তানামন

শৈলেন ঘোষ

মেয়েটার নাম তানামন। ভালো রে ভালো—দুনিয়ায় এত নাম থাকতে হঠাৎ তানামন! নামটা কার মুখ দিয়ে প্রথম বেরিয়ে এল? বাবা না মা-র? না অন্য কারোর? ছোট্টবেলায় আদর করার এই এক মজা। মাথা নেই, মুন্ডু নেই মুখে যা আসে—আদরের শব্দে সেগুলো উছলে বেরিয়ে পড়ে। হয়তো তেমনই একটা আদরের শব্দ তানামন। আর সেই থেকে অজান্তে মেয়েটার নামও হয়ে গেছে তানামন। তবে বলতে পারবে না, সে বুঝি এখনও দুধের শিশুটির মতো ছোট্টটি আছে! মোটেই না। এখন সে দস্তুর মতো বড়ো হয়েছে। আন্দাজে বললেও বলতে পারি, তানামনের বয়েস বছর দশেক হবে। তা সে তুমি যাই বলো আর তাই বলো, এমন গেছোমেয়ে দুনিয়ায় দু-টি পাবে না। কী দস্যি! যেমন দস্যি তেমনই হিংসুটে। মেয়েটা নিজের ছাড়া আর কিছু জানে না। অন্যের ভালো দেখলেই জ্বলেপুড়ে মরে। মেয়ের দুরন্তপনার নালিশ শুনতে শুনতে বাবা-মায়েরও কান ঝালাপালা। তারা কোনোদিন শুনছে, পুকুরে সাঁতার কাটতে কাটতে কার যেন ছেলের মুখ বার বার জলের ভেতর চুবিয়ে দিয়েছে। ছেলেটা দম আটকে মরতে মরতে বেঁচে উঠেছে। আবার কোনোদিন শুনছে, কার নাকি গোরুর ল্যাজে এমন মোচড় দিয়েছে যে ব্যথার চোটে গোরু ল্যাজ নেড়ে আর মাছি তাড়াতে পারছে না। আছে, এমন নালিশ আরও অনেক আছে, কার পুতুল ভেঙে দিয়েছে, কার বই-এর ছবির ওপর হিজিবিজি কেটে দিয়েছে। সেদিন নাকি কার সঙ্গে এমন মারামারি করেছে যে, তার নতুন জামাটা ছিঁড়ে ফর্দাফাই হয়ে গেছে! তা এমন মেয়ের জন্যে মা-বাবার কম হেনস্থা! বলো, ছেলে-মেয়ে যতই আদরের হোক বার বার এমনসব দুরন্তপনার অভিযোগ শুনলে বাবা-মার মাথা হেঁট হয়ে যায় না? এই সোজা কথাটা কে শুনছে বলো! তানামন? তবেই হয়েছে। আজ বকা দাও, দু-দন্ড চুপ করে রইল। আবার কাল যে কে সেই! শুরু হয়ে গেল বেয়াড়াপনা। কে সামলাবে? তা সেদিন হল কী, মেয়েটা একটা অদ্ভুত কান্ড করে বসল। ওমা, কোথাও কিছু নেই একটা মা-কাকের সঙ্গে ঠোকাঠুকি শুরু করে দিল!

কাকের সঙ্গে ঠোকাঠুকি?

তবে আর বলছি কী! হ্যাঁ, কাক। ওই যে, বটগাছটায় বাসা বেঁধে ডিম পেড়েছে—সেই কাক।

যাচ্চলে! কাকের সঙ্গে কী হল আবার?

কী আর হবে! বাজার থেকে তানামনের বাবা মাছ কিনে এনেছে। কাকটার নজর পড়েছে। আর যায় কোথায়! কাকটা পাঁচিলের ওপর বসে শুরু করে দিল ক্যারকেরে গলায় ক্যাঁক ক্যাঁকানি। তানামন যতবার হুস হুস করে কাকটাকে তাড়িয়ে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে কাকটা করে কী, ডানা ঝাপটে একটু উড়ে আবার জুড়ে বসে পাঁচিলে। শুধু বসলে সে এককথা, কিন্তু তারস্বরে এমন ঘন ঘন ক্যাঁক, ক্যাঁক করতে লাগল যে, কানের পোকা বেরিয়ে যাবার গোত্তর!

এ্যাঁয়—! আর থাকতে পারল না তানামন। তার মেজাজ গেল বিগড়ে। দিল ছুড়ে একটা ঢিল! আরে বাবা ওর নাম কাক! খুঁজলে এমন পাখি দু-টি পাবে না কোথাও।

ঢিল ছোড়ো কী ডাণ্ডা তোলো ওদের ঠাণ্ডা করা অত সোজা নয়!

এই সেরেছে!

কেন, কী হয়েছে?

তানামন এমন খেপেছে, ওই দ্যাখো, মেয়েটা সব ছেড়ে রেগেমেগে এবার গাছে উঠছে!

এ কী কান্ড! মেয়েটা কাকের বাসা ভেঙে দেবে নাকি?

না, বাসা ভাঙল না, আরও নিষ্ঠুর কাজ করল। কী! বাসার থেকে কাকের ডিমটাকে তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে ভেঙে দিল।

ইস! এ কী করল মেয়েটা?

তবে আর বলছি কী! এতক্ষণ কাকটা তানামনকে গাছে উঠতে দেখে তারস্বরে চিৎকার করছে। আর এটা তো জানো, একটা কাকের বিপদ দেখলে, অসংখ্য কাক তাকে সাহায্য করতে উড়ে আসে। একসঙ্গে কাঁ-কাঁ করে গলা ফাটিয়ে চেঁচায়। এবারও তেমনটাই করল কাকের ঝাঁক। কিন্তু মা-কাক হেরে গেল একটা দুষ্টু জেদি মেয়ের কাছে!

হঠাৎ এ কী! এবার দেখি যে, আর এক আশ্চর্য দৃশ্য! ওই অত কাকের অমন চিৎকার আর ক্যাঁকানি হঠাৎ যেন কেমন ধীরে ধীরে থেমে গেল। মা-কাকটাও যেন ডাকতে ভুলে গেছে! তার গলায় আর স্বর নেই। চোখও যেন ঝাপসা!

গাছ থেকে তরতর করে নেমে আসে তানামন। মা-কাক ঝাপসাচোখে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। তানামনেরও চোখ পড়ে যায় মা-কাকটার দিকে। চেঁচিয়ে কড়কে ওঠে, ‘‘থামলি কেন? আবার যদি ক্যারকেরে গলায় ‘কাঁ-কাঁ’ করিস তো এবার ঠ্যাং ভেঙে দেব!’’

গজরাতে গজরাতে চলেই যাচ্ছিল তানামন। চলতে চলতে হঠাৎ সে দাঁড়াল কেন? নিজের মুখ ঘুরিয়ে আবার কাকের মুখের দিকে তাকাল কেন? আবার কি মুখঝামটা দিয়ে কাকটাকে তাড়া দেবে? নাকি ইট ছুড়ে মারবে?

না তো, সেসব কিছুই করল না তো! তবে? মুহূর্তে আগে যার চোখে-মুখে রাগের আগুন ছিটকে বেরোতে দেখেছি, এখন তার সেই মুখ অমন থমকানো কেন? কী হল সেই দজ্জাল মেয়েটার?

তবে কী—

হ্যাঁ ঠিক ধরেছি। দুঃখে ভার মা-কাকের ওই শান্ত মুখখানা দেখেই তানামন অমন থমকে গেছে। সে হতে পারে একটা কাক, তবু সে তো মা। ওই ডিমের ভেতরে ছিল তার সন্তান। ক-দিন পরে ওই ডিম ফুটে সেই সন্তান বেরিয়ে এলে মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরত। আদর করত। সব মা-ই তো তাই করে। যেমন মানুষের মা, তেমন পাখির মা-ও। আর তানামনের মতো তার চোখে ঝলসে উঠল না আলো। দেখতে পেল না আকাশ। সে পারল না তার মায়ের মতো আকাশে ডানা ছড়িয়ে উড়তে। মিথ্যে হয়ে গেল সব।

দুষ্টু মেয়েটা কি বুঝতে পারল মায়ের দুঃখের কথা?

জানি না। শুধু জানি তার মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বেরোয়নি। সেখানে সে আর পারেনি দাঁড়িয়ে থাকতে। কাকের চোখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে সে ছুট দিল ঘরে। ঘরের জানালায় মুখ ঠেকিয়ে আকাশ-পাতাল কী যে ভাবতে লাগল তা সে-ই জানে!

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার কী মনে হল যে ঘুরে দাঁড়াল? হঠাৎ আবার ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে সে কোথায় চলল!

চলল সেই বটগাছের নীচে। বটগাছের নীচে গিয়ে মেয়েটা আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগল সেই ছুড়ে ফেলা ডিমটা। বলা তো যায় না, ডিমটা আস্তও তো থাকতে পারে। যদি আস্ত থাকে তবে আবার তুলে রাখবে ওই ডিম কাকের বাসায়! হ্যাঁ, ঠিক বটে, এখন মা-কাকের চোখ দেখে তার মন বলছে, এমন অন্যায় কাজ সে আর কোনোদিন করবে না।

হ্যাঁ, সে খুঁজে পেল। তবে একটা আস্ত নিটোল ডিম নয়। ফেটে চৌচির ডিমের খোসা। আশ্চর্য, জেদি দুরন্ত মেয়েটা পলকে কেমন যেন পালটে গেল! ছলছলিয়ে উঠল তার চোখের পাতা। বটগাছটার নীচে দাঁড়িয়ে মা-কাকের বাসাটার দিকে তাকাল খানিক। দেখতে পেল না মা-কাককে। তানামন জানে, মা-কাক দিনের পর দিন একটি দু-টি খড়কুটো জোগাড় করে ওই বাসা বানিয়েছে। বাসায় ডিম পেড়েছে। বুকে নিয়ে ডিমে তা দিয়েছে। আর হয়তো ভেবেছে, যেদিন ডিম ফুটে ছানা বেরোবে, সেদিন যেন মেঘ না ডাকে, বিদ্যুৎ না চমকায়। ছানা ভয় পাবে। কিন্তু সে আর হল না। মনের ভাবনা মনেই থেকে গেল।

কিন্তু মা-কাকটা গেল কোথায়? কাকটাকে একটিবার দেখার জন্যে তানামন কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে! ওই দ্যাখো, মেয়েটা কেমন উঁকিঝুঁকি দিয়ে বটগাছটার এ-ডাল সে-ডাল খোঁজাখুজি করছে! এখন আর খুঁজলে কী হবে, খোঁজাই সার! সে কি আর এ তল্লাটে আছে! সত্যিই তো, মা-কাক কী এমন অন্যায় করেছে যে মেয়েটা তার এমন সর্বনাশ করে দেয়! হ্যাঁ এটা ঠিক, মাছ দেখে তার লোভ হয়েছিল। তাই সে একটু বেশিই চেঁচামেচি করেছে। বলতে পারো এটাই তাদের স্বভাবদোষ। তা কী-আর করা যাবে? তাই বলে এমন রাগ তোমার, তুমি তার ডিমটাই নষ্ট করে দিলে! ছি:! সে থাকবে কেন তোমাদের পাড়ায়! অন্য পাড়ায় অন্য গাছ হয়তো এখন, মা-কাক খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের থাকার জন্যে।

কিন্তু আশ্চর্য কী, তানামনও স্থির থাকতে পারল না। হন্যে হয়ে সে-ও খুঁজে বেড়াতে লাগল সেই মা-কাকটাকে। আচ্ছা, এটা কি একটা কথা হল? শূন্যে মাথা তুলে, এ-গাছ ও-গাছে কাক খোঁজা! দেখে তুমি কেমন করে চিনবে কোন কাকটা সেই মা কাক? সব কাকের-ই গায়ের রং কালো। গলার স্বরও একরকম। যেমন মুখ, তেমন চোখ, তেমনই ছটফটে চাউনি। এখানে তো তুমি এই একইরকম দেখতে অগুনতি কাকের মধ্যে কাকে বলবে, এই কাকটাই সেই মা-কাক?

না, বলা যায় না। শুধু বলা যাবে, তানামন নামে একটি দুরন্ত মেয়ে ভয়ংকর জেদ ভুলে দুঃখী মা-কাককে খুঁজছে দু-টি কথা বলবে বলে। বলবে, ‘ওরে কাক, তুই এখনই আমাকে যত পারিস আঘাত কর। তোর ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে, তুই আমার চোখ দুটো কানা করে দে! নয়তো পায়ের নখ দিয়ে খামচে রক্তে আমায় ভাসিয়ে দে! আমি অন্যায় করেছি, ভীষণ অন্যায়। তোকে আমি অসহ্য কষ্ট দিয়েছি। আমার জন্যে তোর ছানার জন্ম হল না। ছি—ছি!’

আসলে মা-কাককে কিছুই বলতে পারল না তানামন। কেন-না, আঁতিপাতি করে খুঁজেও সে তার সন্ধান পেল না। দুঃখে জর্জর মেয়েটা কখন যে অন্যমনে নদীর কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা পর্যন্ত খেয়াল করতে পারল না।

হঠাৎ যখন তার খেয়াল হল, তখন দেখল, নদীর স্রোত ভেঙে নৌকো বাইতে বাইতে মাঝি গান গাইছে। ভেসে আসছে সুর—

গাছ থেকে তুমি ফুল ছিঁড়ে নিলে

ফুল ব্যথা পায় জানো কি,

পাখির পালক ছিঁড়ে নিলে তার

চোখে জল আসে মানো কি?

নদী-জলে তুমি আবির ছড়ালে

হারায় যে নদী শুচিতা,

নদীর দুঃখ ঢেউ তুলে ভাসে

চোখ মেলে দেখে বুঝি—তা?

গানের ছন্দে তাল ভাঙে যদি

সে-গান মধুর হয় কি,

কারোর প্রাণ নিয়ে রক্ত ঝরালে

হিংস্র সে-কাজ নয় কি?

নদীর স্রোতের উজানে নৌকো দুলছে। গানের সুরও দোল খায়। দুলতে দুলতে নৌকো এগোয়। গানের সুরও মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে। গান শুনতে শুনতে কেমন যেন—কেঁপে ওঠে তানামনের বুকের ভেতরটা। মনে হয়, গানের কথাগুলো সব সত্যি। সে আর দাঁড়ায় না সেখানে। ছুটতে ছুটতে ঘরে ফেরে। বিছানায় আছড়ে পড়ে মুখটাকে লুকিয়ে হাঁপায়।

হঠাৎ তার চমক লাগে। একটা কাক যেন-ডেকে উঠল কাঁ-কাঁ করে! একমুহূর্ত আর দেরি করল না তানামন। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ছুট দিল বাইরে।

ছুটে গেল সেই বটগাছটার তলায়। অধীর হয়ে উঁকি দিল মা-কাকের বাসায়। হায়রে, কোথায় কাক, আর কোথায় কী! শূন্য বাসা!

ক-দিন কেটে গেল। বাসা শূন্যই পড়ে থাকল গাছের ডালপালার ফাঁকে। তবু তানামন তাকিয়ে দেখে রোজই একবার না-একবার। আশা করে, মা কাক যদি আসে!

অবশ্য একটা কথা তো মানতেই হবে, গাছের বাসা চিরদিন অটুট থাকে না। একদিন সে বাসা, ঝড়ে-ঝাপটায় ভাঙবেই। না, ঝড়ে নয়, একদিন তানামনের বাসাটা দেখে মনে হল, এমনিতেই টলমল করছে. যখন-তখন ভেঙে পড়তে পারে। তানামন কী যে হঠাৎ ভাবল কে জানে, তড়বড়িয়ে গাছে উঠে পড়ল। গাছের ডালে বসে ওই টলমলে বাসাটাকে নতুন করে সাজাতে লাগল। মা কাকের ডিমটাকে সে ফেলে দিয়েছে এই বাসা থেকে। এখন সেই বাসাটাকে সে রক্ষা করবে। তার মন বলছে মা-কাক একদিন ঠিক আসবে। বটগাছের এই বাসাতেই আবার ডিম পাড়বে। ডিম ফুটে তার ছানা জন্ম নেবে। সেদিন তানামন সেই কাকের ছানাকে বুকে নিয়ে আদর করবে। নয়তো গান শোনাবে। মাঝির সেই গান—

গাছ থেকে তুমি ফুল ছিঁড়ে নিলে

ফুল ব্যথা পায় জানো কি...

হ্যাঁ, সব গানটাই তানামনের মুখস্থ হয়ে গেছে। এখন মা-কাক এলেই হয়। সে অপেক্ষা করছে। কিন্তু কবে সেই মা-কাক আসবে? তানামন কবে তাকে বলবে, আর সে দস্যিপনা করে না। এখন সে লক্ষ্মীমেয়ে। সবার বন্ধু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%