মনোজ সেন

পর্যটকরা বাস থেকে নামতেই তাঁদের অভ্যর্থনা করবার জন্য টুরিস্ট অফিসার এগিয়ে এলেন। লম্বা-চওড়া-টাকমাথা-মাঝবয়েসি ভদ্রলোক, পরনে রংচঙে বুশশার্ট আর সাদা ট্রাউজার্স, মুখে ভুবনমোহন হাসি। কেতাদুরস্তভাবে হাত নেড়ে বললেন— টুরিস্ট ডিপার্টমেন্টের পক্ষ থেকে আপনাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি হরিসিং রাঠোর, আপনাদের টুরিস্ট অফিসার। আপনাদের এই বাঘেলাগড় দুর্গ দেখাবার দায়িত্ব আমার।
বলে খুব বিনীতভাবে সবাইকে নিয়ে অফিসে ঢুকলেন।
নিজের টেবিলে বসে হরিসিং বললেন— আপনারা ওয়েস্ট বেঙ্গল থেকে এসেছেন, কাজেই আপনাদের সবকিছু বেশ বিস্তারিতভাবে দেখাতে হবে। ফাঁকি দিলে চলবে না। এই দুর্গের শুধু দ্রষ্টব্যগুলো দেখালেই তো হবে না, তার রাজবংশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও শিল্পকলার ইতিহাস, এসবও তো জানাতে হবে। তা, এই ব্যাপারে যিনি সবচেয়ে অভিজ্ঞ, তাঁকেই আপনাদের গাইড হিসেবে দিচ্ছি। এর পরিবার বংশানুক্রমে এই দুর্গেই বাস করে আসছেন। কাজেই, এই দুর্গের সবকিছু তাঁর নখদর্পণে। ওই যে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, উনিই আপনাদের গাইড হবেন— শ্রীবিজয়কুমার মীনা।
বিজয়কুমার ছোটোখাটো, রোগাটে মানুষ, পরনে ধুতি আর ছাইরঙের হাঁটু পর্যন্ত লম্বা একটি অতি প্রাচীন শেরওয়ানি। তবে, তাঁর গালভাঙা মুখে একজোড়া প্রকাণ্ড গোঁফ তাঁর অতীত আভিজাত্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
হরিসিং-এর প্রশংসাবাক্যে বিজয়কুমার কিছুমাত্র পুলকিত হয়েছেন বলে মনে হল না। গম্ভীর মুখে বললেন— আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।
দুর্গটা যেন কেমনধারা। অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। ঘরের ভেতর দিয়ে ঘর, এখানে-ওখানে সরু সরু অন্ধকার সিঁড়ি কোনোটা ওপরে কোনোটা নীচে চলে গেছে, বারান্দা বা করিডরগুলো একটু গিয়েই এদিক-ওদিক বাঁক নিয়েছে। বিজয়কুমার বললেন যে এসবই করা হয়েছিল রাজপরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে। ফলে, সারা দুর্গটাতেই একটা গা-ছমছম করা ভাব। মনে হয় যেন সব ঘরেই ষড়যন্ত্রীরা ফিসফিস করে কথা বলছে নয়তো ওঁত পেতে বসে আছে।
সমস্ত দুর্গটা ঘুরিয়ে বিজয়কুমার তাঁর টুরিস্টদের দল নিয়ে প্রশস্ত একটা বারান্দা পেরিয়ে অন্দরমহলের একতলায় একটা ঘরে এসে ঢুকলেন। বাইরে তখন বিকেল হয়ে এসেছে। কাজেই ঘরের ভেতরে কিছুটা অন্ধকার। ঘরটা চৌকোনা আর বেশ বড়ো। তার নিরেট দেওয়ালে জানলা-টানলা নেই, তবে সমকোণে দুটো দরজা— একটা অবশ্যই বারান্দার দিকে, অন্যটায় মোটা কাঠের কারুকার্য করা পাল্লা বন্ধ করা ছিল। বারান্দার দিকের দরজাটা দিয়েই ঘরের ভেতরে যা আলো আসবার আসছে।
বিজয়কুমার বললেন— এটা মহারানি নন্দাবাই-এর সংগীতকক্ষ। মহারানি কেবল অসাধারণ গানই করতেন না, সংগীত রচনাও করতেন। তাঁর রচিত বহু গান শুধু এই রাজ্যেই নয়, সারাদেশে আজও অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর স্বামী মহারাজ দয়ানাথ সিং তাঁর প্রতিভার সমঝদার ছিলেন। তিনি তাঁর রানির গান এই বাঘেলাগড় দুর্গের বাইরে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এই রাজবংশ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। তাই পর্দানশীন রানির পক্ষে সবার সামনে বসে গান গাওয়া সম্ভব ছিল না। সেইজন্যে, মহারাজ এই দুর্গের ভেতরে এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যে অন্দরমহলের এই ঘরে বসে মহারানি গান গাইতেন আর রাজসভায় বসে সবাই সেই গান শুনত।
টুরিস্টদের ভেতর থেকে লেকটাউনের মিসেস গৌরী মিত্র বললেন— সে কী কথা? রাজসভা তো আমরা দেখে এলুম। সে তো এখান থেকে বেশ অনেকটা দূরে। অতদূরে গলা পৌঁছুত কী করে? সে যুগে কি মাইক-টাইক ছিল?
বাঁশদ্রোণী কলেজের ছাত্র সমীর ব্যানার্জি বলল— পৌঁছবে না কেন? সে যুগের মহিলাদের বাজখাঁই গলা হত, বুঝলেন? আপনাদের মতো মিনমিনে ছিল না। তাঁরা অমায়িক হয়ে গান গাইতেন, রাজ্যসুদ্ধু লোক শুনতে পেত।
বিজয়কুমার সমীরকে পাত্তা না-দিয়ে মৃদু হেসে বললেন— মাইক তখন কোথায়? ইলেকট্রিসিটিই কী ছিল নাকি? কিন্তু আমাদের দেশে সেই সময়ে যাঁরা বাস্তুকার ছিলেন, মানে আজ যাঁদের আপনারা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বলেন, তাঁদের ছিল অসম্ভব কে সম্ভব করার অদ্ভুত ক্ষমতা। ওই যে বন্ধ দরজাটা দেখছেন, ওর পেছনে একটা করিডর রয়েছে। ওখান দিয়ে রাজসভায় যাওয়া যায়। করিডরটা এমনভাবে তৈরি যে এই ঘরে কারও হাতের কাচের চুড়ির টুংটাং শব্দও রাজসভায় পরিষ্কার শোনা যায়। গান আর তার সূক্ষ্ম গলার কাজ যে শোনা যাবে তাতে আর আশ্চর্য কী? অথচ, রাজসভার কোনো কথাই এ-ঘরে শোনা যায় না।
সমীর বলল— বলেন কী? তার মানে, রাজামশাই এ-ঘরে তাঁর রানিকে কোনো গোপন কথা বলতেন, সেটা সভাসদরা সবাই শুনতে পেত?
বিজয়কুমার দরজাটা খুলে দিতে দিতে বললেন— না। এই দরজাটা পুরো খুলে না-দিলে ওপাশে কিচ্ছু শোনা যাবে না। এবার আপনাদের মধ্যে যিনি গান করতে পারেন, তিনি এখানে থাকুন আর বাকি সবাই এই পথে রাজসভায় চলে যান। আমি এখানেই আছি। ব্যাপারটা কী ঘটত, এবার আপনারা দেখতে পাবেন বা শুনতে পাবেন।
কে গান গাইতে পারেন এবং কে থাকবেন, তাই নিয়ে আলোচনা শুরু হল। শেষপর্যন্ত শ্রীলতাকেই সবার পছন্দ হল। গাইড বললেন— না। পুরুষদের মধ্যে একজন থাকুন।
শ্রীলতার বাবা সাংবাদিক দীপঙ্কর চৌধুরি বললেন— কেন? অসুবিধে আছে?
—হ্যাঁ, আছে। আপনারা শুনেছেন কি না জানি না, এই বাঘেলাগড় দুর্গের একটা বদনাম আছে। এই ঘরেই মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধে গুরুতর আহত মহারাজ দয়া সিং মারা যান আর সতী নন্দাবাই আত্মহত্যা করেন। তারপর থেকে— সে যাকগে, নানা লোকে নানা কথা বলে।
দীপঙ্কর বললেন— ভূত? আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।
মা-মেয়ে অতসী আর শ্রীলতা সমস্বরে বলল— আমি করি। আমি করি।
বিজয়কুমার সহাস্যে বললেন— দেখলেন তো? তাহলে, আর একজনকে ঠিক করুন। কিছুই হবে না, কোনোদিন হয়নি। তবে, সাবধানের মার নেই।
এবার গানের জন্য নির্বাচিত হলেন যাদবপুর গৌরীশঙ্কর স্মৃতি হাই স্কুলের মাস্টারমশাই কল্যাণময় গুহ। অত্যন্ত নিরীহ আর শান্তপ্রকৃতির এই অকৃতদার মাঝবয়েসি ভদ্রলোক লজ্জিতভাবে রাজি হলেন।
রাজসভার দিকে যেতে যেতে সমীর বলল— ভালো করে গাইবেন, মাস্টারমশাই। ভুলভাল হলে নন্দাবাই-এর ইয়ে কিন্তু আপনার ঘাড়ে চড়ে বসতে পারে।
চারদিক ঢাকা টানেলের মতো করিডর দিয়ে সকলে রাজসভায় চলে এলেন। একটু বাদেই করিডরের ভেতর থেকে পরিষ্কার বিজয়কুমারের গলা শোনা গেল— এবার সবাই শুনুন, গান শুরু হচ্ছে।
একটা গলা খ্যাকারি শোনা গেল। তারপরেই একটা ভয়ংকর আর্তনাদ।
আর্তনাদটা শুনেই সাগর বলল— শ্রী, আমার সঙ্গে আয়। আর, আপনাদের মধ্যে কেউ এক্ষুনি গিয়ে টুরিস্ট অফিসারকে খবর দিন। বলে দু-জন করিডর দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল। পিছনে পিছনে গেল সমীর।
রানির ঘরে ঢুকে দেখা গেল মাস্টারমশাই একপাশে মেঝের ওপর অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রয়েছেন, বিজয়কুমারের চিহ্নমাত্র নেই। সাগর বলল— শ্রী, তুই ওই দরজাটা দিয়ে বাইরের বারান্দায় যা। এখানে আসার সময় দেখেছি বাঁ-দিকে একটা ছোটো বাথরুম আছে। ওখান থেকে তোর টুপিটা ভিজিয়ে নিয়ে আয়। মাস্টারমশাই-এর মুখে জলের ছিটে দিতে হবে। শিগগির যা।
শ্রীলতা একটু ইতস্তত করে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। সাগর সমীরকে বলল— আপনি মাস্টারমশাই-এর পাশে থাকুন, সমীরদা। আমি এদিকটা দেখছি।
সমীর একটু আশ্চর্য হয়ে বলল— এদিকটা মানে? কোন দিকটা?
সাগর উত্তর দেবার আগেই ওদের দলের সবাই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকল। সাগর বেশ জোরের সঙ্গে বলল— সবাই ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ান, কেউ দেওয়ালের কাছে যাবেন না।
সাগরের কথায় কাজ হল। সকলে হুড়মুড় করে ঘরের মাঝখানে চলে এলেন। তারপর শুরু হল প্রশ্নের বন্যা— মাস্টারমশাই বেঁচে আছেন কি না, গাইডসাহেব কোথায় গেলেন, নিশ্চয়ই কেটে পড়েছেন, টুরিস্ট-অফিসারের পাত্তা নেই কেন, দেওয়ালের কাছে গেলে কী হবে, ওই বাচ্চা ছেলেটি এসব কথা বলবার কে, ইত্যাদি, ইত্যাদি। সবাই তারস্বরে কথা বলছেন, সে এক মহা গণ্ডগোল।
সাগর এই প্রশ্নমালার উত্তর দেবার চেষ্টাই করল না। বলল— বাবা, তোমার টর্চটা দাও তো।
দীপঙ্কর তাঁর কাঁধ-ঝোলার ভেতর থেকে ছোটো টর্চ বের করে সাগরের হাতে দিলেন। সঙ্গেসঙ্গে নতুন প্রশ্নের ঝড় উঠল— টর্চ দিয়ে কী হবে, ছেলেটা কী ডিটেকটিভ না কি, যতসব চালিয়াতি বাজে কায়দা দেখাবার আর জায়গা ছিল না ইত্যাদি।
এরমধ্যে শ্রীলতা তার টুপি ভিজিয়ে নিয়ে এসেছে। সমীর সেটা নিংড়ে মাস্টারমশাই-এর চোখে-মুখে কিছুক্ষণ জলের ছিটে দেওয়ার পর তাঁর জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলেই মাস্টারমশাই খাবি খেতে খেতে বললেন— ভূত... ভূত।
সমীর ব্যথিত গলায় বলল— আমি ভূত নই, মাস্টারমশাই। জলজ্যান্ত মানুষ।
মাস্টারমশাই বললেন— আহা, তুমি ভূত হতে যাবে কেন। ঘরের ভেতরে সত্যিকারের ভূত এসেছিল। বিজয়কুমারের ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছিল।
দুর্গাপুরের মিসেস সুগতা গাঙ্গুলি মাস্টারমশাই-এর মতোই কম্পিতকণ্ঠে বললেন— ওরে বাবারে! কীরকম দেখতে ছিল ভূতটা, মাস্টারমশাই?
—আমি কী আর ভালো করে দেখেছি? তবে, কোনো রাজা-টাজার ভূত হবে। বিশাল চেহারা, মাথায় পাগড়ি, পরনে সলমা-চুমকি বসানো রাজার মতো পোশাক।
—ও মা গো! ওই বারান্দা দিয়ে ভূতটা এল?
সাগর টর্চটা জ্বেলে দেওয়ালের কাছে মেঝেটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। বলল— না। ভূতটা দেওয়ালে ফুটো করে বেরিয়ে এসেছিল, তাই-না মাস্টারমশাই?
মাস্টারমশাই বললেন— ঠিক তাই। আমি আর বিজয়কুমার ঘরের মধ্যিখানে করিডরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিলুম। কাজেই ওপাশের বারান্দা দিয়ে যা কিছুই আসুক না-কেন, আমরা দেখতে পেতুম। ভূতটা এসেছিল আমাদের পেছন থেকে। তার মানে দেওয়ালে ফুটো করেই বটে। তা, সে কথাটা তুমি কী করে জানলে?
ঢাকুরিয়ার সবজান্তা উকিল কান্তিভূষণ কুণ্ডু বললেন— এতে আবার না জানার কী আছে? বারান্দা দিয়ে এলে শুধু আপনি কেন, বাইরে দুর্গের যেসব লোকজন ঘোরাঘুরি করছে, তারাও দেখতে পেত। আমার তো মনে হয়, ভূত-টূত কিছু নয়। একটা লোক এই ঘরের মধ্যেই কোথাও লুকিয়ে ছিল।

কান্তিভূষণের স্ত্রী গীতা বললেন— বাজে কথা বোলো না তো। এই ঘরে লুকোবার মতো কোনো জায়গা আছে? যা এসেছিল, সেটা ভূতই, মানুষ হতে পারে না। মাস্টারমশাই খুব জোর বেঁচে গেছেন। ভূতটা গাইডসাহেবকে তুলে নিয়ে ওই দেওয়াল ভেদ করেই বেরিয়ে গেছে। দ্যাখো গিয়ে, এতক্ষণে তাঁকে বোধ হয় কড়মড় করে...
মিসেস গাঙ্গুলি তাঁর স্বামী ডি. এস. পি.-র ইঞ্জিনিয়ার প্রবালকে বললেন— আমি এখানে আর একমুহূর্তও থাকব না। আমি এক্ষুনি বাড়ি যাব।
বারান্দায় কতগুলো ভারী জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। সঙ্গেসঙ্গে সকলের কথা বন্ধ হয়ে গেল। ঘরে ঢুকলেন টুরিস্ট-অফিসার রাঠোর, একজন রোগা, লম্বা পুলিশের দারোগা আর দু-জন মোটাসোটা কনস্টেবল।
ঘরে ঢুকেই রাঠোর বললেন— এ কী! বিজয়কুমার কোথায় গেল? তার এখান থেকে চলে যাওয়া ঠিক হয়নি।
মিসেস গাঙ্গুলি বললেন— ইচ্ছে করে কী আর গেছেন? তাঁকে তুলে নিয়ে গেছে।
তারপর সবাই একসঙ্গে ঘটনাটা রাঠোরকে বোঝানোর চেষ্টা করতে আরম্ভ করে দিলেন। কেউ শুরু করলেন রাজসভা থেকে গান শুনতে পাওয়ার কাহিনি থেকে। কেউ সকাল বেলা টুরিস্ট বাংলো থেকে রওনা হওয়া থেকে। আবার কেউ-বা একেবারে হাওড়া স্টেশনে মাস্টারমশাই-এর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়া থেকে। সবাই একসঙ্গে কথা বলে যাচ্ছেন, কে যে কার কথা শুনেছেন তা বোঝে কার সাধ্যি।
অনেক কষ্টে ব্যাপারটা বুঝে রাঠোর বললেন— আপনারা ভয় পাবেন না। এ কথাটা ঠিকই যে এখানে নানা রকমের অতিপ্রাকৃত গল্প প্রচলিত আছে, কিন্তু সেগুলো গল্পই। এখানে আজ যা ঘটেছে বলে আপনারা মনে করছেন, সেটা ঠিক নয়। আমার তো মনে হচ্ছে যে বিজয়কুমার মাস্টারমশাইকে ভয় দেখিয়ে অজ্ঞান করে তাঁর টাকাপয়সা হাতিয়ে নেবার ধান্দায় ছিল। মাস্টারমশাই চিৎকার করে ওঠায় সে পালিয়েছে। রাজার সাজে যাকে উনি দেখেছেন, হয় সেটা তাঁর চোখের ভুল নয়তো বিজয়কুমারের কোনো সাগরেদের কাণ্ড। আপনারা নিশ্চিন্ত মনে বাংলোয় ফিরে যান। বিজয়কুমার এই দুর্গেই এদিক-ওদিক কোথাও আছে। বাইরে কোথাও যায়নি। ওকে ধরা কঠিন হবে না। কি বলেন দারোগাসাহেব?
দারোগাসাহেব মাথা নেড়ে বললেন— সহি বাত।
সাগর বলল— বিজয়কুমার এদিক-ওদিক কোথাও নেই আর এক্ষুনি ব্যবস্থা না-নিলে ওঁকে ধরা সত্যিই কঠিন হবে। মাস্টারমশাই যা দেখেছেন, সেটা তাঁর চোখের ভুল নয়।
সস্নেহ হাসি হেসে রাঠোর বললেন— বাঃ, তুমি তো সব জেনে গেছ দেখছি। বিজয়কুমার কোথায় আছে বা সে সেখানে গেল কী করে, সেটাও কি জানতে পেরেছ? তবে তো দারোগাসাহেবের কাজ খুব-ই সহজ হয়ে গেল। না কি বলেন দারোগাসাহেব?
দারোগাসাহেব মাথা নেড়ে বললেন— সহি বাত।
সাগর বলল— বিজয়কুমার কোথায় আছেন তা আমি সঠিক না জানলেও আন্দাজ করতে পারি আর তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এই দেওয়াল ভেদ করে।
রাঠোর এবার গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন— ওই নিরেট পাথরের দেওয়াল ফুটো করে একটা মানুষকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এটা কিন্তু বুদ্ধিমানের মতো কথা হল না। আমি বলি কী, আপনারা এবার বাড়ি যান। পুলিশ এবার তার কাজ শুরু করবে। তাই তো, দারোগাবাবু?
দারোগাসাহেব মাথা নেড়ে বললেন— সহি বাত।
সাগর বলল— শুনুন মি. রাঠোর, আমাদের কিন্তু দেরি করা চলবে না। তাহলে হয়তো বিজয়কুমারকে আর জীবিত অবস্থায় পাওয়া যাবে না।
রাঠোরের গলায় এবার বিদ্রূপের সুর। বললেন— একেবারে খুন? কী করে বুঝলে?
—দেওয়ালের ধারে এই বৃত্তচাপের মতো বাঁকা দাগটায় আর ন্যাফথালিনের গন্ধে।
—এসব কী আজেবাজে কথা বলছে এই ছেলেটি? বেশি ডিটেকটিভ গল্প পড়ার এই ফলই হয়। চলুন সবাই, আপনাদের বাংলোয় ফেরার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। বিজয়কুমারকে নিয়ে পুলিশকে মাথা ঘামাতে দিন।
সমীর এতক্ষণ গভীর মনোযোগের সঙ্গে এই কথোপকথন শুনছিল। রাঠোরকে বাধা দিয়ে বলল— একটু দাঁড়ান। সাগর, তুমি কী বলতে চাইছ, বলো তো?
সাগর বলল— আমি যা বলতে চাইছি সেটা জানতে হলে আগে এইখানে আসুন। বাবা, তুমিও এসো।
—তা না-হয় যাব। তারপর কী করতে হবে?
—আমরা তিনজনে মিলে দেওয়ালের এই জায়গাটা ঠেলব।
রাঠোর ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললেন— না, এসব এখানে চলবে না। বিজয়কুমার একজন অত্যন্ত শয়তান লোক। অনেকদিন ধরেই আমি সেটা জানি। কাজেই, কোনো বাচ্চা ছেলে নয়, পুলিশই তার খোঁজ করবে।
দারোগাসাহেব মাথা নেড়ে বললেন— সহি বাত।
টুরিস্টদের মধ্যেও অনেকেই তাঁকে সমর্থন করলেন।
সমীর বলল— পুলিশ তার কাজ করুক-না। ছেলেটি তো শুধু চাইছে দেওয়ালের একটা জায়গায় ধাক্কা দিতে। তাতে যে কী মহাভারত অশুদ্ধ হচ্ছে, তাই তো আমি বুঝতে পারছি না। এতে কী পুলিশের কাজে কোনোরকম বাধা দেওয়া হচ্ছে? তা যদি না-হয়, তাহলে তো পুলিশের তরফ থেকে কোনো আপত্তি থাকতে পারে না। তাই না দারোগাসাহেব?
দারোগাসাহেব মাথা নেড়ে বললেন— সহি বাত।
এই কথার মধ্যে সমীর সাগরের কাছে চলে এসেছে এবং দু-জনে দেওয়াল ঠেলতে শুরু করে দিয়েছে। দীপঙ্করের দরকার হল না, দু-জনের ঠেলাতেই একটা স্ল্যাব বেশ মসৃণভাবে ঘুরে গেল। দেখা গেল, সেটা আসলে একটা গোপন দরজা আর তার পেছনে একটা অন্ধকার সিঁড়ি নীচে নেমে গেছে।
দরজাটা বেরোনোমাত্র রাঠোর হাউমাউ করে চিৎকার করে উঠলেন— আর্কিয়োলজিক্যাল ডিপার্টমেন্টের অনুমতি ছাড়া ওখান দিয়ে কেউ যাবে না।
কে কার কথা শোনে। সাগর সমীরকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামতে নামতে চেঁচিয়ে বলল— বাবা, রাঠোরকে আটকে রাখো। দারোগাসাহেব, আপনি আমাদের সঙ্গে আসুন।
এইবার দারোগাসাহেবের মধ্যে কিছু ব্যস্ততা দেখা গেল। তাড়াতাড়ি দৌড়লেন সিঁড়িটার দিকে। বাকি সবাই রাঠোরের চারদিকে ঘন হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
হরিসিং রাঠোর ভাঙেন কিন্তু মচকান না। টুরিস্ট অফিসে নিজের চেয়ারে বসে বাঁকা হেসে বললেন— আমিই যে বিজয়কুমারকে তুলে নিয়ে গিয়ে মাটির নীচে চোরকুঠুরিতে মুখ-হাত-পা বেঁধে আটকে রেখেছিলুম, তার কোনো প্রমাণ আছে?
সাগর বলল— বিজয়কুমার পুলিশকে যা বলেছে সেটাই কি যথেষ্ট নয়?
—না, বিজয়কুমার যা বলছে তার একটি শব্দও বিশ্বাসযোগ্য নয়। সে একটা মহা পাজি লোক। অনর্গল মিথ্যেকথা বলে থাকে। অন্য কোনো প্রমাণ থাকে তো বলো।
—অন্য প্রমাণও আছে। সেটা আপনার গায়ে তীব্র ন্যাফথালিনের গন্ধ। আপনি পরে রয়েছেন কটন বুশশার্ট। ও জিনিস কেউ ন্যাপথালিন দিয়ে রাখে না। আর, বিজয়কুমারের পাশে যে সলমা-চুমকি বসানো প্রিন্সকোর্টটি পাওয়া গেছে তারমধ্যেও এই একই গন্ধ। সারকামস্ট্যান্সিয়াল এভিডেন্স হিসেবে এই ব্যাপারটা কিন্তু খুব জোরালো। তা ছাড়া, এই কোটের পকেটে যে থিয়েটারের পোশাক ভাড়া দেবার দোকানের রসিদটি পাওয়া গেছে সেখান থেকে ওটা কে ভাড়া নিয়েছিল সেটা বের করতে পুলিশের বেশি সময় লাগবে না।
সাগরের কথা শুনে রাঠোর গুম হয়ে চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ বাদে সাগর প্রশ্ন করল— এই কাজ আপনি করতে গেলেন কেন, মি. রাঠোর?
রাঠোর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন— এত কথা জেনে বসে আছ আর একথাটা জানো না?
—বিজয়কুমার গুপ্তধন সম্পর্কে কী যেন বলছিলেন বটে। তা, সেটা কি এমন একটা কাণ্ড করবার জন্য খুব জরুরি ছিল?
—নিশ্চয়ই। যে গুপ্তধনের কথা ও বলছিল সেটা আমার পরিবারের সম্পত্তি। রাজা দয়ানাথ সিং আর রানি নন্দাবাই নিঃসন্তান ছিলেন। দয়ানাথের মৃত্যুর পর তাঁর শ্যালক সিংহাসন দখল করে রাজা হয়েছিলেন। তিনিই আমার পূর্বপুরুষ। ওই বিজয়কুমারের বংশ ছিল এখানকার রাজপরিবারের দেহরক্ষী। আলমগীর যখন এই দুর্গ আক্রমণ করেছিলেন, তখন দয়ানাথের আদেশে তাঁর প্রধান দেহরক্ষক সমস্ত রাজকীয় ধনরত্ন লুকিয়ে ফেলেছিল। যুদ্ধে দয়ানাথ মারা যান, ফলে এই বিশাল সম্পদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। নতুন রাজা প্রধান দেহরক্ষকের ওপর অনেক অত্যাচার করেছিলেন কিন্তু তার পেট থেকে কথা বের করতে পারেননি।
—বেশ, ব্যাপারটা এইবার স্পষ্ট বোঝা গেল। সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। আপনার বিশ্বাস, বিজয়কুমারের পরিবারে প্রচলিত কাহিনির মাধ্যমে সেই সম্পদ কোথায় থাকতে পারে সে সম্পর্কে তাঁর একটা ধারণা ছিল। দুর্গের ভেতরে দর্শকদের ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে তিনি তাঁর খোঁজ পেয়ে গেছেন আর সেটা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করছেন, যদিও আপনার মতে সেটা আপনার হক্কের ধন। অতএব, আপনি বিজয়কুমারকে জোর করে গোপন কুঠুরিতে তুলে নিয়ে গিয়ে তাঁর গলা টিপে তার পেটের খবর বের করে নেবার জন্য এত কাণ্ড করলেন। অথচ এটা ভেবে দেখলেন না যে ওই গুপ্তধন যদি থাকেও, তবে আজ সেটা জাতীয় সম্পত্তি, তাতে কারুর ব্যক্তিগত অধিকার নেই। আর, যদি মনে করেন যে ওসব আইনের অর্থহীন কথা তাহলেও আপনি সেটা হজম করতে পারতেন না। কারণ, তা করতে গেলে যে পরিমাণ এলেম থাকা দরকার তা আপনার নেই। যদি থাকত তাহলে এমন নির্বোধের মতো একটা প্ল্যান করতেন না আর পত্রপাঠ ধরাও পড়ে যেতেন না।
টুরিস্ট বাংলোর বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সমীর বলল— হরিসিং রাঠোরের এলেম থাক বা না-থাক, তোমার তো বেশ আছে বলেই মনে হচ্ছে। ব্যাপারটা তুমি ধরলে কীভাবে একটু বুঝিয়ে বলো তো।
কান্তিভূষণ কুণ্ডু বললেন— এতে আবার বোঝাবার কী আছে? খুবই সহজ ব্যাপার। আমি তো প্রথমেই বলেছিলুম যে ভূত-টূত নয়, একটা লোকই ঘরের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। অবশ্য পাথরের দেওয়ালে চোরা দরজার কথাটা তখন মাথায় আসেনি। আর, ন্যাফথালিনের গন্ধটা পেলে তো রাঠোরকে সঙ্গেসঙ্গে ধরে ফেলতুম। কিন্তু পাবো কোত্থেকে? আমি একটু বেশি সিগারেট খাই কিনা, তাই এসব গন্ধ-টন্ধ আমার নাকে বড়ো একটা আসে না।
শ্রীলতা জনান্তিকে বলল— আমারও ছিল মনে, কেমনে ব্যাটা পেরেছে সেটা জানতে।
সাগর বলল— যে দুর্গে এত চোরা পথ, সেখানে রানিমহলে তা থাকবে না সেটা ভাবাই যায় না। তাহলে সেটা পাথরের দেওয়ালেই কোথাও-না-কোথাও হবে। সেখান দিয়ে কেউ এলে তার কোনো একটা চিহ্ন দেওয়ালের খুব কাছেই থাকার সম্ভাবনা। সেইজন্যেই আমি কাউকে দেওয়ালের কাছে আসতে বারণ করেছিলুম। ধুলোর ওপরে বৃত্তচাপের মতো একটা হালকা দাগ দেখে বুঝতে পারলুম যে কোন পাথরের স্ল্যাবটা আসলে একটা চোরা দরজা আর তার কোন দিকটা ঠেললে সেটা খুলে যাবে। হরিসিং এখানকার ভূতের ভয়ের কথা জানতেন। ভেবেছিলেন যে ঘরে যখন মাত্র দু-জন লোক থাকবে তখন রাজার পোশাক পরে পেছন থেকে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়লে তারা অজ্ঞান হয়ে যাবে আর তিনি বিজয়কুমারকে নিয়ে চোরাকুঠুরিতে বিনা বাধায় চলে যেতে পারবেন। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল তবে মাস্টারমশাই যে ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠবেন আর আমরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ও ঘরে পৌঁছে যাব সেটা ভাবতে পারেননি।
—তোমার কি মনে হয় যে বিজয়কুমার গুপ্তধনের সন্ধান পেয়েছেন?
—আমার তো মনে হয় না। ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে রাঠোরের উষ্ণ মস্তিষ্কের কল্পনা। এই দুর্গের গলিঘুঁজির সব খবর রাঠোরই রাখেন, বিজয়কুমার নয়। আজকের ঘটনাটা সেই ইঙ্গিতই করে। সম্ভবত, অনেক দিন ধরেই মহারাজার গুপ্তধন খুঁজে বেড়াচ্ছেন রাঠোর। না-পেয়ে হতাশার রাগটা গিয়ে পড়েছে বেচারা বিজয়কুমারের ওপরে। তবে, বিজয়কুমার গুপ্তধনের সন্ধান যদি পেয়েও থাকেন তাহলেও উনি সেটা প্রকাশ করবেন না কারণ, ওই যে বললুম, সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন