রহস্য

শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট সোনা ছই,

কাল তোমার চিঠি পেয়েছি ঘাটশিলা থেকে। জানতে পারলাম, মামাবাড়িতে তুমি ভালোই আছ। তোমার দুঃখ শুধু, আমার মুখে অনেকদিন কোনো গল্প শোনা হয়নি বলে। কিন্তু তুমি এখন এতদূরে আছ, আমি চিৎকার করে গলা ফাটিয়ে গল্প বললেও, সে-গল্প এখান থেকে তোমার কানে পৌঁছোবে না, কাজেই তোমার গল্প না শোনার খেদ আমি এই চিঠিতেই একটি গল্প লিখে মেটাবার চেষ্টা করছি। এ গল্প আমার নিজের। সত্যি, আর ভারি অদ্ভুত।

তবে হ্যাঁ, আমার গল্পটা পড়ার আগে, তোমায় আর একটি গল্প পড়তে হবে। সে-গল্পটি দুই ইংরেজ মহিলার। সেই গল্পের এমনই ভূতুড়ে ঘটনা, মন বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ খাঁটি সত্যি। অনেকটা আমার নিজের গল্পের মতোই।

ওই দুই ইংরেজ মহিলা লেখাপড়ায় ছিলেন চোস্ত। দু-জনের মধ্যে যিনি বড়ো, তিনি ছিলেন একটি কলেজের অধ্যক্ষা আর ছোটো জন ছিলেন, একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা। তারা দু-জনে আজ থেকে ঠিক একশো দু-বছর আগে ফ্রান্সে গেছিলেন সেখানকার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি দেখতে। তাঁদের দেখার বিষয় ছিল ভার্সাই প্রাসাদও। প্রায় চারশো বছর আগে ভার্সাই শহরে এই প্রাসাদদুটি তৈরি হয়েছিল। প্রাসাদটি তৈরি হয়েছিল ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর আমলে। প্রায় তিনশো বছর আগে সম্রাট ষোড়শ লুই ছিলেন ফ্রান্সের হর্তাকর্তা। তাঁর রানির নাম ছিল, মারি যোতোয়ানেৎ। পরমাসুন্দরী। সুন্দরী হওয়ার জন্যেই বোধহয় একটু বেশি রকম আহ্লাদিও ছিলেন এই রানি। তাই রাজকোষের অনেক টাকা খরচ করে তিনি প্রাসাদের মস্ত বাগানের নির্জনে বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে একখানা চমৎকার বাড়ি বানিয়েছিলেন। ছোট্ট বাড়ির নামটাও ভারি চমৎকার ‘পেতিত তারাইনো’।

তো, ফ্রান্সে পৌঁছে একদিন মহিলা দু-জন সেই প্রাসাদ দেখতে গেলেন। প্রাসাদে ঢুকে এটা-ওটা দেখতে দেখতে তাঁরা প্রাসাদেরই মস্ত বাগানে পা রাখলেন। চললেন বাগানের আরও ভিতরে। দেখবেন, ‘পেতিত তারাইনো’ নামের সেই বাড়িটি। আর বলতে কী বাগানের ভিতরে ক-পা যেতেই আচমকা তাঁদের চোখে ধাঁধা লেগে গেল। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেল সব। তাঁরা একটু আগে যা দেখছিলেন, এখন সেসব আর কিছু নেই। পলকে উবে গেছে। লোকজন নেই সাড়া নেই শব্দ নেই। পথ নেই। যেন ভূতুড়ে কান্ড! একদম নিস্তব্ধ নিঝুম চারদিক। ভীষণ ভয় পেয়ে তাঁরা হাঁকপাক করে ঘুরপাক খেতে লাগলেন। ভাবলেন, হঠাৎ কি কোনো বিপদ তাদের পিছু নিয়েছে! তাঁরা কি কোনো ইন্দ্রজালে জড়িয়ে পড়লেন!

ঠিক এই মুহূর্তে আচম্বিতে তাঁদের চোখের ওপর ভেসে ওঠে একটা পাথরের তৈরি কুটির। কোথায় ছিল ওইটা এতক্ষণ। হঠাৎ তাদের মনে হল, ইতিহাসে যেমন পড়েছেন, তেমনই চারশো বছরের পুরোনো ভার্সাই প্রাসাদের বাগানে ঢুকে পড়েছেন তাঁরা। সেই সময়ে প্রাসাদের কর্মচারীদের যেমন সাজপোশাক ছিল, তেমনই পোশাক গায়ে একজন বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে সেই কুটিরের সামনে। একটি ছোট্ট মেয়ের হাতে একটি পাত্র তুলে দিচ্ছে। ছোট্ট মেয়েটিও পরে আছে সেই আদ্যিকালের পোশাক। দেখা গেল, দু-জন সুপুরুষ মানুষ এগিয়ে আসছে মহিলা দু-জনের দিকে। তাদের গায়েও সেই আদ্যিকালের জামা-প্যান্ট পুরোনো ঢংয়ের কোট। মাথায় তেকোনা টুপি। যদিও বোঝা যাচ্ছিল, তারা বাগানের মালী, কিন্তু তাদের সাজপোশাক দেখলে কে তা বিশ্বাস করবে! মহিলা দু-জন এগিয়ে গেলেন তাদেরই দিকে।

তাঁরা যে বাগানে ঢুকে পথ হারিয়ে ফেলেছেন, মহিলা দু-জন মালীদের বললেন। বলার সঙ্গে সঙ্গে মালী তাদের বাগানের আরও ভেতরে যাওয়ার একটা পথ দেখিয়ে দিল। যেন বলতে চাইল, আসল পথ ওইটাই।

মহিলা দু-জন সেই পথ ধরেই হাঁটলেন। খানিক যেতেই সামনে দেখলেন, একটা গোলমতো শামিয়ানা খাটানো। তার নীচে বাজনা বাজাবার মঞ্চ। আর সেই মঞ্চে ওঠার সিঁড়ির ওপর একটা লোক মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। তার গায়ে একটা কালো রঙের ঢিলেঢালা আলখাল্লা। তার মাথায় একটা টুপি। লোকটা একটা যেন সন্ত!

ঠিক এই সময়ে হঠাৎ সেই অধ্যক্ষ মহিলার ভীষণ গা ছমছম করে উঠল। তাঁর মনে হল, তিনি কীভাবে ভূতের রাজ্যে এসে পড়েছেন! আর, সেই প্রধানশিক্ষিকারও ভয়ে মুখ চুন। তাঁর মনে হল, চারপাশটা কেমন যেন আবছায়ায় ঢাকা পড়েছে। কী অস্বস্তিকর পরিবেশ। মনে হচ্ছে, বাগানের সেই মস্ত মস্ত গাছগুলোও যেন হেলছে না, দুলছে না। ফসিলের মতো স্থির! তার উপর সেই সন্তমার্কা লোকটা যখন আচমকা তাঁদের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল, তাঁদের কম্ম সারা! এই বুঝি জ্ঞান হারান। কী বীভৎস সেই মুখ। বসন্তের দাগে ফুটোফাটা সেই মুখ, চোখে দেখা যায় না। তাঁরা আর এগোতে পারলেন না। সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন!

পরক্ষণেই তাদের মনে হল, কার যেন পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে! কে যেন ছুটে এদিকেই আসছে! কিন্তু তাকে দেখা যাচ্ছে না! দেখা সম্ভবও নয়! কেন-না, গাছভরতি বাগানের আড়াল থেকে পায়ের সেই শব্দ ভেসে আসছে! অথচ হঠাৎ যে কখন কোথা থেকে, সেই অদৃশ্য লোকটা অজান্তে তাদের পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল, তাঁরা টেরই পেলেন না! আরও আশ্চর্য, তাঁদের পথের দিশা দিল ইশারায় সেই লোকটাই। তারপর যেমন করে এসেছিল, তেমন করেই অদৃশ্য হয়ে গেল। আর, মহিলা দু-জন, তার দেখানো পথ ধরে একটু হাঁটতেই সত্যি-সত্যি দেখতে পেলেন রানি আতোয়ানেতের সেই বিশ্রামঘর!

ছোট্ট সোনা ছই, যেন মনে কোরো না, এ আমার মনগড়া বানানো গল্প! এ একেবারে চাঁদ সূর্যের মতো সত্যি! বিজ্ঞানীরা পর্যন্ত, এই ঘটনা নিয়ে অনেক মাথা ঘামিয়েছেন। আর ওই দু-জন মহিলাও তাঁদের এই ভয়ানক অভিজ্ঞতা নিয়ে, ‘একটি অভিযান’ নামে একখানা বইও লিখে ফেলেছেন।

তোমাকে এমন একটা গল্প শোনানোর আসল কারণ একটাই, একটা রোমহর্ষক ঘটনা আমার জীবনেও ঘটে গেছে। এবার বলি সেই নিজের গল্পটা।

সেদিন কলকাতার ব্যস্ত মোড় এসপ্ল্যানেড পেরিয়ে হাঁটছিলুম গঙ্গার দিকে। রাজভবনের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলেছি। সামনেই রাস্তার ওপর দিয়ে একটার পর একটা গাড়ি এদিকে-ওদিকে ছুটছে। মানুষ আসছে-যাচ্ছে একটু দূরে ওই কোণে দেখা যাচ্ছে আকাশবাণী ভবন। আমি রাস্তাটা পেরোবার জন্য খুব সাবধানে ফুটপাত থেকে নামলুম। ফাঁকা পেয়ে তড়িঘড়ি পেরিয়েও গেলুম। একদিকে নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়াম, তার উলটোদিকে বিধানসভা ভবন। এখান থেকে ক-পা হাঁটতেই গঙ্গার তীর। আরও ক-পা হাঁটতেই আমি পৌঁছে গেলুম মিলেনিয়াম পার্কে। তোমার কি মনে আছে, সেই পার্কে একদিন তুমিও গিয়েছিলে আমার সঙ্গে?

এখন হেমন্তের শেষবেলা। সন্ধ্যে নামছে। আমি একটি ফাঁকা জায়গা দেখে বসে পড়লুম গঙ্গার কিনারে পাতা বেঞ্চের ওপর। গঙ্গা শান্ত। ফুর ফুর করে বাতাস বইছে জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। ঢেউ উঠছে টুপটাপ। ছড়িয়ে পড়ছে পাড়ে পাড়ে। মাঝদরিয়ায় নোঙর ফেলে নৌকা দুলছে একটি-দুটি। আলো জ্বলছে মিটিমিটি। পাড়ের আলো ঝিলমিলিয়ে দোল খাচ্ছে জলের ওপর। দু-একটি পাখি তখনও আকাশ সাঁতরে উড়ে যাচ্ছে বাসায়। আমি দেখছি।

দেখতে দেখতে হঠাৎ যেন কেমন অন্যমনা হয়ে গেলুম কেমন যেন স্বপ্নের মতো আমার চোখের ওপর ভাসছে সব কিছু। আমি ভুলে যাচ্ছি সব। তুমি যে এখন ঘাটশিলায় বেড়াতে গেছ, আমি যে এখন মিলিনিয়াম পার্কে বসে আছি, আকাশে যে পাখি উড়ছে একটি-দুটি, কিংবা গঙ্গার জলে যে আলোর ছায়া, এসব আর কিছুই আমার চোখে নেই। এখন তুমিই আমার চোখে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠেছ। তুমি আমাকে আদর করে জড়িয়ে ধরেছ। বলছ, বাবা তুমি আমাকে একটুও ভালোবাস না।

আমি অবাক হই। চমকে উঠি। জিগ্যেস করি, কেন একথা বলছ?

তুমি উত্তর দিলে, ‘তুমি বলেছিলে আজ গল্প বলবে, বললে না। বলেছিলে, আমার সঙ্গে খেলা করবে, করলে না। কথা ছিল আমাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে, গেলে না। অথচ তুমি এত এত গল্প জানো। কত রকমের খেলা জানো। আমাকে নিয়ে কোথায় বেড়াতে গেলে যে, আমি খুব খুশি হব, সেটা পর্যন্ত তুমি জানো। অথচ কোনোটাই তুমি করলে না। ঠিক আছে, দরকার নেই ওসব কিছু করার। এখন আমার সঙ্গে একটু খেলা তো করতে পারো!’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে ছই, এসো খেলাই করি। বলো, কী খেলা খেলবে?’

চোর-পুলিশ। আমি চোর, তুমি পুলিশ। আমায় ধরো! বলেই তুমি ছুট দিলে।

আমিও হেসে উঠে তোমার পেছনে ধাওয়া করলাম। তুমিও হাসছ, হাসতে হাসতে ছুটছ।

আমি আর কতক্ষণ পারব তোমার সঙ্গে। হাঁপিয়ে গেলুম, তাই চেঁচিয়ে ডাক দিলুম ছোট্ট সোনা, দাঁড়াও আর পারছি না। আমি হেরে গেছি। তার চেয়ে বরং গল্প করি এসো।

কিন্তু, তুমি এলে না। ছুটেই চলেছে। লক্ষণ নেই থামার। তুমি যেন একটি ছোট্ট হরিণ! আর আমি যেন এক বেতো ঘোড়া। তোমার পিছনে ছুটছি ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে। তা বলো বেতোঘোড়া কেমন করে ছুটে পারবে হরিণের সঙ্গে!

এমন সময় হঠাৎ ঘটে গেল একটা আজব কান্ড। আমি দেখলুম, ছুটতে ছুটতে তুমি টুক করে লুকিয়ে পড়লে। কোথায় যে লুকোলে আমি বুঝতেই পারলুম না। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। মুহূর্তে এদিক-ওদিকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। তারপর চিৎকার করে উঠলুম ছই-ই-ই!’

আমার চিৎকারের রেশ ফুরাতে না ফুরাতেই আচমকা একটা দমকা বাতাস কোত্থেকে যে আমার দিকে তীব্র গতিতে ধেয়ে এল! ধুলো ঝঞ্ঝায়, নাস্তানাবুদ হয়ে আমি পাক খেতে লাগলুম। তারপর আরও সর্বনাশের কথা, বাতাসের এত তোড় যে আমার পা মাটিতে আর রাখতে পারলুম না। সেই বাতাস আমায় শূন্যে তুলে এমন চরকি খাওয়াতে লাগল, মনে হল আমি বুঝি গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে যাই! কিন্তু তেমন কিছু হবার আগেই আমাকে দারুণ জোরে একটা ঝাপটা মারল বাতাস। আমি হাত-পা ছরকুট্টে পড়লুম মাটিতে। উফ! ভীষণ লাগল। হাড়গোড় যে গুঁড়োল না, কিংবা মাথা যে ফাটল না, এই যা রক্ষে! আমি পড়েই ধড়ফড় করে উঠে বসেছি। জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে দাঁড়িয়েও পড়েছি। তারপরেই ধন্দ লেগে গেল আমার চোখে! বাতাসের ধাক্কায় এ কোথায় এসে পড়েছি আমি!

ছই, তোমার কি মনে আছে, ক-দিন আগে তোমাকে কোরসিকা দ্বীপের গল্প বলেছিলাম। প্রস্তরযুগে ভূমধ্যসাগরের এই দ্বীপে একদল শান্তিপ্রিয় মানুষ বাস করত। তারা জমিতে ফসল ফলাত, মেষ চরাত। তাদের আপনজন মারা গেলে পাথরের তৈরি মস্ত মস্ত ঘরে কবর দিয়ে রাখত। তারপর বিরাট বিরাট পাথর খোদাই করে মানুষের মূর্তি গড়ত। সেই সব মূর্তি সাজিয়ে রাখত স্মৃতিস্তম্ভের মতো কবরের সামনে। তারা মনে করত, এই পাথরের মূর্তির বুকের মধ্যেই আশ্রয় নেয় মৃত মানুষের আত্মা। তোমাকে বলব কী আমার যেন মনে হল, এই দমকা বাতাস আমাকে ঝাপটা মেরে কোরসিকা দ্বীপের এমনই এক মূর্তির সামনে ফেলে দিয়েছে! আমি থমকে গেছি। দাঁড়িয়ে দেখছি, কেউ নেই কাছেপিঠে। চারদিক নির্জন, শুনশান! ফাঁকা মাঠ। হু হু করে বাতাস বইছে। ওই দূরে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ের সারি। সবুজ গাছগাছালি। পাহাড় আর গাছের আড়ালে সূর্য ঢলে পড়ছে। তার মানে, তখন দিনের শেষবেলা। রক্তরাঙা সূর্যের আভায় আমার চোখে পড়ে গেল, এমনই সারবাধা আরও ক-টা মূর্তি। আর কোনো সন্দেহই নেই! আমার মনে হয় আমি যেন কোরসিকা দ্বীপের সেই মূর্তির সামনেই দাঁড়িয়ে আছি!

আমার এই আজগুবি কথা শুনে, তুমি নিশ্চয়ই হেসে কুটপাটি হচ্ছ। ভাবছ বাবা মনগড়া কথা শোনাচ্ছে! ঠিকই তুমি একথা ভাবতেই পারো। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখো ছই, মানুষের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু হচ্ছে বই। আমি তো ভূমধ্যসাগরের ওই ছোট্ট দ্বীপে কোরসিকায় কোনো দিন যাইনি। সে-দেশের মানুষ যে তাদের আপনজন মারা গেলে, তার কবরের সামনে মূর্তি গড়ে রাখত, আর বিশ্বাস করত তার আত্মা ওই মূর্তিতে আশ্রয় নেয়, এতো আমি বই পড়েই জেনেছি। এমন অনেক অজানা কথা তো মানুষ বই পড়েই জানতে পারে। এক-এক সময় মানুষ যখন বই-এ পড়া এমন সব অজানা কথা ভাবতে ভাবতে আনমনা হয়ে যায়, তখনই অজান্তে তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে সেইসব না-জানা কথার ছবি স্বপ্নের মতো। স্পষ্ট। জীবন্ত। হয়তো, সেই দু-জন ইংরেজ মহিলার চোখেও ভেসে উঠেছিল এমনই স্বপ্নের মতো ভার্সাই প্রাসাদের ইতিহাসের ছবি। সে-ও বোধহয় বই পড়ারই প্রভাব। অবশ্য এটা আমার নিজের বিশ্বাস।

সে যাই হোক, এখন কিন্তু আমার মনে বইপড়ার প্রভাবই জাঁকিয়ে বসেছে। তোমাকে খুঁজছি যখন, তখন বাতাসই যেন আমাকে উড়িয়ে এনেছে কোরসিকার এই কবর স্থানে। আমি এখানে হতবাক হয়ে সূর্যের অস্ত যাওয়া দেখছি, আর অবাক হয়ে ভাবছি, কোথায় গেলে তুমি আচমকা! এখন কোথায় খুঁজব তোমায়!

ভয়ে আর স্থির থাকতে পারি না। আর কিছু ভেবে না পেয়ে তারস্বরে চিৎকার করে উঠলুম ছই-ই-ই!এই থমথমে নির্জন জায়গাটা আমার চিৎকারে নিমেষে খান খান হয়ে গেল। আর তারপরেই বাজ পড়লে যেমন কানফাটা শব্দ শোনা যায়, তেমনই শব্দ করে কারা যেন হেসে উঠল একসঙ্গে, হা-হা-হা!’

আমি থতোমতো খেয়ে গেছি। হাসির সেই ঘনঘন শব্দ আমার বুকের ভেতর থরথরানি শুরু করে দিল। আমি আতঙ্কে ফিরে তাকাই এদিকে-ওদিকে। ভাবি, এ কী সত্যিই হাসি, না বিনা মেঘে বজ্রপাত!

আশ্চর্য, মুহূর্তে হেসেই সেই শব্দ থমকে গেল। আবার নেমে এল সেই জমাট নিস্তব্ধতা। কেমন যেন ঝিমঝিম করতে লাগল মাথার ভেতরটা। কী যে করি, কিছু ভেবে না পেয়ে দিলুম ছুট!

মিথ্যে ছোটা। কেন-না ততক্ষণে সূর্য ডুবছে। আকাশে আঁধার নেমেছে। অন্ধকারে নিবিড় হয়েছে চরাচর। পথঘাট ঠাওর করে কার সাধ্যি। তার ওপর একেবারেই অচিন সব কিছু আমার কাছে। কোথায় যাব, কোনদিকে, জানি না। অগত্যা হোঁচট খাই, ধড়ফড় করি। আবার হাঁটকাই। পড়তে পড়তে সামলে বাঁচি।

এমনই করে বাঁচতে গিয়ে একবার আলটপকা একটা পাথরের মূর্তিকেই জাপটে ধরলুম। মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে গেল, একটা অবিশ্বাস্য কান্ড! সেই মূর্তিটা আচম্বিতে গর্জে উঠল হুংকার ছেড়ে:

হুল্লো হুল্লো হল্লা,

নাকের গর্ত খামচে ধরে

কাটব পাজির গল্লা।

আমি থতোমতো খেয়ে আর্তনাদ করে উঠেছি, বাঁচাও-ও-ও! সঙ্গে সঙ্গে মারলুম লাফ চোখ-কান বুজে। মারলে কী হবে, তার আগেই আমার চুল খামচে ধরেছে মূর্তিটা। টেনে ছাড়াতে গিয়ে আমার মাথার ঝিক্কুর নড়ে গেল। আমি যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলুম, উঃ হু-হু-হু!

আর বলব কী, আমার দুর্দশা দেখে সারা কবর স্থানে যতগুলো পাথরের মূর্তি ছিল, তারা একসঙ্গে বিকট স্বরে হা-হা-হা করে হেসে উঠল। সে হাসির এমনই উৎকট রব যে, আমার পায়ের নীচে মাটি পর্যন্ত থরথর করে কাঁপতে থাকল। তারা হাসতে হাসতে খেঁকিয়ে উঠল:

এই চোর, শোন তোর মাথাখানা মুড়িয়ে,

ঠক-ঠক-ঠুকে ঠুকে দেব ঠিক গুঁড়িয়ে।

মতলব জানি তোর সোনাদানা হাতানো,

খবরটা দিল কেরে কার মাথা খাটানো?

কবরে যে সোনা আছে খুঁড়োখুঁড়ি গর্তে,

জানিস তা ছুঁলে ঠিক হবে তোকে মরতে!

ভালো যদি চাস তবে কেটে পড়, চোট্টা,

তা না হলে দেব টেনে গাঁট্টার চোটটা!

ফেটে মাথা চৌচির পেয়ে যাবি অক্কা,

লোভ তোর চুকে যাবে সোনাদানা ফক্কা!

বলতে বলতে আবার হাসি-হা-হা-হা! হো হো! আর আমার মাথার ঝুটি নুড়োনুড়ি-উঃ আঃ! বাপরে-মা! আমি যন্ত্রণায় নাস্তানাবুদ হয়ে বলে উঠলুম, শোনো হে পাথরের মূর্তি। আমি চোর নই ছ্যাঁচোড়ও নই, আমি একটি ছোট্ট মেয়ের বাবা। আমি তারই সঙ্গে ছুটে ছুটে খেলা করছিলুম। হঠাৎ এক ধাঁধা লেগে গেল আমার চোখে। আমি দেখি, ছুটতে ছুটতে আমার মেয়ে অতর্কিতে কোথায় যেন হারিয়ে গেল! আমি আর দেখতে পাই না। তাকে খুঁজতে খুঁজতে অজান্তে কেমন করে যে এখানে চলে এসেছি বলতে পারব না। তোমরা বিশ্বাস করো, আমি মিথ্যে বলছি না। তোমরা আমাকে দয়া করে ছেড়ে দাও! তাকে আমায় খুঁজে বার করতে হবে। নইলে বিপদ!

ছই, বলতে নেই, আমার মুখের কথা ফুরোতে না ফুরোতে সেই মূর্তি-র হাত থেকে আমার খামচে ধরা চুলের মুঠি খুলে গেল। খুলে যেতেই সে চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল—

লাংমি লাংমি ড্রাগনের পথ,

সেই পথে পা দিলেই দিতে হবে খত!

আমরাও ছেলেটা সেই পথে পড়ে হায়

জানি না, জানি না আমি হারাল কোথায়!

সেই মূর্তি বলতে বলতে কাঁদতেই থাকল। আর আমি ‘লাংমি’ কথাটা শুনে শিউরে উঠলুম। কারণ, আমি জানতাম, চিনারা বলে, ড্রাগনরা যে পথ দিয়ে চলাফেরা করত, সেই পথকে বলে লাংমি। এই পথ ছড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে। এদিক ওদিক থেকে এসে এই পথ যেখানে মিশে গেছে, সেইখানেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছে পাহাড় পর্বত। বড়ো-বড়ো পাথরের চাঁই। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে শক্তিশালী চুম্বকের। সেই চুম্বকের ওপর কারও পা পড়লেই, তাকে মারবে টান। মাটির নীচে তার সমাধি হয়ে যাবে! আমি শিউরে উঠে ভাবলুম, আমার ছইও কি তবে এমনই লাংমির পথে পা দিয়ে মাটির নীচে হারিয়ে গেছে। সেই ভয়ে আমারও যেন বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়!

দ্যাখো ছেলের শোকে পাথরের মূর্তিটা এখনও কেমন বেদম হয়ে কাঁদছে! অমন একটা রুক্ষু পাথরের মূর্তি যে, এমন করে একটা কচি ছেলের মতো কাঁদতে পারে, সে-দৃশ্য যে না দেখবে তাকে বোঝানো যাবে না। অবশ্য সেই মূর্তিটা এখন অন্ধকারে ঝাপসা। তার কান্নায় উপচে পড়া মুখ এখন দেখাও যাবে না। অন্তত আমি দেখতে পাচ্ছি না। শুধু কান্নাই শুনছি!

এমন সময় ঘটল আর এক উদ্ভট কান্ড! যতগুলো মূর্তি ছিল, সব কটাই একসঙ্গে কেঁদে উঠল। এ কী বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার! তাদের কান্নার শব্দে আমার কানে তালা লেগে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এখন এখান থেকে পালাতে পারলে বেঁচে যাই। কিন্তু পালাব যে, চোখ তো আমার পাথের হদিশ পাচ্ছে না। এই কবরস্থানের ভয়ংকর অন্ধকারে আমি যেন বলি, কী করি এখন!

ঠিক এই মুহূর্তেই আবার আচমকা কান্না থেমে গেল। নিথর হয়ে গেল কবরস্থান। নি:সাড় চারদিক। এমন সময় শোনা গেল, একটি ছোট্ট মেয়ের গলার স্বর ‘বাবা-আ-আ’।

আমি চমকে উঠলাম!

সে আবার ডাকল বাবা আ-আ-আ’।

কে ডাকে! এ কী আমার মেয়ে ছই-এর গলা! এখানে সে কোথা থেকে আসবে!

সে আবার ডাকে-বাবা আ-আ-আ।

মনে হল সে ছুটতে ছুটতে এদিকেই আসছে। আমিও অস্থির হয়ে উঠলুম।

সে ছুটতে ছুটতে চিৎকার করে উঠল, ‘বাবা আমি ছই! তুমি কোথায়?

আমি আর থাকতে পারলুম না। আমিও আকুল হয়ে চিৎকার করে উঠলুম, ‘ছ-ই-ই-ই, আমি এখানে।’ বলে, আমার আর তর সইল না। আমি অন্ধকারেই লাফ মারলুম। দেখা পাচ্ছি না কিছুই তাই মারলুম তো মারলুম একটা পাথরের মুহুর্তের গায়েই। লাগল ভীষণ। ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়লুম মাটিতে। মাথায় লাগল।

হ্যাঁ, লাগল, তবে পাথরের মূর্তিতে নয়, এতক্ষণ আমি মিলেনিয়াম পার্কের যে বেঞ্চে বসে আছি, মাথা ঠুকে গেল সেই বেঞ্চের হাতলে। এতক্ষণ আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলুম। বুঁদ হয়ে, সেই প্রস্তর যুগের স্বপ্ন। যে-যুগের মানুষ মৃতের কবরের সামনে মূর্তি গড়ে সাজিয়ে রাখত আর ভাবত, তার আত্মা বুঝি ওই পাথরেই আছে।

যাই হোক, এই ভালো যে তুমি সত্যিই লাংমির পথে পা দিয়ে, মাটির নীচে আটকা পড়োনি। ভালো থেকো। কেমন লাগল লিখো!

বাবা

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%