হিরণ্ময় ভট্টাচার্য
গোপেন দারোগা ঝিমোচ্ছিলেন। তবে নাক ডাকাডাকি এখনো শুরু হয়নি। ওটা শুরু হবার অপেক্ষায় থাকে পটলা। কেননা, তামুকের পাউচপ্যাকটা আলমারির ওপরে রাখা থাকে। তার ওপর আবার নাসিকা ধ্বনির কম্পাঙ্কের বাড়া-কমার ওপর কান সজাগ রাখতে হয়। যখন আওয়াজটা মিহি হবার দিকে তখন হেলে পড়া মুন্ডুটাকে সোজা করে দিতে হয়। ঝিম ভাব থেকে নাক ডাকা পর্যায়ে প্রমোশন হতে দশ বিশ মিনিট টাইম নেয়। আর তারপরই পটলা নিশ্চিন্তে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আয়েশ করে ধুমপান করে। আর অপরিচিত লোক এলে তার ওপর দারোগা গিরি ফলায়।
সেদিন একটা লোক এল বেশ সন্দেহজনক চেহারার। অন্ততঃ পটলার চোখে। লোকটার কেমন জানি হাব-ভাব। গায়েগতরে বেজায় হালকা আর চাউনিটা চোরাগোপ্তা। লোকটা এসে বলল, ‘গোপেন দারোগার সাথে দেখা করতে চাই।’
পটলা মুরুব্বি চালে মাথা নেড়ে বলল, ‘হবে না।’ লোকটা মাথা চুলকে বলল, ‘কিন্তু আমার যে খুব দরকার।’ পটলা জানতে চাইল, ‘নাম কি?’
লোকটা বিনয়ের সাথে উত্তর দিল, ‘অধমের নাম পটকা।’ চমকে উঠল পটলা। মনে হল, লোকটা মিথ্যেও বলতে পারে।
—প্রমাণ দিতে পারো তুমিই পটকা?
—আঁজ্ঞে না। এখানে প্রমান করার সুযোগ নেই।
—তুমি দাবি করছ তুমিই কুখ্যাত সিঁদেল বাজি’র শিষ্য পটকা ?
—জী হুজুর।
—আই কার্ড আছে ?
—আঁজ্ঞে আমাদের পেশায় ওসবের বন্দোবস্ত নেই।
—তা গোপেন দারোগার সাথে কি দরকার ?

...কিসের অভিযোগ?
—আজ্ঞে দেখা করতে চাই।
—বললাম তো দেখা হবে না।
—আমিও তো বললাম, আমার খুব দরকার।
—যদি বলি আমিই গোপেন দারোগা?
—তা বলেন, ক্ষতি নেই। কিন্তু বিশ্বাস করা না করাটা তো আমার ওপর।
কথাটা বলে একটা গলা খাঁকারি দিল পটকা।
—বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি? এখন আমি সিবিল ড্রেসে আছি। ডিউটি অফ।
গোপেন দারোগার ঝিমুনি চটকে গেল আগন্তুক লোকটার গলা খাঁকারির শব্দে।
—কে রে পটলা?
পটলা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেল। ধরা পড়ে যাচ্ছিল আর কি।
—এক জন ভদ্রলোক সার।
—কি নাম?
—বলছে পটকা।
—কত ডেসিবেল?
—বুঝলাম না সার।
—শব্দ হয়?
—মানুষের আবার শব্দ কি হবে হুজুর?
—ও মানুষ! তাই বল। কি নাম বললি?
—আঁজ্ঞে পটকা। নাম শোনেননি বুঝি?
—উহু, এ নামে তো কোন ভদ্রলোক হতে পারে না। ভালো করে দেখেছিস মানুষ কিনা?
—হুজুর মানুষ বলে ভ্রম হওয়া কি চোখের অসুখ?
—তুই নিজেই তো গোটাটাই একটা অসুখ। লোকটাকে ডাক।
—আমি কার অসুখ?
—কার আবার, আমার। আগে ডাক লোকটাকে।
পটলার ডাকে লোকটা এল। তার পরনে চেককাটা লুঙ্গি আর স্যাণ্ডো গেঞ্জী। তার মুখমণ্ডলে জরুল বা কাটাদাগ কিছুই নেই। তবে একটা চোখ ঈষৎ বড়ো। আর চোখের মনি সবজে রঙের। লোকটা উবু হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসল। গোপেন দারোগা মুখ খুললেন।
—নামটি তো শুনলাম পটকা। বেড়ে নাম। তা ফাটাফাটি করার ব্যামো আছে নাকি? পটকা তো ফাটে।
—আঁরে না ছার। ফাটাই নে কিছু, সরাই।
—কি সরানো হয়?
—সে কথা বলি কোন মুখে? আমার যে একটাই মুখ।
—তা থানায় আসা হয়েছে কি জন্যে?
—আঁজ্ঞে একটু অভিযোগ ছিল ছার।
—কিসের অভিযোগ?
—বাটপাড়ির।
চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিলেন গোপেন দারোগা। সময়মতো পটলা চেপে না ধরলে কি ঘটত বলা মুশকিল।
—কিন্তু বাটপাড়ির আগে তো ‘চুরি’ নামে একটা কথা থাকে।
—আঁজ্ঞে সেটাই আমার কাজ। অর্থাৎ পেশা।
ষোল দুগুণে বত্রিশটা দাঁত উন্মোচন করে হাসলো পটকা। দুনিয়ায় এ কোন যুগ পড়ল রে ভাই! চোর এসেছে বাটপাড়ের বিরুদ্ধে নালিশ জানাতে। হায় খোদা!
—কিন্তু তুই যে চোর তার তো একটা বিহিত হওয়ার দরকার সবার আগে। সেটার কি হবে?
—আমি যে চোর এ কথা চন্দ্র-সূর্যের মতোই সত্যি ছার। তবে তাতে আমার লাভটা কি হল? যে সব জিনিসপত্র ঝেপে আনছি তা তো হাপিস হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি। এই সেদিন রতন কোলের হাতবাক্স থেকে ঘড়িটা সরিয়ে এনে নিজের বাড়ির টেবিলে রাখলাম। আধঘন্টা টাক পরে দেখি জিনিসটা হাওয়া। একটা ঘড়ির বড়ো দরকার হয়ে পড়েছে আমার। আঁধার রাতে টাইম মিলিয়ে কাজ না করলে ভুলচুক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখন যেন মনে হচ্ছে ঐ বাটপাড়টা আমায় চাকর রেখেছে। আমি মেহনত করে দুধ জ্বাল দেব আর সে পায়ের ওপর পা তুলে সর খেয়ে যাবে। এ হতে দেওয়া যায় না ছার। এ বড়ো অন্যায়।
—চুরি করাটা অন্যায় নয় বলতে চাস?
—বাটপাড়ি ডবল অন্যায় ছার। আমায় যদি পঁচিশ ঘা জুতো মারেন ওটাকে তবে পঞ্চাশ ঘা মারা উচিৎ। চোরের চাইতে বাটপাড়ের কদর বেড়ে গেলে আমরা বিপাকে পড়ব ছার। আমাদের পেশায় পলিটিকস শুরু হয়েছে সেটাই আপনাকে জানাতে এসেছি। চুরি-ছ্যাঁচড়ামির মধ্যে পলিটিকস আমদানি করা কি ভালো বলেন ছার?
—বাটপাড়টা দেখতে কেমন?
—তা কি করে বলব ছার? আমি তো তাকে দেখিনি। তবে সেদিন দেখলাম রতন কোলে চুরি যাওয়া হাতঘড়িটাই হাতে পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুনীল দর্জি তার চুরি যাওয়া কাঁইচি দিয়ে কাপড়ের থান কাটচে। ছেলে বিনোদ তার চুরি যাওয়া হামাল দিস্তাতেই পান ছাঁচছে। বলেন, এরকম হওয়া কি নেয্য? তাহলে চুরির কি মানে রইল?
—কথাটা হবে হামান দিস্তা। সে যাই হোক, আমার পনেরো বছরের চাকুরি জীবনে তো এরকম কথা শুনিনি রে বাপু। তাহলে কি তুই বলতে চাস তুই চুরিগুলো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নের মধ্যে করিস?
—না ছার! আমি গায়ে চিমটে কেটে দেকিচি আমি সত্যি সত্যিই চুরি করি।
—তবে এরকম হচ্ছে কি করে, যার জিনিস তার কাছেই ফেরৎ যাচ্ছে। হাতঘড়ি কাঁচি, হামান দিস্তা এসবের হাত-পা গজিয়েছে নাকি। কোনো কোনো বেড়াল-কুকুর-পাখি মনিবের কাছে ফিরে যায় শুনেছি। কিন্তু ঘড়ি দ্রব্যটা পাখি নয় নিশ্চয়। তার ডানা নেই তাই না?
—ব্যাপারটা অমন সহজভাবে ধরবেন না ছার। এর মধ্যে প্যাঁচ আছে। প্যাঁচালো ব্যাপার।
—তুই তাহলে বলতে চাচ্ছিস কোনো প্যাঁচাতে এই কাজ করছে?
—প্যাঁচা কিনা জানিনা ছার। তবে লোকটা ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ কচ্চে। যার এমন মাথা সে অনায়াসে দেশের দশের একজন হতে পারে। বোধহয় কেউ তাকে সুযোগ দিচ্ছে না।
—খুলে বল দিকি আর কি জানিস?
—ছার হারান সামন্ত’র দোকানে চোরাই মাল পাওয়া যায়। আজকাল চুরি হলে কেউ আর হা-হুতাশ করে না। থানা-টানা থাকার দরকারই নেই। সবাই চুরি হবার পরদিন হারানের দোকানে চলে যায়। উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করে নিজের মালটা ফেরৎ নিয়ে চলে আসে।
—তাহলে বলছিস হারান সামন্তকে অ্যারেস্ট করা উচিৎ?
—উচিৎ নয় ছার। ও তো চুরি করে না।
—তাহলে তোকে লক আপে পুরবো?
—আমি যে চোর তার তো কোনো প্রমাণ আপনার হাতে নেই। তাহলে খামোকা আমাকে অপদস্থ করা কিসের ভিত্তিতে?
—যুক্তিটা সঠিক। তোর মাথাটা বেশ পরিস্কার। আচ্ছা চুরি করিস কেন বল তো?
—আমরা চুরি না করলে আপনার যে কোনো মানে থাকে না ছার। ক্যালি দেখাবেন কোথায়?
—তা বটে! তাহলে আমায় তুই কি করতে বলিস?
—হারানকে জেরা করেন ছার। সুড়সুড় করে বাৎলে দেবে বাটপাড়ের ঠিকানা। তারপর ওকে কড়া ভাষায় ধাতানি দিয়ে দেন যাতে আমাদের কাজে হস্তক্ষেপ না করে। যার কাজ তারেই সাজে।
—আমি তোর মাইনে করা চাকর নাকি রে, যা বলবি তাই শুনবো?
—এ ছাড়া উপায় কি ছার?
—ঠিক আছে এখন যা। ঠিকানাটা দিয়ে যা তোর। তারপর আমি দেখছি কত চালে কত চাউমিন। আমার নামে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল খায় জানিস?
—বাঘ কোথায় পাচ্চেন ছার? বরং বলেন, গোরু-ছাগলে এক নালায় জল খায়। নদীও শুকিয়ে গেচে, পুস্কনিও প্রোমোটারে বুঁজিয়ে দিয়েছে।
—কথাটা হবে পুস্করিনী। ঠিক আছে তুই যা। আই হ্যাভ টু টেক এ ন্যাপ। ‘ন্যাপ’ মানে জানিস?
—জানব না কেনে ছার? ন্যাপ মানে ল্যাপ। কাঁথা-কম্বলের ভায়রাভাই। সরেস জিনিস।
—বেরো এখান থেকে গণ্ডমূর্খের দল। আমার ভাতঘুমটা মাটি করতে এসেছে। গেট আউট ফাজিল কোথাকার!
পটকা গাত্রোত্থান করল। তারপর দ্রুত পদসঞ্চারে হাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু গোপেন দারোগার মাথায় গোল লাগিয়ে দিয়ে গেল। গোপেন দারোগা গোঁফ চুমড়ে বললেন, ‘পটলা’।
—জী হুজুর!
—বুদ্ধির গোড়ায় ধুঁয়ো দিয়েছিস?
—দিয়েছি জনাব।
—মাথা খুলবে?
—খুলবে জাঁহাপনা।
—যাত্রাপালা দেখে এইসব বচন শিখেছিল তাই না?
—আঁজ্ঞে! ধর্মাবতার।
—এমতাবস্থায় কি করা যায় বল তো?
—কাগজে বিজ্ঞাপন দেন।
—কি বিজ্ঞাপন দেব?
—নতুন সরকারী সার্কুলার অনুযায়ী চোরেদের নিজগুনে ধরা দেবার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানানো হচ্ছে। বিজ্ঞপ্তি লঙ্ঘন করিলে কঠোর জরিমানা হইবেক।
—হইবেক?
—জী হুজুর!
—তোর মাথা! ধূমপানে তোর বুদ্ধি আরো ধেবড়ে যায়। তোর কি আদৌ কোনকালে বুদ্ধিশুদ্ধি বলে কোনো পদার্থ ছিল বলে মনে হয়? তোর বাপকে জিজ্ঞেস করিস তো?
—স্যার আপনি করেছিলেন?
—কি?
—নিজের পিতাকে জিজ্ঞাসাবাদের কথাটাই বলচি স্যার।
—অনেক মানুষের জানিস তো বিন্দুমাত্র সুবুদ্ধি থাকে না। কিন্তু ষোলআনা কুবুদ্ধি থাকে। তোরা হলি সেই জাতের। বোঝা গেল কিছু?
—গেল স্যার!
—কি বুঝলি?
—আপনি এখন ঘুমোবেন স্যার। নাকে দু-ফোঁটা বাদাম তেল দিয়ে দিই?
—যা যা, মেলা বকিসনে। আমায় ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে ভাবতে দে।
কিন্তু আজ গোপেন দারোগার কপালে নিদ্রা নেই। ঝনঝন করে বেজে উঠল থানার ল্যাণ্ডলাইন ফোনটা। পটলা রিসিভারটা তুলে গোপেন দারোগার হাতে দিল।
—হ্যালো! গোপেন মাহান্তি স্পিকিং।
—কেসটা কিভাবে হ্যাণ্ডেল করবি ভাবছিস?
—উপেন নাকি?
—ঠিক ধরেছিস। কেসটা নিয়ে কিছু ভাবলি?
—কোন কেসটা?
—পটকার।
—তুই জানলি কি করে?
—জানতে হয় ব্রাদার। নাহলে কাজ-কাম চালাব কি করে?
—তাহলে বাটপাড়িটা তুইই করছিস?
—তুই এতক্ষনে বুঝলি?
—কিন্তু এতে তোর ফায়দাটা কি হচ্ছে?
—ফায়দার জন্যে নয়। চুরিটা করি নেশায়। মগজের ঘিলুতে যাতে মরচে না পড়ে।
—আমি হারান মাইতির দোকান সার্চ করে সব মাল বাজেয়াপ্ত করব। ওকে লক আপে পুরে জেরা করব চোরাইমাল বিক্রির অপরাধে।
—হারান মাইতি আর হারান সামন্ত দুটো কিন্তু আলাদা লোক। হারান মাইতি খড়-বিচুলি বিক্রি করে। হারান সামন্তর মনিহারি দোকান। হারান মণ্ডলও আছে। দাদ-হাজা-চুলকানির মলমের কারবার। জেনে রাখ, এই এলাকায় হারান তিনজন, পরান পাঁচজন, নিতাই সাতজন, কানাই গোটা আষ্টেক, গোপেন দু-জন। শুধু উপেনই একমেবাদ্বিতীয়ম।
—গোপেন আরেকজন কে?
—গোপেন তলাপাত্র। বাড়ি ঘুরে-ঘুরে উঁইপোকা মারে।
—উঁইপোকা মারতে লোক লাগে নাকি?
—মশা মারতেও তো কামান দাগতে হয়। উঁই, মশা এদের আণ্ডার এস্টিমেট করিস না।
—মওকা পেয়ে জ্ঞান দিচ্ছিস?
—দিতে হল। উপায় কি? তোকে অঙ্কের উত্তর বলে দিচ্ছি। অঙ্কটা কষে দেখা।
—উত্তরটা কি?
—বাটপাড়ের নাম উপেন্দ্রনারায়ন চাকলাদার।
ফোনের লাইনটা ওদিক থেকে কেটে গেল। গোপেন দারোগা পড়লেন মহা বিপাকে। দেশে ফেরা ইস্তক দেদার ঝামেলা পাকাতে শুরু করেছে উপেন।
‘পটলা ড্রাইভারকে ডাক’। হাঁক পাড়লেন গোপেন দারোগা। জিপ গাড়িতে চাপলেন গোপেন। পথে নজরে পড়ল দুলকি চালে হেঁটে আসছে রতন কোলে। সোনালী ব্যাণ্ডের রিস্টওয়াচখানা হাতে ঝকঝক করছে। গাড়িটা থামালেন তিনি। ডাকলেন রতনকে। রতনের হাতে একটা বেতের ঝুড়ি।
—ওহে রতন, একটু ইদিকে এসো দিকি। চললে কোথায়?
—আঁজ্ঞে স্যার, ঘাস কাটতি।
—যাচ্ছো ঘাস কাটতে হাতে দিব্যি একখানা ঘড়ি। তুমি কি ট্রেনে চেপে ঘাস কাটতে যাও?
—না স্যার! একদম টাইম মেপে ঘাস কাটতি হয়। বাবুদের যেমন দশটা-পাঁচটা টাইম মাপা আছে। আমাদেরো তেমন।
—তা তোমার ঘড়িটা নাকি চুরি গিয়েছিল?
—তা গিয়েছিল। কিন্তু ও নিয়ে আপনার মাথা ঘামানোর দরকার কি?
—কেন, মাথা ঘামাবোনা কেন?
—মাল তো ফেরৎ পাচ্ছে সবাই।
—হ্যাঁরে রতন, তাহলে আমরা আছি কি করতে?
—সে আপনারাই জানেন স্যার কি করতে আছেন। তার আমি কি জানি।
—তুই ঘোড়ার ঘাস কাটিস না গোরুর?
—না স্যার, ছাগলের জন্যি।
সুনীল দর্জির দোকানের সামনে ঘ্যাঁচ করে গাড়ি থামালেন গোপেন দারোগা। একটা লম্বা মতন সিড়িঙ্গেপানা লোক ঝগড়া করছিল সুনীল দর্জির সাথে।
—তোমার মাপ ঠিক হয়না। প্যান্টের কোমর কেন ঢিলে হয়ে যাচ্ছে?
—তুমি রোগা হয়ে গেলে আমি কি কত্তি পারি। ওদিকে চম্পক দলুই তো অভিযোগ জানিয়ে গেল তার প্যান্টের কোমর আঁট হয়ে যাচ্ছে। তোমরা ফিগার ধরে রাখতে পারবানা। খামোকা আমার ঘাড়ে দোষ চাপাবা।
—প্যান্ট বানানো তোমার কম্মো না। লুঙ্গি সেলাই অবধি ঠিক আছে।
—যাও যাও, মেলা বোকোনো। এই তো জেবনে প্রথমবার প্যান্ট পরলে। আমারো প্রথমবার বড়ো কাজ। যাও শোধবোধ। চা খাবা?
গোপেন দারোগাকে দেখে ঝগড়া থেমে গেল।
গোপেন দারোগা বললেন, ‘ওহে সুনীল, তোমার নাকি কাঁচি চুরি গিয়েছিল?’
সুনীল বলল, ‘শুধু কাঁইচি কেন, এই সেলাই মেশিনটাও চুরি হয়েছিল।’
—তা ফেরৎ পেলে কি করে? মানে কি করে উদ্ধার হল?
—জানেন না বুঝি?
—জানি। তোমরা ভাবো গোপেন দারোগা কিছুই খোঁজ রাখে না। তা হারান সামন্তর দোকানটা কোন দিকে?
—আপনার কিছু চুরি গিয়েছে নাকি স্যার?
—চোপরও বেয়াদব। কার ঘাড়ে কটা মাথা যে আমার জিনিস চুরি করে?
—অমন গ্যারান্টি দেওয়া কথা কবেন না স্যার। রাবনের দশটা মাথাই দেখা যেত। কিন্তু আজকাল অনেকেই একটা মাথা ফোরফ্রন্টে রেখে বাকি ন’টা নুকিয়ে রাখে।
—উজবুকের মতো কথা বলিস না। মানুষের কখনো দশটা মাথা হয় না। সব কবির কল্পনা।
—তা যাই বলেন স্যার, থানা চত্বরে এই নতুন চোরের একটা আবক্ষ মূর্ত্তি বসালে নেহাৎ মন্দ হতনা।
—বুঝেছি! তোরা আমায় নিয়ে মস্করা করছিস। তবে শুনে রাখ চোরের সাতদিন, গৃহস্থের একদিন।
—আর দারোগার স্যার? কয়দিন?
‘চল পটলা গাড়ি ঘোরা। উপেন সবাইকে হাত করে ফেলেছে বোঝাই যাচ্ছে। ব্যাটাকে কি করে টিট করা যায় তাই ভাবছি।’
পটলা বলল, ‘সার হুমায়ুনের বাবার নাম কি?’
—ঠিক এই প্রশ্নটারই উত্তর আমায় ক্লাস সিক্সের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় বলে দিয়েছিল উপেন। তার জের টানতে হচ্ছে। কিন্তু তোর এতে কি দরকার?
পটলা বলল, ‘স্যার, যদি কিছু না মনে করেন তো একটা কথা বলি—’
—বল। কত আর মনে করা যায়।
—মুঘল সাম্রাজ্যের বাপ-ছেলে-দাদু-নাতি সবার নাম মনে রাখার একটা ফর্মূলা আছে।
—আছে নাকি? বল তো শুনি।
—সেটা হল—‘বাবার হল আবার জ্বর সারিল ঔষধে।’
—সে নয় হল, কিন্তু সমস্যাটা সমাধান করি কি করে?
—কি দরকার স্যার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর। যেমন চলছে চলুক না। এমন সময় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো গোপেন দারোগার বুক পকেটে।
—হ্যালো গোপেন দারোগা স্পিকিং।
—কিছু কিনাড়া করতে পারলি?
—আপনি কে?
—নাম্বারটা সেভ করিসনি এখনো?
—ও উপেন—তুই কিন্তু মহা ধড়িবাজ বন্ধু।
—সে আর অস্বীকার করলাম কবে। তাহলে তুই যে তিমিরে সেই তিমিরেই অবস্থান করছিস?
—আর দুটো দিন সময় দে। হাল ছাড়ছি না।
—শোন বন্ধু, একটা প্রস্তাব দিই। অনেক তো হল, চল রেজিগনেশন লেটারটা লিখে ফেল। দু-জন মিলে হিমালয় ভ্রমনে বেরিয়ে পড়ি।
—তা মন্দ বলিস নি। আমায় দু-দিন ভাবতে দে। কিছু বকেয়া ঘুম পাওনা আছে আমার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন