মনোজ সেন

১৯২৪ সালে আমার বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে এমএসসি পাশ করে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালে চাকরি নিয়ে আসেন পূর্ব বাংলা থেকে। সে সময় বেঙ্গল কেমিক্যালের কর্ণধার ছিলেন রাজশেখর বসু, যিনি বাঙালি পাঠকের কাছে 'পরশুরাম' নামে পরিচিত।
এই বেঙ্গল কেমিক্যালের চাকরি সূত্রে আমার বাবা অনেক বিখ্যাত মানুষের সংস্পর্শে আসেন। তাঁর কাছে এইসব বড়ো মাপের মানুষদের যে সব গল্প শুনেছি, তার কয়েকটা এখানে বলছি। হয়তো এসব গল্প কারুর কাজে লেগে যেতে পারে।
রাজশেখর বসু
উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের শেষ কয়েক জন প্রতিভূর একজন ছিলেন রাজশেখর বসু। তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিধিটা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের বড়ো। ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি বা সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। একদিকে তিনি যেমন লিখেছেন হাসির গল্প, অন্যদিকে তেমনি অনুবাদ করেছেন রামায়ণ, মহাভারত, মেঘদূত ইত্যাদি মূল সংস্কৃত থেকে। রচনা করেছেন বাংলা অভিধান চলন্তিকা। লিখেছেন অসাধারণ সব প্রবন্ধ। বাংলা ভাষাকে দিয়েছেন নতুন নতুন প্রতিশব্দ। আবার ইনিই ছিলেন বেঙ্গল কেমিক্যালের একজন সার্থক পরিচালক, ভারতবর্ষের বিপণন শিল্পের একজন পথিকৃৎ।
রাজশেখর বসুর একটা বড়ো জিনিস ছিল— সময় জ্ঞান, যা বাঙালিদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। শুনেছি, উনি যখন বকুলবাগানে থাকতেন, তখন ওঁর গতিবিধি দেখে পাড়ার লোক ঘড়ি মেলাত। সেইসঙ্গে ছিল পরিমিতি বোধ। উনি যে গল্প বা প্রবন্ধ লিখতেন, তার শেষে কম্পোজিটারকে বিশদভাবে নির্দেশ দিতেন যাতে তার গল্পটা কম্পোজ করতে এতটুকু অসুবিধে না-হয়।
একবার রাজশেখর বসু নিজের আবিষ্কৃত ফর্মূলায় একটি বেগুনি রঙের কালি তৈরি করেছিলেন। সেই কালি দিয়ে অনেকগুলো চেক সই করেছিলেন। সব কটা চেক ফেরত এল। রাজশেখরবাবু তো স্তম্ভিত; আর রেগেও গেলেন তেমনি। সেই চেকগুলো নিয়ে তিনি ব্যাঙ্কের ম্যানেজারের ঘরে চলে গেলেন। ম্যানেজার চেকগুলো দেখে বললেন— এই চেকগুলো ফেরত পাঠিয়েছি কারণ আমরা রাবার স্ট্যাম্পে সই গ্রাহ্য করিনা। রাজশেখরবাবু তখন তাঁর বেগনি রঙের কালি ভরা কলম বের করে ম্যানেজারের সামনে অনেকগুলো সই করলেন। ম্যানেজার সব দেখে বললেন— আমার কী দোষ? বেগুনি রঙের কালি আর সব কটা সই যদি অবিকল একরকমের হয়, তাহলে সেগুলো রাবার স্ট্যাম্প ভাববো না তো কী করব?
অত্যন্ত গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ ছিলেন রাজশেখর বসু। নিজে হাসির গল্প লিখতেন কিন্তু তাঁকে কেউ বড়ো একটা হাসতে দেখেনি। তাঁর সঙ্গে ঠাট্টা ইয়ার্কি করার কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না।
শান্তিনিকেতনে একবার বিরিঞ্চিবাবা নাটকের অভিনয় হচ্ছে। নিমন্ত্রিত হয়ে রাজশেখরবাবু সেখানে গেছেন। দর্শকদের মধ্যে রয়েছেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানি। ভীষণ মজার নাটক। সবাই খুব হাসছেন। নাটক যখন শেষ হল, তখন দর্শকদের একজন ইন্দিরাদেবীকে জিজ্ঞেস করলেন— নাটক কেমন দেখলেন?
ইন্দিরাদেবী বললেন— নাটক তো আমি দেখিনি।
প্রশ্নকর্তা ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে বললেন— নাটক দেখেননি? সে কী কথা?
ইন্দিরাদেবী বললেন— না। আমি আগাগোড়া তাকিয়ে ছিলুম রাজশেখরবাবুর মুখের দিকে। কী অদ্ভুত মানুষ। যেখানে সবাই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে, সেখানে তাঁর মুখে একটা রেখারও পরিবর্তন নেই!
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়
সময়জ্ঞান আর নিয়মানুবর্তীতায় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন অনমনীয়। আমার বাবাকে দেখেছি; তাঁর কাছে পাঁচটা বত্রিশ ছিল ঠিক পাঁচটা বত্রিশ-ই। তার এক মিনিট এদিক-ওদিক হবার জো ছিল না। শুনেছি, এই স্বভাবটি তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।
একবার ভারতবর্ষ তখন অবিভক্ত-ভারতীয় শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীদের আমন্ত্রণে আচার্য গিয়েছিলেন লাহোরে একটা কনফারেন্সে বক্তৃতা দিতে। সঙ্গে করে আমার বাবাকেও নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর আমন্ত্রকদের মধ্যে মস্ত সব নাম-লালাশ্রীরাম, কস্তুরভাই লালভাই ইত্যাদি। কথা ছিল কনফারেন্স পাঁচটায় শুরু হবে এবং গাড়ি আসবে সাড়ে চারটের সময় আচার্যকে হোটেল থেকে নিয়ে যাবার জন্য।
আচার্য বাবাকে বললেন— তুই হোটেলেই থাকবি। কোথাও যাবি না। কনফারেন্স ঘণ্টাখানেকের বেশি হবে না। আমি সাড়ে ছ-টার মধ্যে ফিরে আসব। তারপর আমরা সিন্দুনদীর ধারে বেড়াতে যাব। সাড়ে চারটে বেজে গেল কিন্তু গাড়ি এল না।
অত্যন্ত উদবিগ্ন হয়ে আচার্য বললেন— আমার মনে হয় গাড়িটার নিশ্চয়ই কোনো বিপদ-আপদ হয়েছে। এদিকে কনফারেন্সে সবাই বসে থাকবেন, তাঁদের সময় নষ্ট হবে। আমি বরং একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে চলে যাচ্ছি। যদি গাড়ি আসে তুই সেটা ফেরত পাঠিয়ে দিস। বলে আচার্য সাদা কালো চৌখুপী খদ্দরের গলাবন্ধ কোট আর ধুতি পরে চলে গেলেন।
ঘণ্টাখানেক বাদে ফিরে এলেন। খুশি খুশি মুখ। বাবাকে বললেন— দারুণ ভালো চা খাওয়াল জানিস। আর তার সঙ্গে ভারি চমৎকার চানাচুর। নে এবার চল। আমরা সিন্ধুনদীর ধারে বেড়াতে যাব।
দু-জনে হোটেল থেকে বেরিয়েছেন, দেখেন একের পর এক গাড়ি এসে হোটেলের দরজায় দাঁড়াচ্ছে। আর তাদের ভেতর থেকে নামছেন মস্ত বড়ো শিল্পপতিরা।
আচার্যকে দেখে তাঁরা বললেন— আমাদের একটু দেরি হয়ে গেল, এবার তাহলে চলুন।
আচার্য মাথা নেড়ে বললেন— উঁহু। আমি তো আর যাব না। আপনারা আমাকে পাঁচটায় সময় দিয়েছিলেন। আমি ঠিক পাঁচটার সময় আপনাদের কনফারেন্স হলে পৌঁছেছি, সেখানে চা আর চানাচুর খেয়েছি। আমার কর্তব্য শেষ। দ্বিতীয় বার আমি আর ওখানে যাব না। আমি এই ছেলেটিকে কথা দিয়েছি যে এখন আমরা সিন্ধুনদীর ধারে বেড়াতে যাব, সে কথার নড়চড় হবে না।
শুনে সবাই স্তম্ভিত। অনেক কাকুতিমিনতি করেও বৃদ্ধ আচার্যকে টলানো গেল না। বাবাকে নিয়ে উনি বেড়াতে চলে গেলেন।
বাবা আচার্যকে পরে জিজ্ঞেস করেছিলেন— আপনি চা আর চানাচুর পেলেন কোথায়?
আচার্য যা বলেছিলেন সেটা এইরকম—
উনি ঠিক পাঁচটার সময় কনফারেন্সের জায়গায় পৌঁছেছিলেন। গিয়ে দেখেন, সেখানে তখন কেউ আসেনি। এমনকী কর্মকর্তারাও অনুপস্থিত। কেবল কয়েক জন বাবুর্চি বসে চা বানাচ্ছে। আচার্য গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর খদ্দরের কোট, ধুতি, উশকোখুশকো চুল আর পাকা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি দেখে তারা মনে করল উনি ওদেরই কেউ হবেন। তারা তাঁকে চা আর চানাচুর খাওয়াল। আচার্যও সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে চলে এলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশেখরবাবু শান্তিনিকেতনে গিয়েছেন। সঙ্গে বাবা। খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু-জনকে পরদিন দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলেন।
পরদিন বেলা এগারোটার সময় রাজশেখরবাবু বাবাকে বললেন— চলুন। রবীন্দ্রনাথের কাছে যাওয়া যাক।
বাবা আশ্চর্য হয়ে বললেন— সেকী? এখন তো সবে এগারোটা। এই সময় নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাওয়াটা কি উচিত হবে?
রাজশেখর বললেন— চলুন-ই না। গেলেই দেখতে পাবেন কেন এখন যেতে বলছি।
সেইরকমই হল। দু-জনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছে গেলেন। রবীন্দ্রনাথ তখন গভীর মনোযোগের সঙ্গে কিছু লিখছিলেন। দু-জনকে দেখে চমকে উঠলেন। কিন্তু অসন্তুষ্ট না-হয়ে বরং সাদরে অভ্যর্থনা করলেন। ওঁদের বসতে বলে অল্প সময়ের জন্য বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। তারপর বেরিয়ে এসে গল্প শুরু করলেন।
রবীন্দ্রনাথের গল্প বলার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তাঁর দুই শ্রোতা মুগ্ধ বিস্ময়ে তাঁর কথা শুনতে শুনতে কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেল তা টের পেলেন না। এইসময় ভেতর থেকে খাবার ডাক এল।
রাজশেখরবাবু আর বাবা খেতে বসলেন। রবীন্দ্রনাথ একটা মোড়া পেতে তাঁদের খাওয়া তদারকি করবার জন্য বসলেন ওঁদের সামনে। দেখা গেল অত্যন্ত সাধারণ খাওয়া। মানে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ালে অন্তত দু-একটা পদ একটু বিশেষ রকমের হয়ে থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকম কিছু ছিল না।
খাবার দেখে রাজশেখরবাবুর মুখে বোধ হয় একটা অত্যন্ত ক্ষীণ হাসির রেখা দেখা গিয়েছিল। সেটা রবীন্দ্রনাথের নজর এড়ায়নি।
রবীন্দ্রনাথ বললেন— তুমি হাসছ কেন? তুমি বুঝতে পেরেছ যে আমি তোমাদের নিমন্ত্রণ করার কথা ভুলে গিয়েছিলুম, তাই না? তবে শোনো আমার দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ কী করেছিলেন।
দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন প্রচণ্ড পণ্ডিত, আত্মভোলা দার্শনিক। থাকতেন শান্তিনিকেতনে 'নীচু বাংলা' বলে একটা বাড়িতে। একবার কলকাতা থেকে আসা কয়েক জন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপককে দুপুরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেছিলেন। তাঁরা যথারীতি দুপুর বেলাতেই এলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ তাঁদের একটা অত্যন্ত দুরূহ দার্শনিক তথ্যের ওপর ঘণ্টাখানেক বক্তৃতা দিয়ে বললেন— বেলা অনেক হল। এখন আমার স্নানাহারের সময়। তোমরা তাহলে এবার এসো।
গল্প শেষ করে রবীন্দ্রনাথ বললেন— আমার তো তোমাদের দেখে অন্তত নিমন্ত্রণ করার কথাটা মনে পড়ল। আমার দাদার কিন্তু তাও পড়েনি।
সে যুগে শান্তিনিকেতনের দুপুরের খাওয়ার মতো কোনো দোকান ছিল না। সেই কলকাতার অধ্যাপকদের যে কী দশা হয়েছিল সে কথা আর রবীন্দ্রনাথ কিছু বলেননি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন