মিথ্যেবাদী

মনোজ সেন

বিনয় দাশগুপ্ত, আমাদের পাড়ার বিনুদা, একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইঞ্জিনিয়ার। বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর ডাক আসে নানা রকমের সমস্যার সমাধান করে দেওয়ার জন্য। এই কারণে তাঁকে মাঝে-মাঝেই বিদেশে উড়ে যেতে হয়। কতবার যে তিনি প্লেনে চড়েছেন তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু হলে কী হবে, প্লেনে চড়তে তাঁর ভীষণ ভয়। যখনই প্লেনে ওঠেন, তাঁর সঙ্গে থাকে এক শিশি ট্র্যানকুইলাইজারের বড়ি। ঝোড়ো আবহাওয়ায় বা এয়ারপকেটে পড়ে প্লেন একটু লম্ফঝম্ফ করলেই তাঁর বুকের ঢিপঢিপানি শুরু হয়ে যায়। তখন চটপট একটা বড়ি মুখে ফেলে দেন। এতে মনটা কিঞ্চিত শান্ত হয়, স্নায়ুর উত্তেজনাও কমে আসে।

একবার বিনুদা কলকাতা থেকে ব্যাঙ্কক হয়ে কাম্বোডিয়া যাচ্ছিলেন। তাঁর সহযাত্রী ছিল হল্যান্ড থেকে আসা একদল পুরুষ ও মহিলা টুরিস্ট। প্লেনে পেছনের দিকে প্যাসেজের ধারে সিট পেলেন তিনি, জানলার ধারে তাঁর পাশে বসলেন ওই টুরিস্টদলের একজন মহিলা। সেই দলের বাকিরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মাঝামাঝি জায়গার সিটগুলোতে বসলেন।

সেদিন আকাশ পরিষ্কার, মেঘের চিহ্নমাত্র নেই, মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। বিনুদা ভাবলেন— যাক, বেশ নিশ্চিন্ত মনে যাওয়া যাবে।

কিন্তু, মানুষ ভাবে এক, হয় অন্যরকম।

প্লেন আকাশে ওঠার কিছুক্ষণ বাদে হঠাৎ মাঝামাঝি জায়গার সিটগুলোতে প্রচণ্ড গোলমাল শুরু হয়ে গেল। শোনা গেল, একজন টুরিস্ট বিজাতীয় ভাষায় ষাঁড়ের মতো চিৎকার করছেন আর বাকি সকলে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন। সে একটা হুলুস্থুল কাণ্ড।

ব্যাপার দেখে বিনুদার পাশে বসে থাকা মহিলা উঠে গিয়ে তাঁর দলের বাকি সকলের সঙ্গে যোগ দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে দেখা গেল, একজন পাইলট বেরিয়ে এসেছেন আর তিনিও আর্তনাদরত ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা। চিৎকার আর কিছুতেই থামে না।

কিছুক্ষণ বাদে বিরক্ত মুখে ভদ্রমহিলা ফিরে গেলেন। বিনুদা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন— কী হয়েছে? ওই লোকটি অমন চিৎকার করলেন কেন?

ভদ্রমহিলা বললেন— কী জানি কী হয়েছে। পাগল-টাগল হয়ে গেছে বোধ হয়। 'প্লেন ফেরাও, প্লেন ফেরাও' বলে চিৎকার করছে আর হাত-পা ছুড়ছে। পাইলট এসে বলে গেলেন যে প্লেনের সবকিছু ঠিকঠাক চলছে, কোথাও কোনো গণ্ডগোল নেই, তাও কিছুতেই শুনছে না। যত সব!

বিনুদা হেসে বললেন— ও কিছু নয়। প্রথম বার প্লেনে চড়লে অনেকে এরকম নার্ভাস হয়ে পড়ে। এই দুটো বড়ি দিচ্ছি, খাইয়ে দিন। দেখবেন, একটু বাদেই ঠিক হয়ে যাবে। বলে পকেট থেকে ট্র্যানকুইলাইজারের শিশিটা বের করলেন।

ভদ্রমহিলা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে বললেন— প্রথম বার প্লেনে? কী বলছেন আপনি? আড্রিয়ান রয়েল ডাচ এয়ারলাইন্সের কর্মচারী, ওর জীবনের অর্ধেকটাই কেটেছে আকাশে। কখনো এরকম করে না। কিন্তু আজ ওর নাকি মনের ভেতরে ডাক এসেছে। যেকোনো কারণেই হোক, ওর ধারণা হয়েছে যে, এই প্লেনটা একটু বাদেই ভেঙে পড়বে, কিছুতেই ব্যাঙ্ককে পৌঁছাবে না। আর সেইজন্যে এমন পাগলামি করছে।

শুনে বিনুদার মুখের হাসি শুকিয়ে গেল। প্রবল ঢোঁক গিলে বললেন— বলেন কী? মনের ভেতরে ডাক এসেছে? প্লেনটা একটু বাদেই ভেঙে পড়বে? বলেই শিশির দুটো বড়ি বের করে মুখের ভেতরে চালান করে দিলেন। তারপর বললেন— এরকম ডাক কি ওই ভদ্রলোকের মাঝে-মাঝেই আসে নাকি?

—মোটেই না। এই প্রথম।

আবার দুটো বড়ি অদৃশ্য হল। বিনুদা চোখ বন্ধ করে সিটের ওপরে এলিয়ে পড়লেন।

তারপর থেকে যতবার আড্রিয়ান চিৎকার করে ওঠেন বা প্লেনটা একটু কেঁপে ওঠে, ততবারই একটা কী দুটো বড়ি বিনুদার মুখের ভেতরে চলে যায়। খাওয়া তো মাথায় উঠল, চা পর্যন্ত খেলেন না।

কিছুক্ষণ বাদে চিৎকারটা একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠল। বিনুদা আরও দুটো বড়ি খেয়ে মিনমিন করে বললেন— প্লেনটা যেন পড়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, না?

ভদ্রমহিলা বললেন— পড়ে যাবে কেন? প্লেনটা নীচে নামছে। ব্যাঙ্কক আসতে তো আর দেরি নেই।

—আপনার তাই মনে হয়? জানলা দিয়ে দেখবেন নীচে কী আছে?

—কী আবার থাকবে! পাহাড় জঙ্গল এইসব।

—পাহাড়? জঙ্গল? কোনোক্রমে কথাদুটো বলে শেষ তিনটে বড়ি মুখের ভেতরে চালান করে দিয়ে বিনুদা একেবারে নেতিয়ে পড়লেন। তাঁর আর তখন হাত-পা নাড়ারও ক্ষমতা নেই। গলা দিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ আওয়াজ বেরচ্ছে। একেবারে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগের অবস্থা।

ব্যাপার দেখে সহযাত্রিণীটি ভয় পেয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি এয়ারহোস্টেসকে ডেকে আনলেন। তিনিও চিন্তিত। বললেন— আমি ব্যাঙ্কক বিমানবন্দরকে খবর দিচ্ছি, তারা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করবে।

কিছুক্ষণ বাদেই প্লেন একেবারে নির্বিঘ্নে ব্যাঙ্কক বিমানবন্দরে নামল। যাত্রীরা একে-একে প্লেন থেকে নামতে শুরু করলেন। বিনুদা তাঁর চেয়ারে আচ্ছন্নের মতো পড়েই রইলেন অ্যাম্বুলেন্সের প্রতীক্ষায়।

প্রায় সবাই যখন নেমে গেছে, তখন তাঁর সহযাত্রিণী এক বিশালকায় ভদ্রলোককে রীতিমতো টানতে টানতে তাঁর কাছে গিয়ে এলেন। ক্রুদ্ধ গলায় বললেন— দ্যাখো আড্রিয়ান, তোমার নির্বোধ লম্ফঝম্ফ এই ভদ্রলোকের কী অবস্থা করেছে!

আড্রিয়ান অত্যন্ত লজ্জিত আর বিনীতভাবে বিনুদাকে বললেন— স্যার, আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?

বিনুদা কথা বলতে পারলেন না। খুব ধীরে-ধীরে ওপরে-নীচে মাথা নাড়লেন।

আড্রিয়ান বললেন— স্যার, আপনি তো জানেন যে আমাদের সকলেরই মনের ভেতরে একটি ভবিষ্যদদ্রষ্টা শক্তি লুকিয়ে থাকে। সে কখনো কখনো আমাদের বিপদ সম্পর্কে আগেভাগে সাবধান করে দেয়। একেই বোধ হয় অন্তর্যামী বলে। তা স্যার, আমার অন্তর্যামীটি যে একেবারে ডাহা মিথ্যেবাদী সেটা আমি মোটেই জানতুম না। তাই এরকম ব্যবহার করেছি। আমাকে মার্জনা করে দেবেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%