মিস অনুরাধা পলের হত্যারহস্য

মনোজ সেন

সন্ধে হয়ে এসেছে। সাগর সবে বসেছিল পড়ার টেবিলে। ঠিক তখনই দরজায় বেল বাজল। একটু পরে শ্রীলতা ঘরে ঢুকে বলল— দাদা, গুরুদাসবাবু এসেছেন। বাবা তোকে বসবার ঘরে ডাকছে।

তৎক্ষণাৎ তড়াক করে উঠে পড়ল সাগর। বসবার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে শুনল সি আই ডি-র বড়োকর্তা গুরুদাসবাবু বলছেন— আমি একেবারেই বেশি সময় নেব না, মিসেস রায়চৌধুরি। আমি কী জানি না যে সাগরের ফাইনাল পরীক্ষার আর দেরি নেই? কিন্তু, কী করব, বলুন? একজন নিরীহ, নির্বিরোধ, পরোপকারী মধ্যবয়স্কা মহিলা নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। কে খুন করেছে বা কেন, তা আমরা এখনও বের করতে পারিনি। আমাদের সরকারি পদ্ধতিতে এই রহস্যের সমাধান হতে দেরি হবেই আর সেই সময়ের মধ্যে যারা অপরাধী, তারা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাবে। সেটা কি আপনি চাইবেন? আমার দৃঢ় ধারণা আপনার ছেলে অন্যান্য বারের মতোই খুব কম সময়ের মধ্যেই অপরাধীদের মুখোশ খুলে দিতে পারবে।

অতসী হাঁড়িপানা মুখ করে বললেন— কোথায় ঘটেছে এই ব্যাপারটা?

আরামবাগের কাছে শিবনাথপুর বলে একটা গ্রাম আছে। নামেই গ্রাম, এখন রীতিমতো শহর। আরামবাগ মিউনিসিপ্যালিটির মধ্যেই।

—ও বাবা, সে যে অনেক দূর!

—দূর বেশি নয়, তবে আমি সাগরকে কখনোই ওখানে যেতে বলব না। ও যদি এখানে বসে সব কথা শুনে রহস্যভেদ করতে পারে, ভালো। নইলে, কোতুলপুর থানার ওসি আর আমি মিলে যা পারি তাই করব।

অতসীর গভীর ভ্রূকুটি একটু নরম হল। দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন— এখানে বসেই করবে? তবে তাই করুক। তবে দেখবেন যেন বেশি সময় নষ্ট না করে।

—আপনার কোনো চিন্তা নেই। আমি সমস্ত ডিটেলস নিয়ে এসেছি। ফটোগ্রাফও আছে। আশা করি এতেই হয়ে যাবে। আর, যদি না-হয়, তাহলে আর কিছু করবার নেই।

এই কথার মধ্যে সাগর ঘরে ঢুকল।

গুরুদাসবাবু বলতে শুরু করলেন— যে ভদ্রমহিলা খুন হয়েছেন, তাঁর নাম মিস মেরী অনুরাধা পল। বয়েস পঞ্চাশের কাছাকাছি। শিবনাথপুর গার্লস হাই স্কুলের অঙ্কের টিচার। স্কুলটা বিরাট আর তার খুব সুনাম। ওই তল্লাটের এক নম্বর স্কুল বলা যায়। প্রায় পঁচিশ বছর আগে এমএ পাশ করে এই স্কুলে ঢুকেছিলেন মিস পল। সেই থেকে এখানেই থেকে গেছেন। সিনিয়ার মোস্ট টিচার ছিলেন, প্রিন্সিপাল মিসেস বন্দনা ঘোষাল ছুটি নিলে উনিই ইনচার্জের কাজ করতেন।

সাগর বলল— এই স্কুলে আসবার আগে কোথায় ছিলেন? মানে বাড়ি কোথায় ছিল?

—সেটা আজ আর কারোর মনে নেই। তবে, স্কুলের জিয়োগ্রাফির টিচার অর্পিতা ভট্টাচার্য বললেন যে, সম্ভবত উনি বাঁকুড়া থেকে এসেছিলেন। ওঁর কথায় সেরকম একটা টান ছিল। স্কুলের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ওঁর পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস দেওয়া ছিল কেয়ার অফ ডাক্তার জন বার্তোস, আরামবাগের একটা ঠিকানায়। সেখানে খোঁজ করে দেখা গেছে ডা. বার্তোস ১৯৯৯ সালের মার্চ মাসে মারা যান। তখন তাঁর বয়েস হয়েছিল একাশি বছর। তারপর থেকে মিস পলের ঠিকানা রঘুনাথপুরের নেতাজি কলোনির একটি একতলা বাংলো।

—আরামবাগের এঁদের প্রতিবেশীরা কী বললেন এঁদের সম্পর্কে?

—ডা. বার্তোস ছিলেন মিতভাষী গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তবে, রোগীর সেবায় কোনো ত্রুটি রাখতেন না। সকলেই তাঁকে ভালোবাসত কিন্তু কেউই তাঁর ঘনিষ্ঠ হতে পারেনি। অনুরাধা খুব সম্ভবত তাঁর ভাগনি। উনিও মামার মতোই গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন। স্কুল থেকে ফিরে মামার ক্লিনিকে নার্সের কাজ করতেন আর অন্যান্য ব্যাপারে সাহায্য করতেন। মামা মারা যাওয়ার পর, অনুরাধা শিবনাথপুরে নেতাজি বাসস্ট্যান্ডের কাছে বাংলোটা ভাড়া নিয়ে একাই থাকতেন। সকালে বাগান করতেন, রাত্রে পড়াশুনো। প্রত্যেক রোববার বাসে করে আরামবাগের সেন্ট ক্রিস্টোফার চার্চে যেতেন। শান্ত নির্বিরোধ নিয়মানুবর্তী জীবনযাত্রা। তবে প্রতিবেশী বা সহকর্মীদের কারোর কোনো বিপদ হলে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন। রাত জেগে সেবা করতেন। কিন্তু গায়ে পড়ে কারোর উপকার করতে যেতেন না।

—বুঝতে পেরেছি। উনি কি আর কিছু করতেন বলে জানা আছে?

—আছে। ভদ্রমহিলা মাঝে মাঝেই ইংরেজি কাগজে বা ম্যাগাজিনে অঙ্কশাস্ত্রের ওপরে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লিখতেন। শুনেছি, উনি বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে বিএ পরীক্ষায় প্রথম আর এমএ-তে তৃতীয় হয়েছিলেন।

—ওঁর টাকা পয়সা কীরকম ছিল? একা মানুষ, মাইনে অবশ্যই ভালোই পেতেন। বিলাসিতাও বিশেষ কিছু ছিল না মনে হয়। কাজেই, জমানো টাকা বেশ ভালোই থাকার কথা।

—তা ঠিক, কিন্তু তা ছিল না। ওঁর মাইনের একটা মোটা অংশ যেত আরামবাগের চার্চ পরিচালিত একটি হাসপাতালে। বাকিটার অনেকটাই খরচ হত শিবনাথপুরে স্থানীয় জনসেবায়। জামানো টাকা বলতে ছিল ওঁর স্কুলের পাশে একটা ব্যাঙ্কে হাজার পাঁচেক টাকা।

—বাড়িতে ক্যাশ কিছু ছিল?

—ছিল কিছু, কিন্তু যথাস্থানেই ছিল। তুমি ভাবছ যে টাকা পয়সার জন্যে কেউ ওঁকে খুন করেছে, তা বোধ হয় না। যদিও কোতলপুর থানার ওসি অরূপ কুণ্ডুর এইরকম ধারণা। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমি কেন অন্যরকম ভাবছি সেটা মিস পল কীভাবে খুন হয়েছিলেন তা শুনলে বুঝতে পারবে।

—কীভাবে?

গুরুদাসবাবু একটা ফোটোগ্রাফ টেবিলের ওপর রেখে বললেন— এটা মিস পলের বাংলো। পেছনে যে উঁচু পাঁচিলটা দেখা যাচ্ছে তার ওপাশে নেতাজি বাসস্ট্যান্ড। বাংলোর সামনে বাগান তার আগে রাস্তা। তিন দিকে বাউন্ডারি ওয়াল বলতে একটা ফুট তিনেক উঁচু বাঁশের বেড়া। বাংলোর দু-পাশে ফাঁকা জমি। অনুরাধা নিহত হন গত পরশুর আগের দিন, ২৩ জানুয়ারি, মঙ্গলবার, সকাল ন-টায়। তখন নেতাজি বাসস্ট্যান্ড আর অন্য জায়গায় নেতাজির জন্মদিন পালন করা হচ্ছিল। চারদিকে মাইকে নানারকম দেশাত্মবোধক গান বাজছিল, বক্তৃতা হচ্ছিল। অনুরাধা তখন বাগানে ঘুরে ঘুরে ফুল গাছগুলো দেখাশুনো করছিলেন। সেইসময় তাঁকে গুলি করা হয়।

—কোথা থেকে গুলি করা হয় বোঝা গেছে?

—হ্যাঁ, রাস্তা থেকে। রাস্তায় তখন অনেক লোক যাতায়াত করছিল। কেউ যাচ্ছিল বাসস্ট্যান্ডে, কেউ বাজারে। অনেকে আবার বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে অনুরাধার সঙ্গে দুটো কথা বলে নিচ্ছিল। হঠাৎ তাঁকে পড়ে যেতে দেখে তাদের দু-চারজন গেট খুলে ভেতরে ঢুকে ব্যাপারটা দেখতে পায়। গুলি লেগেছিল গলায়। সঙ্গেসঙ্গে মৃত্যু হয়েছিল।

—দু-পাশের ফাঁকা জমিতে কেউ ছিল না?

—না।

—না থাকারই কথা। থাকলে তার ওপরে লোকের নজর পড়ত। কেউ গুলির শব্দ শুনেছিল?

—না। মাইকের শব্দে সেই শব্দ বোধ হয় চাপা পড়ে গিয়েছিল। তবুও বলব, বেড়ার এপাশ থেকে যদি গুলি করা হয়ে থাকে তাহলে সে শব্দ কারোর না-কারোর শোনবার কথা। আর একটা কথা। যে গুলিটা অনুরাধার শরীরে পাওয়া গেছে সেটা একটা বিদেশি পিস্তল থেকে ছোড়া হয়েছিল, দিশি ওয়ান-শটার নয়। তার মানে, অবশ্যই কোনো সাইলেন্সার লাগানো রিভলভার ব্যবহার করা হয়েছিল। সেটা একটা বেশ বড়ো লম্বাটে জিনিস। শীতকালে বলে তখন পথচারীদের অনেকের গায়েই আলোয়ান। তার মধ্যে সেটা লুকিয়ে রাখা হয়তো কঠিন নয়, কিন্তু অতগুলো লোকের মধ্যে দাঁড়িয়ে সেটা কাউকে না দেখতে দিয়ে ঠান্ডা মাথায় গুলি চালানো তা-ও এমনভাবে যে এক গুলিতেই কাজ শেষ, সেটা কিন্তু সহজ ব্যাপার নয়।

—মানে, এক্সপার্ট প্রফেশনাল ভাড়াটে খুনির কাজ। ডাকাতির ব্যাপার নয়।

গুরুদাসবাবু মাথা নেড়ে বললেন— ঠিক তাই। কিন্তু কেন? মিস পলের মতো একজন নিতান্ত সাধারণ মাঝবয়সি শিক্ষিকাকে একগাদা টাকা খরচা করে ভাড়াটে খুনি লাগিয়ে মারবার দরকার পড়ল কার, বা কেন?

সাগর অন্যমনস্কভাবে থেমে থেমে বলল— আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?

—অবশ্যই।

—এক নম্বর প্রশ্ন। মিস পলের কি কোনো বন্ধুবান্ধব ছিলেন যাঁদের বাড়িতে উনি যাতায়াত করতেন বা তাঁদের কেউ কেউ ওঁর বাড়িতে আসতেন?

—না, ওঁর কোনো বন্ধুবান্ধব বা ইয়ারদোস্ত কেউই ছিল না, থাকবার কথাও নয়।

—স্কুলের শিক্ষিকাদের কেউ?

—কেউ না। তাঁরা অনুরাধাকে অপছন্দ কখনোই করতেন না, কিন্তু ঘনিষ্ঠতাও করতে পারতেন না।

—কেউ আসত না এই বাড়িতে?

—আসত। তিনজন। প্রথম, নাসিমা খাতুন, রান্না করত। দুপর বেলা টিফিন ক্যারিয়ারে স্কুলে লাঞ্চ নিয়ে যেত। দ্বিতীয়, তার হাসব্যান্ড আইনুল হক। তার কাজ ছিল ঘরদোর পরিষ্কার করা, দুধ আনা, ট্যাক্স জমা দেওয়া আর অন্যান্য বাইরের কাজ করা। তৃতীয়, সুবিমল সরকার, স্কুলের অ্যাকাউন্টেন্ট। ইনি মাসের প্রথমে মিস পলের মাইনেটা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে তাঁর পাসবইটা আপডেট করে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন।

সাগর বেশ চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল— এদের সম্পর্কে কিছু বলুন।

গুরুদাস বললেন— নাসিমা বাংলাদেশের মেয়ে। বয়েস তিরিশের বেশি নয়। সাদামাটা ভালো মানুষ। আইনুলের বয়েস পঁয়তাল্লিশ, আদি বাড়ি বিহারের ছাপরায়। তিন-চার পুরুষ আছে আরামবাগের কাছে মাঝডাঙা গ্রামে। পুলিশের খাতায় আইনুলের নাম আছে। বছর কুড়ি আগেও সে আরামবাগ, কোতুলপুর, শিবনাথপুর অঞ্চলে ডাকাতি করে বেড়াত। কয়েক বার জেলও খেটেছে। কিন্তু, নাসিমা আর অনুরাধা মিলে ওকে সৎপথে ফিরিয়ে আনে। অনুরাধা তাকে বর্ধমানে একটা ইনস্টিটিউটে ভরতি করে দরজির কাজ শেখান। এখন অনেক বছর হল সে আর নাসিমা দিনে অনুরাধার বাড়িতে কাজ করে আর সন্ধে বেলা বাড়ি ফিরে রাতে দরজির কাজ করে।

—আইনুল বোধ হয় এখন হাজতে।

—ঠিক। অরূপের দৃঢ় বিশ্বাস যে একবার অপরাধ জগতে ঢোকে সে আর বেরোতে পারে না। তার থিয়োরি হল যে আইনুল তার পুরোনো বন্ধুদের দিয়ে সে আর নাসিমা ওখানে ঢোকবার আগেই মিস পলকে খুন করিয়েছে। উদ্দেশ্য, যাতে তাদের ওপরে কারোর কোনো সন্দেহ না পড়ে আর গোলমাল মিটে গেলে এই বাংলোটা অবলীলাক্রমে দখল করা যায়। আমার মনে হয় এই থিয়োরিটা আদালতে ধোপে টিকবে না। বাংলোটা যে ভাড়া বাড়ি ছিল, এই তথ্যটা অরূপ পাত্তা দিতে চাইছে না।

—আপনি কিন্তু একজনের কথা এখনও বলেননি।

—কে, অ্যাকাউন্টেন্ট সুবিমল সরকার? তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলবার নেই। ষাটের কাছাকাছি বয়েস, চোখে মোটা কাচের চশমা, রোগা কোলকুঁজো ডিসপেপটিক চেহারা। অত্যন্ত নার্ভাস প্রকৃতির লোক। অল্পেই বেশি বিচলিত হয়ে পড়েন। ঘটনার দিন সকাল বেলা একটা পোর্টফোলিও ব্যাগ নিয়ে অনুরাধার বাংলোয় এসেছিলেন হত্যাকাণ্ডটা ঘটে যাবার মিনিট কুড়ি বাদে। এসে এত লোকজন, পুলিশ, ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স আর রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখে কাঁপতে কাঁপতে বারান্দার ওপর শুয়েই পড়লেন। তখন আবার তার মাথায় জল-টল দিয়ে একটু সুস্থ করে রিকশা করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সাগর মুখ তুলে বলল— ২৩ তারিখে সকাল বেলা পোর্টফোলিও ব্যাগ নিয়ে তিনি মিস পলের বাড়িতে গিয়েছিলেন কেন, সে কথা জিজ্ঞাসা করেননি মি. কুণ্ডু?

—না। ও অঞ্চলে সকলেই সরকারবাবুকে চেনে। নিতান্ত নিরীহ মানুষ, বিশাল পরিবার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। তাঁর পক্ষে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটানো আর এভারেস্টের ডগায় ওঠা একই ব্যাপার। আর ব্যাগটা? একজন অ্যাকাউন্ট্যান্টের বগলে পোর্টফোলিওব্যাগ থাকবে, সেটা কারোর অস্বাভাবিক বলে মনে হয়নি।

একটু চুপ করে থেকে সাগর বলল— আপনি যে মিস পলের নিয়মানুবর্তী জীবনযাত্রার কথা বললেন, তাতে কি সম্প্রতি কোনো পরিবর্তন ঘটেছিল?

গুরুদাসবাবু হাত নেড়ে বললেন— এটা আমার জানা নেই। কুণ্ডুকে বলছি নাসিমা আর আইনুলকে জেরা করে জেনে নিতে। কাল তোমাকে জানাব।

—সেইসঙ্গে আরও কয়েকটা বিষয় জেনে নিতে বলবেন। এক, মিস পল স্কুলে কোনো টাকাপয়সা সংক্রান্ত গোলমালে জড়িয়ে পড়েছিলেন কি না। দুই, ওঁর স্বভাবে কোনো দুর্বলতা ছিল কি না। যেমন— মিষ্টি খাওয়ার প্রতি অতিরিক্ত লোভ বা অল্পেই রেগে যাওয়া বা এই ধরনের কিছু। তিন, ব্রেকফাস্ট কি উনি নিজেই বানিয়ে নিতেন না নাসিমা এসে বানাত? সকালে কখন আসত নাসিমা আর কখন যেত? চার, স্কুল শুরু হয় ক-টার সময় আর শেষ হয় কখন।

—তোমার শেষ দুটো প্রশ্নের উত্তর আমি জানি। নাসিমা আর আইনুল আসত সাড়ে ন-টা থেকে পৌনে দশটার মধ্যে। ঘটনার দিনও দু-জনে পৌনে দশটা নাগাদ এসেছিল। তবে মিস পল ব্রেকফাস্ট মনে হয় নিজেই বানাতেন। কারণ, নাসিমারা এলে তাদের হাতে বাড়ির চাবি দিয়ে স্কুলে চলে যেতেন। কাছেই রিকশস্ট্যান্ড, সেখান থেকে দশ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছে যেতেন। স্কুলের সময় দশটা থেকে চারটে, শনি আর রবিবার স্কুল বন্ধ। অনুরাধা রোজ সাড়ে চারটের ভেতরে বাড়ি পৌঁছতেন আর সাতটা নাগাদ নাসিমা বাড়ি যেত। আইনুল তার আগেই চলে যেত। আর তোমার দু-নম্বর প্রশ্ন, মানে স্কুলে টাকাপয়সার কোনো গণ্ডগোলের ব্যাপারে বলতে পারি, মিস পল এত সৎ ছিলেন যে তাঁর পক্ষে, বিশেষত সুবিমল সরকারের মতো একজন ভীরুপ্রকৃতির লোকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে, এই ধরনের কোনো স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়া একেবারেই অসম্ভব।

বলে উঠে দাঁড়িয়ে জোরগলায় বললেন— দেখুন মিসেস রায়চৌধুরি, আমি মোটেই বেশি সময় নিইনি। তবে, সাগরের কতগুলো প্রশ্নের জবাব পেলে কাল আমি সারাদিনে কোনো একসময়ে আসব।

তারপর গলা নামিয়ে বললেন— আজ রাত্রেই কুণ্ডুর সঙ্গে যোগাযোগ করছি। মনে হয়, কাল সকালেই উত্তর পেয়ে যাব।

গুরুদাসবাবু চলে গেলে, দীপঙ্কর বললেন— কিছু বুঝতে পারলি?

সাগর মাথা নাড়ল। বলল— না, পারিনি। তবে, একটা খুব আবছা ছবি দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, খুনটা যে করেছে সে যে ভাড়াটে খুনি তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু যে খুন করিয়েছে, সে একটি ভয়ংকর ক্রিমিন্যাল। হেন দুষ্কর্ম নেই যা সে করতে পারে না।

শনিবার সাগর বসবার ঘরেই বসেছিল। গুরুদাসবাবু এগারোটার মধ্যে এসে গেলেন। একটু চিন্তিত মুখে কোনোরকম ভনিতা না-করে বললেন— তোমার প্রশ্নের উত্তরগুলো এনেছি। ব্যাপারটা যে একটু গোলমেলে হয়ে গেল।

সাগর হেসে উঠে বলল— কী জানলেন বলুন, গুরুদাসকাকা।

—এক নম্বর উত্তর। নাসিমা জানিয়েছে যে গত মাস তিনেক হল, মিস পলের নিয়ম-বাঁধা জীবনযাত্রায় একটা পরিবর্তন হয়েছিল। এই সময়ে মাঝে মাঝেই সন্ধে ছ-টা সাড়ে ছ-টা নাগাদ সুবিমল সরকার পোর্টফোলিয়ও ব্যাগে ভরে কিছু ফাইল তাঁকে দিতে আসতেন আর দিয়েই চলে যেতেন। অনুরাধা অনেক রাত অবধি সেই ফাইলগুলো পড়তেন আর খাতায় কী সব লিখতেন। দু-চারদিন পরে সেই ফাইলগুলো একটা বাজারের থলেতে ভরে নিয়ে স্কুলে যেতেন।

সাগর ভুরু কুঁচকে বলল— অনেক রাত অবধি ফাইল দেখতেন, সেটা নাসিমা জানল কী করে?

—এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে নাসিমার একটি কথায়। মিস পল নাকি সুবিমল সরকারের ফাইল যে ক-দিন কাছে রাখতেন, সে ক-দিন বিকেল বেলা ঘুমুতেন। অন্যান্য দিন নয়।

—যে খাতায় মিস পল কাজ করতেন সেই খাতাগুলো আপনারা পেয়েছেন?

—পেয়েছি তা জোর করে বলি কী করে? ভদ্রমহিলার পড়বার ঘরে অসংখ্য খাতা আর তাদের সব কটাতেই নানা রকমের ভয়ানক জটিল অঙ্ক কষা। সেসব অঙ্কে দাঁত ফোটানো ক্ষমতা আমাদের নেই। কাজেই সেসব কার অঙ্ক, কীসের অঙ্ক তা বোঝা আমাদের সাধ্যাতীত। তবে তিনি ইদানীং কোনো একটা গোলমালে জড়িয়ে পড়ছিলেন ঠিকই। কিন্তু সেটা স্কুলে না অন্যত্র তা বোঝা যাচ্ছে না।

—কী কী বোঝা যাচ্ছে?

—নাসিমা বলেছে যে গত কয়েক মাস যাবৎ তার মনিব খুব চিন্তিত হয়ে থাকতেন। ফাইল দেখতে দেখতে চেয়ার থেকে উঠে ঘরের ভেতর পায়চারি করতেন। কখনো একটা ইজিচেয়ারে বসে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সেসময় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে বিরক্ত হতেন। উনি আগে এরকম ছিলেন না। আর তোমার তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর হল যে মিস পল ভীষণ একরোখা মানুষ ছিলেন। এটা একরকম দোষই বলতে পারো। নিজে যা ভালো মনে করতেন সেটা করে ছাড়তেন।

—তার মানে বোঝা যাচ্ছে যে ওই ফাইলগুলোয় এমন কিছু ছিল যা মিস পলকে বিচলিত করেছিল এবং খুব সম্ভবত সেই জন্যেই এই ঘটনাটা ঘটে গেল। সুবিমল সরকারকে আপনারা এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন?

—হ্যাঁ, করেছি। কাল রাত্রেই। সুবিমল বলছেন যে কিছুদিন যাবৎ তিনি স্কুলকে না-জানিয়ে সন্ধ্যে বেলা ভুবনেশ্বরী কোল্ডস্টোরেজে একটা পার্টটাইম কাজ নিয়েছেন। কিন্তু আলুর হিমঘরের হিসাবপত্রের ব্যাপারটা তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। অনুরাধা মিস খুব ভালো অঙ্ক জানে। তাই তাঁর কাছে ব্যাপারটা বুঝে নিতে যেতেন সুবিমল। বিরাট সংসার, শুধু স্কুলের মাইনেতে চলে না। তাই এই কাজটা তাঁর বিশেষ প্রয়োজন। এই জন্যেই তিনি অনুরাধা মিসের সাহায্য চেয়েছিলেন। তিনিও খুশি হয়ে রাজি হয়েছিলেন।

—এর মানে হল এই হিসাবপত্রের মধ্যে এমন একটা গরমিল মিস পল দেখতে পেয়েছিলেন যা তাঁকে বিচলিত করে তুলেছিল। এখন কথা হল একটা কোল্ডস্টোরেজের হিসাবের গণ্ডগোল থাকলে মিস পল কি এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়বেন আর এমন কাজ করে বসবেন যাতে তাঁর প্রাণটা চলে যায়?

—ঠিক বলেছ। তার মানে, সুবিমল সত্যি কথা বলছেন না। তাহলে এখন আমাদের কর্তব্য কী? সুবিমলকে গ্রেপ্তার করব? তাতে কিন্তু আমার মন থেকে সমর্থন পাচ্ছি না।

সাগর বলল— আজ শনিবার, কালও স্কুল ছুটি। আমার মনে হয় এই সুযোগে স্কুলের সমস্ত কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করে সোমবার থেকে একটি স্বতন্ত্র অডিটর বা হিসাবরক্ষক সংস্থাকে দিয়ে সেগুলো আপনারা পরীক্ষা করান। আমি নিশ্চিত যে তাহলেই সব রহস্যের সমাধান হয়ে যাবে। এই কাজটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করা দরকার; নইলে সব কাগজপত্র হয় আগুন লেগে পুড়ে যাবে নয়তো চুরি হয়ে যাবে। অরূপবাবু আইনুলকে হাজতে ঢুকিয়ে একটা ভালো কাজ করছেন। পুলিশ ভুলপথে যাচ্ছে দেখে বোধ হয় আসল অপরাধী হুড়োতাড়া করে হিসাবের খাতাগুলো লোপাট করেনি। আর সামনেই যে রিকশাস্ট্যান্ড আছে সেখানে খোঁজ নিন যে গত রবিবার, ২১ তারিখে, মিস পল চার্চ থেকে ফিরে কোথাও গিয়েছিলেন কি না।

গুরুদাসবাবু উঠে দাঁড়ালেন। বললেন— বুঝেছি। আমি এখনি ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর এর ফলশ্রুতি কী দাঁড়াল, সেটাও দু-এক দিনের মধ্যেই তোমাকে জানিয়ে যাব। তোমার কি মনে হয় যে সুবিমল সরকার এর মধ্যে আছেন?

—থাকতে পারেন। তবে আমার এখনও পর্যন্ত ধারণা যে উনি এর মধ্যে নেই। থাকলে কোল্ডস্টোরেজে পার্টটাইম কাজ নিতেন না। মনে হয়, সুবিমলবাবু নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন।

বুধবার স্কুল থেকে ব্যাডমিন্টন খেলে বাড়ি ফিরে সাগর দেখল বসবার ঘরে গুরুদাসবাবু আর অন্য একজন কমবয়সি পুলিশ অফিসার বসে রয়েছেন।

গুরুদাসবাবু সহাস্যে বললেন— এসো সাগর, আমরা তোমার জন্যেই বসে রয়েছি। আর এই যে ইনি তোমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছেন, ইনি হলেন...

সাগর একটা চেয়ারে বসে বলল— জানি, অরূপবাবু, কোতুলপুর থানার ওসি। বলুন, রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?

গুরুদাসবাবু বললেন— শোনো, বলছি। রবিবার সকালে আমরা স্কুলে গিয়ে সমস্ত হিসাবের খাতাপত্র বাজেয়াপ্ত করি। সঙ্গেসঙ্গে হুলুস্থুল পড়ে গেল। স্কুলের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট গৌরহরি সাহা আর সেক্রেটারি বিজন সামন্ত থানায় এসে হাজির। গৌরহরি সাহা ধর্মপ্রাণ সৎ লোক বলে ওই অঞ্চলে পরিচিত। শিবনাথপুর গার্লস আর বয়েজ হাই স্কুল দুটোই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বাবা কৃষ্ণহরি সাহার দান করা জমির ওপরে। গৌরহরি কম বয়সে দুটো স্কুলেই পড়াতেন। স্কুলের সব ফাংশনেই তিনি হাজির থাকেন। সেক্রেটারি বিজন সামন্ত স্থানীয় লোক কিন্তু নামকাটা সেপাই। অল্প বয়েসে নানারকম বেআইনি আর অসমাজিক কাজকর্ম করে অনেক টাকা করেন। তারপরে পলিটিক্স। তখন তাঁর রমরমা দেখে কে? কামারপুর আর শিবনাথপুরে দুটো কোল্ডস্টোরেজ, আরামবাগে একটা শপিং সেন্টার। তারপরে এম এল এ। এখন জনপ্রতিনিধি হয়ে স্কুলের সেক্রেটারি হয়ে বসেছেন, কেউ আটকাতে পারেনি। একজন রিকশাওয়ালার কাছে জানা গেল যে রবিবার বিকেলে এই বিজন সামন্তর কাছেই গিয়েছিলেন অনুরাধা।

—বাঃ। উনিই তো তাহলে নাটের গুরু। উনিই স্কুলের অ্যাকাউন্টস-এ কারচুপি করে হাজার হাজার টাকা সরিয়েছেন আর একরোখা মিস পল যে সেটা ধরে ফেলেছেন সেটা রবিবার জানতে পেরে মঙ্গলবারেই তাঁকে খুন করিয়েছেন। তাঁর বোধ হয় আরও ভয় ছিল যে মিস পল খবরের কাগজে লেখেন যখন, তখন সেখানে ব্যাপারটা প্রকাশ করে দিতে পারেন। ঠিক বলেছি?

—একদম। শুধু তোমার অনুমানে একটু ভুল আছে। বিজন সামন্ত হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ টাকা সরিয়েছেন। আমাদের জেরায় সুবিমল সে কথা স্বীকার করেছেন। কোথাও যে একটা বিরাট গোলমাল আছে সেটা সুবিমল আন্দাজ করতে পারেন মাস চারেক আগে। সেটা কনফার্ম করবার জন্যে মিস পলের কাছে গিয়েছিলেন। উনি স্কুলটাকে এত ভালোবাসতেন যে সুবিমলের কথা শুনে হিসাব পরীক্ষা করতে রাজি হন। সুবিমল ভাবতেই পারেননি যে স্কুলের টাকা নয়-ছয় হচ্ছে দেখে অনুরাধা এত রেগে যাবেন যে একেবারে খোদ বিজন সামন্তর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে ধমকে দিয়ে আসবেন। সুবিমলের সে সাহস ছিল না। না থাকারই কথা। এই তল্লাটে সবাই সামন্তকে যমের মতো ভয় পায়। সুবিমল ফেঁসে যাবার আগেই সময় বুঝে পালাবার পথ হিসেবেই কোল্ডস্টোরেজের চাকরিটা নিয়েছিলেন।

—গৌরহরি সাহা এর মধ্যে ছিলেন না?

—না, উনিই মিস পলের খুনের খবর পেয়ে সঙ্গেসঙ্গে মন্ত্রী শক্তিপদ নস্করকে কেসটা সি আই ডি-র কাছে পাঠাতে বলেন। শক্তিপদবাবু গৌরহরিবাবুকে অত্যন্ত শ্রদ্ধ করেন, তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন, শিবনাথপুর স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন। তিনি তৎক্ষণাৎ আমাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁর অনুমতি নিয়েই আমরা বিজন সামন্তকে গ্রেপ্তার করেছি।

সাগর বলল, কিন্তু খুনটা করল কে?

গুরুদাসবাবু সহাস্যে বললেন, চিন্তা কোরো না। মাথাটা যখন ধরেছি, তখন কানটা ধরতে বেশি দেরি হবে না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%