পাণ্ডারবাজারের মানুষখেকো বাঘ

মনোজ সেন

সেবছরটা ছিল বোধ হয় উনিশশো পঁয়তাল্লিশ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন শেষ হওয়ার মুখে। ইয়লটা কনফারেন্স হয়ে গেছে, হিটলার তখনও আত্মহত্যা করেননি, অ্যাটম বোমাও ফাটেনি জাপানে। অথচ এরকমই একটা সময়ে, কোথাও কিছু নেই, আমার জীবনে এমন একটা বোমা ফেটেছিল যে আমার একেবারে দফারফা হওয়ার জোগাড় হয়েছিল।

আমি তখন পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টে জুনিয়র ওভারসিয়ার। কাজকর্ম তেমন কিছু নেই। দিনের বেশিরভাগ সময়ই যুদ্ধের বিশদ আলোচনা আর চুলচেরা বিশ্লেষণে কাটে। বেশ একটা গনগনে উত্তেজনা। এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ বড়োসাহেবের ঘরে আমার ডাক পড়ল।

আমার তো আত্মারাম খাঁচা! বড়োসাহেব ক্রিস্টফার গ্রে ছিলেন একজন অতিশয় বিপজ্জনক চরিত্র। আমরা তাঁর নামের পেছনে একটা হাউন্ড জুড়ে দিয়েছিলুম। তাঁর ঘরে ডাক পড়া মানে সর্বনাশ।

আমি তো কাঁপতে-কাঁপতে গ্রে সাহেবের ঘরে ঢুকলাম। সাহেব প্রচণ্ড ভ্রূকুটি করে কী একটা ফাইল দেখছিলেন। আমাকে দেখে মুখ তুলে বললেন— মিস্টার টলাপাট্র, তুমি কি গাড়ি চালাইটে পাড়ো?

গাড়ি। এহেন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের উত্তরে মিনমিন করো বললুম— ইয়েস, স্যার।

—নন্ডডুলাল টাহা হইলে ঠিকই বলিয়াছে। কোঠায় শিখিলে?

অফিসে অড্ডা মারতে মারতে একটু চাল মেরেছি কী মারিনি, অমনি সাহেবের কানে কথাটি তুলে দিয়েছে! মনে মনে নন্দদুলালের বাপান্ত করতে করতে বললুম— ইন বারাসাত, স্যার। মাই ম্যাটার্নাল আঙ্কেল হ্যাজ এ কার। হি টট মি, স্যার।

—লাইসেন্স আছে?

—নো, স্যার।

—ডাসন্ট ম্যাটার। টোমাকে একটা কাজ কড়িটে হইবে। খুবই গোপনীয় কাজ। কালই টোমাকে নর্থ বেঙ্গলে যাইটে হইবে। কাজ শেষ কড়িয়া ফিড়িবে। সব ব্যবসটা আমড়া কড়িয়া ডিব। আর, কাহাড়ও সহিট ইহা লইয়া আলোচনা কড়িবে না।

ভয়ে আমার বুকের রক্ত জল হয়ে গেল। বুঝলুম, যুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো কাজ। জাপানিরা এতদূর এসে গেছে না কি? নাঃ, সাধের প্রাণটা শেষপর্যন্ত জাপানিদের হাতেই গেল। যাব না বলে লাভ নেই, রাইফেলের গুঁতো মেরে পাঠাবে। পালালে ঠিক ক্যাঁক করে ধরে এনে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে দেবে। কাজেই বশংবদের মতো ঘাড় নেড়ে কম্পিতকক্ষে কাজটা কী সেটা জানবার জন্যে অপেক্ষা করতে থাকলুম।

ব্যাপারটা যখন জানা গেল তখন দেখলুম খুব একটা ভীত হওয়ার মতো কিছু নয়। ফলসাগুড়ি চা-বাগানের থেকে মাইলদশেক দূরে পাণ্ডারবাজার বলে একটা গ্রামের কাছে রংকি বলে একটা পাহাড়ি নদী আছে। তার ওপরে নাকি একটা ব্রিজ আছে। পূর্বরণাঙ্গনে রসদ সরবরাহের জন্য মণিপুর পর্যন্ত একটা যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য ফলসাগুড়ি থেকে একটা রাস্তা বানাচ্ছিল ইঙ্গ-মার্কিন সেনাবাহিনী। তারা কোনো একটা মান্ধাতার আমলের ম্যাপ থেকে এই ব্রিজটার কথা জানতে পেরে তার ওপর দিয়ে রাস্তাটা নিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করেছিল। অথচ আমাদের ডিপার্টমেন্ট এই ব্রিজটার রক্ষণাবেক্ষণ করা তো দূরের কথা, তার অস্তিত্বের কথাই জানত না। এখন, আমার কাজ হল, এই ব্রিজটা আদৌ আছে কি না বা থাকলে সেটা কী ধরনের আর তার কী দশা তার তত্ত্বতালাশ করা।

আমাকে প্রথমে যেতে হবে ফলসাগুড়ি চা-বাগানে। সেখানকার ম্যানেজার জন রিঙ্গার সাহেবকে বলে দেওয়া আছে। তিনি আমাকে একটা গাড়ি দেবেন। সেটা নিয়ে ভোররাত্রে বেরিয়ে আমাকে যেতে হবে পাণ্ডারবাজারে। পথে যদি কোনো ব্রিজ দেখা যায় তো ভালো, নইলে পাণ্ডারবাজারের লোকজনকে জিজ্ঞাসা করে তার খোঁজখবর নিতে হবে। তারপর, রাতের অন্ধকারে ফলসাগুড়িতে ফিরে আসতে হবে।

রিঙ্গার সাহেব ব্যাপারটা জানেন। তিনি তাঁর ড্রাইভারকে পাঠিয়ে খবরটা নিতে পারতেন কিন্তু সে লোকটাকে তিনি একেবারেই বিশ্বাস করেন না। তাই তিনি তাকে ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। যে কারণে আমাকে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। গাড়ি চালাতে পারে অথচ বিশ্বাসযোগ্য এরকম কাউকে না কি আর আমাদের ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যায়নি।

রিঙ্গার সাহেব যে গাড়িটা দিলেন সেটা ১৯৪০ সালের অস্টিন। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, প্রায় একটা ট্যাঙ্কের মতো শক্তপোক্ত বাহন। সে-যুগে পাহাড়ি অঞ্চলে এই গাড়িটাই বেশি ব্যবহৃত হত।

রওনা হওয়ার সময়, রিঙ্গার সাহেব আমকে একটা দু-নলা বন্দুক দিলেন। আমি বন্দুক চালাতে জানি না শুনে বললেন যে তাতে কিছু যায় আসে না, হাতে বন্দুক আছে দেখলে নেটিভরা সম্ভ্রম করবে, ভয় পাবে আর ইচ্ছে থাকলেও কোনো ক্ষতি করতে সাহস পাবে না।

সেটাই হল যত গণ্ডগোলের মূল।

পাণ্ডারবাজার পর্যন্ত নির্বিঘ্নে যাওয়া গেল। রংকি নদীর ধার দিয়ে-দিয়েই রাস্তা। চারদিকে গভীর জঙ্গল, একপাশে রংকি, সব মিলে মনোরম সব দৃশ্য। পথে ব্রিজ-ট্রিজ কিছুই নজরে পড়ল না। বেলা বারোটা নাগাদ পাণ্ডারবাজারে গিয়ে পৌঁছলুম।

পৌঁছনো মাত্র একদল গ্রামের লোক আমার গাড়িটা ঘিরে ফেলল। সবাই মিলে চ্যাঁচাচ্ছে, কী বলছে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাদের যে কোনো একটা ব্যাপারে ভয়ানক ক্ষোভ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু ক্ষোভটা যে কীসের সেটা বোঝে কার সাধ্যি! আমি তখন বন্দুকটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলুম।

বন্দুক দেখে ভয় পাওয়া তো দূরস্থান, লোকগুলো অত্যন্ত উল্লসিত হয়ে উঠল। আমি তো অবাক।

যাই হোক, কিছুক্ষণ বাদে যা জানতে পারলুম, তাতে আমার আক্কেলগুড়ুম।

ঘটনাটা হচ্ছে সম্প্রতি একটা বাঘ ওই অঞ্চলে ভয়ানক অত্যাচার শুরু করেছে। মানুষ এখনও মারতে আরম্ভ করেনি বটে, কিন্তু তার বেশি দেরি নেই। এইতো কিছুদিন আগে একটি রাখাল ছেলে বনের কাছে একপাল মহিষ চরাচ্ছিল। বাঘটা হঠাৎ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঘটা অবশ্য বিশেষ কোনো ক্ষতি করতে পারেনি, কারণ মহিষগুলো শিং বাগিয়ে তাকে তাড়া করতেই সে ল্যাজ তুলে পালায়।

গ্রামের মোড়ল বললেন— সেদিন পালিয়েছে বলে যে ভবিষ্যতেও পালাবে, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। মানুষকে যে আক্রমণ করেছে, সেটাই বড়ো কথা। তাই আমরা বনদপ্তরকে চিঠি দিয়েছিলুম যাতে তারা শিকারি পাঠিয়ে বাঘটার একটা ব্যবস্থা করে। আপনিই তো সেই শিকারি?

আমি জিজ্ঞাসা করলুম— শিকারির কী দরকার? আপনারা তো নিজেরাই ফাঁদটাঁদ পেতে বাঘটাকে ধরে ফেলতে পারেন।

মোড়ল মাথা নেড়ে বললেন— আজ্ঞে না। তা করলে বনদপ্তরের সাহেবরা এসে আমাদের হাঁড়ির হাল করে ছাড়বে। সাহেবরা এদেশে আসবার আগে, আদ্যিকাল থেকে আমাদের বাপঠাকুরদাদারা তাই করে এসেছেন বটে, কিন্তু এখন তা আর করা যায় না। শোনেননি, এক-একটা বাঘ আড়াইশো-তিনশো করে মানুষ মারছে, আর গাঁয়ের লোকেরা মাইলের-পর-মাইল পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে ছুটতে ছুটতে গিয়ে কাঁদতে-কাঁদতে সাহেব শিকারির পায়ে ধরে তাকে ডেকে আনছে বাঘ মেরে তাদের বাঁচাতে? ভাগ্যিস সাহেবরা আছে, নইলে আমাদের গ্রামের-পর-গ্রাম উজাড় হয়ে কবেই বাঘের পেটে চলে যেত সবাই। কাজেই আমরা কিছুতেই আপনাকে ছাড়ব না। আপনাকেই বাঘ মেরে দিয়ে যেতে হবে।

আমি বললুম— মশায়, আমি শিকারি-টিকারি নই। সাহেবও নই। আমি পি ডব্লিউ ডি-র ওভারসিয়ার, এসেছি একটা ব্রিজের খোঁজে। আমার পক্ষে বাঘ মারা অসম্ভব ব্যাপার। জীবনে কোনোদিন একটা ইঁদুরও মারিনি তো বাঘ! আমি এখন ফিরে যাই। ফলসাগুড়িতে পৌঁছিয়েই একজন নির্ভেজাল সাহেব শিকারি পাঠিয়ে দেব। শুনেছি, রিঙ্গার সাহেব মস্ত শিকারি। গণ্ডা গণ্ডা বাঘ মেরেছেন। তাঁকে বললে, মহা খুশি হয়ে তিনিই হয়তো চলে আসবেন।

মোড়ল পুনরায় মাথা নেড়ে বললেন— তা হবে না। আপনি শিকারি কী শিকারি না, তা আমরা জানি না। আপনি যখন গাড়ি করে এসেছেন, আর হাতে বন্দুক রয়েছে, তখন আপনিই আমাদের সাহেব শিকারি। আপনাকেই বাঘ মারতে হবে।

আমি বললুম— কী মুশকিল! আমার গায়ের রংটা দেখেছেন? আমি কখনো সাহেব হতে পারি? আর, হাতে বন্দুক রয়েছে, তো কী হয়েছে? আমি কোনোদিন বন্দুক চালাইনি। বন্দুকের কোন দিক দিয়ে গুলি বেরোয়, তাই ভালো করে জানি না। কাজেই আমি এখনই ফিরে যাব।

তখন ভিড়ের ভেতর থেকে একটা ষণ্ডামতন লোক একটা দা হাতে এগিয়ে এল। চোখ পাকিয়ে বলল— আপনি যদি বাঘ মেরে দিয়ে না-যান, তাহলে আপনার গাড়িতে আমরা আগুন লাগিয়ে দেব আর আপনাকে কুচিকুচি করে কেটে ওই রংকিরা জলে ভাসিয়ে দেব।

আমি কাষ্ঠহাসি হেসে বললাম— না, না, অত কিছু করবার কোনো দরকার নেই। বাঘ মারতে হবে তো? এ আর এমন কী বেশি কথা?

মনে মনে বললুম— এই আমার কপালে ছিল শেষপর্যন্ত।

আমার কথা শুনে সবাই একসঙ্গে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। বললুম— তা বাঘটা কোথায় আছে? কোথায় মারতে হবে?

মোড়ল বললেন— বাঘ তো আর আমাদের কাছে তার ঠিকানা রেখে যায়নি। তবে সে আসবে। রাত্রি বেলা আমরা গাঁয়ের ভেতরে একটা ছাগল বেঁধে রাখব। তাকে খেতে বাঘ আসবে। আপনি তখন তাকে গুলি করবেন। সব ব্যবস্থা আমরা করে দেব। এখন আমাদের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করুন। চাই কী দুপুরে একটু গড়িয়েও নিতে পারেন।

রাত্রি বেলা? বলে কী? আমাকে তো আজ রাত্রের মধ্যেই ফলসাগুড়ি পৌঁছতে হবে। না-হলে চাকরি নট। কিন্তু সে কথা বলি কাকে? এগুলে রামে মারবে, পেছুলে রাবণে মারবে। আপাতত প্রাণটা তো বাঁচাই। আমি আড়চোখে দা-ওয়ালা লোকটার দিকে চেয়ে বললুম— ঠিক আছে, তাই হবে।

দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা মন্দ ছিল না। কিন্তু খাওয়া কী যায়? আমার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে এমন ধড়ফড় করছিল যে প্রায় কিছুই সেখানে দিয়ে আর নামল না। যাই হোক, ভোজনপর্বটা শেষ হলে মোড়লের দাওয়ায় এসে বসলুম।

মোড়ল একটা ছোকরা ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। বললেন— এর নাম রাজু, এ আপনাকে সব ব্যাপারে সাহায্য করবে। ওর তিনকুলে কেউ নেই, পড়াশুনোয় লবডঙ্কা, দিনরাত জঙ্গলের ভেতরে ঘুরে বেড়ায়। তাই জঙ্গলের হাড়হদ্দ ওর নখদর্পণে। বাঘ কখন কোন রাস্তায় চলে তা ওর চেয়ে ভালো এ-তল্লাটে কেউ জানে না। আপনার ওই রিঙ্গার সাহেব শিকার করতে এলে রাজুই ওঁকে জঙ্গলে নিয়ে যায়, মাচা বেঁধে দেয়, ঠিক জায়গায় টোপ বেঁধে রাখে। রিঙ্গার সাহেব তো পায়ের শব্দ শুনে বাঘ আসছে না হাতি আসছে তার কিছুই বুঝতে পারেন না। রাজুই ওঁকে সব বলে-টলে দেয়। কোনদিকে বন্দুক তাক করতে হবে, তাও বলে দেয়। কাজেই ও সঙ্গে থাকলে আপনার বিশেষ চিন্তা করবার দরকার নেই।

রাজুকে দেখে আমার কিন্তু চিন্তা বেড়েই গেল। এই কাটা হাফপ্যান্ট আর ছেঁড়া গেঞ্জি পরা রোগা ছেলেটা আমার যে কী কাজে লাগবে আমি তো বুঝে উঠতে পারলুম না। ঠিক তখনি আর-একটা ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে মোড়লমশাই-এর পায়ের কাছে ধড়াস করে পড়ে গেল। আমি আঁতকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালুম।

ব্যাপারটা কী? জানা গেল, ব্যাপার অত্যন্ত গুরুতর। আজ সকালে ছেলেটি শহর থেকে কিনে আনা সবুজ গুঁড়ো সাবান দিয়ে রংকি নদীতে পাথরের ওপর আছড়ে-আছড়ে কাপড় কাচছিল। হঠাৎ বাঘটা হালুম করে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে অবশ্য তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। তার কারণ, সাবানের ফেনায় পেছল পাথরের ওপর পড়ে পা পিছলে সেটা হুড়মুড় করে রংকির ভেতরে পড়ে যায়। কোনোরকমে সাঁতরে নদীর অন্য পাড়ে উঠে সে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে যায়। তারপরে আর তাকে দেখা যায়নি।

আহত বাঘ এইভাবেই নরখাদকে পরিণত হয়। অতএব, আমি ছেলেটিকে ভবিষ্যতে সাবানের ব্যবহার সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করার ব্যাপারে একটা ছোটোখাটো লেকচার দিয়ে ফেললুম। ছেলেটি হাঁ করে শুনল, কী বুঝল তা সে-ই জানে।

মোড়লমশাই বললেন— দেখেছেন তো, কী অবস্থায় আছি আমরা? বলে, নবাগত ছেলেটিকে নিয়ে কোথায় যেন চলে গেলেন। রাজু তখন আমার পাশে বসে আমার মুখের দিকে চেয়ে ফিকফিক করে হাসতে শুরু করল।

মহা অস্বস্তিকর ব্যাপার। একটু বাদে বললুম— অ্যাই, হাসছিলি কেন রে?

শুনে ছেলেটা হিহি করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল— তুমি গনাকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়েছিলে, তাই না? গনার চেহারাটাই ওরকম, আসলে ও কিন্তু বেজায় ভীতু। ছাগল দেখলে হাঁটু বেঁকে যায় আর দিনের বেলাতেও ভূতের ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে।

আমি বেজার হয়ে বললুম— যেরকম দা হাতে তেড়ে এসেছিল, তাতে ভয় পাব না?

রাজু বলল— সে যাকগে। এখন বলোতো তোমার মতো দিশি সাহেব নয়, আসল সাহেবদের দেশে কি মেলা বাঘ? তারা শুনি, মাটিতে দাঁড়িয়ে তেড়ে আসা বাঘকে এক গুলিতে মেরে ফেলে। আমরা যারা চোদ্দোপুরুষ বাঘের সঙ্গে পাশাপাশি বাস করছি, সেই আমরাই বাঘের সামনে পড়লে নড়তে পারি না। তাবড়-তাবড় সাহসী লোকও বাঘের গর্জন শুনলে অজ্ঞান হয়ে যায়। সেখানে সাহেবরা এত বড়ো বাঘশিকারি হয় কী করে? ওদের নিশ্চয়ই ছোটোবেলা থেকে বাঘ মেরে-মেরে হাত পাকানো, তাই না?

বললুম— সাহেবদের দেশে বাঘের একটা ন্যাজও দেখতে পাবিনে তুই। ওখানে আছে ছোটো-ছোটো লাল-লাল শেয়াল। সেই একটা শেয়াল মারতে বিশ-পঁচিশজন সাহেব, ষাট-সত্তরটা ডালকুততা নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বন্দুক বাগিয়ে শিঙে ফুঁকতে-ফুঁকতে শিকার করতে যায়। তবে কি না, ওরা হলগে সাহেব। তাই আমাদের দেশে এসে ওরা মাটিতে দাঁড়িয়ে বাঘ মারে আর তাই নিয়ে মোটা মোটা বই লেখে। রিঙ্গার সাহেবও লিখেছেন, তবে তোর কথা কোথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করেননি। দ্যাখ, বাঘগুলোও তো আসলে নেটিভ, ভীতুর ডিম, তাই সাহেব দেখলে ওরাও নেতিয়ে পড়ে। আমাকে দেখলে তো তা হবে না, বরং হাঁউমাউ করে তেড়ে আসবে।

শুনে ছেলেটা আবার হাসতে শুরু করল। বলল— কোনো ভয় নেই। কী করতে হবে তা আমি সব বলে দেব।

পাণ্ডারবাজার গ্রামটার মাঝখানে একটা বড়ো ফাঁকা জমি, তার চারদিকে কুঁড়েঘর। রংকি নদীর ধার দিয়ে চলা মূল রাস্তা থেকে একটা পথ এসে সেই জমিতে পড়েছে। বিকেল বেলা ওই জমির ওপরে একটা খোঁটা পুঁতে মোড়লমশাই-এর একটা ছাগল বাঁধা হল। তার সামনে একগাদা পাতাসুদ্ধু ডালপালা রাখা হল। ছাগলটা পরমানন্দে শুয়ে শুয়ে সেই পাতা খেতে লাগল। সব ব্যবস্থা করে দিনের আলো থাকতে-থাকতেই যে যার ঘরে চলে গেল।

আমি মোড়লমশাই-এর দাওয়ার ওপরে বন্দুক নিয়ে বসলুম। রাজু একটা বড়োসড়ো দা দিয়ে অনেকগুলো কাঁটাঝোপ কেটে নিয়ে দাওয়ার চারদিকে পেতে দিল যাতে চট করে বাঘ এসে আমার ঘাড়ে না পড়তে পারে। পেছনের একটা দরজা খুলে রাখল যাতে বিপদ বুঝলে টুক করে ভেতরে ঢুকে পাল্লা বন্ধ করে দেওয়া যায়। এইসব কাজ শেষ করে দা হাতে আমার পাশে বসে পড়ল। বলল— সিগারেট খাবে না আর বকরবকর করবে না।

সন্ধে গড়িয়ে নিস্তব্ধ গ্রামের ওপর নিকষ কালো রাত নামল। চারদিকে কোনো শব্দ নেই, মাঝে মাঝে শুধু জঙ্গল থেকে ভেসে আসা কোনো নিশাচর পাখির কর্কশ ডাক শোনা যাচ্ছিল। দু-একটা জন্তু-জানোয়ারের ডাকও শোনা গেল তবে তারা যে কী জন্তু তা আমি কিছুই বুঝতে পারলুম না। খানিক বাদে দ্বাদশীর চাঁদ উঠল। তাতে করে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারটা কিছুটা কেটে গেল। তখন দেখি, ছাগলটা খাওয়া বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়েছে আর ভয়ে ভয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।

রাজু আমার কানে ফিসফিস করে বলল— বাঘ চলতে শুরু করেছে।

শুনেই আমার বুক আর পেটের মধ্যে কেমন যেন গুড়গুড় করে উঠল আর তৎক্ষণাৎ খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে চলে যাওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছে হল। কিন্তু রাজু বসে থাকবে আর আমি পালিয়ে যাব, এতে আমার বিবেক সায় দিল না। ভাবলুম, যা হয় হবে। হয় এস্পার নয়তো ওস্পার।

হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, ছাগলটা তারস্বরে ভ্যা ভ্যা করে ডাকতে আরম্ভ করল। সে কী ভয়ংকর ভ্যাভ্যাকার। কান ফেটে যায় আর কী! থামেই না। মোড়লমশাই-এর ছাগল তো, আর তেমনি গলা। কিছুক্ষণ বাদে আমার কান-মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। গ্রামের ভেতর থেকেও কয়েকটা উঃ আঃ শুনতে পেলুম।

তারও কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ দেখি কালো ছায়ার মতন কী একটা গুড়ি মেরে ছাগলটার দিকে এগিয়ে চলেছে। হলদেটে চাঁদের মরা আলোয় সেটা যে কী তা বুঝতে পারলুম না। কোত্থেকে যে তার উদয় হল, তাও বোঝা গেল না। সেটা যখন ছাগলটার বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে, আমি কম্পিত হস্তে বন্দুক তুলে দড়াম করে গুলি চালিয়ে দিলুম।

তৎক্ষণাৎ অনেকগুলো ঘটনা একসঙ্গে ঘটে গেল। ছাগলটার ভ্যাভ্যাকার বন্ধ হয়ে গেল, কালোছায়াটা আকাশ সমান লাফ দিয়ে উঠে দু-পায়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে গ্রামের ভেতরে চলে গেল আর আমি বন্দুকের ধাক্কায় চিতপাত হয়ে পড়ে গেলুম।

ঘোর যখন কাটল, দেখি রাজু মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে হাসছে আর গ্রামের ভেতর থেকে একদল লোক উত্তেজিতভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে মশাল-টশাল জ্বেলে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের হাবভাব দেখে মনে হল, তাদের উদ্দেশ্য ওই লাঠিসোঁটাগুলো আমার পিঠেই প্রয়োগ করা।

ইতিমধ্যে মোড়লমশাই বেরিয়ে এসেছেন। তিনি তাড়াতাড়ি জনতার দিকে এগিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন কয়েক জন বয়স্ক গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে। আমি ততক্ষণে ধুলোটুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। মোড়ল মশাই বললেন— করেছেন কী? আপনাকে বলা হল বাঘ মারতে আর আপনি কালুয়ার ঠাকুমাকেই গুলি করে বসলেন! ভাগ্যিস গুলিটা তালগাছের মগডালে লেগেছিল। তা না-হলে যে কী হত কে জানে! রিঙ্গার সাহেব একবার বাঘ মারতে গিয়ে বনবেড়াল মেরেছিলেন। আপনি তো দেখছি রিঙ্গার সাহেবের চেয়েও ওঁচা। এখন যান, ওদের সামলান।

বয়স্ক গ্রামবাসীদের একজন বললেন— একটা ব্যাপার কিন্তু ভারি আশ্চর্য। কালুয়ার ঠাকুমা তো বাতের ব্যথায় বেঁকে গেছে, ভালো করে হাঁটতেই পারে না। সে যে অমন একটা লাফ মেরে অত জোরে দৌড়তে পারে, সেটা কোনোদিনই কল্পনাই করিনি!

আর একজন বললেন— যা বলেছেন। আর একটা কথা। কালুয়ার ঠাকুমা তো জানতুম বন্ধ কালা. আমি যখনই আমার সাড়ে পাঁচটাকা ফেরত দিতে বলি, কিছুই শুনতে পায় না। অথচ ওই হতচ্ছাড়া ছাগলের ডাকে নাস্তানাবুদ হয়ে তার মুখ বাঁধবার জন্যে এখানে চলে এল।

এই কথার মধ্যে হঠাৎ জনতার কোলাহল বন্ধ হয়ে গেল। দেখি, সকলে স্তব্ধ হয়ে গ্রামে ঢোকার পথটার দিকে সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। আমি, রাজু, মোড়লমশাই আর বাকি সকলে গিয়ে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ালুম। দেখা গেল, পথ দিয়ে একটা পূর্ণবয়স্ক বাঘ একটু খোঁড়াতে খোঁড়াতে গ্রামের দিকেই আসছে। এতগুলো লোক যে মশাল জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে সে ব্যাপারে তার কোনো ভ্রূক্ষেপও নেই।

কে যেন আমার কানে কানে বলল— হাঁ করে দেখছেন কী? বাঘটাকে মারবেন তো।

আমি তাড়াতাড়ি আবার কাঁপতে কাঁপতে বন্দুকটা তুলতেই রাজু হুংকার দিয়ে উঠল— খবরদার! এক্ষুনি বন্দুক নামাও। গুলি চালালে দা দিয়ে তোমার মুণ্ডুটা কেটে ধড় থেকে নামিয়ে দেব।

এরকম ভয়ংকর কথা শুনে আমি তক্ষুনি বন্দুক নামিয়ে নিলুম। রাজু তখন রাখাল ছেলেটা আর কাপড়কাচা ছেলেটাকে চিৎকার করে ডেকে বলল— তোরা কী গাধা না কি রে? পিকপিক কে চিনতে পারলি না? ওটা তো পিকপিক। তোদের সঙ্গে খেলতে এসেছিল!

বলামাত্র তিনজনে তিরবেগে ছুটে বাঘটার কাছে চলে গেল। তারপরে যা শুরু হল। তিনটে ছেলে আর বাঘটা মিলে জড়াজড়ি করে মাটির ওপরে গড়িয়ে পড়ল। তাই দেখে গ্রামের লোকেরা মাটিতে মশালগুলো পুঁতে লাঠিসোঁটা ছুড়ে ফেলে দৌড়ে গিয়ে ওদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।।

মোড়লমশাইও যাচ্ছিলেন। আমি ওঁর হাত ধরে আটকে জিজ্ঞাসা করলুম— এসব কী হচ্ছে বলুন তো?

মোড়লমশাই বললেন— আরে, ওটাতো আমাদের চেনা বাঘ। ওর জন্মের কয়েক দিন বাদেই ওর মা এক সাহেবের গুলিতে মারা যায়। সে আজ থেকে বছরছয়েক আগেকার ঘটনা। ও তখন খাবারের সন্ধানে আমাদের এই গাঁয়ে এসে ঢোকে। ছোট্ট একটা বেড়ালছানার মতো বাচ্চা। রাজুর তখন বছরদশেক বয়েস। সে ওকে পালতে শুরু করে। ওর তখন গলা দিয়ে পিকপিক করে আওয়াজ বেরুত, তাই ওর নাম রাখা হয়েছিল পিকপিক। ভারি মজার ছিল, সব্বার সঙ্গে খেলে বেড়াত। যখন বছরতিনেকের হল, তখন রাজু ওকে কাঁদতে কাঁদতে গভীর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এল। তারপর যে কোথায় চলে গিয়েছিল জানি না। আজ আবার ফিরে এসেছে।

আমি বললুম— ওটা কিন্তু আহত বাঘ। দেখছেন না খোঁড়াচ্ছে? আহত বাঘ কিন্তু ভীষণ মারাত্মক।

—দূর মশাই! মারাত্মক না কচু। আজ সকালে আছাড় খেয়েছিল, তাই একটু খোঁড়াচ্ছে।

—ওটা যে পিকপিকই তা বুঝলেন কী করে? ওর গায়ে কী নাম লেখা আছে? অন্য বাঘও তো হতে পারে।

—শোনো কথা। আপনি তো দেখছি রিঙ্গার সাহেবের চেয়েও... সে যাকগে। আপনার গায়ে কী নাম লেখা আছে না কি? তাহলে আপনার গিন্নি আপনাকে চেনেন কী করে? আমরা বনের মধ্যে থাকি। বাঘ তো দূরের কথা, আমরা প্রত্যেকটা কাঠবিড়ালীকে আলাদা আলাদা করে চিনি। আপনার যেমন নাক-চোখ-মুখ-কান আছে, ওদেরও তাই আছে, বুঝলেন? রাজুর চোখের জোর খুব বেশি তাই এত দূর থেকে পিকপিককে চিনতে পেরেছে। ও আর একটু কাছে এলে আমরাও পারতুম।

আমি বললুম— ভাগ্যিস গুলিটা চালাইনি। চালালে যে কী হত, কে জানে।

মোড়ল বললেন— কিছুই হত না। বড়োজোর, ওই বাদামগাছটার ওপরে ঘুমিয়ে থাকা একটা বাঁদরের ন্যাজ ফুটো হয়ে যেত। তার বেশি কিছু নয়। এখন যাই, আমিও পিকপিককে আদর করে আসি।

মোড়লমশাই চলে গেলেন। হলদে চাঁদের মরা আলোয় ফাঁকা জমির ওপরে আমি আর ছাগলটা হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলুম।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%