ্যালাক্সি থেকে আরেক গ্যালাক্সি তোমায় গোরু খোঁজা খুঁজছি। আর কখনো আমাদের না বলে কোথাও যাবে না।’

রুবি বলল, ‘তারপর?’

পটাদা বলল, ‘ওরা চলে যাবার সাথে সাথে আমারও হাওড়াগামী ট্রেন এসে গেল।’

রুবি বলল, ‘সব বাজে কথা।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%