শৈলেন ঘোষ
টুকু আজ ভারি জব্দ হয়েছে। বাবা তাকে আজ ছাতের চিলেকোঠায় বন্ধ করে রেখেছেন। আজ ভীষণ রেগে গেছেন।
ছেলেকে নিয়ে জ্বালাতন-পোড়াতন। এইটুকুনি ছেলে। নয় কি দশ বছর বয়েস এখনই কী দুষ্টু! পড়াশোনো তা দূরের কথা—খালি রাস্তায় রাস্তায়, টো-টো করে ঘুরবে। এর পাঁচিলে উঠে ঘুড়ি ধরবে। এর-তার সঙ্গে মারামারি করবে। কুটোকুটি কাড়াকাড়ি, ছেঁড়াছিঁড়ি। দুষ্টুমির একশেষ! সেদিন তো ড্যাংগুলি খেলতে খেলতে পিন্ঢুBর মাথায় এমন ড্যাং-এর বাড়ি ঝাড়লে যে, একেবারে রক্তারক্তি কান্ড। সে যাহোক। কিন্তু আজ? আজ যে কান্ডটা করেছে—সেটা? ওমা! সকালবেলা বামুনঠাকুর ঘুমুচ্ছে, নাক ডাকিয়ে, আর উনি কিনা তার মাথার টিকিটি কাঁচি দিয়ে গোড়া পেঁচিয়ে লোপাট করে দিলে! ছি ছি ছি, বলতেও ঘেন্না! বাবার থাপ্পড়টি গালে যেই পড়ল, তখন কি প্যানপ্যানানি! বললে কি—পিন্টু বলেছিল, ‘বামুন ঠাকুরের টিকি কেটে, সেটা গঙ্গার জলে চুবিয়ে রেখে, মাটিতে পুঁতে দিলে, আর বই ছুঁতে হয় না। বই-এর মলাটের ওপর দুবার ঢিপঢিপ করে গড় করলেই রোজের পড়া আপনি আপনি হয়ে যায়। বলি বুদ্ধি কাকে বলে। ঠিক হয়েছে! থাকো চিলেকোঠায় বন্দি হয়ে।’
টুকুর কিন্তু চিলেকোঠায় বন্দি থেকে, একটুও মন খারাপ হয়নি। ভালোই লাগছে সকালটা। যাক বাবা, আজ সকালে পড়তে হল না তো। আরে যাবে কোথায়? বাবা আপিসে গেলেই হয়। মা অমনি এসে দরজার শেকল খুলে ডাকবে, ‘আয় খাবি আয়। পাজি ছেলে।’ যাই বলো, তাই বলো, মা খুব ভালো। মা কোনো কথা বললে, টুকু কক্ষনো না শুনেছে? কিন্তু মা-তো কক্ষনো বলেই না—এটা করিস না, ওটা করিস না। কেন, বললেই তো পারে। তা নয়, বাবা মারল, মা অমনি চুপি চুপি আঁচল দিয়ে চোখ মুছলে! ওকি সেটা দেখে ফেলেনি?
চিলেকোঠার জানলার গরাদে মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিল টুকু। এখন ক-টা হবে? আটটা-ন-টা হবে। একটু পরেই বাবা বেরিয়ে যাবেন। ভাবতে ভাবতে টুকু কেমন যেন চনমন করে উঠল!
‘এই-ই-ই-ই। মারল, মারল।’ ব্যাস! বলতে বলতেই শেষ। রাস্তা দিয়ে একটা ছেলে খাবারের ঠোঙা নিয়ে যাচ্ছিল—মেরেছে চিলে ছোঁ। টুকু স্পষ্ট দেখল চিলেকোঠার জানালা দিয়ে। সত্যি, চিলগুলো কী চালাক। ভগবান যদি ওকে মানুষ না করে চিল করে দিত তো বেশ হত। কেমন আকাশে আকাশে উড়ে বেড়াত। পয়সা দিয়ে খাবার কিনতে হত না। মায়ের কাছে বায়নাও করতে হত না, ‘মা দুটো পয়সা দাও—চিনে বাদাম খাব।’ যা খুশি খাও, যেখানে খুশি যাও। গড়ের মাঠে অমনি অমনি ফুটবল খেলা দেখো ক্রিকেট খেলা দেখো বা দিনের বেলায় ঝুপ করে একবার সার্কাসের টেন্টে ঢুকে পড়তে পারো—তো রাত্রি বেলা মজাসে সার্কাস দেখো। তখন কি আর বাবা হিড়হিড় করে টানতে টানতে চিলেকোঠায় পুরে রাখতে পারতেন? ধরতে এলেই ফুড়ুৎ।
ফুড়ুৎ করে জানলা দিয়ে একটা চড়াই পাখি উড়ে এল—চিলে কোঠায় উড়ে এল—চিলেকোঠার ঘরে। কিচির-মিচির করতে করতে ঠিক জানলার ওপর, একটা গর্ত—সেই গর্তে ঢুকে গেল। আরে! চড়াইটাকে ধরতে পারলে তো মন্দ হয় না। কিন্তু ধরা যায় কেমন করে? অত উঁচুতে কি আর হাত যায়?। আচ্ছা, একটা কাজ করা যায় তো! টুকু জানলাটা বন্ধ করে দিলে। গায়ের জামাটা খুলে ফেললে। জামাটা সাঁই-ই-ই করে ছুড়ে দিলে ওই ঘুলঘুলিটার দিকে। চড়াইটা বেরোল না। একবার, দু-বার, তিনবার। বার বার অনেকবার ছুড়লে—তবুও বেরোল না। দূর ছাই! অমন করে হবে না। বরং এক কাজ করা যাক। জানালার গরাদে উঠে দেখা যাক—হাত যায় কিনা।
জানালাটা খুলে ফেললে। গরাদের ওপর পা দিয়েছে কি—অমনি চিলকোঠার দরজার শেকলটা বেজে উঠল ঝনাৎ। টুকু তাড়াতাড়ি জানলা থেকে লাফ মারল। ব্যাস। দরজা খুলে গেল। সামনে মা।
‘কী করছিলি?’ মা কীরকম মুখ ভার করে জিগ্যেস করলে।
টুকু থতোমতো খেয়ে বললে ‘না, ও কিছু না, একটা চড়াই পাখি।’
মা কোনো কথা বললে না। টুকুই জিগ্যেস করলে ‘বাবা বুঝি বেরিয়ে গেছেন?’
মা উত্তরই দিল না। দরজাটা খোলা রেখে বেরিয়ে গেল। মাও কি তবে তার ওপর রাগ করেছে? সকাল থেকে এক ফোঁটা জলও সে মুখে দেয়নি। কই তাকে তো মা বলল না, ‘খাবি আয়।’
দুপুরবেলা সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। ও আবার এসেছে চিলের ছাতে। দরজা-জানালা বন্ধ করে ধরে ফেলেছে চড়াইটা। ধাড়ি চড়াই না, একটা-ছানা। মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে টুকুর। ছোড়দির কাঠিম থেকে বেশ খানিকটা সুতো ছিঁড়ে এনে বাঁধলে চড়াই-এর ঠ্যাং-এ। ছাতে দাঁড়িয়ে হাতে সুতোটা ধরে, উড়িয়ে দিল আকাশে। সুতো-বাঁধা চড়াইটা উড়ছে আর বলব কি—অমনি সঙ্গে সঙ্গে একটি দুটি করে কত চড়াই পাখি জুটল! গোল হয়ে ঘুরতে লাগল ছানাটার চারদিকে। কিচির-মিচির করে কান ঝালাপালা করে দিলে। টুকু চড়াই-ছানার পায়ের সুতো টেনে নামিয়ে আনছে, আর সঙ্গে সঙ্গে ওগুলোও নেমে আসছে। আবার সুতো ছাড়ছে ছানাটা ওপরে উঠছে, ধাড়িগুলোও ওপর দিকে উড়ে যাচ্ছে। না চড়াইটাকে নিয়ে এত হট্টগোলে খেলা যাবে না। তার চেয়ে এখন ওটাকে নামিয়ে এনে খাঁচায় পুরে রাখাই ভালো।
খাঁচায় পুরে রেখেও কি পার আছে? অমন দশ-বিশ-পঁচিশটা চড়াই খাঁচাটা ঘিরে চেঁচামেচি শুরু করে দিলে। টুকু তাড়িয়ে তাড়িয়ে দিচ্ছে—আবার ওগুলো উড়ে আসছে। আর ছানা-পাখিটার খাঁচার থেকে বেরিয়ে আসবার জন্যে কী ছটফটানি! বারবার এদিকে ওদিকে মাথা গলাচ্ছে! থাক অমনি।

রাত্তিরবেলা টুকু মায়ের কাছে শুয়েছিল। রাত গড়িয়ে গড়িয়ে একটা দুটো বাজতে বাজতে ভোর হয়ে এসেছে প্রায়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে টুকু স্বপ্ন দেখছে নাকি? সেই চড়াই ছানাটার স্বপ্ন? সেই পাখিটাইতো! খাঁচার ভেতর থেকে, তার মুখের দিকে চেয়ে আছে। চোখ দুটো কি তার জলে ভরে গেছে?
পাখিটা কথা বলে উঠল, ‘তুমি আমায় বেঁধে রেখেছ কেন? আমাকে মায়ের কাছে যেতে দিচ্ছ না? তোমাকে যদি কেউ, অমনি করে, মায়ের কাছ থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখে? তোমার বুঝি কষ্ট হবে না?’
ঝট করে ঘুমটা ভেঙে গেল টুকুর। দেখল, সকালের আলো আকাশ থেকে নেমে এসেছে। নেমে এসেছে টুকুর বিছানার ওপর। ঘুম থেকে উঠেই দেখতে ছুটল খাঁচার পাখিটা। না: এখনো সেটা ছটপট করছে। রান্নাঘরে মায়ের কাছে গেল টুকু।
‘কীরে? সকালবেলাই মুখটা অমন ভার কেন? কী হয়েছে?’
একটুখানি চুপ করে রইল টুকু। তারপর মাকে জিগ্যেস করলে, ‘আচ্ছা মা, পাখিরা কথা বলতে পারে?’
‘কেন পারবে না?’
‘আমাদের মতো কথা বলতে পারে?’
‘হ্যাঁ রে!’
‘কই আমরা তো ওদের কথা বুঝতে পারি না?’
মা হেসে ফেললে। ‘বোকা ছেলে, ওরা কি আমাদের কথা বুঝতে পারে?’
‘আচ্ছা মা, ওদের মা আছে? ঠিক যেমন তুমি আমার মা, তেমনি?’
মা বললে, ‘সব্বারই মা আছে।’
টুকু মায়ের কাছ থেকে চলে গেল ছুটে সেই চড়াই-ছানাটার কাছে। খাঁচাটা উঠানে নিয়ে এল। টুকু মাকে ডাকলে, ‘মা দ্যাখো দ্যাখো।’ খাঁচার দরজাটা খুলে দিল সে। সকালের খোলা আকাশে পাখিটা উড়ে গেল। কোথায় গেল, টুকু আর দেখতে পেলে না।
মা বলে উঠল, ‘ও কীরে! ও কীরে! পাখিটা ছেড়ে দিলি যে বড়ো!’
টুকু ছুটে গিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল। চোখ দুটো যেন তার ছলছল করছে। বললে তুমি যে বলেছ না পাখিদেরও মা আছে। ওর যে মায়ের জন্যে মন কেমন করছে।’
মা টুকুকে বুকের মধ্যে টেনে নিল। বললে ‘টুকু আমার লক্ষ্মী ছেলে, সোনা ছেলে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন