শৈলেন ঘোষ
ছেলেটির নাম শামিম। শান্তনু অথবা স্যামুয়েলও হতে পারত। কারণ, তিন বন্ধু তারা। তিনজনেরই এই গ্রাম ভালো বাসার। তিনজনেরই জন্ম এখানেই। তিনজনেই একই ইস্কুলে পড়ে। একই সঙ্গে তারা খেলা করে। গান গায়। নাটক করে। একই সঙ্গে মনের ইচ্ছেগুলি নিয়ে কত গল্প বানায়। স্যামুয়েল যদি বলে সে জাহাজের ক্যাপ্টেন হবে, তবে শান্তনু বলে সে হবে আকাশচারী। আকাশযানে চড়ে সে এই গ্রহ থেকে আর এক গ্রহে উড়ে যাবে। কিন্তু শামিম ওসব কিছুই বলে না। বলে, সে বাবার মতো ঘোড়ার গাড়ি চালাবে। রেল-ইস্টিশান থেকে যাত্রী নিয়ে গাড়ি ছোটাবে বাড়িবাড়ি। তাতে নাকি মজা অনেক।
হ্যাঁ, সত্যি, শামিমের বাবার একটা ঘোড়ার গাড়ি আছে। তিনি গাড়ি চালান। গাড়িটাকে কত যত্ন করে রাখেন তিনি। তা হয়ে গেল ক-বছর। এখনও পর্যন্ত একটুও রং চটেনি। আঁচড় পড়েনি গাড়ির গায়ে। ঝকঝক করছে। আর ঘোড়াটাও তেমনই—তেজীয়ান। গায়ের রঙটাও কেমন গাঢ় নীল। শামিমের সঙ্গে ঘোড়াটার খুব দোস্তি। শামিম ছোট্ট হলে কী হবে, এক-একদিন ঘোড়ার পিঠে চেপে কী দৌড়দৌড়িই না করে। এক-এক দিন বাবার পাশে বসে গাড়িও চালায়। কী সাহস দ্যাখো ওইটুকু ছেলের! তা যেমন বাবা, তেমনই তো ছেলেও হবে। সত্যি বটে, ভীষণ সাহস শামিমের বাবার।
সেবার হল কী, তখন শীতকাল। শীতকালে গাছে গাছে পাখির ছড়াছড়ি। কত দূর দূর দেশ থেকে ঝাঁকঝাঁক পাখি আসে এখানে। প্রত্যেক বছর। তা সে বছরে পাখির সন্ধান পেয়ে কিছু বাইরের উটকো লোক উৎপাত শুরু করে দিলে। লোকগুলো পাখি-চোর। হয় ধরে, না-হয় মারে। রুখে দাঁড়ালেন শামিমের বাবা। আটটা-দশটা লোকের সঙ্গে একাই লড়ে গেলেন। চোরেরা পালাতে পথ পায় না। সত্যিই তো, কী অন্যায্য কাজ বলো। শীতের পাখিরা এখানে আসে আশ্রয়ের আশায়, আর তোমরা তাদের ধরবে। হাত ভেঙে দিতে হয়। এমনই করে কত পাখির বংশ পৃথিবীর আকাশ থেকে চিরদিনের মতো লোপ পেয়ে গেছে। শুধু পাখি কেন, অমন কত প্রাণী লোপাট হয়ে গেছে এই পৃথিবী থেকে। সে তো মানুষেরই কুবুদ্ধিতে।
সেবার কী একটা কাজে বাবা শহরে গেছলেন। দু-দিন বাড়ি ছিলেন না। তখন বোধ হয় ইশকুলের ছুটি ছিল। ছুটি থাকলেই এই বয়সে ছুটোছুটি বাড়ে বলেই শামিম, শান্তুনু, স্যামুয়েল তিনজনেই ছুটোছুটি করছিল। ছুটতে ছুটতে বন-বাদাড় তোলপাড় করছিল। একটু হাঁপায়। একটু থামে। আবার ছোটে।
হঠাৎ শামিম আর ছোটে না, দাঁড়িয়ে পড়ে। কী হল?
শামিম হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘দূর একদম বোকা আমরা। ঝুটমুট ছুটে ছুটে দমসম হয়ে যাচ্ছি। তার চেয়ে চ, গাড়ি চেপে ঘুরে আসি।’
‘গাড়ি মানে?’ খানিকটা অবাক হয়েই জিগ্যেস করলে স্যামুয়েল।
শামিম দম নিয়ে বলল, ‘আমাদের ঘোড়ার গাড়ি!’
‘কে চালাবে?’ জিগ্যেস করল শান্তনু।
‘কেন, আমি চালাব।’ উত্তর দিল শামিম। কী তার মনের জোর।
গাছে একটা ফিঙে কেমন করে নাচছে ডেকে ডেকে। কী চঞ্চল। একটা কাঠবেড়ালি গাছের গুঁড়ি বেয়ে কেমন উঠছে নামছে। কী দুরন্ত দেখেছ?
শূন্য আকাশে একটা চিল একা। কী সুন্দর তার রোদে ছড়ানো ডানা দুটি। অনেক দূরে কে যেন গান গাইছে। মাটির গান। সুরের ছন্দে কেমন দোলা লাগছে মনে।
শামিমের কথা শুনে স্যামুয়েলের গায়ে কাঁটা দেয়।
শান্তনুর রোমাঞ্চ লাগে। অবশ্য দু-জনের কেউ-ই কথা বলতে পারে না। কেমন যেন বোবার মতো চেয়ে থাকে শামিমের মুখের দিকে।
‘চ আমার সঙ্গে।’ শামিম ছুটল বাড়ির দিকে। ছুটল স্যামুয়েল, শান্তনু তার পেছনে পেছনে।
ছুটতে ছুটতে বাড়ি পৌঁছে শামিম চেঁচাল, ‘মা—’
মা সাড়া দিলেন, ‘কী বলছিস?’
গাড়িতে ঘোড়া জুততে জুততে শামিম উত্তর দিল, ‘গাড়ি নিয়ে আমরা একটু বেড়িয়ে আসছি।’
মা বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। দেখলেন শান্তনুকে, স্যামুয়েলকে। হাসলেন। তারপর শামিমকে বললেন, ‘সাবধানে যাস।’
শামিম একজন পাকা মুরুব্বির মতো উত্তর দিল, ‘কিচ্ছু ভেবো না। লাগাম আমার হাতে। ডাইনে-বাঁয়ে সব চেনা আমার। বাবা সব শিখিয়ে দিয়েছে।
থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল শান্তনু আর স্যামুয়েল। শামিমের মা শামিমকে বকলেন না তো! বারণ করলেন না। কী আশ্চর্য!
শামিম গাড়িতে ঘোড়া জুতে ডাক দিল, ‘এই স্যামু, এই শান্ত মায়ের মুখের দিকে হাঁ করে কী দেখছিস? আয়, গাড়ি রেডি।’
স্যামুয়েল আর শান্তনু একবার শামিমকে দেখল আর একবার শামিমের মাকে দেখল। তারপর স্যামুয়েল মাকে আমতা আমতা করে বলল, ‘আপনি রাগ করবেন না তো?’
মা বললেন, ‘রাগ করব কেন! বেড়াবার ইচ্ছে হয়েছে বেড়িয়ে এসো। শামিম এখন একাই সব পারে।’
স্যামুয়েল আর শান্তনু জুলজুল চোখে নিজেরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। হয়তো দু-জনেই মনে মনে ভাবল, তাদেরও যদি এমন গাড়ি থাকত, তবে কি তাদেরও মা এমন সাহস করে এইসব কথা বলতে পারতেন!
‘এই আয় না রে!’ গাড়ির ছাদে সহিসের সিটে টপাটপ উঠে পড়ে শামিম তার বন্ধুদের ডাক দিল।
আর দাঁড়াল না স্যামুয়েল আর শান্তনু। এগিয়ে গেল গাড়ির দিকে।
‘আয়, ওপরে উঠে আয়, আমার পাশে বসবি। দু-জনের হয়ে যাবে।’ বলে শামিম হাত বাড়িয়ে দিল। গাড়ির এটা-ওটায় পা রেখে দু-জনেই উঠে পড়ল ওপরে।
হ্যাঁ, শামিমদের এই গাড়িটা ফিটনও নয়, টাঙাও নয়। এ গাড়িকে বলে ছেকড়াগাড়ি। তাই ছাদ আছে।
কাঁধে ঠেকাঠেকি করে তিনজনেই বসে পড়ল। এমন করে গাড়ির ওপরে বসে কতদিন শামিম বাবার সঙ্গে ঘোড়ার লাগাম ধরে গাড়ি চালিয়েছে। কিন্তু ঘোড়ার লাগাম ধরে গাড়ি চালানো তো অনেক পরের কথা, শান্তনু আর স্যামুয়েল ঘোড়ার গাড়ির ছাদেই ওঠেনি কোনোদিন। তাই গাড়ির ছাদের ওপর বসে শান্তনু আর স্যামুয়েলের কেমন যেন নতুন নতুন দেখতে লাগছে চৌদিক। অবাক না-হয়ে পারে!
‘কোনদিকে যাবি?’ জিগ্যেস করল শামিম।
শান্তনু বলল, ‘কোনদিকে আর যাব। যাবার তো একটাই জায়গা। চ, ইস্টিশানের দিকে যাই।’
স্যামুয়েল বলল, ‘ইস্টিশানের দিকে তো যখন ইচ্ছে যাওয়া যায়। চ, আজ উলটো রাস্তায় পাড়ি দিই।’
শামিম বলল, ‘সেই ভালো। তাই চ। আমরাও অনেক দিন ওদিকে যাইনি। চেনা হয়ে যাবে।’
শান্তনুরও ভালো লেগে গেল স্যামুয়েলের কথাটা। সুতরাং, ঘোড়া ছুটল, গাড়ি ছুটল, সঙ্গে তিন বন্ধু ছুটল। ক-পা যেতে না-যেতে শান্তনু চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওই দ্যাখ, আমাদের বাড়ি।’
‘ওই দ্যাখ ভাঙা মন্দির।’
‘ওই দ্যাখ, বিনুমাসির মুড়ির দোকান।’
‘ওই দেখা যাচ্ছে বাজার।’
‘ওই দ্যাখ, বোসেদের আমবাগান।’
স্যামুয়েল দেখতে পেয়েছিল। প্রথম বলল, ‘ওই দ্যাখ অঙ্কস্যার যাচ্ছেন।’
শান্তনু চেঁচিয়ে ডাক দিল, ‘স্যার!’ স্যারও দেখতে পেয়েছিলেন, অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই বিচ্ছু ছেলের দল, এ কী সর্বনেশে কান্ড করে বেড়াচ্ছিস? এক্ষুনি যে একটা দুর্ঘটনা বাধিয়ে বসবি।’
শামিম গাড়ি থামাল। মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে নরম গলায় বলল, ‘না স্যার, কিচ্ছু হবে না। আমি গাড়ি চালাতে পারি।’
শান্তনু আর স্যামুয়েল একসঙ্গে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ স্যার, ও পারে। ওর মা বলেছেন।’
‘বলিস কী রে? এই বয়সে এমন একটা শক্ত কাজ শিখে ফেলেছিস? তোকে তো বাহাদুর বলতে হয়।’ স্যার যেন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, ‘দেখিস, সাবধানে যাস।’
শামিম জিগ্যেস করল, ‘স্যার, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’
স্যার বললেন, ‘অশেষপুরে। আমার ছোটোবোন থাকে।’
‘আসুন না স্যার। আমরা আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি। এতটা রাস্তা হাঁটবেন কেন?’
‘না বাবা, আমার দরকার নেই। হাঁটাই ভালো। শেষকালে তোমার ঘোড়া খেপুক, আর আমি মরি।’ স্যার দোনোমনা করলেন।
শান্তনু আর স্যামুয়েল দু-জনে স্যারের কথা শুনে অতি উৎসাহে আশ্বাস দিল, ‘না স্যার, শামিমদের ঘোড়া খেপে না। খুব শান্ত। আপনার কিচ্ছু ভয় নেই।’ বলতে বলতে স্যামুয়েল তরতর করে নেমে এল। গাড়ির দরজা খুলে বললে, ‘আমরা ভয় পাচ্ছি না স্যার, আর আপনি ভয় পাচ্ছেন? কিচ্ছু হবে না। আপনি বসুন।’
স্যার ইতস্তত করে বললেন, ‘বলছিস।’ বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে পড়লেন। বসতে বসতে বললেন, ‘দেখিস বাবা যেন প্রাণে মারিস না।’
দ্যাখো! দ্যাখো! বলতে না বলতেই গাড়ির চাকা আর একটু হলে ওই গর্তের ভেতরে গোঁত খেয়েছিল! উফ! খুব বাঁচোয়া! গাড়িটা টাল খেয়েই সামলে গেছে। স্যার ভয়ে-ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই-ই-ই! কী করছিস! এক্ষুনি অ্যাক্সিডেন্ট করে বসেছিলি যে, আমার দরকার নেই। দাঁড়া, আমি নেমে যাই!’
‘ভয় পাচ্ছেন কেন স্যার! সামনের চাকাটা গর্তে একটু টাল খেয়ে গেছে। রাস্তায় গর্ত থাকলে ঘোড়া কী করবে বলুন!’
‘একটু তবে খানাখন্দ দেখে চালা।’ বলে স্যার আবার থিতিয়ে গেলেন।
শামিম, শান্তনু, স্যামুয়েল তিনজনে মুখ চাওয়া-চায়ি করল। চোখে চোখে কথা হয়ে গেল। হাসল।
ঠিক বটে, তুমি ঘোড়ার কোনো দোষ দিতে পারো না। সামনে খানাখন্দ থাকলে, সহিসকেই দেখেশুনে ঘোড়ার লাগাম সামলাতে হয়। কিন্তু খানাখন্দ যদি দু-পা অন্তর থাকে, তবে সহিসই বা কী করবে? গাড়ি একটু হ্যাঁচকাহেঁচকি করবেই। কিছু করার নেই। কিছু করার নেই সেটা স্যারও বুঝেছেন। তাই মাঝে মাঝেই চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিচ্ছেন। স্যারেরই বা দোষ কী! রাস্তার গাড়ি যদি নদীর নৌকার মতো টলমল করতে করতে চলে, তাঁর ভয় হতেই পারে। তার ওপর চালক যখন একেবারেই খুদে। সুতরাং, তিনি যেন প্রাণটি হাতে নিয়ে চললেন। মনে-মনে ভাবতে লাগলেন, ছিল ভালো পা। ছেলেগুলোর চাপে পড়ে খামোখা বিপদ ডেকে আনা। এখন ভালোয় ভালোয় পৌঁছোলে হয়!
বলতে বলতেই— গেল! গেল! একেবারে ঝাঁকি মেরে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল! ওপরের তিনজন গলা ফাটিয়ে এমন চেঁচিয়ে উঠল, মনে হল বুঝি ভীষণ একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেছে! ছুটন্ত গাড়ি ঝপ করে দাঁড়িয়ে পড়লে যা-হয়। স্যারের মাথা ঠুকে ঠকাস! ইশ! বেশ জোরেই লেগেছে। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে তিনি ধমকে উঠলেন, ‘কী হল রে?’ ‘আজ্ঞে ছাগল, স্যার।’ তিনজনে একসঙ্গে উত্তর দিল।
শামিম বলল, ‘ছাগলটার কোনো কান্ডজ্ঞান নেই স্যার! আপন খেয়ালে রাস্তা পেরোচ্ছিল। আর একটু হলেই মরত।’
স্যার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ছাগল কি মানুষ যে কান্ডজ্ঞান থাকবে? ছাগলের সঙ্গে আমিও যে গেছিলুম!’
‘ও কিছু নয়, স্যার। আপনি তো গাড়ির ভেতর আছেন আর আমরা ছাদে, আমাদেরই কিছু হয়নি, আপনার কেন হবে?’ শামিম উত্তর দিল।
‘আমার ঘাট হয়েছে। আর আমার দরকার নেই। দয়া করে আমায় নামিয়ে দাও!’ স্যার মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতেই বললেন। স্যারের বোধহয় আঘাতটা একটু বেশিই লেগেছে। কে জানে, বোধ হয় ফুলেও গেছে। শামিম বলল, ‘আর নেমে কী করবেন স্যার। অশেষপুর তো এসেই গেল।’
‘এদিকে আমাকে যে শেষ করে ছাড়লি তোরা।’
‘না স্যার, শেষ কেন হবেন। ওই তো সামনেই অশেষপুরের মোড়। কোনদিকে যাব একটু বলে দেবেন স্যার।’
‘ডানদিকে যাবি।’
‘ঠিক আছে স্যার।’
ঠিক যে নেই, সেটা আর আগেভাগে জানা যায় কেমন করে! কাজেই ডানদিকে গাড়ি ঘুরতেই গাড়ি ঘ্যাচাং।
‘কী হল?’
আবার গর্ত। চাকা গর্তে পড়ে গেছে। স্যার তো খেপে আগুন। তিনি গাড়ির দরজা নিজেই খুলে ফেললেন। হুংকার ছেড়ে বললেন, ‘তোদের কখন থেকে বলছি আমায় ছেড়ে দে, কথা কানে নিচ্ছিস না। এখন ঠেলা সামলাও।’
মুখ শুকিয়ে গেছে স্যামুয়েল আর শান্তনুরও। শামিম বলল, ‘এখন তো চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই। চাকা ঠেলতে হবে।’
‘কে ঠেলবে? স্যার ক্ষিপ্ত স্বরে জিগ্যেস করলেন। ‘আসুন স্যার, সবাই মিলে ঠেলি।’
‘যত্তো সব’ বলে একটা মুখঝামটা দিয়ে তিনি গাড়ি থেকে নেমে এলেন। নেমে এল স্যামুয়েল আর শান্তনুও। তারপর শুরু হয়ে গেল, হেঁইও মারি জোয়ান ঠেলা! কী ভয়ানক কান্ড!
সত্যি, কী অবস্থা দ্যাখো স্যারের! শামিম ঘোড়া সামলায় আর দুটো বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে স্যার গাড়ি ঠেলেন। ছ্যা-ছ্যা গাড়ির ময়লা লেগে দ্যাখো, স্যারের জামা-কাপড়ের কী অবস্থা হল। হবেই তো। এরপর ঠেললেই যদি চাকা উঠত, তা হলে এক কথা! এ তো গর্ত ছেড়ে উঠতেই চায় না। ঠেলতে ঠেলতে, পড়তে-পড়তে তিনজনকে নাস্তানাবুদ করে তবে উঠল। বাব্বা! ঘেমে-নেয়ে একশা। মেহনত কী কম হল! কী কুক্ষণেই না স্যার শামিমের গাড়িতে উঠেছিলেন! শেষ পর্যন্ত চাকা ধরে ঠেলতে হল!
শামিম বলল, ‘স্যার, আর ভয় নেই। এবার নির্বিঘ্নে পৌঁছে যাব!’
স্যার খেপে অস্থির, ‘তোর গাড়ির নিকুচি করেছে। তোমার মুন্ডু। আমার কাপড়-জামার কী দশা হয়েছে দেখতে পাচ্ছিস। দেখলে আমাকে কেউ ভদ্রলোক বলবে?’
শামিম উত্তর দিল, ‘স্যার, রাগ করলে আমি কী করব বলুন। রাস্তা যদি ভোগায়, আমার কী দোষ বলুন। বসুন স্যার. এবার ঠিক পৌঁছে যাব।’
আবার স্যার বসলেন। আবার ওরা তিনজন ওপরে সহিসের সিটে গিয়ে বসল। অবশ্য এবার আর তেমন কোনো অঘটন ঘটল না বটে, তবে তিনজনেরই ভয়ে মুখ শুকিয়ে আমচুর। শান্তনু খুবই বিমর্ষ গলায় বলল, ‘স্যারকে গাড়িতে না নিলেই হত। আমরা নিজেরাই নিজেদের বিপদ ডেকে আনলুম।’
শামিম জিগ্যেস করল, ‘কেন একথা বলছিস?’
‘অঙ্কে তিনজনই এবার নির্ঘাত গোল্লা।’
শামিম উত্তর দিল, ‘কী করব বল। আমরা তো ইচ্ছে করে স্যারকে খাটাইনি! একটার পর একটা বিপদ কীভাবে এল দেখলি তো! এখন স্যার যদি হুড়কুষ্টি করে গোল্লা দেন, আমরা কী করব!’
স্যার তিরিক্ষি মেজাজে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এই এসে গেছি, দাঁড়া।’
শামিম গাড়ি দাঁড় করাল।
স্যার গাড়ি থেকে গোমড়া মুখে নামতে নামতে গজগজ করে জামার ধুলো ঝাড়তে লাগলেন। বলব কী সঙ্গে সঙ্গে স্যারের বোন ঘরের ভেতর থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। এসেই বললেন, ‘দাদা এসেছ। আমি তোমার জন্যে তখন থেকে ঘর আর বার করছি। আমাদের কী বিপদ।’
‘কেন কী হয়েছে?’
‘দেখবে এসো।’ বলে বোন দাদাকে প্রায় টানতে টানতে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেলেন। শামিম, শান্তনু ও স্যামুয়েল তাই দেখে একেবারে ভ্যাবাচাকা খেয়ে হতভম্ব। তাদের যে এখন কী করা উচিত, কিছুই তারা ঠাওর করতে পারল না। আসলে এমনকী দুর্ঘটনা ঘটল যে, স্যারের বোন অমন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন!
বলতে বলতেই স্যার ছুটে এলেন। এবার তিনি একেবারে অন্য মানুষ। মুখ কাঁচুমাচু করে বললেন, ‘বাবা শামিম, তোকে একটা কাজ করতে হবে বাবা। আমার বাচ্চা ভাগনেটা খাট থেকে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ডাক্তারবাবু বলে গেছেন, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তা, হাসপাতাল তো এখানে নয়, দু-ক্রোশ দূরে। তুই যদি বাবা তাড়াতাড়ি করে একটু পৌঁছে দিস। আমি অবশ্য সঙ্গে যাব। সঙ্গে ওর মা বাবাও যাবে মানে আমার বোন আর ভগ্নীপোত। এখানে এখন গাড়ি-ঘোড়া কোথা পাই বল?’
শামিম উত্তর দিল, ‘তবে আর দেরি করবেন না স্যার! এক্ষুনি চলুন। আমরা পৌঁছে দেব।’
‘তোদের বাড়িতে ভাববে না তো?’
‘আপনি ওসব ভাবছেন কেন? এখন ভেবে সময় নষ্ট করবেন না স্যার। যা করবার তাড়াতাড়ি করুন। আমরা তৈরি।’
তাড়াতাড়ি করে স্যারের বোন আর ভগ্নীপতি অচেতন ছেলেকে নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন। স্যারও। সঙ্গে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন সঙ্গে চললেন। এগাড়িতে এতজন তো ধরবে না। কাজেই তাদের ফেলেই গাড়ি ছুটল। স্যার অবশ্য সাবধান করতে ছাড়লেন না, ‘দেখেশুনে চলিস বাবা শামিম।’
শামিম উত্তর দিল, ‘আপনি কিচ্ছু ভাববেন না স্যার। আপনি শুধু হাসপাতালের রাস্তাটা বলে দেবেন। হাসপাতাল আমরা কেউ চিনি না।’
স্যার বললেন, ‘ঠিক আছে, চ।’
তো, হাসপাতালে পৌঁছোতে বেশ দেরি হয়ে গেল। তা হোক। ছেলেটার গাড়িতেই জ্ঞান ফিরেছে। বলতে হয়, শুভ লক্ষণ। কিন্তু সেই থেকে কান্না জুড়েছে। আহা রে!
ওঁরা তো হাসপাতালের গেটের সামনে পৌঁছে, ধড়ফড় করে গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। নামতে নামতে স্যার বললেন, ‘তোরা চলে যাস না। একটু দাঁড়া।’
শামিম উত্তর দিল, ‘আছি স্যার।’
তা হাসপাতাল যখন, তখন একটু দাঁড়াতেই হয়। হাসপাতালে গেলে কে আর সঙ্গে সঙ্গে ছুটি পায়! তবে স্যারদের একটু বেশিক্ষণই সময় গেল। এদিকে ছেলে তিনটের চিন্তাও একটু বাড়ল। মনে হল, শান্তনু যেন একটু বেশিই ভয় পেয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে আছে। শান্তনুর ভয়ে কোঁচকানো মুখটা দেখে শামিম জিগ্যেস করল, ‘বাড়ির ভাবনা হচ্ছে, না? কী করব বল, বিপদের সময় সাহায্য চাইলে না বলা যায়?’
শান্তনু বিষণ্ণ গলায় উত্তর দিল, ‘সে তো ঠিক কথা। কিন্তু মধ্যিখান থেকে আমরাও বিপদে পড়ে গেলুম।’
স্যামুয়েল একটু হালকা চালে বলে উঠল, ‘তবে একটা আশার কথা, আমাদের একটা বিপদ কেটে গেল।’
শান্তনু আর শামিম একসঙ্গে উৎসুক হয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী বিপদ?’
‘স্যার আর আমাদের অঙ্কে গোল্লা দিতে পারবেন না।’
স্যামুয়েলের এই কথা শুনে তিনজনই হেসে উঠল। তবে গলা চড়িয়ে হো হো করে নয়। খুব আস্তে। হি হি করে।
যাক, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। আহত ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই তাঁরা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন। আহা রে, ছেলেটার হাতের কব্জিটা ভেঙে গেছে। তবু ভালো, অন্য ভয়ের কিছু হয়নি। হাতটা অবশ্য প্লাস্টার করতে হয়েছে। তবে কচি বয়েস তো, ভাঙা হাড় ঠিক জুড়ে যাবে।
গাড়ি করে ওঁদের সবাইকে আবার বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে শামিম, স্যামুয়েল, শান্তনু বাড়ি ফিরে এসেছিল। তবে স্যার আর সেদিন বাড়ি ফেরেননি। একটা চিঠি লিখে শামিমের হাতে দিয়ে বলেছিলেন, চিঠিটা তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিতে। তিনি যে আজ আসবেন না, কেন আসবেন না সব লেখা ছিল সেই চিঠিতে। সুতরাং, স্যারের বাড়িতে স্যারের জন্য আর কেউ ভাববে না। কিন্তু শামিম, শান্তনু, স্যামুয়েল? কী হবে তাদের? খুবই সোজা কথা। এই বয়সে এই আসছি বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ির ছেলে যদি না খেয়ে বেলা পার করে বাড়ি ঢোকে, তবে বাবা-মা চুপচাপ বসে থাকতে পারেন? কক্ষনো না। সুতরাং ঘর-বার করবেনই। তার ওপর শামিমের মতো একটা খুদে ছেলে বেড়াবার নাম করে তাদের গাড়িতে নিয়ে বেরিয়েছে। ফিরতে দেরি দেখলে মনেই হতে পারে, ছেলেগুলো দুর্ঘটনায় পড়েছে। সুতরাং, পুলিশ চৌকিতেও খবর পৌঁছে যাবার কথা। কিন্তু আশ্চর্য, এসব কিছুই হয়নি। সবাই দেখি যে-যার ঘরে নিশ্চিন্তে বসে আছেন। এমনটা হয় নাকি!
হয়, কারণ অশেষপুর গ্রামের দু-জন মানুষ এসে খবরটা দিয়ে গেছেন শামিম, স্যামুয়েল আর শান্তনুদের বাড়ি-ঘরে। আর সত্যি বলতে কী, মানুষের বিপদের সময়ে তাদের ছেলেরা যে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করেছে, একথা শুনলে কোন বাবা-মার বুক গর্বে ফুলে ওঠে না। সুতরাং, তিন ছেলে তিন বাড়িতে ফিরল যখন, খুশিতে ভরে গেল সবার বাড়ি। সে কী আনন্দের দিন!
কিন্তু তারপর? তারপর মিথ্যে হয়ে গেল এ আনন্দ হঠাৎ! এমন যে সুন্দর সুন্দর গ্রাম, এমন যে মানুষের ভালোবাসা সব শেষ! কে জানত একটা ভয়াবহ বিপদ ধেয়ে আসছে হিংস্র রাক্ষসের মতো এই গ্রামকে গিলে খেতে। কাল পাশের গ্রামে ঘাতক হানা দিয়েছে। ছ-টা মানুষের প্রাণ নিয়েছে ঘাতকেরা। দু-দিন আগে এই গ্রামের শামিমদের ঘোড়াটা চুরি হয়ে গেছে। এখন, এই ভয়ংকর নিঝুম রাতে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। আজ আবার কার প্রাণ যাবে! হঠাৎ কেন এই মানুষের প্রাণ নিয়ে কাড়াকাড়ি। কেন? কীসের জন্যে? কার ভালো হবে এতে? অবাক হয়ে ভাবে তিন বন্ধু।
সেদিন মায়ের পাশেই শুয়েছিল শামিম অন্ধকার রাতে। মায়ের পাশেই শুয়েশুয়ে সে শুনছিল গুলির শব্দ। ঘুম তার চোখ ছুঁতে চায় না। ওই শব্দে মা যখন শিউরে উঠছেন, তেমনই কেঁপে উঠছে শামিমের বুকও। আজ বাবা ঘরে নেই। গ্রামের অনেক মানুষের সঙ্গে বাবাও বেরিয়েছেন ওই দুর্বৃত্তদের রোখার জন্যে পাহারা দিতে। ধরতে হবে সেই শয়তানটাকে যে তাদের ঘোড়াটা চুরি করেছে!
হঠাৎ চাপা উত্তেজনায় শামিম ডাক দিল, ‘মা!’
মা চমকে ওঠেন। ব্যস্ত গলায় নীচু স্বরে বললেন, ‘কথা বলিস না।’
শামিম তবুও ফিসফিস করে বলল, ‘যারা বন্দুক ছুড়ছে তারাই কি আমাদের ঘোড়াটা চুরি করেছে? বাবার তো বন্দুক নেই!’
মায়ের গলাও অস্পষ্ট, ‘বন্দুক কী হবে?’
‘বন্দুক ছাড়া বন্দুকবাজদের সঙ্গে বাবা লড়াই করবে কেমন করে? ওরা যদি আমাদের গ্রামে ঢুকে পড়ে?’
মা কিছুই বলতে পারলেন না।
শামিম বলল, ‘জানো মা, শান্তনুর বাবা বলছিলেন, শোধ নেওয়ার নামে যারা অস্ত্র ধরে, তারা কে ভালো কে মন্দ দেখে না। যাকে সামনে পায় তাকেই মারে। রক্ত ঝরায়। বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়।’
গুলির শব্দ এগিয়ে আসছে।
শামিম আঁতকে উঠে জিগ্যেস করে, ‘কী হবে মা?’
এগিয়ে আসছে হিংস্র মানুষের হুঙ্কারের শব্দ।
বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় শামিমের মার।
কারা যেন ঢুকে পড়েছে শামিমদের পাড়ায়!
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েন শামিমের মা।
হল্লা করে তারা ধেয়ে আসছে।
শামিম আচমকা চিৎকার করে ওঠে, ‘বাবা-আ-আ!’
আগুন জ্বলে ওঠে বাড়ির চালে।
দুড়দাড় করে দরজা খুলে শামিমের মা ঘর থেকে শামিমের মা ঘর থেকে শামিমকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন।
মায়ের মাথায় কে যেন লাঠির আঘাত করল। মা পড়ে গেলেন।
কেঁদে উঠল শামিম আর্তনাদ করে। মাকে জড়িয়ে ধরে সে। পেছন ফিরে শিউরে ওঠে, এ কী! যে তার মায়ের মাথায় লাঠির আঘাত করল সে যে স্যারের ভগ্নীপতি! সেই অমানুষটাও বোধ হয় চিনতে পেরেছিল শামিমকে। সে শামিমের মুখখানা দেখেই সেখান থেকে ছুট দিল। ভয়ে? না লজ্জায়? তাকে ছুটতে দেখে শামিমও তার পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু হল্লার হট্টগোলে কোথায় যে মিলিয়ে গেল তাকে আর খুঁজে পেল না শামিম। সে শুধু দেখতে পেল এখানে রক্ত, তো ওখানে মানুষের দেহ। আর দেখতে পেল হিংসা ঝলসানো অনেক মানুষের মুখ।

শামিম ছুটতে ছুটতে চলে এল স্যারের বাড়ি। আর্তস্বরে ডাক দিল, ‘স্যার, আপনার সেই ভগ্নীপতি আমার মাকে মেরে পালিয়েছে। স্যার, স্যার দরজা খুলুন।’
স্যার দরজা খুললেন না।
দরজায় ধাক্কা দিল শামিম। তবু কেউ সাড়া দিল না।
শামিম আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘বাবা-আ-আ!’ সে পাগলের মতো সেই অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে বাবাকে খুঁজতে লাগল। ছুটে ছুটে সে ধাক্কা খায়। পড়ে, আবার উঠে পড়ে। তার বাবা নেই কোথাও। শুধু দেখে আগুন। দেখে অনেক আর্ত মানুষ। শোনে কান্নার শব্দ! কী করবে শামিম! মাকে সে কেমন করে বাঁচাবে? সে ছোটে শান্তনুর বাড়ি। জ্বলছে বাড়িটা। কেউ নেই। সে ছোটে স্যামুয়েলের বাড়ি। বাড়িটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কে জানে কোথায় পালিয়ে বাঁচল তারা। অগত্যা শামিম একাই ছোটে। একাই ছুটে চিৎকার করে ‘বাবা-আ-আ! স্যামুয়েল-ল-ল! শান্তনু-উ-উ!’ কারো সাড়া নেই। শুধু মানুষের গলায় আতঙ্কের শব্দ। কান্না।
না, শামিম পেল না খুঁজে। পেল না বাবাকে, স্যামুয়েলকে, না শান্তনুকে। অগত্যা সে ছুটে এল মায়ের কাছে। না, মাকে সে দেখতে পেল না। দেখতে পেল না তাদের বাড়িটা। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। শুধু দেখতে পেল তাদের সেই ঘোড়ার গাড়িটা তখনও আগুনে পুড়ছে দাউ-দাউ করে। একটু পরে সেটাও ছাই হয়ে যাবে। শূন্য চোখে চেয়ে রইল শামিম সেই দিকে। নিথর। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে দেখতে লাগল। তার চোখের সামনে সেটা পুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তবু সে নড়ল না। নিশ্চল হয়ে সেই দিকেই অপলকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কখন অন্ধকার রাত ডিঙিয়ে আকাশের আলো নেমে এসেছে, সে জানতে পারেনি। জানতে পারেনি কখন তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শান্তনু আর স্যামুয়েল। ধস্ত দু-বন্ধু তার। তারই মতো একা, অসহায়।
হঠাৎ তিন বন্ধু চমকে উঠল। দেখতে পেল একটা বাঁদর। গাছে। তার কোলে একটা বিড়ালছানা। নেহাতই কচি। তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করছে। কেন? তার মা কোথায়? তার মা-ও বুঝি আগুনে পুড়ে মরেছে! হবে হয়তো!
শান্তনু দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘আহা রে, বেড়াল ছানাটারও বোধ হয় আমাদের মতো দশা!’ চোখ দিয়ে জল ঝরে পড়ল তার। স্যামুয়েল অবাক চোখে দেখতে দেখতে বলল, ‘বাঁদরেরও দয়ামায়া আছে।’
হঠাৎ আর্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠল শামিম, ‘আর আমরা?’
কেউ আর কথা বলতে পারল না। কেমন যেন বোবা হয়ে গেল তিনজনেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন