আলোর চমক

শৈলেন ঘোষ

মঞ্চ

[নাটকে তিনটি দৃশ্য। দৃশ্যগুলি যাতে সহজেই পরিবর্তন করা যায় তার জন্য নীচের পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। প্রথম এবং তৃতীয় দৃশ্যটি একই রাস্তার। দ্বিতীয় দৃশ্যটি সুলতানের দরবারের। রাস্তার দৃশ্যে একটি দাওয়া এবং একটি আলোকস্তম্ভ থাকবে। সুলতানের দরবারের দৃশ্যে দাওয়াটি যথাস্থানে থাকবে। শুধু দাওয়ার ওপর একটি রাজসিংহাসন বসাতে হবে। সিংহাসনের দু-পাশে ভালো কাপড় ঢাকা দিয়ে দুটি বেঞ্চ বসিয়ে দিলেই চলবে। এই বেঞ্চে পাত্র-মিত্র, সভাসদ বসবে। আলোকস্তম্ভটি সরিয়ে ফেলতে হবে। ইচ্ছে করলে রাজসিংহাসনের পেছনে জাফরিও বসানো যায়। তৃতীয় দৃশ্য এলে রাজসিংহাসন, বেঞ্চ ও জাফরি সরিয়ে আবার আলোকস্তম্ভটি আগে যেখানে ছিল সেখানে বসাতে হবে। এগুলি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হবে।]

পোশাক

[কেবলমাত্র একটি ক্ষেত্রে পোশাক পরিবর্তনের ঝক্কি আছে। সে-পরিবর্তন নাজিরের। দ্বিতীয় দৃশ্যের পর তৃতীয় দৃশ্যে নাজির যখন প্রবেশ করছে, তখন তার ছদ্মবেশ। তখন সময়ের ব্যবধান অল্প থাকায় তাকে গালে একটি দাড়ি বেঁধে নিয়ে একটি কালো কাপড়ের আলখাল্লা পরে নিতে হবে। অবশ্য যারা আরও ভালোভাবে করতে চায়, তাদের সে-স্বাধীনতা তো আছেই।]

চরিত্র

[একটি ছেলে (আলোর দাদা) : জমাদার : ওস্তাগর : জহুরি : সওদাগর : প্রথম কোতোয়াল : দ্বিতীয় কোতোয়াল : নাজির: সুলতান : ছত্রধারী : সোরাব : ইয়াসিন : পাত্র-মিত্র : সিপাই-সামন্ত : আলো (ছেলেটির ছোটো বোন)]

প্রথম দৃশ্য : রাস্তা

[রাতের অন্ধকার কাটছে। ধীরে-ধীরে সকালের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। দেখা গেল অনেক দিন আগের এক সুলতানের রাজধানী-শহরের একফালি রাস্তা। রাস্তার একপাশে একটি ছোট্ট দাওয়া। একটি আলোকস্তম্ভ। রাস্তার ওই ছোট্ট দাওয়াটির ওপর গুটিশুটি মেরে একটি ছেলে ঘুমোচ্ছে। তার মাথায় একটি কাপড়ের পুঁটলি। খুব বেশি হলে তার বয়েস এগারো-বারো বছর। রাস্তায় লোকজন নেই। এদিকের রাস্তাটা একটু নির্জনই বলা যায়। দেখা গেল, একজন জমাদার একটা লাঠির ডগায় ঝাড়ু বেঁধে রাস্তা সাফ করতে করতে এগিয়ে আসছে। আনমনেই লোকটি রাস্তায় ঝাড়ু দিচ্ছিল, আর নিজের মনে গুনগুন করে গান করছিল। হঠাৎ সে দাওয়ায় ঘুমন্ত ছেলেটিকে দেখতে পেল। সে মুহূর্ত থামল। ছেলেটিকে ভালো করে দেখল।]

জমাদার : [ছেলেটিকে দেখে, বিদ্রুপ করে] ঘুমোচ্ছেন! ঘুমোও বাপধন, আরও ঘুমোও! নাক ডাকিয়ে ঘুমোও! সারারাত ধিঙ্গিপনা করেছ, এখন ঘুমোবে বইকি! [হঠাৎ কড়কে উঠে] ওহে নবাবপুত্তুর!

[ছেলেটি চমকে ধড়ফড় করে উঠে বসে পড়ল। বসেই সে মাথার পুঁটলিটা দু-হাত দিয়ে জাপটে ধরল। ঘুম-চোখে হতভম্বের মতো এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। তারপর জমাদারের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।]

জমাদার : [তেমনিই তিরিক্ষি মেজাজে] নবাবপুত্তুরের ঘুম ভেঙেছে! [ধমক দিয়ে] এই হতচ্ছাড়া, এইটা কি ঘুমোবার জায়গা! উটকো ঝঞ্ঝাট কি যত এখানেই জোটে!

[ছেলেটি ভয়ে ভয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়েই রইল।]

জমাদার : চোখ দুটো দ্যাখো, যেন পটকা-ফাটা পটলভাজা! মনে হচ্ছে, নবাবপুত্তুরের কাঁচা ঘুমটা চটকে গেল। [আবার কড়কে উঠে] ওঠ!

[ছেলেটি পুঁটলিটা বুকের সঙ্গে হাত দিয়ে আঁকড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।]

জমাদার : [ধমক দিয়ে] হাট এখান থেকে।

[ছেলেটি সন্ত্রস্ত-চোখে স্তব্ধ হয়ে দেখতে লাগল।]

জমাদার : [আবার ঝাড়ু দিতে-দিতে] খুব মজা না! এখানে শুয়ে থাকলে তো আর ভাড়া দিতে হচ্ছে না। কেউ বারণও করছে না। সবটাই ফোকটসে!

[ছেলেটি নিশ্চুপ।]

জমাদার : [ঝাড়ু দিতে-দিতে হঠাৎ যেন ছেলেটির হাতের ওই পুঁটলিটির দিকে নজর পড়ে গেল] ওইটি বুঝি কাল রাতে হাতিয়েছ? কী আছে ওটির ভেতরে বাপধন? টাকাকড়ি, না, সোনাচাঁদি?

[ছেলেটি চুপটি করে দাঁড়িয়ে একবার পুঁটলিটা আর-একবার লোকটার মুখ দেখতে লাগল।]

জমাদার : কেমন ঘোড়েল দেখেছ! পাছে কেউ সন্দেহ করে তাই একটি ছেঁড়া কাপড় দিয়ে পুঁটলিটি বেঁধে রেখেছে। ভাবছে, আমাকে ধোঁকা দেবে। অতই সোজা। তুই তো কালকের ছেলে রে। [হঠাৎ তেড়ে ওঠে] কথা বলছিস না কেন? কোতোয়ালকে ডাকব দেখবি!

[ছেলেটির চোখ দুটি ভয়ে বিস্ফারিত হল।]

জমাদার : মনে করেছিস মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি ছেড়ে দেব! [ছেলেটির মুখের সামনে এগিয়ে এসে] কী আছে তোর পুঁটলির ভেতর?

[ছেলেটি ভয়ে-ভয়ে ঘাড় নাড়ল, যার মানে, কিছু না।]

জমাদার : [তীক্ষ্ণস্বরে] বলবি না! দাঁড়া। [হঠাৎ চেঁচিয়ে] চোর! চোর!

[ছেলেটি ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। এখন সে যে কী করবে কিছু ঠিক করতে না-পেরে ছুটে পালাতে গেল। পালাতে গিয়ে তার হাতের পুঁটলিটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল। সেদিকে ছেলেটি আর দেখল না। পালাল। অমন করে ছেলেটিকে পালাতে দেখে জমাদার প্রথমটা হকচকিয়ে গেল। তারপর হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে পুঁটলির কাছে এসে যেই পুঁটলিটা তুলেছে, সঙ্গে-সঙ্গে মঞ্চের এদিক-ওদিক থেকে ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করে, জমাদারের দিকে আঙুল তুলে তিনজন লোক উপস্থিত হল। তারা তখনও ‘চোর, চোর’ বলে চিৎকার করছে। এই তিনজনের একজন ওস্তাগর, একজন সওদাগর, আর একজন জহুরি।]

জমাদার : [প্রথমটা থতোমতো খেয়ে] কই চোর? কই চোর?

তিনজনে : [একসঙ্গে] তুই চোর! তুই চোর! [জমাদারের দিকে তখনও তাদের আঙুল স্থির।]

জমাদার : [প্রথমটা থতোমতো খেয়ে গেলেও, পরে যখন বুঝল তিনজনে তাকেই চোর ঠাউরেছে, তখন রেগে] মুখ সামলে কথা বলবে!

ওস্তাগর : অ্যাঁ! ব্যাটা চুরিও করবে, আবার চোখও রাঙাবে!

সওদাগর : [ঘুসি দেখিয়ে] এমন দেব একখানি যে বুকের কাঁপকাটি ছেতরে যাবে।

জহুরি : আরে বাবা ঘুসো দিতে হবে কেন। আমার একখানি ঠুঁসো খেলেই বাছাধনের কম্ম শেষ!

জমাদার : [ঝাড়ু তুলে ওদের দেখিয়ে] দেখি তোদের মুরোদ কত! মার!

ওস্তাগর : [তর্জন-গর্জন করে] কী! ভদ্রলোকের মুখের ওপর ঝাড়ু তোলা! তুইও মার! দেখি তোর কত বড়ো বুকের পাটা!

সওদাগর : [ক্ষিপ্ত স্বরে] ওই ঝাড়ু তোর মুখে ঘসে দেব ব্যাটা!

জমাদার : [ঝাড়ু নামিয়ে] ব্যাটা-ব্যাটা করবে না বলে দিচ্ছি!

ওস্তাগর : [রুখে] কেন, কী করবি তুই?

জহুরি : এমন ধড়িবাজ, রাত্তিরে আমার চোখে যখন ঘুমটি সবে এসেছে, ঠিক তখনই পাঁচিল টপকে আমার ঘরে ঢুকে বাক্স ভেঙেছে।

সওদাগর : [জহুরির কথা শুনে, জহুরির দিকে চেয়ে, ফোঁস করে উঠল] এখানে আবার তোমার বাক্স আসে কোত্থেকে? বাক্স তো ভেঙেছে আমার।

ওস্তাগর : [খেঁকিয়ে উঠে] বা:! বা:! চোরটাকে ধরলুম আমি, আর বাক্স ভাঙল তোমাদের!

জহুরি : তুমি আবার কখন চোর ধরলে, ধরলুম তো...

সওদাগর : [জহুরির মুখ থেকে কথাটা লুফে নিয়ে] আমি। আমি সবচেয়ে আগে দেখতে পেয়েছি। আমি সবচেয়ে আগে ছুটে এসেছি।

জহুরি : [ঝগড়ার গলায়] তুমি দেখতে পারো, কিন্তু চুরি গেছে আমার!

জমাদার : ওহে বাবুরা, তোমরা যত পারো ঝগড়া করো। আমায় যেতে দাও! আমার অনেক কাজ পড়ে আছে। [যাবার জন্য পা বাড়াল।]

ওস্তাগর : [জমাদারের পথ আগলে] তুই কোথায় যাবি! এত মেহনত করে আমার জিনিস সমেত চোর ধরলুম, এখন ছেড়ে দেব!

জমাদার : [রুখে] এ-জিনিস তোমার কে বলেছে?

জহুরি : ঠিক কথা, এ-জিনিস তোমার নয় আমার।

সওদাগর : বা:! মধ্যিখান থেকে আমি ফক্কা!

জমাদার : [নির্ভয়ে] তোমরা সাফ-সাফ শুনে রাখো, এ-জিনিস আমি কাউকে দেব না! [ওস্তাগরকে হটিয়ে দিয়ে] সরো! [বেরিয়ে যাবার জন্য আবার পা বাড়াল।]

ওস্তাগর : [জমাদারের পথ আবার আগলে দাঁড়াল] এই জোচ্চোর, আমার গায়ে ঠেলা দিলি কেন। চুরিও করবি, আবার ঠেলাও মারবি! [ঝট করে জমাদারের গলাটা ধরে] দেখি তোর কত কলজের জোর।

জহুরি : ঠিক হ্যায়! হয়ে যাক এসপার-ওসপার।

জমাদার : [হাত থেকে ঝাড়ু আর পুঁটলিটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ওস্তাগরের হাতে একটা ঝাপটা মারল। ওস্তাগারের হাত ওর গলা থেকে ছিটকে গেলে] তুমি আমার গলা টিপলে কেন? [খেপে গেল]

ওস্তাগর : [রুখে] বেশ করেছি!

[সঙ্গে-সঙ্গে জমাদার ওস্তাগরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর মঞ্চের একদিকে পড়ে দু-জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি লেগে গেল। দু-জনেরই মুখে আস্ফালন আর গলায় চোটপাটের শব্দ। ওদিকে ওস্তাগর আর জমাদার মারামারি করছে, আর এদিকে জহুরি আর সওদাগর জমাদারের হাত থেকে ছিটকে পড়া সেই পুঁটলিটার দিকে লোলুপ-দৃষ্টি হানছে। হঠাৎ তাল বুঝে সওদাগর পুঁটলিটা ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে পালাতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জহুরি তাকে জাপটে ধরেছে।]

জহুরি : [চেঁচিয়ে] পালাচ্ছে! পালাচ্ছে!

[লেগে গেল জহুরির সঙ্গে সওদাগরের টানাটানি। তারপর কোস্তাকুস্তি। একদিকে জমাদার আর ওস্তাগরের মধ্যে হাতাহাতি চলছে, আর একদিকে জহুরি আর সওদাগরের মধ্যে কোস্তাকুস্তি চলছে। এমন সময়ে একফাঁকে জহুরির হাত ছাড়িয়ে সওদাগর পুঁটলিটা নিয়ে ছুটতে গেল। জহুরি নাছোড়বান্দা। সওদাগরকে তাড়া করল। সওদাগর কোন দিকে যাবে ঠিক করতে না পেরে মঞ্চের ওপরেই জহুরির তাড়া খেয়ে ছুটতে লাগল।

একদিকে জমাদার আর ওস্তাগরের মধ্যে লড়াই, আর-একদিকে সওদাগর আর জহুরির মধ্যে ছোটাছুটি, চ্যাঁচামেচি। এমন সময় হঠাৎ ওস্তাগর সওদাগরের হাতে পুঁটলিটা দেখে জমাদারের সঙ্গে মারামারি থামিয়ে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। সওদাগরের দিকে ধেয়ে গেল। সওদারগরকে তারা ধরে ফেলল। কিন্তু টাল সামলাতে পারল না। চারজনে একসঙ্গে হুড়মুড় করে এ-ওর ঘাড়ে পড়ল। সওদাগরের হাত থেকে পুঁটলিটা ছিটকে পড়ল সামনে। চারজনেই ভীষণ হাঁফাতে লাগল। তাদের নিশ্বাসের শব্দটা জোরে-জোরে শোনা গেল।]

জমাদার : [হাঁফাতে-হাঁফাতে উঠে দাঁড়িয়ে] আমরা চারজনই আহাম্মক। যে চোর সে চোখে ধুলো দিয়ে সটকে পড়ল, আর মধ্যিখান থেকে চোরাই জিনিস নিয়ে আমরা মরছি মারামারি করে।

[সওদাগর, ওস্তাগর আর জহুরি ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে।]

সওদাগর : মানে! তুই কী বলতে চাস! তুই চুরি করিসিনি?

জমাদার : [বিদ্রুপ করে] হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছ না, সকালবেলা ঝাড়ু হাতে নিয়ে আমি চুরি করতে বেরিয়েছি।

ওস্তাগর : তবে কে চুরি করল?

জমাদার : একটা ছেলে। সে এই পুঁটলিটা এই রাস্তায় ফেলে পালিয়েছে।

সওদাগর : তার মানে, আমরা নিজেদের মধ্যে ঝুটমুট মারামারি করলুম?

জহুরি : আসলে আমরা সকলেই আকাট মূর্খ। পুঁটলিটা যে খুললেই যার জিনিস সে পেয়ে যায়, এটা আর আমাদের মাথায় ঢুকল না। সুতরাং, পুঁটলিটা খুলে দেখা হোক।

ওস্তাগর : খুললে, ওর মধ্যে যদি আমার জিনিস না থাকে?

জহুরি : তুমি পাবে না।

সওদাগর : আমারও তো জিনিস না-থাকতে পারে?

জহুরি : না-থাকলে তুমিও পাবে না।

ওস্তাগর : এটা কিন্তু ঠিক ব্যবস্থা হল না। ব্যবস্থাটা এমন হওয়া উচিত, এতে যদি আমাদের কারও জিনিস না-থাকে, তখন ধরতে হবে এ-জিনিসগুলি আমাদের সকলের। আমরা চারজনে সমান চারটি ভাগে ভাগ করে নেব।

ওস্তাগর : [তারিফ করে] এই অ্যাঃ! এই যে বুদ্ধিটা বাতলেছ তুমি, এ একদম পাক্কা মাথার বুদ্ধি। তুমি কী করো ভাই?

জহুরি : আমি জহুরি। আমার সোনা-চাঁদির কাজ।

ওস্তাগর : (সওদাগরকে) আর তুমি?

সওদারগর : আমি সওদাগর। এই কেনাবেচার ব্যাবসা আর কী! এই ধরো, কখনো করছি জাহাজের ব্যাবসা আবার কখনো ব্যাঙের ঠ্যাং।

ওস্তাগর : তার মানে, আমার মতো আর কি। আমি ওস্তাগর। সাদা কথায় দর্জি। এই কখনো ছোট্ট ছেলের নিকারবোকার সেলাই করছি, আবার কখনো চোগা-চাপকানো বানাচ্ছি।

[সকলে হেসে উঠল। শুধু জমাদার ছাড়া।]

জমাদার : ঠিক আছে বাবুরা। আমাকে তো তোমরা সকলেই চেনো। আমার হাতে যখন ঝাড়ু, তখন বুঝতেই পারছ আমি জমাদার। তোমাদের ওই ভাগাভাগির মধ্যে আমি নেই। [রাস্তায় পড়ে থাকা পুঁটলিটি দেখিয়ে] এখন ওইটির কী ব্যবস্থা তোমরা করবে করো। নইলে আমি ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেব।

জহুরি : সে তুমি ভাগ না-নিতে চাও, আমাদের কিছু বলার নেই। জহুরি, ওস্তাগর আর সওদাগরের দিকে চোখ মটকে ইশারা করল।

[ওস্তাগর আর জমাদার ইশারায় সায় দিল।]

জহুরি : তবে, ওটি তোমাকে ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দিতে হবে না। ওটি আমরাই তুলে নিচ্ছি।

(জহুরি পুঁটলিটি রাস্তা থেকে তুলে নেবার জন্য দ্রুত এগিয়ে যাবার মুখেই সওদাগর তার জামাটা টেনে ধরল।]

জহুরি : [থমকে দাঁড়িয়ে] কী হল?

সওদাগর : তুমি একলা তুলবে কেন? জমাদার যখন রাজি নয়, তখন এতে আমাদের তিনজনের দাবি। আমরা তিনজনে একসঙ্গে তুলব।

ওস্তাগর : ঠিক, ঠিক, ঠিক কথা। তা হলে কথা বাড়িয়ে আর কাজ নেই। এসো, আমরা তিনজনে একসঙ্গে হাত মিলিয়ে ওটি তুলে নিই।

[তিনজনে এগিয়ে গেল। তিনজনে একসঙ্গে হাত বাড়িয়ে পুঁটলিটা ধরতে গেল। ঠিক সেইসময় দু-দিক থেকে দুজন কোতোয়াল মঞ্চে ঢুকে পড়ে, তারা হাতের লাঠি দিয়ে পুঁটলিটা চেপে ধরল। এতক্ষণ জহুরি, ওস্তাগর আর সওদাগরের চোখের দৃষ্টি ছিল পুঁটলিটার ওপর স্থির। লাঠি দেখে তারা চমকে উঠল। তাদের হাত ছুঁতে পারল না পুঁটলিটা। চোখ তুলে কোতোয়ালের মুখের দিকে চেয়ে তারা ভড়কে গেল। চোখের নিমেষে তিনজনে যে যেদিক দিয়ে পারল, মারল ছুট। পালাল জমাদারও।]

[তাদের পালাতে দেখে কোতোয়াল দু-জন প্রথম ‘পালাচ্ছে, পালাচ্ছে’ বলে চিৎকার করে তারপর নিজেরাই হো-হো করে হেসে উঠল।]

১ম কোতোয়াল : [হাসতে-হাসতে] ভীতু, একদম ভীতু।

২য় কোতোয়াল : [হাসতে হাসতে] জমাদারটা পর্যন্ত চম্পট দিয়েছে।

[দু-জনেই বেদম হেসে উঠল।]

১ম কোতোয়াল : আসলে আমরা যে লুকিয়ে-লুকিয়ে ওদের সব কথা শুনে ফেলেছি, ওরা সেটা টেরই পায়নি।

২য় কোতোয়াল : [হেসে] টের পেলে কি আর এতক্ষণ ধরে কচকচানি হত, কখন পালাত। [চড়া সুরে হেসে উঠল।]

১ম কোতোয়াল : [পুঁটলিটা দেখিয়ে] তবে এটাকে আর বেশিক্ষণ রাস্তায় ফেলে রাখা ঠিক হবে না।

২য় কোতোয়াল : তা ঠিক। তোমার কী মনে হয়? পুঁটলির ভেতর কী আছে?

১ম কোতোয়াল : আরে ভাই, জহুরির যখন অত উৎসাহ, তখন আর সন্দেহ নেই। নিশ্চয়ই সোনা-দানা আছে।

[দুজন কোতোয়াল এগিয়ে গেল। দু-জনেই হাতে লাঠি দিয়ে পুঁটলিটা ঠেলাঠেলি করতে লাগল।]

২য় কোতোয়াল : [ঠেলা দিয়ে] ওপর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।

১ম কোতোয়াল : পুঁটলিটা খুলে না ফেললে বোঝা যাবেও না।

২য় কোতোয়াল : তা হলে খুলে ফেললেই হয়।

১ম কোতোয়াল : এই রাস্তার মধ্যিখানে?

২য় কোতোয়াল : রাস্তার মধ্যিখানে কেন? এই আড়ালে গেলেই তো হয়। [আড়ালটা হাত দিয়ে দেখাল।]

১ম কোতোয়াল : ঠিক বলেছিস!

[পুঁটলিটা রাস্তা থেকে তোলার জন্য হাত বাড়াল।]

২য় কোতোয়াল : [হঠাৎ যেন কিছু দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে] এই দাঁড়া!

১ম কোতোয়াল : [চাপাস্বরে] কী হল?

দাঁড়িয়ে পড়ল?

২য় কোতোয়াল : একটা লোক।

[দু-জন কোতোয়ালই প্রায় একদৃষ্টিতে উদগ্রীব হয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখতে লাগল।]

১ম কোতোয়াল : [দেখতে-দেখতে] না, এদিকে এল না। [স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।]

[ঠিক এই তক্কে কোতোয়াল দু-জন যেদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার উলটো দিক থেকে সওদাগর সাবধানে পা টিপে মঞ্চে এসে নি:সাড়ে পুঁটলিটা তুলে নিয়ে পালাতে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে দু-জন কোতোয়ালই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আচমকা সওদাগরকে দেখতেও পেয়েছে। দু-জনেই একসঙ্গে ছুটে গিয়ে সওদাগরকে ধরে ফেলল।]

১ম কোতোয়াল : [সওদাগরের বুকের জামাটা খামচে ধরে] হাসি দেখেছ কান্না দ্যাখোনি!

২য় কোতোয়াল : [লাঠি দিয়ে পেটে খোঁচা মেরে] দেব জন্মের মতো ফুটো করে।

সওদাগর : [গলায় জোর দিয়ে] এটা আমার।

[এই কথা শোনার সঙ্গে-সঙ্গে অন্য আর-একদিক থেকে হুড়মুড় করে ওস্তাগর ঢুকে পড়ল।]

ওস্তাগর : [চিৎকার করে] না হুজুর, ওটা আমার।

সওদাগর : [ওস্তাগরকে দেখে থতোমতো খেয়ে] অ্যাই, তখন কী কথা হয়েছিল? এর ভেতরে যা আছে আমরা সবাই ভাগ করে নেব না! এখন আবার উলটো কথা বলছ কেন?

ওস্তাগর : তবে, তুমিই বা আমাদের ফাঁকি দিয়ে পুঁটলিটা নিয়ে পালাচ্ছিলে কেন?

সওদাগর : আমি কেন পালাতে যাব? জহুরি বলল তো! [ঠিক এই সময়ে জহুরিও ঢুকে পড়ল।]

জহুরি : [রেগে টং] সওদাগর আমার নামে মিথ্যে বলছে। নিজে অপকম্ম করে এখন অন্যের নামে কেমন চালিয়ে দিচ্ছে!

সওদাগর : [ন্যাকামি করে] কী অসভ্য লোক বাবা! আমাকে মিথ্যেবাদী বলছে। তখন তুই আমাকে বললি না?

জহুরি : [ঠিক সওদাগরের মতো ন্যাকামি করে, ভেংচি কেটে গালে হাত দিয়ে] ও মা, কী গুলপট্টি দিচ্ছে! [তারপর কোতোয়ালদের উদ্দেশ্যে] সত্যি বলছি কোতোয়াল সাহেবরা, তোমাদের গোঁফের দিব্যি বলছি, ওকে আমি একদম বলিনি। নিজে ধরা পড়ে এখন আমাকে জড়াচ্ছে।

১ম কোতোয়াল : [ঝাঁঝিয়ে উঠে] সব কটা ধান্দাবাজ! সব কটাকে দেব চালান করে!

২য় কোতোয়াল : আমরা কোথায় ভুল করে পুঁটলিটা এখানে ফেলে গেলুম, [দুই কোতোয়ালের চোখে-চোখে দৃষ্টি বিনিময় হল] অমনি তোদের হয়ে গেল!

[ঠিক এই সময়ে হঠাৎ জমাদারও ঢুকে পড়ল।]

জমাদার : (মজা ও আদরের সুরে ঠাট্টা করে) কোতোয়াল বাবারা?

দু-জন কোতোয়াল : (চমকে একসঙ্গে) কে? কে?

জমাদার : কতদিন চাকরি করছ এই শহরে?

১ম কোতোয়াল : যতদিন চাকরি, ততদিন করছি।

জমাদার : শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ক-টি ছেলে-মেয়ে তোমাদের?

২য় কোতোয়াল : ৬টি ছেলে, ৩টি মেয়ে।

জমাদার : মাইনেপত্তর?

১ম কোতোয়াল : যত টাকায় হয়নে, তত টাকা মাইনে।

জমাদার : তা হলে ওই পুঁটলিটা তোমাদেরই।

কোতোয়াল : [দু-জনে একসঙ্গে] কেন? কেন?

জমাদার : [ঠাট্টা করে] যত টাকায় হয়নে, তত টাকা মাইনে পেলে দু-চারটে অন্যের পুঁটলি হাতাবে বইকি। তা না-হলে সংসারটা চলবে কী করে!

১ম কোতোয়াল : [হুংকার ছেড়ে] ফুককুড়ি হচ্ছে আমাদের সঙ্গে!

২য় কোতোয়াল : [শাসিয়ে] ঘুরিয়ে নাক দ্যাখানো! আমরা চোর!

জমাদার : ছি: ছি:! আপনারা চোর হবেন কোন দুঃখে! আপনারা কোতোয়াল। আপনারা তো চোর ধরেন! তা হলে যদি সাহস দেন তো সত্যি কথাটা বলে ফেলি।

কোতোয়াল : [দু-জনে একসঙ্গে] কী? কী?

জমাদার : আজ্ঞে কোতোয়ালবাবারা, ওই পুঁটলিটা আপনারা এখানে ফেলে যাননি।

১ম কোতোয়াল : [রেগে] আর-একবার বল!

জমাদার : বলছি তো, ফেলে যাননি।

২য় কোতোয়াল : [রেগে ঝট করে জমাদারের ঘাড়টা ধরে] আর-একবার বললে মুখ সেলাই করে দেব।

জমাদার : আমার মুখ সেলাই করলেও সত্যি কথাটাকে তো সেলাই করতে পারবে না।

১ম কোতোয়াল : কোনটা সত্যি কথা?

জমাদার : পুঁটলিটা তোমাদের নয়, এই কথাটা।

জহুরি : [হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল] পুঁটলিটা আমার।

ওস্তাগর : না, না, আমার।

সওদাগর : মিথ্যে কথা, আমার।

[তিনজনেই তারপর একসঙ্গে চ্যাঁচাতে লাগল, ‘আমার আমার’ বলে। হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। তারপর জহুরি, ওস্তাগর আর সওদাগর পরস্পর পরস্পরকে তেড়ে যাবে আর চিৎকার করবে। কোতোয়ালরা ধমক দিয়ে হট্টগোল থামাবার চেষ্টা করল। হট্টগোল যখন থামল না, তখন লাঠি চালাতে লাগল। লাঠি চালিয়ে সবকটাকে মঞ্চে ধারাশায়ী করে আবার টেনে-টেনে তুলল। তারপর কোতোয়াল দু-জন জহুরি, সওদাগর, ওস্তাগর আর জমাদারকে একসঙ্গে গ্রেফতার করল]

১ম কোতোয়াল : [যেমন করে হুকুম জারি করে তেমনিই সুরে] বেআইনিভাবে রাস্তার মধ্যিখানে চোরাই জিনিসের বখরা নিয়ে মারামারি করার জন্য এই চারটে আসামিকে আমরা গ্রেফতার করছি।

২য় কোতোয়াল : [হুকুমজারির সুরে] এই চার আসামির বিচার হবে দীনদুনিয়ার মালিকের দূত আমাদের প্রিয় সুলতান ইয়াসিন মনসুরের দরবারে। এই পুঁটলি কার, সেটা জানা যাবে তাঁর কাছেই। চল!

[দু-জন কোতোয়াল চারজনকে ধরে নিয়ে বেরিয়ে গেল যেদিক দিয়ে ঠিক তার উলটো পথ দিয়ে যার হাতে পুঁটলি ছিল সেই ছেলেটি ঢুকল। সে হতবাকের মতো এদিক-ওদিক দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে তার পুঁটলিটা খুঁজতে লাগল। খুঁজে না-পেয়ে অসহায়ের মতো সেই দাওয়াটার ওপর বসে পড়ল। ধীরে-ধীরে মঞ্চের আলো নিভে গেল।]

দ্বিতীয় দৃশ্য : সুলতানের দরবার

[সুলতানের দরবার-গৃহ। সুলতান এখনও আসেননি। সিংহাসন শূন্য। দরবারের দু-পাশে সুলতানের দর্শন-প্রার্থী রাজ্যের কিছু প্রজা উপস্থিত। প্রজাদের মধ্যে এলোমেলো কথাবার্তার চাপা হট্টগোল শোনা যাচ্ছে। তাদের কথাবার্তা বলার সময় মাঝে-মাঝে দু-একটি শব্দ বোঝা যায়। আবার মাঝে-মাঝে তাদেরই কথা বলার হট্টগোলে কিছুই বোঝা যায় না। এমনই সময়ে বাইরে ভেরি বেজে উঠল। দরবারের সামনের দিকে, একপাশে, একটি মঞ্চে ঘোষক দাঁড়িয়ে ছিল। সেইখানে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা করল।]

ঘোষক : প্রিয় প্রজাগণ, আমাদের মহামান্য সুলতান দরবারের প্রবেশ-দরওয়াজা অতিক্রম করে দরবারের দিকে এগিয়ে আসছেন।

[ঘোষকের ঘোষণা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে দামামা বেজে উঠল। উপস্থিত প্রজারা সুলতানকে অভিবাদন জানানোর জন্য উঠে দাঁড়াল। দামামার তালে-তালে সুলতানের দেহরক্ষী সিপাইরা এগিয়ে এল। তাদের পেছনে সুলতান। সুলতানের পেছনে একজন ছত্রধারী রাজচ্ছত্র ধরে আছে। একেবারে পেছনে নাজির, উজির, পাত্রমিত্র। তারা সুশৃঙ্খলভাবে নিজের-নিজের জায়গা গ্রহণ করল। সুলতান সিংহাসনে বসলেন। সিংহাসনে বসে তিনি উপস্থিত প্রজাদের নিজের-নিজের আসনে বসবার জন্য ইশারা করলেন। ছত্রধারী ছাতাটি যথারীতি তাঁর মাথায় ধরে রইল। সঙ্গে-সঙ্গে একজন ব্যজনদার একটি মস্ত কারুকার্যকরা পাখা হাতে নিয়ে সুলতানকে বাতাস করতে লাগল। সুলতানের নাজির সুলতানের প্রায় কানের কাছে মুখ এনে ফিশফিশ করে কিছু বলল। সুলতান ঘাড় নাড়লেন। নাজির তখন স্বস্থান থেকে ঘোষণা করল।]

নাজির : মহামান্য সুলতান আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আজকের কার্যসূচি শুরু করার জন্য আমাকে আদেশ করেছেন। সেই কারণে আপনাদের জানাই, আপনারা এক-এক করে আপনাদের বক্তব্য তাঁর সামনে পেশ করুন।

[হঠাৎ একজন প্রজা উঠে দাঁড়াল। সে একজন বাচাল গোছের। সে যখন কথা বলে তার মধ্যে একটা রগুড়ে ভাব দেখা যায়।]

নাজির : বলুন, আপনার কী বলার আছে?

প্রজা : [কথা বলার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই তার গলা কাঁপতে লাগল। তার কথা আটকাতে লাগল।] জাহাঁপনা, আমার নাম ইয়াসিন। আমি হুজুরের একজন নগণ্য প্রজা। আমি হুজুর, ছেলেপুলে নিয়ে এই শহরেই বাস করি। শহরে আমার আসবাব তৈরির একটি ছোট্ট কারখানাও আছে। [কাঁদো-কাঁদো স্বরে] হুজুর কী বলব, [একটু কেঁদে নিয়ে] বলতে গিয়ে আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। [থরথর করে কাঁপছে।] আমি বলতে পারছি না। আমার গলা শুকিয়ে আসছে। [ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে] হুজুর আমাকে মাপ করে দিন। আমি বসব!

সুলতান : বসবেনই যদি, তবে উঠলেন কেন? [দরবারে উপস্থিত সকলেই হেসে উঠল।]

ইয়াসিন : অন্যায় হয়ে গেছে হুজুর। গোস্তাকি মাফ করুন। [কাঁদতে-কাঁদতে বসে পড়ল।]

[সকলে হো-হো করে হেসে উঠল।]

সুলতান : খামোশ! খামোশ! [সবাই হাসি থামাল]

সুলতান : এ-আবার কী-রকম! আপনি অমন একজন তাগড়াই লোক, কিছু বলার আগেই কেঁদে ফেললেন!

২য় প্রজা : [এর মধ্যেও একটা রগুড়ে-ভাব আছে, তবে কথা কম বলে। ইয়াসিনের বন্ধু। সুতরাং, ইয়াসিনের কথায় এমন ভাবে সায় দেয় দেখলেই মনে হয়, বোকা-বোকা। হঠাৎ দাঁড়িয়ে ইয়াসিনের মতো কান্না-জড়ানো গলায় নাকি সুরে] হুজুর, আমার নাম সোরাব। [ইয়াসিনকে দেখিয়ে] আমি ইয়াসিনের বন্ধু। আজ্ঞে আমি জানি, কেন ইয়াসিনের না-কেঁদে উপায় নেই। হুজুর, কাল সারারাত ধরে [বলতে-বলতে তোতলাতে লাগল, তারপর যাতে হাউ-হাউ করে কেঁদে না-ফেলে, তাই কান্নাটাকে জোর করে চাপার জন্য চিৎকার করে উঠল] কাল সারারাত আমার ওই বন্ধু ঘুমোতে পারেননি।

সুলতান : আপনার বন্ধু ঘুমোতে পেরেছেন-কী-পারেননি সেটা আপনার বন্ধুই বলবেন। আপনার ঘুম হয়েছে কি না সেটাই আপনি বলুন।

সোরাব : [একটু থতোমতো খেয়ে] আজ্ঞে হুজুর, সেকথা যদি জিগ্যেস করেন তবে মিথ্যে কথা বলব না, জাহাঁপনা, আমি যতবার ঘুমোব মনে করেছি, ততবারই ঘুমিয়ে পড়েছি। কিন্তু একবার কিছুতে চোখে ঘুম এল না।

সুলতান : সেটা কত রাত্তির?

সোরাব : হুজুর, রাত্রি নয়, সেটা সকাল।

সুলতান : সকালে তো মশাই কুঁড়ের বাদশা ছাড়া আর কেউ ঘুমোয় না।

সোরাব : না হুজুর, সে এমন সকাল যখন আমি ঘুমিয়ে থাকি, সূর্য উঠে পড়ে।

সুলতান : ও! তার মানে, রোদ উঠে গেলেও আপনার ঘুম ভাঙে না! [একটু মুচকি হেসে] অত ধানাইপানাই না করে ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলুন দিকি!

সোরাব : আজ্ঞে, বলতে পারলে তো ল্যাঠা চুকেই যেত। কিন্তু যতবারই বলব-বলব মনে করছি, ততবারই বুকের ভেতরটা ধকধক, ধকধক করে কেঁপে উঠছে। তার চেয়ে আমি বসে পড়ি হুজুর।

সুলতান : [ধমক দিয়ে] না, আপনি বসবেন না।

সোরাব : [ধমক খেয়ে বসতে গিয়েও বসা হল না। আচমকা নিজের মনে বলে ফেলল] এই খেয়েছে। এ যে উলটো বিপত্তি হয়ে গেল!

সুলতান : [সবটা শুনতে না পেয়ে গর্জে উঠলেন] কী হয়ে গেল?

সোরাব : [চমকে উঠে] কিছু নয় হুজুর। বিশ্বাস করুন, বলতে আমার ভয় করছে! [ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল।]

সুলতান [সোরাবকে ঠকঠক করে কাঁপতে দেখে মনে হল লোকটা তামাশা করছে। তাই ইয়াসিন আর সোরাবের দিকে আঙুল তুলে] আপনারা দু-জন কি আমার সঙ্গে তামাশা করতে এসেছেন! এটা রাজদরবার। আপনাদের তামাশার জায়গা নয়। আপনারা যদি না-বলেন দু-জনকেই আমি কয়েদে পুরে ঘানি টানাব।

সোরাব ও ইয়াসিন : [একসঙ্গে চিৎকার করে] ওরে বাবা রে, বাবা রে। [চোখের পলকে সুলতানের পায়ের কাছে ছিটকে পড়ে] হুজুর আমাদের মা-বাপ।

সুলতান : তবে বলুন!

ইয়াসিন : [মড়া-কান্নার মতো চিৎকার করে] হুজুর, আমাদের এই সুখের রাজ্যে চোর ঢুকেছে!

সুলতান : [অবাক হয়ে] চোর!

সোরাব ও ইয়াসিন : [একসঙ্গে] হ্যাঁ হুজুর, চোর!

ঠিক এইসময়ে, অর্থাৎ চোর বলার সঙ্গে-সঙ্গে রাজদরবারের বাইরে জুতোর গটমট শব্দ শোনা গেল। বোঝা গেল, কারা যেন রাজদরবারেই আসছে। দরবারসুদ্ধু লোকের উদগ্রীব চোখ সেই দিকেই।

সুলতান : কারা আসছে?

[সুলতানের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সেই দু-জন কোতোয়াল, ওস্তাগর, জহুরি, সওদাগর ও জমাদারকে পাকড়াও করে সুলতানের সামনে হাজির করল। একজন কোতোয়ালের হাতে দেখা গেল সেই পুঁটলিটা। সুলতানের পায়ের কাছে এতক্ষণ পড়ে ছিল ইয়াসিন আর সোরাব। তারা সঙ্গে-সঙ্গে উঠে পড়ল। কোতোয়াল কুর্নিশ করল সুলতানকে।]

সুলতান : [তাদের সকলের ওপর চোখ বুলিয়ে] কী ব্যাপার!

১ম কোতোয়াল : হুজুর, এই যে চারজন লোককে দেখছেন, এদের একজন ওস্তাগর [ওস্তাগর মাথা হেঁট করল], একজন জহুরি [জহুরি যথারীতি মাথা হেঁট করল], একজন সওদাগর [সওদাগর মাথা হেঁট করল] আর এ হচ্চে জমাদার [জমাদারও মাথা নোয়াল] এই চারজনে হুজুর, শহরের শান্তি ভঙ্গ করেছে।

সুলতান : কীরকম?

২য় কোতোয়াল : [পুঁটলিটা সুলতানকে দেখিয়ে] এই পুঁটলিটার মালিকানা-স্বত্ব নিয়ে এরা রাস্তায় মারামারি করছিল।

সুলতান : [অবাক হয়ে] পুঁটলি নিয়ে মারামারি!

১ম কোতোয়াল : আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর। এটি একটি চোরাই জিনিস।

সুলতান : [আরও অবাক হয়ে] চোরাই জিনিস! আমার রাজ্যে চোর কোত্থেকে এল?

ইয়াসিন : [হঠাৎ চেঁচিয়ে] আমরা ঠিক কথা বলেছি কি না দেখলেন তো হুজুর!

সুলতান : [ইয়াসিনকে থামিয়ে] আপনি চুপ করুন!

২য় কোতোয়াল : আজ্ঞে হুজুর, চোর কোত্থেকে এল, সেটা তদন্তসাপেক্ষ। কেন-না, আসল চোর ধরা পড়েনি। সে পালিয়েছে। কিন্তু এই চোরাই জিনিসটা এরা সকলেই দাবি করছে নিজের বলে।

জমাদার : [কটাক্ষ করে] আপনাদের কথাটা চেপে গেলেন কেন কোতোয়াল বাবারা?

ওস্তাগর : ঠিক কথা! আপনারাও তো ওই পুঁটলিটা হাতিয়ে নেওয়ার তাল করেছিলেন। পারলেন না বলেই তো... [একজন কোতোয়াল সুলতানের সামনে চিৎকার করতে না-পেরে দাঁতে-দাঁত চেপে চোখ পাকাল। অন্য কেউ দেখতে পেল না। কিন্তু ওস্তাগর ভয় পেয়ে সব কথা শেষ করতে পারল না।]

সওদাগর : চোখ রাঙালে কী হবে! ও তো নির্যাস কথাই বলেছে।

১ম কোতোয়াল : [সওদাগরের কথাটা চাপা দেবার জন্য চিৎকার করে] চোরাই জিনিসটা নিয়ে এই চারজনে যখন কার জিনিস ঠিক করতে পারল না, তখন এর ভেতরের মাল এরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবার ফন্দি আঁটল।

জহুরি : আপনারাও যে জিনিসটা আমাদের কাছে থেকে কেড়ে নিয়ে দু-জনে ভাগ করে নেবার মতলব এঁটেছিলেন, সেই কথাটা বলছেন না তো!

সওদাগর : আমরা বাধা দিলুম বলেই তো আপনারা আমাদের গ্রেফতার করে আনলেন। বলুন সত্যি কি না!

২য় কোতোয়াল : [থতোমতো খেয়ে আরও জোরে] হুজুর, এই পুঁটলিটা এদের কোনো একজনের যদি হত, তবে কখনওই সে ভাগাভাগি করতে রাজি হত না। এদের কারও নয় বলেই, এই চোরাই জিনিসটা এরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে রাজি হয়ে যায়।

ওস্তাগর : [হঠাৎ চিৎকার করে] আপনাদের কথাটা বেমালুম হজম করে ফেলছেন যে!

সুলতান : [ওস্তাগরের চিৎকার শুনে, ধমক দিয়ে] খামোশ! খামোশ! [দরবারের গুঞ্জন স্তব্ধ হলে] আমি জানতে চাই, পুঁটলিটা কোত্থেকে পাওয়া গেছে? কে পেয়েছে প্রথম?

জমাদার : আজ্ঞে আমি। সকালবেলা আমি যখন রাস্তা সাফাই করছি তখন দেখি, একটা কমবয়সি চোর, পুঁটলিটা চুরি করে, রাস্তায় ঘুম দিচ্ছে। আমি ধমক দিতেই চোরটা ওই পুঁটলি ফেলে পালাল।

ইয়াসিন : [হঠাৎ উৎসাহে চেঁচিয়ে] হুজুর, এতক্ষণ আমি সেই চোরটার কথাই আপনাকে বলতে চেয়েছিলুম।

সুলতান : আপনার কি চুরি গেছে কিছু?

ইয়াসিন : আজ্ঞে যায়নি। কিন্তু যাব-যাব করছিল।

সুলতান : [বিরক্ত হয়ে] আপনি তো আচ্ছা ভোঁতা লোক মশাই। যাব-যাব করছিল, আর তাতেই আপনি কেঁদে-কঁকিয়ে পাড়া মাত করে দিলেন!

সোরাব : আজ্ঞে হুজুর, ইয়াসিনের কাঁদাটা অন্যায্য কিছু নয়। কেন-না, আপনার আব্বাজান যখন সুলতান ছিলেন, তখন আমাদের এই শহরে চোরের উপদ্রব একেবারেই ছিল না, কিন্তু এখন যদি উপদ্রব শুরু হয়, তবে তো কান্না পাবেই। [নিজেই ফুঁপিয়ে উঠল।]

সুলতান : [সোরাবকে ধমক দিয়ে] আপনি থামুন! [জমাদারকে] এখন দেখছি, তুমিই একটি অকম্মা। তুমি চোরটাকে দেখতে পেলে, অথচ ধরতে পারলে না!

জমাদার : আজ্ঞে ধরব কী! যেই ধরতে গেছি, সে ওই পুঁটলিটা ফেলে এমন ছুট দিল, কার সাধ্যি তাকে ধরে!

সুলতান : তুমিও ছুটলে না কেন?

ইয়াসিন : অ্যাই! ঠিক কথা। এবার বলো, তুমিও তার পেছনে ছুটলে না কেন?

সুলতান : আঃ। আপনারা দু-জনে তো জ্বালিয়ে খেলেন। ইয়াসিন থতোমতো খেয়ে বসে পড়ল।

জহুরি : হুজুর, ও ছুটবে কী। ও তো মিথ্যে কথা বলছে। ও নিজেই তো চুরি করে যখন পালাচ্ছিল, তখন আমরা তিনজনে [ওস্তাগর ও সওদাগরকে দেখিয়ে] ওকে ধরে ফেলি।

ইয়াসিন : [আবার তিড়িং করে দাঁড়িয়ে] এই, এসো পথে!

সুলতান : [ইয়াসিনকে কড়কে] আপনি আবার কথা বলছেন! ইয়াসিন মিইয়ে বসে পড়ে।

সুলতান : [জমাদারকে] এরা যা বলছে সত্যি?

জমাদার : [দৃঢ় গলায়] না হুজুর, ঝুটা বাত। বলুক, কে আমাকে চুরি করতে দেখেছে!

ওস্তাগর : তোমাকে চুরি করতে দেখলে তো তুমি হাতে-নাতে ধরা পড়তে। তখন তো আর এত তর্ক-বিতর্ক হত না।

জমাদার : হুজুর, যেহেতু আমি চোরাই জিনিসটা উদ্ধার করেছি সেই কারণেই কি আমি চোর হয়ে গেলুম?

সুলতান : এখন, এটা তো তুমি অস্বীকার করতে পারো না যে, চোরাই জিনিসটা তোমার কাছ থেকে পাওয়া গেছে। চোর তুমি, না অন্য কেউ, এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তবে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তোমরা, মানে ওস্তাগর, জহুরি আর সওদাগর ভাগ করে নেবার ফন্দি এঁটেছিলে।

ইয়াসিন : [আবার দাঁড়িয়ে] হুজুর, কোতোয়াল দু-জন বাদ পড়ে গেল!

সুলতান : আঃ! [বিরক্ত] আবার আপনি! [ইয়াসিনের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে আবার ওস্তাগর, জহুরি ও সওদাগরের দিকে তাকিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে] চোরাই জিনিস উদ্ধার করে কোতোয়ালিতে জমা না-দিয়ে যারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবার মতলব আঁটে, তারাও চোর। সুতরাং চোরের মতো তারাও শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

ইয়াসিন : হেঁ: হেঁ: বাবা! আমাদের সুলতানের সঙ্গে চালাকি নয়! শাবাশ বটে বুদ্ধি!

[সুলতান এবার মুখে কোনো কথা উচ্চারণ না করে ইয়াসিনের দিকে কটমট করে তাকালেন। ইয়াসিন সেই চাউনি দেখে ধড়ফড়িয়ে বসে পড়ল।]

সুলতান : তবে শাস্তি দেবার আগে, আমি এই পুঁটলিটা খুলে দেখতে চাই, এর ভেতর কী-কী জিনিস আছে! তারপর জিনিসের মালিককে খুঁজে বার করার চেষ্টা হবে। তাকে যদি পাওয়া যায় ভালো নইলে, এই মালটা আমার তোশাখানায় জমা পড়বে।

ইয়াসিন : এর নাম বিচার, বুঝলে! তার মানে মালটি হবে সুলতানের।

সুলতান : [ক্ষিপ্তস্বরে] আবার! আপনি যদি ফের কথা বলেন, আমি আপনাকে দরবার থেকে বার করে দেবার হুকুম জারি করব।

[ইয়াসিন মুখটি চুন করে বসে পড়ল।]

সুলতান : [কোতোয়ালের কাছে পুঁটলিটি চেয়ে] দেখি, পুঁটলিটা! কোতোয়াল সুলতানের হাতে পুঁটলিটা তুলে দিল। সুলতান পুঁটলিটা ওপর থেকে টিপে-টিপে দেখতে লাগলেন। দরবারসুদ্ধু সবাই উদগ্রীব হয়ে সেইদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সুলতান পুঁটলির গিঁটটা খুলে ফেলতেই ভেতর থেকে একটি ছোট্ট মেয়ের পায়ের একজোড়া নতুন চপ্পল আর একটি নতুন সাদামাটা শাড়ি বেরিয়ে পড়ল। দেখতে-দেখতে দরবারের লোকেরা সবাই প্রথমটা কেমন ভাবাচাকা খেয়ে গেল। তারপরে মুহূর্তের মধ্যে ইয়াসিনই প্রথম হেসে উঠল হো-হো করে। তাকে হাসতে দেখে দরবারসুদ্ধু সমস্ত লোক চিৎকার করে হাসতে লাগল। শুধু হাসলেন না রাজা। তিনি গম্ভীর।

[ইয়াসিন মুখটি চুন করে বসে পড়ল।]

সুলতান : (হঠাৎ আদেশের সুরে) খামোশ! খামোশ! এটা কি আপনাদের বৈঠকখানা! আমি আপনদের সুলতান। আমার সামনে হ্যা-হ্যা করে হাসছেন?

ইয়াসিন : আজ্ঞে হুজুর, হাসি তো পাবেই। এত কান্ড করে শেষে এ যেন সেই বিয়ের ভোজে কাঁঠালবিচির তরকারি।

সুলতান : [ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে] আপনি আর একবার কথা বলুন! আপনাকে আমি কাঁঠালবিচিই গেলাব। বুঝলেন!

[ইয়াসিন পড়ি-মরি করে বসে পড়ল।]

সুলতান : [ধমকের সুরে] শুনে রাখুন, আপনাদের হাসি পেতে পারে, কিন্তু আমার পাচ্ছে না। কেন না, আমি বুঝতে পারছি না এটা চুরির জিনিস কি না। কিন্তু সেই ছেলেটা এই পুঁটলিটা ফেলে রেখে, পালিয়ে গিয়ে একটা মস্ত কাজ করে গেছে। মানে, কার কার মনে চুরি করার বাসনা আছে, সেটি সে দেখিয়ে দিয়েছে।

[সকলে ভয়ে-ভয়ে একে-অন্যের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।]

সুলতান : সুতরাং সেই চোরেদের [ওস্তাগর, জহুরি ও সওদাগরের দিকে আঙুল নির্দেশ করলেন] শাস্তি দিতেই হবে।

ওস্তাগর : [নিমেষের মধ্যে লুটিয়ে] হুজুর, আমাদের মা-বাপ...

সওদাগর : [একইভাবে লুটিয়ে] আমায় শাস্তি দিলে আমার ছেলে-মেয়েগুলো না-খেতে পেয়ে মরে যাবে হুজুর!

জহুরি : [একইভাবে] আমায় শাস্তি দিলে আমার ব্যাবসাটা লাটে উঠবে হুজুর।

জমাদার : দেখুন হজুর আপনি ইচ্ছে করলে আমাকেও শাস্তি দিতে পারেন। কিন্তু একটা কথা স্পষ্ট করে বলছি, আমি চুরিও করিনি, এমনকী ওদের ভাগাভাগিতে সায়ও দিইনি।

সওদাগর : [ন্যাকামির সুরে] ও মা, কী মিথ্যেবাদী। তুই তখন বললি না, পুঁটলিটা পড়ে আছে, ওটার ব্যবস্থা করতে!

জমাদার : ব্যবস্থা করতে বলা মানে কি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে জিনিসগুলো নিয়ে নেওয়া!

জহুরি : আচ্ছা, ঠিক আছে, তোর কথাই মেনে নিলুম। কিন্তু ওই কোতোয়াল দু-জন? বল ওরা আমাদের ফাঁকি দিতে চায়নি?

জমাদার : হুজুর, জহুরির কথা শুনে রাখুন, ও মেনে নিচ্ছে আমি ভাগ করার কথা বলিনি। তবে হ্যাঁ, আমি ওদের এই কথাটা স্বীকার করছি, ওই কোতোয়াল দু-জন পুঁটলিটা হাতাবার চেষ্টা করেছিল।

ইয়াসিন : [হঠাৎ আবার] কত দূরের জল কোথায় গড়াচ্ছে দ্যাখো!

সুলতান : [কড়কে] আবার কথা! [ইয়াসিন আবার বসে পড়ল।]

সুলতান : হ্যাঁ, এখন দু-পক্ষের কথা শুনে এটা প্রমাণ হচ্ছে তুমি ভাগ-বাঁটোয়ারার কথা বলোনি। কিন্তু জিনিসটি তোমার হেফাজত থেকে পাওয়া গেছে।

জমাদার : কিন্তু হুজুর, এটা যে চোরাই জিনিস, সেটা তো এখনও প্রমাণ হল না। ছেলেটাকে আমি ‘চোর’ বলতেই সে ভয়ে পালাবার সময় পুঁটলিটা রাস্তায় ফেলে গেল। এখন হুজুর, আমি জমাদার। রাস্তার মধ্যিখানে একটা পুঁটলি পড়ে থাকলে সেটা রাস্তা ঝাড়ু দেবার সময় তুলে সরিয়ে না-রাখলে হুজুর, তখনও তো আমায় দোষী হতে হবে।

সুলতান : তোমার অত কথা বলার দরকার নেই। আমার বিচার আমি করে ফেলেছি। এটা প্রমাণ হয়েছে, এই তিনজন, জহুরি, ওস্তাগর আর সওদাগর অন্যের জিনিস হাতিয়ে নিয়ে নিজেরা ভাগ করে নিতে চেয়েছিল। সুতরাং এদের প্রত্যেককে আমি একমাস করে সশ্রম কারাবাসের হুকুম দিলুম।

তিনজনে : [একসঙ্গে মড়া-কান্না কেঁদে] হুজুর। [সুলতানের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ল।] [সুলতানের দেহরক্ষীরা তিনজনকে টেনে তুলে গ্রেফতার করল।]

সুলতান : [জমাদারকে] কিন্তু তুমি যে চোর নও, সেটা প্রমাণ করার জন্য তোমাকে আমি সময় দিলুম। তোমার কথা অনুযায়ী এই পুঁটলিটা যে-ছেলেটা রাস্তায় ফেলে পালায়, তার সঙ্গে তোমার মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছে। মানে তুমি তাকে দেখেছ। সুতরাং, আমার হুকুম, তোমাকে সাতদিনের মধ্যে তাকে খুঁজে বার করে, আমার কাছে ধরে আনতে হবে। সে যদি বলে, তার কাছ থেকে তুমি পুঁটলিটা কেড়ে নাওনি, তবে তুমি ছাড়া পাবে। আর সেইসঙ্গে এও জানা যাবে, এই পুঁটলি সে পেল কোত্থেকে। চুরি করেছে, না তার নিজের। এখন এই পুঁটলিটা আমার জিম্মায় থাকবে। যার জিনিস প্রমাণ হবে, তাকে আমি নিজে ফেরত দেব। [দেহরক্ষীদের নির্দেশ দিয়ে, জহুরি, ওস্তাগর ও সওদাগরকে দেখিয়ে] যাও, এদের নিয়ে যাও! এদের কয়েদ করে রাখো।

[দেহরক্ষীরা জহুরি, ওস্তাগর ও সওদাগরকে গ্রেফতার করে বাইরে নিয়ে চলল। তাদের পেছনে-পেছনে কোতোয়াল দু-জনও বেরিয়ে যাচ্ছিল।]

সুলতান : [ধমক দিয়ে কোতোয়াল দু-জনকে] তোমরা কোথায় যাচ্ছ? দাঁড়াও! [তাঁর অন্য দু-জন দেহরক্ষীকে নির্দেশ করে] হ্যাঁ শোনো। তোমরা এখনই আমার সাক্ষাতে এই কোতোয়াল দু-জনের মাথার পাগড়ি কেড়ে নাও! জামা খুলে নাও! [দেহরক্ষী দু-জন তাদের মাথার পাগড়ি খুলে, গায়ের জামা কেড়ে নিল। সবাই নিস্তব্ধ হয়ে দেখছে।]

সুলতান : [পাগড়ি-জামা খোলা হলে দু-জন কোতোয়ালকে হুকুম করেন] এবার এখানে কান ধরে ওঠ-বোস করো। কোতোয়াল দু-জন ইতস্তত করতে লাগল।

সুলতান : [ধমক দিয়ে] করো!

কোতোয়াল দু-জন কান-ধরে ওঠ-বোস করতে লাগল।

সুলতান : [সিংহাসন থেকে নামতে-নামতে] হ্যাঁ, ঠিক আছে। চলুক। এমনই করে চলবে, যতদিন না সেই ছেলেটা ধরা পড়ে ততদিন। থামলেই পিঠে চাবুক পড়বে। [বলেই সুলতান বেরিয়ে গেলেন।]

ইয়াসিন ও সোরাব : [একসঙ্গে] এবার বোঝো ঠেলা! [মঞ্চ অন্ধকার হল।]

তৃতীয় দৃশ্য : প্রথম দৃশ্যের সেই রাস্তা

[রাস্তাটা নিরিবিলি। এখন বিকেল। সেই ছেলেটিকে দেখা গেল। দাওয়ার ওপর হাঁটুতে মুখ গুঁজে ছেলেটি বসে আছে। ঠিক সেইসময়ে ইয়াসিন আর সোরাব ঢুকল।]

ইয়াসিন : [ঢুকতে ঢুকতে, পেছনে সোরাব] যাক বাবা, আল্লার কৃপায় মোটামুটি শান্তিতে সব বিচার-টিচার হয়ে গেল!

সোরাব : [উচ্ছ্বাসে] দারুণ! দারুণ! কী দারুণ বুদ্ধি বল সুলতানের। খপ করে ধরে ফেললেন তিনটে লোককে। চলো ঘানি টানতে।

ইয়াসিন : [হাসতে-হাসতে] দুটো কোতোয়ালের কী অবস্থা, চালাও ওঠ-বোস! [নিজে ওঠ-বোস করতে গেল, কোমরে লাগল] উ-হু-উ-হু!

সোরাব : [ধরে] এই বয়সে যেমন বাহাদুরি দেখানো!

ইয়াসিন : [ব্যথায় বিকৃত মুখে] ভাগ্যিস আমাদের ওঠ-বোস করতে বলেননি সুলতান।

সোরাব : আমরা ওঠ-বোস করব কেন? আমরা তো চুরি করিনি!

ইয়াসিন : দ্যাখ, বোকার মতো কথা বলিসনি। জানিস, সুলতানের কত ক্ষমতা! ইচ্ছে করলে, যাকে খুশি তিনি যখন-তখন চোর বানিয়ে ফেলতে পারেন।

সোরাব : চুরি না করলেও?

ইয়াসিন : তবে আর বলছি কী! শুধু কি তাই, তুমি যদি চোর না-হতে চাও, বেশি বেগড়বাঁই করো মারো ওঠ-বোস।

[আবার ওঠ-বোস করতে গেল। আবার কোমর ব্যথায় টনটন করে উঠল] উ-হু-উ-হু!

সোরাব : [ইয়াসিনকে আবার ধরে ফেলল। ধরতে গিয়ে দুজনের মাথা ঠুকে গেল, মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে] চুরি না করলেও যদি সুলতান আমাদের চোর বানান, তবে তো চুরি করেই চোর হওয়া ভালো।

ইয়াসিন : ভালোই তো!

সোরাব : [চাপাস্বরে] তুই কখনো চুরি করেছিস?

ইয়াসিন : তুই?

সোরাব : [স্বীকার করে] হেঁ-হেঁ, (মুখ টিপে হাসল)

ইয়াসিন : [দাঁতের ফাঁকে হাসি এনে] আমিও হেঁ-হেঁ!

সোরাব : [উৎসাহে এগিয়ে এসে] তুই ক বার চুরি করেছিস?

ইয়াসিন : আমি? একবার।

সোরাব : আমিও একবার। তুই কী জিনিস চুরি করেছিস?

ইয়াসিন : দুধ।

সোরাব : [আলতো করে একগাল হেসে] দুধ?

ইয়াসিন : [সোরাবের মতো চাপাস্বরে হাসতে-হাসতে] হ্যাঁ। সেদিন আমার খিদেটা সকাল থেকে খালি, দুধ খাই, দুধ খাই করছিল। থাকতে পারলুম না। দুপুরবেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়েছে, আমিও তখন তাল পেয়ে, ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে চোঁ-চোঁ করে মেরে দিলুম একবাটি! কেউ ধরতে পারল না।

[চাপা-হাসিতে দু-জনে গড়িয়ে পড়ল।]

সোরাব : [হাসির জের টেনে] আমিও ঠিক তাই।

ইয়াসিন : [হাসতে হাসতে থেমে] তুইও দুধ।

সোরাব : [মুখ টিপে হেসে] না, ঘুগনি। সেদিন বাড়িতে হয়েছিল। ঘুগনির কী খোশবাই! নোলা একেবারে টসটস করছে। আমিও থাকতে পারলুম না। কেউ যখন ছিল না, সেই ফাঁকে রান্নাঘরে ঢুকে এই এতটা মেরে দিলুম। দু-জনেই হেসে উঠল।

সোরাব : [হাসি থামাতে-থামাতে] যাই বল, এইসব আলতু-ফালতু জিনিস চুরি করে সুখ নেই।

ইয়াসিন : তবে কি সেই চোর-ছেলেটার মতো চপ্পল আর শাড়ি চুরি করতে চাস?

[ছেলেটা এতক্ষণ বসেছিল দাওয়ায়, কানে কথাটা পৌঁছে গেল। ঝট করে সে মুখ তুলে তাকাল।]

সোরাব : দূর! ও তো সেই ছিঁচকে চোরে করে। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ।

[দেখা গেল, ঠিক সময়ে ছেলেটি ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে ইয়াসিন আর সোরাবের দিকে। ইয়াসিন অথবা সোরাব ছেলেটিকে দেখতে পায়নি। কাজেই তারা নিজের খেয়ালে কথাই বলে চলেছে।]

ইয়াসিন : আচ্ছা, মনে কর, সেই চোর-ছেলেটাকে ধরা গেল না। তারপর ধর, যাদের জিনিস চুরি গেছে তাদেরও খোঁজ মিলল না। তখন কী হবে?

সোরাব : শুনলি না, তখন সুলতান বললেন, তাঁর তোশাখানায় জমা পড়বে।

[ছেলেটি এগিয়ে এসে ইয়াসিন আর সোরাবের পেছনে দাঁড়াল।]

ইয়াসিন : তার মানে, জিনিসটা সুলতানের হয়ে গেল। এও তো একরকমের চুরি রে!

সোরাব : তা হলে, তোর কথা মতো এই দাঁড়াচ্ছে, সুলতান যদি চুরি করতে পারেন, আমরাও পারি।

ইয়াসিন : আলবত!

সোরাব : [ইয়াসিনের চোখের দিকে নিজের চোখ স্থির রেখে] চুরি করবি?

ইয়াসিন : সুযোগ পেলে একশোবার করব।

সোরাব : তবে চল, আমরা বেরিয়ে পড়ি।

ইয়াসিন : কোথায়?

সোরাব : সুলতানের ঘরে।

ইয়াসিন : কেন?

সোরাব : সেই চপ্পল আর কাপড়টা সুলতানের কাছে আছে। আমরা সুলতানের ঘরে ঢুকে চুরি করে ভাগাভাগি করে নেব।

[এমন সময় ছেলেটি তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আচমকা খুক করে কেশে ফেলল।

ইয়াসিন আর সোরাব ভয়ে চমকে উঠল। ভয়ে আঁতকে ধীরে-ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে সোরাব ইয়াসিনকে, ইয়াসিন সোরাবকে চোখ বড়ো-বড়ো করে দেখতে লাগল। দু-জনে একটু তফাতেই ছিল। হঠাৎ পেছনে ফিরে দু-জনেই একসঙ্গে ছেলেটিকে দেখে দু-জনে পালাতে গেল। কিন্তু দু-জনে দু-মুখে পালাতে গিয়ে, অর্থাৎ ইয়াসিন সোরাবের দিকে আর সোরাব ইয়াসিনের দিকে পালাতে গিয়ে ধাক্কা খেল। পড়ে গেল। চোখের নিমেষে উঠে পড়ে, দু-জনে দু-দিক দিয়ে পালাতে-পালাতে চেঁচিয়ে উঠল।]

দু-জনে : [একসঙ্গে] ওরে বাবা রে!

[ছেলেটি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়েই থাকল। ঠিক সেইসময়ে একজন বুড়ো ঢুকল। ছেলেটিকে দেখল। বুড়োর পিঠে একটা রেশমি কাপড়ের পুঁটলি। বুড়োর যেন পুঁটলিটা বইতে কষ্ট হচ্ছে। পুঁটলির ভারে নুয়ে পড়েছে। সে হাঁফাচ্ছে। পুঁটলিটা পিঠ থেকে নামিয়ে বুড়ো বসে পড়ল। ছেলেটিও ঠিক এই মুহূর্তে তাকে দেখে ফেলল। ছেলেটি থতোমতো খেয়ে থমকে গিয়ে বুড়োকে দেখতে লাগল। বুড়োর কষ্ট দেখে, তারও করুণা হল। তারপর ধীরে-ধীরে একপা-একপা করে পিছিয়ে ছেলেটি আগে যেখানে বসে ছিল, রাস্তার সেই দাওয়াটার ওপর গিয়ে বসল। তার দৃষ্টি কিন্তু ভারি অবাক হয়ে সেই বুড়োকে দেখতে লাগল। বুড়োও তাকে দেখছে। হঠাৎ বুড়ো যেন তার ক্লান্তি মুছে ফেলে নিজের মনে কথা বলতে শুরু করল।]

বুড়ো : এই শহরটি আমাদের ভারি সুখের শহর। [যেন আকাশ আর মাটির ওপর একবার ভালো করে চোখ বুলিয়ে নিল।] ছেলেটির দৃষ্টি হঠাৎ তীক্ষ্ণ হল।

বুড়ো : আমাদের এখন যিনি সুলতান তাঁর বাবা কত যত্ন করে নিজে দাঁড়িয়ে তৈরি করিয়েছিলেন এই শহর। কী নেই এই শহরে। সুলতানের ফুলবাগিচায় গোলাপের সুবাস থেকে প্রাসাদের অন্দরমহলে রাজকন্যার হাসি। [একটু থামল] [ছেলেটির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ক্রমশ নরম হচ্ছে।] [বুড়ো কথা বলতে বলতে কখনো-কখনো থামছে। তাকে আড়চোখে দেখছে। আবার কথা বলছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় বুড়ো আপনমনেই বকবক করে যাচ্ছে।]

বুড়ো : চাঁদনি রাতে চাঁদের রোশনাই থেকে প্রাসাদের খুশমহলে নূপুরের রিনঝিন। এমনকী মেওয়ার মিঠে-মিঠে গন্ধ, সবই পাওয়া যাবে এই শহরে।

[ছেলেটির নরম দৃষ্টি তার মুখের ওপর স্থির হয়ে থমকে রইল।]

বুড়ো : তবে ইদানীং একটি ছিঁচকে চোর আমাদের এই সুখের শহরে বড়ো উৎপাত শুরু করেছে। [একটু থামল।] [ছেলেটির মুখের চোহারা পালটাল।]

বুড়ো : শোনা যাচ্ছে, চোরের বয়েসটা খুব একটা বেশি নয়। যে-বয়সে তার লেখাপড়া আর খেলাধুলো করা উচিত, সেই বয়সে ছেলেটি চুরিতে হাত পাকিয়েছে। [আবার একটু থামল] [মনে হল, ছেলেটি রাগছে।]

বুড়ো : সম্প্রতি তার কাছ থেকে উদ্ধার করা একজোড়া নতুন চপ্পল, আর-একটি আনকোরা নতুন শাড়ি পাওয়া গেছে। সেগুলি সুলতানের জিম্মায় আটকা পড়েছে। [ছেলেটি উঠে দাঁড়াল।]

বুড়ো : [তার দিকে দৃষ্টি ফেলে] তুই কে বাবা?

ছেলে : [রাগে, উত্তেজনায়] তোমরা যাকে চোর বলছ, আমি সেই চোর।

বুড়ো : [আঁতকে উঠে] অ্যাঁ!

ছেলে : [রাগে গর্জে উঠে] ওই শাড়ি আর চপ্পল আমার।

বুড়ো : তুই চুরি করেছিস? [অবাক।]

ছেলে : [চিৎকার করে] মিথ্যে কথা!

বুড়ো : মিথ্যে?

ছেলে : হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমরা সবাই মিথ্যে-মিথ্যে আমায় চোর বলছ। ওগুলো আমার। আমার বোনের জন্য আমি চপ্পলটা কিনেছি। আর মায়ের জন্য শাড়িটা।

বুড়ো : [এতক্ষণ বসে ছিল। উঠে দাঁড়াল।] দাঁড়া, দাঁড়া আমার যেন কেমন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। বলছিস, তুই কিনেছিস তোর মা আর বোনের জন্য?

ছেলে : [গলায় জোর দিয়ে] হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি কিনেছি নিজের পয়সা দিয়ে। এই শহরেই আমি কিনতে এসেছিলুম। কিনে রাত্তির হয়ে গেছল বলে কাল আমি আমার গাঁয়ের ঘরে ফিরতে পারিনি। আমি সারারাত ওই দাওয়াটার ওপর শুয়ে ছিলুম। একজন জমাদার আমাকে দেখে চোর ভেবে চেঁচিয়ে উঠল। আমি ভয়ে পালাতে গেলুম। আর ঠিক সেই সময় আমার হাত থেকে শাড়িটা আর চপ্পলটা পড়ে গেল।

[চোখ ছলছল করতে লাগল। বুড়ো থতোমতো খেয়ে এগিয়ে গেল ছেলেটির কাছে। তার মাথায় হাত রাখল]

ছেলে : আমার বাবা নেই। আমি রাখাল। আমি রোজ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মাঠে যাই মেষ চরাতে। বেলা দুপুর হলে আমার বোনের হাতে মা খাবার পাঠায় আমার জন্য। ঘর থেকে বেরিয়ে, অনেকখানি পথ পেরিয়ে সে খুশিতে গান গাইতে-গাইতে আমার কাছে আসে। সেদিনও সে-আসছিল এমনই করে গান গাইতে-গাইতে।

[এখান থেকে শুরু হবে অতীত ঘটনার একটি দৃশ্য। ফ্ল্যাশ ব্যাক। শোনা যাচ্ছে দূর থেকে একটি ছোট্ট মেয়ের গলায় গান। ধীরে ধীরে মঞ্চ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। মঞ্চ অন্ধকার হলে সেখান থেকে পুঁটলি নিয়ে বুড়ো বেরিয়ে যাবে। অন্য পরিবেশে দেখা যাবে শুধু ছেলেটিকে। তার মুখে হাসি। সে উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বোনের জন্য। খুশির আবেশে তার মুখখানি ঝলমল করছে। বোন গান গাইতে-গাইতে ঢুকছে।]

[বোনের গান]

আমার গানের নাও ভেসে যায়

বাতাসে ঢেউ তুলে,

দাদার মুখের মিষ্টি হাসি

তাই তো ওঠে দুলে।

দেখতে যে পাই মুখখানি সেই

আকাশ-মুকুর ছায়ে,

উছল নদীর স্রোতের ধারায়,

মেঘের গায়ে-গায়ে।

(ওরে) বন-সবুজের পাখি,

তাই যে তোকে ডাকি,

দে না রে তুই মন ভরিয়ে

সুরের স্বপ্ন আঁকি।

[ছেলেটি হঠাৎ চিৎকার করে মেয়েটির নাম ধরে ডাক দিল।]

ছেলে : আলো-ও-ও!

আলো : [চিৎকার করে সাড়া দিল] দাদা-আ-আ!

[শোনা যাচ্ছে মেয়েটির পায়ের মলের আওয়াজ। যতই দূর থেকে কাছে সেই মলের আওয়াজ এগিয়ে আসছে, ততই যেন চারদিক আনন্দে উছলে উঠছে। উছলে উঠছে আলো, জলতরঙ্গের টুংটাং। পরেই দেখা গেল একটি সাত-আট বছরের ছোট্ট মেয়েকে। একটি ডুরে শাড়ি পরেছে সে। গাছ-কোমর করে বাঁধা। পায়ের ওপর একটু তোলা। কানের রুপোর গয়না। তার মাথায় খাবারের পাত্র। হাতে জলের ঘটি।]

আলোর দাদা : [খুশিতে-হাসিতে মুখখানি ভরে আছে, বোনের মাথা থেকে খাবারের পাত্র নামাতে-নামাতে] আমার জন্য যত কষ্ট তোর।

আলো : না, আমাদের জন্য যত কষ্ট তোর? সেই সকাল থেকে কোন সন্ধ্যে অবধি তোকে এখানে থাকতে হয় বল তো!

আলোর দাদা : [একদিকে বসে, খাবারের ঢাকা খুলতে-খুলতে] আমার আবার কী কষ্ট। ভেড়াগুলোকেদ্যাখ, কেমন শান্ত। [বাইরে দূরে হাত তুলে দেখাল।] কেমন নিজেদের মনে ঘাস খাচ্ছে আর চরে বেড়াচ্ছে। কোনো ঝঞ্ঝাট নেই। [হঠাৎ খাবারের পাত্র দেখে] এতসব কী রে?

আলো : মা দিয়েছে। (আলো পাশে এসে হাঁটু মুড়ে বসল।)

আলোর দাদা : এটা কী?

আলো : পায়েস। খেতে হয়। আজ তোর জন্মদিন না!

আলোর দাদা : আজ বুঝি? আমার একদম মনে নেই।

আলো : তোর মনে না থাকলে কী হয়েছে! মা কখনো ভোলে নাকি!

আলোর দাদা : [পায়েসটা দেখিয়ে] তুইও একটু খা!

আলো : [উঠে পড়ে] আমি খেয়েছি। তুই খেয়ে নে! আমি বরঞ্চ ভেড়াগুলোকে দেখি।

[আলো ছুটে বেরিয়ে গেল। তার ছোটার ছন্দে বাজনা ঝংকার তুলল। মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। মঞ্চ অন্ধকার হলে খাবারের পাত্রগুলি সরিয়ে নিতে হবে। বুড়ো, পুঁটলি নিয়ে আগে যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়বে। আলোর দাদা, সেই ছেলেটিও যথাস্থানে দাঁড়াবে। অর্থাৎ বাজনার তালে-তালে আলো জ্বললে যেন মনে হয়, অতীত থেকে আমরা আগের অবস্থাতে এসেছি।]

বুড়ো : [আলো জ্বললে] থামলি কেন?

আলোর দাদা : তুমি শুনে কী করবে?

বুড়ো : শুনে হয়তো কিছুই করতে পারব না। তবে, শুনতে আমার ভালো লাগছে।

আলোর দাদা : তোমার ভালো লাগলেই বা কী, আর না-লাগলেই বা কী। আমার তো কোনো লাভ নেই।

বুড়ো : বলা যায়, কোথা থেকে কার কী লাভ হয়। বল শুনি। [আদর]

আলোর দাদা : আমি অনেক কষ্ট করে, পয়সা জমিয়ে আমার বোনের জন্য ওই চপ্পল আর মায়ের জন্য ওই শাড়ি কিনেছিলুম। তুমি কি পারবে আমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যেতে। তাঁকে আমি বলব, ওগুলো আমি নিজের পয়সা দিয়ে কিনেছি। চুরি করিনি। ওগুলো আমি ফেরত চাই।

বুড়ো : চেষ্টা তো করতে পারি। মনে কর না, আমি তোর হঠাৎ-পাওয়া বন্ধু।

[ছেলেটি বুড়োর মুখে এই কথা শুনে অভিভূতের মতো তার দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার ক্লান্ত মুখখানা ক্ষণিকের জন্য উছলে উঠল। সেই সঙ্গে আবার জলতরঙ্গের টুংটাং শব্দ শোনা গেল। আবার নিভে গেল মঞ্চেরআলো। আবার অতীতের দৃশ্য।] [ফ্ল্যাশ ব্যাক।]

[আলো জ্বললে দেখা যাবে একটি মিষ্টি সুরের তালে হাসতে-হাসতে, নাচতে-নাচতে আলো নামে মেয়েটি একটি ছড়া গাইছে। তার দাদা হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে একটু তফাতে। আলোকে দেখছে।]

[আলোর ছড়া]

আমার কানে গুনগুনিয়ে

বলছে ভ্রমর রানি,

মা যদি হয় সাত রাজ্যের

সুন্দরী রাজরানি

রাতের বেলা চাঁদের আলো

ভোরের আলোয় ফুল

মায়ের গলায় মুক্তো-মানিক

দুলত যে দুল-দুল।

[সঙ্গে-সঙ্গে দাদাও ছড়া ধরল।]

[দাদার ছড়া]

বোনটি আমার হত যদি

রাজকন্যে আরও,

ঝুম-ঝুম-ঝুম বাজত নূপুর

পায়ে তখন তারও।

নাচতে-নাচতে চলে যেত

শিউলিবনের বাঁকে,

সেই যেখানে অচিন রাজার

রাজপুত্তুর থাকে।

[আলোর ছড়া]

তাই বইকি, একলা আমি

যেতাম কেন সেথা?

আমার যে এক দাদা আছে

জানে নাকো কে তা?

সঙ্গে যেত আমার দাদা

রাজকন্যের তরে,

সাতনরিহার গলায় দিয়ে

আনত তাকে ঘরে।

[শেষ করেই আলো হেসে উঠল।]

আলোর দাদা : [ছুটে ধরতে গিয়ে] তবে রে...

[আলো দাদাকে ধরা না দিয়ে মঞ্চে হাসতে-হাসতে ছুটতে লাগল।]

আলোর দাদা : [হাসতে-হাসতে আলোর পেছনে ছুটতে-ছুটতে] একবার ধরতে পারলে...

আলো : [ছুটে] ধরতেই পারবে না। [ছুটতে-ছুটতে আলোর পায়ে একটা কাঁটা ফুটে গেল।]

আলো : [আর্তনাদ করে বসে পড়ল] আঃ! [নিজের পায়ে হাত দিয়ে ছটফট করতে লাগল।]

আলোর দাদা : [থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপরেই ছুটে এল আলোর কাছে] কী হয়েছে? [মুখে আতঙ্কের ছাপ।]

আলো : [যন্ত্রণায় কাঁদো-কাঁদো] কাঁটা।

আলোর দাদা : [ভয়ে] রক্ত! [আলোর পায়ে হাত দিয়ে কাঁটা বার করার চেষ্টা করল।]

আলো : [যন্ত্রণায়] উঃ! আমার লাগছে!

[দাদা কাঁটাটা আলোর পা থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিল। আলোর পায়ের ক্ষত দিয়ে রক্ত ঝরছে। আলো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। দাদা তার নিজের কোমরে জড়ানো কাপড়টা ছিঁড়ে ফেলে আলোর পায়ে বেঁধে দিল। তারপর তাকে সাবধানে ধরে ধীরে-ধীরে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।

জলতরঙ্গ আবার বেজে উঠল। মঞ্চ অন্ধকার হল। আবার আলো জ্বলতে দেখা গেল, আগে, যেখানে সেই বুড়ো আর আলোর দাদা দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক সেইখানেই তারা দাঁড়িয়ে আছে।]

বুড়ো : [আলোয় তার মুখ ভেসে ওঠার পরমুহূর্ত চুপ থেকে] এবার বুঝতে পেরেছি।

আলোর দাদা : কী বুঝেছ?

বুড়ো : তোর বোনের জন্য কেন তুই চপ্পল কিনেছিস? তার নরম পায়ে আর যেন কাঁটা না-ফোটে।

আলোর দাদা : কিন্তু সে খুঁড়িয়ে হাঁটে। (গলায় ব্যাকুলতা)

বুড়ো : এখনও?

আলোর দাদা : তুমি আমাকে সুলতানের কাছে নিয়ে যেতে পারো?

বুড়ো : [গম্ভীর স্বরে] পারি। [বুড়ো ঘুরে দাঁড়াল] একটু অপেক্ষা করো। আমি একটা কাজ সেরে এক্ষুনি আসছি। তারপর তোর সামনে রাজাকে না রাজার সামনে তোকে নিয়ে যাব সেটা ভাবব। আমার পুঁটলিটা এখানে রইল। তুই দ্যাখ। আমি যাব আর আসব।

[বুড়ো বেরিয়ে গেল।]

আলোর দাদা : [চেঁচিয়ে] দেরি কোরো না, আমি বাড়ি যাব।

বুড়ো : [চেঁচিয়ে] না...।

[বুড়ো বেরিয়ে যাবার পর তার পথের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল আলোর দাদা। তারপর মুখ ফেরাল।]

আলোর দাদা : [আপন মনে] কখন আমার ঘরে ফেরার কথা। মা না-জানি কত ভাবছে। আর আলো? সে নিশ্চয়ই ভাবছে, দাদা কোনো বিপদে পড়েছে। কী হবে এখন? [বুড়োর পুঁটলিটার কাছে বসে তারপর শুয়ে সেই পুঁটলিটা মাথায় দিল। এমনভাবে শুয়ে থাকল দর্শকরা তার মুখটি দেখতে পাচ্ছে। তারপর আলোর সেই ‘আমার কানে গুনগুনিয়ে’ গানটি গুনগুন করে গাইতে লাগল। তারপর আচমকা স্বপ্নের মতো আলোর হাসির শব্দটা তার কানে বেজে উঠল।]

[ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ দেখা গেল সেই জমাদারকে, মঞ্চে প্রবেশ করল। সে প্রথমে আলোর দাদাকে দেখতে পায়নি। আলোর দাদাও তাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু যে মুহূর্তে জমাদার কথা বলতে শুরু করল, ঠিক সেই মুহূর্তে আলোর দাদা অবাক হয়ে তাকে দেখতে-দেখতে উঠে বসল।]

জমাদার : [নিজের মনে] একে বলে, কাজ নেই তো টিকটিকি তাড়াও। আমার কী দরকার ছিল ওই চোরাই জিনিস নিয়ে অত বাহাদুরি দেখানোর! [স্তব্ধ গলায় ভয়ে] এখন, সাতদিনের মধ্যে যদি চোরটাকে ধরতে না-পারি, আমাকেও কয়েদে পাঠিয়ে দেবে। শুনেছি কয়েদখানায় কাঠপিঁপড়ের রাজত্ব। রাতে ঘুমোতে গেলে কামড়ায়, দিনে সুড়সুড়ি দেয়! ওরে বাবা রে, এখন আমি... [কথা শেষ হবার আগেই সে দেখতে পেয়েছে আলোর দাদা সেই ছেলেটিকে। সে থমকে অবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগল। তারপর চিৎকার করে উঠল আচমকা।] ধরেছি, চোর! চোর!

[আলোর দাদা চুপচাপ বসে রইল। তাকে দেখতে লাগল।]

জমাদার : [যেমন করে চু-কিতকিত খেলার সময় হাত বাড়িয়ে অন্যকে মোর করার চেষ্টা করা হয়, তেমনই দু-হাত বাড়িয়ে এদিক-ওদিক করে] এবার কোথা যাবি তুই! [উত্তেজনায়] এবার পালা দেখি! তখন পালিয়ে গিয়ে আমায় ঘোল খাইয়ে ছেড়েছ। এখন আর ছাড়ি!

[আলোর দাদা অবিচলিত। কিন্তু মুখে তার রাগের চিহ্ন। জমাদার ঘন-ঘন নিশ্বাস ফেলতে-ফেলতে এগিয়ে আসছে। শিকার হাতে পাওয়ার আহ্লাদে তার চোখ দুটো চকচক করছে। মুখে অস্পষ্ট আওয়াজ করে সে একপা-একপা করে এগোতে লাগল।]

জমাদার : [আলোর দাদার কাছে বুড়োর পুঁটলিটা দেখে] ওই, আজও চুরি করেছে ওই পুঁটলিটা। আর পালাবি কোথায়? এবার তোর মুন্ডুপাত করব।

[জমাদার যখন আলোর দাদার কাছাকাছি এসেছে, হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে গেছে, ঠিক তার আগের মুহূর্তেই আলোর দাদা দাঁড়িয়ে জমাদারের বুকের জামাটা খামচে ধরেছে।]

আলোর দাদা : [জামা খামচে ধরে] আমার পুঁটলি কোথায়?

জমাদার : [থতোমতো খেয়ে, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে] পাজি, হতভাগা চুরি করে আবার আমার গলা ধরা। গুণ্ডামি করার জায়গা পাওনি!

আলোর দাদা : [রুখে] আমি চোর! [জমাদারকে হঠাৎ মাথা দিয়ে গুঁতিয়ে ঠেলতে লাগল।] কোথায় আমার পুঁটলি?

জমাদার : [গুঁতো খেয়ে পিছু হটতে-হটতে] ওরে খুদে শয়তান, আমার সঙ্গে মারামারি করতে চাস! [ঝাঁকুনি দিল। আলোর দাদা পড়ে গেল।]

[সঙ্গে-সঙ্গে আলোর দাদা উঠে পড়েই জমাদারের সঙ্গে মারামারি লাগিয়ে দিল। কখনও সে জমাদারকে জাপটে ধরে। গড়িয়ে-গড়িয়ে তার বুকের ওপর বসে। আবার কখনও জমাদার উলটে তাকে জাপটে ধরে। দু-জনের লড়াই-এ ছেলেটা যখন কাবু হয়ে গেছে, তখন শোনা গেল অনেক ঘোড়ার খুরের শব্দ। ঘোড়ার খুরের শব্দ থামলে, দু-জন সেপাই প্রবেশ করল।]

সেপাই : [ধমক দিয়ে] এই! রাস্তার মাঝখানে কারা মারামারি করছে। মহামান্য সুলতান আসছেন। [চাবুক তুলে] হটো এখান থেকে।

[জমাদার ঝটপট উঠে পড়ল। ভয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। ছেলেটিও উঠে পড়ল। দু-জনেই হাঁফাচ্ছে। ছেলেটি রেগে ফুঁসছে। জমাদার ভয়ে কুঁচকে আছে।] [এমন সময় ভেরি বেজে উঠল। নিমেষের মধ্যে সেই রাস্তায় সুলতানের অনুচরেরা ঝলমলে পোশাক পরে উপস্থিত হয়ে রাস্তার এই নির্জন জায়গাটা রঙে-রঙে ভরিয়ে দিল। ঝলমল করে উঠল চারিদিক।] [তারপরেই প্রবেশ করল সেই বুড়ো মানুষটি। তার মুখে হাসি। ঠিক তার পেছনেই সুলতান। তিনি রাস্তার সেই উঁচু দাওয়াটার ওপর দাঁড়ালেন। রেশমি কাপড়ে জড়ানো সেই পুঁটলিটা এতক্ষণ পড়েই ছিল।]

জমাদার : [সুলতান দাওয়ায় দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটির হাত খপ করে ধরে, টানতে-টানতে সুলতানের কাছে নিয়ে গিয়ে] আজ্ঞে হুজুর, এই সেই চোর!

আলোর দাদা : [প্রতিবাদ করে চিৎকার] মিথ্যে কথা!

জমাদার : [সেই রেশমি কাপড় বাঁধা পুঁটলিটা হাত তুলে দেখিয়ে] দেখুন হুজুর, এই চোরটা আজ আবার ওই পুঁটলিটা চুরি করেছে।

সুলতান : [জমাদারের কথা শুনে মুচকি-মুচকি হাসলেন, তারপর ছেলেটিকে দেখতে-দেখতে] হ্যাঁ, আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি।

বুড়ো : [পুঁটলিটার কাছে এগিয়ে এসে] হ্যাঁ হুজুর, এই সেই পুঁটলি! এইটাই আমার!

আলোর দাদা : [তীব্র প্রতিবাদ করে] না, আমি চুরি করিনি।

জমাদার : [চেঁচিয়ে] আলবত! তুই চোর!

আলোর দাদা : [জমাদারের হাত ছাড়িয়ে বুড়োর কাছে ছুটে গিয়ে] তুমিও আমাকে চোর বলছ?

[বুড়োর মুখে রহস্যের হাসি।]

আলোর দাদা : [সুলতানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে] ঠিক আছে! তবে আমাকে দিন শাস্তি। আমি জানব, সুলতানের রাজ্যে সবাই সাধু, শুধু আমি চোর।

সুলতান : [দৃঢ় অথচ সহৃদয় কন্ঠে] না, তুমি চোর নও। তুমি ওঠো! আমার কাছে এসো!

[ছেলেটি উঠল। সুলতানের কাছে গেল। বুড়ো মানুষটি পুঁটলিটা তুলে নিয়ে নিজের হাতে রাখল। ইতিমধ্যে আরও কিছু শহরবাসী সেখানে জমায়েত হয়েছে।]

সুলতান : [উপস্থিত সকলকে সম্বোধন করে] আমার প্রিয় প্রজাগণ, আপনারা শুনুন, সেদিন হঠাৎ আমার কানে এল, আমার রাজ্যে একটা কমবয়সী চোর এখানে-সেখানে চুরি করে বেড়াচ্ছে। তার কাছ থেকে একটি পুঁটলি উদ্ধার করে আমাকে বলা হল, সেটি চোরাই জিনিস। পুঁটলির ভেতরে ছিল একজোড়া ছোট্ট চপ্পল আর একটি শাড়ি। এ-দুটি দেখে আমার কেমন সন্দেহ হল। আমি তখন সত্য ঘটনা খুঁজে বার করার জন্য আমার নাজিরকে আদেশ করলুম। আমার নাজির চোরের সন্ধানে ছদ্মবেশে তল্লাশি শুরু করল।

সুলতান : [সেই বুড়ো মানুষটিকে দেখিয়ে] এই আমার সেই নাজির।

[সকলে উদগ্রীব হয়ে বুড়ো মানুষটির দিকে তাকাল। সুলতান সঙ্গে সঙ্গে সেই বুড়ো মানুষটির মুখ থেকে নকল দাড়িগোঁফ আর মাথা থেকে নকল চুল টেনে খুলে ফেললেন। এতক্ষণ যাকে একজন থুত্থুড়ে কুঁজো বুড়ো মনে হচ্ছিল, এখন দেখা গেল সে একজন যুবক। সমবেত সকলের মুখে বিস্ময়ের কলস্বর শোনা গেল। ইতিমধ্যে সেই ইয়াসিন আর সোরাবও এখানে উপস্থিত হয়েছে।]

ইয়াসিন : [নাজিরকে দেখে, অবাক হয়ে] একী রে!

সোরাব : [দৃষ্টি নাজিরের দিকে স্থির রেখে] এ যে ভোজবাজি!

ইয়াসিন : এ যে দেখি, ভ্যাবাচ্যকা হাম্বা।

সুলতান : [তাদের দেখে] এ কী! আপনারা এখানেও জুটেছেন!

ইয়াসিন : এখানে আসতে চাইনি হুজুর। আমরাও চোরটাকে ধরব বলে এদিক-ওদিক যখন ঘুরপাক দিচ্ছি, তখন শুনলুম আপনি এখানে এসেছেন।

সোরাব : তাই ছুটে এলুম।

ইয়াসিন : আজ্ঞে, তা হলে কি চোর ধরা পড়ল না?

সুলতান : পড়েছে। তারা কয়েদে। সে চোরের নাম জহুরি, ওস্তাগর, সওদাগর আর কোতোয়াল।

সোরাব : তারা এখনো ওঠ-বোস করছে হুজুর?

সুলতান : [মৃদু বিরক্ত হয়ে] আঃ! আপনারা আবার কথার মাঝখানে কথা বলছেন? আমি কী বলছি, একটু স্থির হয়ে শুনুন।

সোরাব ও ইয়াসিন : [একসঙ্গে] বলুন হুজুর। আমরা এই স্থির হলুম। [দু-জনে কাঠের মতো দাঁড়িয়ে রইল।]

সুলতান : হ্যাঁ, যা বলছিলুম। আমার নাজির অনেক তত্ত্বতালাশ করে জানতে পেরেছে, যাকে আমরা সবাই চোর ঠাউরে ছিলুম, সে চোর নয়। সে তার বোনকে উপহার দেবার জন্য [চপ্পল জোড়া একজন দেহরক্ষীর হাত থেকে নিয়ে] এই চপ্পল জোড়া কিনতে শহরে এসেছিল। [দেহরক্ষীর হাত থেকে শাড়িটা নিয়ে] আর এ শাড়িটা সে কিনেছে তার মার জন্য। [জমাদারকে ইঙ্গিত করে] তুমি ভুল করে এই নির্দোষ ছেলেটিকে চোর ঠাউরে বিপত্তি বাধিয়েছ। সুতরাং এই ছেলেটিকে আমি তার চপ্পল আর শাড়ি ফেরত দিচ্ছি। [ছেলেটির হাতে তুলে দিল। তারপর নাজিরের হাত থেকে রেশমি-কাপড়ের পুঁটলিটা নিয়ে] সেইসঙ্গে মা আর বোনকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসার জন্য আমার তরফ থেকে তাকে দিলুম মায়ের জন্য রুপোর বাসনপত্তর, আর বোনের জন্য রেশমি পোশাক। [রেশমি-কাপড়ের পুঁটলিটা ছেলেটির হাতে তুলে দিলেন।] আর এই দরাজ মন তসরিফ ছেলেটির জন্য আমার ইনাম [দেহরক্ষীর হাত থেকে মুদ্রার থলি নিয়ে] এক সহস্র স্বর্ণমুদ্রা আর একটি টাট্টু ঘোড়া। [ছেলেটি সুলতানকে সালাম করল মাথা হেঁট করে।] [জমাদারকে] আর তুমি যে কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসগুলি চুরি করোনি, আর চোরকে ধরার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছ...

ইয়াসিন : [হঠাৎ] তার জন্য তুমি কান পাকড়ে এমনি করে ওঠ-বোস করো!

[ইয়াসিন আর সোরাব নিজেরাই এ-ওর কান ধরে মঞ্চের মধ্যিখানে কাঠের পুতুলের মতো টুকটুক করে এগিয়ে এসে ওঠ-বোস করতে লাগল। সুলতান হেসে উঠল। সুলতানের দেখাদেখি সবাই প্রাণ খুলে হেসে উঠল। আনন্দের বাজনা বেজে উঠল। সঙ্গে শোনা গেল ছেলেটির ছোট্ট বোন আলোর সেই গান]

‘‘আমার গানের নাও ভেসে যায়...’’

[ধীরে-ধীরে পরদা নেমে এল।]

[সমাপ্ত]

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%