সার্কাস

শৈলেন ঘোষ

টুলুদের দেশে রথের মেলায় ভারি ধুম। কত রকমের দোকান-পসরা। তেলে-ভাজা বেগুনি-ফুলুরি, মিষ্টি-মিঠাই, পাঁপড়-ভাজা। সেই দামি দামি সিল্কের কাপড়, কার্পেটের দোকান, বড়োবড়ো খাট-পালঙ্ক, দেরাজ-আলমারি, পায়রা-পাখি, গাছগাছালি, খেলনা-পুতুল, কত কী! তারপর কত রকমের খেলা। বাঁশবাজি খেলা, ভালুক নাচ, বাঁদর নাচ, বান-মারামারি, জিব কাটার ম্যাজিক, নাচ, গান, বলে শেষ করা যায় না। তার ওপর এবছর আবার এক সার্কাস পার্টি এসেছে। কী যেন নাম? দুর ছাই ইংরিজি নাম অত মনে-টনে থাকে না। তেঁতুলতলার মাঠ জুড়ে, গোল করে তাঁবু ফেলেছে। কী যে আছে সার্কাসে, কে জানে?

টুলু আজ সার্কাসে যাবে কাকামণির সঙ্গে। টুলু এর আগে আর কক্ষনো সার্কাস দেখেনি। সার্কাসের গপ্প সে অনেক শুনেছে। পিসিমা কলকাতায় থাকেন। শীতকালে বছর বছর কলকাতার পার্কে, ময়দানে সার্কাসের তাঁবু পড়ে। জ্যান্ত বাঘ, সিংহি নিয়ে, হাতে চাবুক নেড়ে-নেড়ে খেলা দেখায় সার্কাসে। তাও আবার কী একেবারে ছাড়া বাঘ। চিড়িয়াখানার মতো খাঁচায় পোরা নয়। বাব্বা কী সাহস মানুষগুলোর।

যতই ভাবছে টুলু ততই মনটা আনন্দে কেমন কেমন করে উঠছে। আজ কি আর পড়তে ভালো লাগে? না, ভালো লাগে লিখতে? পড়া নেই, চান নেই, খাওয়া নেই। দুর ছাই কখন বাজবে সেই পাঁচটা!

টুলু না-হয় সার্কাস যাবে, কিন্তু কালু কী করল যে, যত ঝক্কি ওকে পোয়াতে হচ্ছে? অন্তত একঘণ্টার মধ্যে টুলুর হাজার রকমের ফাই ফরমাশ খাটতে হয়েছে ওকে। এই বলছে, কালু ঘড়িটা দেখে আয় তো! এই বলছে, বইগুলো তুলে রাখ তো! প্যান্টটা কেচে দে, জুতোয় কালি দিয়ে দে! কুকুরটাকে চান করিয়ে দে। উঃ বাব্বা। বাড়ির কাজের লোক বলে যেন ও মানুষ নয়! কালু বড্ড ভালোবাসে টুলুকে। তাই তার ঝুড়ি-ঝুড়ি ফরমাশে ওর মুখে একটুও বিরক্তি নেই!

কালুরও ভারি ইচ্ছে করছিল, সেও সার্কাসে যায়। ভাবছিল হয়তো টুলু বলবে, ‘‘কালু যাবি আমাদের সঙ্গে?’’ কিন্তু কই একবারও তো মুখ ফুটে বলছে না সে কথা। কেন বলবে, সে যে ওদের বাড়ির কাজের লোক। কাজের লোক আবার সার্কাসে যায় নাকি!

‘কালু’ টুলু হাঁক দিলে, ‘আর একবার দেখে আয় তো কটা বাজল?’

কালু উড়োজাহাজের মতো বোঁওঁওঁ করে ছুট্টে দোতলায় উঠে গেল। ঘড়ি দেখেই দুটো-দুটো সিঁড়ি একসঙ্গে টপকে নীচে নেমে এসে বললে, ‘দশটা পঁচিশ।’

‘দশটা পঁচিশ’ বলেই টুলু মুখটা কেমন বিচ্ছিরি করে খিঁচিয়ে উঠল, ‘ঘড়িকেও বলিহারি যাই!’

‘যা তেল নিয়ে আয়! চান করব।’

চারটে বেজে গেল। টুলু সেজেগুজে একেবারে ফিটফাট। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়বে কাকামণির সঙ্গে। কালুর ভেতরটা ভারি আনচান করছে। কালু হোক না কাজের লোক, ওতো টুলুর মতোই দশ কী এগারো-বছরের ছেলে! টুলুর সার্কাস দেখার সাধ থাকতে পারে, আর ওর থাকতে পারে না? ভারি ইচ্ছে করছিল ওর টুলুর সঙ্গে সার্কাসে যায়। কিন্তু ও নিজে কেমন করে বলে? লজ্জা করছে যে। তাই যেখানেই টুলু যাচ্ছে ও পেছনে পেছনে সেখানেই যাচ্ছে। কী যেন বলতে চাইছে; কিন্তু বলা হচ্ছে কই?

‘কী রে অমন পায়ে পায়ে ঘুরছিস কেন?’ হঠাৎ টুলু জিগ্যেস করলে।

কালু থতোমতো খেয়ে, আমতা-আমতা করে বললে, ‘না, না, এমনি।’ বলেই ছুট দিলে।

‘শোন, শোন। এই কালু শোন।’

কালু দাঁড়াল। ‘এই নে।’ বলে টুলু প্যান্টের পকেটে হাত পুরে পঞ্চাশটা পয়সা বার করে কালুর হাতে গুঁজে দিল। ‘মেলায় গিয়ে জিলিপি কিনে খাবি।’

কালু পয়সাটা হাতে নিল। একটু ভাবল। তারপর টুলুর দিকে চেয়ে বলে ফেললে, ‘পয়সা আমার চাই না টুলুবাবু। কাকামণিকে বলে, আমাকেও তোমার সঙ্গে সার্কাসে নিয়ে চলো। সার্কাস দেখতে আমারও ইচ্ছে করছে।’

টুলু এক্কেবারে তেড়ে উঠল। ‘‘উঁ, আমতা নাইনের নোক উনি আবার সার্কাসে যাবেন। তারপর বাঘে যখন ঘাড় মটকে দেবে, তখন? তখন যে ‘মা’ বলতে সময় পাবে না। সার্কাসে যাবে। সার্কাসে গেলে কাজকম্ম করবে কে? বাড়ির কাজ। যা: যা:।’

ওর নাকের ওপর দিয়ে কাকামণির হাত ধরে টুলু ড্যাং ড্যাং করে চলে গেল। আর ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। কালুর কপালে আর সার্কাস দেখা হল না।

কালু সেদিন সারারাত কী ভেবেছিল কে জানে?

তার পরের দিন খুব সকালে বিছানা ছেড়ে উঠে, বাড়ির কাজকর্ম ফেলে রেখে সার্কাসের তাঁবুর দিকে ছুটল কালু। সার্কাসের গেট তখন বন্ধ। এত সকালে কি-আর গেট খোলে? তাঁবুর পাশের দিকে একটা ঘেরা জায়গায় হাতি, উট সব বাঁধা আছে। ওইতো উটের মুখ দেখা যাচ্ছে। কী আশ্চর্য, একেবারে টুলুদের ঘরে টাঙানো সেই ক্যালেণ্ডারের ছবিটার মতো! না, ভেতরে তাকে যেতেই হবে। কিন্তু যায় কেমন করে?

তাঁবুর চারপাশটা ও আনমনে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। একবার ওপর দিকে চেয়ে, একবার নীচের দিকে চেয়ে। হঠাৎ নজরে পড়ল টিনের ওই পাশটা ফাঁক না? হ্যাঁ, তাইতো বটে। যেই না ফাঁকটা চোখে পড়া একবার এধার-ওধার ভালো করে তাকিয়ে নিলে। তারপর গুঁড়িসুড়ি মেরে হামাগুড়ি দিয়ে ফাঁক গলে ভেতরে ঢুকে গেল।

একটু দূরে সার্কাসের ভেতরটায় যেখানে সব খেলাধুলো দেখায় সেখানে কারা যেন কী করছে। ও চুপি চুপি নি:সাড়ে চলে গেল সেখানে। একটু আড়াল থেকে পর্দা সরিয়ে সরিয়ে দেখতে লাগল। এখন সবাই খেলা প্র্যাকটিস করছে। বা রে, ওই ছোট্ট মেয়েটা কেমন ঘোড়ার ওপর খেলা দেখাচ্ছে? বাব্বা, ওই শূন্যে লোকগুলো কেমন দড়ি ধরে-ধরে লাফাচ্ছে, ডিগবাজি খাচ্ছে। ভালুক-ছানাটা সাইকেল চেপে কেমন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর ওই লোকটা কেমন চাবুক দেখিয়ে সিংহীটাকে ওঠাচ্ছে, বসাচ্ছে—

‘এই!’ কালুর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। পেছনে তাকিয়ে দেখে, তকমা-আঁটা ইয়া গালপাট্টাওলা একটা লোক।

‘এখানে কী হচ্ছে? লুকিয়ে লুকিয়ে ঢোকা হয়েছে? চল রিংমাস্টারের কাছে।’ প্রথমটা কালু চমকে উঠলেও শেষে একটুও ভয় পেল না। কেমন যেন সাহস করে বুক ফুলিয়ে চলল লোকটার সঙ্গে।

রিংমাস্টারের সামনে কালুকে টেনে এনে লোকটা বলল, ‘এই ছেলেটা লুকিয়ে লুকিয়ে ভেতরে ঢুকেছে’।

‘তাই নাকি?’ কী রকম হেঁড়ে গলা রিংমাস্টারের। কালুর দিকে চেয়ে খেঁকিয়ে উঠে বললে। ‘কেন ঢুকেছ, অ্যাঁ।’

কালু কেমন সাহস পেয়ে গেল। চট করে বলে ফেললে, ‘আমাকে সার্কাসে কাজ দেবেন? আমি কাজ করব।’

রিংমাস্টার ‘হিহিহি’ করে হেসে উঠল। উরি ব্যাস! হাসি শুনে কালুর বুকের ভেতরটাও একেবারে দুরদুর করে উঠল।

‘উঃ, পুঁচকে ছেলে কাজ করবে! এই দারোয়ান, বাহার নিকাল দেও।’

সেই তকমা-আঁটা, ইয়া গালপাট্টাওলা লোকটা কালুর নড়া ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে গেটের বাইরে বার করে দিলে। গেটের বাইরে এসে কালু হাঁদার মতো ফ্যালফ্যালিয়ে চেয়ে রইল। গেট বন্ধ হয়ে গেল।

মেলা শেষ হয়ে এসেছে। সার্কাস-পার্টির ফিরে যাবারও সময় হয়েছে। কাল সার্কাস ফিরে যাবে।

সার্কাস উঠে যে যাচ্ছে, একথা কালুর কানে পৌঁছোতে দেরি লাগল না। টুলুই সেদিন বললে, ‘জানিস কালু, সার্কাস উঠে যাচ্ছে। কাল তল্পিতল্পা গুটিয়ে ওরা চলে যাবে।’

কথাটা শুনে পর্যন্ত ওর মাথাটাও যেন কেমন হয়ে গেল। কী যেন ভাবছে সে। মনে মনে কী যে মতলব আঁটছে, কে জানে?

সকালে উঠে বাড়ির কাজকম্ম না সেরেই ছুটল সে। ছুটল সেই-যেখানে সার্কাস-পার্টির জিনিসপত্তর-ভরতি, বাকসো-প্যাঁটরা, গোরুর গাড়ি বোঝাই হচ্ছে সেখানে। এক-আধটা কী বাকসো? কাঠের বাকসো, স্টিলের বাকসো, দু-মানুষ উঁচু, বড়ো-বড়ো লোহার গরাদের খাঁচা, তাতে বাঘ-সিংহি, ভালুক-বাঁদর। উট, হাতি, ঘোড়া, জিরাফ ওগুলো তো আর খাঁচায় পোরা যায় না। পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাবে। তাই সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে ওগুলো। কী ভিড়। ভিড় আর ভিড়। লোকজন গিসগিস করছে। কিন্তু কালু গেল কোথায়? কই সামনে-পেছনে এদিকে-ওদিকে কোথাও নেই তো! কোথা গেল। ওমা কী সর্বনাশ!

সার্কাস-পার্টি চলে গেল। কিন্তু কালুকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না। ও কি হারিয়ে গেল?

একটা রাত কেটে গেল। দুটো রাত কেটে গেল। সার্কাসের দল খানিকটা পথ পায়ে হেঁটে, অনেকটা পথ রেলে চেপে, তারপর নৌকো করে তিন দিনের দিন আর এক দেশে হাজির। দেশে দেশে খেলা দেখিয়ে বেড়ানোই তো ওদের কাজ। আগে থেকে এখানেও বিরাট-বিরাট তাঁবু খাটানো হয়েছে। এমনি ছোট্ট ছোট্ট ফোকরওলা টিকিট ঘর। অমনি খেলা দেখাবার জায়গাটা তকতকে ঝকঝকে। সাজগোজের ঘর। সাজগোজ ঘরে এটা-সেটা হাজার রকমের মালপত্তর। আর ওই-ই, পাশে ঘেরা জায়গাটা জন্তুজানোয়ারদের থাকবার জায়গা।

সেদিন সকালবেলা কালু সেই যে ছোট্ট মেয়েটিকে দেখেছিল, সেই যে ঘোড়ার পিঠে খেলা শিখছিল, সেই মেয়েটি হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে সাজ-ঘরে কেন ঢুকল? ঘরে ঢুকে এদিক দেখছে, ওদিক দেখছে, একোণ দেখছে, ওকোণ দেখছে। কী হল? ও! ওর যে একপাটি জুতো হারিয়ে গেছে। জুতোটা গেল কোথায়? নিশ্চয়ই রাস্তায় পড়েছে। ও কী! হুমড়ি খেয়ে ছোট্ট মেয়েটি বাক্সর নীচে মাথা গলায় কেন? বাক্সর নীচে কি-আর জুতো থাকে?

কী কান্ড! বাক্সর নীচে মাথা গলিয়ে যখন ছোট্ট মেয়েটি জুতো খোঁজাখুঁজি করছে, বলব কী, ঠিক তক্ষুনি বাক্সর ডালাটা আপনা-আপনি খুলে গেল। বাক্সর ভেতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এল? হ্যাঁ, তাইতো বটে! ওমা! এ যে কালু! বেরিয়ে এসে চুপিসারে একেবারে ছোট্ট মেয়েটির পেছনে। যেই মেয়েটি বাক্সর নীচে থেকে মাথা বার করে দাঁড়িয়েছে, অমনি কালু পেছন থেকে চট করে তার চোখ দুটো চেপে ধরল। আচমকা মেয়েটি একবারে ‘আঁক’ করে চেচিয়ে উঠল, ‘কে? কে? ছাড়ো, ছাড়ো বলছি।’

কালু চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিলে। পেছন ফিরেই মেয়েটি অবাক।

‘এ কী! তুমি?’ ছোট্ট মেয়েটি জিগ্যেস করলে।

কালু মুচকি-মুচকি হাসল।

আবার মেয়েটি জিগ্যেস করল, ‘তোমায় যেন কোথায় দেখেছি? কোথায়? কোথায়? ওঃ, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আমরা সেদিন সকালবেলা যখন খেলা শিখছিলুম, তুমিই না গিয়েছিলে? দারোয়ন তোমায় ঠেলে-মেলে বার করে দিল—’ বলেই মেয়েটি মিষ্টি মুখে কেমন হিহিহি করে হেসে উঠল। ‘‘দারোয়ানটা অমনই কাঠখোট্টা! ভারি গুণ্ডা! তা তুমি এখানে কেমন করে এলে?’

‘আমি এই বাক্সর ভেতর লুকিয়ে-লুকিয়ে চলে এসেছি।’

‘বাক্সর ভেতর! ওমা কী কান্ড! তোমায় কেউ দেখতে পায়নি?’

‘কে, দেখবে? সেদিন যখন তোমাদের জিনিসপত্তর গাড়ি বোঝাই হচ্ছিল, আমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলুম। হঠাৎ একফাঁকে টুক করে এই খালি বাক্সটার ভেতর ঢুকে পড়ি। তারপর গাড়ি চেপে সুড় সুড় করে চলে এলুম। আমি সার্কাসে কাজ করব।’

‘সার্কাসে কাজ করবে? পারবে তুমি?’

‘কেন পারব না। সক্কলে পারছে, আর আমি পারব না?’

‘তা হলে বেশ হয়।’ ছোট্ট মেয়েটির মুখটি খুশিতে ভরে গেল। ‘তুমি আর আমি একসঙ্গে একটা খেলা দেখাব। খুব মজা হবে। এই দ্যাখো, আমি ভুলেই গেছি। নিশ্চয়ই তোমার ক-দিন খাওয়া হয়নি। তুমি এইখানে চুপটি করে বসো, আমি চট করে তোমার জন্যে খাবার নিয়ে আসি। দেখো, বাইরে যেয়ো না যেন। তা হলে দারোয়ান আবার বার করে দেবে।’

মেয়েটি দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

কালু চুপটি করে বসে রইল। বসে বসে দেখতে লাগল সাজ-ঘরে সার্কাস-পার্টির সাজন-গোজের কত রকমের জিনিস-পত্তর। চারটে পাঁচটা দু-চাকার সাইকেল। উঃ বাবা! একটা কত বড়ো জাল। ইয়া লম্বা-লম্বা দশ-বারোটা ডাণ্ডা। না হবে একশোটা বাক্সে-প্যাঁটরা। ওই যে দেয়ালে ঝোলানো চাবুকটা ওইটা নিয়ে—

‘খস খস’ হঠাৎ কীসের শব্দ কানে এল না? কেউ আসছে না কি?

কালু উঠে দাঁড়াল। বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখতে যাবে কী—ব্যস! মাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরে গেল। এই সেরেছে! একটা সিংহি। হেঁটে হেঁটে ওর ঘরের দিকেই আসছে। কিন্তু এসময় কেমন করে সিংহীটা ছাড়া পেল? নিশ্চয়ই খাঁচা থেকে পালিয়ে এসেছে। কী করবে এখন কালু? উরি ব্যস! এক্কেবারে সাজ-ঘরের দোরের কাছে! কালু সাতপাঁচ ভাববার আগেই চট করে ওর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। ওই যে দেয়ালে ঝোলানো চাবুকটা, যে চাবুকটা নিয়ে রিংমাস্টার সেদিন সিংহীটার সঙ্গে খেলা করছিল, সেইটা টক করে পেড়ে নিল। পেড়ে নিয়েই এক্কেবারে সিংহীটার সামনা সামনি কালু দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর যেমন করে রিংমাস্টার সিংহীর সামনে চাবুকটা দোলাচ্ছিল, তেমনি করে দোলাতে লাগল। অমন যে জিব-লকলকে সিংহী, তাই না দেখে একেবারে জুজুবুড়ি। চুপ করে বসে পড়ল কালুর সামনে। বসে-বসে ল্যাজ নাড়তে লাগল। আর মুখে একটা কেমন গরগর, গরগর আওয়াজ করতে লাগল।

দেখতে দেখতে সেই ছোট্ট মেয়েটি একথালা খাবার নিয়ে হাজির। ঘরে ঢুকতে গিয়েই সিংহীটাকে দেখেই থমকে দাঁড়িয়ে এক্কেবারে চিলচেঁচিয়ে উঠল। চেঁচামেচি শুনে এ-ছুটে এল, ও-ছুটে এল, দারোয়ানটা ছুটে এল, পালোয়ান সিং স্যাণ্ডো ছুটে এল, সেই ক্লাউন সাজে এইটুকুনি পুঁচকে গুড়গুড়িয়াল লোকটা ছুটে এল আর এল রিংমাস্টার। রিংমাস্টার সিংহীটাকে দেখেই তড়াং করে একলাফ মেরে কালুর সামনে হাজির। ঝট করে কালুর হাত থেকে চাবুকটা ছিনিয়ে নিয়ে. সিংহীর সামনে। দু-বার সপাং সপাং করে দিলে বসিয়ে। অমনি সিংহীটা ‘কাউউ গাঁক-গাঁক’ করে ডেকে, সুড়সুড় করে উঠে দাঁড়াল। তারপর চাবুকের আর-একঘা সপাং করে খেয়ে, ল্যাজ গুটিয়ে নিজের খাঁচার কাছে গিয়ে লক্ষ্মীটির মতো ঢুকে পড়ল। খাঁচার দরজা বন্ধ হয়ে গেল।

তারপর? তারপর রিংমাস্টার কালুর সব কথা শুনলে। তাকে আদর করে কাছে টেনে নিলে। বললে, ‘হ্যাঁ, তুমিই পারবে আমার সার্কাসে কাজ করতে। আজ থেকেই তোমার চাকরি।’

তোমরা, দেখেছ কোনোদিন কালুর সার্কাস? সেই যে একটি ছোটো ছেলে, ওই শূন্যে ট্রাপিজের ওপর নানারকম খেলা দেখাতে দেখাতে নীচে টাট্টুঘোড়ায়-বসা ছোট্ট মেয়েটির কাঁধের ওপর লাফিয়ে পড়ছে! ওই তো কালু। আর ওই ছোট্ট মেয়েটি তো কালুর সবচেয়ে বড়ো বন্ধু। তোমাদের বাড়ির কাছে সেই ইংরিজি নামওলা সার্কাস-পার্টি এলে দেখতে ভুলো না কিন্তু। সত্যি কী চমৎকার খেলা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%