মায়ের সোনা ছেলে আফজল

শৈলেন ঘোষ

তার নাম আফজল। সে ঠিক তোমার মতো ছোটো। তুমি যেমন দেখতে, সে তেমন নয়। তবু, ভারি ফুটফুটে।

আফজলদের বাড়ির চারপাশে কত গাছ। যত গাছ, তত পাখি। সারাদিন গাছে নাচছে। টুটুর টুটুর ডাকছে। কত ফুল, তুলতুল। কোনোটা হলুদ রঙের। কোনোটা লাল টকটকে। কোনোটা সাদা ধবধবে। বাড়ির সামনে একটুখানি বাগান। দেখলে মনে হবে ছবি দেখছ।

বাড়িতে আফজলের বাবা আছেন। মা আছেন। আর ঘরের দেওয়ালে একটা ছবি আছে খুব বড়ো। হরিণের ছবি। হরিণ-মায়ের তিনটে ছানা। মা একটার গা চাটছে। আর দুটো ছুটছে, খেলা করছে। কত রং দিয়ে আঁকা ছবিটা যেমন ঝলমলে, তেমনি বাহারি। চোখ জুড়িয়ে যায়।

আফজলের খুব মন চায় ছবি আঁকতে। রং দিয়ে। ঠিক অমনি ছবি। বাবাকে সে বলেছে রং এনে দিতে। বাবা আনলেই আঁকতে বসবে।

আফজল ইশকুলে পড়ে। তাদের ইশকুলের ছাদ নেই। আছে গাছের ছায়া। গাছের ফাঁকে নীল আকাশ। একদম খোলামেলা।

তবে বিপদও আছে। গরমকালটা তো ঝড়-জলের সময়। ঝড় উঠলেই ইশকুলের ছুটি। ছোটো বই-খাতা বগলে নিয়ে সটান বাড়ি।

বাদলের দিনেও তা-ই। কখন যে ঝমঝমিয়ে নামবে কেউ জানে না।

অথচ শীতের দিনে পিঠে রোদ। কী আরাম!

একবার খুব একটা দরকারি কাজ পড়ল বাবার। শহরে গেলেন। সেখানে থাকতে হবে ক-টা দিন। মা একা বাড়িতে ছেলেকে নিয়ে রয়েছে। মায়ের কাছে ছেলে থাকেই বা কতটুকু। এই গাছে উঠছে। নয়, শেয়ালের পিছু ছুটছে। দিঘিতে সাঁতার কাটছে। তার ওপর ইশকুল তো আছেই। কাজের যেন শেষ নেই। ডাকলে যে মায়ের কাছে যাবে তার সময় কই।

কাজেই মাকে একলা থাকতে হয়। মুখ বুজে।

অথচ মাকে কী ভালোই না বাসে আফজল। এ-ভালোবাসার কোনো মানে হয়! তুমি তো নিজের কাজ নিয়ে থাকছ সারাদিন। তাহলে মা কাকে নিয়ে থাকবেন? তা বলো, একলা ঘরে মুখ বুজে সারাদিন থাকতে পারে মানুষ?

পারেন না বলেই তো মায়ের মন খারাপ। মন খারাপ থেকেই হল শরীর খারাপ। শরীর খারাপ হলে সে তো আর লুকোনো যায় না। মায়ের মুখ দেখে ঠিক বুঝতে পেরেছে আফজল। মাকে জড়িয়ে ধরল আদর করে। জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে মা?’

মা বললেন, ‘না না, কিছু না।’

ছেলে বলল, ‘তবে, তোমার চোখ ছলছল করছে কেন? মুখখানা শুকনো কেন? গরম কেন গা? কী হয়েছে বলো!’

‘বলছি তো কিছু হয়নি।’

ছেলে শুনল না। বলল, ‘তবে আমি যাই কবরেজমশাইকে ডেকে আনি। তিনি যদি বলেন তোমার কিছু হয়নি, তা হলেই আমি মানব।’ বলেই ছুট দিল আফজল।

মায়ের কথা শুনে থামল না আফজল। সে ছুটল কবরেজখানায়। কবরেজখানায় পৌঁছে সে হাঁক পাড়ল, ‘কবরেজমশাই, কবরেজমশাই বাড়িতে আছেন কি?’

আফজল ছুটতে ছুটতে হাঁপিয়ে গেছে।

কবরেজমশাই সাড়া দিলেন, ‘কে ডাকে রে?’

কবরেজমশাই দেখা দিলেন। আফজলকে ঘরে ডাকলেন। কী হয়েছে, জিগ্যেস করলেন।

আফজল বলল, ‘আপনি একবার আমাদের বাড়িতে যাবেন? মায়ের অসুখ করেছে।’

‘কী অসুখ?’ জিগ্যেস করলেন কবরেজমশাই।

‘তা তো জানি না।’ জবাব দিল আফজল।

কবরেজ বললেন, ‘চ তবে, তোর মাকে দেখে আসি।’

কবরেজমশায়ের ওষুধের বাক্সটা আফজল নিজেই নিল। একটুও ভারী নয়। হনহনিয়ে চলল মায়ের কাছে, বাড়িতে।

কবরেজমশাই আফজলদের বাড়িতে ঢুকলেন। যে ঘরে মা আছেন, সেই ঘরে বসলেন। মায়ের নাড়ি টিপলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘কী হয়েছে মা?’

মা বললেন, ‘তেমন কিছু নয়।’

‘তবে মুখ কেন শুকনো? মন খারাপ?’ জিগ্যেস করলেন কবরেজমশাই।

শুকনো মুখে মা শুধু হাসলেন। কিছু বললেন না।

কবরেজমশাই বললেন, ‘বুঝেছি।’ বলে, বাক্স খুলে ওষুধ দিলেন। তারপর আফজলকে ডাকলেন আড়ালে। বললেন, ‘শোন বাছা, তোর মায়ের অসুখটা খুব যে খারাপ, তেমন নয়। আবার খুব ভালো তাও-ও বলি না। তোর মা সারাদিন একলা থাকেন। চুপচাপ। কেউ কথা বলার নেই। তা-ই তোর মায়ের দরকার একজন সাথি। তা হলেই রোগ সারবে। দ্যাখ, কী করতে পারিস।’ বলতে বলতে করবেজমশাই চলে গেলেন।

খুবই ভাবনা হল আফজলের। এখন, কোথায় পাবে সে মায়ের সাথি? কে খুঁজে দেবে?

অনেক ভাবল আফজল। ভাবতে ভাবতে সারা হল। তারপর ঠিক করল, মায়ের সাথি সে নিজেই খুঁজে আনবে। তাই সেদিন সে কাগজ নিল। কালি নিল। কলম নিল। কাগজে বড়ো বড়ো করে লিখল—আমার নাম আফজল, আমার মায়ের একজন সাথি চাই। সে মায়ের কাছে থাকবে। তাকে খাবার দেব। কাপড় দেব। আর যা চাইবে, তাই দেব। কে রাজি আছ?’ লিখে জামার বুকে সাঁটল। তারপর মাকে বলল, ‘তুমি ভেবো না। কবরেজমশাই বলেছেন, সাথি পেলেই তোমার অসুখ ভালো হয়ে যাবে।’

মা কিছু বললেন না। হাসলেন তেমনি শুকনো মুখে।

আফজল হাঁটতে হাঁটতে চলে এল বনের দিকে। তার সামনে পড়ল একটা গোলাপগাছ। গোলাপগাছে একটি গোলাপ ফুটে আছে। গোলাপের নজর পড়ল জামার দিকে। আফজলকে ডাকল। বলল, ‘ও আফজল, আমি তোমার মায়ের সাথি হতে রাজি আছি। আমার খাবারও চাই না, কাপড়ও চাই না, একটু থাকতে দিলেই হবে।’

আফজল বলল, ‘ওমা সে কী কথা! তুমি গাছের ফুল। তুমি সাথি হবে কেমন করে? তোমাকে গাছ থেকে তুলে নিলেই তো তুমি শুকিয়ে যাবে। শুকিয়ে গেলেই, তোমার পাপড়ি খসে পড়বে। তখন কী হবে? না, না তুমি যেমন আছ গাছেই থাকো। আমি আর কাউকে খুঁজি।’ বলে গোলাপকে সেলাম করে বনের ভেতর এগিয়ে চলল।

আফজল বেশ খানিকটা গেছে। এমন সময়ে একটা দোয়েল পাখি তাকে দেখতে পেয়েছে। আফজলের জামায় সাঁটা লেখাটাও তার নজরে পড়ল। পাখি বলল, ‘ও আফজল, আমি তোমার মায়ের সাথি হতে রাজি আছি। আমায়. তুমি নিয়ে যাবে? আমি কিছুই চাই না। আমায় দুটি মুগ-মুসুরি খেতে দিলেই হবে।’

দোয়েলের কথা শুনে আফজলের ভারি ভালো লাগল। বলল, ‘তুমি আমার মায়ের সাথি হলে ভালোই হয়। তুমি নাচতে জানো। গাইতে জানো। মা খুশিই হবেন। তবে বাবু একটা কথা মনে রেখো। সাঁঝ নামলেও তোমায় মায়ের কাছে থাকতে হবে। তখন বাসায় ফেরার কথা বললে চলবে না।’

দোয়েল বলল, ‘এই তো মুশকিলের কথা বললে, সাঁঝ নামলে ছানাপোনারা একলা থাকবে। বাসায় আমায় ফিরতেই হবে।’

‘তবে বাবু থাক। ঠিক কথাই তো। ছানাপোনাদের একলা ফেলে মা কি আর কোথাও থাকতে পারে! না, থাকা উচিত? তার চেয়ে আমি আর কাউকে দেখি। কিছু মনে করো না।’ বলে, আফজল মায়ের সাথি খুঁজতে বনের আরও ভেতরে ঢুকল।

কিছুটা যেতেই সামনে পড়ল একটা ভালুক। গাবদাগাবুস। সেই ভালুক চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমি পড়তে পারি, আমি পড়তে পারি। তোমার বুকে সাঁটা কাগজের লেখা আমি পড়ে ফেলেছি। আফজল, আমি তোমার মায়ের সাথি হব।’

আফজল হেসে ফেলল। বলল, ‘তবেই হয়েছে! তোমায় কে দেখে তার নেই ঠিক! থেকে থেকে তুমিই তো জ্বরে কেঁপে গড়াগড়ি খাও মাটিতে। তখন তুমি মাকে দেখবে, না, মা তোমাকে দেখবে? কাজ নেই বাবা তোমার সাথি হয়ে।’’ বলতে বলতে ভালুককে একটা কুর্নিশ করল আফজল। করে, বনের আরও ভেতরে ঢুকে পড়ল।

গভীর বনে ঢুকে এবার একটু গা ছম ছম করতে লাগল আফজলের। করবেই। কেন-না, বনের এত ভেতরে কোনোদিনই ঢোকেনি আফজল। তবে তাকে আরও ভেতরে ঢুকতে হল না। সামনেই পড়ল হাতি। বাব্বা! তার আবার মুখের দু-পাশে ঝকঝকে দাঁত।

হাতি আফজলকে দেখেই বলল, ‘তোর ওই বুকের লেখাটা খুলে ফেলে দে আফজল। ওটার দরকার লাগবে না।

‘কেন?’ আফজল অবাক হয়ে জিগ্যেস করল।

‘আমাকে নিয়ে চ। আমি হব তোর মায়ের সাথি। নে, আয়! আমার পিঠে চাপ!’ বলতে বলতে হাতি শুঁড় বাড়াল।

হাতির কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল আফজল। এত যে ভয় করছিল, তা ভুলেই গেল। আফজল বলল, ‘হাতিদাদা, তুমি যে মায়ের সাথি হতে চাও, শুনে খুব ভালো লাগছে। তবে দাদা, আমাদের বাড়ি তো এইটুকু। এইটুকু বাড়িতে তোমায় থাকতে দেব কোথায়? তুমি তো ঘরে ঢুকতেই পারবে না। মায়ের সাথি হবে কেমন করে?’

‘ও তা-ও তো বটে।’ বলে হাতি একটা হাঁফ ছাড়ল। তারপর বলল, ‘তা হলে আর কী করা যাবে। তবে আর কাউকে দ্যাখ!’

আর কাউকে দেখতে হলে বনের আরও গভীরে পাড়ি দিতে হয়। এখানেই বন এমন ঘন। এখানেই ভয়ে গা ছমছম করছে! না জানি বনের আরও ভেতরে গেলে আরও কী হয়!

উপায় নেই। যেতেই হবে। এতটা এসেও তো আর ফিরে যাওয়া যায় না। যেমন করে হোক একজন সাথি নিয়ে যেতেই হবে।

এই ভেবে সে আরও একটু এগিয়ে গেল।

দু-পাও যায়নি। এমন সময় দেখে কী, সামনে একটা বাঘ! সে বন কাঁপিয়ে দিল হুঁwকার।

আফজল তো ভয়ে এইটুস! আর কিছু না পেয়ে উঠে পড়েছে গাছে। তরতরিয়ে। উঠলে কী হবে! এ বাবা বাঘের চোখ! ঠিক দেখতে পেয়েছে! হাঁক পেড়েই ডাক দিয়েছে, ‘এই ছেলেটা, তুই হাঁদা, নাকি গাধা? অমন তড়বড় করে গাছে উঠে পড়লি। ভাবলি, আমি তোকে খাব? দুর বোকা আমি তোকে খাব না। আমি তোদের বাড়ি যাব। তোর মায়ের সাথি হব।’

ভয়ে চুপ আফজল এবার সাহস পেল। সাহস পেলেও গাছ থেকে নামল না। ওপর থেকেই চেঁচাল, ‘তুমি আমায় অকথা-কুকথা বলছ কেন? কেন আমাকে হাঁদা বললে? ঠিক আছে, হাঁদা কথাটা না-হয় তোমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। গাধা বললে কেন? বাঘ বলে কি মাথা কিনে নিয়েছ? এসব কথা শুনলেই বোঝা যায় তুমি কেমন সাথি হবে। সাথি হওয়ার নাম করে তুমি যে আমার মাকে খেয়ে ফেলবে, এ আমি বুঝতে পেরেছি। যাও! তোমার মতো সাথির দরকার নেই। তুমি ভারি চালাক।’

ঠিক ধরে ফেলেছে আফজল।

বাঘ মনে মনে ভীষণ আফশোস করতে লাগল। না, না, গাধা বলাটা মোটেও উচিত হয়নি। ওই গাধা বলেই এমন একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই বাঘ আর সাধাসাধি করল না। এখন মানে মানে সরে পড়াই ভালো।

বাঘ সরেই পড়ল।

আফজল তো আর বোকা নয়। তাই বাঘ চলে গেলেও সে হুট করে গাছ থেকে নামল না। যদি ঘাপটি মেরে বসে থাকে বনের ঝোপঝাড়ে। বলা তো যায় না!

আরও অনেকটা সময় তার কাটল গাছের ওপর। তারপর তার মনে হল বাঘ কাছেপিঠে নেই। তখন নামল গাছ থেকে; নেমে ভাবল, এবার সে কী করবে! আরও দূরবনে যাওয়া কি ঠিক হবে!

এমনি করে ভাবতে ভাবতে সে এধার-ওধার করছিল। হঠাৎ তার মনে হল, একটা কী পড়ে আছে ঝোপের ভেতর। একটু দূরে ক-পা এগিয়ে গেল সে। গিয়ে দেখে কী, সেটা একটা বাজনা! ঝটপট তুলে নিল সেটা। ধুলো ময়লায় কী দশা হয়েছে। নিজের কাপড়ের খুঁট দিয়ে ঝেড়েঝুড়ে ময়লা সাফ করে ফেলল। ওমা, এ কেমন বাজনা! মাত্র একটা তার। এই ভালো যে তারে মরচে পড়েনি। হাত দিয়ে তারে টান দিল। দিতেই বেজে উঠল টুং! যেই বেজেছে, অমনি খুশিতে চেঁচিয়ে উঠল আফজল, ‘এই তো আমার মায়ের সাথি। মা আমার গান জানেন। মা গান করবেন আমি বাজনা বাজাব। কী মজা! কী মজা!’ বলতে বলতে সে ছুট দিল। বন টপকে ঘরে ফিরল। তারপর হাসিতে খুশিতে লুটোপুটি খেয়ে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর বাজনাটা নিজের পেছনে লুকিয়ে রাখল। হাসতে হাসতে জিগ্যেস করল মাকে, ‘বলো তো মা, কী এনেছি?’

মা মুচকি হেসে বললেন, ‘পেছনে লুকিয়ে রাখলে বলব কেমন করে?’

ওমনি ঝট করে মায়ের মুখের সামনে হাত বাড়িয়ে বাজনাটা এগিয়ে দিল। বলল, ‘তোমার সাথি!’

মা অবাক হলেন। বাজনাটা হাতে ধরলেন। বললেন, ‘এ-বাজনা কোথায় পেলি তুই? এ তো একতারা!’

ছেলে বলল, ‘বনের শুকনো পাতার আড়ালে পড়ে ছিল।’

‘টুং—ওমা এ যে বাজছে!’ তারে টান দিলেন মা। আবার বাজল ‘টুং’।

একবার নয়, দু-বার নয়, বার বার বাজাতে ও গাইতে লাগলেন মা।

আর, বাজনার সেই গানের সঙ্গে নাচতে নাচতে আফজল বলতে লাগল মায়ের সাথি খুঁজে পেয়েছি। সাথি পেয়ে দ্যাখো দ্যাখো, মা কেমন গান গাইছেন। এখন আর কী ভাবনা। একতারা বাজিয়ে মা গান গাইবেন। আমি নাচব।

মা হেসে উঠলেন। তারপরেই মা আফজলের কপালে চুমু দিলেন। বললেন, ‘আফজল আমার সোনা ছেলে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%