মনোজ সেন

প্রায় পঁচিশ বছর বাদে দেশে ফিরেছেন অমরেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরি। পনেরো বছর বয়সে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেখানেই লেখাপড়া করেছেন, ডাক্তারি পাশ করেছেন, তারপর স্থায়ীভাবে ওখানেই থেকে গিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী মীনাক্ষীও ডাক্তার। দু-জনেই লন্ডন শহরের একই হাসপাতালে চাকরি করেন। কাজেই দেশে ফেরার কোনো প্রয়োজন বা তাগিদ তাঁরা কোনোদিনই অনুভব করেননি। এ ছাড়াও তাঁদের দেশে ফেরার ব্যাপারে কোনো উৎসাহ না থাকার অন্য কারণও ছিল।
গোলমাল বাঁধাল ছেলেমেয়েরা। তেরো বছরের ইন্দ্রনারায়ণ আর এগারো বছরের এষা তাদের দেশ দেখবার জন্য এমন ঝুলোঝুলি শুরু করে দিল যে শেষপর্যন্ত অমরেন্দ্র রাজি না হয়ে পারেননি। এরকম হওয়ারই কথা; কারণ ইন্দ্র আর এষাকে ছোটোবেলা থেকেই বাংলা বলতে, বাংলা বই পড়তে আর বাংলা গান শুনতে তাদের বাবা-মা-ই উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। সেজন্যে তাদের ভেতরে নিজেদের দেশ সম্পর্কে একটা অদম্য কৌতূহল গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক।
কলকাতায় একটা পাঁচতারা হোটেলে উঠেছিলেন রায়চৌধুরিরা। পঁচিশ বছর বাদে কলকাতার চেহারা দেখে বেশ খুশি হলেন অমরেন্দ্র। কিন্তু তাঁর ছেলেমেয়ে সন্তুষ্ট হল না। তারা, তাদের দেশ, হাওড়া জেলার মানিকপুর গ্রামে যেতে চায়। তাদের অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেন অমরেন্দ্র। বললেন, এই মানিকপুর একটি নিতান্তই অজ পাড়াগাঁ, এখানে সুইচ টিপলে আলো জ্বলে না, কল খুললে জল পড়ে না, চারদিকে ঝোপঝাড়, সাপখোপ, পোকামাকড়, সন্ধে হলে শেয়াল ডাকে। ওখানে গেলে কলকাতার সুন্দর স্মৃতিটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে। তার চেয়ে দার্জিলিং যাওয়া অনেক ভালো। সকাল বেলা কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য একটা অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
অমরেন্দ্রর এতসব যুক্তি তাঁর ছেলেমেয়ের কাছে ধোপে টিঁকল না। ওদের বাবা যেখানে তাঁর ছেলেবেলা কাটিয়েছেন, সে জায়গাটা না-দেখে তারা কোথাও যাবে না। অনেক তর্কাতর্কির পর স্থির হল যে ভোর বেলা একটা গাড়িভাড়া করে মানিকপুর যাওয়া হবে, সঙ্গে থাকবে প্যাক করা দুপুরের খাওয়া আর বিকেলের আগেই ওখান থেকে রওনা দিয়ে সন্ধে নাগাদ ফিরে আসা হবে।
সেইরকমই করা হল, গাড়ির ব্যবস্থা করে দিল হোটেলের কর্ত,পক্ষ। বিদ্যাসাগর সেতু আর কোনা এক্সপ্রেসওয়ে দেখে তো অমরেন্দ্র একেবারে চমৎকৃত। ড্রাইভার মহেন্দ্রকে বললেন— এই জায়গাটা যে এতদূর পালটে যাবে ভাবতেই পারিনি। আপনাকে রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যেতে পারব কি না বুঝতে পারছি না।
মহেন্দ্র বললেন— মানিকপুর যাবেন তো? কোনো চিন্তা করবেন না, আমি ঠিক নিয়ে যাব। মানিকপুরের পাশেই এই রাস্তার ওপরে বিরাট হাউসিং কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। আমি ওখানে বেশ কয়েক বার গেস্টদের নিয়ে গেছি। মানিকপুরের আশেপাশে সব-কটা রেস্টুরেন্ট আর পানের দোকানের মালিক আমার চেনা।
মানিকপুরে পৌঁছে অমরেন্দ্র একেবারে হতবাক। চারদিকে তাকান আর গলার মধ্যে নানারকম শব্দ করেন। শেষপর্যন্ত একটা বড়ো কাপড়ের দোকানের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ড্রাইভারকে বললেন— জেনে আসুন তো শ্রীবীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরির বাড়িটা কোনদিকে। আমি তো কিছুই চিনতে পারছি না।
মহেন্দ্র ভেতরে গেলেন। ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করল— বীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরি তো তোমার কাকা, তোমার বাবার ছোটোভাই, তাই না? এখনও বেঁচে আছেন? কত বয়েস?
—বোধ হয় বেঁচে আছেন। মারা গেলে খবর পেতুম। ওঁর বয়েস এখন হবে সত্তরের কাছাকাছি।
বলতে-বলতেই দোকানের ভেতর থেকে মহেন্দ্র আর তার সঙ্গে তিন-চারজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন। তাঁরা দোকানের খরিদ্দার না কর্মচারী বোঝা গেল না। তাঁদের একজন এগিয়ে এসে অমরেন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করলেন— আপনি রায়চৌধুরি বাড়িতে যেতে চান? জমি কিনবেন না কি?
অমরেন্দ্র সাবধানে বললেন— ঠিক তা নয়। অন্য একটা কাজ ছিল।
—আমার এসব প্রশ্নে কিছু মনে করবেন না। শুনলুম আপনি বিদেশ থেকে এসেছেন, তাই বলছিলুম যে, যে কাজই থাক, সতর্ক থাকবেন। বীরেন চৌধুরি লোকটা ভালো নয়, অত্যন্ত ধূর্ত আর প্রচণ্ড কিপটে। ওঁর দাদা আর ছোটোবোন অকালে মারা যান। সে ব্যাপারেও লোকে নানাকথা বলে। তখন উনি এখানকার জমিদার হন। সে সময় তো হাতে মাথা কাটতেন। পরে, প্রোমোটারদের খাসজমি বেচে লক্ষ লক্ষ টাকা করেছেন অথচ সৎকাজে একপয়সা ও উবুড়-হস্ত করতে নারাজ। বিয়েথা করেননি, এত টাকা যে কী করবেন তা ভগবানই জানেন। ওদিকে, সাদাসিধে সরল লোককে বিপদে ফেলে নাকাল করতে সিদ্ধহস্ত। এখানকার লোকেরা ওঁর নাম মুখে আনে না। আনলে না কি হাঁড়ি ফেটে যায়। সেকথা থাক, রায়চৌধুরি বাড়ি যাওয়ার পথ এঁকে বলে দিয়েছি। চিনতে অসুবিধে হবে না।
এষা হিহি করে হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করল— হাঁড়ি ফেটে যায় মানে কী বাবা?
চিন্তিত গম্ভীর মুখে অমরেন্দ্র বললেন— ও কিছু নয়, পরে বলব।
কিছুটা এগিয়ে পাকা রাস্তা ছেড়ে গাড়ি যখন কাঁচা রাস্তা ধরল, তখন গ্রামের দৃশ্য দেখা যেতে লাগল। টালির চালের ঘর, চাষের খেত ইত্যাদি দেখে ইন্দ্র আর এষা মহাখুশি। বলল— এই তো তোমার গ্রাম, তাই না বাবা?
অমরেন্দ্র সংক্ষেপে হ্যাঁ বলে চুপ করে গেলেন, তাঁর মুখ চিন্তিত আর গম্ভীর হয়ে রইল। তাঁর আনন্দ আর উৎসাহে কেমন যেন ভাঁটা পড়েছে বলে মনে হল।
রায়চৌধুরি বাড়ি গ্রামের এক প্রান্তে। প্রায় দশফুট উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিঘে-তিনেক জমির ওপরে দোতলা লম্বাটে প্রকাণ্ড ইমারত। সামনে টানা থামওয়ালা বারান্দা, মাঝখানে পেছনদিকে যাওয়ার জন্য খিলেন করা চওড়া প্যাসেজ। কিন্তু সমস্ত বাড়িটার এখন বড়োই দৈন্যদশা। অনেক জায়গায় প্লাস্টার খসে গেছে, মোটা থামগুলো জড়িয়ে উঠেছে বুনোলতা, জানলা দরজায় রং হয়নি যে কতকাল তা বোধ হয় কেউ জানে না। একজন ক্লান্ত বিষণ্ণ বৃদ্ধের মতো বাড়িটা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। সে বাড়িতে যে কেউ বাস করে তা প্রথম দর্শনে মনে হয় না।
মীনাক্ষী বললেন— তুমি ঠিক জানো যে তোমার কাকা এইখানে থাকেন? আমার তো মনে হচ্ছে যে উনি হয়তো অন্য কোথাও বাড়ি করে উঠে গেছেন।
অমরেন্দ্র বললেন— তাই হবে হয়তো। তাহলে তো ভালোই হয়।
দেউড়ি দিয়ে ঢুকে গাড়ি দাঁড়াল একখণ্ড পোড়ো জমির ওপরে। সে জায়গাটা বোধ হয় একসময়ে লন ছিল, এখন আগাছায় ভরতি। এমন নিস্তেজ আর নিষ্প্রাণ জায়গায় এসেও ইন্দ্র আর এষার আনন্দের কোনো অভাব ঘটল না। হইহই করতে করতে গাড়ি থেকে নেমে দু-জনে প্রথমে বাড়ির সামনে একপাক ঘুরে এল, তারপর দৌড়ে প্যাসেজের ভেতরে চলে গেল। পেছন থেকে মীনাক্ষী ডেকে বললেন— সাবধানে যাবি। সাপখোপ থাকতে পারে।
ইন্দ্র আর এষা কোনো জবাব দিল না বটে কিন্তু প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই বেরিয়ে এল। সমস্বরে বলল— এখানে লোক থাকে, বাবা।
অমরেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন— কী করে বুঝলি?
—ওপাশে জামাকাপড় শুকোচ্ছে দেখলুম।
—তাহলে চল, দেখে আসি।
প্যাসেজের অন্যপাশে বাঁধানো উঠোন। শুকনো ডালপালা, ভাঙা ইটের স্তূপ আর আর্বজনায় ভরতি। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অমরেন্দ্র বললেন— ছেলেবেলায় এখানে পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতুম, ভাবাই যায় না।
—কে, কে ওখানে? বলতে বলতে একতলার একটা ঘরের ভেতর থেকে একজন গামছা কাঁধে আধময়লা ধুতিপরা প্রৌঢ় লোক বেরিয়ে এল, তার পেছনে একজন পক্ককেশ বিধবা বৃদ্ধা। প্রৌঢ় লোকটি জিজ্ঞাসা করল— কে আপনারা, কী চাই?
উত্তর দেওয়ার দরকার হল না। তার আগেই বৃদ্ধা বললেন— আরে অমর না? বড়োবাবুর ছেলে না তুমি?
অমরেন্দ্র মাথা নেড়ে বললেন— হ্যাঁ, তুমি তো মিনতি পিসি, তাই না? আর, তুমি তো জগাদাদা।
—হ্যাঁরে ছেলে, ঠিক চিনেছিস! তা, হাঁকডাক করিসনি কেন? কত বছর বাদে এলি, আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস? সঙ্গে কারা? তোর বউ আর বাচ্চারা? আয় বাবা, ভেতরে আয়। বৈঠকখানায় বস। বড্ডো ধুলো আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। তুই হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, জগু? যা, ওপরে গিয়ে ছোটোবাবুকে খবর দে।
প্রকাণ্ড বৈঠকখানা ঘর। সেখানে থাকবার মধ্যে আছে একটা ধূলিধূসরিত বিশাল সোফাসেট আর দেওয়ালে অনেকগুলো অয়েলপেন্টিং। আসবাবপত্র বলতে আর কিছুই নেই। মিনতিপিসি একটা সোফার ধুলো ঝেড়ে সেটা বসবার উপযুক্ত করে দিলেন। ইন্দ্র আর এষা দু-তিন মিনিট ঘরের ভেতরে ঘুরে দৌড়ে বাইরে চলে গেল।
মিনতিপিসি বললেন— তোরা বস, আমি তোদের জন্য চা করে আনি। বলেই পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ শুরু করে দিলেন। সে আর থামেই না।
প্রায় আধঘণ্টা পরে বারান্দায় চটির শব্দ পেয়ে বাক্যস্রোত বন্ধ করে মিনতিপিসি তাড়াতাড়ি চা করতে বেরিয়ে গেলেন। তখন ঘরে ঢুকলেন শ্রীবীরেন্দ্রনাথ রায়চৌধুরি। ছ-ফুট লম্বা শক্তসমর্থ শরীর। মাথার চুল, ভুরু আর ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি সব-ই সাদা। পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামা। দেখলে ভক্তি হয় না, ভয় করে।
প্রণাম আর কুশল প্রশ্ন শেষ হলে বীরেন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করলেন— তুমি এখানে এসেছ কেন? কোনো বিশেষ কারণ আছে কী? আমি তো জানতাম তুমি আর কোনোদিন এদিকে আসবে না।
অমরেন্দ্র বললেন— নিজের দেশে বা নিজের বাড়িতে আসতে গেলে কোনো বিশেষ কারণের দরকার হয় কি, কাকা? তবু কারণ একটা আছে। আমি এসেছি আমার ছেলেমেয়েদের তাদের পূর্বপুরুষদের বাসস্থান দেখাতে। এখানে এসে অবশ্য মনে হচ্ছে যে ওদের না আনলেই বোধ হয় ভালো হত। আমি এতদিন ধরে ওদের এই বাড়ির যে উজ্জ্বল রূপের কথা বলে এসেছি, তার তো কণামাত্রও আজ আর অবশিষ্ট নেই। ভয় হচ্ছে যে ওরা না আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবে।
—সেরকম ভাবার তো কারণ দেখি না। যা দিনকাল পড়েছে তাতে তোমার ওই উজ্জ্বল রূপ আর অবশিষ্ট থাকা সম্ভব নয়। তুমি তো জানো না, জমিদারি চলে যাওয়ার পর আজ আমাদের কী দুরবস্থা। কোনোরকমে ডালভাত খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। দেখছ না, এই ঘরে যত ফার্নিচার ছিল, সব-ই প্রায় বিক্রি করে দিতে হয়েছে? টাকাপয়সার যা অভাব তা বলে বোঝাতে পারব না। নেহাত পূর্বপুরুষের ভিটে, তাই বাড়িটা বিক্রি করতে পারিনি। তবে, হয়তো তারও আর বেশি দেরি নেই।
অমরেন্দ্র কথাটা খুব একটা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হল না। বললেন— লোকে তো বলে আপনার নাকি অনেক টাকা।
ভয়ানক রেগে গেলেন বীরেন্দ্রনাথ, তবে নিজেকে চট করে সামলে নিলেন। বিস্ফারিত চোখে যথাসাধ্য শান্ত গলায় বললেন— লোকে কী বলে না-বলে, তাই দিয়ে কাকার কথার সত্যাসত্য বিচার করতে যেও না, অমর।

আরও কিছু হয়তো বলতেন, কিন্তু তার আগেই ইন্দ্র আর এষা লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকল। এষা তড়বড় করে বলে গেল— জানো বাবা, ওই উঠোনটার একপাশে একটা দরজা আছে। সেখান দিয়ে পেছনের একটা জঙ্গলে যাওয়া যায়। ওখানে একজন সাধুবাবা আছেন। একটা গাছের নীচে একটা খুব সুন্দর প্ল্যাটফর্মের ওপরে লালরঙের কাপড় পরে বসেছিলেন। মুখে লম্বা দাড়ি কিন্তু খুব ভালো লোক। আমাদের জিগ্যেস করছিলেন যে আমরা কারা, কোথা থেকে এসেছি, এইসব।
মীনাক্ষী কথাটা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বললেন— তোমাদের না বলেছি যে অপরিচিত কোনো লোকের সঙ্গে কখনো কথা বলবে না বা তার কাছে যাবে না?
ইন্দ্র বলল— না মা, সাধুবাবা খুব ভালো মানুষ।
এতক্ষণ বীরেন্দ্রনাথ তীব্রদৃষ্টিতে ইন্দ্র আর এষার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। থেমে থেমে বললেন— এরা তোমাদের ছেলেমেয়ে? বেশ, বেশ। তা তুমি ঠিকই বলেছ, বউমা। এইসব সাধুবাবা-টাবার কাছেপিঠে না যাওয়াই উচিত। এই অঞ্চলে মাঝে-মাঝেই ছেলেধরার উৎপাত হয়। সবাইকে তাই সাবধানে থাকতে হয়।
বলতে বলতে তাঁর মুখে একটা অদ্ভুত চাপাহাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে বললেন— তা, তোমরা এখানে কতদিন থাকবে?
অমরেন্দ্র বললেন— আমরা আজ বিকেলেই চলে যাব।
—তা বেশ। এখন দেখি, তোমাদের দুপুরের খাওয়ার কোনো বন্দোবস্ত করতে পারি কিনা। না-হলে, এখানে কাঠেপিঠে খাওয়ার অবশ্য কোনো অভাব নেই।
—তার দরকার নেই, কাকা। আমাদের সঙ্গে প্যাকেট করা খাবার আছে।
—বেশ, বেশ। সব ব্যবস্থা করেই এসেছ দেখছি। তুমি আর বউমা তাহলে এখন বিশ্রাম করো। আমি বরং তোমার ছেলেমেয়েকে বাড়িটা ঘুরে দেখাই, কি বলো? ওদেরই তো সব।
বলামাত্র ইন্দ্র আর এষা মহাখুশি হয়ে সমস্বরে বলল— হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই ভালো।
বীরেন্দ্রনাথ গলায় যথাসাধ্য মধু ঢেলে ওদের বললেন— আমি তোমাদের ছোটো ঠাকুরদাদা। এখন প্রথমে তোমাদের আমাদের বাড়িটা দেখাব আর তারপরে তোমাদের খাওয়ার পর জমিটমিগুলো দেখাব, কি বলো?
দু-জনে তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল।
মীনাক্ষী বললেন— সাড়ে বারোটা থেকে একটার মধ্যে গাড়ির কাছে চলে আসবে কিন্তু। আর কোনোরকম দুষ্টুমি করবে না, কেমন?
বীরেন্দ্রনাথ বরাভয়ের ভঙ্গিতে হাত তুলে বললেন— চিন্তা করো না বউমা, আমি ঠিক পৌঁছে দেব। আর, বাচ্চারা দুষ্টুমি করবে না, তা কখনো হয়?
বলে ছোটো ঠাকুরদাদা তাঁর নাতি-নাতনিকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অমরেন্দ্র কিন্তু কিছুটা সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাঁর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
মীনাক্ষী বললেন— তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? কী ভাবছ?
অমরেন্দ্র বললেন— ভাবছি, মানুষের মধ্যে এতটা পরিবর্তন কী সম্ভব? বীরেন্দ্রনাথের ভেতরে স্নেহের সঞ্চার যে দেখিলেও না-হয় প্রত্যয়। কবে দেখব, গোরিলা গান গাইছে আর নেকড়েবাঘ গলায় কণ্ঠি ঝুলিয়ে হরিনাম করছে।
মীনাক্ষী বললেন— চমৎকার! কাকা-ভাইপোতে এমন ভাব তো বিশ্বসংসারে দেখা যায় না। পারোও তোমরা!
অমরেন্দ্র গম্ভীর হয়ে চুপ করে রইলেন। কোনো কথা বললেন না।
দেড়টা নাগাদ গরদের ধুতি আর উত্তরীয় পরা বীরেন্দ্রনাথকে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির মাঝখানের প্যাসেজটা দিয়ে বাইরে আসতে দেখা গেল, পেছনে জগা। মীনাক্ষী, মোবাইল ফোন হাতে, অমরেন্দ্র একটা লোহার রড হাতে, মহেন্দ্র অত্যন্ত উদবিগ্নমুখে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে কী যেন পরামর্শ করছিলেন। বীরেন্দ্রনাথ উত্তেজিতভাবে বললেন— তোমার ছেলেমেয়েরা কি এখানে এসেছে?
রাগত কঠিন মুখে অমরেন্দ্র বললেন— ওরা আপনার কাছে ছিল।
—ছিল তো। আমি একটু পুজোয় বসেছিলুম, তখন ওরা জগুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছিল। খেলতে খেলতে কোথায় যে গেল। কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। জগু আর আমি তন্নতন্ন করে খুঁজেছি। ভীষণ ভয় করছে। ছেলেধরা তুলে নিয়ে গেল না তো?
—ছেলেধরার ব্যবস্থা পরে হবে। আগে বলুন তো কাকা, এই ভরদুপুরে আপনি কী পুজো করছিলেন?
—সে তুমি বুঝবে না। আমি রোজ এই পুজো করে থাকি। আমার গুরুর আদেশ।
—আপনার গুরুটি তো তান্ত্রিক, তাই না, কাকা? তাকে তো এখন আমার বাবার শোওয়ার ঘরে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার ব্যবস্থাও হবে। আর তোমাকেও বলি জগাদা, এই জঘন্য ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে ভালো কাজ করোনি। আমার বাবা আর পিসি যখন মারা যান, তখনও তুমি চুপ করে ছিলে, আজও চুপ করে আছ। তোমার কপালে অশেষ দুঃখ রয়েছে।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন বীরেন্দ্রনাথ। চিৎকার করে বললেন— তুমি শালিনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছ, অমর। তোমার ছেলেমেয়েকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তুমি আমার সাধনাকে জঘন্য ব্যাপার বলতে সাহস পাও কী করে? তা-ও আমারই সামনে দাঁড়িয়ে।
—আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আরও অনেক কথাই বলব, কাকা। যথাসময়ে। আগে তো আমার ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে আসি। তারাও বলবে। পুলিশ আসতে আর বেশি দেরি নেই। সবকথা আপনার আর তাদের সামনেই হবে। আমি লালবাজারে ফোন করে দিয়েছি। তারা লোকাল থানায় খবর নিয়ে দিয়েছে।
বীরেন্দ্রনাথ পূর্ববৎ চিৎকার করে বললেন— তুমি আমাকে পুলিশের ভয় দেখাচ্ছ? ক্ষমতা থাকে তো যাও, নিয়ে এসো তোমার ছেলেমেয়েদের। দেখি তারা কী বলে? তারা কোথায় আছে তা কি তোমার জানা আছে?
—আছে। আমাদের গুমঘরে আপনি তাদের আটকে রেখেছেন যাতে তারা আস্তে-আস্তে কষ্ট পেয়ে মারা যায় আর যখ হয়ে যে কুবেরের ঐশ্বর্য আপনি ওই ঘরে জমিয়ে তুলেছেন সেটা অনন্তকাল ধরে পাহারা দিতে পারে। মোহর দেখাবার অছিলায় আপনি তাদের ওখানে নিয়ে গিয়েছেন কিন্তু আপনার সেই উদ্দেশ্য সফল হতে পারল না, কাকা। আপনার এই কদর্য নিষ্ঠুর কুসংস্কার কি জঘন্য ব্যাপার নয়?
মীনাক্ষি বললেন— আপনি শালিনতার কথা বলছিলেন না? এই আপনার শালিনতা?
চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো মিইয়ে গেলেন বীরেন্দ্রনাথ। মিনমিন করে বললেন— আমাদের গুমঘর কোথায়, তোমরা জানো? সেটা তো আমি ছাড়া আর কেউ জানে না বলে জানতুম। সেই ঘর তো আজ বহুবছর তালাবন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। তার চাবি তো কবেই হারিয়ে গিয়েছে।
অমরেন্দ্র বললেন— তার চাবি আপাতত আছে আপনার শোওয়ার ঘরে ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারের ভেতরে।
মহেন্দ্র বললেন— ভালোয় ভালোয় চাবি যদি না দেন, তাহলে এই লোহার রড দিয়ে তালা ভেঙে দেব। কোনো অসুবিধে হবে না।
স্তম্ভিত বীরেন্দ্রনাথ বললেন— তোমাদের এসব খবর দিলে কে? নিশ্চয়ই জগু হারামজাদা।
—না, আমি দিয়েছি। বলতে বলতে মাঝারি গড়নের, ধুতি আর ফতুয়া পরা, মুখে লম্বা কাঁচা-পাকা দাড়ি, একটি লোক বারান্দার একটি থামের পেছন থেকে বেরিয়ে এল।
বীরেন্দ্রনাথ বললেন— কে তুই? এসব খবর তুই জানলি কী করে?
লোকটি বলল— আমাকে চিনতে পারলেন না, ছোটোবাবু? আমি গোষ্ঠ, বড়োবাবুর খাস বেয়ারা।
বীরেন্দ্রনাথ মুখ বেঁকিয়ে বললেন— গোষ্ঠ? ফাজলামো হচ্ছে? এ গোষ্ঠ নয়, হতে পারে না। কারণ, গোষ্ঠ বেঁচে নেই। সে বহুকাল আগে খুন হয়েছিল। দাদা মারা যাওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। টাকাপয়সা চুরি করেছিল আর সেই সূত্রে ওর দলের লোকজনের সঙ্গে বিবাদে ওকে খুন হতে হয়েছিল।
শুনে সবাই স্তম্ভিত, বাক্যহারা। মহেন্দ্র সামলে নিয়ে বলল— লোকটা চোখের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর আপনি বলছেন যে সে খুন হয়েছে! এ কি তবে ভূত? যত সব বাজে কথা। আমি ভূতে বিশ্বাস করি না।
বীরেন্দ্রনাথ বললেন— আমি তা বলছি না। আসলে, এ একটা বাজে লোক। তুমি এর একটা কথাও বিশ্বাস কোরো না, অমর। আমার কোনো শত্রু একে এখানে পাঠিয়েছে।
গোষ্ট সহাস্যে বলল— আমি বাজে লোক কি না জানি না। তবে, এটা জানি যে রানিমা যখন অমরদাদাকে নিয়ে বাপের বাড়ি গিয়েছিলেন, তখন জমিদারির লোভে আপনি আপনার দাদা আর ছোটোবোনকে বিষ খাইয়ে মেরেছিলেন। ওরা ফিরে এলে সুযোগ বুঝে ওদেরও মারতেন। আমি ব্যাপারটা জানতে পেরে সেই রাতেই খবরটা অমরদাদার বড়োমামাকে দিয়ে আসি। তিনি তখন কিছু করতে পারেননি; তবে আর ওদের এখানে আসতে দেননি। আপনি ঘটনাটা টের পেয়ে আমাকেও খুন করেন। তার ওপর, আজ আপনি দুটো নিরাপরাধ শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। তাদের হাহাকার আর কান্না আপনি শুনতে পাচ্ছেন, ছোটোবাবু? আমি পাচ্ছি। এতবড়ো অন্যায়, এতবড়ো পাপ আর সহ্য করা যায় না। এতদিন যে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলুম, আজ অমরদাদার চলে আসায় তা এসেছে। এবার আপনার সব খেলা শেষ, ছোটোবাবু।
বলতে-বলতেই পুলিশের গাড়ি বাড়ির ভেতরে এসে দাঁড়াল। বীরেন্দ্রনাথ ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে দেখলেন, তার পরেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
বিকেলের পড়ন্ত আলোয় মহেন্দ্রর গাড়ি কলকাতার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। পেছনের সিটে ইন্দ্র আর এষা অকাতরে ঘুমোচ্ছিল আর সামনের সিটে অমরেন্দ্র আর মীনাক্ষি চিন্তিত-বিষণ্ণ মুখে বসেছিলেন। মীনাক্ষি বললেন— লোকে কেন যে ভূতে ভয় পায়, জানি না। আজ দেখলুম, মানুষ অনেক বেশি ভয়ংকর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন