মনোজ সেন

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার নারায়ণপুর মৌজার মণিমোহনতলা এককালে নিতান্তই একটি সাধারণ গ্রাম ছিল। কলকাতার দশ-পনেরো কিলোমিটারের মধ্যে এই গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই ছিলেন দরিদ্র চাষি নয়তো কুমোর। একটাই পাকা বাড়ি ছিল। প্রায় দু-বিঘে জমির ওপরে নীচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা সাধারণ দোতলা ইমারত। তার সামনে একটি বড়োসড়ো বাগান, পিছনে তরিতরকারির খেত। এ বাড়ির মালিক, সিংহ পরিবার। একসময় তাঁরাই ছিলেন গ্রামের জমিদার।
আজ মণিমোহনতলার চেহারাই আলাদা। কলকাতা শহর বাড়তে বাড়তে তাকে ছাড়িয়ে আরও দক্ষিণে চলে গেছে। ঝকঝকে নতুন বাড়িগুলো দেখলে তার অতীতের চেহারাটা কেউ কল্পনাই করতে পারবে না। কুঁড়েঘরগুলোর আর কোনো চিহ্নই নেই।
এতসব প্রাচুর্যের মধ্যে অতীতের একমাত্র সাক্ষী হয়ে সসংকোচে দাঁড়িয়ে রয়েছে সিংহদের বাড়িটা। ছিয়াত্তর বছরের বৃদ্ধ কনকলতা সিংহ আর তাঁর বড়ো ছেলে ইন্দ্রকুমার ছাড়া ওই পরিবারের কেউ-ই এখন আর সবসময়ের জন্য ও বাড়িতে থাকেন না। ইন্দ্রকুমার ওয়েস্টার্ন রেলের চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন, সম্প্রতি রিটায়ার করে ফিরে এসেছেন পশ্চিমবাংলায়। কনকলতার নাতিনাতনিরা বছরে একবার পুজোয় সময় আসে। বছরের বাকি দিনগুলো যেন তাদের আশাতেই কাটিয়ে দেন তিনি।
আর একটি পরিবার ওই বাড়িতে থাকে। বিদ্যাধর পাত্র আর তার স্ত্রী মনোরমা। বিদ্যাধর প্রায় চল্লিশ বছর আগে মেদিনীপুর থেকে এ বাড়িতে এসেছিল চোদ্দো বছর বয়সে। সেই থেকে এখানেই রয়ে গেছে। কনকতলার সকল কাজের কাজি সে। তিনি তাঁর সব কাজের ভার ওর ওপরে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে আছেন। বাড়ির আর বাগানের দেখাশুনো থেকে শুরু করে টাকাপয়সার হিসাব— সবই তার দায়িত্বে।
মনোরমা কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্ত। তার জীবনের একমাত্র নেশা হল কাপড় কাচা, সেসব শুকোতে দেওয়া আর ইস্তিরি করা। আগে যখন বাড়িতে অনেক লোকজন থাকত, তখন তাকে অনেক কাপড় কাচতে হত, আজ তা হয় না— এটাই বোধ হয় তার জীবনের একমাত্র দুঃখ। তবে, এর ফলে বাড়ির সব কটা ঘরের বিছানার চাদর, পর্দা ইত্যাদি সবসময় একেবারে ফিটফাট থাকে।
কনকলতার মেজোছেলে নন্দকুমার সিংহ সাগরের স্কুলের হেডমাস্টার। বছর পঞ্চাশেক বয়েস, দশাসই চেহারা আর প্রচণ্ড বদরাগী। এই রাগের জন্যেই নাকি তাঁর মাথাজোড়া টাক। শুঁয়োপোকার মতো তাঁর একজোড়া ভুরু সবসময়ই কুঁচকে আছে। বলাই বাহুল্য যে তাঁকে সবাই প্রচণ্ড ভয় করে। এন. কে. সিংহকে ছাত্ররা চিরকাল নরখাদক সিংহ বলেই জেনে এসেছে।
এইসব কারণে সাগরের যখন হেডমাস্টারমশায়ের ঘরে ডাক পড়ল, তখন কেবল সে নয়, ক্লাসসুদ্ধু ছেলেমেয়ে ভয়ানক চিন্তিত হয়ে পড়ল। তখন বাংলা ক্লাস চলছিল, ক্লাস নিচ্ছিলেন রমেনবাবু। তিনিও খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বললেন— কী করছিস রে, সাগর? কী গণ্ডগোল পাকালি আবার? যা, শিগগির যা।
সাগরের বন্ধুরা ফিসফিস করে কেউ বলল— জুতো মুছে ঢুকবি। কেউ বলল— চুল আঁচড়ে নে। কেউ বলল— প্যান্টের ভেতরে ভূগোল বইটা ঢুকিয়ে নিয়ে যা, বেত মারলে লাগবে না।
সাগর কাঁপতে কাঁপতে হেডমাস্টারমশায়ের ঘরে ঢুকল। উনি তখন চকচকে টাকমাথা নীচু করে কীসব কাগজপত্র দেখছিলেন। সাগরকে ঢুকতে দেখে মুখ তুলে হাসলেন। তাই দেখে সাগর আরও নার্ভাস হয়ে পড়ল। তার মনে হল ভয়ংকর কিছু একটা নিশ্চয়ই ঘটেছে, নইলে নরখাদক তাকে দেখে হাসবে কেন? কেউ যাঁকে কোনোদিন হাসতে দেখেনি, তাঁকে হাসতে দেখলে ভয় পাওয়ারই কথা।
হেডমাস্টারমশাই বললেন— বসো, সাগর। তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
সাগর বলল— বসব স্যার? আমি বরং দাঁড়িয়েই থাকি। আপনি বলুন কী বলবেন।
—ঠিক আছে, আচ্ছা, আমি শুনেছি যে তুমি নাকি শখের ডিটেকটিভ। কথাটা কী সত্যি?
সাগর বিড়বিড় করে বলল— না, স্যার, তেমন কিছু নয়। মাঝে মাঝে দু-একবার মাথা খাটাবার সুযোগ পেয়েছি, এইমাত্র।
—বেশ, বেশ। দ্যাখো, আমার একটা প্রবলেম আছে। সে ব্যাপারে মাথা খাটাতে রাজি আছ?
—নিশ্চয়ই, স্যার। আপনি বললে অবশ্যই রাজি আছি।
—বেশ। এবার তাহলে বসো। আমি তোমাকে আমার প্রবলেমটা বিস্তারিতভাবে বলি।
হেডমাস্টারমশাই তাঁর মণিমোহনতলায় পরিবার আর তার পুরোনো ইতিহাসের কথা বলেন। লর্ড কার্জনের আমলে জমিদারির পত্তন হয়। আদায়পত্র এমন কিছু গেয়ে বেড়াবার মতো কোনো কালেই ছিল না। কাজেই গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য পরিবারের সকলকেই লেখাপড়ার দিকে যেতে হয়েছে। তার ফলে, পরিবারে প্রায় সকলকেই কলকাতা বা ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরে চলে যেতে হয়েছে। তবে যে যেখানেই যান না-কেন, তাঁদের শেকড়টা কিন্তু রয়ে গেছে মণিমোহনতলাতেই।
একমাত্র ব্যতিক্রম হেডমাস্টারমশায়ের বাবা বিষ্ণুপদ সিংহ। তিনি ছিলেন আদর্শবাদী ডাক্তার। পাশ করে গ্রামে ফিরে আসেন এবং চিকিৎসা শুরু করেন। তাঁর খ্যাতি অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। কলকাতা, পাটনা এমনকী লক্ষ্নৌ থেকেও তাঁর ডাক আসত। কাজেই, তাঁকে কোনোদিন অর্থাভাবে ভুগতে হয়নি বা তাঁর গ্রামের গরিব মানুষদের বিনে পয়সায় চিকিৎসা করতেও কোনো অসুবিধে হয়নি।
বিষ্ণুপদর তিন ছেলে, এক মেয়ে। ছেলেরা হলেন ইন্দ্রকুমার, নন্দকুমার আর নবকুমার। মেয়ের নাম ইরা, তাঁর বিয়ে হয়ে গেছে, থাকেন চেন্নাইতে। ইন্দ্রকুমার বিপত্নীক। তাঁর ছেলেমেয়েরা মুম্বাই, পুনা আর বরোদায় থাকে। নন্দকুমারের দুই ছেলে। বড়োজন আর্কিটেক্ট, তাঁর হেয়ার স্ট্রিটে নিজস্ব অফিস আর ছোটোজন তার জ্যাঠামশায়ের মতো চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, থাকেন কানপুরে। নবকুমার অবিবাহিত। তিনি আমেরিকায় থাকেন, তবে মাঝে মাঝে দেশে আসেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ান আর বাঙালি ছেলেমেয়েদের রবীন্দ্রসংগীত শেখান।
যে সমস্যা নিয়ে হেডমাস্টারমশাই সাগরকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন, সেটা শুরু হয় ইন্দ্রকুমার আর মণিমোহনতলায় পাকাপাকিভাবে চলে আসবার তিন-চারমাস পর থেকে, হঠাৎই সারা বাড়িতে একটা অদ্ভুত গন্ধ পেতে শুরু করে সবাই। গন্ধটা অম্বুরি তামাকের। হেডমাস্টারমশায়ের ছোটো ঠাকুরদা এই তামাক খেতেন। তাঁর বাবাও শেষবয়সে এই তামাক ধরেছিলেন। কেবল বাতাসে নয়, বিছানার চাদরে, পর্দায়, এমনকী তোয়ালেতেও এই গন্ধ পাওয়া যেতে লাগল। মনোরমা তটস্থ হয়ে উঠেছে আর অনবরত কাপড় কেচে যাচ্ছে। অথচ, সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও কোনো অম্বুরি তামাকের সন্ধান পায়নি কেউ।
এখানেই শেষ নয়। শেষরাত্রের দিকে মাঝে মধ্যে একটা আতরের গন্ধও ভেসে আসে। এটা সাধারণ আতর নয়। ডা. বিষ্ণুপদ সিংহের লক্ষ্নৌ-এর এক রুগি তাঁকে এই বিশেষ আতরটি কখনো কখনো পাঠাতেন।
এই ঘটনার ফলে সিংহ পরিবারের সকলে আতঙ্কিত না হলেও, বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। কারুর যে-কোনো ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা তাঁরা মনে করছেন না। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটবে কেন?
একটা কারণ থাকবে তো ঘটনার পিছনে। আজ না হয় গন্ধের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, কাল যে আরও বিপজ্জনক কিছু ঘটবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়?
হেডমাস্টারমশাই বললেন— এই কারণটা খুঁজে বের করবার জন্য অনুরোধ জানাতেই তোমাকে ডেকে এনেছি। দেখবে নাকি একটু মাথা খাটিয়ে?
সাগর বলল— স্যার, দেখব তো বটেই। তবে, তার আগে কি আমি কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?
—নিশ্চয়ই পারো। বলো কী জানতে চাও?
—আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত ডিটেকটিভকে না-ডেকে আমাকে ডাকলেন কেন?
হেডমাস্টারমশাই ম্লান হেসে বললেন— তার কারণ, একজন প্রতিষ্ঠিত ডিটেকটিভ ডাকলে ব্যাপারটা আমাদের পরিবারের বাইরের লোকদের মধ্যে জানাজানি হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। তা যদি হয়, তাহলে অনেকেই হাসাহাসি করবে আর বলবে, দেখেছ, সিংহ বাড়ির লোকেরা ভূতের ভয় পাচ্ছে। ঘটনাটা যে তা নয়, সেটা তাদের বোঝানো যাবে না।
—সে তো স্যার, আমিও কথাটা পাঁচজনকে বলে বেড়াতে পারি।
—না, তা পারো না। কারণ, তুমি ভালো করেই জানো যে তা করলে নরখাদক সিংহ তোমাকে জ্যান্তো চিবিয়ে খাবে।
অনেক কষ্টে হাসি চেপে গম্ভীর মুখে সাগর বলল— এবার স্যার দ্বিতীয় প্রশ্ন। গন্ধটা কী বাড়িতে যখন অনেক লোকজন থাকে তখনও পাওয়া যায়, না কেবল মোটামুটি খালি বাড়িতেই পাওয়া যায়?
হেডমাস্টারমশাই বললেন— খালি বাড়িতেই বেশি পাওয়া যায়। তবে লোকজন থাকলেও যে পাওয়া যায় না, তা নয়।
—আপনাদের ওখানে তো জমির অনেক দাম। প্রোমোটাররা আসে না আপনাদের বাড়িটা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে?
—আসে না আবার? অনবরত আসছে। টাকার থলি নিয়ে বসে রয়েছে সবাই। কেউ দেখাচ্ছে লোভ, কেউ দেখাচ্ছে ভয়। বেশ কিছুদিন আগে একজন তো আমার মা আর দাদাকে বলে গেল, ইয়ে কোঠি আপকো ছোড়না পড়েগা। তারপরে একটু উৎপাতও শুরু করেছিল। দাদা তো বেশ ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলেন। তখন সদ্য এসেছেন ওখানে, ভয় পাওয়ারই কথা। পরে সেই প্রোমোটার যখন জানতে পারল যে ডিসি সাউথ সঞ্জয় বোস আমার ছাত্র, তখন সে গা ঢাকা দিল।
—আপনার বাবা বা ঠাকুরদাদার মুখে অতীতে এই ধরনের কোনো উপদ্রবের কথা কি শুনছেন কখনো?
—না। কখনো না।
—আপনার দাদা কি তামাক বা সিগারেট খান বা কখনো খেতেন?
—না, আমাদের ভাইয়েদের ওই নেশা কস্মিনকালেও ছিল না। দাদা তো সিগারেটের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
—আমি কি একবার আপনাদের বাড়িতে যেতে পারি, আর ওখানে যাঁরা থাকেন তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারি?
—অবশ্যই পারো। আমি আগামী শনিবার গাড়ি নিয়ে তোমার বাড়িতে যাব বেলা দুটো নাগাদ। তোমার বাবা-মাকে জানিয়ে রেখো, আমি তাঁদের সঙ্গে কথা বলে নেব। সন্ধে ছ-টার মধ্যেই ফিরে আসতে পারব আমরা।
—আর একটা কথা স্যার। আমার বোন শ্রীলতাও আমার সঙ্গে যাবে। সে এই স্কুলেই ক্লাস টেনে পড়ে। ও আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। আমি না বললে মুখ খুলবে না। কোনো অসুবিধে হবে না তো?
—ক্লাস টেনের শ্রীলতা, মানে আমাদের ব্যাডমিন্টন টিমের শ্রীলতা চৌধুরি? না, না, কোনো অসুবিধে হবে না।
সাগর যখন ক্লাসে ফিরল, তখন বাংলা ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। অঙ্ক স্যার নিরঞ্জনবাবু তখনও এসে পৌঁছননি। ও ঢোকামাত্র সবাই ঘিরে ধরল। অজস্র প্রশ্ন— নরখাদক কেন ডেকেছিল, কী করেছিস তুই, খুব মেরেছে না কি ওঠ-বোস করিয়ে ছেড়ে দিয়েছে, স্কুলে নাম কেটে দেয়নি তো, ইত্যাদি ইত্যাদি।
সাগর প্রবল বেগে মাথা নেড়ে বলল— না, না, ওসব কিছু নয়। আমাকে শুধু বললেন, এ বছরটা খেলাধুলো বন্ধ রেখে পড়াশুনোয় বেশি করে মন দিতে। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতেই হবে।
ফার্স্টবয় সুপ্রতীক বলল— আর কাউকে না-ডেকে শুধু তোকে ডাকল কেন? আমাকেও তো ডাকতে পারত।
মনীষা বলল— বোকার মতো কথা বলিস না তো। ওকে ডেকেছিল খেলতে বারণ করবার জন্য। সেজন্য তোকে ডাকবে কেন? তুই কোনোদিন ফুটবলে পা লাগিয়েছিস?
বেশ একটা ঝগড়া বেঁধে গেল। ভালোই হল। সাগর আর বলবার কোনো সুযোগই পেল না যে নরখাদক সিংহের বাইরেটা যতই ভয়ংকর হোক না-কেন, তার ভেতরে একটা রসিক মানুষ লুকিয়ে আছে। অবশ্য বললেও কেউ বিশ্বাস করত না।
হেডমাস্টারমশাই-এর পিছনে পিছনে তাঁদের বাড়িতে ঢোকামাত্র গন্ধটা পেল সাগর আর শ্রীলতা। একটা মিষ্টি-মিষ্টি অথচ সোঁদা-সোঁদা গন্ধ।
হেডমাস্টারমশাই বললেন— একটা গন্ধ পাচ্ছ তোমরা? এটা অম্বুরি তামাকের গন্ধ।
শ্রীলতা ফিসফিস করে বলল— আমার কেমন ভয় করছে রে, দাদা।
সাগরও ফিসফিস করে বলল— দূর, দিনদুপুরে আবার ভয়ের কী আছে? গন্ধ তো নয় মন্দ।
সাগরের শেষ কথাটা হেডমাস্টারমশাই-এর কানে গেল। মৃদু হেসে বললেন— যা বলেছ। এসো, এবার তোমাদের বাড়ির সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। চা-এর সময় হয়েছে, সকলকেই এখন বসবার ঘরে পাওয়া যাবে।
বসবার ঘরটা একতলায়। আয়তনে বেশ বড়ো, মেঝে জুড়ে কার্পেট আর দেওয়ালে অজস্র ছোটো-বড়ো ফোটোগ্রাফ আর অয়েলপেন্টিং। সেখানে কয়েকটি প্রাচীন অতিকায় সোফার ওপরে তিনজন বসে ছিলেন। একজন বৃদ্ধ মহিলা আর অন্য দু-জন সুদর্শন ভদ্রলোক। তাঁদের একজন প্রৌঢ় আর অন্যজন মনে হল যৌবনের প্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। স্পষ্টতই, প্রথম জন ইন্দ্রকুমার আর অপরজন নবকুমার। তাঁদের মা বৃদ্ধা হলেও অত্যন্ত শক্তপোক্ত আর প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। তাঁর মেজোছেলে যে তাঁর কাছ থেকে চরিত্রটি পেয়েছেন, তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। অথচ, ইন্দ্রকুমারকে মনে হল নিতান্ত নার্ভাস প্রকৃতির মানুষ। অনবরত নখ খেয়ে যাচ্ছেন। নবকুমার আবার অন্যরকম। তিনি রসিক মানুষ, মুখে সবসময় একটি রহস্যপূর্ণ ব্যঙ্গাত্মক হাসি লেগে আছে।

নবাগতরা ঘরে ঢোকামাত্র নবকুমার প্রশ্ন করলেন— এই তোমার বাচ্চা শার্লক হোমস, ছোড়দা? আর ইনি? বাচ্চি ওয়াটসন? এঁরাই রহস্যভেদ করবেন বুঝি?
প্রশ্নের প্রচ্ছন্ন খোঁচাটা এড়িয়ে গেলেন হেডমাস্টারমশাই। বললেন— বুড়ো শার্লক হোমস যখন পাচ্ছি না, তখন বাচ্চা শার্লক হোমস ছাড়া উপায় কী বল? বলে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন।
নবকুমার বললেন— পরিচয় তো হল, এবার কী-কী প্রশ্ন আমাকে করবার আছে সেগুলো করে ফেলুন মি. হোমস।
মৃদু হেসে সাগর বলল— আপনাকে নয়, আগে ওঁকে প্রশ্ন করব। বলে, ইন্দ্রকুমারকে জিজ্ঞাসা করল— আপনি তো রেলওয়ের চিফ অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন। আপনি ভালো বলতে পারেন। এই বাড়িটা বিক্রি করলে এখন কীরকম দাম পাওয়া যাবে?
প্রবল বেগে নখ খেতে খেতে ইন্দ্রকুমার বললেন— তা প্রায় এক কোটি কুড়ি লক্ষ টাকা হবে খোলা বাজারে। আর যদি প্রেমোটারকে দেওয়া হয় তাহলে আমরা ভাইবোনেরা আর মা প্রত্যেকে একটা করে ফ্ল্যাট আর চোদ্দো লক্ষ করে টাকা পাব।
—তার মানে, সকলের একটি আধুনিক ফ্ল্যাট থাকবে আর বাকি জীবনটা স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে দেবার মতো সুযোগ পাওয়া যাবে, তাই তো?
কিঞ্চিত উত্তেজিতভাবে ইন্দ্রকুমার হাত নেড়ে বললেন— ঠিক তাই। আমি তো সে কথাই সবাইকে বোঝাবার চেষ্টা করছি কিন্তু বুঝতে চাইছে না। আর এখন তো সে প্রশ্ন আর ওঠেই না। আমরা সবাই যখন বাবার উপস্থিতি সর্বদাই অনুভব করছি তখন এ বাড়ি কি বিক্রি করা সম্ভব?
ইন্দ্রকুমার হয়তো আরও কিছু বলতেন কিন্তু তাঁর মা-র চোখে চোখ পড়ায় চুপ করে গিয়ে পুনরায় প্রবল বেগে নখ খেতে শুরু করে দিলেন।
কিছুটা যেন তাঁর দাদাকে চুপ করানোর জন্য নবকুমার তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন— এবার কী আমার পালা?
সাগর বলল— আমি একটু বাড়িটা ঘুরে দেখব তারপরে হয়তো আপনার পালা আসবে। তবে, তার আগে আপনাদের সবাইকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। রোজ আপনাদের মধ্যে সকলের আগে ঘুম থেকে কে ওঠেন?
প্রশ্নটা শুনে শ্রোতারা সকলেই একটু আশ্চর্য হলেন। কনকলতা বললেন— আমি। সূর্য ওঠার আগে স্নান করি তারপর পুজোয় বসি।
—ঘুম থেকে ওঠার সঙ্গেসঙ্গে কি চা খান?
বেশ বিরক্তভাবে কনকলতা বললেন— হ্যাঁ, খাই। তবে আমি চা খাই কী না-খাই তার সঙ্গে গন্ধের কী সম্পর্ক?
—সেটা পরে বলব। চা কি আপনি নিজে করেন?
—না। মনোরমা করে এনে দেয়। কনকলতাকে আরও বিরক্ত মনে হল।
অবিচলিত সাগর হেডমাস্টারমশাই-এর দিকে তাকিয়ে বলল— স্যার, এই বাড়িতে ঢোকার সময় দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা একতলা দু-কামরার ছোটো বাড়ি দেখলুম। ওটা কী?
হেডমাস্টারমশাই বললেন— ওটা বিদ্যাধরের কোয়ার্টার্স বলতে পারো। একটা ঘরে ও আর মনোরমা থাকে, অন্যটা ওদের পুজোর ঘর।
—আমি ওই বাড়িটা একবার দেখব স্যার। আপনি শ্রীলতাকে এই বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখিয়ে দিন, আর বিদ্যাধরকে বলুন ঘরটা খুলে দিতে।
শ্রীলতা শঙ্কিত মুখে বলল— আমি স্যারের সঙ্গে যাব?
—হ্যাঁ, তুই যা। দুটো তলারই সব কটা ঘর দেখবি। কোন-কোন ঘরে গন্ধের তীব্রতাটা বেশি সেটা নোট করে নিবি।
ঘর থেকে বেরুনোর সময় ঘাড় ঘুরিয়ে সাগর দেখল নবকুমার ভুরু কুঁচকে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর মুখের ব্যঙ্গাত্মক হাসিটি অনুপস্থিত। হেডমাস্টারমশাই-এর মুখেও আষাঢ়ের মেঘ। বিদ্যাধরের বাড়িটা সাগরের একা দেখতে যাওয়াটা তিনি পছন্দ করছেন না বলে মনে হল।
পরিদর্শন সেরে সকলে প্রায় একইসঙ্গে বসবার ঘরে ফিরে এল। সাগর শ্রীলতাকে জিগ্যেস করল— সব ঘর দেখলি?
শ্রীলতা বলল— হ্যাঁ, দেখেছি। বাড়ির ওই কোণায় দোতলায় ওঠার সিঁড়ির বাঁ-পাশের ঘরেই গন্ধটা সবচেয়ে বেশি। দোতলার দুটো ঘরেও আছে তবে অতটা বেশি নয়।
কনকলতা ব্যাজার মুখে বললেন— সিঁড়ির বাঁ-পাশের ঘরটা আমার। দোতলার যে ঘরদুটোর কথা মেয়েটি বলছে, তার একটা আমার মেয়ে ইরার আর অন্যটা নন্দর। এ ব্যাপারটা আমি অনেকদিনই লক্ষ করেছি।
সাগর অভিব্যক্তিহীন মুখে কথাটা শুনল, কোনো মতামত প্রকাশ করল না। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে মুখ তুলে ঘাড় নেড়ে বলল— না! আমি পারলুম না স্যার। এ রহস্য ভেদ করা আমার সাধ্য নয়।
গাম্ভারি হেসে নবকুমার বললেন— পারলে না তো মি. হোমস? আমি জানতুম পারবে না। আমি যেখানে পারিনি, তুমি তো সেখানে শিশু।
সাগর সহাস্যে কথাটায় সায় দিল।
গাড়িতে উঠে হেডমাস্টারমশাই বললেন— তুমি কি সত্যিই রহস্যটা সমাধান করতে পারোনি?
সাগর বলল— পেরেছি, স্যার।
—তবে তুমি মিথ্যে কথা বললে কেন?
—তার কারণ, যে জন্য রহস্যটা তৈরি করা হয়েছ সেটা একটা ভালো উদ্দেশ্যে, কোনো অসদুদ্দেশ্যে নয়। এ ব্যাপারটা প্রকাশ করলে শুধু যে সেই উদ্দেশ্যটা অসফল হতে পারত তাই নয়, আপনারও অসম্মান হতে পারত।
—আমার অসম্মান? আমি আবার এর মধ্যে কোত্থেকে এলুম? কী তুমি বুঝেছ বলো তো?
—স্যার, আমি যা বুঝেছি তা হল, আপনাদের বাড়িটা বিক্রি হওয়া বন্ধ করবার জন্যই এই রহস্যটা তৈরি করা হয়েছে। আপনার দাদার, ন্যায় বা অন্যায় যেকোনো কারণেই হোক, এখন অনেক টাকার দরকার। বাড়িটা বিক্রি হলে সেই টাকাটার একটা ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারত। সম্ভবত, তার পরিমাণটা এতই বেশি যে আপনারা দুই ভাই মিলে যে তাঁকে টাকাটা দেবেন, সেটা হয়ে উঠছে না। অথচ, বাড়িটা বিক্রি হোক, তাও আপনারা বা আপনাদের মা মনেপ্রাণে চাইছেন না। সে কথাটা আবার মুখ ফুটে বলতেও পারছেন না পাছে আপনাদের দাদার মনে আঘাত লাগে। কাজেই এমন একটা রহস্য সৃষ্টি করা হল যাতে যতই প্রয়োজন থাকুক না-কেন আপনাদের দাদা এ ব্যাপারে অগ্রসর হতে না পারেন।
হেডমাস্টারমশাই চিন্তিত মুখে সাগরের কথা শুনছিলেন। বললেন— আশ্চর্য! তুমি ঠিকই ধরেছ। আমরাও বুঝতে পারছি যে দাদার এখন অনেক টাকার দরকার। কিন্তু, কত টাকা বা কীসের জন্য দরকার সেটা কিছুতেই বলছেন না। আমরাও জিগ্যেস করতে পারছি না। এদিকে এখানে এসেই বাড়ি বিক্রির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। কয়েক জনকে কথা পর্যন্ত দিয়ে ফেলে ভয়ানক গোলমাল পাকিয়ে তুলেছিলেন। এখন অবশ্য সেসব বন্ধ হয়েছে।... তবে রহস্যটা আমারই তৈরি, সে কথাটা তোমার মনে হল কেন।
—লক্ষ্নৌ-এর আতর থেকে স্যার।
—খুলে বলো।
—আপনি ভেবেছিলেন যে আমি রহস্যটা ভেদ করতে পারব না এবং ঘটনাটা যে অতীন্দ্রিয় সেটা মোটামুটি প্রমাণ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা যদি অলৌকিক কাণ্ড, প্রেতাত্মা কাণ্ড, প্রেতাত্মা, ভূত ইত্যাদি বাদ দিই, তাহলে স্যার ধরে নিতে হয় যে, কোনো মানুষই এই গন্ধ ছড়াচ্ছে। সে কে হতে পারে? আপনার মা যেরকম রাশভারি মহিলা, তাতে এ ধরনের ব্যাপার থেকে তাঁকে বাদ দিতেই হয়। আপনি বা আপনার ছোটোভাই ওখানে সবসময় থাকেন না। আর, আপনার দাদাকে দেখে বোঝাই যায় যে তিনিও হতে পারেন না। তাহলে বাকি থাকে বিদ্যাধর বা মনোরমা।
—আমি কিন্তু বাদ পড়ে গেছি।
—না, স্যার, যাননি। বিদ্যাধর আর মনোরমার ঘটে এত বুদ্ধি নেই যে তারা এমন চমৎকার একটি প্ল্যান ফেঁদে ফেলবে। তাদের দিয়ে এই কাজ কেউ করাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হল এটা তারা করেছে কীভাবে? ধোঁয়ার মাধ্যমে এটা হয়তো করা যেত কিন্তু তা করলে তৎক্ষণাৎ তারা ধরা পড়ে যেত। তাহলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই মেনে নিতে হয়, আর তা হল বিছানায় চাদর বা পর্দার সাহায্যে এটা করা হচ্ছে। তার মানে, মনোরমা কাচার সময় এই গন্ধ এগুলোতে লাগিয়ে দিচ্ছে এবং সেটা অম্বুরি তামাকের গন্ধ।
—আতর নয় কেন?
—তার কারণ, আতর দামি জিনিস। সারা বাড়িতে তার গন্ধ ছড়াতে গেলে সেটা অনেক খরচের ব্যাপার হয়ে যায়। কাজেই, কোনো কোনো ঘরে সে একফোঁটা দু-ফোঁটা করে মাঝে মাঝে দিয়ে আসে। ভোর বেলায় যখন সবাই ঘুমোন আর আপনার মা থাকেন পুজোর ঘরে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েও সে এ কাজ করছেই বা কেন? এখানে স্যার, আপনি ওর কাপড় কাচার পাগলামিটা কাজে লাগিয়েছেন। সে বুঝেছে যে এ বাড়ি বিক্রি করে সবাই যদি ছোটো ফ্ল্যাটে উঠে যায়, তাহলে তার কাপড় কাচা প্রায় বন্ধই হয়ে যাবে। এ ব্যাপারটা তার পক্ষে সহ্য করা প্রায় অসম্ভব।
হেডমাস্টারমশাই হাসতে হাসতে বললেন— সেটা অত্যন্ত সত্যি কথা। কিন্তু এটা যে আমিই তাকে বুঝিয়েছি, একথা তোমার মনে হল কেন?
—স্যার, এটা তো ঠিক যে তামাক বা আতর তাকে কেউ এনে দেয়। তামাকটা জোগাড় করা কঠিন নয়, সেটা হয়তো বিদ্যাধরই করতে পারত। শুধু যদি তামাকের গন্ধই পাওয়া যেত, তাহলে আপনি এবং আপনার ছোটোভাই, দু-জনকেই সন্দেহ করতুম। কিন্তু ব্যাপারটা জোরদার করবার জন্য আতরটা এনেই আপনি ধরা পড়ে গেলেন। লক্ষ্নৌ থেকে ওই আতরটি এনে এখানে ব্যবহার করা আপনার ছোটোভাই-এর পক্ষে অসম্ভব না হলেও অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে, আপনার ছোটো ছেলে যে কানপুরে থাকে, তার কাছে এই আতর জোগাড় করে আপনাকে পাঠিয়ে দেওয়া সহজ ব্যাপার।
হেডমাস্টারমশাই সপ্রশংস গলায় বললেন— চমৎকার! অমন অ্যানাটিক্যাল বুদ্ধি তোমার অথচ অঙ্কে সত্তরের ওপরে পাওনা কখনো। কেন? এমন করলে কখনো ফাইনালে স্ট্যান্ড করতে পারব না। শোনো সাগর, কাল থেকে তুমি স্কুলের পরে রোজ একঘণ্টা আমার কাছে অঙ্ক শিখবে, বুঝেছ?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন