শৈলেন ঘোষ
রাস্তার এখানে দাঁড়ালেও তুমি গর্জন শুনতে পাবে। সমুদ্রের গর্জন। এই রাস্তা ধরে আর খানিক হাঁটলেই তোমার নজরে পড়বে সমুদ্রের সেই ভয়ংকর মূর্তিটার দিকে। গর্জন করতে করতে ঢেউ-এর পেছনে ঢেউ তেড়ে আসছে। লাফিয়ে তটের ওপর আছড়ে পড়ছে। একটার পর একটা।
রাত-নি:ঝুম অন্ধকারে একটি মানুষকেও তুমি দেখতে পাবে না এই রাস্তায় চলতে-ফিরতে। ভোরের পোশাক পরে আকাশ যখন আলো ছড়িয়ে দেয়, তখনই শুরু হয়ে যায় মানুষের আনাগোনা। হই-হল্লা। রাস্তা বরাবর কত ঘরবাড়ি। একদিকে সমুদ্র, আরেক দিকে বাড়িঘর। সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে ভেসে আসে দুরন্ত বাতাস। উড়িয়ে আনে তটের বালি। ছড়িয়ে দেয় যেখানে-সেখানে। এমনকী, ওই ঘর-বাড়ির আনাচে কানাচেও।
দ্যাখো, একটি ছেলে কেমন একলাটি হেঁটে যায় ওই রাস্তা দিয়ে। পড়ন্ত রোদে, এই বিকেলে কোথায় যাবে সে? মাঝে মাঝে দস্যি হাওয়ার ঝাপটায় সে দাঁড়িয়ে পড়ে। দু-হাত চেপে মুখ লুকোয়। তারপর আবার হাঁটে। এই রাস্তাটা যে, সমুদ্রের বালুচরের এপাশ দিয়ে কোথায় চলে গেছে, দেখা যায় না। ছেলেটিও বোধ হয় এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হারিয়ে যাবে। তাকেও বোধ হয় আর দেখা যাবে না।
ছেলেটি কত বড়ো হবে? এগারো না বারো? মনে হয় না, এর বেশি। পরনে তার প্যান্ট আর হাতকাটা শার্ট। শার্টের রংটা এই দূর থেকে দেখলে বলবে, রংটা ফিকে গোলাপি। প্যান্টটা কালো। খালি পা। পায়ের জুতো কি বাড়িতে ফেলে এসেছে সে? হবে হয়তো।
এ কী, হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থামল কেন সে? হাওয়ার ঝাপটায় কী ওটা উড়ে এসে ওর গায়ে পড়ল? একটা চিঠির খাম! ছেলেটি তুলে নিল। নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। খামের ভেতরটা কি ফাঁকা? না, ওই তো খামের মুখটা আঁটা। ওর ভেতর চিঠি আছে মনে হচ্ছে। তাই তো, খামের ওপর কোনো ঠিকানা লেখা নেই তো। তবে কি চিঠিটা অসাবধানে কারোর পকেট থেকে পড়ে গেছে? হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে? হবে হয়তো। তাহলে এখন চিঠিটা নিয়ে কী করবে ছেলেটি? ভারী ভাবনায় পড়ল সে। কখনো ভাবল, খামটা ছুড়ে ফেলে দেয় হাওয়ায় উড়িয়ে। নয়তো ভাবে, ছিঁড়ে ফেলাই ভালো। পরক্ষণেই তার মনে হয়, এ-কাজটা কি ঠিক হবে? চিঠির ভেতরে দরকারি যদি কিছু লেখা থাকে! তবে কি সে চিঠিটা খুলে পড়ে দেখবে? এতগুলো ভাবনা একসঙ্গে তার মাথার ভেতরে ঢুকে কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে দিল। খামটা সে না পারে ছুড়ে ফেলে দিতে—না পারে ছিঁড়তে। না পারে খাম খুলে চিঠিটা পড়তে। কেননা, সবাই যে বলে অন্যের চিঠি পড়তে নেই।
এমন সময়ে হঠাৎ তার মনে হল, আচ্ছা, খামের ভেতরে তো চিঠি না-ও থাকতে পারে। যদি অন্য কিছু থাকে! কোনো দামি কাগজ! কিংবা জরুরি কিছু খবর? সুতরাং খুলে না ফেললে তো কিছুই জানা যাবে না। শেষমেশ সে আর দোনোমনা করল না। খামের মুখটা সে ছিঁড়েই ফেলল। না, অন্য কিছু নয়, বেরিয়ে এল পাতা ভরতি লেখা একখানি চিঠি। চিঠির মাথায় ঠিকানা। হ্যাঁ, এখন সে—যে-রাস্তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে, ঠিকানায় যে সেই রাস্তার-ই নাম লেখা। বাড়ির নম্বরটাও স্পষ্ট লেখা আছে। ছেলেটি অনায়াসে পড়ে ফেলল। সুতরাং, বাড়িটা সে এমন সহজেই খুঁজে বার করে ফেলতে পারে। যার চিঠি তাকে তো ফেরত দিতে আর কোনো অসুবিধে নেই। শুধু বাড়িটা খুঁজে বার করা, এই যা! কাজেই সে সিধে পথে সটান না-হেঁটে বাড়িটা খুঁজতেই এদিক-ওদিক করতে লাগল।
বেশিক্ষণ তাকে এদিক-ওদিক করতে হল না। একটু খুঁজেই সে বাড়ির নম্বরটা বার করে ফেলল। কিন্তু হায় রে, বাড়ির দরজায় যে তালা ঝোলানো। বন্ধ! থমকে যায় ছেলেটি। ভেবে পায় না, এবার সে কী করবে? তবে কি সে চিঠিটা দরজার ফাঁকে গলিয়ে ভেতরে ফেলে দেবে? না, তারও তো উপায় নেই। কেননা, দরজায় কোনো ফাঁকই নেই। আঁটোসাঁটো করে আটকানো। সে ঠেলেও একটু নড়াতে পারল না। তাহলে এখন সে কী করবে? তবে কি সে এখানে দাঁড়িয়ে খানিক অপেক্ষা করবে? ভাবল, এমনও তো হতে পারে, বাড়ির বাসিন্দা কাছে-পিঠেই কোথাও গেছে! এখনই আসবে! আর এখনই যদি না আসে? যদি দেরি হয়? ততক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকাটা কি ঠিক হবে? পাঁচজনে দেখলে পাঁচকথা ভাবতে পারে। তার চেয়ে বরং সমুদ্রের ধারে খানিক শুয়ে-বসে অপেক্ষা করাই ভালো, সময় কাটিয়ে একটু পরে আবার আসা যাবে। এইভেবে সে খামের চিঠিটা পকেটে পুরে ফেলল। হাঁটল সমুদ্রের তটের দিকেই। সমুদ্রের তটে, এইখানে এখন কত মানুষ হাঁটছে, ফিরছে, ছুটছে খেলছে। ছেলেটিও এই মানুষের ভিড়ে মিশে গেল। হাঁটতে হাঁটতে সে পৌঁছে গেল জলের কিনারে। সমুদ্রের ঢেউ দেখছে সে। কত উঁচু। কী ভীষণ গর্জন তার। আছড়ে পড়ছে তটের ওপর। জলের তোড়ে তার পা ডুবে যায় মাঝে-মাঝে। হাওয়ার ঝাপটায় মাথার চুল এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়ে কপাল ছুঁয়ে চোখের ওপর।
না, বেশিক্ষণ দাঁড়াল না সে জলের কিনারে। ধীর পায়ে সে ফিরে এল এইখানে, তটের গা ঘেঁষে, এখানে সার-সার ঝাউগাছ। একটা গাছের নীচে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ একনাগাড়ে হেঁটেছে সে। আঃ! সমুদ্রের বুক ছুঁয়ে কোমল বাতাস বয়ে আসছে! ভারী ভালো লাগছে। গাছের নীচে ইচ্ছে করলে সে শুয়েও পড়তে পারে! অবশ্য শুলো না সে। বলা যায় না, যদি সে ঘুমিয়ে পড়ে—। তার চেয়ে বরং এখান থেকে চোখ মেলে দেখা ভালো বালুচরে অনেক মানুষের আনাগোনা। শুনতে ভালো লাগছে তাদের হাসির শব্দ, কিংবা কথার কলকলানি। হঠাৎই চমকে ওঠে সে। চিঠিটা? চমকে সে বুকে হাত দেয়। না-আছে, বুক পকেটেই আছে। আবার সে পকেট থেকে বার করে চিঠিটা। আবার একবার খামের ভেতর থেকে চিঠিটা বার করে ঠিকানাটা দেখে নিল। তখন ভুল দেখেনি তো! না, না, ঠিক এই নম্বরটাই সে দেখেছে। সুতরাং, সে আবার মুড়ে ফেলল চিঠির কাগজখানা। আবার খামে ভরতে গিয়ে সে এবার থমকে গেল। হঠাৎ তার মনে হল, আচ্ছা—, চিঠির ভেতর কী লেখা আছে পড়ে দেখলে তো হয়। অন্যের চিঠি যে, পড়তে নেই! পড়ার ইচ্ছে থাকলেও তার মন কেমন যেন খুঁতখুঁত করতে লাগল। না, দরকার নেই। তার চেয়ে বরং খামে ভরে রাখাই ভালো। হ্যাঁ, খামের ভেতর ভরেই সে রাখল। কিন্তু পকেটে পুরল না। একবার যখন পড়ার ইচ্ছে হয়েছে, তখন মনকে সামলাবে কী! মন তার অস্থির হয়ে উঠল। তাই সে আবার আনমনে চিঠিটা বার করল। আনমনেই চিঠির ভাঁজ খুলে ফেলল। আনমনেই সে চোখ বোলাতে লাগল চিঠির ওপর! এ চিঠি বাবা লিখেছেন ছেলেকে—
তোমার অনেকদিন কোনো খবর পাইনি। এর আগেও তোমায় তিনখানি চিঠি দিয়েছি। তোমরা কেমন আছ, জানতে ইচ্ছে করে। আমাদের বয়েস হয়েছে। বয়েস হলে ছেলেকে বড্ড কাছে পেতে মন চায়। এর মধ্যে ক-দিন তোমার মা খুব জ্বরে ভুগলো। আমরা যে কবে বলতে কবে চলে যাই ঠিক নেই। তোমার মাকে কাঁদতে দেখলে আমার বড্ড কষ্ট হয়। তখনই তোমার মুখখানি আমার মনে পড়ে যায়। আহা, কত কষ্ট করে তোমার মা তোমাকে মানুষ করেছেন। আজ তুমি কত বড়ো হয়েছ। কতদূরে বসে কত বড়ো চাকরি করছ। আমাদের দাদুভাই কেমন আছে? তেমনই হেসে-খেলে বেড়াচ্ছে? ইশকুলে দিয়েছ? দাদুভাইয়ের পড়ার খরচের জন্য কিছু পয়সাকড়ি জমিয়ে রেখেছি আমরা। কিছু গয়নাগাটিও আছে। সেগুলোআমাদের বিছানার নীচে লুকিয়ে রেখেছি।
চিঠিটা পড়তে পড়তে চমকে থামল ছেলেটি। সে ভয় পেয়ে কাঁপে। তাড়াতাড়ি চিঠিটা মুড়ে খামের মধ্যে পুরে ফেলল। ঠিক এইসময়ে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে গেল ছেলেটির। বাবা কত কষ্ট করে তার ইশকুলের বইপত্তর কিনে দেন। কত কষ্ট করে বাজারহাট করে আনেন। কত কষ্ট করে তাদের দিন চলে। কত গরিব তারা। তার ওপর মায়ের অসুখ, মায়ের অসুখের ওষুধ জোগাড় করতে-করতে বাবা যেন আর পারেন না। বাবার ওই কষ্টের মুখখানা দেখতে দেখতে ছেলেটি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। মনে মনে ভাবে, সে-ও যদি পারত বাবার দুঃখ ঘোচাতে! যদি দুটো পয়সা উপায় করে এনে দিতে পারত বাবাকে! কিন্তু সে যে জানে না কেমন করে পয়সা উপায় করতে হয়। সে যে নেহাতই ছোটো। এখন সে পড়বে, খেলবে, হাসবে। নয়তো, মনের সুখে মনের সঙ্গে কথা বলবে। হয়তো সে জলের ছায়ায় নিজের মুখ দেখবে এখন। হয়তো ফুলের মতো ফুল এঁকে সে রং বোলাবে। কিংবা ধ্রবতারার গল্প শুনতে শুনতে এখন সারা আকাশটাই, সে তার চোখের তারায় এঁকে রাখবে।
না, তার চোখের তারায় আকাশ আর আঁকা হয়নি। বাবার শুকনো মুখখানি দেখে তার চোখ দু-টি সেদিন ছলছলিয়ে উঠেছিল। বার বার মনে হচ্ছিল, এখনই সে চলে যায় কোথাও। সে জানে, দেশটা তাদের অনেক বড়ো। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই যেতে পারে সে। কিন্তু জানে না, কোথায় গেলে সে তার বাবার জন্যে একটু সুখ খুঁজে আনবে।
জানে না, কী করলে বাবার দুঃখ ঘুচবে, মায়ের অসুখ ভালো হবে। ভাবতে-ভাবতে সে জেরবার হয়ে যায়। যখন তার মন আর কিছুতেই মানল না, তখনই সে পথে বেরিয়ে পড়ল। সে কোথায় যায়, কাউকে বলল না, না-বলল মাকে, না-বাবাকে। তবে কি সে পথে পথে সবার কাছে হাত পেতে পয়সা চাইবে? ছি:! এ কাজটা যে ভালো নয়, কে না-জানে? এই হাতে তার বড়োমানুষের মতো তাগদ না থাকতে পারে কিন্তু অকেজো তো নয়! এই হাত পেতে মাগনা পয়সা না-চেয়ে সে তো কাজ করতে পারে। কাজ করলে তো মানুষ পয়সা পায়। সে-ও পাবে।
না, পয়সা সে পেল না। এতখানি পথ সে হেঁটে এসেছে। কিন্তু কোথাও সে কাজের ঠিকানা খুঁজে পায়নি। কে তাকে দেবে কাজ? ও তো ওইটুকু পুঁচকে ছেলে! কী কাজ পারবে সে? ওই যে মানুষগুলো আনাজের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে হেঁটে চলেছেন, ও কি পারবে ওঁদের বোঝা বইতে? নাকি পারবে চালের বস্তা পিঠে নিতে? তা-ছাড়া তোমার এই বয়েসে কাজ করার কী দরকার বাপু! কেন দরকার, কাকে বলবে সে। কে শুনবে ওর মনের দুঃখ? তবে কি সে চুরি করবে?
শিউরে ওঠে তার বুকের ভেতরটা। গায়ে কাঁটা দেয়। মনে মনে ভাবে, ওই বন্ধবাড়ির ভেতরে কত গয়না আছে। কত টাকা। একবার যদি ঢুকতে পারে, তবে আর ভাবনা নেই। মায়ের অসুখ ভালো হয়ে যাবে। বাবাকে আর দিনরাত ভাবতে হবে না। এত যে দুশ্চিন্তা বাবার, সব দূর হয়ে যাবে। শুধু হাতিয়ে নিতে পারলেই হয় ওই টাকা আর গয়নাগুলো। লোভে তার চোখ টস টস করে ওঠে। সে উঠে দাঁড়ায়। বালির ওপর দিয়ে আচমকা ছুট দেয়। এখনই তাকে পৌঁছতে হবে ওই বাড়ির কাছে। যদি বাড়ির দরজা এখনও বন্ধ দেখে, তবে সে গা ঢাকা দিয়ে আশপাশ থেকে লক্ষ রাখবে। তারপর তাল পেলেই সে, বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়বে। সুতরাং ছোটো যত জোরে পারো! কিন্তু বালির ওপর একটা মানুষ কত জোরে আর ছুটতে পারে। পা ফসকে যায়। তবু থামলে হবে না। এমন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে!
কিন্তু হঠাৎ তাকে থামতে হল।
‘একটু দাঁড়াবে খোকা?’ কে যেন ডাকল তাকে করুণ গলায়! ঘুরে দাঁড়াল সে। দেখল, একজন বুড়োমানুষ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছেন তার দিকে। ছেলেটি জিগ্যেস করল, ‘আপনি কি আমায় ডাকলেন?’
হ্যাঁ, একটু এদিকে আসবে?’
তার আর ছোটা হল না। সে এগিয়ে গেল।
বুড়োমানুষটি বললেন, ‘আমাকে একটু সাহায্য করবে?’
‘কী হয়েছে আপনার?’ ছেলেটি জিগ্যেস করল।
‘আমার সঙ্গে এসো একটু!’
ছেলেটি তাঁর সঙ্গে এগিয়ে গেল। খানিকটা গিয়েই দেখল, একজন অসুস্থ বৃদ্ধা বসে আছেন ঝাউগাছের নীচে।
বুড়োমানুষটি তাঁকে দেখিয়ে ছেলেটিকে বললেন, ‘আমরা দুই বুড়োবুড়ি রোজই আসি সমুদ্রের ধারে বেড়াতে। কাছেই থাকি। শরীরটা ওর ভালো যাচ্ছে না ক-দিন ধরে। আজ হঠাৎ কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ল এখানে এসে। তুমি যদি আমাদের সাহায্য করো, তবে দু-জনে ধরে-ধরে ওকে বাড়ি নিয়ে যাই। আমি বুড়োমানুষ একা সাহস হচ্ছে না।
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, চলুন-না। আমিও ওঁকে ধরছি।’ বলতে বলতে ছেলেটি সেই বৃদ্ধার কাছে এগিয়ে গেল। বুড়ো মানুষটিকে সাহায্য করার জন্যে সেই বৃদ্ধার হাত ধরল। তারপর সেই বুড়োমানুষ আর সেই ছেলে বৃদ্ধাকে ধরে-ধরে সমুদ্রের বালির রাজ্য পেরিয়ে এল। বাড়ির পথে পা বাড়াল।

বৃদ্ধার হাঁটতে যে কষ্ট হচ্ছে, সে তো বোঝাই যায়। তবু তিনি যেন কষ্ট ভুলে গেলেন ক্ষণিকের জন্যে। তাঁর মুখে একঝলক হাসি ফুটে উঠল ছেলেটির মুখের দিকে চেয়ে। তিনি হাসিমুখে বললেন, ‘তুমি ভারী ভালো ছেলে। আমার জন্যে কত কষ্ট করতে হচ্ছে। সবাই করে না। তোমার নাম কী?’
‘ভোর।’ ছেলেটি উত্তর দিল।
‘বা:! নামটি তো বেশ।’
ছেলেটি বলল, ‘আমি ভোরবেলা জন্মেছি তো, তাই আমার নাম ভোর।’
সেই বুড়ো-বুড়ি ছেলেটির কথা শুনে হেসে উঠলেন। তারপর হাজার রকমের প্রশ্ন করলেন, কোথায় থাকো তুমি? বাড়িতে কে কে আছেন? কোন ক্লাসে পড়ো?
ছেলেটি উত্তর দিতে দিতে থমকে দাঁড়ায়। কেননা, সেই বুড়োমানুষটি দাঁড়ালেন। বললেন, ‘এবার হবে। আমরা এসে গেছি।’
ছেলেটি থতোমতো খেয়ে যায়। কেননা, যে-বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ালেন তাঁরা, এই বাড়িটাই তো সেই বাড়ি। এই বাড়িটাই তো সে চিঠির ঠিকানা দেখে খুঁজে বার করেছে। ওই তো বুড়ো মানুষ পকেট থেকে চাবি বার করে তালা খুললেন। আনমনে কথা বলতে সে যে-এই বাড়িটার সামনে এসেছে, একদমই খেয়াল করেনি! তিনি যতক্ষণ দরজার তালা খুলছিলেন, ততক্ষণ সেই বৃদ্ধাকে একাই ধরে দাঁড়িয়েছিল ছেলেটি। দেখছিল হতভম্ব হয়ে।
অবশ্য বৃদ্ধাকে আর ধরতে হল না। দরজার তালা খুলে যেতেই তিনি বললেন, ‘আমি এবার একাই পারব।’
ছেলেটি অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘একা পারবেন?’
‘এই তো দ্যাখো-না,’ বলে তিনি দিব্যি হাঁটলেন। তবে যেন মনে কোরো না হনহন করে।
ছেলেটি দাঁড়িয়ে রইল বাইরে। বুড়োমানুষটি বললেন, ‘এ কী! তুমি দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ভেতরে এসো!’
বৃদ্ধাও হাঁটতে হাঁটতে থামলেন। পেছনে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘সত্যিই তো, তুমি দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসো!’
ছেলেটি কিন্তু-কিন্তু করে বলল, ‘আমি আর ভেতরে গিয়ে কী করব!’
বুড়োমানুষটি ছেলেটির হাত ধরে বললেন, ‘এসো, এসো, তোমাকে একটা জিনিস দেখাব!’
‘কী জিনিস?’
‘এসো না!’ বলে, আলতো ছোঁয়ায় ছেলেটির হাতে তিনি টান দিলেন।
ছেলেটি ভেতরে ঢুকে গেল ধীর পায়ে। অবাক হয়ে দেখতে লাগল চারদিক। কত বড়ো বাড়িটা। ভেতরে মস্ত বড়ো একটা বাগান। যেমন বাড়িটার অযত্নে রং চটে গেছে, তেমনই বাগানটারও সেই অবস্থা। শুকিয়ে গেছে সবুজ। জন্মেছে এদিকে-ওদিকে আগাছা। একটা দোলনা ঝুলছে বাগানের মধ্যিখানে। কিন্তু তারও যা দুর্দশা। শেকলে মরচে পড়ে গেছে। সে কাঠের ওপর ঝুলছে, দেখলেই বোঝা যায়, ঘুণ ধরে গেছে। হয়তো অনেকদিন ওতে কেউ হাত দেয়নি। এখন কেউ সাহস করে দুলতে গেলেই, সে যে নির্ঘাত বিপদে পড়বে, সেটা দেখলেই বোঝা যায়।
ছেলেটিকে নিয়ে এই ঘরেই এলেন।
বৃদ্ধা বললেন, ‘বোসো ভোর।’
ছেলেটি একটি চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘আমার নামটা আপনার তো ঠিক মনে আছে!’
বৃদ্ধা বললেন, ‘যার কাছে উপকার পায় মানুষ, তার নাম কি ভুলতে পারে? নাকি, ভোলা যায়? না, ভোলা উচিত?’
কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে ছেলেটি। যে-বিছানায় বৃদ্ধাটি বসলেন, ছেলেটি ভীষণ অবাক চোখে সেই বিছানাটার দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে ভাবল, হয়তো এই বিছানাটার নীচেই সোনার গয়না আর টাকা লুকোনো আছে। একবার ফাঁক পেলেই সে...। ভাবতে ভাবতে গায়ে কাঁটা দেয়।
‘কী ভাবছ?’ হঠাৎ জিগ্যেস করলেন সেই বুড়োমানুষটি।
ছেলেটি চমকে উঠল! মুখ দিয়ে তার বেরিয়ে এল— ‘না, ভাবছি না। একটার পর একটা কত কী দেখছি।’
‘কী দেখলে, একটার পর একটা?’ বুড়োমানুষটি জিগ্যেস করলেন।
দেখছি কী বিরাট বাড়ি। কত বড়োবাগান। কী পেল্লায় দালান। তেমনই আপনাদের ঘরটা।’
বৃদ্ধা ছেলেটির কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, ‘সব থেকেও আমাদের কিছু নেই। বাগানটার কী দশা দেখলে না? বাগানে আগে কত ফুল ফুটত, কত ফল ধরত। ছোট্টবেলায় দোলনায় আমার ছেলে দোল খেত। এখন সব গেছে। এখন ওটাকে বাগান বলে না কেউ। বাগানটা এখন জঞ্জালে ভরে আস্তাকুঁড় হয়ে আছে। তবুও তো সব ঘরগুলো দ্যাখোনি। ঘরের যে কী হাল হয়ে আছে কে জানে বলে, তিনি আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
ছেলেটি বলল, ‘হ্যাঁ, দালানের গায়ে দেখলুম বটে, ঘরে-ঘরে তালা ঝুলছে।’
সেই বুড়োমানুষটি তার কথা শেষ হওয়ামাত্র বললেন, ‘চলো তোমাকে যা দেখাব বলেছিলাম—দেখবে চলো।’
ছেলেটি উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াবার আগে আর একবার সেই বিছানার দিকে তাকাল। তারপর বিছানায়-বসা সেই বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘যাও না, দেখে এসো!’
বলতেই, ছেলেটি সেই বুড়োমানুষটির সঙ্গে ঘর দেখতে চলল।
আরিব্বাস! এঘরটা যে, ওই ঘরটার চেয়েও বড়ো। জানলাগুলো খুলে দিতেই আলোয় ঝলমল করে উঠল সারাঘর। কী সুন্দর সাজানো। মনে হয় রোজ ঝাড়পোঁছ হয়। সারাঘরের দেওয়ালে কত রঙিন ছবি। হাতে আঁকা। ছেলেটি অবাক চোখে দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে জিগ্যেস করল, ‘কে করেছে?’
বুড়োমানুষটি বললেন, ‘তোমার মতো যারা ছোট্ট তাদের আঁকা এইসব ছবি। আমি পয়সা দিয়ে কিনে সাজিয়ে রেখেছি। যেখানেই ছোটোদের ছবি দেখতে পাই, তাদের প্রাইজ দিই কিনে আনি। আমার ইচ্ছে ছিল, আমার ছেলেটাও ছবি আঁকবে। ছবি আঁকতে আঁকতে ওর মনটাও এমনই নানান রঙে ভরে উঠবে। সে হবে শিল্পী। কিন্তু সে হয়নি।’ বলতে বলতে বুড়োমানুষটির মুখখানি কেমন যেন ভার হয়ে উঠল। ছেলেটি ‘থ’ হয়ে তাকিয়ে রইল তাঁর মুখের দিকে।
সে ভার মুহূর্তের জন্যে। তারপরেই তাঁর মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি হেসেই উঠলেন। হাসতে-হাসতে জিগ্যেস করলেন, ‘তুমি ছবি আঁকতে পারো?’
ছেলেটি ঘাড় নাড়ল, ‘হ্যাঁ, পারি, একটু-একটু। বাবা ছবি আঁকেন। বাবার দেখে একটু-একটু পারি।’
বুড়োমানুষটি এতক্ষণ ‘তুমি-তুমি’ করছিলেন। এখন উৎসাহে অস্থির হয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘তুই পারিস? দেখি, আঁক, আঁক!’ বলে তিনি ঘরের এককোণে পাতা টেবিলের কাছে ছেলেটিকে নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘এই নে তুলি। এই নে রং। আমি তোকেও প্রাইজ দেব।’
ছেলেটি ছবি আঁকতে বসল। সে আঁকল ভোরের আকাশ। একটু পরেই সূর্য উঠবে। আকাশ লাল। নীচে সমুদ্র। বালুচর। একটি মানুষও সেখানে নেই। চারদিক শূন্য। সেই শূন্য বালুচরের ওপর আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউ। সেই ঢেউ-এর সঙ্গে এই মস্ত বাড়ির, মস্ত বাগানের ঝুলন্ত দোলনাটা যেন পাক খাচ্ছে।
বুড়োমানুষটি থমকে গেলেন। অবাক চোখে দেখতে লাগলেন ছবিটার দিকে। বোধ হয় তাঁর চোখ ছলছলিয়ে উঠল। তিনি ফিরে দেখলেন ছেলেটির মুখের দিকে। তারপর আদরে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেটিকে। তার কপালে চুমো খেলেন।
এখন ছেলেটি ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরছিল রাস্তা দিয়ে। তখন আকাশে সন্ধ্যাতারা ফুটে উঠেছে। সমুদ্রের গর্জন তখনও শোনা যাচ্ছে। ছেলেটির গলায় একটি সোনার হার। পকেটভরতি ওগুলো বুঝি অনেক টাকা, বুড়োমানুষটি দিয়েছেন ভালোবেসে? এবার বুঝি তার মায়ের জন্য বাবা ওষুধ কিনে আনবেন। এবার নিশ্চয়ই মায়ের অসুখ ভালো হয়ে যাবে। আর কষ্ট হবে না বাবার। সে ছুটতে-ছুটতে ফিরে এল বাড়িতে।
কিন্তু সেই চিঠিটা? সে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে। সে চিঠির আর কী দরকার? তাঁরা যে সেই ‘ভোর’ নামের ছেলেটিকেই বলেছেন, ‘তুই আমাদেরও ছেলে। আমাদের ভালোবাসা।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন