শৈলেন ঘোষ
এই গ্রামটার নাম সবুজ-ছায়া। সত্যি, ভারি মানানসই নাম। গ্রামের চতুর্দিক সবুজ-আনন্দে ভরপুর। দেখতে দেখতে চোখ ঝলমল করে ওঠে। এ গ্রাম দেখলে তোমার মনে হবেই হবে, অন্য যেকোনো শহর যেন সবুজ-ছায়া গ্রামের পাশে নেড়ামাথায় ছোট্ট একটি টিকি। তার মানে এই নয়, সবুজ-ছায়া নামের গ্রামটি বুঝি গাছগাছালি ঘেরা অজ পাড়াগাঁ। মোটেই তা নয়। এ গ্রামের ওপর দিয়েও পিচঢালা রাস্তা চলে গেছে অনেক দূরে। কে জানে কোথা থেকে কোথায় গেছে! হিল্লি-দিল্লি হবে হয়তো! একটু গেলেই রাস্তার ওপারে জল চকচক ঝিল। আর ঝিলটা যেখানে একটু বেঁকে গেছে, তার কোলেই সেই মস্ত বাড়িটা। ওই মস্ত বাড়িটার দিকে ঠায় চোখ মেলে চেয়ে থাকে টুকটু। একটি ছোট্ট মেয়ে স্বপ্ন দেখে! আহা, বড্ডইছোট্ট টুকটু! কিন্তু স্বপ্নটা তার এতই বড়ো যে, কে জানে সেই স্বপ্ন সত্যি হবে কিনা কোনোদিন!
না, টুকটুর বরাতে বই পড়া হয়নি কোনোদিন। ও জানে না, কোনটাকে বলে, ‘অ’, আর গণেশঠাকুরের মতো শুঁড় বেঁকানো এই আঁকটাকে বলে ‘ক’! ওর জানার সময় কই? সারাদিনই তো বাবুদের বাড়িতে কাজ করতে হয়। আর দেখতে হয় কেমন করে দুরন্ত-আনন্দে তার বয়সি, নয়তো তার চেয়ে ছোটো কিংবা বড়ো ছেলে-মেয়েরা ওই মস্ত বাড়িটার ভেতরে হইহই করে ঢুকে পড়ছে। তাদের পিঠে ব্যাগ। ব্যাগে পড়ার বই। এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। ওই মস্ত বাড়িটা ইশকুলবাড়ি। তোমার দেখলেই মনে হবে, সবুজের আড়ালে উঁকি মারছে, কতকালের পুরোনো যেন এক রাজবাড়ি। পুরোনোই বটে! টুকটু শুনেছে, ক-দিন পরে ইশকুলবাড়িটা নাকি একশো বছরে পা দেবে। একশো বছরটা কি কম?
খুব বেশি হলে কতই বা হবে টুকটুর বয়েস, দশ-ই হোক। রোজ তাকে সকাল সাতটার মধ্যে বাবুর বাড়িতে হাজিরা দিতে হয়। তার আগে মা অবশ্য মেয়েকে পেট ভরে হাতেগড়া রুটি, তরকারি খাইয়ে, বাবুদের বাড়িতে পাঠায়। তারপর নিজে কিছু মুখে দিয়ে, অন্য আর এক বাড়িতে কাজে যায়। সারাদিনের কাজ তো, তা-ই দু-বেলা দুটো খাবার জুটে যায় দু-জনের দু-বাড়িতেই। এই যা রক্ষে। তা না হলে সারাদিনের খাটাখাটুনির পর মাস গেলে যা জোটে, তাতে আর যাই হোক ভরন্ত পেটে দিন কাটত না।
যাক গে যাক, সে বিপদ থেকে এখন নিশ্চিন্ত। কিন্তু আর এক বিপদ জেঁকে বসেছে অন্য আর এক জায়গায়! সেই বিপদে জেরবার আর কেউ নয়। জেরবার ওই ছোট্ট মেয়ে টুকটু। সেই কথাই এখন বলি।
আসলে কী জানো, টুকটু যে বাড়িতে কাজ করে সেই বাড়িটা অনেক বড়ো। দোতলা। নীচে মা থাকেন, আর বাড়ির কর্তা। আর দোতলার বড়ো ঘরটায় বড়ো দাদা থাকে। আর ছোড়দা থাকে বড়দার পাশের ঘরে। সেই ঘরেই ছোড়দার পড়াশোনা, শোয়া-বসা সব। ওই যে ইশকুল বাড়ির কথা বলেছি, ওই ইশকুলেরই ক্লাস নাইন-এ ছোড়দা পড়ে। আর বড়দা ওই ইশকুলেরই গানের মাস্টারমশাই। কী ভালো গান গায় বড়দা। কত বড়ো একটা অর্গ্যান বড়দার ঘরে। বেশ একটু রাতে, নীচে মায়ের ঘরের টেলিভিশনটা যখন বন্ধ হয়ে যায়, বড়দা তখন অর্গান বাজিয়ে গান গায়। গ্রামের রাত। চারদিক নিথর নিস্তব্ধ। এদিক-ওদিক গাছে গাছে মাঝে মধ্যে পাখিদের ঝটাপটি, না-হয় কিচির-মিচির ছাড়া কিচ্ছু কানে আসে না। তখন অর্গানের সঙ্গে বড়দার গলায় গানের সুর কী যে অপূর্ব শুনতে লাগে! যে কোনোদিন শোনেনি তাকে কেমন করে বোঝাই। টুকটুর তো একটা গান বড়দার গলায় শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে। বললে এখনই গেয়ে দিতে পারে। কী মিষ্টি গানটা। শোনো তাহলে—
পাখিরা যে গান গায়
তাকে বলি কলতান,
ভোরের আলোয় ঘুম
ভাঙে শুনে সেই গান।
সাগরের ঢেউ নাচে
শুনে বুঝি সেই সুর,
উতল হাওয়ায় মন
আনন্দে ভরপুর।
আকাশে মিঠে রোদ,
তারই তানে সংগত,
দূরে দূরে গানে গানে
ভেসে যায় মনপ্রাণ।
যদি জিগ্যেস করো টুকটুর কেমন করে এত বড়ো গানটা মুখস্থ হল? তাহলে আসল কথাটাই বলতে হয়। বাবুদের বাড়ির সারাদিনের কাজ তো আর সাঁঝের বেলায় শেষ হয় না। কাজ সারতে বেশ রাত হয়ে যায়। তাই টুকটুর মা কাজকম্ম সেরে নিজে আসে বাবুদের বাড়িতে। নিজে এসে সঙ্গে করে নিয়ে যায় মেয়েকে নিজের বাড়িতে। গ্রামে সবে ইলেকট্রিকের আলো এসেছে। তবে, এখনও সব জায়গায় পৌঁছোয়নি। অবশ্য পোস্ট পোঁতা হয়ে গেছে। এই ভালো যে, টুকটু যে-বাড়িতে কাজ করে, সেই বাবুদের বাড়িতে আলো এসে গেছে। তা, হয়েছে কী, রোজই একটু রাত হলেই বড়দা অর্গ্যান বাজাতে বসে যায়। আর এদিকে টুকটু একটু তাড়াতাড়ি কাজ সেরে, মা আসার আগে, চুপিসারে দোতলায় ওঠে। বড়দার ঘরের দরজা ভেজানো থাকে। সেই ভেজানো দরজায় নি:শব্দে কান পেতে টুকটু শোনে অর্গ্যানের মিঠে সুরের সঙ্গে বড়দার মিষ্টি গলার গান। শুনতে শুনতে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় মেয়েটা। সে বড়দার গলায় একের পর এক কত গান শুনেছে। কিন্তু মনে মনে আউড়ে ওই গানটাই মনে থেকে গেছে।
টুকটুর এই কান্ডটা একজনের কিন্তু চোখ এড়ায় না। সে হল ছোড়দা। সত্যি বলতে কী, ছোড়দা কিন্তু ছোট্ট মেয়েটাকে খুব পছন্দ করে। এককথায় ছোড়দা যখন বাড়িতে থাকে, টুকটু তখন ছোড়দার খেলার সাথি। ওই ছোট্ট মেয়ে টুকটুর কাজের ফাঁকে ফাঁকে দুটিতে কখনো গান হচ্ছে। কখনো লুকোচুরি খেলা হচ্ছে। কখনো টুকটুর নাচ হচ্ছে। সত্যি সত্যি নাচ না জানলে যেমন এলেবেলে নাচ হয়, তেমন আর কী! কিন্তু তা বলে টুকটুর নাচকে এলেবেলে বলা যাবে না। তাহলেই কিন্তু মেয়ের মুখ ভার। না, না, সেরকম ভার নয়, একটু পরেই হাসিহাসি মুখ!
আর, হাসির কথা বলতে না-বলতেই সেদিন একটা দারুণ হাসির কান্ড ঘটে গেল। হল কী হঠাৎ কোথাও কিছু নেই, ছোড়দা বলল কী, ‘জানিস টুকটু, আমি আজ একটা হাসির গান লিখেছি।’
গানের কথা দূরে থাক, টুকটু তো ছোড়দার গান লেখার কথা শুনেই হেসে কুটোপাটি। হাসতে হাসতে বলল, ‘এ বাবা তুমি তো সবে ক্লাস নাইন-এ পড়ছ। এর মধ্যেই গান লিখতে শুরু করেছ। তা-ই আবার হয় নাকি! আমি লিখতে-পড়তে জানি না বলে আমাকে বোকা ঠাউরাচ্ছ না?’
টুকটুর হাসি শুনে ছোড়দারও যে হাসি পেল না, তেমন না। তবে হাসিটাকে চেপে সে এবার বলল ‘তোকে আমি মোটেও বোকা ঠাউরাচ্ছি না। আমি সত্যি-সত্যি কী লিখেছি শোন তা হলে।’
‘বলো, শুনি!’ টুকটু ছোড়দার মুখের দিকে তাকাল। ছোড়দা খাতা বার করে পড়ল—
ড্যাং কুড় কুড় বাজছে ঢাক
দাদুর মাথায় মস্ত টাক
টাকের ওপর লম্বা টিকি
ওটা টিকি নাকি? টিকটিকি!
গানের কথা শুনে কার না হাসি পায়! টুকটুও যে হাসবে এ তো জানা কথাই। কিন্তু টুকটু হাসতে হাসতে ছোড়দাকে যখন বলল, ‘ও, এবার বুঝতে পেরেছি, এসব কান্ড করবে বলেই সকাল থেকে তোমার পেট কামড়াচ্ছিল, তাই ইশকুল কামাই করলে।’
ছোড়দার এই পেট কামড়ানোর মিথ্যে কথাটা টুকটুর মুখ থেকে সবটুকু বেরিয়ে আসার আগেই ছোড়দা টুকটুর মুখটা চেপে ধরেছে। ধরে, ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘চুপ, কথাটা মার কানে গেলে আমার কান রেহাই পাবে না। এমন মলে দেবে, উঃ!’ উঃ বলেই ছোড়দা চমকে টুকটুর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। ছোড়দা এমন চমকাল মনে হল, এখনই মা বুঝি কানে হাত দিল তার।
না, তেমন কিছু নয়। কিন্তু ছোড়দা তখনই কাকুতি-মিনতি করে মেয়েটাকে বলল ‘আমার এই মিথ্যে কথাটা মাকে যেন কখনো বলিস না টুকটু! মা তো কান মলে দেবেই, বাবা শুনলে বাবাও দু-দিন আমার সঙ্গে কথা বলবে না।’
টুকটু খুব জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে ছোড়দাকে বলল, ‘তোমাকেও কিন্তু তা হলে আমার একটা কথা রাখতে হবে!’
‘কী কথা?’
‘বলো রাখবে?’
‘না শুনলে কেমন করে বলব?’
টুকটু বলল, ‘আমি দেখেছি, বড়দা যখন থাকে না, তখন তুমি চুপি চুপি বড়দার ঘরে ঢুকে অর্গ্যান বাজাও। দরজা-জানলা সব আঁটসাট করে বন্ধ রাখো বলে তেমন শুনতে পায় না কেউ। আমি দেখতে পাই বলে, দরজায় কান রেখে শুনতে পাই। এখন তুমি যদি আমায় কেমন করে অর্গ্যান বাজাতে হয় একটু শিখিয়ে দাও, তাহলে তোমার পেট-কামড়ানোর মিথ্যে কথাটা কাউকে বলব না।’
আশ্চর্য কথা কী, এককথায় ছোড়দা টুকটুর এই শর্তে রাজি হয়ে গেল। শুধু রাজি নয়। বলল, ‘আজই তোকে অর্গ্যান বাজানোর প্রথম কায়দাটা শিখিয়ে দেব। দাদা এখন ইশকুলে। দাদার ছুটি হতে এখনও দেরি আছে। এই তাল।’
তালই তো বটে। এখন তো দুপুর। কাজেই নীচের ঘরে মা আর বাবা একটু গড়িয়ে নিচ্ছেন। একেই বলে ভাতঘুম। সারা সকাল কাজের মেয়েটাকে দিয়ে, তার সাধ্যমতো এটা-ওটা ঘরের কাজ করিয়ে নিয়ে, এখন একটু ছুটি। টুকটুরও এখন ছুটি। অন্যদিন হলে এই ফাঁকে সে-ও একটু ঘুমিয়ে নিত। কিন্তু আজ ছোড়দা ইশকুলে যায়নি। তাই, ঘুমের বদলে তার ছোটাছুটি করার কথা। কিন্তু না, আজ ছোটাছুটির দিনও নয়। আজ প্রথম অর্গ্যান বাজানোর দিন।
বলতে না বলতেই দুটিতে ঢুকে পড়ল বড়দার ঘরে। ঘরের দরজায় খিল না-দিয়ে শুধু ভেজিয়ে রাখল। ছোড়দা ডালা খুলে বসে পড়ল অর্গ্যানের সামনে। শুরু হল অর্গ্যানের রিড টেপা। বলতে কী, ছোড়দাও তো আর পাকাপোক্ত অর্গ্যান বাজিয়ে হয়ে ওঠেনি এখনও। ক্লাস নাইন-এ পড়ছে। বয়সটা তো এখন কাঁচাই বলা যায়। সুতরাং, অর্গ্যান বললেই তো আর ওস্তাদের মতো চমক দিয়ে বাজানো যায় না। তার সাধ্যে কুলোবে কেন?
না, এখন ছোড়দার হাতে এ বাজনার শব্দ শুনে কোনো সমঝদার মানুষ আহা-আহা বলে তারিফ করবে না ঠিকই, কিন্তু বাজনার শব্দে চমকে উঠেছিল টুকটু। তুমি যদি তখন দেখতে মেয়েটাকে তোমার ঠিক নজরে পড়ত, তার টুকটুকে ঠোঁট দুটো যেমন কাঁপছিল তার হাতের আঙুলও। এমনকী, ধড়ফড় করছিল তার সারা দেহমন।
ঠিক এমনই সময়ে উত্তেজনায় অস্থির টুকটু ছোড়দাকে জিগ্যেস করল, ‘বড়দার যে গানটা শুনে শুনে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে, সে গানটা তুমি বাজাতে জানো?’
ছোড়দা রিড থেকে হাত নামিয়ে অর্গ্যান থামিয়ে জিগ্যেস করল, ‘‘কোন গানটা? ‘পাখিরা যে গান গায়’ সেই গানটা?’’
কথা শেষ হল না, ঠিক সেই মুহূর্তে আচমকা ঘটে গেল এক ভয়ংকর কান্ড। যা একেবারেই কেউ ভাবতে পারে না। কী, না হঠাৎ কার যেন হাতের ঠেলায় বড়দার ঘরের দরজা হাট হয়ে খুলে গেল। থতোমতো খেয়ে গেছে টুকটু আর তার ছোড়দা। ছোড়দা তো অর্গ্যানের সামনে থেকে পড়িমরি করে উঠে পড়েছে। এমন অসময়ে কে ঢুকল ঘরে?
ঢুকল যার ঘর সে, বড়দা। সঙ্গে ইশকুলের পোশাকে দুটি ছেলে, দুটি মেয়ে। বোঝাই যাচ্ছে, ইশকুলের ছাত্র-ছাত্রী।

বড়দা ধমকে উঠল, ‘কী করছিস তোরা? আমাকে না-বলে, আমার ঘরে ঢুকে অর্গ্যান বাজিয়ে গান গাওয়া হচ্ছে!’ তারপর রেগে ছোড়দার দিকে চোখ পাকিয়ে কী জোর বকা দিল। বলল, ‘বুঝতে পেরেছি যত নষ্টের গোড়া তুই! এই দামি অর্গ্যানটা খারাপ হয়ে গেলে, তখন কী হত? তুই সারিয়ে দিতিস? এক্ষুণি আমার সামনে থেকে চলে যা! নইলে কান ছিঁড়ে দেব!’
ছোড়দা মাথা নীচু করে বেরিয়ে গেল। পেছনে পেছনে বেরিয়ে গেল টুকটুও। টুকটু যে মনে মনে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে, সে তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। যতই হোক বড়দার সঙ্গে যে চারজন ছেলে-মেয়ে এসেছিল, তারা তো ছোটো নয়। বয়সে সক্কলে প্রায় টুকটুর বয়সিই হবে। তাদের সামনে বকলে মনে কষ্ট হবে না? খানিক পরে অর্গ্যানটা যখন বড়দার হাতে আবার বেজে উঠল, আর ওই চারজন ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইতে শুরু করল, তখন টুকটু আন্দাজ করতে পারল এরা সবাই ইশকুলের ছাত্র-ছাত্রী। ক-দিন পরে ইশকুলের একশো বছর পূর্ণ হলে খুব বড়ো অনুষ্ঠান হবে তো, বোধহয় তারই জন্যে, বড়দা এদের অর্গ্যানের সুরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান শেখাতে নিয়ে এসেছে নিজেদের বাড়িতে।
টুকটুর আন্দাজটা নেহাতই মিথ্যে নয়, একেবারেই সত্যি। যাই হোক, বড়দার বকাঝকার কথাটা পাঁচকান করল না টুকটু। এমনকী টুকটু তার আদরের মাকেও বলল না। কষ্টটা নিজের মনেই চেপে রাখল।
পরের দিন ঠিক যথাসময়েই টুকটু বাবুর বাড়িতে কাজে গিয়েছিল। যথাসময়েই তার কাজের নিয়ম যেমন, সেইমতো সকালে বড়দার জন্য চায়ের কাপ নিয়ে দোতলায় বড়দার ঘরে গেল। অন্যদিন যেমন বড়দার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিতে দিতে বলে, ‘বড়দা চা’। আজ কিন্তু সে বড়দার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিল বটে, তবে সেই কথাটা বলতে পারল না। বলতে পারল না ‘বড়দা চা’। কেন-না, তার চোখে জল। তার সেই কান্নামাখা মুখটা বড়দার চোখ এড়াল না। তাই জিগ্যেস করল, ‘তোর চোখে জল কেনরে টুকটু? কী হয়েছে?’
টুকটু প্রথমটা কথার উত্তরই দিতে পারেনি। উত্তর দিতে গেলেই সে যে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেলত। সে তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। কাজেই কথার উত্তর না পেয়ে বড়দা তো জিগ্যেস করবেই,‘কী হয়েছে তোর?’
এবার টুকটুর চোখ থেকে টুপ করে একফোঁটা জল মাটিতে পড়ল। অমনি তার মুখ দিয়ে কথা বেরিয়ে এল। ‘‘তুমি শুধুমুধু ছোড়দাকে কাল বকলে। ছোড়দার কোনো দোষ নেই। যত দোষ আমার। আমিই ছোড়দাকে বলেছিলুম, বড়দার এই ‘পাখিরা যে গান গায়’ এই গানটা শুনে শুনে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। আমি গাইতে পারি। তুমি অর্গ্যান বাজাতে পারবে? ছোড়দা উত্তর দেওয়ার আগেই—’’এইটুকু বলেই আর কথা বলতে পারল না টুকটু।
উলটে হল কী, একটু অবাক হয়েই বড়দা তাকে জিগ্যেস করল, ‘তুই গান গাইতে পারিস?’
টুকটু এবার হাসল, মুচকি হাসি। কোনো কথা বলল না। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। লজ্জায়।
‘পাখিরা যে গান গায়—এই গানটা তুই গাইতে পারিস?’
এবার টুকটু ঘাড় নাড়ল। যার মানে পারি।
‘আমার অর্গ্যানের সঙ্গে গাইতে পারবি?’
টুকটুর সারা মন আকুল হয়ে ওঠে। ধীর গলায় এবার সে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, পারব।’
বড়দা বলল, ‘গা তো, দেখি!’ বলে বড়দা অর্গ্যান খুলে বসল। টুকটু অর্গ্যানের সুরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠল—
পাখিরা যে গান গায়
তাকে বলি কলতান
একেবারে অবাক কান্ড যেন! আহা, কী গান গাইল মেয়েটা! কী মিষ্টি মধুর গলার স্বর! ভাবা যায় না! সারাঘর যেন সেই সুরের ঝংকারে এখনও উছলে উঠছে। বড়দা তো মেয়েটার গান শুনে থ। একটা ছোট্ট মেয়ের গলায় এমন যে এক অসাধারণ সুর লুকিয়ে থাকতে পারে, এ যেন ভাবতে পারে না বড়দা! বড়দা কতক্ষণ যে অবাক চোখে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল, তার খেয়াল ছিল না। হঠাৎ হুঁশ হতেই হাঁক পেড়ে ডাক দিল মাকে, বাবাকে হইহই পড়ে গেল। ডাক দিয়ে বলল, ‘শোনো বাবা, শোনো মা, আজ থেকে টুকটু আমাদের বাড়িতে আর ঘরকন্নার কাজ করবে না। ওকে আমি ইশকুলে নিয়ে যাব। তোমরা ভাইকে বলে ওর মাকে ডেকে পাঠাও। ওর মাকে যা বলার আমি বলব।’
সঙ্গে সঙ্গে টুকটুর ছোড়দা ছুটল তার মাকে ডাকতে। সঙ্গে সঙ্গে টুকটুর মাকে ডেকে নিজের ঘরে বসাল। তারপর বড়দা নিজের মাকে ডেকে নিল। নিয়ে, টুকটুর মাকে বলল, ‘শোনো মাসি, টুকটু আর আমাদের বাড়ির ঘরকন্নার কাজ করবে না। শুধু আমাদের বাড়িই বা বলি কেন, কারও বাড়িতেই আর ওকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হবে না। এবার ওকে আমি আমাদের ইশকুলে নিয়ে যাব। ইশকুলে আমার কাছে গান শিখবে, আর অন্য মাস্টারমশাইদের কাছে লেখাপড়া শিখবে। আমি ওর দেখাশোনার ভার নিলুম। মেয়েটার ভেতরে যে এত গুণ আছে এ তো আমার আগে জানাই ছিল না। দেখো, ও একদিন আমাদের সকলের মুখ উজ্জ্বল করবে। আর শোনো মাসি, এরপর কী হবে, না হবে এ নিয়ে তুমি কিচ্ছু ভেবো না। সে ভাবনা আমার। আর শোনো, আমাদের বাড়ি থেকে টুকটু সারাদিন কাজ করার জন্য যে টাকা পেত, সে টাকাটাও তুমি মাসে মাসে আমার কাছ থেকে পেয়ে যাবে। তবে একটা কথা বলি, যেদিন টুকটু সোনায় মোড়া মুকুট মাথায় পরবে, সেদিন আমাদের খাওয়াতে হবে।’ বলে বড়দা হো-হো করে হেসে উঠল।
টুকটুর মায়ের চোখে জল ছলছল করে উঠল। থাকতে পারল না টুকটুও। ছুট্টে গিয়ে, মাকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। সে কান্না দুঃখের নয়, আনন্দের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন