শৈলেন ঘোষ
কতদিন পর আজ রোদ উঠেছে। আজ মোমপার খুব ভালো লাগছে। খুশিতে মনটা ঝলমলিয়ে উঠেছে তার। রোদ আরও উঠলে পাহাড়ের মাথায় বরফ গলে গলে পড়বে। আকাশের নীল তার ওপর ছায়া ফেলবে। দেখতে দেখতে হাসবে মোমপা। হাসতে হাসতে চোখ দুটি তার ডুবে যাবে। গাল দুটি টোল খাবে। তখন কী সুন্দর দেখতে লাগবে পাহাড়ি ওই ছোট্ট ছেলে মোমপাকে!
সে তখন ঘরের জানলা খুলে ফেলবে। রোদ ছড়িয়ে পড়বে ঘরে। জানলায় মুখ বাড়িয়ে সে তখন ডাক দেবে, মুনমুন-ন-ন।
অমনি ঘণ্টা বাজবে টুনটুন-ন-ন।
মোমপার বন্ধু মুনমুন। একটা ঘোড়া। তার গলায় ঘণ্টা। আজও তার ঘণ্টা বাজছে। এখনও। আজ রোদ উঠেছে যে। তার গলাটা জড়িয়ে ধরল মোমপা। লাফিয়ে উঠল তার পিঠে। ছুট দিল পাহাড়ের পাথর ডিঙিয়ে সামনে।
ঠিক তখনই কে যেন ঘর থেকে চেঁচিয়ে ডাকল, ‘মোমপা-আ-আ!’
মোমপা সাড়া দিল, ‘আসছি-ই-ই।’
একটি বুড়োমানুষ ব্যস্ত হয়ে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকলেন। মোমপার বুড়োদাদু। চেঁচালেন, ‘যাসনি-ই-ই।’
কে শুনবে দাদুর মানা। মোমপা তখন অনেক দূরে চলে গেছে মুনমুনের পিঠে চড়ে।
দাদু ভয় পেলেন। হয়তো ছুটতেন মোমপাকে ধরবার জন্যে। কিন্তু ছুটবেন কেমন করে। দাদুর যে একটা পা নেই। মানুষটা কাঁপতে লাগলেন ঠকঠক করে। খানিকটা শীতে। অনেকটা ভয়ে।
পাথর কাটার কাজ করতেন বুড়োদাদু। পাহাড়ের ওপর পাথর কেটে রাস্তা তৈরির কাজ। একদিন রাস্তা কাটতে কাটতে পা পিছলে গেল। কত উঁচু থেকে পড়ে গেলেন দাদু। নীচে, খাদে। বেঁচে গেলেন। পা-টা চলে গেল চিরদিনের মতো। এখন ছেলেটার মা-বাবা দু-জনেই গেছেন বাইরে। কাজে। দাদুর জিম্মায় রেখে গেছেন নাতিকে। ভয় লাগে তাই। ছেলেটাও যদি ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ছুটতে কোনো বিপদ ঘটিয়ে বসে!
কিন্তু দাদুর আজকের ভয়টা অন্যরকম? অন্যরকম? কীসের ভয়?
একটু পরেই তা জানতে পারবে।
এখন ছুটবে মোমপা ঘোড়ার পিঠে। খুশিতে দুলবে। আর গান গাইবে।
পাহড়ে এখন কুয়াশা নেই একফোঁটা। কত রোদ। অথচ জনমনুষ্যি পথে বেরোয়নি। কেন? অবাক লাগছে মোমপার।
‘মোম—’ হঠাৎ যেন কে ডাকল তাকে! থমকে দাঁড়াল মোমপা ঘোড়ার গলা জড়িয়ে। পিছু ফিরে দেখল। কই? কেউ তো নেই। আবার চলল।
না, যেতে পারল না। আবার ডাকল সে। ‘মোম, যাসনি, ধরে নিয়ে যাবে।’
এবার মোমপা স্পষ্ট বুঝল, এ তার বন্ধু চুংলির গলা। ঘরের ভেতর থেকে চেঁচাচ্ছে। তাই মোমপা জিগ্যেস করল, ‘কে ধরে নিয়ে যাবে?’
উত্তর এল, ‘সেপাই।’
মোমপা বলল, ‘তোরা বড্ড ভিতু! ভয় পাস কেন সেপাইকে? সেপাই কি জুজু। তুই যাবি তো আয় আমার সঙ্গে। দ্যাখ, কেমন রোদ উঠেছে। এমন রোদ কতদিন ওঠেনি। কী মিষ্টি!’ বলে আবার চলল মোমপা ঘোড়ার পিঠে। আবার বেজে উঠল টুংটাং ঘণ্টা ঘোড়ার গলায়। আবার গান ধরল মোমপা গলা ছেড়ে। এগিয়ে চলল।
কোথায় যাচ্ছে সে? এদিকে তো কোনোদিন আসেনি। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল দাদুকে। দাদু একা আছেন বাড়িতে। কোথাও বোরোতে পারেন না। নিশ্চয়ই ভাবছেন! তিনিই তো বুকে করে মানুষ করেছেন ছেলেটাকে। পাহাড়ের পাথরের মতো শক্ত করেছেন। পাহাড়ের গায়ে চড়ানো গুঁড়ো গুঁড়ো বরফের মতো নরম করেছেন। তাই, মোমপার মনে হয়, দাদুর বুকটা যেন স্বপ্ন দিয়ে গড়া এক ভালোবাসার দেশ।
সত্যিই তো কোথায় চলে এসেছে সে! এ যে এক ঘন বন! বড়ো-বড়ো গাছগুলো মাথায় মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। এদিকটা একেবারেই যে অচেনা মোমপার।
না, ভয় নেই মোমপার। মনে হচ্ছে, বনের আরও গভীরে চলে যায় সে। মনে হচ্ছে, লাফিয়ে পড়ে নীচে, পাহাড়ের খাদে। না, পাহাড়ের খাদে সে লাফ দিল না। তার ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফ দিয়ে সে নেমে পড়ল। ঘোড়াকে বলল, ‘তুই দাঁড়া, আমি একটু এদিক-ওদিক দেখি।’
আঃ! ঘোড়ার গলার ঘণ্টা বাজে টুংটাং। শিরশিরে হাওয়ায় ঝুরঝর শব্দ। আর থমথমে বনের ছমছমে রূপ দেখতে দেখতে এগিয়ে যায় মোমপা। অবশ্য বেশি দূর যেতে হল না। খানিক গিয়েই সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ যেন কীসের একটা শব্দ তার কানে এল! কে যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে পাথর ডিঙোচ্ছে। কে উনি?
হ্যাঁ, ঠিক তা-ই। ওই তো, একজন আহত মানুষকে পিঠে নিয়ে হেঁটে চলেছে! ছুটে গেল মোমপা। জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’
লোকটা উত্তর দিল না। দাঁড়াল। মোমপার মুখের দিকে চেয়ে দেখল মুহূর্ত। আবার চলল। বনের ভেতর উঁচু রাস্তা। এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ওপর পা ফেলে সে হাঁটছে, সেই আহত মানুষটাকে পিঠে নিয়ে। কী কষ্ট তার! সেই দৃশ্য দেখে কষ্ট হয় মোমপারও।
তার পিছুপিছু খানিক এসে মোমপা জিগ্যেস করল, ‘তোমরা কারা?’ আহত মানুষটাকে সে এবার কাছ থেকে দেখল। রক্তে ভিজে গেছে গায়ের জামা!
এবারও উত্তর পেল না মোমপা।
ব্যস্ত হয়ে উঠল মোমপা ওই রক্ত দেখে। তাই আবার জিগ্যেস করল, ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ?’
এবার লোকটা দাঁড়াল। হাঁপাচ্ছে। বলল, ‘আমরা রাজার সেপাই। একটু জল এনে দেবে?’
ছুটে গেল মোমপা এদিক-ওদিক। না জল পেল না। পেল বরফের টুকরো। নিয়ে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে সেই বরফের টুকরো মুখে দিল লোকটা। তারপর বলল, ‘যুদ্ধ করতে করতে আমার এই বন্ধুর বুকে আঘাত লেগেছে। তাই রক্ত ঝরছে। জ্ঞান নেই। শত্রুকে ফাঁকি দিয়ে ঘাঁটিতে নিয়ে যাচ্ছি।’
‘কোথায় তোমাদের ঘাঁটি?’

‘আরও খানিক দূরে।’
‘তবে আমাদের বাড়ি চলো। বাড়িতে দাদু আছে।’
সেই সেপাইটি চমকে তাকাল মোমপার মুখের দিকে। মুখে তার কষ্টের হাসি। তারপর বলল, ‘তুমি ছোট্ট বলেই এমন একটা কথা তোমার মুখে শুনে মন ভরে গেল। কিন্তু তোমাদের বাড়িতে গেলে আমার বন্ধুকে বাঁচাব কেমন করে! ঘাঁটিতে গেলে ওষুধ আছে। লোকজন আছে। সবাই মিলে চেষ্টা করতে পারব।’
‘কিন্তু অনেকটা পথ, বন্ধুকে পিঠে নিয়ে, এত কষ্ট করে যাবে কেমন করে?’
সেপাই মোমপার চিবুকে হাত দিল। আদর করল। বলল, ‘এমনি করেই যেতে হবে। উপায় নেই। চলি। দেরি হয়ে গেলে বিপদ ঘটতে পারে।’
এমন সময় হঠাৎই মুনমুন নামের সেই ঘোড়ার গলার ঘণ্টা টুংটাং করে বেজে উঠল। শুনতে পেল মোমপা। কী যেন মনে হল তার। সেপাইকে ব্যস্ত গলায় বলল, ‘তুমি কি দাঁড়াবে একটু?’
‘কেন?’
‘দাঁড়াও, আমি এক্ষুণি আসছি।’ বলতে বলতে পাথর টপকাতে লাগল মোমপা।
পলকের মধ্যে সে ফিরে এল সেই সেপাই-এর কাছে। সঙ্গে তার ঘোড়া, মুনমুন। সিপাইকে বলল, ‘আমার এই ঘোড়ার নাম মুনমুন। আমার বন্ধু। এর পিঠে চেপে তোমরা চলে যাও। কিছু ভেবো না। আমার ঘোড়া তোমাদের পৌঁছে দেবে। তোমরা তাড়াতাড়ি ঘাঁটিতে পৌঁছে যাবে।’
‘তারপর?’ জিগ্যেস করল সেপাই।
‘তারপর তুমি যদি পারো আমার মুনমুনকে ছেড়ে দিও। ও নিজে নিজেই ফিরে আসবে। মুনমুনের সব চেনা।’
‘তুমি যাবে না আমাদের সঙ্গে?’
‘কেমন করে যাব? বাড়িতে যে দাদু একলা আছে। আমার দেরি দেখলে ভাববে। আমাকে খুঁজবে। ডাকবে, মোমপা, মোমপা-আ-আ। কোথায় গেলি।’ আমার সাড়া না পেলে, দাদু যদি বেরিয়ে আসে ঘর থেকে! দাদু একবার পড়ে গেছিল। তারপর থেকে দাদুর একটা পা নেই। আমার ভয় করে। আমি যাই!’
হ্যাঁ, ফিরে গেল মোমপা দাদুর কাছে।
অনেকক্ষণ পর ফিরেও এসেছিল মুনমুন। তবে একা নয়। তার পিঠে চেপে এসেছিলেন সেই সেপাইও। সঙ্গে এনেছিলেন মোমপার জন্যে একটি খেলনা-রেলগাড়ি। আর দাদুর জন্যে এনেছিলেন একটা ক্রাচ। খোঁড়া-মানুষের বন্ধু এই ক্রাচ। পথচলার সহায়। ক্রাচটি সঙ্গে নিয়ে দাদু এখন একাই ঘরের বাইরে এসে আকাশ দেখেন। দাদু যেমন মোমপাকে দেখতে ভালোবাসেন, তেমনি আকাশকেও! আকাশও যেন এখন দাদুর বন্ধু।
ফিরে যাবার সময় সেপাই বলল, ‘আমার বন্ধু ভালো আছে। তার জ্ঞান ফিরেছে।’ মোমপার মুখে হাসি ফুটল। ভারি মিষ্টি সেই হাসি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন