মনোজ সেন

সকাল বেলা জানলা খুলে যথারীতি মুখ বেঁকালেন ইন্দ্রজিৎবাবু। গত কয়েক দিন ধরেই এই চলেছে। ইন্দ্রজিৎবাবুর উষ্মার কারণ তাঁর জানলার ঠিক সামনে, রাস্তার উলটো দিকে, একটা অতিকায় বিজ্ঞাপন। তাতে আগামী মাসের সাত তারিখে কলকাতার মহানগর রঙ্গমঞ্চে ফাল্গুন মিত্র আর গগন চৌধুরির যুগ্ম সংগীতের ফেনিল সুধা পান করবার জন্যে কলকাতাবাসীদের সাদর আহ্বান জানানো হয়েছে, প্রবেশমূল্য মাত্র দশ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপনটা দেখলেই ইন্দ্রজিৎবাবুর ছেলেবেলায় তাঁর স্কুলের সংস্কৃত ক্লাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। প্রায়ই পণ্ডিতমশায় বলতেন, 'ব্যাকরণে বলেছে ফাল্গুনে গগনে ফেনে ণত্বমিচ্ছন্তি বর্বরাঃ। অর্থাৎ, ফাল্গুন, গগন আর ফেনে একমাত্র বর্বরেরাই মূর্ধন্য ণ বসায়।'
এই বিজ্ঞাপনটায় সেই তিনটে শব্দই বিরাট আকারে উপস্থিত। কাজেই, প্রখরমূর্তি অগ্নিশর্মা পণ্ডিতমশায়ের কথা যে ইন্দ্রজিৎবাবুর মনে পড়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই।
পল্লবী এক কাপ চা নিয়ে ঘরে ঢুকে বললেন— কী দেখছ বাইরে?
ইন্দ্রজিৎবাবু বললেন— দেখছি না, ভাবছি। আমাদের স্কুলের পণ্ডিতমশাই বলতেন যে আমাদের বর্বর হয়ে যেতে আর বেশি দেরি নেই। আমরা কী এতদিনে বর্বর হয়ে গেছি না আরও একটু বাকি আছে— সে কথাই ভাবছিলাম।
পল্লবী ঠক করে কাপটা টেবিলের ওপর রেখে বললেন— রিটায়ার করেছ বলে কী আর কোনে কাজ নেই তোমার? সকাল থেকে এইসব হিজিবিজি চিন্তা না-করে, সেই যে সময়সরণি না কোথায় যাবে বলছ কয়েক দিন ধরে, সেখানেই যাও না।
—ভালো কথা মনে করিয়ে দিয়েছ। বিজ্ঞানবিক্ষণ কেন্দ্রে সময়সরণি বলে একটা টাইমমেশিন বসিয়েছে। তাতে চড়ে অতীত থেকে ঘুরে আসা যায়। কলকাতায় এই প্রথম। ভাবছি, ব্যাপারটা কী সেটা একবার দেখা দরকার। তুমিও যাবে না কি?
—কক্ষনো না। আমি এই বর্তমানেই ছেলেমেয়ে নাতিনাতনি নিয়ে বেশ আছি। তোমাদের ওই অতীতে গিয়ে যদি আটকে যাই আর ফিরে আসতে না-পারি, তখন কী হবে? কোনো দরকার নেই। তোমার যেতে হয়, তুমি যাও। আর, আসার সময় কিছু মিষ্টি কিনে এন। কাল মেয়ে-জামাই আসছে, মনে আছে তো?
—কিন্তু অতীত থেকে তো কিছু আনা যায় না বলে শুনেছি।
—অতীত থেকে তোমাকে কে আনতে বলেছে? বর্তমানেই রাস্তার মোড়ে যে দোকানটা আছে, ওখান থেকে আনলেই হবে। মনে থাকবে তো?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে থাকবে।
—কিচ্ছু বলা যায় না। অতীত থেকে ঘুরে এসে আমাদের কথাই মনে থাকবে না হয়তো।
বিজ্ঞানবিক্ষণ কেন্দ্র ইন্দ্রজিৎবাবুর বাড়ির থেকে বেশি দূরে নয়। সেখানে পৌঁছে ইন্দ্রজিৎবাবু দেখলেন কেন্দ্র তখন সবে খুলেছে। লোকজন বেশি নেই। সময়সরণির ঘরে তখনও কোনো দর্শক আসেননি, ইন্দ্রজিৎবাবুই প্রথম।
নীলরঙের কাপড়ের ওপরে ছোটো ছোটো তারা বসানো ইউনিফর্ম পরে একজন মহিলা দর্শকদের আপ্যায়ন করবার জন্য বসে ছিলেন। তিনি ইন্দ্রজিৎবাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন— কোথায় যেতে চান?
ইন্দ্রজিৎবাবু বললেন— কীরকম খরচ পড়বে তার ওপরে সেটা নির্ভর করছে।
—যদি কাছেপিঠে যেতে চান, মানে ধরুন এক-শো কী দু-শো বছর পেছনে, তবে খরচা সামান্যই পড়বে। যত বেশি দূরে যাবেন, খরচা তাতেই বেড়ে যাবে।
—সবাই কী করেন? ধারেকাছেই যান?
—আবার কী? কেউই খুব একটা পেছনে যেতে চান না। শ-দুয়েক বছরের মধ্যে গেলেই আপনি স্বশরীরে রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ বা ১৫ আগস্টের উৎসব দেখতে পাবেন। আর একটু পেছলে রাজা রামমোহন রায়, পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা ওয়ায়েন হেস্টিংসকে দেখবেন। তার থেকে একটু বেশি পেছনে গেলে আর তেমন কিছু পাবেন না। এই অঞ্চলটা তো তখন জঙ্গল, কলকাতা আস্তে আস্তে গড়ে উঠছে। সেই সময় এখানে বাঘ-টাঘ ঘুরে বেড়াত। সে সব দেখতে আর কে চায় বলুন?
—যদি আরও পেছনে যাই?
—আরও পেছনে? আপনি কি সৃষ্টির গোড়ায় যেতে চান না কি? বিগ ব্যাং? অতদূর আপনাকে নিয়ে যেতে পারব না, সেটা গোড়াতেই বলে দিচ্ছি। আমাদের রেঞ্জ অতটা নয়।
—সবচেয়ে বেশি কতদূর যাওয়া যাবে?
—সবচেয়ে দূরে। আমাদের রেঞ্জের সবচেয়ে পেছনে আছে মেসোজোয়িক যুগ। সেখানে যাবেন না কি?
ইন্দ্রজিৎবাবু কেমন যেন উদাস হয়ে গেলেন। অন্যমনস্কভাবে বললেন— মেসোজয়িক যুগ? তখন প্রথম পৃথিবীতে ফুল ফুটেছিল। একদিকে দেখা দিয়েছিল অতিকায় সরীসৃপের দল— ব্রন্টোসরাস, টাইরানোসরাস, ডিপলোডকাস, ট্রাইসেরাটপস, প্টেরোডক্টিল। আবার এই যুগেই তাদের দানবিক অস্তিত্ব পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গিয়েছিল। অন্যদিকে খুব ছোটো ছোটো পোকার আবির্ভাব হয়েছিল। তারা সারা পৃথিবী ছেয়ে ফেলেছিল।
—ঠিক বলেছেন। যাবেন না কি ওই সব দানবাকৃতি সরিসৃপ আর ছোটো ছোটো পোকা দেখতে?
—যাওয়া যাবে? ইন্দ্রজিৎবাবুর গলাটা কেঁপে গেল।
—তা যাবে। তবে ঝামেলা আছে। প্রথমত খরচ খুব বেশি, দ্বিতীয়ত অত দূরের যুগে থাকবার সময় খুব কম, আর তৃতীয়ত আমাদের মনস্তত্ববিদ আপনাকে পরীক্ষা করে আপনি মানসিকভাবে সুস্থ বললে তবেই আপনাকে যেতে দেওয়া হবে।
—সে আবার কী? প্রথম দুটো তো বুঝলুম, শেষ নিয়মটা কেন?
—তার কারণ, জীবনের বিবর্তনে কোনোরকম বিশৃঙ্খলা যাতে না-হয়, সেটা আমরা সুনিশ্চিত করতে চাই। বুঝিয়ে বলি। পৃথিবীর বুকে যখন থেকে প্রাণ এসেছে, তখন থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত জীবজগতের পশুপাখি, গাছপালা, কীটপতঙ্গ একের পর এক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে আজকের অবস্থায় এসে পৌঁছেছে। এই পরিবর্তগুলো পশুপাখির আলাদা, গাছপালার আলাদা বা কীটপতঙ্গের আলাদা— এরকম নয়। এদের প্রত্যেকটার সঙ্গে প্রত্যেকটার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগ আছে। এই যোগসূত্রটা যদি কোথাও ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে বিবর্তন চলতে থাকলেও সেটা একটু পালটে যাবে। দু-পাঁচশো বছরে তার ফলটা হয়তো বোঝা যাবে না, কিন্তু পঁচিশ-তিরিশ লক্ষ বছরে সেটা যথেষ্ট বোধগম্য হবে।
যেমন ধরুন, আজ থেকে এক লক্ষ বছর পেছনে চলে গিয়ে আপনি একটা পাখি মারলেন যেটার সে সময় মরবার কথা নয়। সেটা বেঁচে থাকলে যা হত, এবার তা হবে না। কিছু অন্যরকম হবে। আবার তার প্রভাব পড়বে অন্য প্রাণীদের ওপর। ফলে, আপনি যখন এক লক্ষ বছর পেরিয়ে ফিরে আসবেন বর্তমান সময়ে, তখন দেখবেন আপনার চারপাশে কোথাও না-কোথাও কিছু না-কিছু পালটে গেছে। আপনার আশেপাশে যারা আছে, তারা সেটা বুঝতে পারবে না, কারণ আপনার বিবর্তন আর বাকি সকলের বিবর্তন একরকম হয়নি।
ইন্দ্রজিৎবাবু একটু উদবিগ্ন হয়ে বললেন— সেটা কীরকম হবে?
—সেটা তো সঠিক বলা যায় না। বিবর্তন তো কোনো ধরাবাঁধা পথ দিয়ে চলে না। এটা কীভাবে হয়, তা এখনও বিজ্ঞানীদের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে। হয়তো, আপনি ফিরে এসে দেখলেন মানুষের একটা কান বড়ো আর একটা কান ছোটো হয়ে গিয়েছে। আপনার একই মাপের দুটো কান দেখে সবাই হাসাহাসি করছে। অথবা দেখলেন যে গোরুর ডাক পালটে গেছে। তারা কোঁকরকোঁ করছে আর মুগরিরা হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে। তাতে একমাত্র আপনিই আশ্চর্য হচ্ছেন, আর কেউই হচ্ছে না। কাজেই, বিবর্তনের ধারা অপরিবর্তিত রেখে এইসব হাঁসজারু মার্কা গণ্ডগোল এড়ানোর জন্যেই আমাদের এই সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। আপনি যদি বোকা বা পাগল বা একগুঁয়ে হন তখন আপনাকে আমরা যেতে দেব না; কোটি টাকা দিলেও না। আমাদের সব উপদেশ আপনাকে সঠিকভাবে বুঝতে হবে, মানতে হবে। এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেওয়া চলবে না।
এই যে আপনি মেসোজোয়িক যুগে যেতে চাইছেন, সেখানে গিয়ে একটা বাচ্চা ট্রাইসেরাটপস দেখে হয়তো আপনার খুব পছন্দ হল। ভাবলেন, কী মিষ্টি দেখতে! এটাকে নিয়ে যাই, পুষব। কেউ টের পাবে না, কিচ্ছু হবে না। তা করলে চলবে না। আমাদের সমস্ত উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবার মতো স্বভাব আর মনের জোর যদি আপনার থাকে, তাহলেই আপনি যেতে পারবেন।
ইন্দ্রজিৎবাবু একটু চিন্তা করে বললেন— ঠিক আছে। আমি যাব। এই আমার কার্ড। আপনি আমার ব্যাঙ্কে খোঁজ নিয়ে যা করবার করে ফেলুন। ইতিমধ্যে আপনাদের মনস্তত্ববিদদের সঙ্গে আমার কথাবার্তা যা হবার হয়ে যাক।
সময়সরণি যন্ত্রটা একটা চকচকে ধাতুর তৈরি ছোটো ঘরের মতো। ভেতরে নানারকমের যন্ত্রপাতি, তাতে লাল নীল সবুজ আলো জ্বলছে নিভছে। ঘরের মাঝখানে একটা মস্ত গদিমোড়া চেয়ার, অনেকটা যেমন সেলুনে দেখা যায় তেমনি। ঘরের একপাশে ভেতরে ঢোকার ধাতব দরজা। জানলা-টানলা কিছু নেই।
একজন আপ্যায়ন বিভাগের মহিলার মতোই ইউনিফর্ম পরা ভদ্রলোক ইন্দ্রজিৎবাবুকে নিয়ে এসে চেয়ার বসিয়ে দিলেন। বললেন— যা বলছি, খুব মন দিয়ে শুনুন। আমরা সময়সরণিকে মেসোজোয়িক যুগের শেষদিকের কোনো এক সময়ে সেট করে দিয়েছি। আপনি এই সবুজ বোতামটা টিপলে চোখের নিমেষে সেখানে পৌঁছে যাবেন। এই হলদে আলোটা জ্বললে বুঝবেন যে আপনি পৌঁছে গেছেন তখন আপনি চেয়ার ছেড়ে উঠবেন আর সঙ্গেসঙ্গে এই দরজাটা খুলে যাবে। আপনি দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দরজার তলা থেকে একটা তীব্র নীল আলোর এক মিটার চওড়া পথ সামনের দিকে প্রায় তিরিশ মিটার পর্যন্ত চলে যাবে। এই আলোটা গাছপালা বাড়িঘর সব কিছু ভেদ করে চলে যেতে পারে। আপনি এই আলোর পথ দিয়ে চারদিক দেখতে দেখতে এগিয়ে যাবেন। এই পথের ওপরে থাকলে কেউ আপনাকে দেখতে পাবে না বা স্পর্শ করতে পারবে না, আর আপনিও এই পথের ওপরে কোনো কঠিন বস্তুর বাধা থাকলেও তা ভেদ করে চলে যেতে পারবেন।
ভুলেও এই পথের বাইরে যাবেন না। গেলে আপনার নিরাপত্তার কোনো দায়িত্ব আমাদের থাকবে না। আপনি ওখানে থাকবার সময় পাবেন দশ মিনিট। তার মধ্যে আপনাকে সময়সারণিতে ফিরে আসতে হবে। আট মিনিট পার হলে দরজার ওপরে একটা ঘণ্টা বাজবে আর একটা লাল আলো জ্বলে উঠবে যাতে আপনি বুঝতে পারেন যে ফেরার সময় হয়েছে। সাড়ে দশ মিনিট বাদে নীল আলোর পথটা নিভে যাবে। কাজেই, সে ব্যাপারে খুব সাবধান।
সময়সারণিতে ফিরে চেয়ারে বসে আবার সবুজ বোতামটা টিপবেন। দরজা নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যাবে। আর, তৎক্ষণাৎ আপনি বর্তমান সময়ে পৌঁছে যাবেন।... সব বুঝতে পেরেছেন তো? কোনো প্রশ্ন আছে?
ইন্দ্রজিৎবাবু মাথা নাড়লেন।
দরজার বাইরে তাকিয়ে ইন্দ্রজিৎবাবু বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। এ কী দেখছেন? কোথায় কলকাতা শহর? তার জায়গায় বিশাল বিশাল মহীরুহের গভীর জঙ্গল, তাদের ডালপালায় মাথার ওপরে আকাশ প্রায় দেখাই যায় না। গাছের নীচে এক মানুষ উঁচু নিশ্চিদ্র ঝোপঝাড়। যেটুকু আকাশ দেখা যাচ্ছে তা অন্ধকার করে রেখেছে ঘন মেঘের স্তূপ, বৃষ্টি পড়ছে অনবরত। মাঝে মাঝে তীব্র চোখ ঝলসানো বিদ্যুতের আলো আর কান ফাটানো মেঘের গর্জন শোনা যাচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর থেকে নানা রকমের অদ্ভুত অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসছে— সেগুলো শুনলে আনন্দ হয় না, বুকের রক্ত জল হয়ে যায়। কখনো কখনো আশেপাশে ধুপ ধুপ করে শব্দ হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন ভীষণ ভারী কিছু চলে ফিরে বেড়াচ্ছে।
দরজার বাইরে বেরিয়ে এলেন ইন্দ্রজিৎবাবু। তাঁর পায়ের তলায় নীল পথটা আলোর বটে তবে তার ওপর দিয়ে হাঁটা যায়। তিনি দেখলেন যে পথটা সত্যি সত্যিই গাছপালা বা মাটির ঢিবি ভেদ করে চলে গেছে। বৃষ্টি যে পড়ছে তা তাঁর গায়ে লাগছে না। আওয়াজ শুনে বোঝা যাচ্ছে যে আশেপাশে জীবন্ত কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের পক্ষে তাঁর কোনো ক্ষতি করা সম্ভব নয়। মনে হচ্ছে যে তারা সময়সরণি বা ইন্দ্রজিৎবাবুকে দেখতেই পাচ্ছে না। দেখতে পেলে এতক্ষণে সামনে চলে আসত।
বেশ খোশমেজাতেই সামনে এগিয়ে চললেন ইন্দ্রজিৎবাবু আর চিৎকার করে বলতে লাগলেন— কোথায় বাবা ব্রন্টসরাস, একবার দেখা দে বাবা! আর, টাইরানোসরাস রেক্স ব্যাটাচ্ছলেই বা গেল কোথায়? এত টাকাপয়সা খরচ করে এলুম, তোদের না দেখেই চলে যাব না কি? আয় বাবারা।
হঠাৎ একজায়গায় এসে দাঁড়িয়ে গেলেন ইন্দ্রজিৎবাবু। তাঁর পাশে ঝোপের ভেতরে ফুটে রয়েছে একগুচ্ছ ফুল। প্রায় দশ সেন্টিমিটার ব্যাসের গাঢ় কমলারঙের ফুল, পাপড়ির ওপরে বেগুনি রঙের ছিটে। সেই অপূর্ব দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলেন ইন্দ্রজিৎবাবু।
—পৃথিবীর প্রথম ফুল! অসাধারণ! বিড়বিড় করে বললেন ইন্দ্রজিৎবাবু। তোলা তো যাবে না, তাহলে আবার কোথায় কী গণ্ডগোল হয়ে যাবে কে জানে! কিন্তু প্রথম ফুলের সুগন্ধ না-শুঁকে ফিরে যাব? গন্ধ শুঁকতে তা কোনো বাধা নেই। মুখটা না-হয় রুমাল বেঁধে ঢেকে রাখব যাতে কোনো পোকামাকড় নাকে-মুখে ঢুকতে না-পারে।
সেইভাবে মুখ ঢেকে ইন্দ্রজিৎবাবু আলোর রাস্তা থেকে গলা বাড়িয়ে দিলেন ফুলগাছের দিকে। কোথায় সুগন্ধ? একটা বিকট পচা দুর্গন্ধে চমকে মুখ তুলে ইন্দ্রজিৎবাবু দেখলেন যে তাঁর থেকে কুড়ি মিটার দূরে দুটো অতিকায় গাছের ফাঁক দিয়ে প্রায় চারতলা বাড়ির উচ্চতা থেকে একজোড়া নৃশংস ক্রুর চোখ তাঁর দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। সে তো ইন্দ্রজিৎবাবুর শরীরটা দেখতে পাচ্ছে না তাই বোধ হয় বোঝবার চেষ্টা করছে যে দেহহীন মুণ্ডুটা খাদ্যবস্তু কি না। তার এবড়ো-খেবড়ো দাঁতওয়ালা প্রকাণ্ড কদাকার মুখের ভেতর থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
টাইরানোসরাস রেক্স! বেশিক্ষণ অবাক হয়ে চিন্তা করবার মতো মগজের ক্ষমতা এর নেই। এক্ষুনি আক্রমণ করবে। ভাবলেন ইন্দ্রজিৎবাবু। আর তৎক্ষণাৎ তাঁর মাথাটা ঢুকিয়ে আনলেন আলোর পথের ভেতরে। ঠিক সেই মুহূর্তে টাইরানোসরাসটার প্রকাণ্ড বিভৎস মুখটা অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ফুলগাছটার ওপরে এসে পড়ল। ভয়ংকর আতঙ্কে দিশেহারা ইন্দ্রজিৎবাবু লাফিয়ে উঠে ধপাস করে পড়ে গেলেন। তারপর কোনোরকমে নিজেকে অজ্ঞান হতে না-দিয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে সময়সরণির দিকে নিজেকে টেনে নিয়ে গেলেন।
দরজার কাছে এসে পেছন ফিরে দেখলেন সেই চারতলা সমান উঁচু ভয়ংকর প্রাণীটা তার পেছনের পায়ের ওপরে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে আর তার প্রকাণ্ড ল্যাজটা এপাশে-ওপাশে আছড়াচ্ছে। তার পায়ের নীচে মরে পড়ে আছে একটা রঙিন বড়োসড়ো প্রজাপতি। সে বেচারি বোধ হয় ওই ফুলটার মধু খাওয়ার লোভেই ওখানে এসেছিল।
সময়সরণির চেয়ারে বসে ইন্দ্রজিৎবাবু ভাবলেন, প্রজাপতিটা যে মরল, তাতে কি বিবর্তনে কোনো অদলবদল হবে? প্রজাপতিটাকে তো আমি মারিনি, মেরেছে ওই ব্যাটা দাঁত-না-মাজা টাইরানোসরাস রেক্স। তবে কি না, প্রজাপতিটার তখন মরবার কথা ছিল না। প্রত্যক্ষভাবে না-হোক, পরোক্ষভাবে আমিই কিন্তু তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী। যাক গে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। ওই একটা তুচ্ছ প্রজাপতির জন্যে কী আর এমন মহামারি পরিবর্তন হবে?

বিজ্ঞানবিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে ভয়ে ভয়ে চারদিকে দেখতে দেখতে ইন্দ্রজিৎবাবু মিষ্টির দোকানের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। লোকজন, গাড়িঘোড়া, বাড়িঘর, কোথাও কোনো পরিবর্তন নজরে পড়ল না।
বাড়ি ফিরে মিষ্টির বাক্সটা পল্লবীর হাতে দিলেন ইন্দ্রজিৎবাবু।
পল্লবী জিজ্ঞেস করলেন— সময়সরণিতে গিয়েছিলে না কি? কীরকম অভিজ্ঞতা হল?
ইন্দ্রজিৎবাবু বললেন— আর বোলো না। সে অতি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। শুনবে?
—তুমি ঘরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে বসো। আমি চা নিয়ে আসছি। তা খেতে খেতে শুনব।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ইন্দ্রজিৎবাবু তাঁর ঘরে ঢুকে জানলাটা খুলে দিলেন। সামনে বিশাল বিজ্ঞাপনটার দিকে নজর পড়ল। অমনি ওঁর গান বন্ধ হয়ে গেল। বিস্ফারিত চোখে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে খাটের ওপর বসে পড়লেন।
বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল আগামী মাসের সাত তারিখে কলকাতার মহানগর রঙ্গমঞ্চে ফাল্গুণ মিত্র আর গগণ চৌধুরির যুগ্মসংগীতের ফেণিল সুধা পান করবার জন্যে কলকাতাবাসীদের সাদর আহ্বান জানানো হয়েছে, প্রবেশমূল্য দশ হাজার টাকা।
চা নিয়ে ঘরে ঢুকলেন পল্লবী। বললেন— বলো, কী অভিজ্ঞতা হল তোমার?
ইন্দ্রজিৎবাবু মাথা নীচু করে বিছানার ওপর বসে ছিলেন। আচ্ছন্নের মতো বললেন— না, সে তেমন বলবার মতো কিছু নয়। আচ্ছা, আমাদের বাড়িতে কী সংস্কৃত ব্যাকরণ আছে?
—সংস্কৃত ব্যাকরণ? সংস্কৃত ব্যাকরণ দিয়ে কী করবে?
—কিছু না। দেখব যে ফাল্গুনে গগনে ফেনে ণত্বমিচ্ছন্তি বর্বরাঃ সূত্রটা এখনও সেখানে আছে, না আমারই জন্যে আজ তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে।
বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন