আগুনের মুখোমুখি

শৈলেন ঘোষ

আজ দোল। সকাল থেকেই আনন্দে রঙিন মানুষের মন। শুনতে পাচ্ছি চেনা-অচেনা কত জনের কত রকমের হল্লাহাসির শব্দ। কানে ভেসে আসছে নানা দিক থেকে। আমি শুনতে পাচ্ছি এইখানে দাঁড়িয়ে, একা চুপচাপ।

আমিও তেমনই। বলো তো, ‘এইখানে দাঁড়িয়ে বললে তোমরা কেমন করে বুঝবে, কোনখানে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বলছি!’ বুদ্ধির ঢেঁকি আর কাকে বলে! সোজাসাপটা বললেই তো হয়, এটা একটা জানলা। দাঁড়িয়ে আছি জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে। জানলাটা আমাদের পড়ার ঘরের। আমাদের বলতে, দাদা, আমি আর আমার ছোটোবোন। বোনের নামটা ভারী মজার—‘চুপটি’। অবশ্য এটা তার ডাকনাম। আমারও একটা ডাকনাম আছে—‘হুক্কা’। শুনে হাসছ? তাহলে কে জানে, দাদার নামটা শুনলে হাসবে, না কাঁদবে—হুস! তবে, দাদার ভালোনামটা কিন্তু খুব ভালো—শুভ্র।

আমি এখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। চুপটি পড়ে ক্লাস থ্রিতে। আর আমার দাদা! কথা ছিল এবছর নাইন থেকে টেনে উঠবে, কিন্তু জানি না কী হবে! কারণ, দাদা এখন হাসপাতালে।

কেন? কী হল?

কী হল সেই কথা বলতে গিয়ে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সে এক ভয়ংকর ঘটনা। যতই চোখের ওপর ভেসে উঠছে সেই ঘটনার দৃশ্যটা, ততই যেন বুক ধড়ফড় করে উঠছে। তাই, আজ এই দোলের দিনে আমাদের বাড়িতে কারোর মুখে হাসি নেই একফোঁটা। মুখ চুন করে আমিও তাই দাঁড়িয়ে আছি জানলার কোলে। শুনছি দোলের হুল্লোড়। আর মনে পড়ে যাচ্ছে দাদার মুখখানা। দাদা দোলের দিনে কী মজাটাই না করে আমাদের সঙ্গে! আজ একদম থমকে আছে বাড়িটা। নি:শব্দ। ‘শব্দ’ বলতে যেটুকু বাতাস ঢুকছে এই জানলা ডিঙিয়ে ঘরের ভেতরে, সেইটুকুই। তার বেশি নয়।

কে-না জানে, জানলার সঙ্গে গলায় গলায় ভাব আলো আর বাতাসের। আমাদের ঘরের জানলা খুলে দিলেই পলকে উপচে পড়বে ঘর আলোয় আলো হয়ে। শুরু হয়ে যাবে বাতাসের সঙ্গে আলোর খেলা ঘরের মধ্যে। হুটোপাটির সেই দুরন্ত খেলা দেখতে দারুণ মজা লাগে। অবিশ্যি বাতাস যদি ঝড় হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে, তখনই বিপদ। শুরু হয়ে যাবে তান্ডব। ছিঁড়ে ছড়িয়ে ভেঙে-গুঁড়িয়ে সর্বনেশে খেলা। সে খেলা আর কে দেখতে চায়।

এই যে আমি দাঁড়িয়ে আছি জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে, কেউ না জানলেও এই জানলা জানে, ওই আলো বাতাসের মতো আমিও তার বন্ধু। সুখের দিনে যেমন, দুঃখের দিনেও তাই। কখনো আনমনে জানলায় চোখ মেলে আকাশের দিকে তাকাই, নয়তো কখনো দৃষ্টি হারিয়ে যায় দূরে, ধু-ধু ধানখেতের দিকে। যাই বলো আর তাই বলো, আকাশ যদি দেখতে হয়, তবে তা দেখতে হয় শরৎকালে দিনের আলোয়। শরতের আকাশ যেমন ঝকঝকে নীল, তেমনই তার বুকে সাদা ধবধবে মেঘ। ভেসে বেড়াচ্ছে। দেখতে দেখতে চোখ জুড়িয়ে যায়। তবে একটা কথা মানতেই হবে। রোদের আলোয় আকাশ উছলে না উঠলে জগৎ জুড়ে যে, এত বাহার ছড়িয়ে আছে, ঘুণাক্ষরেও তার কল্পনা করতে পারতুম না।

আমাদের এখানে একটাই বয়েজ স্কুল। গার্লস স্কুলও একটাই। বয়েজ স্কুলে দাদা আর আমি পড়ি, আর গার্লস স্কুলে বোন পড়াশোনা করে। বোনের স্কুলের নামটা আমার খুব পছন্দ, ‘নন্দিনী’। এই ভালো যে, বোনের স্কুলটা আমাদের বাড়ির অনেকটা কাছে। বয়েজ স্কুলটা একটু দূরে। তা হোক। কিন্তু আমাদের স্কুলবাড়িটা যেমন সুন্দর, তেমনই খোলামেলা। যেদিকেই তাকাও সবুজ আর সবুজ। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা স্কুলের পেছন দিকে একটা ঝিল। শীতের সময় ভিনদেশ থেকে কত পাখি আসে। কী ভালোই না দেখতে লাগে।

আমি এতকথা বলছি বটে, কিন্তু জানি দাদার কথা শোনার জন্যে তোমাদের মন ভীষণ ছটফট করছে। দাদা এখন হাসপাতালে সেই কথাটা তোমাদের কানে তুলেছি, কিন্তু কেন যে হাসপাতালে, সেই আসল কথাটা এখনও বলা হয়নি। সত্যি বলতে কী, কেমন করে বলব, এটাই ভেবে পাচ্ছি না।

তবে, একটা কথা গোড়াতেই বলে রাখি, তোমরা যদি আমাদের স্কুলের ছাত্র হতে তবে পড়ার নামে একফোঁটা ভয়ও ছুঁতে পারত না তোমাদের মন। যেমন ধরো, কারোর হয়তো ইতিহাস পড়তে একদম ভালো লাগে না। ইতিহাসের নামেই ভয়ে জড়োসড়ো। কিন্তু কী আশ্চর্য, মাস্টারমশাইদের পড়ানোর গুণে,একদিন সেই ইতিহাস-ই অজান্তে তার বন্ধু হয়ে ওঠে। তখন মনে ভয়ডর কিছু থাকবে না। মনে জুড়ে বসবে আনন্দ।

আসলে কী জানো, আমাদের স্কুলটা যেন আনন্দের জাদুঘর। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে খুশির পসরা সাজানো। তোমাদের মন যখন যেমনটি চাইবে, তেমনটিই খুঁজে পাবে এখানে। তাই এখানে পড়ার পাশে পাবে খেলা, খেলার পাশে গান। পাবে গানের সঙ্গে নাটক, আঁকাজোকা, গল্প, ছড়া আরও কত কী! শুধু মুখ ফুটে মাস্টারমশাইকে বলা, এখন অঙ্ক ভালো লাগছে না। ছবি আঁকতে ইচ্ছা করছে। মাস্টারমশাই মানা করবেন না।

আমি এই যে স্কুলের এত গুণগান করছি, সে তো আমার করতে ভালো লাগছে বলে, তাই-না? কিন্তু আমার সেই ভালোবাসার স্কুলে কেউ যদি একটা সর্বনাশা কান্ড ঘটিয়ে বসে, আর সেটা নিয়ে যদি সারারাজ্যে ঢিঢি পড়ে যায়, তবে লজ্জায় মাথা হেঁট না হয়ে পারে! অথচ দ্যাখো, তোমরা আমার বন্ধু। সেই সর্বনাশা ঘটনাটা তোমাদের না শুনিয়ে থাকতেও পারছি না।

প্রথমেই বলি, আমাদের দাদা দারুণ ফুটবল খেলে। আমাদের ফুটবল টিমের সুখ্যাতি সবার মুখে মুখে। আর, সত্যি বলতে কী, তার অনেকখানিই ওই দাদার জন্যেই। স্কুলের সামনেই খেলার মাঠ। আমাদের গেমস্যার ওই মাঠেই প্র্যাকটিস করান। আমার দাদা স্ট্রাইকার পজিশনে খেলে। আমাদের স্কুল প্রতিবছর তিনটে-চারটে বড়ো বড়ো ফুটবল প্রতিযোগিতায় নাম দেয়। এইসব প্রতিযোগিতায় দাদা প্রত্যেকটা খেলায় একটা-দুটো গোল তো করবেই। বরাত ভালো থাকলে হ্যাটট্রিকও হয়ে যায়। বলতে পারো, দাদার জন্যে স্কুলের ট্রফি বাঁধা। এই কারণেই হেডস্যার যেমন, অন্যান্য স্যাররাও তেমন দাদাকে খুব ভালোবাসেন। আর ছাত্রদের কাছে দাদা তো হিরো। এইটাই হল কাল। সেই কথাই বলি।

দাদার থেকে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে শ্যামল। আমাদের মতো ক্লাস ওয়ানে ভরতি হয়নি সে। ভরতি হয় ক্লাস এইট-এ। এখানে আসার আগে ও ছিল আসানসোলে। মামার বাড়ি। ছেলেবেলায় পড়াশোনা শুরু সেখানেই। বাবার ব্যাবসা। অঢেল পয়সা। মস্ত বাড়ি। দামি গাড়ি। কী নেই বাড়িতে। আজকের দিনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে যা-যা দরকার, ওদের সব আছে। এমনকী যা না থাকলেও ক্ষতি নেই, তা-ও আছে। লেখাপড়াতেও শ্যামল ভালো। কিন্তু শ্যামলের যা নেই, তা হল পায়ে ফুটবলের শট, আর মাথায় ফুটবলের বুদ্ধি। কিন্তু সবার যে সব হয় না, এটা শ্যামলকে কে বোঝাবে। ওর কিন্তু গোঁ ফুটবল খেলবেই। অথচ গেমস্যার শত চেষ্টা করেও ওকে ফুটবলার বানাতে পারলেন না। অগত্যা তার স্কুল-টিমে জায়গাও হল না। কোনো ম্যাচ সে খেলতেও পারল না। গেমস্যারের ওপর তাই তার রাগ। আর দাদাকে হিংসে। সেই রাগ আর হিংসে যে, কী মারাত্মক হতে পারে, ভাবলেই বুক ঢিপ ঢিপ করে।

শেষপর্যন্ত স্কুল টিমে জায়গা না পেয়ে শ্যামল ঠিক করে ফেলে ও নিজেই একটা ক্লাব গড়বে। ফুটবল ক্লাব। গেমস্যার তাকে স্কুল টিমে না নিলে কী হয়েছে, নতুন ক্লাব গড়ে সে দেখিয়ে দেবে ফুটবল খেলা কাকে বলে! খেলাটা সেও খেলতে জানে! দেখিয়ে দেবে, আমার দাদার চেয়েও সে কম যায় না। বড়োলোকের ছেলে, তাই দেমাকের কী বহর দেখেছ!

হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত সে সত্যিই গড়ে তুলল একটা ফুটবল দল। কিন্তু আমাদের স্কুলের একজন ভালো খেলোয়াড়কেও সে দলে টানতে পারল না। শ্যামল নিজেও জানত এটা খুব শক্ত কাজ। তবু সে চেষ্টার কিছু বাকি রাখল না। একে বলে, তাকে বলে বেশ কয়েকজন প্লেয়ারও জোগাড় করে ফেলল। একজন কোচও পেয়ে গেল। আসলে পয়সা ফেললে কী-না করা যায়! তারপরেই সে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসল। করল কী, একটা আণ্ডার সিক্সটিন-এর কম্পিটিশনে নাম দিয়ে নেমে পড়ল স্কুলের সঙ্গে রেষারেষিতে। এই কম্পিটিশনে গত দু-বছর আমাদের স্কুলই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এ-বছর জিততে পারলে জেতার হ্যাটট্রিক হবে। শ্যামলের লক্ষ্য সেই হ্যাটট্রিক রোখার।

আসলে, এটা হয়তো অনেকটা ঠিক, পয়সা থাকলে অনেক কিছু হাতে আনা যায়। কিন্তু একটা মোক্ষম কথা মানতেই হবে, পয়সা থাকলেও মাথায় যদি গোবর গাদা থাকে, তা পরিষ্কার করা যায় না। আচ্ছা বলো, এটা শ্যামলের কেমন বুদ্ধি, তুই টিমে জায়গা পেলি না বলে, নিজেই একটা টিম গড়ে স্কুলকে হারানোর ফন্দি আঁটিস! এ তো সেই, গাছের যে-ডালে বসে আছি সেই ডালেই কুড়ুল মারার মতো বোকামি! নিজের জ্ঞানগম্যি থাকলে কেউ এমন কাজ করে? তা কে নিচ্ছে কানে সে কথা! আসল কথা হল, যত রাগ তার গেমস্যারের ওপর। সে ভেবেছে স্কুলকে হারানো মানেই গেমস্যারকে টাইট দেওয়া। তবে একটা কথা সে ভালোই জানে, স্কুলের একনম্বর প্লেয়ারটাকে যতক্ষণ না সে হাতে আনতে পারছে, ততক্ষণ জেতার ভরসাও করতে পারছে না।

কে না জানে, স্কুলের ‘একনম্বর প্লেয়ার’ বলতে শ্যামল কার কথা বলছে। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, এখন তার নজর আমার দাদার দিকে। ছেলেটা এত বোকা, আমার দাদাকে স্কুল টিম থেকে ভাঙিয়ে নেওয়ার জন্যে তলে তলে ফন্দি আঁটা শুরু করল। একদিন কথায় কথায় দাদাকে বলেই ফেলল, ‘শুভ্র তুই যা খেলিস না, দারুণ! তোর খেলা দেখে চোখ ফেরানো যায় না। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, এরকম খেললে একদিন তুই জাতীয় দলে পেয়ে যাবি। তুই এত ভালো খেলে স্কুলকে এত ট্রফি এনে দিয়েছিস, কিন্তু স্কুল তোকে কী দিয়েছে বল? কাঁচকলা। আমি তোকে একটা মোবাইল প্রেজেন্ট করব।’

শ্যামলের কথা শুনে প্রথমটা দাদা একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছিল। ভেবেছিল শ্যামল বুঝি তার সঙ্গে ঠাট্টা করছে। তাই দাদা হেসে ফেলেছিল। বলেছিল, ‘ওটা আমার খুব কাজে লাগবে না।’

‘তবে কী নিবি বল?’ জিগ্যেস করেছিল শ্যামল।

‘কী আবার নেব? আর কেনই-বা নেব?’ উত্তর দিয়েছিল দাদা।

‘আমি দেব বলে তুই নিবি।’ হাসতে হাসতে বলেছিল শ্যামল।

‘ফালতু আমাকে কিছু দিবিই বা কেন?’ জিগ্যেস করেছিল দাদা।

‘ফালতু কেন বলছিস? আমি কি ভালোবেসে তোকে কিছু দিতে পারি না? এই বয়সে এমন ফুটবল ক-জন খেলতে পারে।’

শ্যামলের কথা শুনে দাদা হেসে ফেলেছিল। শ্যামল জিগ্যেস করেছিল, ‘হাসছিস কেন?’

মুহূর্তে হাসিটা মুছে গেল দাদার মুখ থেকে। একটু থেমে উত্তর দিয়েছিল, ‘স্কুলে ভালো খেলা, আর একটা নামকরা বড়ো ক্লাবে খেলা অনেক তফাত। আমি যে চিরদিন ফুটবল খেলব, তারও তো কোনো ঠিক নেই। যদ্দিন স্কুল তদ্দিন ফুটবল। তারপর কে যে কোথায় হারিয়ে যাব, কী করব তার কি কিছু ঠিক আছে?

দাদার কথা শেষ হতেই শ্যামল শুনিয়ে দিল, ‘দেখিস আমি কিন্তু হারব না। আমার ক্লাবটাকে আমি মস্ত বড়ো করে গড়ে তুলব।’

উত্তরে দাদা বলেছিল, ‘হতে পারে। তবে এখন তুই যা করছিস সেটা খুব ভালো করছিস না।’

‘কোনটা ভালো করছি না?’

‘যে স্কুলের ছাত্র তুই সেই স্কুলকে অপদস্ত করার জন্যে যা করছিস সেটা একদম ঠিক নয়। আর একটা টিম করে ঝুটমুট ঝগড়া বাধাচ্ছিস কেন?’

দাদার উত্তর শুনে শ্যামল বলল, ‘তুই-ই বল, ঝগড়া আমি বাধিয়েছি, না গেমস্যার বাধালেন? কেন আমায় টিম থেকে বাদ দিলেন তিনি? কেন তিনি আমাকে বাদ দিয়ে অর্ককে নিলেন?’

দাদা জবাব দিল, ‘অর্ক ভালো খেলে।’

এবার শ্যামলের মেজাজ গেল বিগড়ে। সে রেগেমেগে বলে উঠল, ‘তুই কি বলতে চাস, অর্কর চেয়ে আমি খারাপ খেলি?’

দাদার উত্তর, ‘আমি সে-কথা বলব কেন? বলব, অর্ককে টিমে নিয়ে গেমস্যার ভুল করেননি।’

উত্তরে শ্যামল বলল, ‘তাহলেই আমিও বলতে পারি, আর একটা টিম করে আমিও ভুল করিনি।’

‘সেটা অবশ্য খেলার মাঠে বোঝা যাবে।’ দাদা ঠাণ্ডা মেজাজেই কথাটা বলল। মেজাজ কিন্তু একটুও ঠাণ্ডা হল না শ্যামলের সে কড়াস্বরেই বলল, ‘খেলার মাঠে যাবার আগে সেই বোঝাবুঝিটা এখানেই আমি তোর সঙ্গে সেরে ফেলতে চাই।’

কীরকম? অবাক হল দাদা।

‘সবাই জানে স্কুল টিমের আসল স্তম্ভটা কে! সেই স্তম্ভটাকে যদি কোনোরকমে সরিয়ে নেওয়া যায়, তবে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে সময় নেবে না টিমটা। তখন আমার টিমকে আটকায় কে! আর সেই স্তম্ভটা অন্য আর কেউ নয়, তুই।’ বলে শ্যামল দাদার মুখে দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

শ্যামলের কথা শুনে দাদা হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, ‘ও, তাই বুঝি স্তম্ভটাকে নড়বড়ে করে দেওয়ার জন্যে তুই আমাকে মোবাইল প্রেজেন্ট করার নাম করে ঘুস দিতে চাইছিস? তবে শোন কোনো টিমের এগারোটা প্লেয়ারই যদি স্তম্ভ না-হয় তবে একা একটা স্তম্ভ কখনোই তার ভার সামলাতে পারে না। আমি একা নই, গোটা দলটাই একটা শক্তপোক্ত স্তম্ভ। তাই আমরা একটার পর একটা ম্যাচ জিততে পারছি। আমি জোরগলায় বলতে পারি, আমি তোদের টিমের হয়ে খেললেও স্কুলের কাছে তোদের টিম গোহারান হারবে।’

দাদার কথা শুনে শ্যামলের মুখখানা রাগে জ্বলে উঠল। বলল, ‘বেশ তো, তুই তা হলে বসে যা। স্কুলের হয়ে খেলিস না। প্রমাণ হয়ে যাক আমার টিম গোহারান হারে কি না।’

আসলে স্কুলের হয়ে দাদা যাতে না খেলে এটাই ছিল শ্যামলের একমাত্র লক্ষ্য।

এটা তো দাদা বুঝতেই পারল। ভেতরে ভেতরে শ্যামলের ওপর বিরক্ত হলেও দাদা কিন্তু এখনও পর্যন্ত একটিও আজেবাজে কথা মুখে উচ্চারণ করেনি। শেষমেশ থাকতে না পেরে বলল, ‘দ্যাখ, শ্যামল তোদের অনেক পয়সা। একটা ফুটবল টিম কেন, এমন আরও পাঁচটা খেলার দল গড়তে পারিস। সে তো খুব ভালোকথা। কিন্তু এখন তুই গেমস্যারকে হেয় করার জন্যে যে রাস্তায় হাঁটছিস, সেটা খুব খারাপ। তুই আমায় যতই লোভ দেখাস, আমি স্কুলের হয়ে খেলবই। আমার কাছে স্কুল যেমন ভালোবাসার, গেমস্যারও তেমনই শ্রদ্ধার। আমাকে রুখতে পারবি না।’

শ্যামলের মুখের ওপর দাদার এই না-পরোয়া জবাবটাও বড়োলোকের আদরে মানুষ হওয়া ছেলের সহ্য হবে কেন! তার আঁতে এমন ঘা লাগল যে, সে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বেশ চড়াগলায় কড়কে উঠল, ‘তবে শুনে রাখ শুভ্র, আমার নাম শ্যামল। আমি কথার ধার ধারি না। আমি জানি তোর খেলা কেমন করে বন্ধ করতে হয়। শুধু একদিনের জন্যে নয়, চিরদিনের জন্যে তুই যাতে খেলতে না পারিস, সেটা আমি দেখে তবে ছাড়ব।’

শ্যামলের তড়পানি শুনে দাদার মেজাজ গেল আরও বিগড়ে। শ্যামলের গলার ওপর আরও গলা চড়িয়ে দাদা বলে উঠল, ‘যা, যা বেশি বাহাদুরি দেখাসনি। তুই কেমন করে দেখে নিস, সেটা আমিও দেখে নেব। তোদের পয়সা আছে বলে এত দেমাক। তোদের মতো পয়সাওয়ালা অমন মানুষ হাজারে হাজারে পথেঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে!’

শ্যামল চোটপাট করে উঠল, ‘ওভাবে আমার সঙ্গে কথা বলছিস কেন?’

‘তুই-ই বা আমার সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে চটামটি করছিস কেন?’

‘জানিস তোর চেয়ে আমি একক্লাস উঁচুতে পড়ি।’

‘তাতে কি মাথা কিনে নিয়েছিস? ক-দিন পরে আমিও তো ওই ক্লাসে উঠব।’

‘আমি তোর ক্লাসে ওঠার বারোটা বাজিয়ে দিতে পারি।’ রাগে গর্জে উঠল শ্যামল।

দাদাও চিৎকার করে উঠল, ‘তাই নাকি। দেখি কেমন করে তুই আমার বারোটা বাজাস! চ্যালেঞ্জ রইল!’

এটা নেহাতই এক স্কুলের দুই ক্লাসের দু-জন ছাত্রের মধ্যে কথা কাটাকাটির ব্যাপার। অন্য কিছু নয়। এমন তো হয়েই থাকে। কিন্তু এই তুচ্ছ ব্যাপারেই যে শ্যামলের মাথায় খুন চেপে বসবে, এ তো স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি কেউ। পরের দিন এই নিয়ে সে কী ভয়ংকর কান্ড ঘটে গেল স্কুলে। শুনলে গায়ের রক্ত হিম হয়ে যাবে তোমাদের। তখনও এগারোটা বাজেনি। ক্লাসও শুরু হয়নি। তখনও হুড়মুড় করে ছেলেরা স্কুলে ঢুকছে। আমি আর দাদা প্রায় প্রতিদিনই একসঙ্গে স্কুলে যাই। আজও তার নড়চড় হল না। আমরা যখন স্কুলে পৌঁছোলাম তখনও ঘন্টা পড়তে পাঁচ-সাত মিনিট বাকি ছিল। আজ দেখলুম শ্যামল আমাদের আগে স্কুলে পৌঁছে গেছে। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা গম্ভীর। আমাদের দেখতে পেয়ে সে চেঁচিয়ে দাদাকে বলল, ‘শুভ্র দাঁড়া।’

দাদা দাঁড়াল। দাদার সঙ্গে আমিও দাঁড়িয়ে পড়লুম। কিন্তু গলার স্বর শুনে আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। মনে হল, ও বোধ হয় দাদার গায়ে হাত তুলবে। আমি ভাবতে ভাবতেই শ্যামল দাদার সামনে হাজির। আর অন্য কোনো কথা নয়, খুব-ই তেড়িয়া মেজাজে সে দাদাকে জিগ্যেস করল, ‘কী ঠিক করলি?’

স্বভাবতই দাদা প্রথমটা একটু হকচকিয়ে গেছিল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী ঠিক করার কথা বলছিস?’

‘কাল যা বললুম?’

‘কাল যা বলেছিস তার উত্তর আমি তো কাল-ই দিয়েছি তোকে’।

‘তুই তাহলে আমার কথা রাখবি না?’

বলতে বলতে শ্যামল দেখলুম তার প্যান্টের পকেটে হাত ঢোকাল।

দাদা উত্তর দিল, ‘কালকের কথা কাল-ই তো শেষ হয়ে গেছে। আমার আর কিছু বলার নেই।’

দাদার মুখের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি চমকে চেয়ে দেখি শ্যামলের যে হাতটা প্যান্টের পকেটে ছিল, সেই হাতটা বেরিয়ে এসেছে। সেই হাতে একটা রিভলবার! দাদার দিকে তাক করে তুলে ধরেছে শ্যামল। দাদাকে গুলি ছুড়ে মারবে সে!

সেই দৃশ্য দেখে আমার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠেছে। আমি প্রথমটা থমকে গেছি। তারপরেই চোখের পলকে শ্যামলের দিকে ধেয়ে গিয়ে মেরেছি এক ধাক্কা। সে ধাক্কা খেয়ে বেটাল হয়ে হুমড়ি খেল। অমনই তার রিভলভারের পেট থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা গুলি। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল চিৎকার, চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি, হল্লা। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে—গুলি! গুলি!

অবশ্য, সেদিকে তখন আমার চোখও নেই কানও নেই। আমি তখন চেপে ধরেছি শ্যামলকে। শুরু হয়ে গেল ধস্তাধস্তি। কিন্তু শ্যামলের সঙ্গে আমি গায়ের জোরে পারব কেন! ও আমার চেয়ে বয়সে বড়ো, শক্ত সমর্থ। কিন্তু আমার বরাত ভালো, গুলির শব্দ শুনে তিন-চার জন মাস্টারমশাই পড়িমরি করে ছুটে এসে শ্যামলকে ধরে ফেলেছেন। সেই তক্কে আমি শ্যামলের হাতে একটা মোক্ষম মোচড় দিয়ে ছিনিয়ে নিলুম রিভলবারটা। সাতপাঁচ অন্য কিছু না-ভেবে তার দিকেই তাক করে রিভলবারের ট্রিগারটা টিপে দিলুম। কিন্তু রিভলভারে শব্দও উঠল না, গুলিও ছুটল না। আমি হতভম্ব হয়ে আর একবার ট্রিগারে চাপ দিলুম। তবু গুলি ছুটল না। ততক্ষণে মাস্টারমশাইরা আমার দিকে তেড়ে এসেছেন। আমার হাত থেকে রিভলবার কেড়ে নেবেন। কিন্তু তার আগেই রিভলবারটা নিয়েই আমি দিলুম ছুট! দাদার যে কী হল, সে আর আমার দেখা হল না। বইয়ের ব্যাগ কাঁধেই ঝুলে রইল। হাতের রিভলবার প্যান্টের পকেটে লুকিয়ে ফেললুম।

আমি এখন ছুটছি। কোনদিকে ছুটছি খেয়াল নেই। এমনকী আমাকে ধরবার জন্যে আমার পেছনে কেউ ছুটে আসছে কি না, সেটা পর্যন্ত ঘাড় ফিরিয়ে দেখার সময় নেই। অত কী, আমি কেন পালাচ্ছি রিভলবারটা নিয়ে, কী করব, কোথায় পালাব কিছুই জানি না। এখন আমি শুধুই ছুটছি। আর মনে মনে ভাবছি কেউ না আমায় ধরে ফেলে!

কিন্তু সত্যিই তো, আমি পালাচ্ছি কেন? রিভলবারটা থেকে একটা গুলি ছিটকে বেরিয়ে যদি শ্যামলের বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিত, তবে পালালে তার একটা মানে খুঁজে পাওয়া যেত। এখন পালানোর তো কোনো মানে নেই। জীবনে এই প্রথম একটা রিভলবার হাতে ধরেছি। হাতে ধরার কথা ছেড়েই দাও, এর আগে কোনোদিন রিভলবার চোখেই দেখিনি। শ্যামল ওই মানুষমারা যন্ত্রটায় যেটা টিপে গুলি ছুড়ল সেটাকে যে, ‘ট্রিগার’ বলে সেটা পর্যন্ত আমার জানা ছিল না। আমি পরে জেনেছি। আমিও শ্যামলের দেখে ওই ট্রিগারটা টিপে ওর বুকে গুলি ছোড়বার চেষ্টা করেছি। ট্রিগার নড়েছে, কিন্তু গুলি ছিটকোয়নি। তবে কি রিভলবারের গুলি ছোড়ার কায়দাটা আমার ঠিকঠাক জানা নেই বলে এমনটা হল? নাকি রিভলবারের গুলি ফুরিয়ে গেছে! আচ্ছা, শ্যামল রিভলবারটা পেলই বা কোথা থেকে? তবে কি ও বাবাকে রিভলবার ছুড়তে দেখে, নিজে শিখেছে? হয়তো তাই-ই হবে।

না, আর ছুটতে পারছি না। আমার দম ফুরিয়ে আসছে। আমি থামলুম। বই-এর ব্যাগটা পিঠের থেকে নামালুম। হাঁপাচ্ছি। এবার একটু না বসলেই নয়। কিন্তু বসব কী, উলটে চমকে উঠেছি! আমাকে তো ধরবার জন্য একদল মানুষ পিছু নিয়েছে! এখানে বসলে যে ধরা পড়ে যাব! আমি সেই ভয়ে বই-এর ব্যাগটা আবার পিঠে তুলতে তুলতে পেছনে তাকিয়েছি। আমায় আবার ছুটতে হবে। না পারলে, জংলার কোনো ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে হবে! কিন্তু যদি ধরা পড়ে যাই!

কিন্তু আশ্চর্যের কথা কী, পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, আমাকে ধরবার জন্যে আমার পেছনে একটি মানুষও ছুটে আসেনি! আমি ভয়ে একাই ছুটেছি। একাই ছুটতে ছুটতে এই জংলায় ঢুকে পড়েছি। অমন যে একটা ভয়ংকর কান্ড ঘটে গেল স্কুলে, এখানে তার কোনো আঁচ-ই নেই। একেবারেই শান্ত, নির্জন।

তবু বিশ্বাস নেই। আমি তড়িঘড়ি একটা ঘন ঝোপের মধ্যে ঢুকে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকলুম। আসলে ভয়ানক হাঁপিয়ে গেছি বলে লুকিয়ে পড়া ছাড়া অন্য কিছু করারও ছিল না!

অবশ্য লুকিয়ে বসে থাকতে হল না বেশিক্ষণ। খানিকপরেই দমটা সামলে নিলাম। ভয় পাওয়ার কোনো লক্ষণ নজরে পড়ল না। বুঝতেই পারা যাচ্ছে, আমাকে ধরার জন্যে এইদিকে কেউ আসেনি। এই জংলা আগে যেমন নির্জন ছিল, এখনও তেমনই নির্জন আর শান্ত আছে! আমার প্যান্টের পকেটে রিভলবার। অনেকখানি ছুটে এসেছি। সেটা ঠিকঠাক আছে কি না দেখার জন্যে মনটা উশখুশ করেই চলেছে। প্যান্টের পকেটের ভেতরে এখনও হাত গলাইনি। ওপর থেকে হাত বুলিয়ে বোঝাই যাচ্ছে, সেটা ঠিকই আছে। এখন বড্ড ইচ্ছে করছে বার করে দেখি! কিন্তু সাহসে কুলোচ্ছে না! হঠাৎ যদি কেউ দেখে ফেলে!

অদ্ভুত এক আতঙ্কে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে! এখানে যে কেউ নেই, কারোর দেখে ফেলার যে কোনো সম্ভাবনাও নেই, মন যেন তা কিছুতেই মানতে পারছিল না। কিন্তু এই অস্থির মন নিয়ে মানুষই বা কতক্ষণ হাত গুটিয়ে থাকতে পারে? সুতরাং পকেটে আমার হাত যেন আপনা-আপনিই ঢুকে গেল। ঝাঁ করে বেরিয়ে এল রিভলবারটা। এতক্ষণ আমার চারপাশটা যতখানি অবাক হয়ে আমি তাকিয়ে দেখছিলুম, তার চেয়ে দ্বিগুণ বিস্ময়ে চোখ ড্যাবড্যাব করে আমি রিভলবারটা উলটেপালটে দেখতে লাগলুম। খুঁজতে লাগলুম রিভলবারের ভেতরে গুলি আছে কী নেই!

আচ্ছা বলো, এসব দেখে এখন কেউ যদি আমাকে ক্যাবলাকান্ত বলে, তবে তাকে কি দোষ দেওয়া যায়? আরে বাবা, যে মারাত্মক অস্ত্রটার কলকব্জার খুঁটিনাটি কিছুই জানি না, আনাড়ির মতো সেটা নাড়ানাড়ি করলে যে, কিছু একটা অঘটনও ঘটে যেতে পারে, সেটা পর্যন্ত আমি ভাবছি না! এই দ্যাখো, আবার টিপলুম ট্রিগারটা!

আরে করছ কী! করছ কী! অমন আনতাবড়ির মতো টেপাটিপি কোরো না! গুলি যদি ছিটকোয়, তখন কী হবে?

উফ! খুব রক্ষে, গুলি এবারও ছিটকাল না। আমি আবারও ট্রিগার টিপলুম। এবারও না। তখন আমার আর কোনো সন্দেহই রইল না, রিভলবার ফাঁকা। শ্যামল তখন দাদাকে লক্ষ্য করে শেষ গুলিটাই ছুড়েছিল। সুতরাং, এখন শ্যামলকে মারতে গেলে আমার গুলি চাই রিভলবারে ভরার জন্যে। কিন্তু সেটা তো এক অসাধ্য কাজ। কোথায় পাব আমি রিভলবারে ভরার জন্যে গুলি! কে দেবে আমায়? তা ছাড়া আমি চাইবই বা কেমন করে? আর কার কাছেই বা চাইব?

এইসব নানান এলোমেলো কথা ভাবতে ভাবতে, হঠাৎ দাদার কথা মনে পড়ে গেল। বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। হঠাৎ মনে হল, শ্যামল যখন রিভলবারটা দাদার বুকের দিকে তাক করে গুলি ছুড়তে গেল, তখন শ্যামলকে আমি ধাক্কা দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু গুলি তো শব্দ তুলে ছিটকে বেরিয়েছিল। সেই গুলিটা কি দাদার গায়ে লাগেনি। যদি না লেগে থাকে, তবে কার গায়ে লাগল? কে জানে!

কিন্তু এখন এই ঝোপে-জঙ্গলে চোরের মতো লুকিয়ে বসে রিভলবারটা হাতে নিয়ে ভাবছি, এবার কী করব? রাগের মাথায় দু-দুটো ভুল কাজ করে ফেলেছি। প্রথম ভুলটা হল, রিভলবারটা শ্যামলের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ওকে মারব বলে ওর দিকে তাক করে ট্রিগার টিপেছি। আর দ্বিতীয় ভুলটা হল, রিভলবার থেকে গুলি বেরোল না বলে রিভলবারটা নিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি। দুটোই অনুচিত কাজ। এই দুটো অনুচিত কাজের জন্য আমার শাস্তিও হতে পারে। আমায় যদি জেল খাটতে হয়! ভাবতে ভাবতে আমি অস্থির হয়ে উঠলুম। ভয়ে বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল।

এটাও তো ঠিক, এখানে তো আর চিরকাল লুকিয়ে বসে থাকা যাবে না। আমাকে যাহোক তো একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু সেই ‘একটা কিছু’ যে কী, কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছি না। তখন বুদ্ধিটা কেমন যেন, তালগোল পাকিয়ে মনটা তোলপাড় করে উঠল। আশ্চর্য ব্যাপার কী, ঠিক এইসময়ে হঠাৎ একটা মনকাড়া দৃশ্য নজরে পড়ে গেল। দেখি কী, একটা মস্ত উঁচু ঝাঁকড়া গাছের বাসায় একটা মা-পাখি সদ্য ডিম-ফোটা তার ছানার ঠোঁটে ঠোঁট পুরে তাকে খাবার খাওয়াচ্ছে। বলব কী, সেই দৃশ্যটা দেখে আমারই মায়ের মুখখানা আচমকা আমার চোখে ওপর ভেসে উঠল। চকিতে মনে হল, এখন এই বিপদ থেকে একমাত্র মা-ই আমাকে বাঁচাতে পারেন। এই কথা মনে হতেই আমার আর তর সইল না। চোখের পলকে জংলার সেই ঝোপ-ডিঙিয়ে আমি ছুট দিলুম বাড়ির দিকে, মায়ের কাছে।

আর, কেমন করে যে, মায়ের কাছে এত দ্রুত পৌঁছে গেলুম, নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাই।

মায়ের চোখে জল। মা কাঁদছিলেন। বোনটার চোখেও জল। বোনও কাঁদছিল। মা আমায় দেখতে পেয়ে পড়িমরি করে ছুটে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। আমার পিঠে ঝোলানো বই-এর বোঝাটা আমার নামানোরও সময় হল না। আমিও হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললুম। কাঁদতে কাঁদতে জিগ্যেস করলুম, ‘দাদা কোথায়, মা?’

‘হাসপাতালে’।

আমি চমকে উঠলুম। ব্যস্ত গলায় জিগ্যেস করলুম, ‘দাদার বুকে গুলি লেগেছে?’

‘লেগেছে। বুকে নয় হাতে। বেঁচে গেছে।’ মা উত্তর দিলেন।

আমি অস্থির হয়ে বলে উঠলুম, ‘আমি যাব। আমি দাদাকে দেখতে যাব। তারপরেই জিগ্যেস করলুম, ‘বাবা কোথায়?’

‘থানায়’। উত্তর দিল আমার বোন।

‘কেন?’ বলতে বলতে আমি বই-এর ব্যাগটা পিঠ থেকে নামালুম।

মা নিজের আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, ‘কেউ যদি রিভলবার দিয়ে কাউকে খুন করতে যায়, তবে থানা পুলিশ হবে না? ছি ছি! তোমরা এখন কোথায় মন দিয়ে পড়াশোনা করবে। বন্ধুরা মিলেমিশে খেলাধুলো করবে। আনন্দ করবে একসঙ্গে—তা নয়, ঝগড়া করে বন্ধুকে রিভলবারের গুলি ছুড়ে মারবে?’

মায়ের কথা শুনতে শুনতে আমি প্যান্টের পকেট থেকে রিভলবারটা বার করে ফেলেছি ততক্ষণে। মাকে দেখাবার আগেই, বোন দেখে ফেলেছে। বোন আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা, ওই দ্যাখো ছোড়দার হাতে রিভলবার!’

আমি আর কথা বাড়ালুম না। মা কিছু বলার আগেই মায়ের হাতে রিভলবারটা তুলে দিয়ে বললুম, ‘আমি শ্যামলের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছি। কেড়ে নিয়ে শ্যামলের বুকে গুলি ছোড়ার জন্যে আমি ট্রিগার টিপেছিলুম। রক্ষে, গুলি বেরোয়নি। নইলে, এতক্ষণে হয়তো আর একটা ভয়ানক বিপদ ঘটে যেত! তখন কী হত মা?’

মা উত্তর দিলেন, ‘কিচ্ছু হত না। পৃথিবীটা যেমন চলছে তেমনই চলত। শুধু দুটো মানুষ, শ্যামলের মা আর বাবা যতদিন বেঁচে থাকতেন ছেলের শোকে হাহাকার করতেন। আর আমরা? আমরা যতদিন বেঁচে থাকতুম—আমাদের ছেলে খুনি—এই অপবাদ নিয়েই বেঁচে থাকতে হত।’ বলতে বলতে মা আমার মুখের দিকে এমন করুণচোখে তাকালেন, দেখে আমার ভারী কষ্ট হল।

দু-দিন পর দাদা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। হাতে ব্যাণ্ডেজ। ক-দিন ধরে অনেক থানা, পুলিশ, আদালত ছোটাছুটি করতে হয়েছে। এখন শোনা যাচ্ছে, শ্যামলকে কিশোরদের সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে। তার স্কুল আসা বন্ধ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%