শৈলেন ঘোষ
অরু বড়ো হচ্ছে। বাবা বলেছেন, ক-দিন পরে অরু উঁচু ক্লাসে উঠবে। উঁচু ক্লাস কত উঁচু জানে না অরু। তাই ভয় পায়। এই নীচু ক্লাসেই একগাদা বই। উঁচু ক্লাসে না-জানি আরও কত বই। নীচু ক্লাসের সব বই পড়ে শেষ করতে পুরো একটা বছর লেগে গেল। তাহলে কেমন করে উঁচু ক্লাসের সব পড়া শেষ হবে এক বছরে? তবে কি অরু উঁচু ক্লাসে উঠে শুধুই পড়বে? খেলবে না? ছবি আঁকবে না? দাদুর ওই কোলের ওপর মাথা রেখে গল্প শুনবে না?
দাদু ভারি মজা করে গল্প বলেন। গল্প বলতে বলতে তিনি নিজেই হয়ে যান কখনো রাজা, না হয় রাজপুত্র। ডাকাত, নয়তো বাজিকর। তখন দাদুর মুখের চেহারাটাই কেমন পালটে যায়। এক-একবার এক-এক রকম। তিনি যখন গল্প বলেন, তখন তাঁর চোখদুটো ঠিক যেন ডাকাতের মতো কটমটে। আবার যখন বাজিকরের গল্প শোনান, তখন তাঁর চোখে যেন কত রহস্য! জ্বলজ্বল করছে। বাজিকরের গল্প শুনলে গায়ে কাঁটা দেয় অরুর। দাদুর মুখে বাজিকরের গল্প যে কতবার শুনেছে সে। যতবারই শোনে, ততবারই মনে হয়, আবার শোনে। সত্যি, আশ্চর্য গল্প বটে। এক ছিল বাজিকর। গায়ে একটা কালো জোব্বা। মাথায় লাল টুপি। ঝাঁকঝাঁক চুলের রাশি টুপির ফাঁক দিয়ে ঘাড়ের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। লাল টকটক করছে চোখ। নাকের নীচে তাগড়াই গোঁফ। সঙ্গে খুবই ছোটো একটি সঙ্গী। তাকে নিয়েই যত রাজ্যের গল্প দাদুর মুখে।
একবার কিন্তু দাদুর মুখে শোনা গল্প অরু নিজের চোখে দেখেছে। অরুদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ছোট্ট মাঠ। একদিন এক বাজিকর ওই মাঠে জাদুর খেলা দেখাচ্ছিল। সেই সময় দাদুর হাত ধরে অরু যাচ্ছিল বেড়াতে। বাজিকরকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন দাদু। অরুকে বললেন, ‘ওই দ্যাখ, গল্পের বাজিকর খেলা দেখাচ্ছে! চ, দেখবি চ।’
অরুর বুকের ভেতরটা খুশিতে উছলে উঠল। দাদুর মুখে শোনা গল্প এক জিনিস। আর সেই গল্প চোখে দেখা আর এক জিনিস। কে বলো এমন সুযোগ হাতছাড়া করে! অরুর তর সইল না। দাদুকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলল মাঠের দিকে। একমাঠ লোক। একেবারে হইহই করে খেলা দেখাচ্ছে। অরু দাদুকে নিয়ে এর হাতের ফাঁক গলে, ওর গায়ে ঠেলা মেরে একেবারে সামনে পৌঁছে গেল। দু-চারজন যে দু-চার কথা বলল না, তা যেন ভেব না। একে ভিড়। তার ওপর পেছন থেকে ঠেলা মেরে কেউ যদি সামনে যায় তো এমন সুজন কে আছে যে, ঠেলা খেয়ে মুখ বুজে সহ্য করবে। মুখ বুজে সহ্য করুক আর না-ই করুক, অরু ততক্ষণে দাদুর হাত ধরে খেলা দেখতে শুরু করে দিয়েছে।
অরু কেমন অবাক হয়ে দেখছে বাজিকরকে। আরে, এ যে ঠিক দাদু যেমন বলেছিল এক্কেবারে তেমন দেখতে। এই বাজিকরের সঙ্গেও তো তেমনই এক ছোট্ট সঙ্গী। অরুর কী ভাগ্য বলো, এক্ষুনি খেলা শেষ হয়ে যাবে। শুধু একটা খেলাই বাকি। অরু শেষ খেলাটা দেখার ঠিক আগেই এখানে হাজির হয়েছে। এই খেলার গল্পটা দাদুর মুখে শুনলেই অরুর বুক শুকিয়ে যায়। এখন চোখের সামনে গল্পের সেই ঘটনা দেখলে কি যে হবে অরুর, কে বলতে পারে।
অরু সামনে এসে দাদুকে একেবারে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। দেখছিল বাজিকরের মুখখানা। তার লাল টকটকে চোখদুটো থেকে-থেকেই এধার-ওধার ঘুরে-ঘুরে সবাইকে দেখছিল। আর তার ছোট্ট সঙ্গীটি মাঠের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে বাজিকরের দিকে তাকিয়ে ছিল। হয়তো বাজিকর এক্ষুনি কিছু হুকুম করবে। সেই হুকুম শোনার জন্যে সে তৈরি।
যা ভাবা ঠিক তা-ই। বাজিকর আচমকা গলা ছেড়ে হাঁক পাড়ল, ‘এ ছেলিয়া!’
সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট সঙ্গীটি চেঁচিয়ে সাড়া দিল, ‘ওস্তাদজি?’ বোঝা গেল ওস্তাদই, মানে বাজিকর, সঙ্গীটিকে ‘ছেলিয়া’ বলে ডাকে।
ওস্তাদজি ছেলিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। আগের মতো হাঁক পেড়েই আবার বলল, ‘ছেলিয়া-আ-আ।’
ছেলিয়া উত্তর দিল, ‘হাঁ জি।’
বাজিকর ভাঙাভাঙা হিন্দিতে জিগ্যেস করল, ‘কভি তিমি-মাছ দেখা হ্যায়?’
‘না জি।’
‘তিমি-মাছ কীধারে থাকে মালুম আছে?’
‘সমুদ্দুরে।’
‘কভি জিরাফ দেখা হ্যায়?’
‘না জি।’
‘জিরাফ কীধারে থাকে মালুম আছে?’
‘জঙ্গলে।’
বাজিকর আবার চোঁচাল, ‘এ ছেলিয়া-আ-আ।’
‘হ্যাঁ জি।’ সাড়া দিল সঙ্গীটি।
‘এখোন যদি তোকে হামি সমুদ্দুরের পানিতে ফেলে দিই, কী হোবে তোর?’
‘ডুবে যাব।’
‘তোকে যদি এখানে জঙ্গলমে ছেড়ে আসি, কী হোবে?’
‘বাঘে খাবে।’
‘এ ছেলিয়া-আ-আ।’
‘হাঁ জি।’
‘তোবে তুই সমুদ্দুরে যাবি না?’
‘ডুবতে কে যায়?’
‘এ ছেলিয়া-আ-আ।’
‘হাঁ জি।’
‘তোবে তুই জঙ্গলমে যাবি না?’
‘বাঘের পেটে যেতে কে চায়?’
‘তবে কীধারে যাবি?’
‘আকাশে যাব।’
‘আকাশে? কেনো যাবি?’
‘আকাশ নীল। আকাশে পাখি ওড়ে। তারা জ্বলে। চাঁদ ওঠে। আমার ভালো লাগে।’
‘তুই কেমোন কোরে আকাশে যাবি? তুই তো পঞ্ছি না।’
‘ওস্তাদজি।’
‘বোলোজি।’
‘তুমি তো মানুষকে পাখি করার মন্ত্র জানো।’
‘ঠিক বাত।’
‘তবে আর কী, আমাকে পাখি করে দাও।’
‘তোর মা-বাবা হামাকে পুলিশে দিবে না?’
‘আমার মা, বাবা, ভাই, বোন কেউ নেই।’
‘কেউ নেহি আছে তো শুয়ে পড় ওহি কম্বলটার উপরে।’
সঙ্গে সঙ্গে বাজিকরের খুদে সঙ্গীটি শুয়ে পড়ল কম্বলের ওপরে। বাজিকর এবার মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘দেখেন বাবুরা, হামাকে কোনো দোষ দিবেন না। এ ছেলিয়া পঞ্ছি হোয়ে আকাশে উড়বে। আপনারা সোব কথা শুনিয়াছেন। দেখেন বাবুরা, হামার হাতের এই কালা কাপড়া কা ভিতর জাদু আছে। এখোন হাম এই কালা কাপড়া দিয়ে ছেলিয়াকে ঢাকিয়া দিচ্ছি। দেখেন বাবুরা, ছেলিয়াকে আর নেহি দেখা যাচ্ছে। বাবুরা, জোরসে তালি বাজান।’
তালি বেজে উঠল।
বাজিকর আবার বলতে শুরু করল, ‘বাবুরা, এখানে আপনারা আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন। এখোন হামি মন্ত্র পড়ব। আপনারা আকাশ থেকে নজর একদম সোরাবেন না। সোরালে ও পঞ্ছি উড়িয়া যাবে, আর দেখা যাবে না।’
বাজিকরের কথা শুনে সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বাজিকর মন্ত্র পড়তে শুরু করল। সঙ্গে সেই সারাদেহ কালো কাপড়ে ঢাকা সঙ্গীটির চারদিকে ঘুরপাক খেতে লাগল।

ইতিমারু তাকা সিকি
উসুখুসু ফুস
কাকা কিচু চাকা চিকি
যা থা উড়ে হুস।
মানা সিকি সামু দাসা
এক থাপ্পড়
দেখো, দেখো উড়ে গেলো
সাদা কবুতর!
মন্ত্র শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে বাজিকর তার ছোট্ট সঙ্গীটির চাপা দেওয়া কাপড়টা ফস করে তুলে নিল। যাচ্চলে! কোথায় সেই ছোট্ট সঙ্গীটি! কাপড়টা টানতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা সাদা ধবধবে পায়রা। বেরিয়েই ফুড়ুত! উড়ে গেল আকাশে। সঙ্গে সঙ্গে হাততালি। সারাচত্বরটা হাততালিতে ফেটে পড়ল।
আশ্চর্য, অরু কিন্তু হাততালি দিল না। তার মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল।
এদিকে আরও এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। নিমেষের মধ্যে সেই ছোট্ট সঙ্গীটি সাদা ধবধবে পায়রাটাকে হাতে নিয়ে সেখানে হাজির! আশ্চর্য, কোথা থেকে এল কেউ বুঝতেই পারল না। আবার একচোট হাততালি! তারপরেই খেলা শেষ। বাড়ি ফেরার পালা।
দাদু বললেন, ‘দেখলি, কেমন খেলা।’
অরু বলল, ‘দেখলুম।’ তারপর পলক চুপ থেকে বলল, ‘দাদু, তুমি আমাকে একটা সাদা পায়রা কিনে দেবে?’
‘পায়রা!’ দাদু অবাক হলেন, ‘কী করবি?’
‘আমিও বাজিকরের মতো খেলা দেখাব। আমিও তোমাকে পায়রা করে দিতে পারি।’
উত্তর দিল অরু।
‘তুই কেমন করে পারবি? বাজিকরের মতো তোর মন্তর জানা আছে?’ জিগ্যেস করলেন দাদু।
অরু উত্তর দিল ‘মন্ত্র একটা শিখে নেব। আমার চাই শুধু একটা পায়রা।’
দাদু বললেন, ‘ঠিক আছে দেব। কিন্তু তুমি উঁচু ক্লাসে ভালো নম্বর পেয়ে যদি ওঠো, তবে দেব।’
অরু বলল, ‘তার মানে সাত দিন পর দেবে। সাত দিন পরে তো রেজাল্ট বেরোবে। ঠিক আছে। তাই সই।’
হ্যাঁ। ঠিক তা-ই। সাতদিন পর রেজাল্ট বেরিয়েছিল। অরু যে শুধু ভালো নম্বর পেয়েছে তা-ই নয়, অরু ফার্স্ট হয়েছে। সুতরাং, অরুর আদর বাড়ল। মা, বাবা, দাদু, ঠানদি সবাই কী খুশি। দাদুকে জড়িয়ে ধরে অরু বলল, ‘আমার পায়রা?’
দাদু হাসলেন। কেন-না, অরু জিগ্যেস করার আগেই সাদা পালকের একটি ঝলমলে পায়রা কিনে এনেছেন দাদু। খুশিতে উছলে উঠে অরু চিৎকার করে উঠল, ‘দাদু—আমার দাদু।’
দাদু জিগ্যেস করলেন, ‘পায়রা তো এল, এবার কী করবি?’
‘এবার আমি হব বাজিকর। তুমি হবে আমার সঙ্গী। ফুসমন্তরে তোমাকে আমি পায়রা করে দেব। বাজিকরের কেরামতি আমি সব দেখে ফেলেছি।’ বলে অরু জিগ্যেস করল, ‘কোথায় রেখেছ পায়রাটা?’
দাদু বললেন, ‘আয়।’
অরু চলল দাদুর সঙ্গে সেই ছাতের চিলেকোঠায়। সেইখানে বাঁধা আছে পায়রা। দাদু পায়রার বাঁধন খুলে দিতেই অরু তাকে দু-হাত দিয়ে ধরে ফেলল। তারপর পায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দ্যাখো-দ্যাখো দাদু, পায়রার চোখদুটো কেমন চকচক করছে।’
দাদু বললেন, ‘দেখিস, হাত ফসকে উড়ে না-পালায়! পোষ মানাতে এখনও ক-টা দিন লাগবে।’
‘অবশ্য বাজিকরের খেলাটা শিখতে তোমার একমিনিটও লাগবে না।’ উত্তর দিল অরু।
দাদু জিগ্যেস কলেন, ‘কীরকম খেলা রে, যে শিখতে একমিনিট লাগে না?’
অরু জবাব দিল, ‘কীরকম খেলা, সেটা আমি তোমায় শিখিয়ে দেব। কিন্তু তুমি কাউকে বলতে পারবে না।’
‘না না। তাই আবার কেউ বলে।’
অরু বলল, ‘দ্যাখো না। আমি সবাইকে এমন ঠকান ঠকাব। মা, বাবা, ঠানদি, আমার বন্ধুরা, কেউ বাদ যাবে না।’
দাদু হাসতে হাসতে জিগ্যেস করলেন, ‘তোর ঠানদিকেও ঠকাবি?’
‘বলছি তো সব্বাই ঠকবে। শুধু তুমি বাদ। কেন না, তুমি হবে আমার ম্যাজিক খেলার সঙ্গী। তুমিই কালোকাপড় চাপাচুপি দিয়ে শুয়ে থাকবে সবার সামনে। আমি মন্তর পড়ব। সবাইকে বলব, দাদু পায়রা হয়ে আকাশে উড়ে যাবে। তোমরা সবাই আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকো।’
‘হ্যারে, আমি কি সত্যিই পায়রা হয়ে যাব?’ দাদু যেন ভয় পেলেন।
অরু হেসে ফেলল। বলল, ‘আমি তোমাকে সব বলব। কিন্তু কাউকে বললেই খেলা পন্ড। এমনকী ঠানদিকে পর্যন্ত বলা চলবে না।’
‘পাগল।’ বলেই দাদু মুখ ঘোরালেন। তারপরে গলা চড়িয়ে বললেন, ‘বাজিকরের গোপন কথা যে কাউকে বলতে নেই। একী আমি জানি না।’
অরু সাবধান করল দাদুকে, ‘মাকেও বোলো না কিন্তু। মাকে বললে, মা আবার বাবাকে বলে দেবে। বলো, সবাই আগের থেকে জেনে ফেললে সে খেলায় মজা থাকে? কাউকে অবাক করা যায়?’
‘সে তো একশোবার।’ উত্তর দিলেন দাদু।
‘তবে, তুমি যখন আমার সঙ্গী তখন তোমার কাছে তো কিছু গোপন করতে পারি না। তোমাকে আগেভাগে সব শিখিয়ে না রাখলে খেলা হবে কেমন করে?’
দাদু বললেন, ‘বটেই তো?’
অরু হঠাৎ জিগ্যেস করল, ‘বাজিকররা খুব চালাক হয়, না দাদু?’
দাদু উত্তর দিলেন, ‘চালাক না হলে মানুষকে ধোঁকা দেবে কেমন করে।’
অরু বলল, ‘আমি কিন্তু বাজিকরের চালাকি ধরে ফেলেছি।’
দাদু চমকে তাকালেন অরুর দিকে। জিগ্যেস করলেন, ‘কীরকম?’
অরু উত্তর দিল, ‘বাজিকর এমন চালাক জানো, ওই যে কালো কাপড়টা তার ছোট্ট সঙ্গীটির গায়ে ঢাকা দিয়ে দিল, পায়রাটা ওই কাপড়ের ফাঁকে কায়দা করে লুকিয়ে রেখেছিল। বাজিকর যখন সবাইকে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে বলল, যখন বলল, সঙ্গীটি এবার পাখি হয়ে আকাশে উড়ে যাবে, আমি তখন চুপচাপ তাকিয়ে রইলুম ওই কালো কাপড় ঢাকা বাজিকরের সঙ্গীটির দিকে। সবাই আকাশ দেখছে, আর আমি দেখছি মাটিতে বাজিকরের কেরামতি। এবার শুরু হল বাজিকরের মন্তর পড়া। কাপড়-ঢাকা সঙ্গীটিকে ঘিরে ঘুরেঘুরে মন্তর পড়ছে বাজিকর। আর আড়চোখে দেখছে, আকাশ না-দেখে কেউ তাকে দেখছে কিনা। আমি কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। তার সাধ্যি কী আমাকে ধরে! ঠিক সেই সময়ে তার ছোট্ট সঙ্গীটি চুপচাপ কালো কাপড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়েই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। পায়রাটা কিন্তু কাপড়ের নীচেই চাপা পড়ে থাকল। মন্তর পড়তে পড়তে বাজিকর আচমকা কাপড়ে মারল একঝটকা। সঙ্গে সঙ্গে পায়রাটা কাপড়ের নীচ থেকে বেরিয়ে উড়ে গেল আকাশে। পোষা পায়রা। খানিক আকাশে চক্কর মেরে সে সবার চোখের আড়ালে চলে গেল। এদিকে বাজিকরের ছোট্ট সঙ্গীটি লুকিয়ে ছিল, একটু দূরে। সে আকাশের দিকে চেয়ে তালি মারল। সঙ্গে সঙ্গে পায়রা নেমে এল আকাশ থেকে তার হাতে। তারপর বাজিকরের ছোট্ট সঙ্গীটি পায়রা হাতে নিয়ে আবার খেলার মাঠে হাজির। সবাই অবাক!’
দাদুও অবাক হয়ে গেলেন অরুর কথা শুনে। তারপর বললেন, ‘একেই বলে ম্যাজিক। এমনই করে বাজিকর আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।’
অরু আবার বলল, ‘তুমি কিন্তু এসব কথা কাউকে বলবে না।’
দাদু উত্তর দিলেন, ‘একদম না।’
‘দ্যাখো এবার কী মজা হয়,’ বলে অরু পায়রাটা হাতে নিয়েই ছুটল।
দাদু ব্যস্ত হলেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’
‘তুমি দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি।’ বলে অরু একেবারে মায়ের কাছে হাজির, ‘মা!’
মা রান্নাঘরে কুটছিলেন। অরুর ডাক শুনে মুখ তুলতেই অবাক। ‘কী রে, পায়রা কোত্থেকে পেলি?’
অরু হাসতে হাসতে উত্তর দিল, ‘আমি ফার্স্ট হয়েছি বলে দাদু দিয়েছে। আমি এই পায়রা নিয়ে বাজিকরের মতো খেলা দেখাব।’
মা বললেন, ‘দ্যাখো ছেলের কান্ড।’
‘আমি সবাইকে অবাক করে দেব,’ বলে অরু আর মায়ের কাছে দাঁড়াল না। ছুটল ঠনদির কাছে।
‘ঠানদি, ঠানদি!’
ঠানদি তুলসী গাছে জল দিচ্ছিলেন। অরুর হাতে পায়রা দেখে বললেন, ‘আমি জানি কে দিয়েছে।’
অরু বলল, ‘সে আমিও জানি। নিশ্চয়ই দাদু বলেছে। দ্যাখো না, এবার এই পায়রার খেলা দেখিয়ে আমি তোমাদের অবাক করে দেব।’
ঠানদি মুচকি হেসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী খেলা দেখাবি রে?’
‘এখন বলব না,’ বলে অরু ছুটল বাবার কাছে।
বাবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। একটু পরে চান-খাওয়া সেরে অফিসে যাবেন। অরু ছুটতে ছুটতে বাবার কাছে হাজির, ‘বাবা! বাবা!’
বাবা কাগজের পাতা থেকে মুখ তুলে চাইতেই তাঁর চোখ পড়ে গেল অরুর হাতের দিকে।
অরু খুশিতে উছলে উঠে বলল, ‘আমি ফার্স্ট হয়েছি বলে দাদু এই সাদা পায়রাটা আমায় দিয়েছে।’
বাবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
অরু হাসতে হাসতেই বলল, ‘এই পায়রাটা নিয়ে আমি একটা দারুণ ম্যাজিক দেখাব তোমাদের। দাদু হবে আমার সঙ্গী। আমার খেলা দেখলে তোমরা অবাক হয়ে যাবে।’
হঠাৎ বাবা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, ‘পায়রাটা যেখান থেকে কিনেছেন, দাদুকে সেখানে ফেরত দিয়ে আসতে বলো।’
‘কেন?’
‘এখন তুমি উঁচু ক্লাসে উঠেছ। তোমার আর খেলাধুলো করে সময় নষ্ট করা চলবে না।’ বাবার গলা তেমনই গম্ভীর।
অরুর হাসি-খুশি মুখখানা নিমেষে মুষড়ে গেল। বলল, ‘উঁচু ক্লাসে উঠেছি তো কী হয়েছে!’
‘অনেক বই পড়তে হবে। খেলাধুলোর সময় পাবে না।’
অরু উত্তর দিল, ‘আমি তো আর সারাদিন খেলা করছি না। শুধু বিকেলবেলা খেলি। আর এই ম্যাজিকের খেলাটা তো আমি বিকেলেই দেখাব।’
‘বিকেলেও তোমার খেলাধুলো বন্ধ করতে হবে।’ বাবার গলায় যেন হুকুমের গর্জন।
‘কেন?’
‘বিকেলে তোমার কোচিং ক্লাসে যেতে হবে। সেইরকম ব্যবস্থা হয়েছে।’
‘না-আ-আ-আ।’ আচমকা একটা ভীষণ চিৎকার করে উঠল অরু। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ফসকে জানলা গলে উড়ে গেল পায়রাটা আকাশে। অরুর চোখদুটি ছলছল করে উঠল। সে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল দ্রুত পায়ে। বাইরে, খোলা আকাশটার নীচে গিয়ে সে দাঁড়াল। তার মনে হল, বাবা যেন ওই আকাশটা কেড়ে নিল তার কাছ থেকে। তার এখন আর আকাশ দেখার সময় হবে না। ওই নীল আকাশ। ওই নীল আকাশের নীচে ছুটে-হেসে সে আর খেলা করতে পারবে না। ভয়ে তার সারাশরীর ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। সে ফুঁপিয়ে উঠল। তার চোখ উপচে জল গড়াল গাল বেয়ে। তখনই সে দেখতে পেল সেই সাদা পায়রাটাকে। সাদা ঝলমল ডানা ছড়িয়ে সে উড়ছে আকাশে। হয়তো সে ডাকছে অরুকে। হয়তো বলছে, এসো এখানে আমার কাছে। এই নীলের স্বপ্নে কত আনন্দ, কত আলো। এসো! এসো! এসো!
কিন্তু অরু যাবে কেমন করে? তার তো পাখির মতো ডানা নেই। দু-টি রং ঝলমলে ডানা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন