সুহা

শৈলেন ঘোষ

আমার নাম সুহা।

মা বলেন, আমি নাকি খুব সুন্দরী। আমার ছোটো ভাইটা বলে, আমার ঠোঁটদুটো গোলাপফুলের পাপড়ির মতো টকটকে লাল। ঝলমলে চোখদুটো টানা-টানা। আমি শুনে হাসি। হাসলে, সবাই বলে আমার গালদুটো টোল খায়। আমি এ-ও শুনি আমাদের বাড়িটা নাকি ছবির মতন। চারিদিকে গাছ। দূরে পাহাড়। কত পাখি। রং বাহারি। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি একটা চার্চও আছে। তার ঘণ্টাটা বাজলে এত মিষ্টি লাগে কী বলব!

চার্চের ঘণ্টা শুনি ঠিকই, কিন্তু চার্চ যে দেখতে কেমন তা তো আমি জানি না। এমনকী আমি যে সুন্দরী, হাসলে আমার গাল যে টোল খায়, এ তো সবই শোনা কথা। আসলে, আমি তো নিজেকে নিজে দেখিনি কোনোদিন। কেমন করে দেখব? আমার চোখে যে আলো নেই। কাজেই জানব কেমন করে আমি সুন্দরী, না কুচ্ছিত। এত যে ভালোবাসেন আমার মা, সেই মায়ের মুখখানিও যে কেমন সুন্দর, তা-ও আমার দেখা হয়নি। দেখিনি বাবার মুখও। দেখা হয়নি আমরা ছোট্ট বিচ্ছু ভাইটার মুখখানিও।

তবে বলি, না দেখার কোনো কারণ ছিল না। আমি জন্মেছিলুম চোখে আলো নিয়েই। কিন্তু জন্মের মাত্র তিনদিন পরেই আমার চোখের আলো কেড়ে নেয় দস্যি-দামাল প্রকৃতি। আমার মায়ের মুখে শোনা, সেদিন মেঘে মেঘে আকাশ ঢেকে, দিগবিদিক তোলপাড় করে ঝড় উঠেছিল। যেমন মেঘের গর্জন তেমনই বিদ্যুতের চমক। এমনই সময় বাজ পড়ল খানখান শব্দ তুলে। আমি যে-ঘরে শুয়েছিলুম সে ঘরের খোলা জানলা মা বন্ধ করার তখনও ফুরসত পাননি। তার আগেই জানলা গলে ভয়ংকর এক বিদ্যুতের ঝলক আমার চোখের ওপর আছড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে ডুবে গেল আমার চোখ অন্ধকারে। আমি কেঁদে ফেললুম চিৎকার করে। তখন মাত্র তিনদিনের শিশু আমি। আমার চোখ কেমন করে সহ্য করবে সটান চোখের ওপর ঝলসে-পড়া বিদ্যুতের ঝলক? সেই থেকে আমি চোখে দেখি না। যদিও আমার বাবা প্রাণপাত করে চেষ্টা করেছিলেন আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার। কিন্তু মিথ্যে হয়ে গেল সেই চেষ্টা। তাই আমি অন্ধ।

আমি সুহা, আমার ভাই সোনা। সোনা আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোটো। ক্লাস সেভেনে পড়ছে। আমার বোধ হয় সতেরো হল। আমি পড়ছি উচ্চমাধ্যমিকে। লেখাপড়ায় সোনার দারুণ মাথা। স্কুলের স্যারেরা বলেন, ছেলেটাকে ঠিকঠিক ভাবে গাইড করলে, স্কুলের নাম রাখবে। আমাদেরও আশা তা-ই। বটেই তো, সোনার কী আশ্চর্য মনে রাখার ক্ষমতা! বাবার মুখে একই গল্প একই সঙ্গে সোনাও শুনছে, আমিও শুনছি, সেই গল্প তুমি জিগ্যেস করো আমাকে, আমি বলতে বলতে কোঁত পাড়ছি হাজার বার। আর সোনা দিব্যি বলে যাচ্ছে গড়গড় করে। যখনই দেখছে আমি কোঁতকাচ্ছি, তখনই ‘দিদি পারল না, পারল না’ বলে সে একেবারে হেসে কুটোপাটি। তার হাসি শুনে আমারও খুব মজা লাগে। আমিও হেসে ফেলি। সোনা তখন জোরে জোরে তালি দিয়ে ছড়া কাটবে—

হাসছে দিদি, হাসছে দিদি

খাচ্ছে গালে টোল,

হাসি তো নয় শুনছি যেন

খুশির উতরোল।

কিন্তু তারপরেই যেই ছড়ার পরের লাইনটা বলবে, তখন বলব কী একেবারে অন্য মানুষ। গলায় তার অমন যে ফুর্তির সুর নিমেষে নিস্তেজ হয়ে যায়। তখন মনে হয়, নিজের মনে চুপিসাড়ে সে বলছে—

এ-মুখ যদি নিজেই দিদি

দেখতে ধরে আয়না,

হায় রে তা যে হবার তো নয়

দেখতে দিদি পায় না!

হ্যাঁ, এই অন্ধকার চোখ নিয়ে মা, বাবার আদরে আমি একটু একটু করে বড়ো হয়েছি। আর একটি একটি করে দুনিয়ার কত কী জেনে ফেলেছি। আমি জানি পৃথিবীটা মস্ত বড়ো। যেমন সুন্দর, তেমনই রহস্যে ভরা ভয়ংকর। এই পৃথিবীর কোথাও পাহাড় দুর্গম। কোথায় আগ্নেয়গিরি জ্বলন্ত। কোথাও জলপ্রপাত উত্তাল। কোথাও বালির রাজ্য মরু। কোথাও মেরুপ্রদেশ বরফে ঢাকা। কোথাও সবুজে সবুজে বন-উপবন। পশুপাখি। কী নেই পৃথিবীতে! তোমরা সব স্পষ্টB দেখতে পাও নিজের চোখে। মিথ্যে বলব না, আমিও দেখছি পৃথিবীকে। তবে চোখের দৃষ্টিতে নয়, হাতের স্পর্শে। তোমরা যেমন গোটা পৃথিবীর চেহারাটা দেখতে পাও ম্যাপে, আমরাও দেখি ম্যাপে। তবে আমাদের ম্যাপটা তোমাদের মতো চাপা নয়। অন্যরকম। উঁচু উঁচু ফুটকি দিয়ে তৈরি। আমাদের পড়ার বইও তা-ই। আমাদের বই-এর অক্ষর উঁচু উঁচু ফুটকি। তোমরা যেমন বই-এর পাতায় চোখবুলিয়ে পড়ো, আমরা তেমনই আমাদের বই-এ সাজানো ফুটকিতে হাত বুলিয়ে বলতে পারি কোনটা ‘অ’ কোনটা ‘ক’। আমাদের পড়াশোনা করার এই কৌশলটা লুইস ব্রেইল নামে আর এক অন্ধ মানুষ আবিষ্কার করে গেছেন। তাঁর দেশ ফ্রান্সে। আমার যেমন জন্মের তিনদিন পরে চোখের আলো নিভে গেছে, তিনিও তেমন অন্ধ হয়ে জন্মাননি। তাঁর বাবার কাজের টেবিলে ছিল জুতো সেলাই করার ছুঁচ। সেই ছুঁচ দিয়ে খেলা করতে করতে কেমন করে যেন দুটো চোখেই সেই ছুঁচ ফুটে যায়। তখন তাঁর বয়স মাত্র তিন বছর। সেই থেকে তিনিও অন্ধ হয়ে যান। অগত্যা তাঁকে অন্ধদের স্কুলে পড়তে হয়। তখন ছিল অন্ধদের পড়াশোনা করার ঢাপ্পুস-ঢাপ্পুস বই। সেই সব বই-এর অক্ষরগুলোওছিল উঁচু আর গোটা গোটা। খুবই অসুবিধে হত সেই সব বই নাড়াচাড়া করে পড়াশোনা করতে। কিন্তু ব্রেইল সাহেব বড়ো হয়ে করলেন কী, এই বেঢপ ধারাটাই পালটে দিলেন। আবিষ্কার করলেন সবার মনকাড়া আজকের এই অন্ধজনের লেখাপড়া শেখার বই। সেই থেকে চলে আসছে এই ব্রেইল পদ্ধতি।

আসলে কী জানো, শেখার ইচ্ছে আর মনের জোর থাকলে কী না শেখা যায়। সে তো বটেই। ব্রেইল সাহেব চোখে দেখতেন না বটে। কিন্তু কী চমৎকার পিয়ানো আর অর্গান বাজাতে পারতেন। এমনকী বেহালাও। অন্ধজনেরা কত সুন্দর গান গাইতে পারে বলো! নাচতেও! আমি নিজে অবশ্য নাচ জানি না, কিন্তু একটু একটু গাইতে তো পারি। তবে হ্যাঁ, বলতেই পারো, যে মানুষের চোখ নেই, তার কষ্টেরও শেষ নেই। এই যে মা, যখন গুনগুন করে গান করেন, তখন মায়ের মুখখানি দেখার জন্যে আমার মন যে কী ভীষণ ছটফট করে, সেকথা আমি কাকে বলি! সত্যি বলতে কী, মায়ের মুখে গান শুনেই তো আমি একটু একটু গাইতে পারি। মায়ের গলাটি ভারি মিষ্টি। ভাবি, মাকেও না-জানি কী মিষ্টি দেখতে। একটা মানুষের চেহারা কেমন, সেটা আমি জানি নিজে মানুষ বলে। কিন্তু কে সুন্দর আর কে কুশ্রী, সে তো কারও গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে পারি না। ঠিক তেমনই পাহাড় যে পৃথিবীর বুক ফুঁড়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানান দিকে, মাথায় বরফ, সেই মস্ত পাহাড়ের আসল রূপটা চোখে না দেখে ম্যাপে হাত বুলিয়ে বোঝা যায় কি? না বলা যায় বিশাল সমুদ্র কেমনতর ভয়ংকর দেখতে? মা বলেছেন, এখন আমি যে পোশাকটি পরে আছি তাকে বলে সালোয়ার-কামিজ। সেটা না হয় ছুঁয়ে ছুঁয়ে বোঝা গেল পোশাকটা সালোয়ার-কামিজ। কিন্তু কামিজটা যে ফিকে নীল আর সালোয়ারটা হালকা সবুজ, এই সবুজ আর নীলের বাহারটা কেমন, সেটা চোখে না দেখে বলা যায়! তোমরা লালই বলো, কী সবুজ, নীলই বলো কী হলুদ, সে রং যে কেমন আমি জানিই না। আমি শুধু জানি, অন্ধকারের রং জমাটকালো। তা সে-ও তো চোখে দেখি না বলে কালোকে চিনি, আলোকে চিনি না। কী জানি কেন, একদিন আমার ভাই সোনার কী খেয়াল হয়েছিল, আমায় সে লাল রংটা কেমন দেখতে, সেটা বোঝাবার জন্য আটুপাটু করে লেগে পড়ল। কখনো বলছিল লাল গোলাপের কথা, কখনো আমাদের গায়ের রক্তের কথা। বলছিল, এবার দোলে আমার মুখে সে যে আবির মাখিয়ে দিয়েছিল, সেই লাল আবিরের কথা। কিন্তু হায় রে, ভাই-এর এত চেষ্টার পরেও লাল রংটা দেখতে কেমন আমি তা একফোঁটাও আঁচ করতে পারছিলুম না! শেষমেষ, বোঝাতে বোঝাতে সে হয়রান হয়ে গেল। তখন হঠাৎ তার নরম দুটো হাত আমাকে আদরে জড়িয়ে ধরল। আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, দিদি, দেখিস, একদিন তোর চোখে আলো ফুটবে। তুই সব দেখতে পাবি। দেখতে পাবি লাল রংটা কেমনতর।’

আমি চমকে উঠি। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলি, ‘তুই একটা আস্ত পাগল’।

ভাই উত্তর দিল, ‘তুই ঠিক বলেছিস একথা শুনলে পাগল ছাড়া আমাকে আর কী বলবে মানুষ! আমার মন বলছে, তা-ই বললুম।’

আমি হেসে ফেলি, আর মনে মনে ভাবি আমার সোনা ভাইটা আমায় ভীষণ ভালোবাসে! আমি যেই হাসতে হাসতেই তাকে জিগ্যেস করলুম, ‘হঠাৎই বা তোর মন এমন কথা বলল কেন?’

ভাই উত্তর দিল, ‘মন কেন বলল, সেকথা মনই জানে!’

আমি আবার চমকে উঠলুম। এবার চমকালুম ভাই-এর কথা শুনে নয়, হঠাৎ মেঘের গর্জন শুনে। বুঝতেই পারলুম, আকাশে মেঘের ঠোকাঠুকি লেগেছে। এবার বৃষ্টি নামবে। বলতে বলতেই টুপটাপ শুরু হয়ে গেল। তারপরেই ঝমঝমানি। বৃষ্টির ঝমঝমানি শুনতে আমার ভারি ভালো লাগে। তখন আমার ইচ্ছে যায় বৃষ্টিতে খুব ভিজি। ভিজতে ভিজতে আনিমানি করে ভাই-এর সঙ্গে খেলা করি। কিন্তু তা যে পারি না। যা পারব না, সে নিয়ে মনে খেদ করে কোনো লাভ আছে! তার চেয়ে বরং যা পারব, সেটাই করাই ভালো।

সেদিন আমি আপনমনে সেটাই করছিলুম। মায়ের মুখে একটা নতুন গান শুনে, সেই গানের সুরটা আমি গুনগুন করে সাধছিলুম। ঘরে বসে, একা। এমন সময়ে হঠাৎ ভাইটা কোথায় থেকে এসে আমায় বলল, ‘গুনগুনুনি ছাড়ত। চ আমার সঙ্গে।’

আমি জিগ্যেস করলুম, ‘কোথায় যাব?’

ভাই বলল, ‘এখানে, ওখানে, যেখানে হোক একটু ঘুরে আসব।’

একটু অবাকই হলুম। ভাবলুম, ভাই-এর হঠাৎ এমন ইচ্ছে হল কেন। ভাই তো আমায় কোনোদিন বেড়াতে নিয়ে যাবার কথা বলেনি! তাই বললুম, ‘কী ব্যাপার রে ভাই, আজ তোর এমন মতি কেন? এর আগে তুই তো আমায় কোনোদিন তোর সঙ্গে বেড়াতে যাবার কথা বলিসনি।’

ভাই উত্তর দিল, ‘তুই সারাদিন ঘরে একলা থাকিস। তোকে দেখে আমার কষ্ট হয়।’

ভাই-এর কথা শুনে আমি হেসে ফেললুম। ভাই যে আমায় খুব ভালোবাসে সে আমি জানি। তাই জিগ্যেস করলুম, এখানে, ওখানে, যেখানে হোক বললে তো হবে না। কোনখানে যাবি সেটা তো বল!’

ভাই বলল, ‘খেলার মাঠে।’

আমি বললুম, ‘ঠিক আছে। যাব, কিন্তু মাকে বলে যেতে হবে।’

ভাই উত্তর দিল, ‘তুই তো আচ্ছা! আমরা কি ধাপধাড়া গোবিন্দপুরে যাচ্ছি, যে মাকে বলে যেতে হবে। দু-মিনিট হাঁটলেই তো খেলার মাঠ। মাঠে তোকে নিয়ে একটু চক্কর দেব, তারপরেই ফিরে আসব।’

ভাই বললেও আমি কিন্তু সোজাসাপটা রাজি হলুম না। এমন নয় যে আমি বাইরে যাই না। গেলেও মায়ের সঙ্গে যাই। তা-ও সে কালেভদ্রে। একা ভাই-এর সঙ্গে তো কোনোদিন যাইনি। তাই মনে মনে ভাবলুম মাকে না বলে যাওয়াটা ঠিক হবে না। ঠিক বটে ; সারাদিন ঘরেই আটকা আমি। একঘেয়েও লাগে। তার মানে এই নয় ভাই বলল বলেই হুট করে ভাই-এর হাত ধরে বেরিয়ে পড়ব। কাজেই আমি ভাইকে বললুম, ‘দ্যাখ সোনা, রাগ করিস না। আমার যেতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু মাকে না বলে কিছুতেই যাব না। আমাদের দেখতে না পেলে মা ভাববে না!’

ওমা, হঠাৎ শুনি মায়ের গলা, ‘কোথায় যাবার মতলব হচ্ছে দু-টিতে?’ আমি হকচকিয়ে গেছি। মা যে কখন আমাদের ভাই-বোনের কথার মাঝখানে এসে পড়েছেন, আমি একদমই টের পাইনি। তবে উত্তরটা আমি দেবার আগে ভাই-ই বলল, ‘দ্যাখো না, দিদিকে বলছি চ, দু-জনে খেলার মাঠটা একটু চক্কর দিয়ে আসি, দিদি রাজি হচ্ছে না।’

ভাই-এর কথা শেষ হতেই, অন্য আর কোনো কথা না বলে আমি জিগ্যেস করলুম, ‘মা, আমি যাব?’

আমি অবাক হয়ে গেলুম, মা অমত করলেন না। শুধু বললেন, ‘যাও, কিন্তু খেলার মাঠ ছাড়া অন্য কোথাও যেয়ো না। দেরি করবে না। একটু ঘুরেই চলে আসবে।’

আমার মা যে খুব ভালো মানুষ সে আমরা জানি। কিন্তু আমাকে যে তিনি এককথায় ভাই-এর সঙ্গে ছাড়তে রাজি হবেন, এ আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তবে হ্যাঁ, মা আমাদের দু-ভাই-বোনকে চোখে চোখে রাখলেও, উঠতে-বসতে আমদের ইচ্ছায় বাধ সাধেন না। অবশ্য তোমার যদি এমন কিছু সাধ হয়, যেটা করা ঠিক নয়, সেটা করতে মা মানা করবেনই। আর বাবা? সে আর বলো না। বাবা এখন বাড়িতে নেই। বাবা এখন বাড়িতে থাকলে যে কী হত, বলা শক্ত। বাবা যে এককথায় রাজি হতেন না, একথা জোর গলায় বলতে পারি। সবকিছুতেই এত ভয়, কী বলব! ছেলে-মেয়েকে বড্ড বেশি ভালোবাসলে যা হয়, তা-ই আর কী! তার ওপর আমি চোখে দেখি না। আমি বুঝতে পারি, অন্ধ মেয়ের জন্য বাবার দুঃখের শেষ নেই। তাঁর আপশোস, আমি জন্ম নিলুম চোখে আলো নিয়ে, কিন্তু আলো নিভে গেল আকাশ-আলোর সেই দুরন্ত ঝলকানিতেই। নিমেষে। কী আশ্চর্য!

ভারি ভালো মানুষ আমার বাবা। অধ্যাপনা করেন। তাঁর জানার শেষ নেই। আমায় তিনি অজানা পৃথিবীর কত আশ্চর্য আশ্চর্য ঘটনার গল্প বলেন। আমার না-দেখা পৃথিবীর সেইসব ঘটনা আমার মনের চোখে কেমন স্পষ্ট ছবি হয়ে ফুটে ওঠে, সে আমি অন্যকে কেমন করে বোঝাব!

অবাক হলে? নিশ্চয়ই ভাবছ, মনের আবার চোখ হয় নাকি!

তবে বলি শোনো, আমি তো তোমায় দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মনে মনে কল্পনা তো করতে পারছি, তোমার মুখখানি কেমন! তুমি হাসলে তোমায় কেমন সুন্দর লাগছে দেখতে! কিংবা ধরো তুমি রাগ করলে তোমার চোখ দু-টি কেমন রাগে কটমট করে উঠছে! এ সবের কোনোটাই তো আমার অন্ধ চোখে আমি দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু কল্পনায় আঁচ করতে পারছি। এই কল্পনাই তো মনের চোখ। এই সেদিন তিনি যেমন আমায় বলছিলেন আল্পস পর্বতের একটা আশ্চর্য গল্প। তিনি বলছিলেন আর আমি মনের চোখে দেখছিলুম। আমার সে-গল্প স্পষ্ট মনের চোখের ওপর ভাসছে। আমি এখন বলছি তোমাদের—

গল্পটা আজ থেকে তিনশো বছর আগের। সেসময়ে মানুষের ধারণা ছিল, পৃথিবীর সমস্ত পাহাড়-পর্বতের চুড়ো দখল করে আছে হিংস্র দানবের দল। সেই সঙ্গে দখল করে আছে, ভয়ংকর ড্রাগনও। তাদের ভয়েই মানুষ পাহাড়ে উঠত না। তখন আরগন নামে এক দেশে পিটার নামে এক রাজা রাজত্ব করতেন। তিনি ছিলেন খুব দুঃসাহসী আর খুব শক্তিমান। তিনি মনে মনে ভাবলেন, পাহাড়ের চুড়োয় উঠে একবার দেখে এলে হয় ব্যাপারটা সত্যি, না মিথ্যে। এই ভেবে তাঁর দু-জন বিশ্বস্ত মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাজা একদিন গোপনে বেরিয়ে পড়লেন। পাহাড়ে উঠলেন। পাথর ডিঙিয়ে পাহাড়ের মাঝবরাবর পৌঁছোলেন, তখনই দেখা দিল বিপদ। কোথাও কিছু নেই, আমচকা বইতে শুরু করল এমন বাতাস যে তাঁদের মনে হল, গায়ে যেন ছুঁচ ফুটছে। যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে তাঁরা আর্তনাদ করে উঠলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঝাপটে পড়ল ভয়ংকর ঝড়ের তুফান। গাঢ় মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। উঠল ঘূর্ণিঝড়। ঘূর্ণিঝড়ে নাকানি-চোবানি খেয়ে তাঁরা যখন পাগলের মতো মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই খুঁজছেন, তখনই ঝাঁপিয়ে পড়ল তুষারঝড়। দেখা গেল বিদ্যুতের চমক সঙ্গে বজ্রপাতের কান ফাটানো গর্জন। প্রকৃতির হঠাৎ এমন ভয়ংকর রুদ্রমূর্তি দেখে তিনটে মানুষ ভয়ে দিশেহারা। তারপর পাহাড়ের এধারে-ওধারে কে যে কোথায় ছিটকে পড়লেন, আর দেখা গেল না।

এমন গল্প বাবা যে কত জানতেন। সময় পেলেই আমাদের শোনাতেন। শুনতে শুনতে যে ছবি আমার কল্পনায় উছলে উঠেছিল তাকেই তো বলব মনের চোখ।

থাক সেকথা। এখন ফের শুরু করি, ভাই-এর সঙ্গে আমার বেড়াতে যাবার সেই গল্পটা। হ্যাঁ, মায়ের সায় নিয়ে, ভাই-এর হাত ধরে যখন বার দরজা পার হতে যাচ্ছি, তখনই মা পিছু ডাকলেন, ‘সুহা, বাইরে বেড়াতে যাচ্ছিস অমন আলুথালু পোশাক পরে কেন? একটু ছিমছাম হয়ে না গেলে লোকে কী বলবে!’

‘ঠিক বলেছ মা।’ আমি উত্তর দিলুম।

‘আয় সালোয়ার-কামিজ পরে যা।’

আমি তো জানি না, সালোয়ার-কামিজ পরলে আমাকে কেমন মানাবে। তবে মা যখন বলছেন, তখন সালোয়ার-কামিজ পরলে নিশ্চয়ই ভালো দেখতে লাগবে। কাজেই মায়ের কথাই সই। সালোয়ার কামিজ পরে ভাই-এর হাত ধরে বেরিয়ে পড়লুম। ভাই-এর সঙ্গে এই প্রথম বেরোচ্ছি। সুতরাং, মায়ের মন যে একটু ছটফট করবে, এ তো জানা কথাই। তিনি বোধ হয় দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছিলেন। তাই ভাই হাঁক দিল, ‘মা, তুমি দরজা দাও! ভেব না। আমরা এক্ষুনি চলে আসব।’

মা থমথমে গলায় উত্তর দিলেন, ‘দেখিস, দিদির হাত ছাড়িস না যেন।’

ভাই-এর উত্তর, ‘না, না’।

মা নিশ্চিন্ত হলেন কি না জানি না। কিন্তু আমি চিন্তা করছি, চোখ না থাকলে দুর্দশার একশেষ।

সে তো হল, কিন্তু এ কী হচ্ছে, ভাই হাঁটছে তো হাঁটছেই! থামছে না কেন! খেলার মাঠ যেতে এতটা হাঁটার কথা তো নয়। ভাই তো মাঠে রোজ যায়। শুনেছি খেলার মাঠ তো বাড়ির কাছাকাছি। মনটা আমার আনচান করে উঠল। অস্থির গলায় ভাইকে জিগ্যেস করতে হল, ‘হ্যাঁ রে, আমাকে এত হাঁটাচ্ছিস কেন? কোথায় যাচ্ছিস? এতক্ষণে খেলার মাঠ তো পৌঁছে যাবার কথা।’

ভাই জিগ্যেস করল, ‘তোর কষ্ট হচ্ছে?’

উত্তরে আমি বললুম, ‘আমার কষ্ট হলে তোরও তো কষ্ট হবার কথা।’

ভাই বলল, ‘তবে দিদি তোকে সত্যি কথাটাই বলি। মাঠে নয়, আমি তোকে নিয়ে যাচ্ছি, একজন গুনিনের কাছে। সেদিন বলেছিলুম, একদিন তুইও দেখতে পাবি, তোর চোখে আলো ফুটবে, এই গুনিনই তোর চোখে আলো এনে দেবেন।’

ভাই-এর কথা শুনে আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছি।

ভাই ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, ‘দাঁড়ালি কেন?’

আমি বেশ রেগেমেগেই উত্তর দিলুম, ‘এক্ষুনি ফিরে চ।’

ভাই উত্তর দিল, ‘সে কী, ফিরে যাব কেন? গুনিনের সঙ্গে যে আমার কথা হয়ে আছে তোকে তাঁর কাছে নিয়ে যাব।’

আমি ভাইকে ধমক দিলুম, ‘তুই তো ভারি দস্যি ছেলে। মা, বাবা কাউকে কিছু না বলে তুই আমাকে কার না কার কাছে নিয়ে যাচ্ছিস! আর তুই বললেই আমি তার কাছে যাব! তুই এত বোকা, তা তো আমি জানতুম না...’

ভাই আমায় কথা শেষ করতে দিল না। আমার কথার ওপরই সে গলা চড়িয়ে উত্তর দিল,‘তুই আমাকে যতটা ভাবছিস আমি ততটা বোকা নই। আমি সব খবর নিয়েই তবে তোকে নিয়ে যাচ্ছি। এই গুনিনের খুব নাম-ডাক। সবাই জানে। মন্ত্র পড়ে সবার কত শক্ত শক্ত অসুখ ভালো করে দেয়।’

আমি বললুম, ‘এখন তোর বয়স কম। এই বয়সে আজগুবি গল্পই তোদের শুনতে ভালো লাগে। কে, কবে মন্ত্র পড়ে অন্ধ চোখে আলো এনে দিয়েছে বল তো আমায়! এক্ষুনি বাড়ি চ। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। মনে হচ্ছে আকাশে মেঘ জমেছে। ঝড় উঠবে হয় তো।’

আমি যা ভেবেছি সত্যিই তা-ই। বলতে না বলতেই মেঘ ডাকল। আর সঙ্গে সঙ্গে ভাই যে ভয়ংকর কথাটা আমাকে শোনাল তাতে আমি ভয়ে থম মেরে গেলুম। সারাশরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। ভাই কী বলল জানো? বলল, তার নিজের চোখদুটো সে আমায় দেবে! আর গুনিন বলেছে, আমার ভাই-এর চোখদুটো মন্ত্রের জোরে আমার চোখে বসিয়ে দেবে! দিলেই, আমি সব দেখতে পাব!

ভাই-এর কথা শুনে আমি আর্তনাদ করে উঠলুম, ‘ওরে সোনা, আমাকে একী সর্বনেশে কথ শোনালি। আমার চোখে দৃষ্টি নেই বলে, তোর চোখের দৃষ্টি নিয়ে, তোকে অন্ধ করে আমি আলো দেখব! তুই আমায় কত ভালোবাসিস তা আমি জানি, কিন্তু ওরে বোকা ছেলে, তুই কি এটা জানিস না আমি তোকে তার চেয়ে কম ভালোবাসি না! তুই কেমন করে ভাবলি, আমার ছোট্ট ভাই-এর দৃষ্টি নিয়ে আমি আমার অন্ধ ভাইকে দু-চোখ ভরে দেখব?’

বোধ হয় বেশ জোরেই বিদ্যুৎ চমকাল। কেন-না বুঝতে পারলুম কানফাটা শব্দ তুলে কাছে-পিঠেই কোথাও বাজ পড়ল। বলতে বলতেই ঝড়; ওমা! ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে ভাই-এর হাত ফসকে গেল কেন আমার হাত থেকে! ভাই কি ঝড়ের ঝাপটায় ছিটকে পড়ে গেল! আমি চিৎকার করে উঠেছি, ‘সোনা, কী হল?’ সোনার কোনো উত্তর নেই। আবার বজ্রপাতের ভয়ংকর শব্দ! আমি তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলুম, ‘সোনা-আ-আ!’

কোনো সাড়া নেই। বুঝতে পারলুম দুর্যোগ শুরু হয়েছে। কেন-না, বেশ ঝেঁপে বৃষ্টিও নামল। ঝড়, বৃষ্টি ও মেঘের তীব্র গর্জনের আতঙ্কে আমার মন ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। অন্ধরা যেমন করে দু-হাত বাড়িয়ে আঁতিপাতি করে কিছু খোঁজে, আমিও তেমন করে আমার ভাইকে খুঁজতে খুঁজতে সোনা-আ-আ, সোনা-আ-আ বলে চেঁচাই, আর ঘুরপাক খাই। ভয়ে হাঁপাই। তখন আমার যে কী অবস্থা, এখন তা কেমন করে তোমাদের বোঝাই আমি। ঠিক সেই মুহূর্তে আবার দিগবিদিক কাঁপিয়ে প্রচন্ড শব্দ তুলে বাজ পড়ল। মনে হল আমার সারাশরীরে ঝলকে পড়ল অসহ্য গরম আগুনের হলকা। আমি তখন আর কিছুতেই আমার পা দুটোকে শক্ত করে মাটিতে ধরে রাখতে পারছি না। বিপদের পর বিপদ! আবার বাজ পড়ল। আমি ছিটকে পড়লুম। তারপর আর কিছু জানি না। জানার কথাও নয়। কেন-না, আমি জ্ঞান হারালুম। তার পরে যে মুষলধারে বৃষ্টি নেমে আমার ছিটকে-পড়া দেহটার ওপর দাপাদাপি শুরু করেছিল, তার কিছুই আমি জানতে পারিনি। তবে, কখন যে আমার জ্ঞান ফিরে এসেছিল, তাও আমি বলতে পারব না। কিন্তু আমার জ্ঞান ফিরে আসার পর আমার গলার স্বর যে অনেক কষ্টে আমার ভাই সোনার নাম ধরে ডেকে উঠেছিল, এটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। আর স্পষ্ট খেয়াল করতে পারি, আমি যেখানে ছিটকে পড়েছিলুম, এখন যেন আমি সেখানে পড়ে নেই। এ এক নির্জন জায়গা। কোনো সাড়া নেই শব্দ নেই। ভয়ানক নিঝুম চারদিক। আমি অন্ধ। চোখে কিছুই দেখি না। তবে কি সোনা আমায় এখানে নিয়ে এসেছে! তাই-বা হবে কী করে! সোনা এত ছোটো ওর সাধ্যে কুলোবে কেন আমার জ্ঞান-হারা দেহটা এখানে বয়ে আনা।

আচমকা বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আমি চিৎকার করে উঠতে গেলুম সোন-আ-আ বলে। পারলুম না। অত শক্তি কোথায়? মিনমিন করে উঠল গলার স্বর।

এমন সময় মনে হল কে যেন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে দাঁড়াল আমার কাছে। তবে কি ভাই সোনা এসে দাঁড়াল! আমি খুশিতে উদবেল হয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘সোনা?’

কোনো উত্তর নেই। কে যেন আমার কপালে হাত রাখল। আমি বুঝতে পারলুম, এ হাত আমার ভাই সোনার নয়। ভারি নরম এ হাত। আমার গলা দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল, ‘কে?’

সে উত্তর দিল, ‘আমি জাহান।’

এ তো শুনি একটি ছোটো মেয়ের গলার স্বর। এরপর আমি কিছু বলার আগেই বলে ওঠে, ‘কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে তোমার সারাশরীর। আমার হাত ধরো! উঠতে পারবে না?’ বলে সে আমার হাত ধরল। কষ্ট হল। তবু উঠে বসতে পারলুম। সে বলল, ‘দু-পা গেলেই সায়র। ডুব দিয়ে চান করতে হবে। আমি তোমরা জন্যে পোশাক এনেছি।’

আমি তার হাত ধরে দাঁড়াবার চেষ্টা করলুম। পা কাঁপছে। তবু পারলুম। তাকে বললুম, ‘আমি চোখে দেখি না।’

সে উত্তর দিল, ‘আমি জানি।’

অবাক গলায় জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি কেমন করে জানলে?’

সে উত্তর দিল, ‘তোমার চোখ দেখে!’

আমি ব্যস্ত হয়ে জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি আমার ভাইকে দেখেছ?’

‘তার নাম কি সোনা?’

আমি অবাক হই। জিগ্যেস করলুম, ‘তুমি কেমন করে জানলে?’

‘তুমি বার বার তার নাম ধরে তাকে ডাকছিলে। কিন্তু তাকে আমি দেখিনি।’

‘তা হলে এখন কী হবে?’

‘এখন তোমাকে আমার হাত ধরে দু-পা হাঁটতে হবে। পরে তাকে খুঁজতে হবে। দু-পা হাঁটলেই সায়র।’

আমি হাঁটি। আশ্চর্য, তার হাত ধরে হাঁটতে আমার কষ্ট হল না। হাঁটতে হাঁটতে বলি, ‘জাহান, আমি কোনোদিন জলে ডুব দিয়ে চান করিনি। আমার ভয় করছে।’

সে জিগ্যেস করল,‘চোখে দেখো না বলে ভয়? নাকি ডুবন্ত জলকে ভয়? কিচ্ছু ভয় নেই, আমি আছি।’

আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। তার চিবুকটা ছুঁয়ে ধরার জন্যে হাত বাড়াই। হ্যাঁ, খুঁজে পাই তার চিবুক। বুঝতে পারি সোনার চেয়ে সে বড়ো নয়। হয়তো সোনার মতোই সে হবে। আমি তার চিবুকে হাত দিয়ে বলি, জাহান, তুমি আমার ভাই সোনার মতো ছোট্ট। সায়রের জলে আমার যদি পা পিছলে যায়, তুমি আমাকে সামলাবে কী করে?’

সে বলল ‘ভয় নেই। তুমি আমারও দিদি। মনে রেখো আমি তোমায় বিপদে ফেলছি না। বিপদে ফেলার জন্যে বলছি না। জেনে রাখো এখানে আমি ছাড়া অন্য একটি মানুষকেও কেউ দেখতে পাবে না। একটি মানুষেরও গলারস্বর কেউ কোনোদিন শোনেনি এখানে। আজই প্রথম তোমার গলার স্বর শোনা যাচ্ছে। চলো। আর একটু হাঁটলেই সায়র।’

আমি কেমন যেন হতভম্ব হয়ে আবার হাঁটতে থাকি তার হাত ধরে। হাঁটতে হাঁটতে তার কথার আকাশ-পাতাল কিছুই ভেবে না পেয়ে আবার জিগ্যেস করি, ‘কেউ-ই নেই এখানে?’

সে উত্তর দিল, ‘না। এখানে অন্য কেউ থাকলে আমি থাকতুম না। আমার চেয়ে বড়ো অন্য কেউ এসে তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করত।’

আমি বললুম, ‘অন্য কেউ নেই বলেই জায়গাটা কেমন থমথম করছে।’

আমার কথা তার কানে গেল কি না আমি বুঝতে পারি না। কেন-না আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সে বলে উঠল, ‘আমরা সায়রে পৌঁছে গেছি।’

শেষমেষ আমাকে জাহানের হাত ধরে সায়রে নামতেই হল। সত্যি বলছি, এবার আমার ভীষণ অবাক লাগল। এই নেহাতই ছোট্ট একটা মেয়ে এই ডুবন্ত জলে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেমন করে যে আমাকে সামলাচ্ছে, ভাবতে আমার ধন্ধ লেগে যাচ্ছে! চোখ থাকলে দেখতে পেতুম। অবশ্য, কে জানে চোখ থাকলে এমন বিপদেও কি পড়তে হত আমায়! এ যে কী ভয়ংকর বিপদ, যে কোনোদিন এমন বিপদে পড়েনি, তাকে কি বোঝানো যায়? আমি কোথায় এসেছি, ভাইটাই বা কোথায় গেল এ যেমন চোখ নেই বলে আমি জানি না, তেমনই মন তো আর আমার হারিয়ে যায়নি। মনে মনে তো আমি বুঝতেই পারছি, আমাদের বাড়িতে হুলুস্থুল কান্ড শুরু হয়ে গেছে! মা আর বাবার যে এখন কী অবস্থা সে কি আমি জানি না! যতই মনে পড়ছে, ততই হুহু করে উঠছে বুকের ভেতরটা!

হ্যাঁ, এই প্রথম আমি জানলুম জলে ডুব দেওয়া কাকে বলে। একগলা জলে যেই ঝুপ করে ডুব দিয়েছি, মনে হল আমার বুঝি দম আটকে যায়। তা বলতে নেই, জাহানকে জড়িয়ে ধরে এমনি করে পাঁচ-ছ-বার যখন নিজেকে জলে চুবিয়েছি, তখন বুঝতেই পারলুম, এবার আমার গায়ের কাদা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে।

তা, সেকথা আমায় নিজেকে বলতে হল না। জাহানই বলল, ‘এবার চলো, আস্তে আস্তে ডাঙায় উঠি!’

আমি খুব ভয়ে ভয়ে জাহানকে আঁকড়ে এক-পা দু-পা করে ডাঙায় উঠলুম। ডাঙায় উঠতেই জাহান খুশি খুশি গলায় বলে উঠল, ‘তোমাকে তো ভারি সুন্দরী দেখতে! এতক্ষণ কাদায় ঢাকা তোমার অত সুন্দর মুখখানা ভূতের মুখের মতো লাগছিল। একটু দাঁড়াও এখানে। আমি এক্ষুনি আসছি।’ বলে মনে হল, মেয়েটা ছুটল। কোথায় গেল! না, বেশি দূর যায়নি। কেন-না, নিমেষের মধ্যে ছুটে এসেই আমাকে বলল, ‘তোমার জন্যে শাড়ি আর জামা নিয়ে এলুম। তোমার ওই সালোয়ার-কামিজ ছেড়ে এই শাড়িটা পরতে হবে তোমাকে। এসো, আমি পরিয়ে দিই!’

‘আমি নিজেও পরতে পারি। তুমি শুধু শাড়িটা খুলে আমাক একটু গুছিয়ে দাও!’ আমি তাকে বললুম।

শাড়িটা গুছিয়ে, জামাটা আমার হাতে দিয়ে জাহান বলল, ‘তাহলে তুমি পরো। পরে এখানে একটু বসে অপেক্ষা করো। বসার কোনো অসুবিধে নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে আছ সেখানেই বসবে। ধুলো-ময়লা লাগবে না। আমি আর একবার তোমাকে ছেড়ে ছুটছি। এক্ষুনি আসছি।’

আসছি বলে সে যে নিমেষে আবার কোথায়, কোনদিকে উধাও হয়ে গেল কে জানে! এবার কেন জানি না, কেমন যেন ভয় করল। আমি এখন একা, একটা অন্ধমেয়ে। কোথায় এসেছি জানি না। কে এই মেয়ে জাহান তা-ও জানি না। এই নির্জন তল্লাটে সত্যিই কি কোনো মানুষ বাস করে না! তবে কে এই ছোট্টমেয়েটা। সে কি তবে এখানে একলা থাকে তা-ই যদি হয়, তবে সে তো বড়ো আশ্চর্য ঘটনা! কেন থাকে সে! কী করে থাকে! তার ভয় করে না! না কি সে ছলনায় ভুলিয়ে আমাকে কোনো বিপদে ফেলতে চায়! ভয়ে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। মনে হল কেঁদে উঠি চিৎকার করে। সাহস হল না। নতুন শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছি। আর মনে মনে ভাবি, দু-চোখে যার আলো নেই এক ফোঁটা, সেই অকেজো চোখে এত জল আসে কোত্থেকে!

‘এ কী! তোমার চোখ জলে ভাসছে?’

আমি থতোমতো খেয়ে গেছি! এই তো জাহান এসে পড়েছে। ইস, ছি-ছি! মেয়েটা আমার চোখের জল দেখে ফেলল! লজ্জা পেয়ে গেছি। ধড়ফড় করে হাত বাড়িয়ে নিজের চোখ দুটো নিজেই চেপে ধরলুম।

জাহান বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। তুমি হয় তো ভাবছিলে, আমি তোমাকে বিপদে ফেলে পালিয়েছি! তাই না?’

আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে বললুম, ‘না, না, আমি তা কেন ভাবব। তুমি তো দেখছ আমি কত অসহায়। অন্ধ চোখে ভাই-এর সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে কী ভয়ংকর দুর্যোগে পড়লুম। দুর্যোগে আমার ভাই কোথায় হারিয়ে গেল আমি জানি না। আমিই বা কোথায় এসেছি, তা-ও আমার জানা নেই। আমার বাবা-মা-র কথা যতই ভাবছি ততই যে আমার চোখ উপচে জল গড়াচ্ছে। আমি এখন কী করি বলো?’

‘এখন তুমি হাঁ করো। আমি তোমার জন্যে খাবার এনেছি। অনেকক্ষণ তোমার খাওয়া হয়নি এ তো জানা কথা-ই। এসো, এখন তোমায় খাইয়ে দিই।’

আমি আবার লজ্জায় পড়লুম। ‘না, না’ করেও পার পেলুম না। আমায় খেতেই হল। আসলে সত্যি বলতে কী মানুষ বিপদে পড়লে তখন খিদে, তেষ্টার কথা কার মনে আসে! কিন্তু খাওয়া শেষ হলে এবার জাহান যা বলল, তা শুনে ভয়ে আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে বলল, ‘তুমি এখন যেখানে এসেছ, এটা আমার দেশ। আমার নিজের এক্তিয়ার। উদ্ভটB ঠাঁই। এখানে কিছু নেই, কেউ নেই। সব শূন্য। এমনকী আমার নিজের হাসি নেই, কান্না নেই। আনন্দ নেই, দুঃখ নেই। মায়া নেই, দয়া নেই। যেন আমি একটা পাথর। কে আমার বাবা, কে আমার মা তা-ও জানি না। এমনকী কেমন করে এদেশটা আমার হল, তা-ও আমার জানা নেই। এখানে আছে শুধু একটা এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘিরে মস্ত পাহাড়। এখানে আসতে হলে ওই পাহাড় ডিঙনো ছাড়া উপায় নেই। আমি তাই অবাক হয়ে যাচ্ছি তোমাকে দেখে! তুমি এখানে এলে কী করে! কেউ কি তবে আমার এই পাহাড় ঘেরা দেশটার খবর জানতে পেরেছে? কেউ কি আমার এ দেশ দখল করতে চায়! তুমি কি তাদের গুপ্তচর! মিথ্যে ভান করে তুমি জলে-কাদায় গড়াগড়ি খাচ্ছিলে! কাজেই তুমি এখন আমার বন্দি। এখন এখানেই তোমাকে বন্দি থাকতে হবে। আমার বন্দিশালা ওই পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু চুড়োয়। ওই চুড়োর নির্জনে থাকতে থাকতে একদিন সবকিছু ভুলে তোমার মনও পাথর হয়ে যাবে। সেই দিন তোমার মুক্তি!’

আমি আঁতকে উঠে জাহানকে বলি, ‘বোনটি আমার এ কী কথা বলছ তুমি! আমাকে দেখে মায়া হচ্ছে না তোমার?’

‘না।’ কী কঠিন স্বর ওইটুকু মেয়ের গলায়। ভয়ে থরথর করে কেঁপে ওঠে আমার সারাশরীর। এবার আমি কী করব!

আমার আর কিছু করতে হল না। তার যে-হাত আমার মুখে খাবার তুলে দিল, সেই হাতে আমার মুখে-চোখে জল দিয়ে ধুয়ে দিল। তারপর সেই হাতই আমার হাত ধরল। আমার হাত ধরে জাহান বলল, ‘ওঠো।’

আমি কোনো কথা বলতে পারলুম না। তার কথা শুনে উঠে দাঁড়ালুম।

জাহান বলল, ‘এবার চলো!’

আমি খুব অস্ফুট গলায় জিগ্যেস করলুম, ‘কোথায় যাব?’

জাহান বলল, ‘বন্দিশালায়। পাহাড় চুড়োয়।’

এবার আমি কথা বলতে পারলুম না। কিন্তু থমকে থাকতে পারল না আমার চোখের জল। আমার মা, বাবা, ভাই সবাইকে হারিয়ে এখন আমি অন্ধ চোখে পাহাড়ে উঠব। পাহাড়চুড়োর বন্দিশালায় আমায় বন্দি থাকতে হবে, যতদিন প্রাণে বাঁচব।

জাহান বলল, ‘একটার পর একটা পাথরে পা ফেলে তোমায় পাহাড়-চুড়োয় উঠতে হবে। আমি যেমন-যেমন যাব, তোমাকেও ঠিক তেমন করে আমার হাত ধরে উঠতে হবে। শক্ত করে আমার হাত ধরো। যেন ছেড়ে না যায়!’

আমি উত্তর দিলুম, ‘জাহান, আমি তোমার হাত শক্ত করে ধরতে পারি, কিন্তু তোমার মতো একটার পর একটা পাথরে পা ফেলে কেমন করে উঠব! তা তো আমি জানি না। আমি তো দেখি না চোখে।’

জাহান কেমন নিষ্ঠুরের মতো উত্তর দিল,

‘সে আমি জানি না। তোমকে তো উঠতেই হবে! পাহাড়ের গায়ে গায়ে মেঘ জমেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনে হচ্ছে দুর্যোগ ঘনিয়ে আসছে। তুমি যত তাড়াতাড়ি পারে পা ফেলো, যেমন করে পারো! তোমাকে চুড়োয় পৌঁছে দিয়ে চটপট নেমে আসতে না পারলে, আমি নিজেই বিপদে পড়ব।’

না, জাহান নামতে পারল না। দুর্যোগ ঘনিয়ে এল পলকে। সেই একই কান্ড ঘটল। হঠাৎ উঠল ঝড়। হঠাৎই পড়ল বাজ। হঠাৎই নামল মুষলধারে বৃষ্টি। আমার পাহাড়-চুড়োয় ওঠা হল না। বাজের ভীষণ ধাক্কায় আমি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলুম পাহাড়ের পায়ের তলায়। জাহানের হাত আর আমার হাত ধরে নেই। সে-ও বোধ হয় কোথাও ছিটকে পড়েছে। আমিও জ্ঞান হারিয়েছি!

এবারেই ঘটল সেই আশ্চর্য ঘটনা। ঘটল এক অদ্ভুত কান্ড! আমার জ্ঞান ফিরল ধীরে ধীরে। আমি হাত বাড়াই এধার- ওধার। গলায় শব্দ আসে না। তবু ডাকি, ‘জাহান, জাহান, আমায় বাঁচতে দাও! আমি আমার ভাইকে খুঁজে নিয়ে মায়ের কাছে যাব, বাবার কাছে যাব। জাহান। জাহান!’

তখনই আমার মনে হল, কার নরম হাত যেন আমার কপাল ছুঁয়ে আছে! সে যেন আমাকে কানে কানে বলল, ‘আমিই জাহান।’

কীসের তাড়নায় কীসের জন্য আমি জানি না, হঠাৎ মুখ ফেরাতেই আমরা চোখে যেন একটুকরো আলো চমকে উঠল! যে ঝলক আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল সেই আলোর ঝলক কেমন ছিল আমি জানি না। কিন্তু আজ অত কষ্টের মধ্যেও আমি চমকে উঠে পড়েছি। আমার সারাশরীর কী ভয়ানক শিহরণে থরথর করে কাঁপতে লাগল আমি কেমন করে বোঝাই। আমার কপালে এতক্ষণ যার হাত ছুঁয়ে ছিল, মনে হল তাকে যেন আমি দেখতে পেলুম এক লহমার জন্যে। দেখতে পাওয়া কাকে বলে তাই যে জানি না আমি। তবু মনে হল মনের চোখ দিয়ে যেমন ইচ্ছেমতো ছবি আঁকি আমি, তেমনই একটা আবছায়া ছবি একবার দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল! তবে...তবে কী...

আমার দুই কাঁধে দু-হাত রেখে ঝাঁকুনি দিতে দিতে আবছায়া সেই মূর্তি বলল, ‘ওঠো শিগগরি! পাশের ওই গুহাতে ঢুকতে হবে।’

দু-দু-বার একইভাবে আছড়ে পড়ে শরীরে আমার জোর নেই যেন একটুও। যে-টুকু জোর জাহান ফিরিয়ে এনেছিল স্নান করিয়ে, নতুন কাপড় পরিয়ে সে-জোর চলে গেছিল আগেই বুঝি-বা তার কড়া-কড়া কথায়! তাকে আমি বুঝতে পারছি না। পারছি না ভরসা করতে। পড়ে থাকি তাই মাটির বুকে। অন্ধ দুটো চোখে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে আসছে। ভাইটার জন্য ডুকরে উঠছে মন। ডুকরে উঠছে মা-বাবার জন্য। দেখতে না পেলেও এতদিন বুঝিনি অন্ধ হওয়া কাকে বলে। বুঝি আজ তা বুঝলাম।

মুখের ওপর গরম নিশ্বাস পড়তেই বুঝলুম জাহান ঝুঁকে পড়েছে আমার মুখে ওপর। জড়িয়ে ধরে আমার মুখে গালে চুমু খেল সে। বলল, ‘রাগ কোরো না দিদি, এই পাথরের জঙ্গলে পাথর হয়ে গেছি আমি। আমি তোমারই মতন হারিয়ে যাওয়া এক মেয়ে। কেমন করে হারিয়ে গেছি তার সবটুকু নিজেও জানি না। শুধু জানি আমারও ঠিক তোমারই মতন মা-বাবা, ভাই আছে। আর জানি এই রাক্ষুসে জায়গাটায় বন্দি করে রেখেছে আমাকে কেউ। তাদের আমি দেখতে পাই না, তবু বুঝতে পারি। তুমি যেমন খুঁজছ তোমার সোনা ভাইকে, বাবা-মাকে, আমিও তেমনি খুঁজছি আমার বাবা-মা আর ভাইটিকে।’

আমি অবাক হয়ে শুনছিলুম ওর কথা এই মেয়েটাই আমাকে অমন কড়া কড়া কথা শোনাচ্ছিল একটু আগে! হঠাৎ দু-ফোঁটা জল পড়ল আমার হাতে। বুঝলুম, এবার জলে ভিজে উঠেছে জাহানের চোখ। আন্দাজে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে নিয়ে জড়িয়ে ধরলুম জাহানকে। বললুম, ‘কেঁদো না বোনটি। আমরা ঠিক খুঁজে পাব আমাদের হারানো সবাইকে, সব কিছুকে।’

অবাক হলুম নিজেই। যে আমি ভরসা খুঁজছিলুম জাহানের কাছে, সেই আমি এখন ভরসা দিচ্ছি তাকে! জাহান আমার হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চলো, মেঘ কেটে গেছে। এখন আর ভয় নেই।’

আমার মনের যে-চোখ সেই চোখ স্পষ্ট দেখল জাহানের দুটো চোখে চিকচিক করছে জল। সেই জলে ঠিকরে পড়ছে আলো।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%