ঝিলিকের আপদ-বিপদ

শৈলেন ঘোষ

এখন দুপুর। এই ঘরে আমি একা। শুয়ে আছি। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। তা হয়ে গেল অনেকক্ষণ। এতক্ষণে রাস্তাঘাট হয়তো জলের নীচে তলিয়ে গেছে। রাস্তায় জল দাঁড়ালে আমার খুব মজা লাগে। আমাদের ফ্ল্যাটটা তো একেবারে রাস্তার ওপর। দোতলায়। যখনই বৃষ্টিমেঘে আকাশ ভেঙে পড়ে, জলে-জলে থইথই করে চারদিক, এমনকী, সামনের ফাঁকা জমিটা পর্যন্ত জলে ডুবে যায়, তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে যা লাগে! কিন্তু এখন আমার শত ইচ্ছে থাকলেও আমি একা বারান্দায় যেতে পারব না। আমার পা ভেঙে গেছে। আমার বাঁ পায়ে আগাগোড়া প্লাস্টার করা। এমন ভাঙা ভেঙেছে প্রথমটা ডাক্তারবাবুরা ভেবেছিলেন, হয়তো বাদই দিতে হবে। রক্ষে, তা অবশ্য করতে হয়নি। আমি মেয়ে। বুঝতেই পারছ, একবার খোঁড়া হয়ে গেলে কী অবস্থা। অগত্যা শুয়েই আছি। নইলে এমন বর্ষার দুপুরে কে আর ঘরের কোণে একলা শুয়ে থাকে! একলা মানে, ঠিক যে একলা তা বলতে পারো না। কাজের দিদি আছে। বাড়ির কাজকর্ম চুকিয়ে দিদিও পাশের ঘরে একটু গড়িয়ে নিচ্ছে। এখন দিদিকে আমার কোনো দরকার নেই। একটু আগে দিদি আমাকে ধরে ধরে খানিক হাঁটিয়েছে। ডাক্তারবাবুই হাঁটাতে বলেছেন। তা কী কষ্ট করে যে পা ফেলি। তারপর আমাকে চান করিয়ে, খাইয়ে দিদি নিজে খেয়েছে। সকাল থেকে কী খাটুনিটাই না খাটে দিদি। সংসারের জন্যে মা আর কতটুকু করে! সকাল ন-টার মধ্যে অফিস বেরিয়ে যাবে মা। তা অফিসের ভাত দেওয়া থেকে আমার ইশকুল যাওয়া পর্যন্ত সে সব তো দিদিকেই করতে হবে। তার ওপর বাবা থাকলে তো আর কথাই নেই। কাজের দিদি নিশ্বাস ফেলার ফুরসত পায় না। অবশ্য এখন বাবা নেই। অফিসের কাজে ব্যাঙ্গালোর গেছেন, ওখানেই থাকতে হবে এখন। তাও তো হয়ে গেল ছ-মাস। আমার পা ভাঙার খবর পেয়ে মাঝে ক-দিনের জন্যে এসেছিলেন। সব ব্যবস্থা করে ফিরে গেছেন। কাল একখানা চিঠি এসেছে বাবার। আমাকে লিখেছেন, চিঠিটা পড়লে বুঝতে পারবে, বাবা আছেন বটে ব্যাঙ্গালোরে, কিন্তু মন পড়ে আছে এখানে। বাবার হাতের লেখাটা যেমন সুন্দর, তেমনি সুন্দর করে লেখা চিঠিটা। তোমাদের পড়ে শোনাই—

লক্ষ্মী সোনা ঝিলিক,

কাজেকম্মে মন দিতে পারছি না একটুও। তোমার কষ্ট দেখে এসে পর্যন্ত সব সময়ে তোমার মুখখানাই মনে পড়ে যাচ্ছে আমার। আর বোধহয় দু-সপ্তা বাদে তোমার প্লাস্টার কাটার সময় হবে। সে সময়ে নিশ্চয়ই যাব। ডাক্তারবাবু যেমন যেমন বলেছেন, ঠিক তেমনই করে তোমার দিদির সাহায্য নিয়ে একটু একটু হাঁটবে। ব্যথা লাগলে কষ্ট করে হাঁটবে না। মন খারাপ কোরো না। আবার তুমি আগের মতোই হাঁটতেও পারবে, ছুটতেও পারবে। তবে হ্যাঁ স্কিপিং নিয়ে আর ছোটাছুটি না করাই ভালো। তোমার কত ইচ্ছে ছিল, পুজোর সময় মায়ের সঙ্গে আমার এখানে আসবে। তা বোধহয় আর হল না। মাঝে মাঝেই তোমার মায়ের চিঠি পাচ্ছি, সেইসঙ্গে তোমার খুঁটিনাটি খবরও। তোমারও চিঠি পেলে খুব ভালো লাগত। কিন্তু এখন বোধহয় তুমি বসে বসে চিঠি লিখতে পারবে না। দরকার নেই। ভালো হয়ে যত পারো লিখো। আমি ভালো আছি। তুমি ভালো থেকো—এই প্রার্থনাই করছি সব সময়ে। ইতি, বাবা।

সত্যি এবার কত আশা করেছিলুম ব্যাঙ্গালোরে যাব। তা সে আর হল না। পুজোর সময় কোনোবারই আমরা বাইরে যাই না। যখনই যাই, তা সে পুজো কাটিয়ে। এখানকার পুজো ফেলে আমার বাইরে যেতেও ইচ্ছে করে না। কিন্তু এবার ঠিক উলটো। এবার এখানে থাকতেই মন চাইছে না। কেন না, পুজোর সময় বাবা কাছে না-থাকলে পুজোটা আমার পুজো বলে মনেই হয় না। পুজোর সময় আমাদের নিয়ে বাবা কী না করেন। একসঙ্গে ঠাকুর দেখা, হইহই আনন্দ। বাড়ি একেবারে জমজমাট। তা, মানুষটা একলা বিদেশে। আমরাও একলা এখানে। তাই ঠিক হয়েছিল, ব্যাঙ্গালোরে বাবার কাছেই যাওয়া হবে। কিন্তু সব পন্ড হয়ে গেল। আমি বসলুম পা ভেঙে। একে বলে ভাগ্য। আসলে কী জানো, ওই যে চিঠিতে বাবা স্কিপিং-এর কথা লিখেছেন, ওই স্কিপিংটাই হল কাল। তবে স্কিপিং নিয়ে আমি ছুটোছুটি মোটেই করিনি। শিবানী আমায় রাগিয়ে দিল বলেই তো এমন একটা বিপদ ঘটে গেল। তবে শিবানীকেও আমি দোষ দেব না। শিবানী বলল বলে আমারই বা অমন জেদ করে বাহাদুরি দেখাবার কী দরকার ছিল! ব্যাপারটা তা হলে বলতেই হয় তোমাদের।

শিবানী আর আমি একই ক্লাসে পড়ি। মিথ্যে বলব না, খেলাধুলোয় মেয়েটা ভীষণ ওস্তাদ। যেমন পারে ব্যাডমিন্টন খেলতে তেমনই টেবিল টেনিস। এবার ইশকুল চ্যাম্পিয়ানশিপে টেবিল টেনিসে ফাইনাল পর্যন্ত উঠেছিল। কিন্তু বেচারি নিছক ভাগ্যের দোষে হেরে গেল। আমরা নিশ্চিত জানতুম, শিবানী জিতবেই। কিন্তু মেয়েটার ফাইনালের ঠিক আগের দিন থেকে জ্বর। ওষুধপত্তর নিয়ে জ্বরটাকে একটু কমানো গেল বটে, কিন্তু একেবারে সারল না। ও যখন ফাইনালের দিন টেবিলে এল, তখনও গা ছ্যাঁক ছ্যাঁক করছে। সেই অবস্থাতেই শিবানী লড়ে গেল। মেয়েটা কী খেলাই না খেলল। কিন্তু সুস্থ শরীরে খেলা আর গায়ে জ্বর নিয়ে খেলা, পারবে কেন! খুব মন খারাপ হয়ে গেল বেচারির। কে জানে, ওই অবস্থায় আমি হলে হয়তো কেঁদেই ফেলতুম। কিন্তু শিবানী বলে তাই, মন শক্ত করে বাড়ি চলে গেল। অবশ্য চোখ দুটো যে একটু ছলছল করেনি, তা নয়। কিন্তু এমন শক্ত মেয়ে একফোঁটাও জল পড়ল না চোখ দিয়ে! তবে বাড়ি গিয়ে সেই যে শুলো, দশদিন ইশকুলে আসতে পারেনি। যেদিন এল দেখি মেয়েটা এই-ই হয়ে গেছে। তবে আমি যখনকার কথা বলছি, তখন অবশ্য শিবানী একেবারে সুস্থ। মানে, আগের মতোই আবার জোর কদমে, খেলাধুলো করছে, আর আমাদের পেছনে লাগছে। আমি মনে মনে ভাবতুম, একবার যদি সুযোগ পাই তো তোমার পেছনে লাগবার ব্যবস্থা করি। কিন্তু সে সুযোগ আর আসে কই?

একদিন হল কী, ইশকুলে টিফিনের সময় শিবানী একটা স্কিপিং বার করে আমায় জিগ্যেস করল, ‘তুই এক দমে কতবার লাফাতে পারিস?’

আমি বললুম, ‘আমি পারি না।’ কারণ, আমি তো জানি, আমি যতবার পারি বলব, শিবানী তার চেয়ে অনেকবার বেশি পারবে বলে আমাকে চ্যালেঞ্জ করবে।

কিন্তু না, এখন সে তা বলল না। উলটে ফট করে বলে বসল, ‘সে কী রে, তুই স্কিপিং পারিস না মানে, তুই একদম আলুভাতে।’

ব্যাস! ও কথা শুনে কে আর মাথার ঠিক রাখতে পারে! মাথা আমার ঘুরে গেল। আসল কথাটা হল, স্কিপিং করতে আমি খুব পারি। তবে শিবানীর মতো তো আর পারব না। কিন্তু ও যে আমাকে আলুভাতে বলে অমন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করবে, এ আমি সহ্য করতে পারলুম না। আমি ভেতরে ভেতরে গুমরে উঠলুম। কিন্তু বাইরে জানতে দিলুম না। ঠাণ্ডা মাথায় ওকেই আমি চ্যালেঞ্জ করে বসলুম, ‘স্কিপিং আমি পারি, এমনকী, তুই যতবার লাফাতে পারিস আমি তোর চেয়ে বেশি বার পারি।’

শিবানী আমার কথা শুনে তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘যদি না পারিস?’

‘পারব না, এ কথাটাইবা তুই আগে থেকে ধরে নিচ্ছিস কেন?’ আমিও তেমনই জেদের সঙ্গেই উত্তর দিলুম।

শিবানী বলল, ‘আয়, তা হলে বাজি ধর।’

আমিও দামে যাওয়ার পাত্রী নই। জিগ্যেস করলুম, ‘কী বাজি?’

শিবানী বলল, ‘একটা মোগলাই পরোটা।’

‘ঠিক আছে।’ আমি রাজি হয়ে গেলুম।

সুতরাং, ইশকুলের দোতলার বারান্দায় শুরু হয়ে গেল বাজির খেলা। ক্লাসসুদ্ধ মেয়েরা ভিড় করে ভেঙে পড়ল বারান্দার ওপর। আমাদের ক্লাসের রানি বিচারক। রানির সম্পর্কে আমাদের কারও আপত্তি নেই। মেয়েটা কারও সাতে-পাঁচে নেই। শান্ত। খুব ভালো। আসলে ওকে বড্ড ভালো লাগে। ও সেই ক্লাস ওয়ান থেকে আমার বন্ধু। আর এই ক্লাস সেভেন অবধি আমাদের বন্ধুত্ব অটুট।

হ্যাঁ, খেলার আগে টস হল। শিবানী শুরু করল। স্কিপিং-এ লাফানোটা ওর কাছে কিছু না। সোজা জলের মতো। একসঙ্গে এক হাজারবার ও চোখ বুজে লাফিয়ে যাবে। কী দম। আমি গা জোয়ারি করে ওর সঙ্গে বাজি লড়ে গেলুম বটে, কিন্তু মনে মনে তো জানি, আমার দৌড় কদ্দুর। যাই হোক, এখন তো আর পিছিয়ে পড়লে চলবে না। লড়ে যেতেই হবে। যদি হারি, একটা মোগলাই পরোটা খাওয়াতে হবে। কী আর এমন!

তা এরই মধ্যে শিবানীর সত্তরটা লাফ হয়ে গেছে। রানি চেঁচিয়ে গুনে যাচ্ছে, ‘একাত্তর, বাহাত্তর, তিয়াত্তর, চুয়াত্তর—যা:।’

এ কী! স্কিপিংয়ের দড়ি যে শিবানীর পায়ে আচমকা জড়িয়ে গেল। শিবানী যে চুয়াত্তরেই শেষ। এ যে অবিশ্বাস্য কান্ড! আমি নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছি না। আমি কেন, কেউই ধারণা করতে পারে না, শিবানী মাত্র চুয়াত্তরেই থমকে যাবে। শিবানী নিজেও কেমন যেন হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। একবার হাতের স্কিপিংটার দিকে আর একবার নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে, সে যেন এই অঘটনটার কারণ বোঝবার চেষ্টা করল। হতাশায় তার মুখখানা আস্তে আস্তে কালো হয়ে গেল। সে রেগেমেগে স্কিপিংটা ছুঁড়ে দিল রানির দিকে। রানি এবার আমায় শুরু করতে বলবে।

মনে মনে কী দারুণ যে আনন্দ হচ্ছে আমার। মাত্র পঁচাত্তরবার লাফাতে পারলেই আমি শিবানীকে হারিয়ে দেব। এ যেন ভাবতেই পারছি না। মাত্র পঁচাত্তরবার! একটা ক্লাস ওয়ানের মেয়ের হাতে স্কিপিং ধরিয়ে দাও, সে চোখ বুজে পঁচাত্তরবার লাফিয়ে যাবে। আর এখন আমার হাতে স্কিপিং। কেউ বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, এখনই শিবানী আমার কাছে হারছে। আমি শুরু করলুম। ক-মিনিটই বা লাগল আমার সত্তরের ঘরে পৌঁছতে। আমার বন্ধুরা শুরু করে দিল চেঁচামেচি। কিন্তু মাত্র কয়েক মুহূর্ত। মানে, রানির মুখে পঁচাত্তর উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যে কী হল, কে যেন উত্তেজনায় একবারে আমার মুখের সামনে লাফিয়ে পড়ল। আমার স্কিপিংয়ের দড়ি তখনও ঘুরছে। ঘুরে ওপর থেকে নীচে নেমে আসছে। তার গায়ে লেগে স্কিপিংয়ের দড়িটা আমার পায়ে জড়িয়ে গেল, আমি টাল রাখতে পারলুম না। সিমেন্টের ওপর প্রচন্ড জোরে আছড়ে পড়লুম। ভীষণ লাগল আমার। মনে হল, বাঁ-পাটা যেন খসে গেছে। আমি যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠলুম। তারপর জ্ঞান হারালুম। যখন জ্ঞান এল দেখলুম আমার পায়ে প্লাসটার।

কাল শিবানী আমায় দেখতে এসেছিল। সঙ্গে রানি আর মিতি। মিতিও আমার বন্ধু। মিতিকে দেখলে তোমাদের মনে হবেই হবে ও আমার চেয়ে ছোটো। আসলে কিন্তু মিতি, আমি একবয়সি। মেয়েটাকে দেখতেও ভারি ভালো। যেমন গায়ের রং তেমনই মুখখানা। শিবানী বেচারি এসে পর্যন্ত ভালো করে কথা বলতে পারছিল না আমার সঙ্গে। যেন আমার পা ভাঙার জন্যে সব দোষ ওর। আমি কিন্তু বারবার ওর হাতটা জড়িয়ে ধরে ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলুম।

মিতি বলল, ‘ঝিলিকের পা ভেঙেছে সে তো তবু রক্ষে। সেবার যে হাজারিবাগে আমরা সবাই মরতে মরতে বেঁচে গেছলুম।’

রানি বলল, ‘উফ! সে কথা মনে পড়লে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।’

আসলে সে গল্প শিবানীরও শোনা। তাই এবার সে হাজারিবাগের নাম শুনতেই কথা বলল, ‘সত্যি সেবার তোরা খুব বেঁচে গেছিস।’

সত্যি, সেবার আমরা যা বাঁচান বেঁচেছি না! বড়োদিনের ছুটিতে রানির সঙ্গে আমি আর মিতি ওর পিসির বাড়ি বেড়াতে গেছলুম। ওর পিসির বাড়ি বিহারের হাজারিবাগ রোডে। অনেকদিন ধরেই যাব যাব হচ্ছিল। শেষে সেই বছর শীতকালে, মানে, বড়োদিনের ছুটিতে যাওয়া পাক্কা। কলকাতা থেকে সকালে খেয়ে দেয়ে ট্রেনে চাপলে সন্ধ্যের মধ্যে হাজারিবাগ রোড স্টেশনে পৌঁছে যাবে। আমরাও তাই করলুম। কী চমৎকার স্টেশনটা। এখান থেকে দূরে ছোট্ট ছোট্ট ক-টা পাহাড়ও দেখা যায়। ওরই একটা পরেশনাথ পাহাড়। একটু ঠাওর করলে তুমি পাহাড়ের চূড়ায় পরেশনাথের মন্দিরটা পর্যন্ত দেখতে পাবে। আমরা একদিন পরেশনাথ পাহাড়ে বেড়াতেও গেছলুম। বেড়াতে গেছলুম রাজারাপ্পাতেও। থাক সেসব কথা? সে সব বলতে গেলে সাতকান্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। রানির পিসির বাড়িটা যেদিকে শহর ঠিক তার উলটো দিকে। রানির পিসির বাড়ির দিকটা পুরো গ্রাম। রাস্তার দু-ধারে সারে সারে ইউক্যালিপটাস গাছ। আম, পেয়ারা, আতা গাছের ছড়াছড়ি। শীতের সময় কত যে ডালিয়া ফুটে আছে চারিদিকে। পিসির বাড়িতে তো আম গাছ ভরতি। কিন্তু হলে কী হবে, গেছি তো শীতে। আম আর কই! বাড়িটার চারদিকে বাগান। খুব সুন্দর। শীতের দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে, বাগানের সবুজ ঘাসের ওপর বসে, পিঠে রোদ লাগিয়ে গল্প করতে কী আরাম।

একদিন ঠিক হল, পিকনিক করতে যাওয়া হবে। এখানে পিকনিক মানে সেই বরাকর নদীর ধারে। পাথর ডিঙিয়ে নদী ছুটে যাচ্ছে। এপাড়ে ওপাড়ে সবুজ বনের সারি। বন ডিঙিয়ে দূরে ছোট্ট ছোট্ট গ্রাম। সেই দৃশ্য সারাদিন বসে বসে দ্যাখো, তোমার কিন্তু একটুও একঘেয়ে লাগবে না। আমরা অবশ্য বরাকরের ধারে পিকনিক করতে গেলুম না। গেলুম রানির পিসির বাড়ির থেকে খানিক দূরে যে জঙ্গলটা দেখা যায়, সেইখানে। আমরা দলে ছিলুম দশজন। আমি মিতি, রানি, রানির পিসেমশাই, পিসিমা, পিসতুতো ভাই, ওদের বাড়ির মালি, মালির বউ আর তার ছেলে। মালপত্তর নিয়ে যাওয়া-আসা করার জন্যে একটা গোরুরগাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল। সেই গাড়ি যিনি চালাচ্ছিলেন তাঁকে নিয়েই দশজন। রানির পিসি আর মালির বউ অবশ্য গাড়িতেই চাপলেন। আমরা পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিলুম। দু-ঘণ্টা হাঁটলে তবে জঙ্গল। তা ধরো, আমরা যখন হাঁটতে শুরু করলুম, তখন সকাল সাতটা হবে। পৌঁছব ন-টা নাগাদ। তাই, রওনা দেওয়ার আগে একপ্রস্থ চা-জলখাবার খেয়েই নেওয়া হয়েছিল।

তা হবে, প্রায় ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর আমরা জঙ্গলে ঢুকলাম। সারাটা রাস্তা গাড়ি যতই চড়াই-উতরাই করেছে, আমরাও ততই একবার উঠছি, একবার নামছি। নালা পেরোচ্ছি, খানা ডিঙোচ্ছি। প্রথমটা জঙ্গলে গাছগাছালি তত ঘন ছিল না। কিন্তু তারপরেই জঙ্গলে শুরু হয়ে গেল রোদের সঙ্গে ছায়ার লুকোচুরি খেলা। আমরা এতক্ষণ খুশিতে ডগমগ করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলুম। যদিও একনাগাড়ে এতখানি হাঁটার পর একটু একটু পা ব্যথা করছিল। কিন্তু একটু একটু পিছোতে লাগলুম। পিসেমশাই আমাদের দেখে কিছু বুঝতে পারলেন কী না জানি না, কিন্তু তিনি বারবার আমাদের লক্ষ করতে লাগলেন। শেষে জিগ্যেস করলেন, ‘পা ব্যথা করছে নাকি সব?’

মিতি তো খুব চালাক, তাই খুব ঝটপট উত্তর দিল, ‘না, না, পা ব্যথা করবে কেন? পিসিমাকে অনেকক্ষণ দেখিনি, তাই পিছিয়ে এলুম।’

পিসিমা হাসলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘খিদে পায়নি তো?’

আমরা প্রায় একসঙ্গেই বলে উঠলুম, ‘না না।’

কিন্তু পিসেমশাই একটু মুচকি হেসে বললেন, ‘আমার কিন্তু পাচ্ছে।’ পিসিমাও হাসতে হাসতে বললেন, ‘হাজারিবাগে এলেই তোমার ঘণ্টায় ঘণ্টায় খিদে পায়।’

‘আরে বাবা সেইজন্যেই তো আসা।’ বলে পিসেমশাই হো হো করে হেসে উঠলেন। আমরাও।

আমাদের হাসির রেশ থামতে পিসিমা জিগ্যেস করলেন ‘আর কতটা?’

পিসেমশাই বললেন, ‘আরে এসে গেল। খানিকটা।’

আমি, মিতি, রানি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলুম। বুঝতেই পারছ, আরও খানিকটা মানে আরও গভীর জঙ্গলে। সুতরাং আরও একটু পিছিয়ে এলুম আমরা তিনজনেই।

কিন্তু শেষমেশ যেখানে এসে আমরা থামলুম, তোমাকে বলব কী, জায়গাটা দেখে যেন ফুতকারে সব ভয়টয় কোথায় উড়ে গেল। কী সুন্দর! কী সুন্দর! দূরে ছোটো ছোটো টিলা। গাছে গাছে ছেয়ে আছে। চারদিকে সার সার শাল। মধ্যিখানে যেখানে পিকনিক হবে, যেন ঝরঝরে পরিষ্কার একটা চত্বর। তুমি অবাক হয়ে দেখবে খালি।

গাড়ি থেকে ঝটপট সব জিনিসপত্তর নামানো হল। চত্বরের একদিকে একটা গাছের নীচে শতরঞ্চি বিছিয়ে আমরা বসে পড়লুম। অন্য আর একদিকে ইট পেতে রান্নার উনুন বানিয়ে ফেলল মালি। কাছেই একটা তালাও মতো আছে, মালি সেখান থেকে জল নিয়ে এল। তারপর শুরু হয়ে গেল চা-জলখাবারের তোড়জোড়। পিসিমা আর মালির বউ দু-জনেই কোমর বেঁধে লেগে পড়লেন। আমরাও হাত লাগালুম। কিন্তু পিসিমা বললেন, ‘তোমরা আবার কেন? এই তো ক-টা লোকের খাবার। আমরাই পারব। তোমরা বরঞ্চ জলখাবার খেয়ে এদিক ওদিক একটু বেড়িয়ে এসো।’

সত্যি, জায়গাটা বেড়াবার মতোই। তবে, এখন একটু জিরিয়ে না নিলেই নয়। অনেকটা হাঁটা হয়েছে।

আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক বসে-গড়িয়ে আর জায়গা দেখতে দেখতে কেটে গেল। তারপর গরম গরম বেগুনি আর মুড়ি। খিদেও পেয়েছিল তেমনি। এখানকার মুড়ি অবিশ্যি আমাদের ওখানকার মতো অমন মুচমুচে না হলেও, খিদের মুখে দারুণ লাগল। ততক্ষণে শরীরটাও বেশ ঝরঝরে হয়ে গেছে।

আমরা উঠে পড়লুম। আমরা তিনজনে রানির পিসতুতো ভাই আর মালির ছেলেকে নিয়ে এদিক ওদিক দেখতে বেরোলুম। পিসেমশাই জিগ্যেস করলেন, ‘আমি যাব নাকি সঙ্গে?’

রানি বলল, ‘না, না, আমরাই পারব।’

‘বেশি জঙ্গলে ঢুকো না যেন।’ পিসেমশাই সাবধান করে দিলেন।

আমরা বললুম, ‘ওই টিলা অবধি যাব।’

‘পথটা চিনে রেখো।’

আমরা উত্তর দিলুম, ‘হরিশ তো সঙ্গে আছে।’

হরিশ মানে, মালির ছেলে। আমাদের থেকে একটু ছোটোই হবে। কিন্তু ভারি পুরুষ্টু চেহারা।

পিকনিকের জায়গাটা পেছনে ফেলে শালবনের ফাঁকে ফাঁকে আমরা চলেছি। ঝরাপাতার শব্দ উঠছে আমাদের পায়ে পায়ে। পাখিদের কলতান শুনছি গাছে গাছে। মিতি আনন্দে থেকে থেকে চিৎকার করে উঠছে। চিৎকার শুনে পাখির ঝাঁক ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে পালাচ্ছে। আর রানির পিসতুতো ভাই, চোখ বড়ো বড়ো করে আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে, ‘বেশি চেঁচামেচি কোরো না, বাঘ শুনতে পাবে।’

এতক্ষণ বেশ ছিলুম। বাঘের নাম শুনেই আমার বুকটা কেমন ছ্যাঁত করে উঠল। অথচ দ্যাখো, রানি কিংবা মিতি বাঘের কথাটা কানেই নিল না। সেই আগের মতোই মিতি ফুর্তিতে উছলে উঠছে।

রানির পিসতুতো ভাইয়ের ডাকনামটা ভারি অদ্ভুত, ফুং। বাবার একজন চিনদেশি বন্ধু আছে, তাঁর নামটাও ভারি মজার—ফিংচু ফিচুং। খুব ভালো লোক। কিন্তু শত চেষ্টা করলেও তুমি তাঁর নাকটি খুঁজে বার করতে পারবে না। একেবারে থ্যাবড়া। তবে ফুংয়ের সেসব নয়। ফুংয়ের নাকটি খাসা। টিকালো। টানা টানা চোখ। মাথা ভরতি চুল। ভীষণ বাহাদুর ছেলে। দ্যাখো, এই নির্জন আলো আঁধারি জঙ্গলেও সে নির্ভয়ে হরিশের সঙ্গে এগিয়ে এগিয়ে হাঁটছে!

হঠাৎ মিতি গান ধরল। ওর যে কী উচ্ছ্বাস, কী বলব। মেয়েটা ভীষণ আমুদে। লোকের পেছনে লাগাও একটু অভ্যেস আছে ঠিকই, তবে মনটা একদম সাদামাটা। তাই মেয়েটাকে আমার ভারি ভালো লাগে। ও মা! দ্যাখো, রানিও যে মিতির সঙ্গে গান ধরল। বা রে, বেশ মিষ্টি গলা তো!

এর আগে ওকে তো কখনো গাইতে শুনিনি। কীরকম চাপা মেয়ে দেখেছ! কেমন বোকা সেজে থাকে। চলো কলকাতায়, তারপর দেখবে মজা কাকে বলে।

দেখতে দেখতে টিলার কাছাকাছি আমরা পৌঁছে গেছি। দূর থেকে মনে হচ্ছিল টিলাগুলো কী আর এমন উঁচু। কিন্তু কাছাকাছি এসে দেখি, হেলাফেলা করার মতো মোটেই না। অথচ দ্যাখো, ওই একফোঁটা ছেলে ফুং ওপরে ওঠার জন্যে কেমন তরতরিয়ে পা ফেলে পাথর ডিঙোতে লাগল। আমি বাবা উঠছি না।

মিতি আমাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক দিল ‘কী রে ঝিলিক, উঠবি না?’

আমি বললুম, ‘না বাবা, দরকার নেই। শেষে পড়ে মরি আর কী।’

‘ভয় পাচ্ছিস?’ বলে মিতি হাসল। হাসতে হাসতে আমার হাত ধরে টান দিল।

আমিও যাব না, মিতিও ছাড়বে না। শেষে রানি বলল, ‘থাক থাক, ওর যখন ভয় করছে, জোর করিস না।’

মিতি আমার হাত ছেড়ে ঠাট্টা করে বলল, ‘তুই একটা রামভিতু।’

আমি উত্তর না দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। মিতি আর রানি এগিয়ে গেল টিলাটার দিকে।

উরিব্বাস! ফুং আর হরিশ কোথায় উঠে গেছে দ্যাখো! গাছের ফাঁকে মাঝে মাঝে ওদের দেখা যাচ্ছে। ওপর থেকে চেঁচাচ্ছে, শোনাই যাচ্ছে না। এদিকে মিতি আর রানিও বড়ো বড়ো পাথর খামচে ওপরে ওঠার জন্যে ধস্তাধস্তি করছে। আমি এইখানে একলাটি দাঁড়িয়ে মনে মনে ভাবতে লাগলুম, ‘এখন সত্যিই যদি বাঘ আসে!’

হঠাৎ চিৎকার। আমি চমকে উঠেছি। চকিতে ওপরে তাকিয়ে দেখি, হরিশ আর ফুং চেঁচাচ্ছে, আর টিলার ওপরে ঝোপঝাড় তোলপাড় করে পালাবার চেষ্টা করছে। হঠাৎ দেখি কী, ক-টা ধুমসো ধুমসো হনুমান ওদের তাড়া করেছে। আরও ক-টা রানি আর মিতির দিকে ধেয়ে আসছে। মিতি আর রানি একটা পাথরে আধঝোলা হয়ে চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিলে। পলকের মধ্যে কুরুক্ষেত্র শুরু হয়ে গেল।

আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারলুম না। ফুং আর হরিশের কী হল জানি না। ওরা একেবারে ওপরে। কিন্তু মিতি আর রানির ওই অবস্থা দেখে ছুটে গেলুম ওদের সাহায্য করতে। কিন্তু শেষ অবধি আমায় যেতে হল না। একটা হনুমান আমাকেই তেড়ে এল। আমি ‘বাপ রে, মা রে’ বলে মারলুম ছুট। কিন্তু পালাব কোথায়? জঙ্গলের গোলকধাঁধায় জট পাকিয়ে ছোটাছুটি করতে লাগলুম। তারপর একটা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়লুম। কিন্তু সেখানে আমি আর কোনো হনুমান দেখতে পেলুম না।

খানিক পরে আমি উঠে দাঁড়ালুম। তখনও আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। সেই অবস্থাতেই আমি ঝোপ ডিঙিয়ে বেরিয়ে এলুম। টিলাগুলো দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কোন পথ দিয়ে যে ওই টিলার কাছে যাব, সে পথ খুঁজে পাচ্ছি না। সামনে বড়ো বড়ো গাছ। খাদ। আমি আরও ভয় পেয়ে গেলুম। তাই ওখান থেকেই চিৎকার শুরু করে দিলুম, ‘হরিশ-শ-শ।’

কোনো উত্তর নেই।

অগত্যা আমি আবার চেঁচালুম, ‘রানি-ই-ই-ই, মিতি-ই-ই-ই।’

এবারও কোনো উত্তর পাওয়া গেল না।

ভয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পা ফেলার মতো যেখানেই জায়গা দেখতে পেলুম, সেইদিকেই পড়িমরি করে ছুটে পালালুম। পড়ে রইল সেই টিলা। পড়ে রইল জঙ্গল। এখন যেমন করে হোক আমাকে মানুষের সন্ধান করতে হবে। তাই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে লাগলুম, ‘আমাদের বাঁচাও-ও-ও! বাঁচাও-ও-ও!’ চেঁচাতে চেঁচাতে নাকাল হয়ে আমি হাঁপাতে লাগলুম। তারপর হঠাৎ আমি সত্যিই মানুষের কন্ঠস্বর শুনতে পেলুম। দূর থেকে অস্পষ্ট গলার স্বর ভেসে আসছে। আমার শিহরণ লাগল। অস্পষ্ট স্বরের দিকেই আমি ‘বাঁচাও-ও-ও! বাঁচাও-ও-ও!’ বলে ছুটতে লাগলুম। ঠিক এই সময়ে মনে হল, আমারই নাম ধরে কে যেন আমায় ডাকছে। আমি বুঝতে পারলুম এ আর কারও গলা নয়, পিসেমশাইয়ের। আমিও সাড়া দিলুম। তারপরে ওই দিকেই প্রাণপণে ছুটতে লাগলুম।

খানিক ছুটেই পিসেমশাইকে দেখতে পেয়েছি আমি। দেখেই আমার মাথাটা টলতে লাগল। আমার পা দুটোও দাঁড়াতে পারছে না। আমার শরীরের ভার আমি যেন আর বইতে পারছি না। আমি পড়ে গেলুম। তারপর আর কিছু জানি না।

যখন জ্ঞান ফিরল, চেয়ে দেখি ফুং আর হরিশ দু-জনেই শুয়ে-শুয়ে কাতরাচ্ছে। হাত-পা কেটেছে, মাথা ফেটেছে। রক্তে ভিজে গেছে জামা-প্যান্ট। মিতি আর রানি বোবার মতো চেয়ে চেয়ে আমায় দেখছে আর ভয়ে কাঁপছে। বুঝতেই পারছ, পিকনিকের আনন্দ তখন মাথায় উঠেছে। এক্ষুনি ফিরে যেতে হবে। ফুং আর হরিশের যা অবস্থা! কী জানি কী হয় ছেলেদুটোর। কাজেই লটবহর নিয়ে আমরা ফিরে এলুম বাড়িতে। হরিশ আর ফুংকে হাসপাতালে ভরতি করতে হল। অবিশ্যি ক-দিন পরেই ভালো হয়ে ওরা বাড়িতে ফিরে এসেছিল। আমাদের দুঃস্বপ্নও কাটল। আমরাও মানে মানে কলকাতায় ফিরে এসেছিলুম।

বাব্বা। খুব বেঁচে গেছি! তখন সেই অমন সাংঘাতিক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া মানে, নেহাত কপাল জোর। কিন্তু এবার যে কী হল। একটা তুচ্ছ মামুলি ঘটনায় আমার পা-টা ভেঙে বসলুম। তবে এখন আমি অনেকটা ভালো আছি। কথা আছে দু-সপ্তাহ পরে ডাক্তারবাবু আমার প্লাস্টার কাটবেন। দু-সপ্তাহ হয়ে গেছে। কথা ছিল সেই সময় ব্যাঙ্গালোর থেকে বাবা আসবেন। বাবা ঠিকই এলেন। কিন্তু আমার প্লাস্টার তখনও কাটা হল না। কারণ, হঠাৎ কী একটা জরুরি কাজে ডাক্তারবাবু বাইরে গেছেন। অবশ্য ফিরে আসতে তাঁর বেশিদিন লাগল না। চারদিন পরেই তিনি এলেন। কিন্তু এদিকে বাবার ছুটিও ফুরিয়ে এল। বাবা মাত্র সাত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলেন। যাই হোক, বাবা থাকতে থাকতেই অবশ্য আমার প্লাস্টার কাটা হল। এক্সরে হল। ডাক্তারবাবু দেখে বললেন, হাড় জুড়েছে। আমি ভালো আছি। ভালো যে আছি সে তো আমি নিজেও বুঝতে পারছি। কারণ, এখন আমি কাজের দিদির সাহায্য না-নিয়েই একটু একটু হাঁটতে পারি। একা একা বারন্দাটায় গিয়ে দাঁড়াতে পারছি। বাবা ব্যাঙ্গালোর থেকে আমার জন্যে সুন্দর একটা চপ্পল এনেছেন। সেটা মাঝে মাঝে পায়ে দিচ্ছি, হাঁটছি। আমার কিছু অসুবিধে হচ্ছে না। চপ্পলটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। সে চপ্পল তুমি এখানে কারও পায়ে দেখতে পাবে না। আমি যখন পায়ে দিয়ে রাস্তায় হাঁটব, তুমি দেখলে চোখ ফেরাতেই পারবে না। তা এখন তো আর রাস্তায় হাঁটার কোনো কথা ওঠে না, তাই ঘরেই পায়ে দিচ্ছি। একটু একটু এ ঘর ও ঘর করছি। আমার মা থেকে থেকে সাবধান করছে, ‘দেখিস, পড়িস না যেন। এবার পড়লে খোঁড়া হয়ে থাকতে হবে চিরদিন।’

প্লাস্টার কাটার পর থেকে দেখেছি, আমার বাঁ-পাটা একটু রোগা হয়ে গেছে। তবে ডাক্তারবাবু বলেছেন, ও ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক না হলে কী বিচ্ছিরি কান্ড বলো! আমার এক পা মোটা, এক পা সরু! ইস!

বাবা ছুটি ফুরোতেই চলে গেলেন। আরও ক-টা দিন পর দিদির কাঁধে হাত রেখে আমিও সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতে লাগলুম। ওঠা-নামা করতে ডাক্তারবাবুই বলেছেন। ঘরে আর একদম মন বসছে না। ইশকুলে যাইনি কতদিন। অন্তত পূজোর ছুটির আগে যদি ক-দিনের জন্যেও ইশকুলে যেতে পারি! তা আর হয়তো হবে না। আমাকে হয়তো বারান্দায় বসে বসেই এবার পুজো দেখতে হবে।

কে মাউথঅর্গান বাজাচ্ছে রে রাস্তায়! বা রে! বেশ বাজাচ্ছে তো! আমি শুনতে শুনতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। চেয়ে দেখি, সামনে, ওই এদিকে যে ফ্ল্যাট বাড়িটা তৈরি হচ্ছে, সেই বাড়ির একতলার বারান্দার নীচে একটা ছেলে বসে আছে। সেই মাউথঅর্গান বাজাচ্ছে। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। সঙ্গে একটা বোঁচকাও আছে। যা সাজ পোশাক, কহতব্য নয়। ছেঁড়া, নোংরা। ফুটো জামার ভেতর দিয়ে হাড় ক-খানা মাঝে মাঝেই উঁকি মারছে। তেমনই মাথাখানা। একঝাঁক চুলে তেল না পড়লে যা হয়। একেবারে রুক্ষ। বোঝাই যাচ্ছে চেয়েচিন্তে চলে আর কী! কিন্তু যাই বলো, মাউথঅর্গানটা ও বাজাচ্ছে দারুণ। আমি বারান্দা থেকে আর নড়তে পারলুম না। ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলুম। আর মনে মনে ভাবলুম, রাস্তার অমন একটা হেঁজিপেঁজি ছেলে যা পারে, আমি তো তা পারি না। সত্যি, ওর যদি সামর্থ্য থাকত, ও না জানি আরও কত ভালো বাজাতে পারত। আমার কেমন যেন মায়া হল ছেলেটার জন্যে। আমি দিদিকে ডাক দিলুম, ‘দিদি।’

দিদি এল।

আমি একটা টাকা দিদির হাতে দিলে বললুম, ‘দিদি, এই টাকাটা ওই ছেলেটাকে দিয়ে আসবে?’

‘এক টাকা!’ দিদি অবাক হল।

আমি বললুম, ‘ছেলেটা কী সুন্দর বাজাচ্ছে শোনো।’

দিদি বলল, ‘একবার লোভ দেখালে কিন্তু পেয়ে বসবে। বারবার চাইবে।’

আমি উত্তর দিলুম, ‘বারবার চাইলে আমিও বারবার ওর বাজনাটা শুনতে চাইব।’

দিদি আর কথা বাড়াল না। চলে গেল। আমিও বারান্দায় উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। দেখলুম, দিদি ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ছেলেটা বাজনা থামাল। দিদি টাকাটা ওর হাতের দিকে বাড়িয়ে দিল। ছেলেটা হাসল। এত জোরে হাসল যে, সে হাসি আমিও শুনতে পেলুম। আমি দেখলুম, টাকাটা সে নিল না। দিদি ফিরে এল।

‘কী হল?’ আমি অবাক হলুম।

দিদি বিরক্ত হয়েই বলল, ‘তোমারও যেমন। আমি শুধুমুধু হেনস্থা হলুম। নেবে না।’

‘কেন?’

‘ছেলেটা বলল, ও ভিখিরি নয়। ভিক্ষে করা ওর ব্যাবসা নয়।’

বলে দিদি আমার হাতে টাকাটা গুঁজে দিয়ে নিজের কাজে চলে গেল।

পরের দিন সকালে একটা ভীষণ কান্ড হয়ে গেল। আমার সেই চপ্পলটা পাওয়া যাচ্ছে না। তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছু কূল-কিনারা করা গেল না। দিদি খুঁজছে, মা খুঁজছে আমিও খোঁড়া পায়ে এখানে ওখানে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু থাকলে তবে তো! আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি চপ্পলটা বাক্সে পুরে সিঁড়ির ধারে, জুতো রাখার জায়গায় রেখে দিয়েছিলুম। ওখান থেকে যাবে কোথায়? ইস, আমার অমন সুন্দর জুতোটা। আমি প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলুম। তা হলে কি চুরি হয়ে গেল! কতদিন এসেছি এখানে। একটা কুটো পর্যন্ত চুরি যায়নি আমাদের ফ্ল্যাট থেকে। আর আজই গেল। তাও, গেল গেল আমারই চপ্পলটা!

আজ একবারও মাউথঅর্গানের শব্দ পেলুম না। রোজ সকাল থেকেই তো প্যাঁ ধরে। আজ কী হল তার! ছেলেটা নেই নাকি! দেখি তো। আমি বারান্দায় গিয়ে উঁকি মারলুম। না তো ছেলেটা তো কোথাও যায়নি। ওই তো আছে। বোঁচকাটা খুলে ঝড়তিপড়তি কী সব ঘাঁটাঘাঁটি করছে। হঠাৎ আমি চমকে উঠলুম। ওইটা কী রে! আমার জুতোর বাক্সটা না? তাই তো? ওখানে কী করে গেল? তা হলে নিশ্চয়ই ছেলেটা চুরি করেছে। দ্যাখো বাক্সটা কেমন লুকিয়ে রেখেছে। ভাবছে, কেউ বুঝি দেখতে পাবে না। এদিকে বড়ো বড়ো কথা, ‘আমি ভিখিরি নই।’ ভিখিরি তবু ভালো। কিন্তু তুই তো চোর। এখনই তোমার ব্যবস্থা হচ্ছে। এখনই একটা কিছু করতে হয়। কিন্তু কী করা যায়! দিদিকে বললে, আর দেখতে হবে না। এমন চেঁচামেচি শুরু করে দেবে যে, বাড়িতে কাকপক্ষীটি পর্যন্ত বসতে পারবে না। আর সেই চেঁচামেচি শুনে চোর কী আর তোমাকে ধরা দেবার জন্যে হাত বাড়িয়ে বসে থাকবে! না, দিদিকে বললে হবে না। যা কিছু করতে হবে সব আমাকেই। একটা টাকা দিতে গেলুম, পছন্দ হল না। এখন জুতোটাই সরিয়ে বসে আছে! কী নচ্ছার! কী নচ্ছার!

দুপুরবেলা কাজ টাজ শেষ করে দিদি রোজকার মতো শুয়ে পড়ল। শুয়ে পড়ল বলি কেন, বলি ঘুমিয়ে পড়ল। আমিও নি:সাড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। তাকিয়ে দেখি, ছেলেটা বোঁচকাটা মাথায় দিয়ে দিব্যি ঘুমোচ্ছে। আর ওর কোলের কাছে আমার সেই জুতোর বাক্সটা। কীরকম সেয়ানা দেখেছ! কেমন লুকিয়ে রেখেছে। ভেবেছে কেউ দেখতে পাবে না। এই তাল। দিদি ঘুমোচ্ছে। কেউ কোথাও নেই। ছেলেটাও ঘুমে নেতিয়ে পড়েছে। আমি বারান্দা থেকে ঘরে এলুম। বাইরের দরজাটা খুব সাবধানে খুলে ফেললুম। বাইরে বেরিয়ে একটি পা ফেলে সিঁড়ি ভেঙে নীচে নামলুম। পা ভাঙার পর এই প্রথম একা একা সিঁড়ি ভাঙছি। একটুও পায়ে ব্যথা লাগল না। এই রে যা:, ফ্ল্যাটের দারোয়ান দেখে ফেলেছে। একবারে আচমকা জিগ্যেস করে বসল, ‘কী দিদি, একা একা সিঁড়ি দিয়ে নামলে? পা ভালো হয়ে গেছে? কুথা যাচ্ছ?’

আমি দারোয়ানকে দেখে থতমত খেয়ে গেছি। কী বলি, কী বলি ভাবতে ভাবতেই বলে ফেললুম, ‘না, যাইনি কোথাও। এই একটু—’ বলেই আমি ভাঙা পায়ে যতটা জোরে পারি রাস্তা টপকে ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। হ্যাঁ, অকাতরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা। বাক্সটা কোলের কাছে পড়ে আছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিলুম। জানতেই পারল না। তারপর জুতোর বাক্সটা হাতে নিয়ে উত্তেজনায় প্রায় কাঁপতে কাঁপতেই আমি ফ্ল্যাটে ফিরে এলুম। বাইরের দরজাটা বন্ধ করে দিদির ঘরে উঁকি মারলুম। দিদি তখনও চোখ বুজে দিব্যি নাক ডাকাচ্ছে। তারপর হন্তদন্ত হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে জুতোর বাক্সটা খুলে ফেললুম। খুলেই আমি হকচকিয়ে গেছি। এ কী! এ জুতো তো আমার নয়! জুতোর কথা তো পরে। জুতো তো বাক্সের ভিতরে। বাক্স না খুললে জুতো তোমার কি আমার কেউ বলতে পারে না। কিন্তু বাক্সর ওপরটা দেখে আমার ঘুণাক্ষরেও একবারও মনে হল না, আমার জুতার বাক্সটার সঙ্গে এই বাক্সটার কোনো মিল নেই! ইস কী লজ্জা! এখন আমি কী করব? এখন যে আমি নিজেই ওই ছেলেটার কাছে চোর হয়ে গেলুম।

আমি আবার বারান্দায় গেলুম। উঁকি মারলুম। না, এখনও ঘুম ভাঙেনি ছেলেটার। মনে হল, এই সুযোগ। দিদি এখনও ঘুমোচ্ছে। অন্তত আমাকে চোর বদনাম দেবার আগে, আবার নীচে, ওর কাছে গিয়ে চুপিসারে এই বাক্সটা আমি রেখে দিয়ে আসতে পারি। সেই ভালো। আমি জানি, বারবার এই ভাঙা পায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করা ঠিক না। তবুও উপায় নেই। না, আর দেরি করা ঠিক নয়। আমি যাই।

টুং টাং।

কলিংবেল বাজল হঠাৎ। আমার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। কে এল এই অসময়ে? আমি চট করে জুতোর বাক্সটা খাটের নীচে লুকিয়ে ফেললুম।

টুং টাং।

আবার বাজল। আমি দরজার সামনে এগিয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘কে?’

‘চিঠি।’ উত্তর পেলুম বাইরে থেকে।

মুহূর্তে আমার মনটা উছলে উঠল। এ নিশ্চয়ই বাবার চিঠি। আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলে হাত বাড়ালুম। হায় রে, কই বাবার চিঠি! এ তো ইলেকট্রিক বিল। সত্যি, কী অবস্থা। এই বিলটা দেওয়ার জন্যে পিয়ন আর আসার সময় পেলেন না!

পিয়ন চলে গেলেন। আমিও বিলটা রেখে দিলুম। মা এসে দেখবে। তারপর আবার খাটের নীচের থেকে জুতোর বাক্সটা বার করার জন্যে হেঁট হয়ে হাত বাড়ালুম। আর বলব কী, ঠিক তক্ষুনি কে ডাকল, ‘বাড়িতে কে আছেন?’

আমি চমকে উঠলুম। ঘর থেকে উঁকি মেরে দেখি, বাইরে একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে। কাঁধে ব্যাগ। জুতোর বাক্স আর বার করা হল না। খোঁড়া পায়ে যতটা সম্ভব ততটা জোরেই আমি দরজার কাছে এগিয়ে এলুম। আমি কিছু জিগ্যেস করার আগেই তিনি বললেন, ‘বাড়িতে মা আছেন?’

‘না, মা অফিসে।’ আমি উত্তর দিলুম।

‘ও।’ বলে তিনি একটু নিরাশ হয়ে আমার মুখের দিকে চাইলেন। তারপর শুরু করলেন, ‘আমার কোম্পানি সস্তায় খুব ভালো একটা পাউডার বাজারে ছেড়েছে।’ বলতে বলতে একটা রংচঙে কৌটো বার করে আমার নাকের সামনে ধরলেন। ধরে বলেন, ‘এ-পাউডারে কী না সারে। ঘামাচি থেকে শুরু করে খোস-পাঁচড়া, নানা চর্মরোগ সব। নানা সাইজের কৌটোতে নানা গন্ধে ভরপুর রোজ, জেসমিন।’

‘মা তো এখন নেই।’ তার কথা শেষ হবার আগেই আমি বললুম তিনি থামলেন না, ‘দাম যে খুব বেশি, তা নয়।’

আমি আবার বললুম, ‘মা নেই, আমি কিছু বলতে পারব না।’

কিন্তু ভদ্রমহিলা নাছোড়বান্দা। একটা কৌটো নেড়ে খানিকটা পাউডার আমার গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘এর গন্ধটা তুমি দ্যাখো কী চমৎকার। এটা লেমন।’

আমি তো আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়লুম। বললুম। ‘দেখুন, মা নেই, আমার কাছে টাকা-পয়সাও নেই। গন্ধ পছন্দ হলেও তো আমি নিতে পারব না।’

তিনিও ছাড়বেন না, ‘বেশি দাম তো নয়। দশ টাকা। তার ওপর আমার কাছ থেকে নিলে তুমি দু-টাকা ছাড় পাবে।’

আমি এখন ছাই ভুল করে অপরের জুতো হাতিয়ে নিস্তার পাওয়ার পথ খুঁজছি, আর ঠিক এই সময়ে কোত্থেকে এক পাউডার আমায় বিপদে ফেলল। আমি তাই এবার বিরক্ত হয়েই উত্তর দিলুম, ‘আমি তো বলছি, আমার কাছে টাকা-পয়সা নেই। আমি কিনতে পারব না। তবু কেন আপনি এক কথা বারবার বলছেন। আপনি মা থাকলে আসবেন।’

‘আসলে কী জানো,’ তিনি আবার বলতে শুরু করলেন। আর ঠিক এই সময়ে দিদির ঘুমও গেল ভেঙে। দিদি ও-ঘর থেকে চেঁচিয়েই জিগ্যেস করল, ‘দিদিমণি, কার সঙ্গে কথা বলছ?’ বলতে বলতে পড়িমরি করে ছুটে এল। ব্যাস, আমারও হয়ে গেল। এই যে দিদির ঘুম ভাঙল এখন চলল সেই রাত্রির এগারোটা পর্যন্ত। সুতরাং, আমারও জুতোর বাক্স ছেলেটাকে পৌঁছে দেওয়া ঘুচে গেল।

ভদ্রমহিলা দিদিকে দেখে আবার পাউডারের কৌটো নিয়ে নতুন করে শুরু করলেন। দিদি তখন আমাকে দেখিয়ে উত্তর দিল, ‘দেখুন, বাড়িতে এই মেয়েটাকে একা নিয়ে আমি আছি। যিনি কিনবেন, তিনি অফিসে। আপনি ছুটির দিনে আসবেন।’

অগত্যা ভদ্রমহিলা কী করেন, কাঁধের ব্যাগে কৌটোটা ঢুকিয়ে পিছু হাঁটলেন।

কিন্তু এদিকে আমার কী অবস্থা। দিদি বাইরের দরজাটা বন্ধ করে আমাকে একচোট বকাবকি করল। বলল, ‘আমাকে না জিগ্যেস করে কখনো দরজা খুলো না। আজকাল, জানো এইসব ফ্ল্যাটবাড়িতে কত কী কান্ড হয়ে যাচ্ছে? কখন কী বিপদ হয়, কে বলতে পারে!’

আমি চুপ করে রইলুম। মনে মনে ভাবলুম, অন্যে আর কী বিপদ ঘটাবে! আমি নিজেই আমার এমন বিপদ ঘটিয়ে বসে আছি যে, সে কথা কাউকে বলতেই পারছি না। এখন দিদি উঠে পড়েছে। মানে, আমার বাইরে গিয়ে ছেলেটাকে জুতোর বাক্সটা দিয়ে আসার মতলবটাও এখনকার মতো খারিজ করতে হচ্ছে। এখন শুধু আমার একটাই কাজ, জুতোর বাক্সটা খাটের নীচের থেকে বার করে অন্য কোথাও লুকিয়ে রাখা। কেন না, দিদির নজরে পড়ে গেলে, তখন আর দেখতে হবে না। বাড়ি মাথায় করবে। কিন্তু বললেই তো আর খাটের নীচের থেকে বার করতে পারছি না। দিদি তো এ-ঘর ও-ঘর করতে শুরুই করে দিয়েছে। আমি বার করতে গেলেই ধরা পড়ে যাব। আর ধরা পড়লে বুঝতেই পারছ, তুলকালাম কান্ড ঘটে যাবে। আমি একা একা রাস্তায় গেছি, জানতে পারলেই দিদি মা-কে বলবে। তারপর মায়ের কাছে বকুনি! সুতরাং, খাঁড়াটা এখন মাথার ওপর ঝুলেই রইল। হঠাৎ রাস্তায়, ঠিক এই সময়ে ঝালমুড়িওলা হেঁকে উঠল, ‘ঝালমুড়ি-ই-ই-ই।’

এই সুযোগ। একেবারে সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। দিদিকে একটু আবদারের সুরে বললুম ‘দিদি, ঝালমুড়িওলা যাচ্ছে।’

দিদি বলল, ‘লোকটা ঠকায়। এক টাকায় এই ক-টা দেয়।’

আমি বললুম, ‘তুমি যার কথা বলছ, গলা শুনে মনে হচ্ছে, এ মুড়িওলা সে মুড়িওলা নয়।’

দিদি বারান্দা দিয়ে উঁকি মারল। আমিও এই ফাঁকে আর একবার ছেলেটাকে দেখে নিলুম। এখনও ঘুমোচ্ছে। দিদি বারান্দা থেকে ডাক দিল, ‘ও মুড়িওলা, দাঁড়াও।’

আমি যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেললুম, ‘আঃ’।

দিদি দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

আমিও সঙ্গে সঙ্গে খাটের তলা থেকে বাক্সটা বার করে, খাটের ওপর ভাঙা পায়ে একটু কষ্ট করে দাঁড়িয়ে, আলমারির মাথায় পাচার করে দিলুম।

কিন্তু এ কী, পাচার করতে গিয়ে আমার হাতে কী যেন ঠেকল। হাত বাড়িয়ে আমি তো তাজ্জব বনে গেলুম। আরে, ওই তো আমার আসল চপ্পলের বাক্স। আমি যেন ভূত দেখলুম। এখানে কী করে এল? আমি তো রাখিনি। তা হলে কি মা রেখেছে। নাকি দিদি! না, এখন কাউকে কিচ্ছু বলা নয়। আগে, এইটা যার বাক্স তাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসি, তারপর তোমাদের হচ্ছে।

যাই হোক, আজ আর কোনো ক্রমেই যাওয়া যাবে না। কেন না, আমাদের মুড়ি খাওয়া শেষ হতে-না হতেই মা এসে পড়ল অফিস থেকে। ঠিক আছে। আজ রাতটা কাটুক। কাল মা অফিসে যাক। দিদি দুপুরে ঘুমোক তারপর যা করার করব আমি। তবে হ্যাঁ, মনটা আমার এই মুহূর্তে বেশ ভালো লাগছে। কেন না, বাবার দেওয়া চপ্পলটা আমার চুরি যায়নি, বাড়িতেই আছে, যাক, তবু একদিকে তো বাঁচোয়া।

পরের দিনে সকাল থেকে কতবার যে আলমারির মাথাটা উঁকি মেরে মেরে দেখলুম, সে তোমাকে কী বলব। মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়েও দেখেছি ছেলেটাকে। আছে। তবে কাল থেকে সেই যে তার মুখের বাজনাটা বন্ধ হয়েছে আর বাজেনি। এদিকে কিন্তু বোঁচকা মাথায় দিয়ে ছেলেটা কখনো শুচ্ছে, আবার কখনো উঠে বসছে। তা এখন সকালে যা ইচ্ছে করুক। দুপুরে একটু ঘুমলেই বাঁচি।

মা অফিসে বেরিয়ে গেলেন। আমাকে খাইয়ে দিদিও খাওয়াদাওয়া সারল। আমি লোক দেখানো বিছানায় শুয়ে পড়লুম। দিদিও পাশের ঘরে রোজকার মতো ঘুমিয়ে পড়ল। আমিও চুপিচুপি উঠে পড়লুম। বারান্দায় গেলুম। উঁকি মারলুম। আঃ! ছেলেটা ঘুমোচ্ছে! আমি আবার খাটের ওপর দাঁড়িয়ে বাক্সটা টেনে পেড়ে নিলুম। আমার বুকের ভেতরটা কী ভীষণ ধড়ফড় করছে। কী সাংঘাতিক উত্তেজনা। আমি বাইরের দরজাটা নি:সাড়ে খুলে ফেললুম। বাক্সটা শক্ত করে হাতে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামলুম। কী ভাগ্য, আজ দারোয়ান নেই। হয়তো খেতে গেছে। আনন্দে আমার যেন হাঁপ ধরে যাচ্ছে। আমি সত্যি সত্যি হাঁপাচ্ছি। হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তা পেরিয়ে ওধারে পৌঁছে গেছি। ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। না, সেও ঘুমোচ্ছে। তার কোলের কাছে আলতো করে বাক্সটা রাখলুম। টের পেল না। আশেপাশে কেউ দেখে ফেলল কি না একবার দেখে নিলুম। না, কেউ দেখেনি। তারপর পিছু ফিরলুম। বুঝতে পারছি, আমার সারা শরীর কাঁপছে। আমি হাঁটছি। তবু যেন মনে হচ্ছে, আমার পা চলছে না। সেই অবস্থাতেই আমি ফ্ল্যাটে ফিরে এলুম। ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলুম। তারপর নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় লুটিয়ে পড়লুম। মনে হল, আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। একটু পরে আমিও ঘুমিয়ে পড়লুম।

অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছিলুম আমি সেই দুপুরে। যখন ঘুম ভাঙল দেখলুম দিদি উঠে পড়েছে। আর একটু পরে মা আসবেন। মা আসুন, তারপর মজা শুরু হবে।

দেখি তো, ছেলেটা এখনও ঘুমোচ্ছে কি না!

এ কী! ছেলেটা তো নেই! তার বোঁচকাটাও নেই! নিশ্চয়ই চলে গেছে। হ্যাঁ, গেছে হয়তো আর এক জায়গায়। এই তো ওদের দস্তুরি। যাক বাবা, আমি তো বেঁচেছি। এখন তো আমায় কেউ চোর বলতে পারবে না।

মা এইমাত্র অফিস থেকে এলেন। সঙ্গে সঙ্গে কিছু না বলাই ভালো। আগে একটু ঠাণ্ডা হয়ে চা-টা হোক, তারপর বলা যাবে।

খানিক পরে মা-ই এলেন আমার কাছে।

আমিও সঙ্গে সঙ্গে দিদিকে ডাক দিলুম।

দিদিও এল।

মা জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার বল তো?’

আমি বেশ গম্ভীর চালে দিদিকে হুকুম করলুম, ‘আলমারির মাথায় হাত দিয়ে দ্যাখো তো, কিছু পাও কি না?’

দিদি বলল, ‘ওখানে আবার কী থাকবে?’

মা একবারে যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠে চেঁচিয়ে বললেন, ‘ওমা, তাই তো তোর জুতোটা তো আমিই ওখানে রেখেছি।’ বলে, লজ্জায় একেবারে আধখানা হয়ে দাঁতের গোড়ায় জিভ ঠেকিয়ে চুকচুক করতে লাগলেন।

দিদি আনন্দে তিড়িং করে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে, আলমারির মাথায় হাত বাড়িয়ে বলল, ‘তাই নাকি! কই, দেখি, দেখি।’

বলতে বলতেই দিদি বাক্সটা পেড়ে নিল। খুলে ফেলল। তারপরেই সব অন্ধকার। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি জুতোর দিকে। মা আর দিদি নির্বাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে জুতোটা দেখে।

এ জুতো আমার নয়। আমি আবার ভুল করেছি। এ তো সেই ছেলেটার জুতো! তবে কি আনন্দের উত্তেজনায় আমার চপ্পলের বাক্সটা ওর সঙ্গে বদলাবদলি হয়ে গেল! ইস, ছি: ছি:! আমি এবারও বাক্সটা ভালো করে না দেখে বোকারামের মতো আমার চপ্পলটাই ওকে দিয়ে এলুম! এখন কী হবে? ছেলেটা যে কখন চলে গেছে, আমি জানিই না। যাবেই তো, অমন একটা দামি চপ্পল পেলে কে আর এখানে বসে বসে মাউথঅর্গান বাজায়!

মা-ও অবাক। জিগ্যেস করল, ‘এ কার জুতো তোর ঘরে ঢুকল? আমার বেশ মনে পড়ছে, তো চপ্পলের বাক্সটা আমিই আলমারির মাথায় রেখেছিলুম। সেটা গেল কোথায়? এটা এল কোত্থেকে?’

দিদি বলল, ‘বাড়িতে ভূত ঢুকেছে বোধহয়! ভুত এখন ভেলকি দেখাচ্ছে। আরও কত কী দেখাবে।’

আমি মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করলুম না। যেন কিচ্ছু জানি না। চুপচাপ বসে রইলুম। কথা বললে যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলি। বোকার কথা না বলাই ভালো। সত্যি আমাকে বোকা ছাড়া আর কী বলবে তোমরা? ছি:!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%