শৈলেন ঘোষ
একটা অদ্ভুত নাম ছেলেটার, এট্টুস।
এ নামটা তার বাবা রেখেছেন, না, মা সে জানেই না। আসলে বাবা-মাকে যদিও বা সে দেখে থাকে কোনোদিন, তাদের কথা কিছু মনে নেই। কারণ এখন তাঁরা কেউ নেই। লোকের কত ঘর-বাড়ি আছে, তার নেই। ওই যে একটা মস্ত বাড়ির ঝুলবারান্দা দেখা যাচ্ছে রাস্তার ধারে, ওই বারান্দার নীচে একফালি জায়গায় এট্টুসের আস্তানা। এই রাস্তাটা দিয়ে গাড়ি-ঘোড়া কম যায়। লোকজন বেশি। মস্ত বাড়িটার ক-টা বাড়ির পরেই একটা চারতলা ইশকুল। ইশকুলের বাস অবশ্য যাওয়া-আসা করে এই রাস্তা দিয়ে। তখন খুব ধুলো ওড়ে। যারা দূর দূর থেকে ইশকুল আসে, তাদের জন্যেই বাস। আর যাদের বাড়ি কাছেপিঠে, পা-ই তাদের গাড়ি। কেউ আসে একা। কেউ কেউ দলবেঁধে। অনেকে আবার মায়ের সঙ্গে, না হয় দাদু-দিদার হাত ধরে।
এই ইশকুলে পড়ে শান্তনু। শান্তনুর অবশ্য দরকার পড়ে না বাস, কিংবা দরকার পড়ে না অন্য কারোর সঙ্গে ইশকুলে যাওয়ার। শান্তনু একা একাই ইশকুলে যায়। কাছেই বাড়ি। তিন মিনিটেরও পথ নয়। টিফিনের সময় ছেলেদের হট্টগোল স্পষ্ট শোনা যায় শান্তনুদের বাড়ি থেকে। যেদিন দেরি হয়ে যায়, দেবে ছুট। একছুটে ইশকুলে। রাস্তা পারাপারেরও ঝক্কি নেই। যে ফুটে ইশকুল বাড়ি, সেই ফুটে শান্তনুদেরও বাড়ি। বলো ক-জনের এমন সুযোগ থাকে!
শান্তনু ক্লাস এইটে পড়ে। পড়াশোনায় তাকে দিগগজ বলা যাবে না ঠিকই, কিন্তু খারাপও বলা যায় না। অবশ্য সে দিদির মতো অত ভালো নয়। দিদি পড়াশোনায় দারুণ। এখন কলেজে পড়ছে। দিদি যে কেবল সারাক্ষণ বই নিয়েই পড়ে থাকে, তা যেন ভেবো না। দিদি গানও গায় খুব ভালো। বাবা একটা অর্গ্যান কিনে দিয়েছেন দিদিকে। হাতে সময় পেলেই দিদি অর্গ্যান বাজাবে। গান গাইবে। নিঝুম রাতে অর্গ্যান বাজিয়ে দিদি যখন গান গায়, তখন যা শুনতে লাগে না—দারুণ।
দ্যাখো, কী বলতে কী বলছি। হচ্ছিল এট্টুসের কথা, মধ্যিখান থেকে এসে গেল দিদি। না, শুধু এট্টুস না, কথা হচ্ছিল শান্তনুর অমন চট করে রেগে যাওয়াটা বোধ হয় ঠিক হয়নি।
আসলে, রোজ সকালে রোদ উঠলেই এট্টুস এই নিজের ঝুলবারান্দার আস্তানা ছেড়ে টোটো করে ঘুরতে বেরোবে। বাপ-মা-হারা পথের ছেলেদের নিত্যদিন এ ছাড়া আর করবারই বা আছে কী! কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হল, ইশকুলের সময় হলেই এট্টুস ঠিক নিজের আস্তানায় ফিরে আসবে। ওই যে দলেদলে ছেলেরা বইয়ের ব্যাগ পিঠে নিয়ে ইশকুলে যাচ্ছে হাঁ করে দেখবে তাদের দিকে। কী সুন্দর পোশাক তাদের! একই রকম! আসমানি রঙের জামা। সাদা প্যান্ট। কালো মোজা। কালো জুতো। ঠিক সেই সময় তার নিজের পোশাকটার দিকে চোখ পড়ে গেলে, নিজেরই কেমন মন খারাপ হয়ে যায়। ছি:! এটা কি পোশাক! নোংরা চিরকুট।
‘ছি:’ বলো আর যাই বলো, ছেঁড়া বলতে পারবে না। তার এই একটাই জামা, আর একটাই প্যান্ট। গরমেও যেমন, শীতেও তেমন। অবশ্য গরমের সময় জামাটা গায়ে না দিলেও চলে যায়। আদুল গায়ে খুব ভালো লাগে। কী আরাম! কিন্তু শীতকালে থাকো দেখি আদুল গায়ে। যাদের আছে, তাদের কথা আলাদা। শীতের জামা বার করো, প্যান্ট বার করো। এটা গায়ে দাও ওটা জড়াও। হাজার রকমের ব্যবস্থা। উফ!
তা বটে, এট্টুসের একটা জামা-প্যান্টে শীত মানবে কেন। খুব কষ্ট। তা কী করা। যার যা জোটে। শীতের দিনে কেউ ঘুমোয় লেপের নীচে, আবার কেউ শুয়ে থাকে আদুল গায়ে মাটির ওপর, কুঁকড়ে-মুকড়ে। এই যেমন এট্টুস। শীত আসব আসব করলেই বেচারির মুখ শুকনো হয়ে যায়। দিনের বেলা রোদেরোদে তবু এক রকম। কিন্তু সূর্য ডুবলেই গা শিরশির করে। লোকে বলে যার যা আছে তাই নিয়েই নাকি তুষ্ট থাকতে হয়। তাতেই নাকি সুখ। ভালো রে ভালো! দরকার নেই এমন সুখের। এট্টুসের মতো ওইটুকু ছোট্ট এক রাস্তার ছেলেকে ওইসব কথা বলে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো মানে হয়! যাদের অনেক আছে তারাই এসব কথা বলে। বলুক, মুখ যখন আছে, তখন কে আর মুখে কুলুপ এঁটে থাকে!
কিন্তু শান্তনু কী এমন কান্ড করল যে, এত কথা বলতে হল। ওই যে বললুম, শান্তনুদের বাড়ি থেকে একছুট দিলেই ইশকুল। তা, একদিন এমনই করে ছুটে ইশকুলে যেতে গিয়ে কান্ডটা বাঁধিয়ে বসল শান্তনু। হয়েছে কী, সেদিন একটু দেরি হয়ে গেছিল। সুতরাং ঘণ্টা পড়ার আগেই ইশকুলে পৌঁছোনোর জন্যে শান্তনুকে ছুটতে হয়েছিল বাড়ি থেকে বেরিয়ে। কিন্তু হল কী, ছুটতে গিয়ে এমন সে হোঁচট খেল, যে রাস্তার ওপর চিৎপটাং। রাস্তার ধুলো-ময়লায় ইশকুলের পোশাক তো গেলই, পিঠে ঝোলানো বইয়ের ব্যাগটা পর্যন্ত ধুলোয় গড়াগড়ি। এমনই বরাত পড়ল তো-পড়ল একেবারে এট্টুসের চোখের সামনে। তাই দেখে কী মজাই না লেগে গেল এট্টুসের। সে আর থাকতে পারল না। বেদম হেসে উঠল হো হো করে। আর যায় কোথায়! শান্তনু মুখ ফেরাতেই দেখে এট্টুস হাসছে। লজ্জার একশেষ। ভীষণ রেগে গেল শান্তনু। ঝটপট উঠে পড়ে তেড়ে গেল এট্টুসের দিকে। জামার গলাটা খামচে ধরে গালে দিলে এক চড়। এট্টুসের জামাটা ছিঁড়ে গেল ফড়াত করে। এট্টুসের মুখের হাসিটাও হারিয়ে গেল মুখেই।
আচমকা এমন যে একটা কান্ড ঘটে যাবে, সে আর কে ভেবেছিল। চড় মেরেই এটা-ওটা বলে চেঁচাতে লাগল শান্তনু। কিন্তু একটা কথাও বলল না এট্টুস। চেঁচাতে চেঁচাতে শান্তনু গায়ের ধুলো ঝেড়ে ব্যাগটা তুলে নিল রাস্তা থেকে। তারপর গজরাতে গজরাতে ইশকুলে চলে গেল।
যা ভেবেছিলুম ঠিক তাই। চড়ের আঘাতটা তাকে কতখানি কষ্ট দিয়েছিল কে জানে। কিন্তু জামাটা ছিঁড়ে যেতে দু-চোখে জল তার ছলছল করে উঠল। জামাটা গা থেকে খুলে ফেলল সে। ছেঁড়া জামাটা ফ্যালফ্যাল করে দেখতে লাগল। কতটা ছিঁড়ে গেছে দ্যাখো! ইস! আর পরা যাবে না। জামাটা মুঠোয় জড়িয়ে সে ফুঁপিয়ে উঠল। এবার সে কী পরবে? কোথায় সে জামা পাবে? আর একটা জামা?
অবশ্য কেউ জামা দিক আর নাই দিক, ইশকুলের টিফিনের সময় ছেলেটাকে অনেকে টিফিনের ভাগ দেয়। যাক, তবু ভালো, খানিকটা পেট তো ভরে! মিথ্যে বলব না, শান্তনুও দেয়। আজও এট্টুসের জন্যে টিফিনের বাক্সে ক-খানা লুচি আর আলুর তরকারি এনেছিল শান্তনু। শান্তনুর মা-ই করে দেন। এট্টুসের কথা মা-ও জানেন। অবশ্য শান্তনুর মুখেই তাঁর শোনা। কিন্তু আজ শান্তনু এমন রাগান রেগেছে, টিফিনের সময় সে গেলই না এট্টুসের কাছে। অবশ্য অন্য যারা রোজ টিফিনের সময় এট্টুসের কাছে যায় খাবার নিয়ে, তারা অনেকেই গেল। কিন্তু গেলে কী হবে, এট্টুস কই? গেল কোথায় ছেলেটা? শান্তনু যে আজ তাকে মেরেছে, এটা অনেকেই জানে। সেই জন্যেই যে ছেলেটা রাগ করে এখানে থেকে চলে গেছে, এই কথাই বলাবলি করতে লাগল সবাই। একথা কি আর চাপা থাকে? ঠিক পৌঁছে গেল শান্তনুর কানে। অনেকে আবার বলেও ফেলল, এমন করে ওই শান্ত ছেলেটাকে শান্তনু না মারলেই পারত।
সত্যি, ছেলেটা ভারি শান্ত। তুমিও যদি এট্টুসের মুখখানা কোনোদিন দেখতে, তোমারও ঠিক এমন কথাই মনে হত। এট্টুসকে দেখলেই কষ্ট হয়। কষ্ট হয় শান্তনুর। কষ্ট হয় বলেই না সে রোজ খাবার আনে এট্টুসের জন্যে। যার জন্যে সে এত করে সে-ই রাস্তায় পড়ে গেল বলে হাসবে! রাগ হবে না?
ঠিক কথা, রাগ তো হবেই। কিন্তু মুশকিল কী, রাগ হলেও এমন রাগ কী আর অনেকক্ষণ মনে থাকে বিশেষ করে শান্তনুর? সে এট্টুসের দুঃখের কথা সব সময় মাকে শোনায়। এট্টুসের মুখখানা ঘুরতে-ফিরতে তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে যখন-তখন। সে বৃষ্টির রাতে জানলায় দাঁড়িয়ে ভাবে, আহা রে এট্টুসের ঘুমের জায়গাটা বুঝি আজ ভেসে যায় বৃষ্টির জলে। সে রাগ করে কতক্ষণে থাকবে। আর যখনই তার রাগ কমল, সেই তখন থেকেই এট্টুসকে দেখার জন্যে শান্তনুর মন ছোঁক-ছোঁক করতে লাগল। তার ওপর ইশকুলের বন্ধুদের মুখে যেই শুনল, এট্টুস ওই মস্ত বাড়ির ঝুলবারান্দার নীচে থেকে চলে গেছে, তখন থেকেই ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল তার মন। তারপর ইশকুলের ছুটির পর, যখন শান্তনু সত্যিই দেখল, ঝুলবারান্দার নীচটা খালি, তখন সে আর থাকতে পারল না। নিজেকে নিজেই সে ছি ছি করতে লাগল। আহা রে, যার আপন বলতে কেউ-ই নেই, তাকে কি অমন করে মারাটা ঠিক হয়েছে! থাকার মধ্যে একটা মাত্র জামা। সেটাও এমন খামচে ধরল যে, ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই! বলো, আর একটা জামা সে কোথায় পাবে?
না, ইশকুল থেকে বাড়ি ফিরে শান্তনু একদন্ডও স্থির থাকতে পারল না। বারবার মনে পড়ছে এট্টুসের কথা। এমনকী ইশকুল ফেরার পর মা যে জলখাবার দিলেন, সেটি তার খেতে ইচ্ছে করল না। একটু মুখে তুলেই রেখে দিল। মা জিগ্যেস করলেন, ‘কী রে, কী হল?’
শান্তনু দুঃখ-ভরা গলায় উত্তর দিল, ‘ভালো লাগছে না।’
মা ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলেন, কেন শরীর খারাপ লাগছে?’
‘না’
‘তবে?’
‘এট্টুসের জন্যে মন কেমন করছে।’ বলতে বলতে সে মায়ের মুখের দিকে তাকাল।
মা অবাক হলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে এট্টুসের?’
‘আমি মেরেছি।’ বলতে গিয়ে তার গলা কেঁপে উঠল। মায়ের মুখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে নিল।
‘কেন, মেরেছিস কেন?’ আরও অবাক হলেন মা। শান্তনু কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, ‘‘আজ দেরি হয়ে গেল বলে আমি ছুটে ছুটে ইশকুলে যাচ্ছিলুম। হঠাৎ হোঁচট খেয়ে রাস্তা পড়ে যাই। কোথায় সে ছুটে এসে আমায় ধরবে, তা নয়, হিহি করে হেসে উঠল। আমি থাকতে পারলুম না। রেগেমেগে এট্টুসের জামাটা খামচে ধরে তার গালে চড় মারলুম। জামাটা ছিঁড়ে গেল। তারপর ইশকুল থেকে ফেরার সময় দেখি, এট্টুস যেখানে থাকে সেখানে নেই। কোথায় চলে গেছে। কী হবে মা?’
মা ভারভার গলায় উত্তর দিলেন, ‘ছি:, এটা তুমি ভালো করোনি। ওই দুঃখী ছেলেটার গায়ে হাত তুলে তুমি অন্যায় করেছ।’
অভিমানের সুরে শান্তনু বলল, ‘এট্টুস কেন হাসল!’
‘তুমিই বা ওভাবে ছুটতে ছুটতে ইশকুলে যাবে কেন? পড়ে হাত-পা ভাঙেনি এই রক্ষে। ইশকুলে যেতে তুমি তো প্রায়ই দেরি করে ফেল। কী এমন কাজ থাকে তোমার?’ মায়ের গলায় রাগ।
শান্তনু কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিল, ‘আজ বইয়ের ব্যাগ গোছাতে গিয়েই দেরি হয়ে গেছে।’
‘কেন আগে থেকে গুছিয়ে রাখতে পারো না? ইশকুলে যাবার আগে যত ধড়ফড়ানি!’ মা বকা দিলেন। তার আলমারি থেকে শান্তনুর একটা নতুন জামা বার করে বললেন, ‘যাও, এই জামাটা এট্টুসকে দিয়ে এসো!’
মায়ের বকুনি খেয়ে শান্তনু একটু মুষড়ে পড়লেও ময়ের হাতে জামাটা দেখে খুশিতে ঝলমল করে উঠল তার চোখ-দুটি। কিন্তু হলে কী হবে, সঙ্গে সঙ্গে শান্তনু মাকে বলল, ‘কিন্তু এখন এট্টুস কোথায় গেছে আমি তো জানি না।’
মা উত্তর দিলেন, ‘যাও, তাকে খুঁজে বার করে এক্ষুনি জামাটা দিয়ে এসো। সে বেচারি খালি গায়ে থাকবে নাকি! একটা জামা যা হোক তবু গায়ে ছিল, তুমি তা-ও ছিঁড়ে দিলে।’’
শান্তনু মায়ের হাত থেকে জামাটা নিল। তারপর কেমন যেন কোমল চোখে মায়ের মুখে দিকে তাকাল। তাকিয়ে বলল, ‘মা, একটা কথা বলব?’
‘কী?’
‘তুমি রাগ করবে না তো?’
মা বললেন, ‘আগে শুনি সেটা রাগের কথা, না, খুশির কথা।’
‘মা—’ বলতে গিয়েও কেমন যেন দোনোমনো করে শান্তনু।
‘কীরে, থামলি কেন?’ মা অবাক হয়ে জিগ্যেস করেন।
শান্তনু আবদারের সুরে বলে, ‘আমার কথা রাখবে বলো?’
‘এ তো আচ্ছা ফ্যাসাদ,’ মা জবাব দিলেন, ‘কথাটা কী আগে না শুনে, রাখা না রাখার কথা কেমন করে বলি?’
এবার মনে সাহস আনল শান্তনু, বলল, ‘আচ্ছা মা, এট্টুস রাস্তায় কেন থাকবে? তুমি আমার মা। তুমি আমায় কত যত্নআত্তি করো। এট্টুসকে যত্ন করার কেউ নেই। এক একা থাকে। কোনোদিন আধপেটা খাবার জোটে, কোনোদিন জোটে না। কী কষ্ট বলো! এট্টুসকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসব মা? আমার মতো তুমি তারও মা হবে। আমার মতো পোশাক পরবে। আমার মতো ইশকুলে যাবে। আমার সঙ্গে খেলা করবে।’
ছেলের মুখে এই কথা শুনে মায়ের মুখের কথা যেন হারিয়ে যায়। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখের পাতা ছলছল করে ওঠে। হঠাৎ ছেলের চিবুকটি ছুঁয়ে ধরেন তিনি। তারপর আবছা গলায় বলেন ‘তুই তাকে মেরেছিস, সে কি আসবে?’
মায়ের মুখের দিকে চেয়ে শান্তনুর চোখও ছলছল করে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ মা, এট্টুসের গায়ে হাত তোলাটা আমার ঠিক হয়নি। তুমি যদি বলো আমি তাকে ঠিক খুঁজে-পেয়ে বাড়িতে নিয়ে আসব। তাকে আদর করে বলব, ‘রাগ করিস না ভাই, আমি ভুল করে ফেলেছি।’
শান্তনুর কথা শুনে মায়ের মুখে একটুকরো নরম হাসি উথলে উঠল। বললেন, ‘দ্যাখ, যদি সে আসে।’
মায়ের মুখের ওই ক-টি শব্দ যেন অফুরন্ত আনন্দের ঝরনা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল শান্তনুর মনে। তক্ষুনি সে মায়ের দেওয়া জামাটা হাতে নিয়ে ছুটল এট্টুসকে খুঁজতে।
শান্তনুকে অমন করে ছুটতে দেখে মা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ছুটিস না, ছুটিস না আবার পড়বি!’
শান্তনু ছুটতে ছুটতেই উত্তর দিল, ‘আর আমি পড়ছি না। এট্টুসকে নিয়ে আমি এক্ষুনি আসছি।’’ বলতে বলতে সে মায়ের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।
শান্তনু খানিকটা ছুটে এল। খানিকটা ছুটে থমকে দাঁড়াল। মনে মনে ভাবল, সত্যিই তো সে কোথায় যাচ্ছে? কোনখানে খুঁজবে সে এট্টুসকে! এই এত বড়ো শহরটার কোথায় যে রাগ করে চলে গেছে এট্টুস, জানে না সে। এই কথা ভাবতে ভাবতে সে আবার হাঁটতে লাগল। আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগল যেদিকে চোখ যায়, সেইদিকেই। খুঁজল খেলার মাঠটা। গেল বাজারে। নদীর ধারে। দেখল, রাস্তার বড়ো বড়ো বাড়িগুলোর অলিগলিতে। যখন এট্টুসকে কোথাও দেখা গেল না, তখন শান্তনু চিৎকার করে ডাক দিল, ‘এট্টুস-স—।’
একবার নয়, অনেকবার। শহরের এই হট্টগোলের মধ্যে সে-ডাক কে শুনবে! বিকেল গড়িয়ে গেল। আকাশে ডুবে যাবার আগে রক্তরাঙা সূর্য ঝলমল করছে। না, খুঁজে সে পেল না। তখনই কী মনে হল শান্তনুর, ভাবল, হয়তো এট্টুস ফিরে গেছে সেই বাড়ির ঝুলবারান্দার নীচে। ছুটল সেইদিকেই।
ওই দেখা যাচ্ছে সেই বাড়িটা। আর ক-পা গেলেই ইশকুল। সারাটা দিন গমগম করে ইশকুল বাড়ি। ইশকুলের ছুটি হয়ে গেলেই সব নিস্তব্ধ। তখন মনে হয়, ইশকুল বাড়িটা যেন ঘুমন্তপুরী। ভেতরে কেউ নেই। থমথম করছে। যেন ঘন রহস্যে ঢাকা।
না, সেই ঝুলবারান্দার নীচেও এট্টুসকে দেখা গেল না। কিন্তু দেখা গেল এট্টুসের সেই ছেঁড়া জামাটা। পড়ে আছে রাস্তায়। ছ্যাঁত করে উঠল শান্তনুর বুক। ভেঙে যায় মন তার। মায়ের দেওয়া নতুন জামাটা হাতে নিয়ে সে আকাশের দিকে তাকায়। তখনও সন্ধের আবছা আলো ঘন অন্ধকারে ঢেকে যায়নি। সে ধীর পায়ে হাঁটে! এ কী, সে যে আনমনে ইশকুলের দিকেই হেঁটে চলেছে।
একটু হেঁটেই চমকে ওঠে শান্তনু। স্কুলের গেটের রেলিং-এ মাথা ঠেকিয়ে কে দাঁড়িয়ে ওখানে! খালি গা। খালি পা। শুধু একটা প্যান্ট তার পরনে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, প্যান্টের রংটা চেনা চেনা লাগছে। ধুলো-ময়লায় চটা রং-এর এ-প্যান্ট তো এট্টুসকেই সে পরে থাকতে দেখেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওই তো গেটের ধারে এট্টুসই দাঁড়িয়ে। ছুটে যায় শান্তনু। ডাক দেয়, ‘এট্টুস!’
ক্লান্ত এট্টুস দু-হাত দিয়ে গেটের রেলিং ধরে মুখ ঘোরায়। অলস-চোখে তাকায় শান্তনুর মুখের দিকে।
শান্তনু হাসে। হাসি মুখে বলে, ‘তোকে কখন থেকে খুঁজছি। তোর জন্যে আমার মা জামা দিয়েছেন। এই দ্যাখ, আমি এনেছি।’
এট্টুস উত্তর দেয় না। মুখে তার অভিমান। মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
শান্তনু আর ক-পা এগিয়ে গেল। কোনোদিন যা করে না আজ তা-ই করল, এট্টুসকে আলতো হাতে ছুঁয়ে ধরল। বলল, ‘এই দ্যাখ, কী সুন্দর জামা।’
এট্টুস ঘুরে দাঁড়াল আচমকা। শান্তনুর হাতের জামা ছিনিয়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল রাস্তায়।
শান্তনু থতোমতো খেয়ে যায়। তার মুখে কথা সরে না। তাড়াতাড়ি জামাটা তুলে নিয়ে আবার এগিয়ে যায় এট্টুসের কাছে। জিগ্যেস করে, ‘রাগ করেছিস?’
এবার এট্টুস তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, ‘তখন তুমি আমায় মারলে কেন? কেন তুমি আমার জামাটা ছিঁড়ে দিলে?’
শান্তনু উত্তর দিল, ‘না রে, তোকে আমি মারতে চাইনি। আমি ছুটতে ছুটতে ইশকুলে যাবার সময় পড়ে গেলুম। তুই হাসলি। আমার হঠাৎ রাগ হয়ে গেছিল। তুই বিশ্বাস কর, আমি বুঝতে পারিনি তোর জামাটা ধরলেই ছিঁড়ে যাবে। তোর কথা মাকে বলতেই মা আমাকে খুব বকাবকি করলেন। তোর জন্যে এই নতুন জামাটা আমার হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। পর।’
‘না, আমি ওই জামা পরব না।’ খুবই রুষ্ট হয়ে উত্তর দিল এট্টুস।
‘খালি গায়ে? থাকলে, তোর ঠাণ্ডা লেগে যাবে।’
‘লাগে লাগবে, আমার লাগবে। তোমার তাতে কী!’
‘যদি বলি তুই আমার ভাই।’
তেমনই তীক্ষ্ণস্বরে উত্তর দিল এট্টুস ‘আমি রাস্তার ছেলে। কেউ আমার ভাই নয়।’
‘আজ থেকে আর তোকে রাস্তায় থাকতে হবে না। আমি তোকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যাব। তুই আমার সঙ্গে থাকবি। আমার সঙ্গে বই পড়বি। খেলা করবি। আমার মাকে তুইও মা বলবি। আমার দিদি হবে তোরও দিদি।’
‘না, আমি তোমাদের বাড়িতে যাব না।’ রোষে ফেটে পড়ল এট্টুস। ‘আমি তোমার কোনো কথা শুনব না। তুমি আমায় মেরেছ। তোমার সব কথা মিথ্যে।’’ বলে গটমট করে হাঁটতে লাগল এট্টুস।
এট্টুসের হাতটা ধরে ফেলল শান্তনু। আদর-মাখা স্বরে বলে উঠল, ‘বিশ্বাস কর, আর আমি কোনোদিনও তোকে মারব না। বিশ্বাস কর, আমি তোকে ভালবাসব। সত্যি বলছি, তুই আমাদের বাড়িতে না গেলে আমার খুব কষ্ট হবে। নে, এই জামাটা পর!’ বলতে বলতে শান্তনুর চোখ ছলছল করে উঠল।
শান্তনুর চোখের দিকে চোখ পড়ে গেল এট্টুসের। এতক্ষণ যে মুখ তার ভার হয়েছিল রাগে, এখন হঠাৎই যেন সে মুখ কত শান্ত। মুখে তার কোনো সাড়া নেই। নি:শব্দে সে জামাটা শান্তনুর হাত থেকে নিল। নি:শব্দে জামাটা দেখতে দেখতে গায়ে পরল এট্টুস।
শান্তনুর মুখখানা উছলে উঠল হাসিতে। নতুন জামা এট্টুসের গায়ে দেখে, শান্তনুর মুখ দিয়ে যেন অজান্তেই বেরিয়ে এল একটি শব্দ ‘বা:!’ তারপর শান্তনুর হাত ধরে এট্টুস চলল তাদের বাড়িতে। তার মায়ের কাছে।

তারপর?
তারপর এখন এট্টুস স্কুলে যায়, খেলা করে শান্তনুর বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে। আর লুকিয়ে লুকিয়ে শান্তনুর দিদির গান শোনে। সে আর এক গল্প।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন