আজব কান্ড

শৈলেন ঘোষ

একটা পাহাড়। মস্ত উঁচু। পাহাড়ের কোলে একটা নদী, আর নদীর ওপারে একটা গভীর বন। সেই বনে একটা বাঘ থাকত। একদিন হঠাৎ বাঘটা দেখে কী, একটা হরিণ নদীতে মুখ ডুবিয়ে জল খাচ্ছে। যেই দেখা, তাকে ধরবার জন্যে বাঘটা তাক কষতে লাগল। তাক কষলে কী হবে, হরিণটা আচমকা বাঘটাকে দেখে ফেলেছে। দেখেই দে ছুট! এমন ছোটা ছুটল যে, তাকে ধরে কার সাধ্য। অবিশ্যি, বাঘটাও হরিণটার পেছনে ছুটল বটে, কিন্তু ধরতে পারল না। ধরবে কেমন করে! বাঘটা ছিল মানুষ খেকো। বলতে কী, মানুষ ধরা তো খুব সহজ। বেশি দৌড়ে ছুটে মেহনত করতে হয় না। মানুষ দেখতে পেলেই হল। মারো লাফ, ধরো খপাত! এর ফলে হল কী, মানুষ ধরতে ধরতে বাঘটা হয়ে গেল ভীষণ গেঁতো। তার গাঁটে গাঁটে বাতও ধরে গেল। খিদে পেলে তাই বাঘটা নদী পেরোত। নদীর এ-পারে মানুষের বসতি। সুযোগ পেলেই রাতের অন্ধকারে মানুষ শিকার করতে বেরোত।

একবার হয়েছে কী, অন্ধকারে বাঘটা যখন নদী পেরিয়ে মানুষ শিকার করতে গেছে তখন একটা ভূত তাকে দেখতে পেয়েছে। অবিশ্যি এ ভূতটা ছিল খুবই ছেলেমানুষ খোকা ভূত! ভূতটা বাঘ দেখে, চুপিসারে বাঘের পিছু নিয়েছে। তবে, ছেলেমানুষ ভূত হলে কী হবে, ভূত সে ভূতই। আসলে কিন্তু এই ভূতটা আগে ভূত ছিল না। সে যখন মানুষ ছিল, তখন এই বাঘটাই একদিন তাল পেয়ে তাকে গিলে খেয়ে ফেলে। আর সেই থেকেই তার ভূতের দশা।

বাঘটা শিকারে বেরিয়ে ‘খিদে পায়, কাকে খাই’ করতে করতে দেখতে পেল, একটা মন্দির। মন্দিরের দুয়ারের পাশে একটা ছেলে কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। আর কথা আছে! তাকে দেখেই বাঘের নোলা দিয়ে জল গড়াতে লাগল। বাঘ বুঝি এই মারল তার ঘাড়ে লাফ!

এদিকে সেই ছেলেভূতটা বাঘের ধড়িবাজি আঁচ করতে পেরেছে। তাই যে মুহূর্তে বাঘটা ঘুমন্ত ছেলেটাকে তাক করে মেরেছে লাফ, অমনই বাঘের অজান্তে ছেলেমানুষ ভূতটাও বাঘের পিঠের ওপর লাফিয়ে উঠে পড়েছে। উঠে পড়েই এমন কাতুকুতু দিতে শুরু করল যে, বাঘ হেসে গড়িয়ে একেবারে তুলকালাম বাধিয়ে বসল। ভূত, সে তো অদৃশ্য। তাই বুঝতেই পারল না, এমনটা হচ্ছে কেমন করে।

বাঘের হাসি শুনে সেই ঘুমন্ত ছেলেটার কোথায় ঘুম, আর কোথায় কী! সে তো বাঘের হাসি শুনে, আর গড়াগড়ি দেখে ভ্যাবাচাকা হাম্বা। বাঘ দেখেই ছেলেটা মার ছুট!

অমনই সেই ভূতটা চিৎকার করে হাঁক পাড়ল, ‘‘এঁই, এঁই, পাঁলাস না। দেঁখে যাঁ আমি কেঁমন কঁরে বাঁঘের পিঁন্ডি চঁটকাঁই!’

ছেলেটা ছুটতে ছুটতে থ। থমকে দাঁড়ায়। চোখ কচলায়। ভাবে, এ কীরে বাবা, কেউ কোথাও নেই অথচ—

হ্যাঁ, ছেলেটা জানে ভূতেরা নাকি সুরে কথা বলে! আর দাঁড়ায়। দে লম্বা! সামনে একটা মস্ত গাছ দেখে তরতর করে উঠে পড়ল মগডালে। দেখতে লাগল মাটির ওপর বাঘের গড়াগড়ি আর ভয়ংকর চিৎকার। আসলে চিৎকারটা যে বাঘের হাসি, সেকথা আর ছেলেটা জানবে কেমন করে!

তা, হয়েছে কী, এই মানুষখেকো বাঘটাকে মারবার জন্যে, এক বিলিতি সাহেব বন্দুক নিয়ে, রাতের অন্ধকারে অন্য একটা গাছে মাচা বেঁধে সজাগ হয়ে বসেছিল। হঠাৎ বাঘের হাঁকডাক শুনে, সাহেব বন্দুক হাতে গুটিশুটি গাছ থেকে নেমে এল। খুঁজতে লাগল বাঘটাকে বন্দুকটা ভালো করে বাগিয়ে। আসলে অন্ধকার তো কিছুই দেখা যায় না, বাঘের গর্জনই শোনা যায়।

এদিকে গর্জন শুনতে শুনতে সাহেব একেবারে বাঘের সামনে উপস্থিত! হলে কী হবে, ভূতের কাতুকুতু খেয়ে বাঘ এমন ইদিক-উদিক চক্কর খাচ্ছে, যে, বন্দুক তাক করতেই সাহেব হিমসিম খেয়ে গেল। সাহেবকে অমন করে বন্দুক তাক করতে দেখে ছেলেমানুষ ভূতটা ভাবল, সাহেব বুঝি তাকেই মারে! ভূতটা নিজে জানে না তো, সে অদৃশ্য। তাই সে এবার বাঘটাকে ছেড়ে সাহেবের ঘাড়ে চেপে বসল। চেপেই দে কাতুকুতু! ওদিকে বাঘ ছাড়া পেয়ে চোখ-কান বুজে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পগারপার। অন্ধকারে কোথায় যে পালিয়ে গেল আর দেখা গেল না। আর এদিকে কাতুকুতুর ঠেলায় শিকারির হাত ফসকে বন্দুকটা যে কোথায় হারাল আর নজরে পড়ল না।

শেষকালে সেই গাছে ওঠা ছেলেটা, সাহেব শিকারির সামনে এসে দাঁড়াল। জিগ্যেস করল, আপনি এত হাসছেন কেন?’

সাহেব কি-আর বাংলা জানে যে, উত্তর দেবে! সে হেসেই কুটিপাটি।

ছেলেটা ভাবল, কী রে বাবা, বাঘ মারতে গিয়ে সাহেবটা শেষে পাগল হয়ে গেল নাকি! সাহেবের কান্ড দেখে ছেলেটাও ফিক করে হেসে ফেলল।

ছেলেটা ফিক করে হেসে ফেলতেই সাহেবের ঘাড়ে বসা সেই অদৃশ্য ছেলেমানুষ ভূতটাও হিঁ-হিঁ করে হেসে উঠে ফট করে কয়ে উঠল, ‘‘আঁহা, তোঁর হাসিটা কিঁ মিঁষ্টি রেঁ! আঁয়, আঁমার কাঁছে আঁয়, দুঁ-জনে গঁলা জঁড়িয়ে নেঁচে নেঁচে হাঁসি।’

এই নাকি-নাকি কথা যেই না শোনা, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটার মুখের হাসি মুখেই গেল আটকে। ‘ওরে বাবারে ভূত’ বলে দে পিটটান!

ছেলেটাকে ছুটতে দেখে, ছেলেমানুষ ভূতটাও সাহেবকে ছেড়ে ছেলেটার পেছনে ছোটা দিলে। হাঁকতে লাগল, ‘ভঁয় নেই রেঁ, ভঁয় নেই, আঁমি তোঁর বঁন্ধু। দাঁড়া দাঁড়া!’

আর দাঁড়া! তার তখন ভূতের ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার গোত্তর। ছেলেটা কোথায় যে হাওয়া হয়ে গেল, আর দেখাই গেল না। শুধু সেই সাহেব শিকারি ভ্যাবাচাকা খেয়ে ইদিক-উদিক দেখছে, আর নিজের গালে হাত বুলিয়ে ভাবছে, এই দেখলুম বাঘ, হয়ে গেল ভূত! আজব কান্ড!

অধ্যায় ২৫ / ২৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%