সুনামি

শৈলেন ঘোষ

মঞ্চ

প্রথম দৃশ্য

[পাহাড়। সমুদ্র। মধ্যিখানে একটি দ্বীপ। পাহাড়ের গায়ে একটি চার্চ, একটি মন্দির। যেমন মানুষ বাস করে এখানে, তেমনই বেড়াবার জায়গাও বটে। একটি ছেলে। তার নাম টুসু, বয়স বারো। একা। দেখছে আকাশে মেঘ। দর্শকের দিকে মুখ ফিরিয়ে সে বলতে শুরু করল।]

টুসু : এই যে সমুদ্র, ওই দেখছ পাহাড় আর মধ্যিখানে দ্বীপ—এই আমাদের জন্মভূমি। থাকি এইখানে। আমি থাকি, মা থাকে, বাবা, দাদু আর আমার বোন মানটি। আমাদের বন্ধু অনেক। ভিনদেশি কত লোক বেড়াতে আসে এখানে। এখন দেখছ। আকাশ মেঘে ঢাকা। খানিক পরেই দেখবে মেঘ কেটে ঝলমলে দিন। তখন কী ভালোই না দেখতে লাগে চারিদিক।

আমি কে? নাম শুনে হেসো না যেন—টুসু। আমরা ধীবর। জানো কাদের বলে? যাদের ব্যাবসা মাছ ধরে বেচাকেনা করা। আমার বাবা মাছ ধরেন। আমি ইশকুলে যাই। মা সামলান ঘরকন্না। দাদু আর আমার ছোট্ট বোন মানটি যায় সমুদ্রতটে। কুড়িয়ে আনে রঙিন ঝিনুক। মা গাঁথেন ঝিনুকের মালা। ওই দ্যাখো আমার দাদু আসছেন মানটিকে নিয়ে, দাদু আর নাতনিতে এখন কত মনের কথা হবে। আমি থাকলে সব মাটি। আমি পালাই।

[টুসু দ্রুত বেরিয়ে গেল]

[ছোট্ট মেয়ে মানটির হাত ধরে দাদু প্রবেশ করল। মানটি দাদাকে দেখতে পেয়েছে। দাদা দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে।]

মানটি : দ্যাখো, দ্যাখো দাদু, দাদা কেমন পালাচ্ছে!

দাদু : কাল টুসু বড়ো হবে আর-এক বছর। টুসুর জন্মদিন কাল। কত মজা হবে।

মানটি : আমারও বড্ড ভালো লাগছে দাদু। বন্ধুরা আসবে সব। কত গান হবে। কত খাওয়া-দাওয়া। কত কী দেবে সবাই। আমি কী দেব দাদাকে?

দাদু : তুই তো ছোট্ট এখন। তোকে কিছুই হবে না দিতে। তুই শুধু হেসে-খেলে করবি মজা। আর মায়ের গাঁথা ঝিনুকের মালা পরিয়ে দিবি দাদার গলায়।

মানটি : তবে শুনি তুমি কী দেবে?

দাদু : নিজে কিছু পাই না ভেবে। তুই বল না, কী দেব!

মানটি : করবে একটা কাজ? তবে খুব মজা হবে।

দাদু : কী এমন সে-কাজ? কী কাজে মজা?

মানটি : আমি যখন মালা দেব দাদার গলায়, তুমি যদি তখনই গেয়ে ওঠো গান, তখন দারুণ হবে, দারুণ মজা।

দাদু : [হাসি] বলেছিস ভালোই, কিন্তু বিপদ কী জানিস, আমি কি গাইতে পারি এখন তেমন!

মানটি : খুব পারো। এই তো সেদিন তুমি সমুদ্দুরের গান গাইলে। কী ভালো।

দাদু : ঠিক আছে, আমি যদি গান গাই, তোকে তবে নাচতে হবে। [হাসি]

মানটি : [হাসতে হাসতে] কী যে বলো তুমি, আমি কি নাচতে পারি?

দাদু : যা পারিস তাতেই হবে।

মানটি : তাহলে এক কাজ করি এসো। [চুপিসারে চারদিক দেখে] কাছেপিঠে কেউ নেই। তুমি গাও, আমি নাচি। পারি কিনা দেখি!

দাদু : ঠিক আছে, সেই ভালো। আমি তবে গাই?

[দাদুর গান]

টুসু আমার স্বপ্ন যেন

মানটি আমার কল্পনা,

টুসু আমার আকাশ হলে

মানটি তারার আলপনা।

টুসু যখন বাতাস হয়ে

খেলবে লুকোচুরি,

মানটি তখন লুকিয়ে দোলে

ফুলের একটি কুঁড়ি।

এই নিয়ে প্রাণ রাঙিয়ে তুলি

আশার আলোয় বাঁধছি মন,

ওরে আমার চোখের মণি

মানটি-টুসু দুই নয়ন।

[দাদু আর মানটির যখন গান-নাচ চলছে, তখন, বেড়াতে এসেছে একজন ভিনদেশি মুসাফির, হঠাৎ উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়ে নাচগান উপভোগ করছে। নাচ-গান শেষ হলে মানটি আর দাদু দু-জনেই হেসে উঠল, আর সেই ভিনদেশি মানুষটি সামনে এসে হাততালি দিল।]

মুসাফির : [তালি দিতে দিতে] শাবাশ শাবাশ! [দাদুকে উদ্দেশ্য করে] আরে দাদা আপনি তো কামাল করিয়া দিলেন। এত ভালো গানা আসে আপোনার! এত ভালো নাচা জানে এইহি গুড়িয়া!

মানটি : না, না, আমার নাম গুড়িয়া নয়, গুড়িয়া নয়। আমার নাম মানটি। আপনি কে, তা জানি না তো? কোথায় থাকেন?

মুসাফির : আমি মুসাফির। দেশে দেশে ঘুমি। আউর তোমহার মাফিক মানটিকো দেখনে পর নাচা দেখি, গানা শুনি।

মানটি : ওটা কী আপনার হাতে?

মুসাফির : তুমহার প্রাইজ। তোমার নাচা দেখে হামার বহুত আচ্ছা লাগল। তাই এ-প্রাইজ তোমহাকে দিলাম।

মানটি : [প্রাইজ হাতে নিয়ে] ওমা! এ যে তোড়া পায়ে পরার!

দাদু : [বাধা দিয়ে] এ কী করছেন? এ যে অনেক দামি!

মুসাফির : বুড়াদাদা, মানটির নাচা হামার ভালো লাগল। তাই দিলাম। আপনি কুছু ভাববেন না।

মানটি : বাবা দেখলে বকবে আমায়। বলবে পরের জিনিস নিতে নেই।

মুসাফির : [মানটিকে আদর করে] হামি তুমহার পর না আছে। হামি তুমহার আপোন আছে।

মানটি : বলো দাদু এখন কী করি? বাবা বকলে তখন? কী বলব?

মুসাফির : তোমায় কুছু বলতে হোবে না। বলিবে একটো মুসাফির হামায় দিয়েছে। [হাসবে]

[হাসির শব্দের সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকাল। বাজ পড়ল। ঝড় উঠল। যেন সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল। মঞ্চ থেকে সবাই বেরিয়ে গেল। খানিক পরেই দুর্যোগ কাটল। মানটির মা হন্তদন্ত হয়ে মঞ্চে ঢুকল। চিৎকার করে ডাক দিল।]

মা : টুসু-উ-উ-উ!

[ছুটতে ছুটতে টুসু মঞ্চে ঢুকল।]

টুসু : ভয় নেই মা।

মা : কী বলছিস তুই! তোর বাবা যে সাগরে মাছ ধরতে গেছে। যদি বিপদ হয়!

টুসু : না মা, অমন কথা ভাবছ কেন তুমি? বাবা আমার ভয় পায় না ঝড়কে।

মা : তবু আমার কেমন ভয় লাগে।

টুসু : [মাকে আদর করে] মাগো, বড়ো হলাম সমুদ্র দেখতে দেখতে। সমুদ্র আমাদের বন্ধু। বলো, বন্ধুকে কেউ ভয় পায়?

[এমন সময়ে সেই মুসাফিরকে নিয়ে মানটি ঢুকল]

মানটি : এই দ্যাখো মা, ইনি মুসাফির। আমাদের নতুন বন্ধু।

মুসাফির : [মাথা নত করে] আদাব মাজি!

মা : বসুন আপনি।

মানটি : এই দ্যাখো মা, মুসাফির এইটা দিলেন। [মানটি পায়ের তোড়া তুলে ধরল।]

মুসাফির : হাঁ মাজি, আপনার মানটি নাচে বহুত আচ্ছা।

মানটি : [টুসুর কাছে গিয়ে, টুসুর হাত ধরে] আমার দাদা।

টুসু : [মুসাফিরকে] আদাব।

মুসাফির : তুমহি ভি নাচা জানে? গানা?

[টুসু হাসল। মানটিও হেসে উঠল]

মানটি : [হাসতে হাসতে] না না, দাদা নাচতে পারে না। গাইতে পারে।

মুসাফির : তবে তো তুমহার একটো গানা শুনবে হামি। শুনাও!

টুসু : মুসাফির এখন ঝড় উঠেছে জোরে। বাবা গেছে মাছ ধরতে সুমুদ্দুরে। বাবা ফিরলে গান শোনাব।

মানটি : জানেন মুসাফির, কাল দাদার জন্মদিন।

মা : আপনি এলে খুব খুশি হব।

মুসাফির : কাল হামি থাকবে না মা।

মা : কোথায় যাবে?

মুসাফির : ফিরে যাবে। মুলুক।

[ঠিক এই সময়ে টুসুর বন্ধুরা ঢুকল]

বন্ধু ১ : এই টুসু, খুঁজছি তোকে কখন থেকে।

টুসু : কেন?

বন্ধু ২ : খেলবি না?

টুসু : না থাক। আকাশ নয়কো ভালো। মনে হচ্ছে ঝড় উঠবে আবার। তার চেয়ে বরং আয় গল্প করি। এই দ্যাখ আমাদের নতুন বন্ধু মুসাফির।

মা : সে-ই ভালো। দিচ্ছে হাওয়া এলোমেলো। তোমরা বরং গল্প করো। আসছি আমি।

[বেরিয়ে গেল]

বন্ধু : কালকে টুসুর জন্মদিন। খুব মজা হবে। [মুসাফিরকে] আসবেন তো আপনি?

মুসাফির : না বাবা, হামি কাল চলিয়া যাবে।

বন্ধু : সে কী কথা! আর একটা দিন থাকুন না! আমরা গান বানিয়েছি।

বন্ধু : আমরা গাইব, মানটি নাচবে।

মুসাফির : হামাকে কাল যেতেই হোবে। তুমহারা এক কাম করো, যো গান বানিয়েছো হামায় এখোন শুনাও। হামি গান শুনবে, মানটির নাচ দেখবে।

বন্ধু : যদি না থাকেন, তবে তাই হোক। মানটি, তুই নাচ তা হলে!

[বন্ধুদের গান]

ঢেউ উঠেছে সমুদ্দুরে

আকাশ দেখছে চেয়ে,

গাঙচিলটা না ধরল

ছোঁ মেরে মাছ পেয়ে।

বালুচরে শাঁখ ঝিনুকের

দেখছ ছড়াছড়ি ;

ঢেউ-এর ফেনা তটের ওপর

দিচ্ছে গড়াগড়ি।

জল থই থই পাতাল তলে

শুশুক তিমির বাসা,

সেথায় দ্যাখো প্রবাল এমন

রং-বেরং-এ ঠাসা।

[গান আর নাচের মধ্যেই প্রবল ঝড় উঠল। পড়িমরি করে সবাই এদিকে-ওদিকে ছোটাছুটি করতে লাগল। চ্যাঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। মঞ্চের আলো নিভে গেল। ঝড় থামল। আলো জ্বললে দেখা গেল মঞ্চ শূন্য। শূন্য মঞ্চে পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে একটি ছেলে। সে টুসুর বন্ধু। তার নাম সানা। টুসু হন্তদন্ত হয়ে মঞ্চে ঢুকল। সে-ও ঝড়ে বিধ্বস্ত।]

টুসু : কী হল ভাই সানা?

সানা : ঝড়ের ধাক্কায় পড়ে গেলাম। পায়ে লাগল।

টুসু : কই দেখি, তাই তো বটে। ঘরে চ পৌঁছে দিয়ে আসি।

সানা : যাব আমি কেমন করে?

টুসু : ধরছি আমি, দাঁড়া দেখি!

[টুসু ধরে দাঁড় করাবার চেষ্টা করল। সানা দাঁড়াবার চেষ্টা করল পারল না।]

সানা : না, না, না, পারছি না তো। লাগছে ভারী আমার।

(বসে পড়ল)

টুসু : বল তো শুনি, লাগছে কোথায়?

সানা : লাগছে হেথায়।

টুসু : তাই তো বটে। ফুলে গেছে!

সানা : ইস, ছি ছি কাল কী হবে? ভেবেছিলাম তোর জন্মদিনে করবো মজা কত কী? ভেস্তে গেল সব!

টুসু : অত কেন ভাবছিস তুই? কাল তুই ঠিক ভালো হয়ে যাবি দেখিস!

সানা : কী সাংঘাতিক ঝড়টা। এমন দিল ঝাপটা! পড়ে গেলাম। ঘরে এবার যাব কেমন করে? বল তো?

টুসু : আমি তোকে পৌঁছে দেব। আমার পিঠে বস!

সানা : বলছিস কী, লাগবে যে তোর।

টুসু : লাগবে নাকো কিছু। বস তো দেখি!

সানা : না ভাই টুসু না। তোর যে ভীষণ কষ্ট হবে!

টুসু : ভাবিস না তো অতশত ওঠ তো আমার পিঠে।

সানা : [টুসুর পিঠে বসতে বসতে] দেখিস টুসু, কষ্ট হলে বলিস!

[টুসুর পিঠে সানা বসল। বসে বেরিয়ে গেল। ঠিক সেই সময়ে অন্যপথ দিয়ে টুসুর ঝড়ে বিধ্বস্ত বাবা মাছ নিয়ে ঢুকল]

বাবা : [কাতর গলায় ডাক দিল] মানটিসোনা! টুসু! কোথায় গেলি?

[মা বেরিয়ে এল]

মা : তুমি কেমন করে এলে? ঝড়কে তুমি সত্যি বুঝি জয় করেছ। তবে তো বলল টুসু ঠিকই। ছেলে তোমায় ঠিক চিনেছে। বললে আমায়, দেখো বাবা ঝড়কে করে জয়, আসবে ফিরে ঘর।

বাবা : এই নাও টুসুর জন্মদিনের মাছ। কোথায় গেল টুসু?

[দাদু ঢুকল]

দাদা : টুসুর বন্ধু সানা চোট পেয়েছে ভারী। তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে গেছে।

বাবা : কী হয়েছে সানার?

দাদু : ঝড়ের তোড়ে ছিটকে পড়ে পায়ে আঘাত পেয়েছে।

বাবা : মানটি কোথায়?

[এদিক-ওদিক দেখে]

দাদু : তাই তো বটে! কাছে পিঠে দেখছি না তো তাকে!

[ডাক দিল] মানটি!

বাবা : মানটি কোথায় গেলি!

মা : [ডাক দিয়ে] মানটি সোনা।

বাবা : [ডাক দিয়ে] মানটি, এই দ্যাখ তোর দাদার জন্যে মাছ এনেছি মস্ত। কালকে টুসুর জন্মদিনে ভোজ হবে একপ্রস্থ।

দাদু : তাই তো! কোনো সাড়া নেই তার!

মা : মানটি।

[মানটির নাম ধরে চতুর্দিকে ডাক, কখনও মঞ্চে, কখনো মঞ্চের বাইরে]

মা : [ভাবনায় অস্থির] নেই তো মেয়েটা এদিক-ওদিক কোথাও!

দাদু : [ব্যস্ত] তাই তো! মেয়েটা গেল কোথায়?

বাবা : ঝড়ের ঝাপটায় কার বাড়িতে ঢুকল।

মা : [কান্না-কান্না গলায়] তবে কি একটু আগে পরদেশি এক মুসাফির—

বাবা : মুসাফির? কোথায় থাকে?

মা : না, না জানি না।

বাবা : এই দেখেছ, কোন দেশের কোন মুসাফির, সুযোগ পেয়ে মেয়েটাকে লুকিয়ে হরণ করল না তো!

দাদু : আমার তা হয় না মনে, লোকটাকে দেখে তো ভালোই মনে হল।

বাবা : কে ভালো, কে মন্দ, বলা খুবই শক্ত। কার মনে কী মতলব, কে বলতে পারে। লোকটা যে ধূর্ত নয়, তুমি বলতে পারো কি? দিনকাল মোটেই ভালো নয়।

মা : [কেঁদে] ওমা! এ কী কথা সর্বনেশে! মেয়েটা কি শেষকালে পড়ল বদলোকের হাতে! করল তাকে হরণ!

দাদু : কী জানি মা, বলতে আমি পারছি নাকো তেমন। এমনও তো হতে পারে, সে অন্য কোথাও, অন্য কারও ঘরে নিরাপদে আছে। ঝড়ের ভয়ে ঠাঁই নিয়েছে সেখানে।

[টুসু আর বন্ধুরা ঢুকল]

টুসু : [বাবাকে দেখে] বাবা, তুমি কখন এলে?

বাবা : [গম্ভীর] এই, এখনই।

টুসু : [মাকে দেখে] মা! তোমার চোখে জল কেন?

মা : মানটিসোনা কোথায় গেল পাওয়া যাচ্ছে না।

টুসু : মানে?

মা : ঝড়ের পরে তার নেইকো দেখা!

টুসু : সে আবার কী?

বাবা : [গম্ভীর] শুনতে পেলাম নাকি, ঝড়ের সময় কোন এক মুসাফির তার সঙ্গে ছিল!

টুসু : তাতে কী!

বাবা : তুই দেখেছিস তাকে?

টুসু : দেখেছি তো। খুব ভালো লোক।

বাবা : বুঝলি কেমন করে?

টুসু : লোকটি, মানটির নাচ দেখে খুব খুশি হয়েছে। তাই দিয়েছে দুই পায়ে দুই তোড়া, খাঁটি রুপোর। সে কখনও খারাপ হতে পারে না।

বাবা : সেই লোকটাই লোভ দেখিয়ে হরণ করেনি তো?

টুসু : [হেসে] না, বাবা না, এ কী কথা বলছ তুমি? মানটি বোধহয় অন্য কোথাও গেছে! ঝড়ে বোধহয় আটকে পড়েছে। ঠিক আসবে ফিরে।

বাবা : ফিরলে সে তো ফিরত এখনই। ঝড় তো কখন হয়েই গেছে শেষ!

টুসু : ঠিক আছে, ভেবো নাকো তোমরা। [বন্ধুদের] চ তো দেখি আমরা খুঁজে আনি। যাবে সে আর কোথা?

বন্ধুরা : হ্যাঁ তাই চ। হ্যাঁ, হ্যাঁ সেই ভালো, চ।

মা : ভয়ে মন কেমন কেমন করছে। যদি না পাই মেয়ের দেখা আর!

দাদু : অমন কথা বলতে যে নেই অলুক্ষণে। তোমরা দেখো আসবে সে ঠিক ফিরে।

[মঞ্চের বাইরে বন্ধুদের মানটির নাম ধরে ডাকাডাকি। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যাবে। তবু ডাকাডাকি শোনা যাবে]

[রাত্রি। চার্চের ঘণ্টা পড়ল। ওদের ডাকাডাকি স্তব্ধ হল। আলো জ্বলবে চার্চের ঘণ্টার সঙ্গে ধীরে ধীরে। আলো আঁধারিতে দেখা যাবে দাদু, মা, বাবা, টুসু, টুসুর বন্ধুরা, প্রতিবেশী সবাই থমথমে মুখে বসে আছে, এধারে-ওধারে। মুখে কথা নেই। শুধু শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের ঢেউ।]

[শুরু হল নিজেদের মধ্যে কথা]

১ : মেয়েটা তা-হলে এল না সত্যি।

২ : মনে হচ্ছে তাই।

৩ : পুলিশকে তো এখনই খবর দেওয়া দরকার।

বাবা : শুনে আমার তখনই মনে হয়েছিল। এটা সেই লোকটার কাজ। নইলে কেন দেখা পাওয়া গেল না মুসাফিরের সারাদ্বীপ খুঁজে। লোকটা দূর্বৃত্ত। লোকটাই মানটিকে চুরি করেছে।

মা : [হতাশায় ভেঙে] মেয়ে আমার লক্ষ্মীসোনা। তার দাদার জন্মদিন। কত কী করবে বলে কত তার ভাবনা-চিন্তা। আজ ঘর আমার ফাঁকা। মন আমার শূন্য। [এমন সময় আচমকা মানটি প্রবেশ করল। তার পরনে ঝলমলে পোশাক]

মানটি : [আনন্দে] মা-আ-আ!

[সকলে চমকে উঠল। থমকে তাকাল, দেখল পরনে তার ঝলমলে পোশাক]

মা : [ছুটে, মানটিকে বুকে টেনে নিয়ে] মানটি!

[অন্য সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। উঠে দাঁড়াল। ছবির মতো দৃশ্য তৈরি হল।]

মা : [আকুল] এতক্ষণ কোথায় ছিলি মা? কোথায় পেলি এমন পোশাক ঝলমলে?

[ঠিক এই মুহূর্তে মুসাফির ঢুকল]

মুসাফির : মাজি, হামি দিয়েছে। এতোক্ষণ মানটি ছিল হামার কাছে।

বাবা : তুমি তো আচ্ছা দেখি সাংঘাতিক। তখন থেকে হাঁকপাকিয়ে খুঁজছি আমরা মানটিকে, আর তুমি তাকে লুকিয়ে নিয়ে বসে আছ? তোমাকে থানায় নিয়ে যাব। পুলিশে দেব।

মুসাফির : দিন বাবু, আমি জানি আমার কাজটা সহি হয়নি। জানি বাবু, হামি গোলতি করিয়া ফেলিয়াছি. জানেন বাবু হামার ভি একটো লেড়কি ছিল। একদম মানটি কা মাফিক। লেকিন আল্লা তাকে নিয়ে নিল। [দীর্ঘশ্বাস] মানটিকে সাথে পেয়ে হামারা দিল সব ভুলিয়া গেল বাবু। আমাকে মাফ করিয়া দিবেন। টুসুর জন্মদিনে আমি থাকতে পারবে না, ইসসে জাদা আফশোস হামার আর কুছ নেই। ওহি আফশোস ভুলনে কো আস্তে একটো গানা বানিয়েছি। বোলেন তো শুনাতে পারি।

মা : বেশ তো গান না!

মুসাফির : বেটা টুসু, এ গানা হবে হামার ভেট তুমহার জনমদিন কা। ভুলভাল হোনেসে কুছু মনে করিয়ো না।

[মুসাফিরের গান]

বোছোর বোছোর জনমদিন তো সোবার জীবনে,

খুশির খোবোর ছড়িয়ে দিবে সোবার মনে মনে।

জনমদিনে গানের সুরের সোনার হাসি ঝোরে,

আনিয়াছি সোনার কলম তাই তো তুমহার তরে।

অনেক লিখন লিখতে হোবে পড়ার সাথে সাথ,

গানা হল শেষ হামারা হাতে রাখো হাত।

[গানের মাঝে কলমের কথা এলে মুসাফির টুসুর হাতে একটি কলম আর একটি বই তুলে দিল। গানের শেষ শব্দের সুরের সঙ্গে ধীরে ধীরে নিভে গেল মঞ্চের আলো।

আলো জ্বললে দেখা গেল সকাল হয়েছে। দেখা গেল নাটকের শুরুতে যেখানে দাঁড়িয়ে টুসু সংলাপ বলছিল সেইখানে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে বই আর কলম]

টুসু : মুসাফির চলে গেল। এই সকালে আজ আমার হাতে সোনার কলম আর বই। তাঁরই দেওয়া উপহার। তাঁর মনটি যেমন সোনায় গড়া, তেমনই এই কলমও। কোন অচিনদেশের মানুষ তিনি আমরা জানি না। হারিয়ে গেছে নিজের মেয়ে। সেই দুঃখ ভুলতে মানটিকে নিজের মেয়ের মতো করলেন আদর। দিলেন আমায় সোনার কলম। গল্প ছড়ার বই। আমি হতে চাই বড়ো। পেতে চাই অমন মন। ঠিক মুসাফিরের মতো।

[বন্ধুরা ঢুকল]

বন্ধুরা : টুসু কী বকছিস অমন করে একা একা?

টুসু : সকাল থেকে রোদ উঠেছে দিনটা ভারি ঝলমলে।

[মানটির বন্ধুরা ঢুকল]

মানটির বন্ধুরা : দাদা, তোমার জন্মদিনে কী সব দ্যাখো এনেছি! এই তো দ্যাখো ফুলের তোড়া গন্ধ কেমন মিষ্টি!

[দাদু ঢুকল। দাদুর হাতে টুপি]

দাদু : ও দাদুভাই টুসু, এই যে টুপি ঝলমলে, পরিয়ে দিলাম মাথায়। বাড়ছে বেলা, আসছে সবাই, মজা হবে এখনই।

টুসু : ও দাদুভাই প্রণাম করি, একটুখানি দাঁড়াও! [প্রণাম করল]

দাদু : থাক বাবা থাক বেঁচে থাক!

[মা ঢুকল মায়ের হাতে পায়েসের পাত্র]

মা : আয় বাবা, আয়, সবার আগে তুই দে পায়েস মুখে। তারপরে সব একে একে পায়েস খাবে। কোন সকালে উঠে আমি বানিয়ে রেখেছি।

টুসু : [মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে, মাকে প্রণাম করে] মাগো মা, তুমি আমায় বড্ড ভালোবাসো। কিন্তু মাগো সবার আগে সানার কথা পড়ছে মনে। বেচারার পা ভেঙেছে কাল। পারবে নাকো আসতে। দাও মা খানিক পায়েস আমি দিয়ে আসি তাকে, সক্কলকার আগে।

[ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ সানা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ঢুকল]

সানা : দরকার নেই তার।

সবাই : (অবাক স্বরে) সানা!

টুসু : আসতে পেরেছিস?

সানা : তোকে ছেড়ে থাকতে পারি! জন্মদিন তোর। বন্ধুরা কি থাকতে পারে ভুলে?

বন্ধু : ঠিক বলেছে সানা।

মা : [হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল] বসো বাবা, বসো!

দাদু : এতটা পথ এমন করে আসে?

[বাবা ঢুকলেন]

বাবা : সব কষ্ট জয় যে করতে পারে, বাহাদুর বলি তো তাকেই।

সানা : না, না, আমার কিছুই কষ্ট হয়নি। বন্ধুর জন্মদিনে বন্ধুর কাছে না এলে ভালো লাগে! টুসুর জন্যে কাল একটা ছোট্ট ছড়া লিখেছি। পড়ব?

সকলে : হ্যাঁ, হ্যাঁ।

[সানার লেখা ছড়া]

আজকে টুসুর জন্মদিনে রুই-কাতলার ঝোল,

বলছি শোনো সবাই খাবে কেউ কোরো না গোল!

আজকে টুসুর কালকে তোমার পরশু আমার দিন,

সবাই মিলে গান গাইব নাচব তাধিন ধিন।

আজকে টুসু পড়বে বারোয় কালকে তুমি আমি,

এখন সবাই নাচ দেখবে, এবার আমি থামি।

[মানটির বন্ধুরা গেয়ে উঠল—]

থামলে তুমি আমরা কি আর

থাকতে পারি থেমে,

ফুল এনেছি এই এত ফুল

পাহাড় থেকে নেমে।

দাদার জন্যে এই উপহার

সুবাস ছড়ায় ফুল

ও দাদাভাই, এই ধরো তাই

রং-করা তুলতুল।

তুল তুল ফুলরে,

হাওয়ায় দোদুল রে,

এই শুভ দিনটিতে

হয়েছি আকুল রে।

[গান শেষে সবাই হেসে উঠল। এতক্ষণ মানটি মঞ্চে ছিল না। এখন সে ছুটতে ছুটতে প্রবেশ করল। তার হাতে নিজের আঁকা একটি ছবি]

মানটি : [ছুটতে ছুটতে দাদুর কাছে গিয়ে] দাদু, এই দ্যাখো, দ্যাখো দাদাকে কী দিচ্ছি!

দাদু : ছবি! কী চমৎকার!

[মানটি বাবার কাছে ছুটে গেল]

মানটি : বাবা, বাবা, মা জানো দাদাকে কী দিচ্ছি আমি, তুমি জানো না। এই দ্যাখো রং ছড়িয়ে গেছে কেমন চারিধার!

বাবা : এ যে দেখি উড়ছে পাখি! তুই এঁকেছিস? বারে বা ভারি সুন্দর!

বন্ধুরা সবাই : [ছোটাছুটি ছবি নিয়ে কাড়াকাড়ি] কই কই, দেখি! দেখি!

মানটি : না, না কাড়াকাড়ি করিস না। ছিঁড়ে যাবে! দে আমাকে। আয় সকলে। সবাই মিলে শান্ত হয়ে দ্যাখ!

সবাই : [অবাক স্বরে] কী সুন্দর!

[মানটি দাদার কাছে গেল]

মানটি : দাদা, তোমার জন্মদিনে এই আমার উপহার। [দাদার হাতে ছবিটা তুলে দিল। দাদা হাসল। আদর করল]

দাদা : এ যে উড়ন্ত এক পাখি! তুই এঁকেছিস? শিখলি কবে? কার কাছে?

মানটি : দাদুর কাছে। দাদুর কাছে সব শিখছি।

[দাদু উপহার দিতে টুসুর কাছে এগিয়ে গেল]

টুসু : তুমি আবার কী দিচ্ছ? এই তো তুমি আমার মাথায় পরিয়ে দিলে টুপি!

দাদু : এটা সোনার চাবি!

টুসু : সোনার চাবি! [অবাক] চাবি কেন?

দাদু : জানিস না, চাবি লাগে কোন কাজে?

টুসু : দরজা, বাকসো বন্ধ করে খুলতে লাগে।

দাদু : চাবিটা তোর ঠাম্মার বাক্সে ছিল। তুই পড়লি বারোয়। হচ্ছে শুরু কিশোরবেলা। মনটাকে তুই রাখিস খুলে ঘুরিয়ে সোনার চাবি, এই তো আমার আশা।

[টুসু প্রণাম করল দাদু, বাবা, মাকে। মন্দিরের ঘণ্টা বেজে উঠল। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। অন্ধকারে শোনা গেল আজান। আলো জ্বললে টুসুকে আবার দেখা যাবে সে একা কথা বলছে, এখন সাঁঝের বেলা। দূর থেকে বন্ধুদের সমবেত গলায় গান ভেসে আসছে]

টুসু : আমার জন্মদিনে সারাদিন কত আনন্দ হল। এখন নেমেছে সাঁঝ। কিন্তু ঝড়ের তান্ডব তা আর থামে না।

[চার্চের ঘণ্টা বেজে উঠল]

[চার্চের ঘণ্টা বেজে উঠেছে। আমরা সবাই গেছি মন্দিরে। প্রদীপ জ্বালিয়ে এসেছি। এবার যাব ওই চার্চে।]

[দূরে গানের সুর শোনা গেল]

[ওই আমার আর মানটির বন্ধুরা আসছে গান গাইতে গাইতে। যীশুখ্রীস্টের জন্য একটি আলোর বাতি নিজের হাতে দিয়ে আসব আমি। তখনই শেষ হবে আমার জন্মদিনের উৎসব।]

[দেখা গেল টুসু আর মানটির বন্ধুরা গান গাইতে গাইতে ঢুকছে, তাদের হাতে জ্বলন্ত বাতি]

[বন্ধুদের গান]

আয় আয় এই শেষ হাসি খুশি ছন্দ,

আয় আয় মন ভরে নিয়ে যা আনন্দ।

সারাদিন কত মজা কত গান হল যে,

প্রাণে প্রাণে উচ্ছল মজলিশ কত সে।

বছর বছর এই দিনটা টুসুর

ফিরে ফিরে পেতে চাই এমনই মধুর।

[উপস্থিত হয়েছেন দাদু, বাবা, মা। একজন বন্ধু গান গাইতে গাইতে টুসুর হাতে তুলে দিল একটি বাতি। টুসুকে সামনে দিয়ে গানের সুরে তাল মিলিয়ে সবাই বেরিয়ে গেল। আলো নিভে গেল]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[দেখা গেল তারা পাহাড়ে উঠছে। যাবে ওই চার্চে। আগে আগে চলেছে টুসু। কিন্তু ঝড়ের তান্ডব বেড়েই চলেছে। হঠাৎ দূরে একটা কুকুর কান্নার সুরে ডেকে উঠল। গাছের অনেক পাখিও ডেকে উঠল ভয়ে। পাহাড়ে ওঠা হল না টুসুর। ঘুরে দাঁড়াল। গর্জন করে উঠল সমুদ্র। ঝড়ের প্রকোপও বাড়ল। শোনা গেল অনেক মানুষের আর্ত চিৎকার, ‘বাঁচাও! বাঁচাও’। সমুদ্রের আলো-আঁধারিতে দেখা গেল জলোচ্ছ্বাস। আতঙ্কে মানুষ ছোটাছুটি করছে। আলো-আঁধারিতে তাদের ছায়ামূর্তিগুলো দেখা যাচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস দেখা গেল কয়েক মুহূর্ত। তারপর সব নিস্তব্ধ।

দেখা গেল কিছু মানুষ আহত হয়ে মঞ্চে পড়ে আছে। তাদের মুখে কষ্টের শব্দ। দেখা গেল পাহাড়ের খানিক ওপরে দাঁড়িয়ে আছে টুসু আর তার বন্ধুরা, বাবা, মা, দাদু মানটি। একটি বাতি তখনও টুসুর হাতে জ্বলছে। জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাহাড় থেকে ওরা নেমে এল সবাই। টুসু মঞ্চের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল আলোর বাতি হাতে নিয়ে।]

টুসু : [দুঃখ কন্ঠে] এ কী করলে তুমি সমুদ্রদেবতা! সমস্বরে সবাই আর্তনাদ করে উঠল। এ কী করলে তুমি সমুদ্র দেবতা!

[পর্দা নেমে এল]

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%