চন্দ্রশেখর হত্যারহস্য

মনোজ সেন

শশীশেখর লাহিড়ি ভুরু কুঁচকে তাঁর চশমার মোটা কাচের ভেতর দিয়ে সাগরকে বেশ কিছুক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করে বললেন— তুমি রহস্যভেদ করে থাকো? এই বয়েসে?

সাগর হেসে বলল— চেষ্টা করি। সবসময় যে পেরে উঠি, তা নয়।

—বটে? আমার ছেলে অর্ণব কিন্তু বলছিল যে তোমার নাকি বেশ ভালোই ক্ষমতা আছে। ও-ই তো তোমাকে ডেকে এনেছে।

—অর্ণব আমার বহুদিনের বন্ধু। সেই ক্লাস ওয়ান থেকে একসঙ্গে পড়ছি। ও আমাকে খুব ভালোবাসে। আমার প্রতি ওর পক্ষপাতিত্ব থাকাই স্বাভাবিক।

—তা বটে। যাই হোক, এসেছ যখন, তখন আজকের মিটিং-এ থেকেই যাও। ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর গুরুদাস হাজরা এখুনি এসে পড়বেন। তাঁর আগে ব্যাপারটা তোমাকে বলি।

—সেই ভালো।

শশীশেখর যা বললেন সেটা এইরকম—

উত্তর কলকাতার বসাকপাড়ায় শশীশেখরের পৈত্রিক বাড়ি। গঙ্গার ধারে দোতলা; প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো ইমারত। শশীশেখরের পূর্বপুরুষ হেমশঙ্কর লাহিড়ি বগুড়া থেকে কলকাতায় এসে কাগজের ব্যাবসা শুরু করেছিলেন। টাকাপয়সা হয়েছিল অনেক। তাই দিয়েই বাড়িটা বানানো। তারপর পরিবার যত বড়ো হয়েছে, ততই ও বাড়িতে থাকবার জায়গা কমে এসেছে। শেষপর্যন্ত, শশীশেখরের বাবা ডাক্তার বিধুশেখর লাহিড়ি দক্ষিণ কলকাতার চারুচন্দ্র স্ট্রিটের বর্তমান বাড়িটা বানিয়ে সেখানে উঠে আসেন। বসাকপাড়ায় তাঁর ছোটোকাকার পরিবার এখনও থাকেন। তাঁদের কপালে একটা ঘর আর একটা বারান্দা জুটেছে।

মাসছয়েক আগে, শশীশেখরের স্ত্রী গৌরী দেবী তাঁর খুড়শ্বশুড়ের ছোটোছেলে চন্দ্রশেখরের কাছ থেকে একটা টেলিফোন পান। চন্দ্রশেখর তাঁকে বলে যে তাঁর সামনে ভয়ংকর বিপদ আসছে, অতএব তিনি যেন সাবধানে থাকেন, আর এই ফোনের কথা যেন কাউকে না জানানো হয়। তিনি অবশ্য কথাটা তৎক্ষণাৎ শশীশেখরকে বলেন। পরের দিনই শশীশেখর বসাকপাড়ায় গিয়ে চন্দ্রশেখরের সঙ্গে দেখা করেন। সে ফোনের কথাটা অস্বীকার তো করেই আর যেন অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছে, এরকম একটা ভাব করে।

এর দু-দিন পরে আবার ফোন আসে। এবার শশীশেখরকে কথাটা বলে দেওয়ার জন্য গৌরী দেবীকে রীতিমতো শাসানো হয়। আর বলা হয় যে তাঁদের দু-জনের গোপন কুকীর্তির কথা এবার ফাঁস করে দেওয়ার সময় হয়েছে। সেটা যদি আটকাতে চান, তাহলে তিনি যেন দশহাজার টাকা জোগাড় করে রাখেন। এই কথা শুনে শশীশেখর অবিলম্বে লোকাল থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি করে আসেন।

তদন্ত করে পুলিশ তাঁকে যে খবর দেয় তাতে তাঁরা খুব চিন্তায় পড়ে যান। চন্দ্রশেখর নাকি একজন মারাত্মক লোক। সে ভালোমানুষির মুখোশ পরে নানা অসামাজিক কাজকর্ম করে থাকে। হেন দুষ্কর্ম নেই যা সে করতে পারে না। মানে, যাকে বলে, সে একটা হার্ডকোর ক্রিমিনাল। পুলিশ অনেকবারই ও-বাড়িতে হানা দিয়েছে, যদিও কিছুই ধরতে পারেনি।

এই ঘটনার দিনতিনেক বাদে হঠাৎ খবর আসে যে চন্দ্রশেখর আত্মহত্যা করেছে। তাঁর মৃত্যুর ঘটনাও অদ্ভুত। তখন বাড়িতে কেউ ছিল না। ঘরের দরজা বন্ধ করে সে খাটে বসে টাকা গুনছিল। সেই অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। দরজা ভেঙে পুলিশ যখন ভেতরে ঢোকে, তখনও তাঁর হাতে পাঁচ-শো টাকার কুড়িটা নোট।

স্বভাবতই, পুলিশ প্রথমে ধরে নিয়েছিল যে চন্দ্রশেখর হার্টফেল করে মারা গেছে। কিন্তু পোস্টমর্টেমের পর দেখা গেল যে তাঁর মৃত্যুর কারণ পটাশিয়াম সায়ানাইডের বিষক্রিয়া। তাঁর মানে এটা আত্মহত্যা। কিন্তু, সেখানে কয়েকটা প্রশ্ন উঠল।

প্রথমত, টাকা গুনতে-গুনতে সে আত্মহত্যা করতে গেল কেন? দ্বিতীয়ত, তাঁর ঘরে যে পটাশিয়াম সায়ানাইডের শিশিটি পাওয়া গেছে, সেটা ছিল তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে। পটাশিয়াম সায়ানাইড খেলে তাঁর তৎক্ষণাৎ মৃত্যু হওয়ার কথা। তাহলে, শিশিটি ওখানে গেল কী করে? তৃতীয়ত, সে যদি কোনো চামচে সেটা মুখে ঢেলে দিয়ে থাকে, তাহলে সেই চামচটা বা গেল কোথায়?

এইখানে পুলিশের সন্দেহ এসে পড়ল শশীশেখরের ওপরে। চন্দ্রশেখর শশীশেখরের কাছে দশহাজার টাকা দাবি করেছিল। তাঁর হাতেও ছিল দশহাজার টাকা। এটা হতে পারে যে শশীশেখর একটা নোটের ওপরে পটাশিয়াম সায়ানাইডের গুঁড়ো ছড়িয়ে রেখে তাকে টাকা দিয়েছিলেন। জিভ দিয়ে আঙুল ভিজিয়ে টাকা গুনতে গিয়ে সেই বিষ তাঁর মুখে চলে যায়, আর তার মৃত্যু হয়। এই সন্দেহের ওপরে পুলিশ হয়তো তাঁকে গ্রেপ্তার করত। করেনি, কারণ তাঁর হাতে যে টাকাগুলো ছিল, তাঁর কোনোটাতেই কোনো বিষের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সেই রহস্যের সমাধান করতেই লালবাজার থেকে মি. হাজরা আসছেন শশীশেখরকে জেরা করবার জন্য।

সবকথা শুনে সাগর বললেন— আমি কি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?

শশীশেখর বললেন— করো।

—আপনি বললেন যে, চন্দ্রশেখর আপনার ছোটোকাকার ছোটো ছেলে। ওঁর আর ক-টি ভাইবোন? তাঁরা কে কী করেন?

—ছোটোকাকার দুই ছেলে এক মেয়ে। বড়ো ছেলে হিমাদ্রিশেখর। সে আত্মভোলা মানুষ, গানবাজনা নিয়ে আছে। শ্যামবাজারে তাঁর একটা গানের স্কুল আছে। স্কুলটা বেশ ভালোই চলে। তারপরে মেয়ে প্রতিমা। সে এমএসসি পাশ করে বরানগরে একটা ওষুধের ফ্যাক্টরিতে চাকরি করত। সম্প্রতি সেই কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়িতে বসে আছে আর চাকরি খুঁজছে।

—আপনার কাকা আর কাকিমা কি বেঁচে আছেন?

—কাকা বেঁচে নেই। কাকিমা বেঁচে আছেন বটে, কিন্তু তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। ঘটনার সময় তাঁকে নিয়ে প্রতিমা ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল আর হিমাদ্রি ছিল গানের স্কুলে।

—ওই পরিবারের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কীরকম?

—সম্পর্ক নেই বললেই চলে। বসাকপাড়ার বাড়িতে বিয়ে বা ওই ধরনের কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান হলে দেখা হয়, এই পর্যন্ত।

—তখন চন্দ্রশেখর বা তাঁর ভাইবোনেরা আপনাদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করেন?

—বলবার মতো কিছু নয়। চন্দ্রশেখরকে তো প্রায় কখনোই দেখি না। হিমাদ্রি বা প্রতিমা হেসে কথা বলে, এই আর কী।

—আপনি তো মহারাজা স্বর্ণকুমার কলেজে ইকনমিক্স পড়ান। মাসিমা ঘরসংসার নিয়েই আছেন। এখন, আপনার বা মাসিমার কী এমন কোনো অতীত ইতিহাস আছে যা কোনোমতেই প্রকাশ হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়? আমি ইতিহাসটা জানতে চাই না, শুধু জানতে চাই যে সেরকম কিছু আছে কিনা।

—কখনোই নয়। আমি বা আমরা কখনো কোনো বেআইনি কাজ করিনি।

—বেশ। তাহলে দেখুন, চন্দ্রশেখরবাবু যদি আত্মহত্যা করে না-থাকেন, তাহলে তাঁর মৃত্যু ঘটানোর জন্যে চারজনের ওপরে সন্দেহ হওয়ার কথা। এক নম্বর, আপনি। টেলিফোনে খবরটা পেয়েই আপনি বসাকপাড়ায় গিয়েছিলেন। হয়তো, টাকা দিতে। টাকায় সামান্য বিষের গুঁড়ো মেশানো ছিল যেটা আপনি আপনার কলেজের ল্যাবরেটরি থেকে জোগাড় করেছিলেন। সেটা হাওয়ায় উড়ে গেছে। বিছানার চাদরটা পরীক্ষা করলে সেটা জানা যাবে। দু-নম্বর, হিমাদ্রিশেখর। একটা ঘরের মধ্যে চারজনে মিলে থাকেন। তাঁর ওপরে অসুস্থ মা। খুবই অসুবিধে হওয়ার কথা। আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া, পুলিশের ঝামেলা। ছোটোভাইয়ের যা সুনাম, তাতে বোনের বিয়ে দেওয়াও কঠিন। কাজেই, চন্দ্রশেখর সরে গেলে সব সমস্যার সমাধান হতে পারে। তিন নম্বর, প্রতিমা। তাঁরও একই সমস্যা। তা ছাড়া, তিনি ওষুধের কারখানায় কাজ করতেন। হয়তো সেখান থেকে পটাশিয়াম সায়ানাইড গোপনে সরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন। চার নম্বর, অন্য কেউ।

সাগরের কথা শেষ হওয়ামাত্র দরজার পরদা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন একজন মধ্যবয়স্ক বেঁটেখাটো ভদ্রলোক। তাঁর পরনে নীলরঙের শার্ট আর কালো ট্রাউজার্স।

ভদ্রলোক বললেন— আমার নাম গুরুদাস হাজরা। আমি লালবাজার থেকে আসছি।

প্রাথমিক অভ্যর্থনা আর পরিচয়পর্ব শেষ হলে হাজরা বললেন— আমি আপনাদের অনুমতি ছাড়াই দরজার বাইরে থেকে এই ছেলেটির কথা শুনছিলুম। আপনার ছেলে ঠিক কথাই বলেছে, প্রফেসর লাহিড়ি। স্বীকার করতেই হবে যে রহস্যভেদে এর একটি স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে।... এবার তাহলে বলো তো সাগরবাবু, আমাদের এখন কী কর্তব্য?

সাগর অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বলল— আমি কখনো আপনাকে তা বলতে পারি?

—খুব পারো। তুমি তো এখন আমাদের সঙ্গে আছ। তাহলে বলো তো, যে চারজনের কথা বললে, তাদের ব্যাপারে কীভাবে এগোনো যেতে পারে?

—মেসোমশায়ের ব্যাপারে বলতে পারি যে তাঁর অতীত জীবনের ওপরে একটা বিশদ তদন্ত হওয়া দরকার। সেইসঙ্গে মাসিমারও। কোনো একজন তাঁদের ব্ল্যাকমেল করতে উদ্যত হয়েছিল। কেন? সেটা কি কোনো কারণ ছাড়াই করা হয়েছিল? আর ফোনগুলো কে করেছিল? চন্দ্রশেখর না অন্য কেউ।

—তাহলে তোমাকে বলি, চন্দ্রশেখরের মোবাইল ফোন থেকে জানা গেছে যে ফোনগুলো সেই করেছিল।

—ভালো কথা। বাকি তিনজনের ব্যাপারে কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারব না। কারণ, আমি তাদের চিনিও না, তাদের সঙ্গে কথাও বলিনি।

—তুমি কি তাদের সঙ্গে আলাদা-আলাদা কথা বলতে চাও?

—তাহলে তো খুব ভালোই হয়। তবে আমি আপনার সামনেই কথা বলতে চাই।

—সে ক্ষেত্রে, বসাকপাড়ার বাড়িতে কথা বলা যাবে না। একটাই ঘর। সেখানে হিমাদ্রিশেখরের মা রয়েছেন। তিনি একে সুস্থ নন, তাঁর ওপরে পুত্রশোকে পাগলের মতো হয়ে খুব চ্যাঁচামেচি করছেন। ওই পরিবেশে শান্তভাবে কোনো আলোচনা চালানো একেবারেই অসম্ভব। আমি তাহলে হিমাদ্রিশেখর আর প্রতিমাকে লালবাজারে আসতে বলি। আমার ঘরে বসেই কথা বলা যাবে। আজ থেকে দিনপনেরো-বাদে কুড়ি তারিখে তুমি আর শশীশেখরবাবু এগারোটার মধ্যে ওখানে পৌঁছে যাবে। সেইসময় তোমার কি স্কুল আছে?

—না, এখন তো গরমের ছুটি।

—বেশ, তাহলে তো কোনো অসুবিধে নেই। তোমার বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি উঠবে না তো?

—বাবা কোনো আপত্তি করবেন না, তবে মা করবেন। উনি আমার এইসব কাজ একেবারেই পছন্দ করেন না।

—সেটা তুমি ম্যানেজ করে নিও।

—তা নেব। তবে আমি ঠিক কোন অধিকারে ওখানে উপস্থিত থাকব? যাঁদের আপনি জেরা করবেন, তাঁরা তো আপত্তি করতে পারেন।

—সেটা আমি ম্যানেজ করব। তবে, তোমার যদি অস্বস্তি হয়, তুমি তোমার প্রশ্নগুলো আমাকে একটা চিরকুটে লিখে দেবে, আমি সেগুলো ওদের জিগ্যেস করব।

—সেটা ভালো কথা। আমি মূল প্রশ্নগুলো খাতায় লিখে আপনাকে দিয়ে দেব। আর তার ওপরেও যদি কোনো জিজ্ঞাস্য থাকে সেগুলো আলাদা করে আপনাকে লিখে দেব।

—তাই হবে। আর ইতিমধ্যে শশীশেখরবাবু আর তাঁর স্ত্রীর ব্যাকগ্রাউন্ডটা চেক করা হয়ে যাবে।

শশীশেখর হাত নেড়ে বললেন— ভালো রে ভালো। সাগরকে ডেকে এনে দেখছি মহা উপকারই করল আমার পুত্র। কোথাও কিছু নেই, মাঝখান থেকে পুলিশ আমারই পেছনে পড়ে গেল। তাও আবার খুনের দায়ে। আচ্ছা গুরুদাসবাবু, সাগরকে যে আপনি এতটা পাত্তা দিচ্ছেন, সেটা কী খুব আইনসংগত হচ্ছে? আপনার ওপরওয়ালারা কি এটা ভালো চোখে দেখবেন?

—আমার ওপরওয়ালারা জানতেই পারবেন না। আসলে কী জানেন, সাগরের বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে। আমি দেখতে চাই ও কতদূর যেতে পারে। তা ছাড়া, এটা একটা খুনের ব্যাপার। এখানে আমার প্রিন্সিপল হল, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পেলেও পাইতে পারো অমূল্যরতন। আমার মনে হচ্ছে, এই ছেলেটি একটি অমূল্যরতন।

অমূল্যরতন সহাস্যে বলল— ছাই আবার কোথায় দেখলেন, স্যার?

কুড়ি তারিখে আলোচনা শেষ হল প্রায় একটার সময়।

গুরুদাস বললেন— কিছু বুঝলে, সাগর?

সাগর বলল— ছাড়া-ছাড়াভাবে বুঝেছি। সবটা সাজাতে দিনদুয়েক ভাবতে হবে। তারপরে আপনার সঙ্গে বসব।

—সেই ভালো। আমিও কিছুটা বুঝেছি। দেখি, তোমার সঙ্গে মেলে কি না।

তিনদিন পরে শশীশেখরবাবুর বাড়ির বসবার ঘরে কথাবার্তা শুরু হল। শশীশেখর, গুরুদাস আর সাগর ছাড়া সেখানে উপস্থিত ছিলেন শশীশেখরবাবুর স্ত্রী অনুরাধা আর অর্ণব।

গুরুদাস বললেন— শশীশেখরবাবু আর মিসেস লাহিড়ির ব্যাপারে যেটুকু জানতে পারা গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে যে ছাত্রজীবনে দু-জনেই বেশ ভালোভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শশীশেখরবাবু আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন আর বারদুয়েক হাজতবাসও করেছেন। তবে মিসেস লাহিড়ির সেরকম কোনো রেকর্ড অবশ্য পাওয়া যায়নি। এটা এমন কোনো ঘটনা নয় যাতে তাঁকে কেউ ব্ল্যাকমেল করতে পারে। এরপর, হিমাদ্রিশেখর। রগচটা বলে তাঁর ছাত্রমহলে বদনাম থাকলেও, তাঁর কোনো ক্রিমিনাল ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। প্রতিমাও তথৈবচ। ইনিও তাঁর দাদার মতো রগচটা। তবে, উনি যে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে ছিলেন, তাঁরা কখনোই পটাশিয়াম সায়ানাইড ব্যবহার করে না। বলা যেতে পারে যে নরহত্যা করবার মতো মানসিকতার ইতিহাস এঁদের নেই। তবে, ইংরেজিতে যাকে বলে 'আন্ডার এক্সট্রিম প্রোভেকেশন' তাঁরা যে এরকম কিছু করতে পারেন না, সে কথা জোর করে বলা যায় না।

অনুরাধা বললেন— আর চন্দ্রশেখর?

—সে একটা নামকাটা সেপাই। হেন ক্রাইম নেই যা সে করেনি বা করতে পারে না। পুলিশ তাকে ধরবার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারেনি। প্রত্যেকবারই সে পাঁকাল মাছের মতো পিছলে বেরিয়ে গেছে। এইবার, সাগর, তুমি বলো যে কুড়ি তারিখের আলোচনায় ওরা যা-যা বলেছেন তাতে কোন ব্যাপারটা তোমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

সাগর বলল— একটা তো নয়, অনেকগুলো ব্যাপারই আমার কাছে অত্যন্ত দরকারি বলে মনে হয়েছে।

—যথা?

—প্রথমত, চন্দ্রশেখরের ব্যাবসায় ইদানীং অত্যন্ত মন্দা যাচ্ছিল। পুলিশের উপদ্রব এবং অন্যান্য কারণে তার চিত্তে সুখ ছিল না। ফলে, আগে তিনি বাড়িতে যদিও সবসময়ে খুব হাসিখুশি থাকতেন, কিন্তু কিছুদিন যাবৎ খুব গম্ভীর আর চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। হয়তো এই জন্যেই তাঁর বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ না-হলেও কমে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, ঘটনার দিন আটটা নাগাদ তিনি ব্রেকফাস্ট খেয়েছিলেন আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী তাঁর মৃত্যু ন-টার সময়। তৃতীয়ত, সেদিন সকাল থেকেই প্রচণ্ড গরম পড়েছিল। চতুর্থত, ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময়, তাঁর কাছে ঘন্টু নামের একটি লোক এসেছিল। লোকটি তাঁর বিজনেস পার্টনার মধুকর মণ্ডলের সাগরেদ, মাঝে-মাঝেই সে তাঁর কাছে আসত। তাঁদের রান্না আর খাওয়ার জায়গা বরান্দার একটি ঘেরা অংশে। উনি সেখান থেকে ঘন্টুকে নিয়ে শোওয়ার ঘরে চলে যান। মিনিটদুয়েক বাদে বেরিয়ে আসেন হাসতে হাসতে। এসে বলেন, 'যাক বাবা,বাঁচা গেল। এবার দেখব, ব্যাটা আর কতদিন রোয়াবি দেখাতে পারে।' আর সব শেষে, চন্দ্রশেখর আজকাল একটা অদ্ভুত পেটের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন, কোনো ডাক্তারই সেটা সারাতে পারছিলেন না।

ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গুরুদাস বললেন— সেদিন যে খুব গরম পড়েছিল, এটাও তোমার মতে একটা খুব প্রয়োজনীয় তথ্য? তুমি কি বলতে চাও, সেদিন গরম না পড়লে চন্দ্রশেখর খুন হতেন না।

—না, আমি তা বলতে চাই না। সেদিন গরম না পড়লে, রহস্যটা এতটা জটিল হত না।

—বটে? যাহোক, তুমি একের-পর-এক তোমার পয়েন্টগুলো ব্যাখ্যা করে বলো।

—বেশ। প্রথমে ধরা যাক চন্দ্রশেখরবাবুর ব্যাবসার কথা। তাঁর কাজ ছিল, প্রথমত লোক ঠকিয়ে টাকা রোজগার করা। পুলিশ তাঁকে ধরতে পারেনি, তাঁর গতিবিধিও বন্ধ হয়নি। তাহলে তাঁর রোজগারপাতি কমে গিয়েছিল কেন? এর জন্যে কী পুলিশের ঝামেলা দায়ি, না অন্য কোনো কারণ?

গুরুদাস বললেন— একটা কারণ হতে পারে তাঁর দলের মধ্যে গণ্ডগোল। দলের যে মদত তাঁর পাওয়ার কথা, তা সে পাচ্ছিল না।

—ঠিক তাই। এরপর দেখুন, ব্রেকফাস্ট খাওয়ার সময়, ঘন্টু নামক একটা লোক এসেছিল। খাওয়া বন্ধ করে তাকে নিয়ে চন্দ্রশেখরবাবু ঘরে চলে যান। সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন হাসতে হাসতে। তার মানে, ঘন্টু তাঁকে এমন কিছু দিয়েছিল যা তাঁকে খুশি করেছিল। সেটা, ধরে নেওয়া যেতে পারে, দশহাজার টাকা যা গুনবার সময় তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর টাকার টানাটানি চলছে। বাড়িতে আগে থেকে গুনে না-রাখা দশহাজার টাকা না-থাকাই স্বাভাবিক। ঘন্টুই যে সেই টাকাটা এনে দিয়েছিল, তাতে সন্দেহ থাকে না। কোত্থেকে এল সেই টাকা?

—তুমি কি সেটাও ধরতে পেরেছ?

—ঠিক ধরতে পেরেছি কি না জানি না, তবে অনুমান করতে পারি।

—কী করে অনুমান করলে?

—চন্দ্রশেখরবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে যে মন্তব্য করেন, তার থেকে। উনি বলেছিলেন, 'যাক বাবা, বাঁচা গেল। এবার দেখব, ব্যাটা আর কতদিন রোয়াবি দেখাতে পারে।' 'যাক বাবা, বাঁচা গেল' থেকে বোঝা যায় যে ঘন্টু তাঁকে যে টাকা দিয়ে গেছে সেটা তাঁর খুব দরকার ছিল। আর 'এবার দেখব, ব্যাটা আর কতদিন রোয়াবি দেখাতে পারে' থেকে অনুমান করা যায় টাকাটা যে ব্যাটার কাছ থেকে এসেছে তাঁর রোয়াবি চন্দ্রশেখরবাবুর একেবারেই পছন্দ নয়। এই ব্যাটা যে মেসোমশাই সেটা ধরে নেওয়া যেতে পারে। চন্দ্রশেখরবাবু মেসোমশাই-এর কাছে দশহাজার টাকাই দাবি করেছিলেন আর মেসোমশাই-এর স্বচ্ছলতা যে বসাকপাড়ার পরিবার ভালো চোখে দেখে না সেটা আমরা জানি।

—তোমার এই অনুমান কিন্তু কিছু প্রশ্ন ওঠে।

—আমি জানি। আর একটু বিশদভাবে বলি। 'এবার দেখব' কথাটা থেকে দুটো জিনিস বোঝা যায়। প্রথমত, চন্দ্রশেখরবাবু খুব একটা নিশ্চিন্ত ছিলেন না যে টাকাটা আদায় করা যাবে কি না। আর আদায় যখন হল, তখন তিনি বুঝতে পেরে গেলেন যে এবার মেসোমশাইকে দোহন করা যাবে বেশ ভালোভাবে এবং কিছু দিনের মধ্যেই তাঁকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেওয়া যাবে।

গুরুদাস উত্তেজিতভাবে সোফার ওপরে সোজা হয়ে বললেন— কী বলতে চাইছ তুমি?

—আমি বলতে চাইছি যে চন্দ্রশেখরবাবু যখন মাসিমাকে ফোন করেছিলেন তখন তিনি স্থির নিশ্চিত ছিলেন না যে মেসোমশাইয়ের সত্যিই প্রকাশ করার অযোগ্য কোনো অতীত ইতিহাস আছে কি না। টাকাটা পাওয়া যেতে সে ব্যাপারে তাঁর আর কোনো সন্দেহ রইল না। অর্থাৎ কেউ তাঁকে উপদেশ বা পরামর্শ দিয়েছিল মাসিমাকে ফোন করবার জন্য। সে কে হতে পারে?

গুরুদাস দাঁতে দাঁত চেপে বললেন— মধুকর মণ্ডল। সেই ঘন্টুর হাত দিয়ে টাকাটা পাঠায়। সে জানত যে তাঁর পরামর্শটা ভিত্তিহীন, কাজেই সেটা তাঁর নিজের টাকা। আর ঘন্টুই বিষটা চন্দ্রশেখরের হাতে তুলে দেয় আর কোনোভাবে সায়ানাইডের শিশিটা তাঁর টেবিলের ড্রয়ারের মধ্যে রেখে দেয়।

সাগর হেসে বলল— ঠিক তাই। তবে আমার ধারণা, শিশিটা ড্রয়ারের ভেতরে রাখাটা বোধ হয় ওরিজিনাল প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। ঘন্টু নার্ভাস হয়ে ওই ভয়ানক বিষ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের পকেট থেকে বের করে দেওয়ার জন্যই কর্মটি করে।

—নোটগুলোর ওপরে সায়ানাইড ছিল না কেন? মধুকর বোধ হয় জানত না যে চন্দ্রশেখরের জিভ দিয়ে আঙুল ভিজিয়ে টাকা গোনার অভ্যাস আছে কি না, তাই না?

—হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়। মধুকরই গোপনে চন্দ্রশেখরবাবুর পায়ের তলা থেকে মাটি সরিয়ে নিচ্ছিল। তাকে মাঝেমধ্যেই গণ্ডগোলে ফেলছিল যাতে সে ব্যাবসাটা কুক্ষিগত করতে পারে। কিন্তু তাতে দেরি হচ্ছিল বলেই সে অনেক আঁটঘাঁট বেঁধে, নিজের পকেট থেকে টাকাটা পাঠিয়ে, তাঁর বন্ধুকে খুন করে। আমার ধারণা, আপনি খোঁজ নিলে দেখবেন যে সে-ই পুলিশকে খবর দিয়ে ঝামেলাগুলো করাত। পুলিশ কিছু করতে পারেনি তার কারণ তাঁরা সঠিক বা পুরো খবর পেত না। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তা পেলে তো মধুকরও ফেঁসে যেতে পারত। সে শুধু চন্দ্রশেখরবাবুকে দুর্বল করে দিচ্ছিল যাতে তাঁর আত্মহত্যাটা পুলিশ মেনে নেয়।

—বিষটা সে চন্দ্রশেখরকে খাওয়াল কী করে?

—দেখুন, সকাল আটটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট শেষ করে সবাই হাসপাতালে চলে গেল। তখন, চন্দ্রশেখরবাবু ঘরের দরজা বন্ধ করে টাকা গুনতে বসলেন। ন-টা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হল। ঠিক এক ঘণ্টা বাদে। কেন?

শশীশেখর রুদ্ধনিশ্বাসে বললেন— কেন?

—সেটা বোঝা তো কঠিন নয়। মনে রাখতে হবে যে চন্দ্রশেখরবাবু আজকাল এমন একটা অদ্ভুত পেটের যন্ত্রণায় ভুগছিলেন যেটা কোনো ডাক্তারই সারাতে পারছিলেন না। এমন অবস্থায় আমরা কী করি? হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ ট্রাই করি। এই হোমিয়োপ্যাথিক ওষুধ কোনোকিছু খাওয়ার এক ঘণ্টা বাদে খেতে হয়। এটা পাওয়া যায় ছোটো শিশিতে গ্লোবিউলে নয়তো কাগজের পুরিয়ায় সাদা পাউডার হিসেবে। এই পাউডারের সঙ্গে সায়ানাইড মিশিয়ে দেওয়া অত্যন্ত সহজ কাজ। তাই করা হয়েছিল। চন্দ্রশেখরবাবু মধুকরকে সন্দেহ করতেন কি না জানি না। কিন্তু তাঁর দেওয়া মেসোমশাই সংক্রান্ত খবরটা যখন ঠিক প্রমাণিত হল আর তাঁর লোক টাকাটাও এনে দিল, তখন তাঁর পাঠানো ওষুধটা খেতে আর তো কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়।

গুরুদাস বললেন— আচ্ছা, তাই তুমি গরমের কথা বললে? ঘরে জোরে ফ্যান চলছিল। চন্দ্রশেখর মারা যেতে পুরিয়ার কাগজটা তাঁর হাত থেকে পড়ে যায় আর ফ্যানের হাওয়ায় উড়ে চলে যায় খাট বা আলমারির নীচে। ঘর সার্চ করলেও সেটা কারুর নজরেই পড়ত না। বাঃ, বাঃ, চমৎকার। অসাধারণ। আমি ভাবতেই পারিনি... সে যাক। এবার তাহলে আমরা ঘন্টুকে অ্যারেস্ট করার ব্যবস্থা করি?

সাগর হাসল। বলল— তাকে বোধ হয় পাবেন না। সে হয় গা ঢাকা দিয়েছে নয়তো আর ইহজগতে নেই।

—আর মধুকর?

—তাকে হয়তো পাবেন। সে থাকে কোথায়?

—বসাকপাড়াতেই থাকে। গঙ্গার দিকে।

—তাহলে, পাড়ার কোনো হোমিয়ো ওষুধের দোকানে খোঁজ নিলেই জানা যাবে যে ঘন্টু সম্প্রতি সেখান থেকে কোনো ওষুধ কিনেছিল কি না। এর ভিত্তিতে, দেখুন, তাঁর পেটের থেকে কথা বের করতে পারেন কিনা।

গুরুদাস হাজরা হেসে উঠে বললেন— ও তুমি ভেব না। পেটের কথা টেনে বের করাই তো আমাদের কাজ। তাঁর অনেক রাস্তা আছে। সেটা আমি ম্যানেজ করব।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%