তুকতুকির প্রজাপতি

শৈলেন ঘোষ

বাবার সঙ্গে এ-মেলা সে-মেলা করে কত মেলাই না ঘুরেছে তুকতুকি। বয়েসটা তার এমনকী আর বেশি। মেয়েটা সবে দশে পড়েছে। এই বছরেই সে ক্লাস ফাইভে উঠেছে। তবে বলতে পারবে না লেখাপড়ায় মেয়েটা বুঝি হেঁজিপেঁজি। হ্যাঁ, ঠিক কথা। ক্লাসে সে ফার্স্ট-সেকেণ্ড হয় না বলে যেন মনে কোরো না, সে কুঁতিয়ে-কাঁতিয়ে পাস করে। অবশ্য খুব ভালো না বলতে পারলেও একটু ভালো তো বলতেই হবে।

থাক সেকথা! এখন কথা হচ্ছে, তুকতুকি বাবার সঙ্গে এ-মেলা সে-মেলা ঘোরে কেন জানো! মেলায় নিয়ে যাবার জন্যে বাবার কাছে সে বুঝি বায়না করে! সত্যিই তো, এই ছোট্ট বেলায় বাড়ির কাছেপিঠে মেলা বসলে, দেখতে যাবার জন্যে কার না মন ছটফট করে! মেলায় দেদার মজা। কত কী দেখার আছে বলো! সেই পুতুলনাচ থেকে ম্যাজিক। ম্যাজিক থেকে কাঠের তৈরি ঘূর্ণি-ঘোড়া, নাগরদোলা আরও কত কী। তার সঙ্গে যেমন আছে মনকাড়া হাজারো জিনিসের দোকানপাট, তেমনই গরম ভাজা জিলিপি।

না, এসব নয়। এসব তো তুকতুকি অনেক দেখেছে। আসলে মেলায় যায় সে বাবার সঙ্গে ইশকুলের ছুটির দিনে। তা না হলে মা-ই হন বাবার সাথি। তুকতুকির বাবা বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে কত মনোহারী খেলনা তৈরি করতে পারেন। যখনই কোথাও মেলা বসে, বাবা তাঁর হাতের তৈরি খেলনার পসরা নিয়ে সেই মেলায় দোকান দেন। আর বিক্রিও হয় খুব। বাবা যখন বাঁশের চাঁচাড়ির খেলনা তৈরি করেন, তুকতুকি বসে বসে দেখে। দেখতে দেখতে তুকতুকি এখন এটা-ওটা নিজে নিজেও বানাতে শিখেছে। দেখলে কে বলবে এটা একটা ছোট্ট মেয়ের হাতের কাজ।

তা বলে যেন মনে কোরো না, তুকতুকিরা বুঝি শহরের হইহল্লার রাজ্যে থাকে। না, তারা থাকে দস্তুরমতো সবুজে ঘেরা একটা শান্ত গ্রামে। কত গাছ। গাছে কত পাখি। একটা ছোট্ট নদী। নদীতে কত মাছ। নদীর ঠিক ওপারে আর একটা গ্রাম। সেই গ্রামে প্রত্যেক বছর খুব ধুমধাম করে দুর্গাপুজো হয়। গ্রামে একটা মস্ত খোলা মাঠ আছে, সেই মাঠেই ঠাকুর বসেন, সেই সঙ্গে একটা মেলাও বসে। এখন তো গ্রামে ইলেকট্রিক লাইট এসেছে, তাই আর আলোর অভাব নেই। সেই আলো দিয়ে সাজানো মেলা নদীর এপার থেকে দেখলে মনে হয়, চাঁদেচাঁদে যেন জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দিয়েছে।

প্রত্যক বছর তুকতুকির বাবা এই মস্ত মেলায় খেলনাপাতির একটা ছোট্ট দোকান খুলে বসেন। এ বছরেও বাদ যায়নি। পুজো, তাই ইশকুলের ছুটি। রোজই তুকতুকি দোকানে যায় বাবার সঙ্গে। এবার সে একটা কাজ করেছে খুব চুপিচুপি, একেবারে নি:সাড়ে! করেছে কী, বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে একটা প্রজাপতি বানিয়েছে। প্রজাপতিটার গায়ে রং দিয়ে এমন বাহারি করে রাঙিয়েছে যে, দেখলেই মনে হবে বুঝি জীবন্ত। তুমি যদি তুকতুকিকে এখনই দেখতে, তোমার নিশ্চয়ই মনে হত, বাবা! এইটুকু একটা মেয়ে এমন একটা সুন্দর প্রজাপতি বানাতে পারে! অত কথা কী, প্রজাপতিটা দেখে তুকতুকির মা আর বাবা পর্যন্ত ভ্যাবাচ্যাকা খায়। বাবা তো ঠিকই করে ফেললেন, প্রজাপতিটা একটু বেশি দামেই বিক্রি করবেন। মা বললেন, ‘দেখো, এটা পড়ে থাকবে না।’

বাবা আবার বললেন, ‘এটা হাসতে হাসতে পঁচিশ টাকায় বিকিয়ে যাবে।’

হায় কপাল! প্রজাপতি বিক্রি হওয়া তো দূরের কথা, সেদিন তখনও পর্যন্ত দোকানে বউনিই হল না। উলটে হল এক অন্য বিপত্তি!

আবার কী বিপত্তি?

উফ! সেদিন মেলায় কী ভিড়টাই না হয়েছিল। যাকে বলে লোকে-লোকে লোকারণ্য। তুকতুকিদের দোকানের সামনে কত লোক রে বাবা! রংচঙে পুতলের দোকান তো, তাই খদ্দেরও এটা-ওটা দেখছে নেড়েচেড়ে। আর যেই নজরে পড়ছে প্রজাপতিটা, সব ছেড়ে তারা প্রজাপতিটারই দাম জিগ্যেস করছে। আর যখনই শুনছে দাম পঁচিশ টাকা, মুখ ঘুরিয়ে সরে পড়ছে। কেউ কেউ বলছে বটে, একটু কমসম করে দাও, বাবা তাদের কথা কানেই নিচ্ছেন না। কাজেই, ওই প্রজাপতিটি ছাড়া তাদের অন্য দিকে চোখ নেই। দোকানে বউনিও হচ্ছে না। সুতরাং, ভেতরে ভেতরে বাবাও যে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ছিলেন, সে তো তাঁর মুখ দেখলেই বোঝা যায়। আর বলব কী, ঠিক এই সময়েই ঘটল সেই বিপত্তি।

হল কী, তুকতুকিদের রংচঙে খেলনার দোকানটার ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল দিদির হাত ধরে তার ছোট্ট ভাই। ভাইকে দেখে কে বলবে তার গায়ে ঝকমকে জামা কিংবা দিদির পরনে ঝলমলে একটা ফ্রক। মোটেই না। দু-জনেরই পরনে চিরকুটে ময়লা ছেঁড়া পোশাক। তেমনই লিকলিকে চেহারা। দেখলেই মনে হয় পেট ভরে খেতে পায় না। হয়তো বা মাথা গোঁজার জায়গাও নেই। দোকানের সামনে এসে দাঁড়াতেই ছোট্ট ভায়ের চোখ পড়ে গেল ওই প্রজাপতিটার ওপর। মনে মনে ভাবল, আহা রে, দিদির যদি পয়সা থাকত, ওই প্রজাপতিটা কিনে দিতে বলত। তাই একবারই সে দিদির মুখের দিকে তাকাল। কোনো কথা বলতে পারল না। কিন্তু একবার দিদিও যখন তার মুখের দিকে হতাশ-চোখে চাইল, ভাই থাকতে পারল না, বলেই ফেলল, ‘প্রজাপতিটা কী সুন্দর না রে?’

দিদি উত্তর দিল, ‘খুব সুন্দর।’

ভাই আবার বলল, ‘নিশ্চয়ই অনেক দাম।’

দিদি সেকথার কোনো উত্তর না দিয়ে বলল, ‘চ।’ বলে ভায়ের হাত ধরে যেই এগোতে যাবে, ছোট্ট ভাইটা আর থাকতে পারল না। দুম করে তুকতুকির বাবাকে বলে ফেলল, ‘ওই প্রজাপতিটা আমায় দেবে?’

এখনও পর্যন্ত বউনি হয়নি। এমনিতেই তুকতুকির বাবার মেজাজ ছিল বিগড়ে। ছেলেটা হাত পেতে চাইতেই এমন চটে উঠলেন কী বলব। দিলেন এক তাড়া। চোখ কটমট করে বলে উঠলেন, ‘ভাগ এখান থেকে! পাজি, ছ্যাঁচড়া ছেলে কোথাকার! দেব ঠ্যাং ভেঙে!’

দিদি ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে ভাইকে আগলে সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। ভিড়ের মধ্যে সে ভাইকে বকাঝকা করল কি না কে জানে। কিন্তু বাবার ওই তেড়ে ওঠা ধমকের চিৎকার শুনে তুকতুকি শিউরে উঠেছিল। যখন থেকে ছোট্ট ভায়ের হাত ধরে ছোট্ট দিদি তাদের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল, তাদের দেখে সেই তখন থেকেই তুকতুকির মনটা কেমন জানি দুঃখে ভার হয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল, এই ছোট্ট দু-টি ভাইবোনের বুঝি কেউ নেই। তাই, তাদের সঙ্গে দুটো কথা বলে ভাব করার জন্যে তুকতুকির মন ভারি ছটফট করছিল। ঠিক এই সময়েই বাবা ধমক দিয়ে তাদের তাড়িয়ে দিলেন। আচ্ছা, বাবা যদি প্রজাপতিটা ছোট্ট ভাইটিকে দিতেন, তবে কী এমন ক্ষতি হত! এটা দিলে আর একটা না-হয় তুকতুকি বানিয়ে দিত! কী এমন শক্ত কাজ!

তুকতুকি আর থাকতে পারল না। খুব নরম গলায় বাবাকে বলল, ‘তুমি এ কী করলে বাবা! তুমি ওদের গায়ের পোশাক দেখে বুঝতে পারলে না ওরা কত গরিব। ওদের অমন করে ধমক দিয়ে তুমি তাড়িয়ে দিলে! প্রজাপতিটা দেখে ছোট্ট ভায়ের ভালো লেগেছে তাই আবদার করে তোমার কাছে চাইল। দিলে কী ক্ষতি হত বলো? আমি না-হয় একসঙ্গে আরও অনেকগুলো করে দিতুম তোমায়। ইশ! ছি-ছি! ওদের জন্যে আমার বড্ড মন কেমন করছে!’

তুকতুকির কথা শুনে বাবা কেমন যেন গুম হয়ে ওই প্রজাপতিটার দিকেই তাকিয়ে রইলেন। এবার তিনি নিজের মেয়েকেই না বকে বসেন। নাকি তাঁর এখন মনে হচ্ছে, আহা রে, ওই ছোট্ট দুটো বাচ্চাকে অমন নিষ্ঠুরের মতো ধমক দিয়ে তাড়িয়ে না দিলেই ভালো করতেন। এখন তুকতুকি একটু বড়ো হয়েছে। একদিন তো তুকতুকিও ওদের মতোই ছোট্ট ছিল। তখন তুকতুকিকে বুকে-কোলে নিয়ে কত আদর করেছেন। হায় রে! ওই বাচ্চা দু-টির এখন আদর করার মতো যদি কেউ না থাকে! এসব কথাই ভাবছিলেন বাবা। ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল।

ঠিক এই সময়েই আর একটি ফুটফুটে ছোট্ট মেয়ে মায়ের হাত ধরে তুকতুকিদের দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। সে দেখছে বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে তৈরি খেলনা-ঘোড়া, না-হয় ডোরাকাটা খেলনা-বাঘ, দাঁড়ে বসা সবুজ টিয়া। রং ঝলমল ফুলের তোড়া। দেখতে দেখতে মায়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে কী যেন বলল।

মা মেয়েকে জিগ্যেস করলেন, ‘কোনটা?’

মেয়ে আঙুল তুলে দেখাল, ‘ওইটা।’

মেয়ের মা তুকতুকির বাবাকে জিগ্যেস করলেন, ‘ওই প্রজাপতিটার কত দাম?’

বাবা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, ‘ওটা বিক্রির জন্যে নয়। অন্য একজনের।’

বাবার কথা শেষ হতে নাহতেই তুকতুকি সেই ছোট্ট মেয়ের চিবুক ধরে আদর করে বলল, ‘কালকে এসো। কালকে তোমার জন্যে আরও সুন্দর একটা প্রজাপতি এনে রাখব কেমন!’

মেয়েটি বলল, ‘ঠিক এমনটি।’

তুকতুকি উত্তর দিল, ‘ঠিক আছে, এমনটিই আনব।’

মেয়ের হাত ধরে মা চলে গেলেন। আর তুকতুকির হাতে প্রজাপতিটি দিয়ে বাবা বললেন, ‘দেখ, এই ভিড়ে তাদের খুঁজে পাস কিনা। তুই ঠিক বলেছিস, গরিবকে অমন করে বকাবকি করতে নেই। ওই ছোট্ট ছেলে-মেয়ে দুটোর জন্যে আমারও মন বড়ো আনচান করছে।’ বলতে বলতে বাবার গলা যেন ভার হয়ে ওঠে।

বাবার হাত থেকে প্রজাপতিটা নিয়ে তুকতুকি যখন বাইরে পা রাখতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বাবা বললেন, ‘আর শোন, এই ক-টা টাকা নিয়ে যা। পারিস তো ওদের খাবার কিনে খাওয়াস।’

তুকতুকি টাকা ক-টা জামার নীচে লুকিয়ে রেখে, হাতে প্রজাপতিটা নিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘দেখি, এই ভিড়ে তাদের খুঁজে পাই কি না।’ বলতে বলতে তুকতুকি চোখের পলকে দোকানের বাইরে বেরিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগল।

বাব্বা! এ যে অসাধ্য কাজ! তুকতুকি যে তাদের নাম ধরে ডাকবে, তা-ও তো হবার নয়! তুকতুকি তাদের নামই তো জানে না। আর তা ছাড়া নাম ধরে ডাকলেই বা কী!

দারুণ ভিড়ের সঙ্গে এমন চিৎকার-চেঁচামেচি যে তুমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও তোমার গলাই ফাটবে। কে কার কথা শুনবে। সুতরাং, ভিড় হাতড়ে খোঁজা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

অনেকক্ষণ ভিড়ের মধ্যে হয়রান হয়ে তুকতুকি তাদের খুঁজল। কিন্তু মিথ্যেই খোঁজা, দেখাই পেল না। তখন তো ফিরতেই হয়।

মেলার ওইদিকটায় কত মনকাড়া খেলার সাজসরঞ্জাম দেখো! সেই মস্ত নাগরদোলাটা তোমার নজরে পড়বেই। ঘুরতে ঘুরতে কত উঁচুতে উঠছে! যেন হাত বাড়ালেই আকাশে হাত ঠেকে যায়! এখন অবশ্য ওটাকে কেউ নাগরদোলা বলে না। বলে, জায়েন্ট হুইল। ঠিক তার পাশে ওই দেখো ম্যাজিক খেলার মস্ত ছাউনি। ছাউনির পাশে কাঠের ঘোড়ার ঘূর্ণি-ছুট। পয়সা ফেলো। কাঠের ঘোড়ার পিঠে বসো। পাক খাও। আর ঘোড়দৌড়ের সাধ মেটাও।

বাব্বা, এই ছুট দেখতেই ভিড়ে-ভিড়াক্কার। এই ভিড় ঠেলেই তুকতুকিকে ফিরতে হবে। এতক্ষণ তো ভিড় ঠেলেই সেই ছোট্ট দু-টি ভাই-বোনকে খুঁজেছে সে! সুতরাং কষ্ট হলেও আবার ঠেলো!

আরে, এ কী, ওই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেই ভাই-বোন দু-টি না? কাঠের ঘোড়ার ঘূর্ণি-ছুটের কেমন খেলা দেখছে! শিউরে উঠেছে তুকতুকি। এতক্ষণ তন্নতন্ন করে খুঁজেও যাদের সে খুঁজে পায়নি, তাদেরই সন্ধান পেয়ে গেল সে এখানে!

তুকতুকির আর তর সইল না। একে-ওকে ঠেলেঠুলে একেবারে তাদের সামনে হাজির। আচমকা আলতো হাতে তাদের ছুঁয়ে ধরতেই তারা থতোমতো খেয়ে গেছে। চোখের পলকে তারা তুকতুকির মুখের দিকে তাকিয়েছে। তাকাতেই তকতুকি হাসিমুখে বলল, ‘আমি কখন থেকে তোমাদের খুঁজছি। এই নাও, তোমার জন্যে আমি প্রজাপতি এনেছি।’ বলে, সেই ছোট্ট ভাইটির হাতের কাছে প্রজাপতিটি এগিয়ে ধরল। বলতে কী, ছেলেটিও হাত বাড়িয়ে প্রজাপতিটি নিয়ে দোনোমনা গলায় জিগ্যেস করল, ‘এমনি এমনি দিলে?’

তুকতুকি হাসল। জিগ্যেস করল, ‘তোমার পছন্দ হয়েছে?’

ছোট্ট দিদিটিও হাসল। হাসতে হাসতে বলল, ‘প্রজাপতিটা যদি উড়তে পারত, তাহলে আরও মজা হত। এই যে কাঠের ঘোড়ার চরকি-দৌড় দেখছি, হয়তো প্রজাপতিটি উড়তে উড়তে এদেরও হারিয়ে দিত।’

ঠিক এই ফাঁকে ছোট্ট ভাইটি বলে ফেলল, ‘যাই বল দিদি, ঘোড়ার পিঠে চরকি খেতেও ভারি মজা ওই দেখ, এরা কেমন মজাসে চরকি খাচ্ছে!’

‘তোমারও বুঝি চরকি খেতে ইচ্ছে করছে?’ জিগ্যেস করল তুকতুকি।

ভাইটি উত্তর দিল, ‘করলেই বা কী। আমাদের তো আর পয়সা নেই।’

‘আমার আছে। চলো, ঘোড়া-ছুটের মালিককে জিগ্যেস করি কত পয়সা লাগবে।’ বলে তুকতুকি ওদের সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার মালিকের কাছে গেল। ঘোড়ার মালিককে কিছু জিগ্যেস করার আগেই মালিক নিজেই জিগ্যেস করল, ‘ক-জন?’

তুকতুকি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। সে কিছু উত্তর দেবার আগেই মালিক আবার জিগ্যেস করল, ‘ক-জনঘোড়ায় বসবে?’

তুকতুকি এবার থমকাল না। ঝটপট উত্তর দিল, ‘আমরা এই তিনজন।’

মালিক বলল, ‘পঁচিশ পাক তিনজনের পনেরো টাকা।’

‘ঠিক আছে।’ রাজি হয়ে গেল তুকতুকি। বাবা ওদের খাবারের জন্যে চল্লিশ টাকা দিয়েছেন। পনেরো টাকায় ঘোড়ায় চরকি খেলে, পঁচিশ টাকা থাকবে। ওদের দু-জনের খাবার হয়ে যাবে।

শেষমেষ তিনজনে ঘোড়ার পিঠে বসে পঁচিশবার চরকি খেল। বয়সে কত ছোটো ওরা। কোনো-দিন স্বপ্নেও ভাবেনি, এমন একটা ইচ্ছে এত সহজে মিটবে। কী খুশি। মন উপচে খুশির আলো যেন চোখে-মুখে ঝলসে উঠছে।

তুকতুকিও সেই দু-টি ভাইবোনের মুখে খুশির ঝলক দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে জিগ্যেস করল, ‘খুব ভালো লাগল না?’

ছোট্ট দু-টি ভাইবোন প্রায় চিৎকার করে সায় দিল, ‘খুব ভালো।’

‘তাহলে চলো, এবার কিছু খাবার কিনে খাই, আমার তো ঘোড়ার পিঠে চরকি খেয়ে খিদে পেয়ে গেছে।’ বলে তুকতুকি হাসল।

হঠাৎ তুকতুকির মুখে খাবারের কথা শুনে ভাই-বোন দু-জনেরই মুখের হাসি যেন ঝাপসা হয়ে গেল। বোনটি শুকনো মুখে উত্তর দিল, ‘আমাদের তো পয়সা নেই।’

তুকতুকি হেসে উঠল। হাসতে হাসতে ওদের আশ্বস্ত করল, ‘তোমাদের পয়সা নাই থাক। আমার কাছে পয়সা আছে। চলো দোকানে যাই।’

বোন বলল, ‘খাবারের দোকান তো মেলার ওইদিকে।’ বলে পেছনের দিকে হাত তুলে দেখাল।

‘তাহলে ওইদিকেই যাই চলো।’

কী জানি কী ভাবল দু-টি ভাইবোন। হঠাৎই বোনটি বলল, ‘আমাদের এখনই বাড়ি যেতে হবে। বাবার খুব অসুখ। ওইদিকে গিয়ে খাবার খেয়ে ফিরে আসতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। মা ভাববে। বাবা তো কথা বলতে পারে না। উঠতেও পারে না। সারাদিন শুয়ে আছে। আমাদের দেখতে না পেলে খুব ছটফট করবে। আমরা যাই। আমরা তো গরিব। মা বাবার জন্য ওষুধ কিনতে পারে না। আজ তোমার এই প্রজাপতিটা বাবাকে দেব। তোমার এই সুন্দর রঙিন প্রজাপতিটা বাবা পেলে নিশ্চয়ই ভালো হয়ে উঠবে। নিশ্চয়ই প্রজাপতিটা হাতে নিয়ে একদিন বাবা ভালো হয়ে আমাদের সঙ্গে খেলা করবে। আদর করবে। সেদিন কী মজা হবে বলো!’

বলতে বলতে এমন হুড়োহুড়ি করে নিমেষে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল যে, তাদের আর ঠাওর করতে পারল না তুকতুকি। চেঁচাল, হাঁক পেড়ে বলল, ‘আমি যাব তোমাদের সঙ্গে!’ কে শুনছে তার কথা!

গরিবরা বোধ হয় ভিড়ের মধ্যে এমনি করেই হারিয়ে যায়!

তুকতুকি ফিরে এল বাবার কাছে। মুখ তার শুকনো, কিন্তু মন তার খুশি। আর যাই হোক, তার প্রজাপতিটা হারায়নি। একটি ছোট্ট গরিব ছেলের সে যে আজ থেকে খেলার সাথি। এটা কী কম কথা! খুশি না-হয়ে থাকা যায়!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%