ডোডোপাখির দেশে

শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট সোনা ছই,

কতদিন পর তোমাকে চিঠি লিখছি। মাঝে একটা তোমার চিঠি পেয়েছিলুম, কিন্তু কাজের চাপে সুযোগ হয়নি উত্তর দেওয়ার। ভাবছ, বুঝি বাবা ভুলেই গেছে। তুমি পরীক্ষায় যে খুব ভালো ফল করেছ, সেই কথা চিঠিতে জানিয়েছিলে। আমিও তোমার জন্যে একটি দামি কলম পার্সেল করে পাঠিয়েছিলুম। তার প্রাপ্তি-স্লিপটা আমার হাতে এল না। কেননা, ঠিক তার আগেই আমার অফিসের কাজে মরিশাসে চলে আসতে হয়েছে। আসতে হয়েছে মরিশাসের রাজধানী পোর্ট লুইস-এ। দেশটা একেবারেই ছোট্ট। একটা দ্বীপ। আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বে, ভারত মহাসাগরের ওপর। পাহাড়, আগ্নেয়গিরি আর সমুদ্রঘেরা। এখানে লোকে লোকারণ্য। রাজধানীতে যেমন, তেমনই সারাদেশে গিজগিজ করছে শয়ে-শয়ে মানুষ। এত্তোটুকু একটা দেশে মানুষের দঙ্গল দেখলে অবাক হতে হয়। অথচ জানো, এক সময়ে এই দ্বীপে একটি মানুষও বাস করত না। বনজঙ্গলে ঢাকা দ্বীপটা মানুষের নজরের বাইরে পড়েছিল ফাঁকা খাঁ-খাঁ। তবে, পশুপাখি অবশ্যই ছিল। কেননা, একমাত্র এই দেশেই বাসা বেঁধেছিল সেই বিখ্যাত ডোডো পাখি। আজ আর পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্বই নেই। আমরা শুনেছি এমনকী পড়েছিও তারা দেখতে ছিল বিতিকিচ্ছিরি। পোর্তুগিজরা প্রথম এই দ্বীপের সন্ধান পায়। সন্ধান পায় এই পাখিরও। তারাই পাখিটার নাম দিয়েছিল ডোডো। যার মানে বোকা! এককথায় পাখি নামের বদনাম।

যাক গে! যারা চিরদিনের মতো হারিয়ে গেছে, যাদের আমরা কেউ দেখিনি কোনোদিন, তাদের দেখতে ভালো ছিল, কী মন্দ ছিল তা নিয়ে চর্চা করার কোনো মানে হয় না। তবে হ্যাঁ, তাদের আর আমরা দেখতে পাব না কোনোদিন, এই কথা ভাবলে মনে কষ্ট হয় বই কী!

ডোডোর কথা থাক। আসলে কী জানো, পোর্ট লুইস-এ এসে আমি বিপদে পড়েছি ভারি। মরিশাস দেশটা ছোটো বলে দেশটার ভালো-মন্দ নিয়ে পৃথিবীতে ভাববার লোকের সংখ্যাও খুব কম। কিন্তু কী চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা দেশটা। আকাশে ওপর থেকে পাখির মতো উড়তে-উড়তে যদি দ্যাখো, ঠিক মনে হবে মহাসাগরের অগাধ জলে ভাসছে যেন একটা মস্ত ডিম। আসলে দ্বীপটার আকৃতিই ডিমের মতো। তার ওপর গোটা দেশটাকেই ঘিরে রেখেছে প্রবালের পাঁচিল।

আমি বুঝতে পেরেছি, এখন তোমার এসব কথা শুনতে ভালো লাগছে না। এখন শুনতে ইচ্ছে করছে, আমি কী বিপদে পড়েছি সেই কথা!

বিপদ বলে বিপদ! আমি জানতুম যে-কাজের জন্যে আমার মরিশাসে আসা, তা সারতে বেশ কিছুদিন এখানে থাকতে হবে। সুতরাং, গোটা দেশের চেহারাটা ধীরে সুস্থে দেখে নেওয়াও যাবে। তার জন্যে মোটামুটি একটা পরিকল্পনাও তৈরি করে ফেলেছিলুম।

একদিন অফিসের কাজ সেরে কোয়ার্টারে ফিরেছিলুম একটু তাড়াতাড়িই। সন্ধ্যে নাগাদ। বেরিয়ে পড়েছিলুম হাওয়া খেতে। হাওয়ার কথা উঠল বলেই শুনিয়ে রাখি, নভেম্বর মাস থেকে আর সেই এপ্রিল পর্যন্ত এখানে দারুণ গরম পড়ে। অথচ দ্যাখো মার্চ আর এপ্রিল মাসটা বাদ দিলে ওই সময়ে আমাদের দেশে লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুমোতে হয়। কিন্তু বছরের বাকি সময়ে যখন আমরা গরমে ঘেমে একশা, এদেশে হাওয়ায় তখন নরম ঠাণ্ডা বাতাস ভেসে বেড়ায়। ভারি মনোরম আবহাওয়া। তবে ভয়ও আছে। কখন যে ঝড় উঠবে আকাশে তার নেই ঠিক। একবার এমনই ঝড়ে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছল দেশটার।

তো, যা বলছিলুম, তুমি তো জানো, সন্ধ্যেবেলা হাওয়া খেতে হলে সমুদ্রের তীরের মতো ভালো জায়গা আর কী আছে! তবে হ্যাঁ, এখানকার সমুদ্রের তীরে তুমি হাওয়া পাবে ঠিকই, কিন্তু ফাঁকা পাবে না। মানুষের এত হুড়োহুড়ি যে অসহ্য লাগে। সেই কারণেই আমি যখনই সমুদ্রের তীরে যাই, একটা ফাঁকা নিরিবিলি জায়গা দেখে বসি। সেদিনেও তাই করলুম। একা-একা বসে তোমাদের কথা ভাবছিলুম। মনে হচ্ছিল এই সময়ে তুমি থাকলে নিশ্চয়ই বলতে, সন্ধ্যেবেলায় সমুদ্রের কপালে চাঁদের টিপ যদি ঝলসে না ওঠে, তবে অর্ধেক সৌন্দর্যই যেন হারিয়ে যায়।

যখন এমনই সব এলোমেলো ভাবনা মনের ভেতর ছোটাছুটি করছে, তখনই শুরু হল আমার সেই বিপদ। তখনই কোনদিক থেকে, কোন অন্ধকার পেরিয়ে একটি কিশোর ছেলে যে আমার সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল আমি বুঝতেই পারলুম না। সে যে খুব ধোপদুরস্ত, তা যেন ভেবো না। গায়ের রংও তার তেমনই। অন্ধকারের সঙ্গে প্রায় অন্ধকার হয়েই সে মিশে আছে। পরনে জামা নেই। তবে উলঙ্গ বলি না। অন্ধকারে চেনাও মুশকিল। তবুও কোনো ভুল নেই, তার জন্ম এদেশেই। কারণ, সে হাসতে-হাসতে আমায় ফরাসি ভাষায় জিগ্যেস করল, ‘তুমি ইণ্ডিয়ান?’ তুমি তো জানো ছই, আমি একসময়ে ফরাসিভাষা নিয়ে একুট-আধটু চর্চা করেছি। সুতরাং, উত্তরটা ‘হ্যাঁ’ বলতে আমার বেশি সময় লাগল না। তোমায় এই সুযোগে বলে রাখি, এই মরিশাস দ্বীপটাকে একসময়ে ইউরোপের অনেকগুলো দেশ নিজেদের দখলে রাখার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেছিল। তার মধ্যে ফরাসিরাও ছিল। সুতরাং, অনেকগুলো ভাষা এদেশের মানুষের এক-এক সময়ে মুখের ভাষা হয়ে গিয়েছিল।

যাই হোক, সেই ছেলেটি হাসতে-হাসতেই জিগ্যেস করল, তা এখানে এই নির্জনে একা বসে আছ কেন? তোমার সঙ্গে কেউ নেই?’

আমি উত্তর দিলুম, ‘এতক্ষণ কেউ ছিল না। এখন তুমি আমার সঙ্গী হলে। আর তা ছাড়া হই-হট্টগোল আমার ধাতে সয় না। তা-ই নিরিবিলি এই জায়গাটা বেছে নিয়ে সাগরের হাওয়া খাচ্ছি।’

‘তবে আমি যাই,’ বলে ছেলেটি হাসি থামাল।

‘কেন? যাবে কেন?’

‘আমি হট্টগোল বাধিয়ে তোমার শান্তির ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি।’

এবার আমি হেসে ফেললুম। বললুম, ‘ও কথা বলো না! তুমি আবার হট্টগোল বাধালে কোথায়? আর বাধাতে যাবেই বা কোন দুঃখে! তুমি তো একা। যত হট্টগোল ওইদিকে।’ বলে আমি তাকে যেদিকে গাদাগাদা লোকজনের অনেক ছুটোছুটি আর হুটোপাটি হচ্ছে, সাগরতটের সেইদিকটা হাত দেখালুম। তারপরে তাকে জিগ্যেস করলুম, ‘নির্জন জায়গা তুমি পছন্দ করো না?’

সে উত্তর দিল, ‘পছন্দ না করে উপায়! আমি তো নির্জনেই থাকি।’

‘তাই নাকি! কী রকম?’ আমি একটু অবাক হয়েই জিগ্যেস করলুম।

সে উত্তর দিল, ‘সে একরকম। সবাইকে বলতে নেই’ তার গলায় কেমন যেন একটা রহস্য উঁকি মারল। আমিও শোনার জন্যে আগ্রহ দেখালুম না। বরং বললুম, ‘তুমি আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে। একটু বসো!’

সে বসল। বসতে-বসতে বলল, ‘দাঁড়ানো আমার অভ্যেস হয়ে গেছে।’

‘তোমার নাম কী?’

সে একটা অদ্ভুত নাম বলল, ‘ফাঁস।’ বলেই সে জানাল ইণ্ডিয়ানদের চাঁদ, তারা, আলো—এইসব দিয়ে অনেক ভালো-ভালো নাম হয়। আমার বাবা আমার নাম রেখেছেন ফাঁস। ফরাসি ভাষায় যার কোনো মানেই হয় না।

আমি বললুম, ‘দেশে তোমার বয়সি আমার একটি মেয়ে আছে। তার নাম ছই।’

‘মানে?’

‘মানে একটা আছে। আমাদের দেশে নৌকোর ছাদকে বলে ছই। কিন্তু চাঁদ, তারা, আলোর সঙ্গে তার মিল পাবে না। এ নাম হল, মায়ের আদরের ডাক।’ আমি উত্তর দিলুম।

‘আদর’ কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে তার মুখখানা কেমন যেন ঝপ করে শুকিয়ে গেল। এই অন্ধকারেও আমি স্পষ্ট বুঝতে পারলুম। ওই ‘আদর’ কথাটা নিয়ে তাই আমি আর কথা বাড়ালুম না। বুঝতে পারলুম ছেলেটা কষ্ট পাবে। বোধহয় ছেলেটার কেউ নেই। তাই উত্তাল সাগরের দিকে তাকিয়ে তাকে বললুম, ‘সাগরের দিকে তাকালেই দেখি ঢেউ। ঢেউ-এর পরে ঢেউ। লক্ষ-লক্ষ বছর ধরে ঢেউ উঠছে আর পড়ছে। তীরে এসে হারিয়ে যাচ্ছে।’

সে বলল, ‘এই দৃশ্য দেখতে-দেখতে আমার চোখ পচে গেল।’

আমি উত্তর দিলুম, ‘একই জিনিস একই চোখে বারবার দেখলে একঘেয়ে লেগে যায়।’

সে আচমকা জিগ্যেস করল, ‘একই চোখ মানে?’

‘একই চোখ মানে, এই যেমন আমার কথা ধরো, আমি তো সাগর দেখি কালে-ভদ্রে! আর তুমি দেখছ জন্ম থেকে। দেখতে-দেখতে তোমার চোখ সয়ে গেছে। কিন্তু আমি দেখলে, আমার মতো কেঠো মনও গুনগুন করে সুর ভাঁজে!’

‘ও, তার মানে তুমি গান গাইতে পারো!’

‘ধ্যাত!’

‘তবে এই যে বললে গুনগুন করে সুর ভাঁজো।’

‘সেটাকে গান বলে না, বলে গুনগুন করা।’ উত্তর দিয়ে তারপর আমিই তাকে জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি জানো না কি?’ সে বলল, ‘একটু-একটু’—

আমি বললুম, ‘একটু-একটুই শোনাও!’

সে উত্তর দিল, ‘একটু-একটু শোনাতে পারি, আগে তুমি যদি একটু-একটু সুর শোনাও!’

এবার নিজের জালে আমি নিজেই জড়িয়ে পড়লুম। কী কুক্ষণেই না বলে ফেলেছি গুনগুন করে সুর ভাঁজি।

তুমি তো জানো ছই, আমি যখন তোমাদের কাছে থাকি, তখন চানের ঘরে ঢুকে গুনগুন করে জল ঢালি। তাকে গান তো বলতে পারি না। এমন গান মানুষ আকছার গাইছে। এখানে এই সাগরবেলায়, খোলা আকাশের নীচে, সেই গান গাইলে গানের মান-মর্যাদা কিছু থাকে কি? কাজেই তাকে আমি আবারও বললুম, ‘দ্যাখো বাবা, এ যাত্রায় আমায় ছাড়ান দাও! বরং তোমার গান শুনি! এখানে, এই খোলা আকাশের নীচে, হেঁড়ে গলায়, আমি গান গাইলে আকাশই চোখ মটকে ছ্যা-ছ্যা করবে।’

তখন সে বলল, ‘আকাশকে যখন তোমার এতই ভয়, তবে চলো, আমরা, আকাশের আড়ালে যাই। সেখানেই তোমার গান শুনব।’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘সে আবার কোথায়?’

সে বলল, ‘চলোই না!’

ওঃ ছেলেটা ছিনেজোঁকের মতো আমার পেছনে লেগে রইল! তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্যে অগত্যা তার সঙ্গেই আমায় যেতে হল। সুতরাং, সমুদ্রের হাওয়া ছেড়ে আমি এখন তাকে আমার গুনগুনানি শোনানোর জন্যে আকাশের আড়ালে চললুম। সেটা কোথায় এখনও জানি না।

সমুদ্রের তীর ছুঁয়ে তার সঙ্গে ক-পা হেঁটেই পৌঁছে গেলুম এমন একটা জায়গায়, মনে হল এখানে গান গাওয়া দূরে থাক, নিশ্বেস পর্যন্ত নেওয়া যায় না। চারদিকে এমন দুর্গন্ধ! নাকে রুমাল চাপা দিয়ে তাকে জিগ্যেস করলুম, ‘এ কোথায় নিয়ে এলে?’

সে উত্তর দিল, ‘এখানটা এমন বলে তোমায় যেখানটা নিয়ে যাচ্ছি, সেখানটা তেমন নয়।’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘সেখানটা কোথায়?’

সে বলল, ‘সেখানটা এইখানে। বলে একটা ভাঙা দুরকুট পাঁচিল টপকে সে আমাকে ঘুপচি মতো একটা ঘরে নিয়ে এল। তা বলতে নেই, এখানে দুর্গন্ধ-টুর্গন্ধ নাকে এল না। কিন্তু হলে কী হবে, দারুণ অন্ধকার।

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি আমায় এ-কোথায় নিয়ে এলে?’

‘জায়গাটা তোমার পছন্দ নয়?’

‘উরি বাবা এ যে ভীষণ অন্ধকার!’

‘বাহ! এই একটু আগে বললে, আকাশ তোমার গান শুনলে ছ্যা-ছ্যা করবে তাই আমি তোমাকে আকাশের নীচ থেকে ঘরে নিয়ে এলুম। এখন বলছ অন্ধকার! না, না, আমি তোমার আর কোনো বাহানা শুনতে রাজি নই। তোমাকে গান শোনাতেই হবে।’

ছোট্ট সোনা ছই, এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, কেমন করে বিপদের ফাঁদে হঠাৎ আমার পা আটকাল। এই তো সবে শুরু। সেই ফাঁদ থেকে আমি কেমন করে বেরিয়ে এলুম, বেরিয়ে তোমায় চিঠি লিখেছি, সেটা জানার আগে, শুনে রাখো আমি কেমন করে আরও বিপদে জড়িয়ে পড়লুম সেই ঘটনা। এবার আমায় গান গাইতেই হল।

ছই, এবার তোমার বাবার অবস্থাটা ভালো করে বোঝবার চেষ্টা করো। যে-মানুষটা নিজে কোনোদিন গান গায়নি, মেয়ের গান শুনে যে কেবল গুনগুন করতে শিখেছে, সে এখন গান গাইবে। নিশ্চয়ই তুমিও বাবার এই বিপদের কথা ভেবে আতঙ্কে কাঁটা হয়ে যাচ্ছ।

হ্যাঁ ছই, আমি গাইলুম, তাকে বললুম, ‘দ্যাখো বাছা, আমি বাঙালি-ইণ্ডিয়ান। ফরাসি ভাষার কোনো গান আমার জানা নেই। তাই, আমি যদি বাংলায় গাই, তোমার চলবে তো?’

সে উত্তর দিল, ‘খুব চলবে।’

আমি তখন যে গানটা আমার খুব ভালো লাগে, শুনতে শুনতে হেসে সারা হই, সেই ছড়ার গানটা গাইলুম—

এক ছক্কায় নাচছে চড়ুই,

দুই ছক্কায় কে?

টরে টক্কা কার কাক্কা

কাঠঠোকরার বে!

ঠুকঠুকঠুক হাঁটছে বুড়ি

বাজছে পায়ে কী?

নূপুর না তো মল রুপোলি।

গরম ভাতে ঘি!

বকর বকর জবর খবর

কাটছে ঘুমের রেশ,

ঝুনঝুনিটা ঝুনঝুনিয়ে

হাওয়ায় দোলে বেশ।

আমার গান শুনে ছেলেটা তো হেসেই কুটোকুটি। ছই, বুঝতেই পারছ ঘরের ভেতরটা দুর্দান্ত অন্ধকার। অন্ধকার বলেই রক্ষে। সেই অন্ধকারে আমার গলায় সুরটা চাপা না পড়লেও মুখটা তো ঢাকা পড়ছিল। কাজেই গাইতে-গাইতে আমার মুখের যা চেহারা হচ্ছিল, সেটা তার চোখে পড়ছিল না, এইটাই রক্ষে! তা সে যাই হোক, এবার তাকে আমি বললুম, ‘আমার গানটা তো হল, এবার তোমারটা হোক!’

সে কিন্তু ইতস্তত করল না। একেবারে সঙ্গে-সঙ্গে গেয়ে উঠল। অবিশ্যি তার গানের যে কী ভাষা, কোন আদিম যুগের মানুষ এমন ভাষায় গান গাইত তার কিছুই আমি হদিশ করতে পারি না। তুমি কথাগুলো শোনো। বুঝতে পারো কি না দ্যাখো—

আলিকালি সুবোসাবা বুমবা বুমবা,

ঝিলিঝিলি মুমুমামা টুমবা টুমবা।

এ ডি মসুমা,

সানা কুসুমা,

লুপুহুহু হাপুহাহা ছুমবা ছুমবা।

আলিকালি সুবোসাবা বুমবা বুমবা।

বুঝলে কিছু? তোমার উত্তরটা যে ‘না’ সে তো আমি জানি। তুমি যে নিজে এখন মনে-মনে হাসছ, না হয় তোমার মাকে, গানের কথাগুলো শোনাচ্ছ সে-ও বুঝতে পারছি। বুঝতে পারছি দুজনে খুব হাসাহাসিও করছ। কিন্তু গানটার মাথামুন্ডু কিছু না বুঝলেও আমার কিন্তু হাসা হল না। গানটা শুনতে শুনতে আমার হঠাৎ নজরে পড়ে গেল, বাইরে, অনেকগুলো বীভৎস মূর্তি অনেকগুলো মুন্ডু যা দেখে আমার মূর্চ্ছা যাওয়ার গোত্তর। যে ভাঙা পাঁচিলটা পেরিয়ে এই ঘরে ঢুকেছি, সেই ঘরের ঠিক সামনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। সেখানে এই ছেলেটার মতো অর্ধ-উলঙ্গ আরও দশ-পনেরোটা ছেলে যে কোত্থেকে হাজির হল, আমি বুঝতেই পারলুম না। তারাও এই ছেলেটার সঙ্গে গলা মিলিয়ে গান গাইছে, নাচছে। পরক্ষণেই মনে হল, এরা যেন আদিম যুগের কিশোর। ছিল অশরীরী। হঠাৎ যেন অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসেছে। দেখে আমার চক্ষু স্থির। তারপর নাচ-গান শেষ হতেই, পলকে তারা অদৃশ্য হয়ে গেল! এমনকী সেই ছেলেটা পর্যন্ত! আমি ভয়ে জবুথবু। মাটির ওপর বসে পড়লুম। তারপর কেমন যেন বেহুঁশ হয়ে পড়লুম।

যখন আমার চেতনা ফিরে এল, তখন বুঝতে পারি রাত গভীর হয়েছে। নিজের হাতঘড়িটা দেখার চেষ্টা করলুম। অন্ধকার এমন ঘন কিছুই ঠাওর করা গেল না। অবশ্য ইট বার করা ঘরের দরজাটা হাঁটকে বার করতে পারলুম। যখন নাচ হচ্ছিল, গান হচ্ছিল, তখন দরজা ছিল হাট করে খোলা। এখন দেখি বন্ধ। আমি ঠেলা দিলুম খোলা গেল না। আমি প্রাণপণে চেষ্টা করি, দরজা নড়েও না, চড়েও না। বুঝতে পারি বাইরে থেকে বন্ধ। ঘরের ভেতর আমি বন্দি। আমার শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলুম। এই নিস্তব্ধ নির্জন গভীর অন্ধকার রাতে কেউ যে আমায় উদ্ধার করতে আসবে, তেমন কোনো সম্ভাবনা, আমি একেবারেই দেখতে পাচ্ছি না।

কিন্তু হঠাৎ ফাঁস নামে সেই ছেলেটা হাজির হল। দরজা খুলল না। ঘরের একটা জানালার পাল্লা হঠাৎ খুলে গেল। সে দেখা দিল সেই খোলা পাল্লার বাইরে। সে বলল দরজা আর খুলবে না। এ হল বন্দিশালার দরজা। আজ থেকে পাঁচ-ছশো বছর আগে ‘সাদামানুষে’-র দল এ দেশটা দখল করে ‘কালোমানুষ’ কিনে আনত। কিনে আনত গোলামি করার জন্যে। আর, যাতে তারা পালাতে না পারে তাই তাদের পায়ে লোহার বেড়ি পরিয়ে বন্দি করে রাখত। তাদের দিয়ে কাজ করাত খেতে-খামারে। অত্যাচার করত অমানুষিক। রাতের বেলা বন্দি করে ফেলে রাখত এই ঘরে। যেন গোরু-ভেড়া। শুনে রাখো, সেই সাদামানুষেরা আমার বাবার সঙ্গে আমাকেও কিনে আনে। আমাদের বলা হত দাস।

সুতরাং, তুমি যা ভেবেছ, এখন আমি তা-ই। ছ-শো বছর কে আর বেঁচে থাকে। আমিও বেঁচে নেই। বয়সে ছোটো ছিলুম বলে আমার পায়ে লোহার বেড়ি পরানো হয়নি। কিন্তু তাদের জুলুম থেকে নিস্তার ছিল না। সব কিছু সহ্য করতে হত মুখ বুজে। আমি ইচ্ছে করলে পালাতে পারতুম। কিন্তু কোথায় পালাব। তা ছাড়া বাবাকে ছেড়ে পালাবার কথা চিন্তাই করতে পারতুম না।

‘এই সময়েই আমার বড্ড শখ হয়েছিল একটা ডেডোপাখি পোষার। শুনে রাখো হে বন্দি ইণ্ডিয়ান, আজকের পৃথিবীর মানুষ সে পাখি চোখেই দেখেনি। শুধু তাদের হাড়গোড় জোগাড় করে নিশ্চিত হয়েছে, সে পাখি ছিল বোকা আর কুচ্ছিত। না, তা মোটেও না। তোমাদের দেশের পায়রা যেমন দেখতে, সে পাখি ছিল অনেকটা সেইরকম। অবশ্য পায়রার চেয়ে অনেক বড়ো। গায়ে ছিল পায়রার মতো পালক। সে-পালক ছিল হাতের সমান লম্বা। দেহের দু-পাশে ছোট্ট দুটো ডানা। গায়ে যেমন জোর ছিল, তেমনই ছুটত তীব্রবেগে। কিন্তু পারত না আকাশে উড়তে। কিন্তু এদেশের এই ডোডো পাখিদের ধরে একটি-একটি করে মেরে ফেলেছে সাদামানুষের দল। মেরে তাদের মাংস খেয়ে লোপাট করে দিয়েছে ডোডো পাখির জাতটাকেই। আমার পোষা পাখিটাও মরেছে তাদের হাতে। তোমরা, ইণ্ডিয়ানরাও এই দলের বাইরে নও! তাই এখন আমাদের প্রতিশোধ নেওয়ার পালা। থাকো তুমি বন্দি! এই ঘরে আমার বাবাও বন্দি ছিল। এই বন্দিশালাতে আমার বাবাও মারা যায়। তুমিও মরো!’ বলেই সে জানলা বন্ধ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

ছই, আমি ঘরের ভেতর, অন্ধকারে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলুম, ‘বাঁচাও-ও-ও!’ কেউ সাড়া দিল না। আমি সারারাত চেঁচাতে লাগলুম। তারপর জ্ঞান হারালুম।

অনেক রাত্রেও আমাকে কোয়ার্টারে ফিরতে না দেখে, আমার বন্ধুরা রাতভর আমাকে খোঁজাখুজি করেছে। পায়নি। অবশেষে পুলিশে খবর দিয়েছে। পুলিশও তল্লাসি চালিয়েছে তন্নতন্ন করে। শেষমেশ পুলিশ তাদের মাথায় বুদ্ধি খাটিয়ে, আর গায়ের অনেক ঘাম ঝরিয়ে আমাকে উদ্ধার করেছে সেই বন্দিশালা থেকে। কেমন করে? ছই, সে আর-এক মস্ত গল্প। শোনাব আর-একদিন। আজ এখানেই শেষ করি। ভয় নেই, আমি ভালো আছি। তোমরা সবাই ভালো থেকো।

বাবা

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%