হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
লোকটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ট্রেনে। পিটার্সবার্গ থেকে ইউক্রেন যাবার পথে।
‘তুমি তাহলে অবিভক্ত রাশিয়াও ঘুরতে ছাড়োনি?’ রুবি প্রশ্ন করল পটাদাকে।
‘গ্লোব ট্রটার কাদের বলে জানিস, যাদের পায়ের তলায় চাকা লাগানো থাকে। খালি চোখে অবশ্য দেখা যায়না চাকাটা।’
রনেন বলল, ‘থাকব না আর বদ্ধ ঘরে, দেখব এবার জগৎটাকে’ কবিতাটা বোধহয় তোমাকে নিয়েই লেখা তাই না পটাদা?’
‘মেলা বকবক করিসনে। চিকেন কবিরাজি কাটলেট ছাড়া আজ কিন্তু এক ইঞ্চিও গল্প বেরুবে না। রোববার দিনটা সৃষ্টি হয়েছিল ভালোমন্দ খাবার জন্যেই।’
রুবি বলল, ‘নো চিন্তা। সঙ্গে ধোসাও আছে আজ।’
রুবির অভয়বাণী পটাদার বসার ভঙ্গি পাল্টে দিল। আজ যেন মনে হচ্ছে বসবার ভঙ্গিটা ফরাসী সম্রাট ষোড়শ লুই-এর মতো।
—ইউক্রেন কিজন্য বিখ্যাত জানিস?
‘জানি’, ঝটিতি হাত তুলল রুবি।
—বল দেখি?
—নামের মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে। ওখানে ‘ক্রেন’ মানে সারস পাখি বিখ্যাত।
—তোর মাথা। রনেন বলতে পারবি?
—পারব। ইউক্রেনকে রাশিয়ার শস্যভাণ্ডার বলা হতো।
—রাইট। দশে দশ।
—কিন্তু পটাদা পিটার্সবার্গ-এর বর্তমান নাম লেনিনগ্রাদ। যখন পিটার্সবার্গ নাম ছিল তখন কিন্তু রেল যোগাযোগ ছিল না বলেই মনে হচ্ছে। ট্রান্স সাইবেরিয়ান রেলওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রেলপথ এটুকু জানি।
পটাদা বলল, ‘বেশি জ্ঞান ফলাতে গেলে গাঁট্টা খাবি। গল্পের গ-ও জুটবেনা কপালে বলে দিচ্ছি।’
—সরি! পটাদা। শুরু করো। এই কান মলছি।

তার বদলে বসে আছে জল্লাদের মতো কাফ্রিটা….
—লোকটা একজন কাফ্রি। ইউরেনিয়াম ধাতু খুঁজে বেড়াচ্ছিল এখানে-ওখানে। উদ্দেশ্য পরমাণু বোমা বানায় যেসব দেশ তাদের সাপ্লাই দেওয়া। ওর প্রধান খদ্দের আমেরিকা।
যখন উজবেকিস্তান পার হয়েছি সবে তখন মাঝরাত। মাঠের মাঝখানে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে গেল। কয়েক মূহুর্তের জন্য ট্রেনটা অন্ধকার হয়ে গেল। বলতে পারিস ‘ফ্র্যাকশন অব সেকেণ্ড’ সময়। আমার পাশে বসেছিল একজন মোঙ্গোলিয়ান। কিন্তু আলো আসতেই দেখলাম লোকটা উধাও। আমার পাশে নেই। তার বদলে বসে আছে জল্লাদের মতো চেহারার ঐ কাফ্রিটা। মিচকি-মিচকি হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি অতবড়ো চেহারা কখনো দেখিনি আর অত অবাকও কখনো হইনি। ছোটোখাটো মোঙ্গলটার জায়গায় এই বিরাটকায় কাফ্রি কি ভৌত পরিবর্তন না রাসায়নিক ভাবতে লাগলাম। লোকটা বলল, ‘হে ম্যান! একটা আলপিন দিতে পারো?’
আমি বললাম, ‘অ্যালপিন কি কাজে লাগবে?’
সে বলল, ‘আলপিন টু এলিফ্যান্ট’ সবই আমাদের কাজে লাগে। তবে এলিফ্যান্ট চেয়ে পাওয়া যায় না, কেউ ব্যাগে রাখে না আজকাল সে আমি জানি। এই ট্রেনে যত ছারপোকা আছে সব এক জায়গায় করলে কয়েক গ্যালন রক্ত হবে। সব রাশিয়ানদের রক্ত। বুঝতেই পারছেন, আমেরিকায় এর কদর আছে।’
—কি করে ওরা এ দিয়ে?
—কিছু করে না। আসলে এইসব কীড়া বা বেডবাগ সব আমেরিকান খটমলের বংশধর। সি. আই. এ.-র এজেন্টরা কোটি কোটি ছারপোকা ছেড়ে গেছে রাশিয়ায়।
লোকটার কথাগুলো বিশ্বাস হল না বটে তবে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কি করেন?’
কাফ্রিটা বলল, ‘বলা নিষেধ আছে।’ কথাটা বলে একেবারে ইবলিশের মতো হাসতে লাগল। কালো চেহারায় সাদা দাঁত মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ চমকের মতো চকচক করছিল।’
রুবি জানতে চাইল, ‘ইবলিশ’ মানে কি ‘আব্বুলিশ’ আর ‘উজবুক’ শব্দটা কি উজবেকিস্তান থেকে আমদানি করা?
রনেন বলল, ‘ইবলিশ মানে ডি লা গ্র্যাণ্ডি সেফিস্টোফিলিস তাই না?’
পটাদা বলল, ‘উজবুক জিনিসটা একদম বঙ্গভূমির একান্ত নিজস্ব মৌলিক কনট্রিবিউশন। উজবেকদের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’
আমি বললাম, ‘গল্পে বাধা দিস না তো তোরা।’ পটাদা আবার শুরু করল।
তারপর কাফ্রিটা আমায় বলল, ‘শুধু এইটুকু শুনে রাখুন আমার পিছনে কেজিবি-র চর লেগেছে। ঐ মঙ্গোলিয়ান লোকটা হল একজন বেতনভুক টিকটিকি। ওর কাজ হল রাশিয়ার খাল-বিল থেকে মশা-র লার্ভা কীট সংগ্রহ করে এজেন্ট মারফৎ আমেরিকার খানা ডোবা-র মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসা। এখন কথাটা হল এদের হাত থেকে একমাত্র আপনিই আমাকে রক্ষা করতে পারেন।’
ঐ রকম দশাশই লোকটাকে একমাত্র আমিই রক্ষা করতে পারি শুনে ভারতবাসী হিসেবে গর্বিত বোধ করলাম। ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিভাবে?’
কাফ্রিটা বলল, ‘আস্তে, শুনে ফেলবে। সি.আই.এ. যদি বুনো ওল হয়, কে.জি.বি.-ও বাঘা তেঁতুল। ওদের সম্পর্ক সাপে-নেউলে।’ তারপর লোকটা পকেট থেকে ঠোঙায় মোড়া একটা জিনিস বের করল। আমি জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলাম। কাফ্রিটা বলল, ‘ইউরেনিয়াম ফোর টোয়েন্টির নাম শুনেছেন?’
আমি বললাম, ‘এরকম হয় না। ২৬৪ হয়।’
কাফ্রিটা বলল, ‘কিন্তু হয়েছে, দেখতেই পাচ্ছেন। এ অতি উন্নতমানের বিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম। ভারতবর্ষের বিহার ছাড়া একমাত্র জিম্বাবোয়ের জঙ্গলে পাওয়া যায়। রাজা সলোমনের প্রাসাদের সন্ধান করতে গিয়ে অ্যালকেমিস্টরা এর সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু উদ্ধার করতে পারে নি। কেননা, সেখানে নরখাদকরা বসবাস করে।’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?’
কাফ্রিটা বলল, ‘আমাকে সেখানে যেতে হয়েছিল। মানে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম আর কি। যে কথা মনে পড়লেও আজ গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।’
কাফ্রিটার মতো বুচারের গায়েও কাঁটা দেয় শুনে অবাক হলাম। জানতে চাইলাম ওর অভিজ্ঞতার কাহিনীটা।
কাফ্রিটা বলতে শুরু করল, ‘তখন সেকেণ্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার চলছে। ভেনেজুয়েলার তেলের খনি ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সোনার খনিতে কাজ করছি। সেইসময় ওপর মহল থেকে আদেশ এল আমাকে পেন্টাগন যেতে হবে। আমার এই চেহারায় এমন কিছু আছে যা তাদের খুব প্রয়োজন। গিয়ে যা শুনলাম তার মোটামুটি সারসংক্ষেপ এই, আমাকে ওরা আদিবাসী সাজিয়ে জিম্বাবোয়ের জঙ্গলে নামিয়ে দেবে। ওখানে গিয়ে ওদের সঙ্গে আমায় মিশে যেতে হবে। সব সুলুক সন্ধান জেনে কাজ হাঁসিল করে তবে ফেরার ভাবনা নচেৎ ওদের পেটের মধ্যে নিজেকে জলাঞ্জলি দেবার কথা ভাবাই ভালো। পেন্টাগন থেকে এই হল নির্দেশ। আমার ঘাড়ে এক্সট্রা মাথা নেই যে ঐ আদেশ অগ্রাহ্য করি। চেপে বসলাম একটা বোমারু বিমানে। হলিউডের একজন মেকাপ আর্টিস্ট এল রঙের বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে। পাতার পোশাক পরাল। নিতান্ত লজ্জা নিবারণ যাকে বলে। মুখ-চোখ-গা-হাত-পা-পিঠ সব জায়গায় দু-চার কোট রঙ চাপাল। আয়নায় নিজেকে দেখে চিনতে পারছিলাম না। ভয়ে চমকে উঠলাম। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল ‘আমি কে?’ মেজর জেনারেল বললেন, ‘আজ থেকে তোমার নাম ‘ইয়া ইয়া-হো-হো’ সোনা।’ তারপর আমার হাতে একটা বর্শা ধরিয়ে দিল। নির্দেশ পেলাম চাঁদনী রাতে ওরা যখন দল বেঁধে জলাশয়ের ধারে আসব পান করে নাচবে তখন সুট করে ওদের দলে ভিড়ে যেতে। নাচের মুদ্রাও আমায় প্রশিক্ষণ দিয়ে দিল পেন্টাগনের ড্যান্স বিশেষজ্ঞ। তারপর ঘন জঙ্গলের ওপর রোমারু বিমানটা তার তলার খোল দিয়ে আমায় ছেড়ে দিল প্যারাশুটে চাপিয়ে। প্যারাশুট হাওয়ার মর্জি অনুসারে আমায় নিয়ে গিয়ে নামাল একটা বিশাল উইলো গাছের মাথায়। ক্লান্তিতে ঘুম এসে গিয়েছিল আমার। ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঝকঝকে রৌদ্রকিরণে ঘুম ভেঙে গেল। সঙ্গে খিদেয় মোচড় দিয়ে উঠল পেট। ওরা সঙ্গে আমায় কোনো খাবারই দেয়নি। দেখলাম গাছের মাথা থেকে কি একটা গাছের ডালের মতো অনেকদূর চলে গিয়েছে। ওর ওপর দিয়ে সিকি মাইল হাঁটার পর ভয়ে গা শিউরে উঠল। বুঝলাম, আমি যার ওপর দিয়ে হেঁটেছি ওটা একটা পাইথন। অর্থাৎ ময়াল সাপ। আমি তার মুখের নাগালে গিয়ে পৌঁছেছি। প্রাণের মায়া ছেড়ে লাফ মারলাম সেখান থেকে। যেখানে পড়লাম সেটা একটা পরিখা। গহিন জঙ্গলের মধ্যে পরিখার অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিল ওখানে প্রাচীনকালে সভ্য মানুষের বসবাস ছিল। বহির্দেশীয় আক্রমণ রুখতে তৎকালে নগরের চতুর্দিকে নদী থেকে খাল কেটে এনে পরিখা বানানো হত। একটা তেজীয়ান আরবি ঘোড়া সর্বাধিক যতখানি লাফাতে পারে তার চেয়ে একটু বেশি হত পরিখার প্রস্থ। আমি সাঁতরে পার হলাম জায়গাটা। কিছুদূর গিয়ে নজরে পড়ল একটা জঙ্গলাকীর্ণ প্রাচীর এবং তার পৃষ্ঠদেশে একটা চিতাবাঘের মুখ যেখান দিয়ে জল নিষ্কাশিত হত। বুঝতে পারলাম ঠিক জায়গাতেই এসেছি। সে নয় হলো, কিন্তু পেটশান্তির আয়োজন করি কিভাবে? আগুন নেই যে পশুপাখি মেরে পুড়িয়ে খাব। দেখতে পেলাম একটা গাছ। থোকা-থোকা মাদ্রাজী ওলের মতো ফল ঝুলছে। একটা পেড়ে টেস্ট করে দেখলাম। চমৎকার সুস্বাদু। একদম পান্তুয়ার মতো খেতে। তার পাশেই আরেকটা গাছে চতুষ্কোণ একরকম ফল ঝুলছে। একটা ছিঁড়ে নিয়ে মুখে চালান করে দিলাম। একদম চিকেন প্যাটিসের মতো টেস্ট। নিরামিষ চিকেন ছাড়া ওটাকে আর কিছু বলা চলে না। বোঁদের মতো একরকম ফলও দেখেছি। ওগুলো দিয়ে বুনো ভল্লুকেরা ব্রেকফাস্ট সারে। শাঁকালুর মতো একরকম ফল যেগুলো হামেশাই বন্য শুকরদের খেতে দেখেছি। খাবার দুশ্চিন্তা গেল। এবার পানীয়ের সন্ধানে ঘুরতে লাগলাম। কোনো ঝরনা বা উনুই-টুনুই চোখে পড়ল না। তবে যেখানটায় দাঁড়িয়ে জলের চিন্তা করছিলাম তার উল্টোদিকে দেখি একটা গাছতলায় জলের মতো কি জিনিস বনবেড়ালে চেটে চেটে খাচ্ছে। শুনেছি বেড়ালে ভালো জিনিস ছাড়া খায় না। গাছের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বোতলের মতো শক্ত কি জিনিস ঝুলছে। এত শক্ত যে বোঁটা থেকে কিছুতেই আলগা করা যায় না ফলটাকে। যাই হোক, টানা-হেঁচড়া করে বোতলের মতো জিনিসটাকে তো নামালাম। কিন্তু ছিপি আঁটা ফলটার গায়ে দেখি এক্সপায়ারি ডেটসহ স্ট্যাম্প মারা আছে। ‘মেড ইন ইউ এস এ।’ মজার ব্যাপার, ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম গাছের ডালে ছিপি খোলার ওপেনার পর্যন্ত ঝুলছে। খুললাম ছিপিটা। ভিতরে পানীয় টলটল করছে। বেড়ালের লেহন করা দেখে যা অনুমান করেছিলাম তাই। গলায় ঢেলে সেটা টের পেলাম একদম কোকাকোলার মতো খেতে। আপনাদের দেশে যেমন ডাবের মধ্যে জল হয়, সেইরকম আর কি। গাছেরাও পিছিয়ে নেই বুঝলাম।
রুবি মুখে কিছু বলছে না। চোখদুটো সরু করে বসে আছে। পটাদা থামলে সে বলল, ‘ফলের গায়ে স্ট্যাম্প মারা আছে মেড ইন ইউ এস এ আর সেটা কোকাকোলার মতো খেতে, তাও আবার নরখাদকের দেশে? চমৎকার! তোমার মুখে ফুল চন্দন পড়ুক।’
পটাদা বলল, ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।’
রনেন বলল, ‘কাফ্রিটার সঙ্গে কোলাকুলি করনি পটাদা?’
‘কেন, কোলাকুলির প্রশ্ন উঠছে কেন?’
‘না মানে ওটা সেয়ানে-সেয়ানেই হলে ভালো তাই বলছিলাম।’
পটাদা বলল, ‘থাকগে গল্প বলে আর কাজ নেই। নিচে খবর পাঠিয়ে দে ধোসাও খাব না।’
রুবি বলল, ‘প্লিজ! পটাদা বাকিটা শুনি।’
রনেন বলল, ‘এই রুবিটা বাগড়া স্পেশালিস্ট।’
আমি বললাম, ‘পটাদা আমি কিন্তু তোমার গুণমুগ্ধ শ্রোতা আর ওদের বলতে পার খরস্রোতা।’
‘হ্যাঁ, খরস্রোতা বলতে মনে পড়ল। ঐ পরিখার জলে স্রোত ছিল। তা দেখে কাফ্রিটা অনুমান করেছিল কাছাকাছি বড়ো নদী আছে। নদী আছে মানে সে একটা কাঠের ডিঙি নৌকা বানিয়ে ভেসে পড়তে পারবে। টানা সাতদিন ঘুরে ঘুরে সে একটাও মানুষেরও টিকি খুঁজে পেল না। কিন্তু একদিন একটা পাথরের ওপর ইয়েতির পায়ের ছাপ দেখতে পেল। পা যদি একফুট হয় তবে মানুষটার উচ্চতা হবে আট-নয় ফুট। এবং সেটা ইয়েতি ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। এরপর কাফ্রি ভদ্রলোক নৌকো বানাবার কাজে লেগে পড়ল। ক্ষিদে পেলে নিরামিষ খাবার দাবার খায় আর সারাদিন নৌকো বানাবার কাজ করে। ইতোমধ্যে মাথা গোঁজবার জন্যে সে হোগলা পাতার ছাউনি দিয়ে একটা ঘর বানিয়ে নিয়েছে। অবসর সময়ে সে নদীটাকে খুঁজে বেড়ায় পালাবার জন্য।
কিন্তু একদিন রাত্রিবেলায় ঘুমের ঘোরে সে দ্রিদিম-দ্রিদিম আওয়াজ পেল। রণভেরীর মতো ধ্বনিমাধুর্য। রণদামামাও বলা যায়। সে ভাবল, এখানে আবার যুদ্ধ বাধাতে এল কে? আমেরিকা নাকি? শব্দের উৎসের দিকে কান পেতে সে গুটি-গুটি পায়ে এগোতে লাগল। সেখানে পৌঁছতে ভোর হয়ে গেল তার। গিয়ে দেখল ঐ বাজনার সাথে আট ফুট উচ্চতার কিছু লোক নাচছে। তবে তাকে যে নাচ শেখানো হয়েছে সে নাচ নয়। বেলি ড্যান্স। কাফ্রিটা গিয়ে বসে পড়ল দর্শকের আসনে। বালির তটের মাঝখানে মস্ত আগুন জ্বালিয়ে ওরা নাচছিল চারপাশে ঘুরে ঘুরে। হঠাৎ সর্দারের অঙ্গুলিহেলনে নাচ থেমে গেল। সে বলল, ‘আমি বলেছিলাম, এই ট্রাম্পেটের আওয়াজ কখনো বৃথা যায় নি। ঠিক একজন সভ্য মানুষকে টেনে আনতে সক্ষম হবে। যাকে দিয়ে আমাদের আজকের ব্রেকফাস্ট সুচারু রূপে সমাধা হতে পারবে। কাম ইন ফ্রন্ট অফ মি ইয়াং চ্যাপ। হোয়াট ইজ ইওর নেম?’
বাকিটা কাফ্রির বয়ানেই শোনা যাক।
—মাই নেম ইজ ইয়া ইয়া হো হো।
—ইয়াপ। ইট সিমস টু মি দিস ইজ ইওর পেন-নেম।
ওকে। ঝলসে নেবার আগে আমরাও একটা নতুন নাম দিয়ে থাকি। কাজটা এগিয়ে রয়েছে দেখে খুশি হলাম।
—কিন্তু আমি জলযোগের দ্রব্য হতে ইচ্ছুক নই।
—নও? তুমি তো বেশ নতুন কথা শোনালে ভায়া। তা জানতে পারি কিসে ইচ্ছুক?
—বলা নিষেধ আছে।
—অ। তা ভালো। নিষেধ থাকা ভালো। এই মদনা আমার ল্যাপটপটা নিয়ে আয় তো।
মদন বলে ছেলেটি দৌড়ে গিয়ে ল্যাপটপ কম্পিউটারটা এনে হাজির করল। আমার তো চক্ষু ছানাবড়া। মদন ছেলেটি এদেশে কাজ না পেয়ে ওখানে কাজে লেগেছে।
রুবি বলল, ‘নরখাদকের কোলে কম্পিউটার? আমি চলি।’
রনেন তাকে ধমক দিয়ে বলল, ‘আঃ! বাধা দিস না। তুমি বলো তো পটাদা।’
কম্পিউটার কোলে নিয়ে সর্দার বললেন, ‘এ পর্যন্ত কতজন ইউরেনিয়ামের সন্ধানে এসে প্রাতরাশের মেনু হয়েছে তার সম্পূর্ণ তালিকা আছে। পেন ড্রাইভে তুলে দিচ্ছি। দেশে নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারবে। তবে তার আগে একটা জেনারেল অ্যাপ্টিচ্যুড টেস্ট নেব। উতরোতে পারলে তবেই দেশে ফেরা। নচেৎ উদরেণ সমাপয়েৎ। দুটো কবিতা বলব, কোন ছন্দে লেখা বলতে হবে।
কবিতা: এক
দৌড় দৌড় খালি দৌড় হজমের যম ওজনের দফারফা পালিশের মোম।
কবিতাটিতে কোন ছন্দমিল ব্যবহার করা হয়েছে?
—আঁজ্ঞে ট্রেডমিল।
—রাইট! তোমার শরীরের অর্ধেক বেঁচে গেল। বাকি প্রশ্নটা যদি না পারো তবে দেহের ওপরতলা কাটবো না নিচের তলা সেটা পছন্দ করার স্বাধীনতা তোমার। ওকে?
কবিতা: দুই
ভাত খাই ডাল খাই
অধিক ছড়াই মাঠে।
আনন্দপাঠে নাচি
শনৈ: শনৈ: ভাই।
উপরোক্ত কবিতাটিতে কবি কোন ছন্দমিল প্রয়োগ করেছেন?
—আঁজ্ঞে এটা নিশ্চয় মিড-ডে মিল।
—সাবাশ! এ যাত্রায় বেঁচে গেলে। তবে শুনে রাখো আমাদের দেশে মুদি দোকানে ইউরেনিয়াম পাওয়া যায় আর এখানকার হাপ্পু পরা ছেলেরাও পরমাণু বোমা বানাবার ফর্মূলা জানে। কিন্তু এটা আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে কাজে লাগাই। কাঠের নৌকোটা নিয়ে ভালোয়-ভালোয় কেটে পড়ো আমাদের পুরোপুরি ক্ষিদে পাবার আগে। আর হ্যাঁ, তোমার কাব্যজ্ঞান দেখে আমরা পরম সন্তোষ প্রকাশ করছি। তাই উপঢৌকন হিসেবে ২৫০ গ্রা. ইউরেনিয়াম৪২০ তোমায় উপহার দিলাম। মদনা প্যাকেটটা ওর হাতে ধরিয়ে দে তো।
‘এই সেই ইউরেনিয়াম।’ কাফ্রি তার কাহিনী শেষ করল।
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আমায় কি করতে বলছেন?’
কাফ্রিটা বলল, ‘এটা নিয়ে আপনি হিথরো এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমাদের লোক আপনাকে ঠিক সনাক্ত করে নেবে। আমি চললাম।’
ইউরেনিয়ামের ঠোঙাটা আমার কোলে ফেলে রেখে কাফ্রিটা কেটে পড়ল। আমি পড়লাম মহা বিপদে। ওটা নিয়ে কি করি এখন? যদি কে.জি.বি.-র চর এসে ধরে তাহলেই বুদ্ধি শেষ। ভাবতে ভাবতে একটা উপায় বেরোল। মোজার ভেতর ওটাকে গুঁজে সোজা দেশে ফিরে এলাম। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।’
—তারপর ওটা কি করলে, আছে এখনো?
—না। কাজের লোকটা ওটা দিয়ে বাসন মেজে ফেলেছে।
রুবি বলল, ‘ইউরেনিয়াম দিয়ে বাসন মাজতে দিলে?’
রনেন বলল, ‘দাঁত যে মাজেনি এই আমাদের সাতপুরুষের ভাগ্যি।’
পটাদা বলল, ‘ওটা ইউরেনিয়াম ছিল না। আমি দেখেছি পাতি ডিটারজেন্টের গুঁড়ো।’
রুবি বলল, ‘যারা পোশাকই পরে না তারা ও দিয়ে কি করে?’
পটাদা বলল, ‘সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন। অনেক ভেবেছি বিষয়টা নিয়ে। কিন্তু উত্তরের কোনো কূল-কিনারা পাইনি।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন