মনোজ সেন

চাণক্য চিন্তিত মুখে বাতায়নের সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। কিছুদিন আগে সাম্রাজ্যের পশ্চিম সীমান্ত থেকে যে খবর এসেছে— সেটাই তাঁর উদবেগের কারণ। পাটলিপুত্র নগরের ওপর তখন দিনের আলো ম্লান হয়ে আসছে। মন্দিরে মন্দিরে সন্ধ্যারতির ঘণ্টাধ্বনি আর বৌদ্ধবিহার ও সংঘারাম থেকে ঢক্কার শব্দ শোনা যচ্ছে। চারিদিকে দোতলা বা তিনতলা সুরম্য কাঠের বাড়িগুলোর একতলায় জ্বলে উঠেছে প্রদীপ। নগরপালিকার লোকেরা জ্বলন্ত মশাল হাতে পথের দু-ধারে দীপাধারগুলি জ্বালিয়ে দিতে শুরু করেছে। মালিনীরা মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ফুল আর মালা বিক্রি করতে বেরিয়ে পড়েছে। বন্দর আর বিভিন্ন কর্মশালা থেকে কর্মীরা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। আদিত্যদেবের সঙ্গে এবার তাদেরও বিশ্রাম নেবার সময় হল।
সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য সুখাসনে বসে তাঁর গুরুদেবের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটাতে ঠিক সাহস পাচ্ছিলেন না। শেষপর্যন্ত না-বলে পারলেন না, 'কেন আপনি এত চিন্তা করছেন, গুরুদেব? সেলুকাস সিন্ধু নদ পার হবার তোড়জোড় করছে, করতে দিন। আমার সৈন্যবাহিনী সিন্ধুর এপারে তার ক্ষত্রপদের একের-পর-এক পরাজিত করে নদী পার করে দিয়েছে। সেলুকাসকেও সেই পথেই যেতে হবে, যদি সে পূর্ব তীরে এসে উঠতে পারে।'
চাণক্য ঘুরে দাঁড়িয়ে তীব্রদৃষ্টিতে চন্দ্রগুপ্তের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'নির্বোধের মতো কথা বোলো না। কতকগুলো সামান্য ম্যাসিডনীয় ক্ষত্রপ আর সেলুকাস এক পদার্থ নয়। সে দস্যু আলেকজান্ডারের সবচেয়ে প্রিয় সৈন্যাধ্যক্ষ। সে শয়তানিতে তার প্রভুর চেয়ে কিছু কম যায় না। ভুলে যাচ্ছ কেন যে এই বিদেশি দস্যুরা ভারতীয় নয়? ভারতের ন্যায়যুদ্ধ এদের কাছে হাস্যকর নির্বুদ্ধিতামাত্র। এই ম্যাসিডনীয়দের কাছে যুদ্ধে জেতার জন্য যেকোনো রকমের জঘন্য নীচতার আশ্রয় নেওয়া শুধু নীতি নয়, পরম ধর্ম। পুরুরাজকে বা পারস্যসম্রাট দারায়ুসকে কীভাবে পরাজিত করা হয়েছিল, সে নৃশংসতার কথা তুমি জানো না?'
'জানি, গুরুদেব। তবে, এও জানি যে যত কূটকৌশলই সেলুকাস করুক না কেন, মগধের সৈন্যবাহিনীর সামনে সে দাঁড়াতে পারবে না। আমি ইতিমধ্যে উত্তরদেশ থেকে একটি অশ্বারোহী আর দক্ষিণাঞ্চল থেকে একটি পদাতিকবাহিনী সীমান্তে পাঠিয়ে দিয়েছি। সম্প্রতি গঙ্গাহৃদি রাজ্য থেকে কেনা পাঁচ-শো রণহস্তীর মধ্যে দু-শোটির একটি দলও পাটলিপুত্র থেকে রওনা হয়ে গেছে। তারা আমাদের ওখানে বর্তমান সৈন্যবাহিনীর শক্তি তো বাড়াবেই আর দেখবেন, তাদের আক্রমণের সামনে সেলুকাসের সৈন্যরা ঝড়ের মুখে শুকনো পাতার মতো উড়ে যাবে।'
'মূর্খ, মূর্খ! কে তোমাকে বলেছে যে সে তোমার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে? শোনো চন্দ্রগুপ্ত, আমি তোমাকে যে রণনীতি শিক্ষা দিয়েছিলাম যে যখনই তুমি শত্রুকে হেয় জ্ঞান করবে, তখনই তোমার সর্বনাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে— সে কথা তুমি ভুলে গেছ। পুরুর সঙ্গে আলেকজান্ডারের একটিমাত্র যুদ্ধের রণকৌশল পর্যালোচনা করে আর ইউডেমাস বা পেইথনের মতো কতকগুলো অপদার্থ ক্ষত্রপকে যুদ্ধে হারিয়ে তুমি ভাবছ যে ম্যাসিডনীয়দের কূটযুদ্ধের সবকিছু তুমি শিখে ফেলেছ, তাই না? জেনে রাখো যে, আসলে তুমি শেখোনি কিছুই!'
চন্দ্রগুপ্ত মাথা চুলকিয়ে বললেন, 'সত্যিই আমি কিছুই শিখে উঠতে পারিনি, গুরুদেব। আপনি আমাকে বলে দিন যে, সেলুকাস কী ধরনের শঠতার আশ্রয় নিতে পারে তা জানতে হলে আমাকে কী করতে হবে।'
চাণক্য পিঞ্জরবদ্ধ সিংহের মতো ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত পদচারণা করতে করতে বললেন, 'সেখানেই তো আসল সমস্যা, চন্দ্রগুপ্ত, আর তাই নিয়েই আমার যত উদবেগ। যেকোনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে গেলে বাহুবল অবশ্যই প্রয়োজন; তবে তার চেয়েও বোধ হয় বেশি প্রয়োজন বুদ্ধির। সেলুকাসের প্রতিটি গতিবিধির, প্রতিটি পদক্ষেপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া না-গেলে তার উদ্দেশ্য বা কৌশল কিছুই সঠিকভাবে জানা সম্ভব হবে না। তার জন্যে চাই— একটি পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী আর বুদ্ধিমান গুপ্তচরবাহিনী, যারা এইসব সংবাদ পাঠাবে বিশদ, দ্ব্যর্থহীন, স্বচ্ছ ভাষায়, ছোটোখাটো কোনো বিবরণ বাদ না-দিয়ে। যুদ্ধে এই গুপ্তচরদের প্রয়োজন সৈন্যবাহিনীর চেয়ে কম তো নয়ই, বরং বেশি।'
'আমাদের গুপ্তচররা কি এই কাজ করতে পারে না, গুরুদেব?'
'পারে, কিন্তু তারা কোথায়? তোমার সাম্রাজ্য এখন সমগ্র উত্তর ভারতে বিস্তৃত, পূর্বে গঙ্গাহৃদি রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমা থেকে পশ্চিমে সিন্ধু নদ, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে গোদাবরী পর্যন্ত। এর সঙ্গে স্বভাবতই বেড়েছে তোমার শত্রুসংখ্যা। এই ঘরের শত্রুদের ওপর নজর রাখবার জন্যে আমাদের প্রায় সমস্ত গুপ্তচরেরাই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। তারা এই মুহূর্তে কে যে কোথায় লুকিয়ে রয়েছে তার সমস্ত সংবাদও আমাদের কাছে এসে পৌঁছোয়নি। পাটলিপুত্র থেকে খবর পাঠিয়ে, তাদের খুঁজে বের করে, পশ্চিম সীমান্তে পাঠানো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সেলুকাস সে সময় আমাদের দেবে বলে মনে হয় না। ওখানে যে ক-জন আছে তাদের সংখ্যাবৃদ্ধির জন্য আরও দু-চারজনকে পাঠানো হয়তো যায়, কিন্তু যে বিশালায়তন পরিসরে তাদের কাজ করতে হবে, তার পক্ষে তারা পর্যাপ্ত হবে না।'
'একটা উপায় করা যেতে পারে কি? ধরুন, ম্যাসিডনীয় বাহিনী পুরোপুরি সংগঠিত হবার আগেই যদি আমরা সিন্ধু পার হয়ে তাদের আক্রমণ করি?'
'তুমি পিপ্পলিবনের পরাক্রান্ত মৌর্যবংশের সন্তান। তোমার মাথায় এ ধরনের চিন্তা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু বৎস, সেটা এখানে বসে গোপনে করতে পারবি কি? ও পক্ষের গুপ্তচরেরা কেউ চুপ করে বসে নেই। তারা ঠিক খবর পেয়ে যাবে আর তোমার আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত হয়ে থাকবে।'
চন্দ্রগুপ্ত হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 'পিপ্পলিবনের মৌর্যদের হঠকারী বলে বদনাম আছে ঠিকই; কিন্তু আপনি যখন আমাদের শীর্ষে আছেন, তখন আর চিন্তা কী? হঠকারিতা আর কূটবুদ্ধি একত্র হলে তবেই তো ইতিহাস রচিত হয়, গুরুদেব। তাই না?'
চাণক্যের মুখের রেখাগুলো নরম হয়ে এল। বললেন, 'ইতিহাস সেদিনই স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে, চন্দ্রগুপ্ত, যেদিন ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর হাতে আদ্যন্ত পর্যুদস্ত হয়ে নৃশংস বিদেশি লুণ্ঠকশক্তি পথকুক্কুরের মতো আমাদের দেশ থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাবে। যাক গে, আমার সন্ধ্যাহ্নিকের সময় হল। আজ মধ্যরাত্রে আবার এই মন্ত্রণাগারে পরামর্শ করতে বসব। এর মধ্যে কোনো একটা উপায় হয়তো বেরিয়ে আসবে।'
চন্দ্রগুপ্ত প্রণাম করে বললেন, 'যথা আজ্ঞা, গুরুদেব।'
পরামর্শ চলছিল, হঠাৎ প্রতিহারিণী ঘরে ঢুকে নমস্কার করে দাঁড়াল।
চন্দ্রগুপ্ত বিরক্ত হয়ে বললেন, 'কী ব্যাপার? কোনো প্রয়োজনীয় সংবাদ আছে কি যে এইসময়ে তোমাকে আসতে হল?'
প্রতিহারিণী করজোড়ে সন্ত্রস্ত গলায় বলল, 'অপরাধ মার্জনা করবেন, সম্রাট। একটি ঘটনা ঘটেছে, সেটা আপনাদের গোচরে আনা প্রয়োজন বলে মনে হল আমার।'
চাণক্য বললেন, 'এত রাতে কী এমন ঘটনা ঘটল, প্রতিহারিণী?'
'একটি যুবক সম্রাটের দর্শনপ্রার্থী, গুরুদেব। তাকে কিছুতেই বিতাড়িত করা যাচ্ছে না। মেরেও না। সে প্রাসাদের সিংহদ্বারের স্তম্ভ আঁকড়ে পড়ে রয়েছে আর অনবরত বলে যাচ্ছে যে তাকে এই মুহূর্তে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতেই হবে, নইলে অত্যন্ত দেরি হয়ে যাবে। সে দ্বাররক্ষীদের প্রহার সহ্য করছে কিন্তু কিছুতেই চলে যাচ্ছে না। তার সর্বাঙ্গ ধূলিধূসরিত। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে অভুক্ত আর দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসছে।'
'হু, তোমার কথায় বুঝতে পারছি ছেলেটি বলশালী এবং সে ভিক্ষুক নয়। সে কোথা থেকে আসছে কিছু বলেছে?'
'হ্যাঁ, সে বলছে যে সিন্ধু নদের পূর্ব তীরবর্তী কোনো গ্রাম থেকে আসছে, তবে গ্রামের নামটি আমার এখন ঠিক মনে পড়ছে না, গুরুদেব—'
চাণক্য বাধা দিয়ে সংহত গলায় বললেন, 'সিন্ধু নদের পূর্ব তীরবর্তী গ্রাম থেকে? তাকে এই মুহূর্তে এখানে নিয়ে এসো। আর সেইসঙ্গে তার জন্যে কিছু খাবারও এনো। প্রতিহারিণী, তুমি অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করছ ঠিকই, কিন্তু বুঝতে পারছি যে সেই বিদ্যা তোমার মাতৃহৃদয়কে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। কাজেই, একটি ক্ষুধার্ত বলশালী ক্লান্ত যুবকের যতটা খাবারের প্রয়োজন বলে তোমার মায়ের মন বলবে ততটাই নিয়ে এসো।'
প্রতিহারিণী আভূমি প্রণত হয়ে স্মিতমুখে বলল, 'যথা আজ্ঞা, গুরুদেব।'
যুবক সত্যিই স্বাস্থ্যবান, সুদর্শন, গৌরবর্ণ, মাথায় একরাশ উশকোখুশকো কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল। তার সর্বাঙ্গে ধুলো আর রক্তের দাগ। নগ্ন পায়ে অসংখ্য রক্তাক্ত ক্ষতের চিহ্ন। সে ঘরে ঢুকেই চন্দ্রগুপ্তকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলল, 'আমি এক ভয়ংকর সংবাদ নিয়ে এসেছি সম্রাট। কিছুদিন আগে হিমালয়ের গিরিপথ দিয়ে এক বিশাল বিদেশি সৈন্যদল সিন্ধু নদের পশ্চিমাঞ্চলে নেমে আসছে। জনশ্রুতি এই যে, রাক্ষস আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও উত্তরাধিকারী সেলুকাস এই সৈন্যদল নিয়ে আসছে। তার উদ্দেশ্য সিন্ধু পার হয়ে আপনার সাম্রাজ্য আক্রমণ করা।
চন্দ্রগুপ্ত কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। চাণক্য তাকে হাত নেড়ে বাধা দিয়ে বললেন, 'আগে বলো, তুমি কে এবং কোথা থেকে আসছ?'
যুবক চাণক্যকে দেখতে পায়নি। তাঁর গলা শুনে তাঁর দিকে ফিরে বলল, 'আপনি নিশ্চয়ই পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ কৌটিল্য। আমার প্রণাম নেবেন।'— বলে সে চাণক্যকে আবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে বলল, 'আমার নাম কর্ণ। সিন্ধু নদের ধারে করঞ্জ গ্রামে আমার নিবাস। আমি মেষপালক।'
'তুমি যে সৈন্যদলের কথা বললে, তাদের তুমি নিজে দেখেছ? তারা যে সেলুকাসের বাহিনী, তা তুমি জানলে কী করে?'
'পাহাড়ের ওপর ভেড়া চরাতে গিয়ে আমি এই বাহিনীর অগ্রবর্তী দলটিকে দেখি। সেই দিনই গান্ধার থেকে আসা একদল ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তারা তক্ষশীলায় যাচ্ছিল। তাদের কাছেই সেলুকাসের খবর পাই। আমি সঙ্গেসঙ্গে করঞ্জে গিয়ে গ্রামবাসীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেই রাত্রেই পাটলিপুত্রের উদ্দেশে রওনা হই।'
'যে সৈন্যদলটিকে তুমি দেখেছ, তার বিষয়ে কিছু বলো দেখি।'
'এরা সংখ্যায় দুই সহস্রের বেশি হবে না। অশ্ব-শকটের ওপরে স্তূপাকার বস্ত্রাবাস নিয়ে এরা একটি পাহাড়ের পেছনে শিলাময় উপত্যকায় জড়ো করছে, যাতে সিন্ধুর পূর্ব তীর থেকে তাদের দেখা না-যায়। বস্ত্রাবাসগুলির পরিমাণ দেখে মনে হয় যে তাদের সংখ্যা দশ সহস্র মতন হবে। হয়তো, আরও আসবে। ব্যবসায়ীদের কাছে জানতে পেরেছি যে তারা একটি বিশাল সৈন্যবাহিনীকে গিরিবর্ত্মে ঢুকতে দেখেছে। তবে, তাদের সংখ্যা কত তা বলতে পারেনি। তারা তো টাকা গুনতে অভ্যস্ত কাজেই— তারা আর কী করেই বা বলবে।'
চাণক্য কিছুক্ষণ সপ্রশংস দৃষ্টিতে কর্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তোমার পায়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে তোমার গ্রাম থেকে এতটা পথ তুমি দৌড়ে এসেছ। তাই কি?'
'হ্যাঁ, গুরুদেব। সারাদিন দৌড়েছি, রাত্রে কোনো মন্দিরে বা বৌদ্ধবিহারে শুয়ে থেকেছি। তা না-করলে যে ভীষণ দেরি হয়ে যেত।'
'কেন? তোমার কি ধারণা যে মগধের রাজকর্মচারীরা এতই অপদার্থ, যে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ তারা যথাসময়ে সম্রাটের গোচরে আনবে না?'
'না গুরুদেব। আমি খুব ভালো করেই জানি যে সম্রাটের কাছে এই সংবাদ পৌঁছে গেছে।'
চাণক্য ভ্রূকুঞ্চিত করে বললেন, 'তাহলে তাড়াটা কোথায় যে তোমাকে এই দীর্ঘ পথ দৌড়ে আসতে হল?'
'আমি সম্রাটের সৈন্যদলে যোগ দিতে চাই, যদি দেরি হয়ে গিয়ে না-থাকে।'
চন্দ্রগুপ্ত বললেন, 'আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে তোমার এত উৎসাহের কারণ কী?'
'যুদ্ধে যদি আমার মৃত্যুও হয়, তবু মরবার আগে আমি অন্তত একটা ম্যাসিডনীয়র শিরচ্ছেদ করে তার রক্তে আমার প্রিয়জনদের তর্পণ করে যেতে চাই। তাহলেই আমার আট বছরের প্রতীক্ষা শেষ হয়।'
'কেন? ম্যাসিডনীয়দের ওপর তোমার এত রাগের কারণ? এরা কী ক্ষতি করেছে তোমার?'
চাণক্য চাপা গলায় বললেন, 'তুমি তো জানো বৎস যে, পুরুরাজের পরাজয়ের পর, ম্যাসিডনীয়রা সিন্ধুর পূর্ব তীরে যে অকল্পনীয়পূর্ব নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, আজ সমগ্র ভারত একযোগে সেটা ভোলবার চেষ্টা করছে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত সংস্কৃত ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় যত কাব্য, নাটক বা গাথা রচিত হয়েছে, তাদের কোথাও আলেকজান্ডারের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না। যে কথা সমস্ত জাতি ভুলতে চাইছে, এই বালককে দিয়ে কেন সেই যন্ত্রণার স্মৃতিকে টেনে আনতে চাইছ?'
কর্ণ বলল, 'গুরুদেব, আর সকলে ভোলবার চেষ্টা করলেও, আমরা করছি না। আমরা যে দেখেছি, প্রথম দিনের যুদ্ধে সম্পূর্ণ পরাজিত আলেকজান্ডার পালিয়ে গিয়ে পরদিন ঘুরপথে এসে পুরুরাজের সৈন্যবাহিনীকে পেছন থেকে আক্রমণ করেছিল। সেই অবিশ্বাস্য কাপুরুষতায় হতভম্ব ভারতীয়রা সেই আক্রমণ প্রতিহত করতে পারেনি। সেই রক্তাক্ত দিনের শেষে ম্যাসিডনীয়রা ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সিন্ধুর তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। যারা পালাতে পেরেছিল তারা বেঁচে গিয়েছিল। যারা পারেনি, সেই নিরীহ, নিরস্ত্র গ্রামবাসীদের ওপরে তারা যে অত্যাচার করেছিল, তা আমরা ভুলতে চাই না। বৃদ্ধবৃদ্ধা ও শিশুদের নির্বিচারে হত্যা করে, সবল নারী ও পুরুষদের গলায় দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। শুনেছি, তাদের দেশে নাকি ওদের গোরুছাগলের মতো বিক্রি করা হবে। এরা কি মানুষ? পৃথিবীর এই ভয়ংকর অভিশাপগুলোর একটিকেও যদি মারতে পারি— তবেই আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করব।'
চাণক্য কর্ণের মাথায় হাত রেখে বললেন, 'বৎস, দুঃখ কোরো না, আমরা কিন্তু তোমাকে সৈন্যদলে নিতে পারি না। তবে, তুমি চাইলে সেলুকাসের সঙ্গে যুদ্ধে আমাদের সাহায্য করতে পারো। সেই সাহায্য আমাদের বিশেষ প্রয়োজন।'
'কেন আমি সৈন্যদলে যোগ দিতে পারি না, গুরুদেব?'
'কারণ, আমাদের সৈন্যরা বেতনভোগী যোদ্ধা। যুদ্ধই তাদের জীবিকা, যেমন তোমার পশুপালন। মহাভারতের যুগ থেকে ভারতবর্ষে এই নিয়মই চলে আসছে। তোমাকে যোদ্ধা হতে গেলে তোমাকে প্রথমে শস্ত্রবিদ্যা শিখতে হবে, তারপর কোনো একটি সেনাগোষ্ঠীতে যোগ দিতে হবে যেখানে সৈন্যদের অন্যান্য কর্তব্য আর বস্ত্রাবাসের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। তাতে সময় লাগবে। কিন্তু সে সময় তো নেই। তার পরিবর্তে, আমরা তোমাকে এখনই এমন কাজ দিতে পারি যার মূল্য যুদ্ধ করার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়— হয়তো-বা বেশি। শুধু একটাই সমস্যা। আমি জানি তুমি বুদ্ধিমান, তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং বিশ্লেষণশক্তি খুব ভালো। কিন্তু যে কাজ তোমাকে দিতে যাচ্ছি, সেটা তুমি একা কতটা করে উঠতে পারবে জানি না।'
'আমি একা নই, গুরুদেব। আমার পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে সহস্রাধিক আবালবৃদ্ধবনিতা। সেলুকাস নামক নরকের কীটটাকে ধ্বংস করতে যেকোনো কাজে তারা সম্রাটকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।'
চাণক্য দীপ্তচোখে কর্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'চমৎকার। তাহলে, কাল সকালে আমি তোমাকে কী কী করতে হবে তা ব্যাখ্যা করে দেব। তারপর, অপরাহ্নে তুমি আমাদের দ্রুতগামী রথে ফিরে গিয়ে সিন্ধুর পূর্ব তীরে আমাদের সৈন্যাধ্যক্ষের সঙ্গে সম্রাটের অভিজ্ঞান নিয়ে গোপনে দেখা করবে। তিনি তোমাকে আরও কিছু উপদেশ দেবেন। নিজের গ্রামে ফিরে যাবে পদব্রজে যাতে কারও মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক না-হয়। এখন প্রতিহারিণী তোমার খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে। খেয়ে নিয়ে তুমি তার বাসস্থানে গিয়ে রাত্রিযাপন করবে। সবাইকে বলবে যে, তুমি প্রতিহারিণীর দৌহিত্র। কাল ভোর হবার এক দণ্ডের মধ্যে প্রাসাদ দেখবার নাম করে এখানে চলে আসবে। এখন যাও আর প্রতিহারিণীকে একবার এখানে আসতে বলো।'
কর্ণ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই চন্দ্রগুপ্ত বললেন, 'এই অনভিজ্ঞ গ্রাম্য যুবকের হাতে এত বড়ো একটা দায়িত্ব দেবেন, গুরুদেব? সে পারবে তো?'
চাণক্য দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, 'এই যুবক তার সমস্ত অন্তর দিয়ে, শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তার কর্তব্য পালন করবে। পারলে, সে-ই পারবে। জানো চন্দ্রগুপ্ত, প্রজাপুঞ্জ যখন রাজশক্তির পেছনে এসে দাঁড়ায়, তখন বিশ্বের কারও ক্ষমতা নেই যে সেই জাতিকে পদানত করতে পারে। তা সে যতই নৃশংস দানবিক হোক না-কেন।'
প্রতিহারিণী চলে যাওয়ার পর চাণক্য পুনরায় বাতায়নের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আকাশে এখনও উষার আলোর ছোঁয়া লাগেনি, অন্ধকার সামান্য কেটেছে মাত্র। নগরপথ জনহীন, দীপাধারগুলির আগুন নিবে যাওয়ার মুখে। শোন নদী থেকে শীতল কোমল বাতাস বইছে, ক্কচিৎ একটি-দু-টি পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে— একটি নতুন দিনের জন্যে প্রস্তুত হয়ে উঠছে পাটলিপুত্র।
চাণক্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, 'চলো চন্দ্রগুপ্ত, আমরা নীচে যাই। আপাতত একটু বিশ্রাম করে নাও। কাল তোমার অনেক কাজ। মগধ আর গঙ্গাহৃদির মিলিত শক্তির কথা শুনে আলেকজান্ডার ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়েছিল। সেলুকাস তা করবে না, যুদ্ধই করবে এবং তার উপযুক্ত প্রতিফলও সে পাবে। এসো, এইবার স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাস রচনার সময় উপস্থিত হয়েছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন