ইন্নির গল্প

শৈলেন ঘোষ

আচমকা কেন যে এমন হয়! কেন যে আকাশ চুপিসাড়ে ঢেকে যায় কালো মেঘে, দিগবিদিক ঝাপসা করে, কেন যে শুরু করে দেয় ঘুর্ণিঝড় তার ভয়াবহ দস্যিপনা, কে জানে! এটা গুঁড়িয়ে, ওটা উড়িয়ে কী লাগামছাড়া উদ্দাম তার! তেমনই মেঘের গর্জন। বুক কেঁপে ওঠে। বিদ্যুৎ চমকায় আকাশ ফালাফালা করে। বাজ পড়ে কান ফাটিয়ে। এমনই সর্বনাশা দুর্যোগে একদিন অনাথ হয়ে গেল একটি ছোট্ট মেয়ে, যাকে ডাকি আমরা ইন্নি বলে।

বলতে শিউরে উঠি, সেদিন হয়েছে কী, এমনই এক দুর্যোগ অগ্রাহ্য করে ইন্নির মা আর বাবা খেতে ধান রুইছিলেন। একটিমাত্র মেয়ে তাঁদের। ভারি আদরের। মেয়ের মুখে দু-মুঠো অন্ন তুলে দিতে হবে তো! মেয়েটাকে মানুষ করতে তাদেরও তো দু-মুঠো খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে।

ইন্নি সবে দশে পা দিয়েছে। পাঁচ ক্লাসে পড়ছে। ইশকুলের দিদিমণিরা বলেন, ইন্নি খুব ভালো মেয়ে। যদি সুযোগ পায়, মেয়েটা জজ-ব্যারিস্টার হবে। কিন্তু ইন্নি ভাবে অন্য কথা, সে জজ-ব্যারিস্টার হবে না। সে ইশকুলের দিদিমণি হবে। সে যা শিখছে এখন, বড়ো হয়ে অন্যকে শেখাবে তখন। কিন্তু তা আর হল না ইন্নির। যে শস্যখেতে তার মা আর বাবা শস্য রুইছিলেন বলতে শিউরে উঠে, সেই সেদিনের দুর্যোগে বাজ পড়ল কাজে ব্যস্ত সেই মানুষ দুটিরই ওপর। দুজনেই চোখ বুজলেন চিরদিনের জন্যে। আর, ইন্নির স্বপ্ন ছারখার হয়ে গেল মুহূর্তে। ওই ছোট্ট মেয়েটার কী হবে এখন! সে যে অনাথ হয়ে গেল!

কে না এল তার কাছে ছুটে! কে না তাকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল! কিন্তু আশ্চর্য, সবার এত কান্না দেখেও মেয়েটার চোখ দিয়ে একফোঁটা জল গড়াল না। কেমন যেন বোবার মতো এর-ওর মুখের দিকে তাকায়! নয়তো ওই খোলা আকাশটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আর, মাঝে মাঝে ওদের মাটির ঘরের গা-ঘেঁসে বেড়ে-ওঠা ওই শিউলি গাছটাকে দেখে। রোজ কোথা থেকে উড়ে এসে যে একটা পাপিয়া ওই গাছটায় বসে ইন্নিকে দেখে আর ডাকে, কে জানে! ইন্নি পাখিকে ডাকে, ‘আয় পাপিয়া, আয় আয়।’

পাপিয়া এদিকে-ওদিকে তাকায়। গাছ থেকে নেমে তুড়ুক-তড়ুক করে লাফিয়ে ইন্নির কাছাকাছি আসে। কিন্তু ইন্নি তাকে ধরার জন্যে হাত বাড়ালেই, পাখি ফুড়ুৎ!

দেখতে দেখতে একদিন সত্যি সত্যি পাখিটার সঙ্গে ভাব হয়ে গেল ইন্নির। এখন ইন্নি মুঠিভরতি করে ছোলা আনে পাপিয়ার জন্যে। তারপরে গান গেয়ে ডাক দেয়—

আয় পাপিয়া আয়,

সময় বয়ে যায়,

আমার মুঠি ভরতি ছোলায়

তুই যে খাবি তা-ই!

গাইতে গাইতে ইন্নি ছোলাভরতি মুঠি খুললেই পাপিয়া উড়ে এসে ইন্নির হাতে বসে। ঠুকরে ঠুকরে ছোলা খায়। খেতে খেতে পাখি ইন্নির চোখের দিকে তাকায়। যেন ইন্নিকে কিছু বলতে চায়! বলতে নেই পাখিটা এখন ইন্নিকে একটুও ভয় পায় না। কিন্তু এখন কী হবে? ইন্নির চোখে ওই আকাশটার মতো বুকটাও যে খাঁখাঁ হয়ে গেল! পাখির গান যে তার কানে হাহাকারের মতো আর্তনাদ তোলে!

ইন্নির এই ভয়ংকর বিপদের সময়ে এই ক-দিন কত মানুষ যে ছুটে এল, তারা ইন্নির জন্যে এটা করবে, সেটা করবে বলে কত আশ্বাস দিল, তা বলার কথা নয়। কিন্তু, যত দিন যায়, তারা ইন্নির চোখের আড়ালে হারিয়ে যায়! সে আশ্বাসের কোনোটাই যেন সত্যি নয়। বলতে হয়, তাই যেন বলা। শুধুই কথার কথা। শুধু একটাই সত্যি। ইন্নির সেই বন্ধু-পাখি পাপিয়া, সে কিন্তু এখনো আছে। আছে বন্ধু হয়েই। অথচ আশ্চর্য কথা কী, পাখি এখন ইন্নির সামনে আসে না। সে যদি দেখা দেয়, ইন্নি কষ্ট পাবে। হাতের মুঠি খুলে সে যে পাখিকে আর ছোলা খাওয়াতে পারবে না। তখন কি তার দুঃখের সীমা থাকবে?

শূন্য হয়ে গেল ইন্নির স্কুলের দিদিমণি হওয়ার স্বপ্নও। এখন ইন্নি দিশেহারা হয়ে পথে পথে ঘোরে। এর দোরে, তার দোরে কাজ খুঁজে বেড়ায়। নিজের কুঁড়ে ছেড়ে সে অন্যের ঘরে একটু আশ্রয় চায়। কে দেবে আশ্রয়?

একদিন হঠাৎ এ কী দেখি! এ যে দেখি ইন্নি যে-পথে হাঁটে বন্ধু পাখিও যে সেই পথের খোলা আকাশে উড়ে, লুকিয়ে লুকিয়ে তার পিছু নেয়! ইন্নি জানতেই পারে না।

হল কী, একদিন অনেকটা পথ হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা বড্ডই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। একটু কোথাও বসে জিরিয়ে না নিলেই নয়। কিন্তু কোথায় সে বসবে! ওই দেখা যাচ্ছে একটা ছোট্ট মতন বাড়ি। বাড়ির সামনের দরজা আঁট-সাঁট বন্ধ। দরজা লাগোয়া দু-থাক বাঁধানো সিঁড়ি। ইন্নি ওই সিঁড়ির ওপরেই বসে পড়ল। বসে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কত কী ভাবতে লাগল। ভাবতে ভাবতে তন্দ্রা জড়িয়ে এল তার চোখে। শত চেষ্টা করেও ইন্নি পারল না জেগে থাকতে। ঢুলে পড়ল ওই সিঁড়ির ওপরেই। ঘুমে অচেতন মেয়েটা জানতেও পারল না এই বাড়িটার সামনে যে মস্ত অশ্বত্থগাছ, সেই গাছে লুকিয়ে বসে আছে তার বন্ধু পাপিয়া। যেন তার পাহারাদার!

এমনি করে কতক্ষণ যে ইন্নি সিঁড়ির ওপর পড়ে পড়ে ঘুমোল কে জানে। হঠাৎ ছোট্ট বাড়িটার দরজা খুলে গেল। ভেতর থেকে উঁকি দিলেন একজন বুড়ি মানুষ। ইন্নিকে দেখে চমকে উঠলেন। তারপরে হাঁক পেড়ে ধমকালেন, ‘কে রে তুই, আমাদের দোরে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিস?’

বুড়ির গলার অমন খ্যানখ্যানে আওয়াজ শুনে ইন্নির চোখে আর ঘুম থাকে! ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। ভয়ে চুপসে ঘুম চোখে বুড়ির মুখের দিকে তাকাল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হনহন করে পা চালাল।

মেয়েটাকে দেখে বুড়ির কী মনে হল কে জানে, চেঁচিয়ে ডাক দিলেন, ‘এই মেয়ে, শোন ইদিকে! যাচ্ছিস কোথায়?’

যেমন চমকে ঘুম ভেঙেছিল ইন্নির, তেমনই থমকে দাঁড়িয়ে মুখ ফেরাল ইন্নি।

বুড়ি বললেন ‘আয়, আমার কাছে আয়।’

বুড়ির কথা অমান্য করল না ইন্নি। ভয়ে ভয়ে পা ফেলে বুড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

বুড়ি জিগ্যেস করলেন, ‘আমার বাড়ির দোরগোড়ায় অমন পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছিলি কেন? কী হয়েছে তোর?’

ইন্নি কোনো উত্তর দিল না। বুড়ির মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই থাকল।

‘কোথায় থাকিস তুই?’

তারও কোনো উত্তর নেই।

এবার বুড়ি দু-পা সিঁড়ি ভেঙে ইন্নির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তুই কথার উত্তর না দিলে তোকে আমি ছাড়ব না। তোকে থানায় নিয়ে যাব। বুঝতে পেরেছি, তুই বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস।’

ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল ইন্নি, ‘না-আ-আ!’ বলে ছুটে পালাতে গেল। বুড়ি ধরে ফেললেন।

ইন্নি কেঁদে উঠল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে থানায় নিয়ে যেয়ো না! আমি বাড়ি থেকে পালাইনি।’

‘তা হলে বল, কী হয়েছে?’

‘আমার সব হারিয়ে গেছে। আমার কেউ নেই, কিচ্ছু নেই।’

‘তোর মা-বাবা?’

ইন্নি কান্নায় উপচে-পড়া চোখে অসহায়ের মতো বুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। কোনো কথাই বলতে পারল না।

বুড়ি তখন ইন্নির হাত ধরে টান দিয়ে বললেন, ‘আয় আমার সঙ্গে।’

ইন্নি কেঁদে লুটিয়ে পড়ল, ‘না, আমি কোথাও যাব না। আমায় ছেড়ে দাও।’

ওই ছোট্ট মেয়ে ইন্নি বুড়ির সঙ্গে পারবে কেন? তাকে যেতেই হবে। বুড়ি তাকে টেনে নিয়ে গেলেন নিজের ঘরে। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ইন্নি এখন বন্দি বুড়ির ঘরে।

বন্দি-ঘরে ইন্নি বুড়িকে তার দুঃখের কথা বলল কী বলল না, তা আমরা জানি না। কিন্তু দেখা গেল, বুড়ি বাইরে যখন এটা-ওটা কিনতে যান, বারদরজায় তালা দিয়ে যান। ইন্নি যাতে ঘর থেকে বাইরে বেরোতে না পারে। মেয়েটা সেই যে বুড়ির ঘরে ঢুকল, সেই যে বন্দি হল তারপর থেকে তার ভালো-মন্দ কোনো খবর আমরা জানতেই পারলুম না।

মেয়েটাকে বুড়ি প্রাণে মারলেন, না খাটিয়ে মারছেন তা-ও কেউ জানে না। কিন্তু সেই পাপিয়া, সে কী করল? সে কি ইন্নির কথা ভুলে অশ্বত্থগাছ ছেড়ে নিজের বাসায় ফিরে গেছে?

না, পাপিয়া তো মানুষ নয়, পাখি। মানুষ ভুলে যেতে পারে বন্ধুর ভালোবাসার কথা, কিন্তু পশুপাখিকে কে দেখেছে মানুষের ভালোবাসা ভুলতে? সত্যি তাই। পাপিয়া ভোলেনি তার বন্ধু ইন্নির কথা। তাই সে অশ্বত্থগাছে বসে বসে নজর রাখত বুড়ির ঘরের দিকে। নজর রাখত, আর থেকে থেকে উড়ে গিয়ে ঘরের আনাচে-কানাচে বসত। উঁকি মারত, যদি দেখা যায় বন্ধুকে। গান শোনাত ইন্নিকে, যদি সাড়া দেয়। না, তাকে দেখাও যেত না, সে সাড়াও দিত না।

কিন্তু হঠাৎ একদিন সকালে এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখা গেল। দেখা গেল কী, হুট করে খুলে গেল বন্দি-ঘরের দরজা। বেরিয়ে এলেন বুড়ি। তাঁর পিছনে ইন্নি। চোখ ঝলসে গেল দেখে। দেখি কী, ইন্নির গায়ে ইশকুলের পোশাক। পায়ে নতুন ঝকমকে জুতো-মোজা। পিঠে বাঁধা বই-এর ব্যাগ। বুড়ি বাইরে বেরিয়ে ঘরের দরজায় তালা দিলেন। তারপর ইন্নির হাত ধরলেন। হাত ধরে ইন্নিকে নিয়ে চললেন ইশকুলে। হাসি-হাসি মুখ যেমন ইন্নির, তেমনই বুড়িরও। তবে কি বুড়িমা ইন্নিকে ইশকুলে ভরতি করে দিয়েছেন! কবে কখন ভরতি হল ইন্নি, আমরা তো তা ঘুণাক্ষরে জানতে পারিনি! তবে কি ওই অশ্বত্থগাছে তার যে পাখি-বন্ধু লুকিয়ে নজর রাখে, জানে না! হয়তো জানে। জানলেও বলবে কাকে, কী করে? তোমার আমার মতো সে তো আর কথা বলতে পারে না। এখন দ্যাখো, সে-ও অশ্বত্থ গাছের ঘুপচি থেকে কেমন ঝুপ করে উড়ে বেরিয়ে এল। দ্যাখো, কেমন ইন্নি আর বুড়ির মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে! তাই তো!

হ্যাঁ, বুড়ির হাত ধরে ইন্নি পৌঁছে গেল ইশকুলেই। দ্যাখো, ইশকুলের গেট দিয়ে ইন্নির মতো আরও কত ছোট্ট ছোট্ট বন্ধু ইশকুলে ঢুকছে। তাদের পরনেও ইশকুলের পোশাক। কী সুন্দর দেখতে লাগছে!

ইন্নিও হাত তুলে বুড়িমার কাছে বিদায় নিয়ে ইশকুলে ঢুকে গেল। সে এখন পড়বে, শিখবে আর বড়ো হয়ে অন্যকে শেখাবে। কিন্তু সে তো এখন অনেক দেরি।

এখন ইন্নির মুখে হাসি ফুটেছে। আশ্চর্য, কী জাদু জানে মেয়েটা যে, একজন অজানা অচেনা বুড়িমানুষ তাঁর বুকভরা ভালোবাসা দিয়ে মেয়েটাকে আপন করে নিলেন। কেউ জানে না একথা, কারও জানার কথাও নয়। কেননা, জানার কথা যাদের, দুঃখের কথা কী, তারাই ভুলে গেছে ইন্নিকে। শুধু ভোলেনি একটি ছোট্ট প্রাণী, একটি পাখি, পাপিয়া। সে তার পুরোনো বাসা ছেড়ে এখন এই অশ্বত্থগাছে বাসা বেঁধেছে। বুড়িমার ঘরের পেছনদিকে যে জামরুল গাছটা ছায়া দিয়ে ঢেকে রেখেছে বুড়িমার ঘর, সেই জামরুল গাছে বসে ভোরের আলোয় ইন্নিকে গান শোনায়। আবার সেই আগের মতোই ইন্নির হাতে এসে বসে। ইন্নি ছোলাভরতি হাতের মুঠি খুলে দেয়। পাপিয়া খায়। আবার আকাশে উড়ে যায়। আর বুড়িমা অবাক হয়ে ভাবেন, এ কেমন করে হয়! ইন্নি একদিন হাসতে হাসতে বলে, পাখিটা ঠিক তোমার মতো। তোমার ভালোবাসার মতো। বলো, তুমি আমায় আপন করে না নিলে আমায় কে দেখত? আমি কী করতুম?’

বুড়িমার চোখ ছলছল করে। কোনো কথা বলতে পারেন না।

তা সে যাই হোক, এতদিন বেশ কাটছিল ইন্নির দিনগুলো। কিন্তু সেদিন ঘটল এক উলটো বিপত্তি। ইন্নি এখন ইশকুলে একাই যায়, একাই আসে। পথ চিনে ফেলেছে। এখন কত তার বন্ধু।

সেদিন ইন্নি ইশকুল থেকে ফেরার পথে হঠাৎ দেখল কী, একটা বেড়াল তার পেছনে পায়ে পায়ে আসছে। ইন্নি পিছু ফিরে দাঁড়াল। ‘যা: যা:’ বলে তাড়া দিল। তারপর আবার হাঁটল। আশ্চর্য, বেড়ালটা একটুখানি থমকে দাঁড়াল বটে, কিন্তু ইন্নির পিছু ছাড়ল না। ইন্নি ভাবল বেড়ালটা তো আচ্ছা দুষ্টু। কথা শোনে না! এবার ইন্নি ঘুরে দাঁড়িয়ে বেড়ালটাকে আচ্ছা করে দিল ধমক, ‘কী মনে করেছিস অ্যাঁ! কেন আমার পিছু নিয়েছিস! যা: পালা! নইলে এমন মারব, তখন বুঝতে পারবি!’

অবাক কথা, বেড়াল তো কথা শুনলই না, উলটে ‘ম্যাঁও’ করে এমন ডেকে উঠল যে, সেই একটি ডাকেই ইন্নির মন ভিজে গেল। তবে কি বেড়ালটার কষ্ট হচ্ছে! না কি খিদে পেয়েছে!

ঠিক বটে, বেড়ালটার গায়ের রং সাদা। তবে, বলতে পারবে না রংটা বুঝি ধুলোকাদায় নোংরা হয়ে গেছে। না, একদমই তা মনে হয় না ইন্নির। তবু তাকে সে নিজের কোলে তুলে নিল না। আসতে দিল তার পেছনে পেছনে। চলল বাড়িতে। তার বুড়িমার কাছে!

পৌঁছেও গেল। বেড়ালটাও ইন্নির পিছু পিছু বাড়িতেও ঢুকল। বেড়ালটাকে ইন্নির সঙ্গে ঢুকতে দেখে, বুড়িমা চেঁচিয়ে উঠলেন ‘ছি-ছি-ছি-ছি! বেড়ালটা কোত্থেকে এল রে?’

ইন্নি উত্তর দিল, ‘আমি নিয়ে এলুম। রাস্তায় হাভাতের মতো ঘুরঘুর করছিল। দেখে মায়া হল।’

বুড়িমা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ছ্যা-ছ্যা, একী কুচ্ছিত কান্ড। যা, যা এক্ষুনি রাস্তার বেড়ালকে বার করে দিয়ে আয়!’

ইন্নি শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘বুড়িমা, আমিও তো রাস্তার মেয়ে। আমাকেও তো তুমি রাস্তা থেকে ডেকে এনে ভালোবেসেছ!

‘তোর কথা আলাদা। তুই আর বেড়াল এক হল?’

‘তা হলে বলো, এত কেন আদর করতে ইচ্ছে করে পশুপাখিকে? এদের কষ্ট দেখলে বলো, আমাদের কেন মন কেমন করে? বুড়িমা, বেড়ালটা একা একা রাস্তায় ঘুরে ঘুরে কষ্ট পাচ্ছিল। আমারই মতো নিশ্চয়ই এরও সব হারিয়ে গেছে। থাক না এখন আমাদের কাছে! তুমি মানা কোরো না বুড়িমা!’ ইন্নির গলায় আবদারের সুর। তারপরে বলে, ‘তবে ও যদি নিজে চলে যায়, তখন অন্য কথা। তখন তো আমরা জোর করে আটকে রাখব না!’

ইন্নির এমন আবদার শুনে বুড়িমার মন গলে গেল কী না জানি না। তবে তিনি আর আপত্তি করলেন না। বরং উলটে বেড়ালটার জন্যে দুধ আনলেন। দুধে ভাত মাখলেন। খেতে দিলেন।

দেখে ইন্নির কী খুশি! বুড়িমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে বলল, ‘তুমি বড্ড ভালো বুড়িমা, আমার মায়ের মতো ভালো।’

বুড়িমা হাসলেন। কিন্তু তাঁর হাসি শুনে মনে হল, তিনি যেন মন খুলে হাসলেন না। কী যেন ভাবছেন মনে মনে।

হায়, যা ভেবেছি ঠিক তাই। হল কী এবার ঘুম-ঘুম রাতের সময় হল। ইন্নি পড়ার বই গুছিয়ে রেখে খাবার খেল। খেয়েদেয়ে বিছানায় আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই ঘুমে চোখ বুজে গেল। আর, ঠিক তখনই ঘটল একটা কান্ড! কী কান্ড ঘটল?

হল কী, ইন্নি যখন ঘুমে একেবারে অচেতন, তখন বুড়িমা নি:সাড়ে বেড়ালটার কাছে গিয়ে তার মুখটা ঝপ করে চেপে ধরলেন। বেড়ালটা তখন চেঁচাতেও পারে না, কোঁকাতেও পারে না। সেই অবস্থায় তিনি বেড়ালটাকে ঘর থেকে রাস্তায় বার করে দিলেন। তারপর তিনি নিজেও ইন্নির পাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুমে-কাতর ইন্নি কিছুই টের পেল না।

আহা রে! এই রাতদুপুরে এখন কোথায় যায় ওই অসহায় বেড়ালটা?

কোথায় আর যাবে? এতদিন যেখানে সে একা একা এর-ওর মুখ চেয়ে ঘুরে বেড়াত, সেই খোলা রাস্তায়ই তো এখন তার আস্তানা। রাস্তার তো আর কোনো দরজা নেই যে, দরজা খুলে বার করে খিল এঁটে দেবে!

হ্যাঁ, সেই রাতটা বেড়ালের রাস্তাই হল আস্তানা। কে জানে, এই অন্ধকার রাতে রাস্তার কোন আঁদাড়ে সে আশ্রয় নিল। সে ঘুমোল, না জেগে রইল, কে আর দেখছে।

কিন্তু অন্ধকার রাত কাটতেই ঘটল এক অদ্ভুত কান্ড। কী, না ইন্নির সেই বন্ধু পাখি পাপিয়া হঠাৎই বেড়ালটার সামনে হাজির। বেড়ালটা যেই না দেখেছে তার সামনে পাখি, অমনি তার চোখদুটো শিকার ধরার লোভে জ্বলজ্বল করে উঠল। পাখিটাকে তাক করে সে মেরেছে এক লাফ। পাখিটাও তৈরি। চোখের পলকে সেও ফুড়ুৎ। আর বেড়ালও পাখি ফসকে মাটিতে ধপাস!

কী আশ্চর্য, পাপিয়ার কী সাহস দ্যাখো, আবার বেড়ালটার সামনে হাজির! এবারও বেড়াল পাখি ধরবে বলে মেরেছে লাফ! এবারও পাখি তাকে বোকা বানিয়ে ছাড়ল। অবাক কথা কী, পাপিয়া মনে মনে কী মতলব এঁটে বেড়ালটাকে যে এমন করে ঠকাচ্ছিল, সেতো আর কেউ জানে না! বেড়াল যতই ঠকছে, ততই তার রোখও বাড়ছে। কখনো লাফাচ্ছে, কখনো আলতো পায়ে ডিঙি মারছে, ঝাঁকি দিচ্ছে নয়তো ছুটে ছুটে ধাওয়া করছে।

শেষমেষ হল কী, বেড়াল এমন খেপে গেল নিজেকে আর সামলাতে পারল না। এবার সে ধরবেই। ওই তো পাখি তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আচমকা এমন দিল ঝাঁপ, হ্যাঁ, পাখি একেবারে তার থাবার নীচে! এই যা:! ইন্নির বন্ধু পাপিয়ার বুঝি শেষ হয়ে গেল প্রাণ। এক্ষুনি তাকে পেটে পুরবে বেড়ালটা।

যাচ্চলে! পাপিয়া তো ধরা পড়েনি। এই তো স্পষ্ট মনে হল, বেড়ালটা তার পায়ের থাবা দিয়ে পাখিটাকে ধরে ফেলেছে! কিন্তু একী কান্ড! থাবার নীচে তো সে নেই! শুধু থাবার নীচে কেন, কোথাও তো পাখিটাকে দেখা যাচ্ছে না! চোখে ধুলো দিয়ে গেল কোথায়! কী রে বাবা! এর নামই কি ভোজবাজি! হবে হয় তো।

কিন্তু তুমি ভোজবাজি বললে কী হবে, এদিকে বেড়ালের কান্ড দ্যাখো। যেখানে সে থাবা দিয়ে পাখিটাকে ধরতে গিয়ে ফসকাল, সেখানে সে রেগেমেগে পায়ের আঁচড় দিয়ে মাটি খুঁটতে লাগল। কী জানি, হয়তো তার মনে হয়েছে, পাখিটা এইখানে মাটির নীচে লুকিয়ে পড়েছে!

কী বোকা বেড়াল রে বাবা! সে আবার হয় না কি!

সে তো তুমি-আমি বলব, হয় না। কিন্তু বেড়াল তো আর তোমার আমার মতো বুদ্ধি ধরে না। তাই সে জিদ দেখিয়ে বোকার মতো মাটিতে আঁচড় কাটতে লাগল। অবশ্য কুকুর-বেড়ালের জিদ দেখতে ভারি মজা লাগে!

এই সর্বনাশ, একী দেখি! বেড়ালটার পায়ের আঁচড়ে হঠাৎ ফস করে যে মাটিতে একটা গর্ত দেখা গেল।

তাই তো!

ওই দ্যাখো, পাখির খোঁজে বেড়ালটা গর্তের ভেতর মাথা গলিয়ে দিয়েছে! মনে হল, কী যেন দেখতে পেয়েছে! পাখিটাকে নাকি? না, অন্য কিছু! তাতো জানি না। শুধু জানি গর্ত থেকে মাথা বার করে সে ছুট দিয়েছে।

কোথায়?

হয়তো ইন্নির খোঁজে।

এদিকে বুড়িমার ঘরে তো আর এক কান্ড! কী, না সকালবেলা ইন্নির তো ঘুম ভেঙেছে। ঘুম ভাঙতেই সে সর্বপ্রথম বেড়ালটাকে আদর করে ডাক দিল, ‘আয় আয় মেনি আয়!’

ডাকলে কী হবে! যাকে ডাকছে তাকে তো বুড়িমা রাত্তিরেই বিদেয় করে দিয়েছেন। তাই ইন্নির ডাক শুনে বুড়িমাই ছুটে এলেন। তিনি আসল কথাটা না-বলে অন্য কথা বললেন। বললেন, ‘যাকে ডাকছিস, তাকে তো আমিও দেখতে পাচ্ছি না।’

ইন্নি তখন হতাশ হয়ে জিগ্যেস করল, তবে কি মেনি চলে গেল?

বুড়িমা উত্তর দিলেন, ‘হবে হয়তো।’

ওমা! কোনো কথা নেই, বার্তা নেই, ইন্নি ছুটল। বারদোরের কপাট খুলে সটান সদর রাস্তায়।

বুড়িমা চেঁচালেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

ইন্নিও চেঁচিয়ে উত্তর দিল, ‘মেনিকে খুঁজতে।’ বলতে বলতে ইন্নি চোখের পলকে বুড়িমার দৃষ্টির আড়ালে হারিয়ে গেল। মেনিকে তন্নতন্ন করে খুঁজে এদিকে ওদিকে ছোটে সে। চেঁচিয়ে ডাকে, ‘মেনি, মেনি-ই মেনি-ই-ই!’

তা, সে খোঁজা তো হয়ে গেল অনেকক্ষণ। কিন্তু কোথায় মেনি! তার কোনো পাত্তাই নেই।

কিন্তু একী! হঠাৎ বাঁদিকে তাকিয়ে ইন্নির চোখ কেন থমকে যায়! মনে হল, যেন একটা বেড়াল আনিমানি করে রাস্তায় ঘুরঘুর করছে! সেই তো একই রকম গায়ের রং, সেই একই রকম দেখতে! তা হলে তো দেখতে হয় মেনি কি না!

ইন্নি ছুটল সেদিকে। হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। একটু ছুটেই চিনতে পেরেছে। হ্যাঁ, এ তো সেই মেনিই।

আশ্চর্য কথা, বেড়ালটা ইন্নিকে দেখে দাঁড়াল না তো! উলটে ছুটে পালাচ্ছে! ইন্নিও তার পেছনে ধাওয়া করল। চেঁচাল, ‘মেনি দাঁড়া, দাঁড়া!’

‘মেনি দাঁড়াল না। ইন্নিও তার পিছু ছাড়ল না। কোথায় পালাচ্ছে মেনি? আর তাকে ধরবার জন্যে ইন্নিই বা কোথায় ছুটছে! এ যে ইন্নির অচেনা, অজানা পথ!

শেষমেষ মেনি দাঁড়াল। কোথায় দাঁড়াল! সেই নির্জন জায়গাটায় যেখানে পাপিয়া তার চোখে ধোঁকা দিয়ে ফুড়ুৎ হয়ে গেছে! দাঁড়াল সেইখানে। দাঁড়িয়ে পলকে ঘাড় ফেরাতেই সে দেখতে পেল, তার একেবারে পেছনেই ইন্নি। হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে ইন্নি তাকে ‘আয় মেনি’ বলে যেই ধরতে যাবে, অমনি মেনি মাটিতে পায়ের আঁচড়ে যে গর্তটা খুঁড়েছে, তার ভেতরে মুখ গলিয়ে দিল। ইন্নি তাকে পড়িমরি করে ধরে তুলতেই তার চোখ ঝলসে উঠেছে। দেখে কী,গর্তের ভেতরে ঝকমক করে কী যেন সব ছড়িয়ে আছে। হাতে তুলতেই সে চমকে ওঠে। মনে হল, এ যে সোনা! সোনার মোহর! দেখে থ হয়ে গেছে ইন্নি!

এমন থ হয়ে কে আর থাকে অনেকক্ষণ! সে তো মাত্র মুহূর্তের জন্যে। হঠাৎ তার হুঁশ হতেই সে চটপট মোহরগুলো নিজের জামার কোল-আঁচলে তুলে, মেনিকে নিয়ে ছুটল ঘরের দিকে। ছুটল বুড়িমার কাছে।

দেখে শুনে বুড়িমার তো চক্ষু ছানাবড়া! তারপর ইন্নির মুখে সব শুনে, মনে মনে ভাবলেন, যে বেড়ালটাকে তিনি খেদিয়ে রাস্তায় বার করে দিয়েছিলেন, সেই বেড়ালের এমন সুকাজ! ছি, ছি, কী ভীষণ অন্যায় করেছিলেন তিনি! আক্ষেপে তিনি যেন নিজেকেই নিজে ধিক ধিক করে ধমকান। তিনি সেই পথের বেড়ালকে এবার নিজের কোলে তুলে নিলেন। তুলে, আদর করতে করতে বললেন, ‘ওরে মেনি, ইন্নির মতো তুইও আমার কুড়িয়ে পাওয়া ধন।’ বুড়ির সে আদরের বহর যদি দেখতে, তুমি অবাক হয়ে যেতে। শুধু তা-ই নয়, তিনি প্রায় চোখের জল ফেলতে ফেলতেই স্বীকার করে ফেললেন, ‘শোন রে ইন্নি, কাল রাতে বেড়ালটা পালায়নি। আমিই ওকে ঘর থেকে রাস্তায় বার করে দিয়েছিলুম। আমি কী নিষ্ঠুর! এমন কাজ আমি আর করব না কোনোদিন। আজ থেকে মেনি তোরও যেমন, আমারও তেমন। মেনি আমাদের কাছেই থাকবে।’

পিউ, পিউ-উ-উ!

ওমা! এ যে ইন্নির পাপিয়া। ডাকছে! এতক্ষণ পাখিটা কোথায় ছিল! ইন্নি পাপিয়াকে দেখে আনন্দে হাততালি দিয়ে চিৎকার করে উঠল। ডাক দিল ‘আয় পাখি, আয় আয়!’

পাখি এল। বেড়ালটার মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল। তাকিয়ে পাপিয়া ইন্নির হাতে বসে ছোলা-মটর খেল। তারপর উড়ে গেল গাছে। গাছে বসে গান শোনাতে লাগল। কেউ জানতেও পারল না ওই পাখিটাই আসলে নাটের গুরু!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%