দাদামশায়ের অভিজ্ঞতা

মনোজ সেন

গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে, মানে ১৯০২ কী ১৯০৩ সালে, আমার দাদামশায় জেলারের চাকরি নিয়ে আসামে গিয়েছিলেন। সে সময় আজকের মতো আসামের এত উন্নতি হয়নি। রাস্তাঘাট বেশি ছিল না। জঙ্গল খুব বেশি ছিল, এমনকী, ছোটো ছোটা শহরের চারদিকেও জঙ্গল ছিল। রেললাইন বেশি ছিল না, এক শহর থেকে আর এক শহরে যেতে হলে হয় ঘোড়ায় চড়ে যেতে হত নইলে গোরুর গাড়িতে।

এইসময় আমার দাদামশায়ের জীবনে অনেক অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর ঘটনা ঘটেছিল। অনেক মারাত্মক বিপদের মুখ থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছেন। তিনি কৃষ্ণভক্ত মানুষ ছিলেন, বিশ্বাস করতেন যে তাঁর উপাস্য দেবতা ভগবান শ্রীকৃষ্ণই তাঁকে সেইসব বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, নইলে উদ্ধারের কোনো আশাই ছিল না। আমরা, মানে তাঁর নাতিরা, যখন দুষ্টুমি করতুম বা কোনো অন্যায় কাজ করতুম, তখন সেইসব গল্প বলে উনি আমাদের শোধরাবার চেষ্টা করতেন। আমরা হাঁ করে সেইসব গল্প শুনতুম, কিন্তু তাঁর আসল উদ্দেশ্য কতদূর সফল হত সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। আমাদের তো ভক্তিটক্তি ছিল না। আমরা সেই ঘটনাগুলোর অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যাখ্যা করতুম দাদামশায়কে ক্ষ্যাপানোর জন্য। খুব রাগী মানুষ ছিলেন, ক্ষেপেও যেতেন আমাদের মন্তব্যগুলো শুনে। তবে রাগটা বেশিক্ষণ থাকত না। নাতিদের সাতখুন মাপ হয়ে যেত।

চাকরির প্রথম দিকে একবার দাদামশায়কে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে এক শহর থেকে অন্য এক শহরে যাবার সময় এক ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়তে হয়েছিল। উনি যখন খেয়াঘাটে গিয়ে পৌঁছেছেন, তার একটু আগেই খেয়া ছেড়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্র বিশাল নদী। খেয়া পারাপার করতে অনেক সময় লাগে। দাদামশাই আর কী করেন। ভাবলেন একটু এদিক-ওদিক ঘুরে দেখি। খেয়াঘাটের চারদিকেই ঘন জঙ্গল। দিনের বেলা, বাঘ-ভালুকের ভয় তো নেই। কাজেই দাদামশাই অন্যমনস্কভাবে ঘুরছিলেন। এসে দাঁড়িয়েছেন একটা মস্ত বটগাছের নীচে। বটগাছটা ভরতি একগাদা বাঁদর কিচিরমিচির করছে। পাহাড়ি জায়গা, গাছটার সামনে ছিল একটা পাথরের সমতল চাতাল মতো। শুকনো পাতা মচমচিয়ে দাদামশাই যেই এসে চাতালটার পাশে দাঁড়িয়েছেন, হঠাৎ অন্যপাশে ফোঁস করে ফণা তুলে খাড়া হয়ে উঠেছে এক শঙ্খচূড় সাপ। শঙ্খচূড় আমাদের দেশের সবচেয়ে বিষধর সাপেদের মধ্যে অন্যতম আর এত বড়ো, যে খাড়া হয়ে উঠলে প্রায় এক মানুষ সমান উঁচু হয়ে উঠতে পারে।

দাদামশাই দেখলেন সমূহ বিপদ। দৌড়ে পালাবেন তার উপায় নেই। শঙ্খচূড়া সাপের সঙ্গে দৌড়ে কখনোই পারা যাবে না। সামনের গাছে উঠে পড়বেন, সেও সম্ভব নয়। একমাত্র উপায় হল সাপের চোখে চোখ রেখে একটুও না-নড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। তাহলে সাপ কামড়ায় না। ইতিমধ্যে যদি অন্য লোক এসে পড়ে তাহলে সাপটা চলে যেতে পারে। অতএব, দাদামশায় সেই নিষ্পলক নৃশংস দুটি চোখের দিকে তাকিয়ে যথাসম্ভব নিষ্কম্প হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

কোনো লোক কিন্তু এল না। আর কতক্ষণই বা একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। দাদামশাই বেশ বুঝতে পারছেন যে তাঁর পা অল্প কাঁপতে শুরু করেছে, একটু বাদেই পড়ে যাবেন। এদিকে কিছু না-করতে পেরে সাপটাও ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে, একটু নড়লেই সঙ্গেসঙ্গে ছোবলাবে তাঁকে। মনে মনে ভাবছেন, হে ভগবান, এইরকম ভয়ংকর মৃত্যু তোমার ভক্তের কপালে লিখে রেখেছিলে তুমি।

ঠিক এইসময় একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। আগেই বলেছি, বটগাছটা ভরে ছিল একদঙ্গল বাঁদর। তারা এতক্ষণ ব্যাপারটা লক্ষ করছিল। দাদামশাই যখন আর পারছেন না, পড়ে যাবার মতো অবস্থা, আর সাপটাও রেগে টং, সেইসময়, হঠাৎ একটা বাঁদর লাফ দিয়ে পড়ল দাদামশায়ের পায়ের কাছে পাথরের চাতালটার ওপরে আর পরমুহূর্তেই চোখের নিমেষে একলাফে উলটোদিকের গাছটার ওপরে উঠে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে চমকে গিয়ে সাপটা চাবুকের মতো প্রচণ্ড জোরে ছোবল মারল বাঁদরটা যেখানে পড়েছিল সেইখানে। কিন্তু, বাঁদরটা তো তখন আর সেখানে নেই। ফলে, সাপটার মুখটা এসে হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ল পাথরের ওপর আর তৎক্ষণাৎ তার মুখটা ফেটে চৌচির হয়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে সাপটা ধড়ফড় করে মরে গেল। দাদামশাই তখন কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে বসে পড়ে তাঁর অদৃশ্য রক্ষাকর্তাকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন আর চোখের জলে প্রণাম করলেন তাঁর উপাস্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে।

গল্প শেষ করে দাদামশাই বলতেন, দেখলি তো। বিপদ যতই ভয়ংকর হোক না-কেন, ভক্ত— সে যতই না-কেন নগণ্য হোক, যদি সত্যিকার অন্তর দিয়ে তাঁকে ডাকে, তাহলে সেই ডাকে ভগবান ঠিক সাড়া দেন এবং ভক্তকে বিপদ থেকে মুক্ত করতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন।

আমরা বলতুম, তাই বলে বাঁদর! দাদু! তোমার প্রার্থনার জন্য তাঁকে কিনা শেষপর্যন্ত বাঁদর হতে হল?

শুনে দাদামশায় রেগেমেগে তাঁর মেয়ের কাছে গিয়ে তাঁর ছেলেরা যে উচ্ছন্নে গেছে সে বিষয়ে নালিশ করতেন এবং ভবিষ্যতে আর কখনো তাদের গল্প বলবেন না সে কোথাও বেশ জোর দিয়ে জানিয়ে দিতেন। সেই প্রতিজ্ঞাটা অবশ্য বেশিদিন টিকত না।

আর একবার দাদামশাই এক শহর থেকে অন্য এক শহরে বদলি হয়েছেন। ততদিনে তাঁর বিয়ে হয়েছে, সংসার বেড়েছে। দিদিমা, তিন মেয়ে আর নিতান্ত শিশু আমাদের মামাকে নিয়ে মালপত্র গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে রওনা দিয়েছেন। একটা গোরুর গাড়ি তো নয়, অনেকগুলো। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, ডাকাতের ভয় আছে, হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের অভাব নেই। সেই জন্য সে সময় দলবদ্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। এই দল যখন চলতে শুরু করত, তখন কতগুলো পূর্বনির্ধারিত জায়গা ছাড়া কোনোমতেই অন্য কোথাও দাঁড়াত না। তা, সে যদি কেউ ভয়ানক অসুস্থ বা মরণাপন্ন হয়ে পড়ে তাহলেও না। অনেকটা আজকের ট্রেনের মতো। তবে, ট্রেন যদি-বা চেন টেনে থামানো যায়, এক্ষেত্রে তাও সম্ভব ছিল না। দু-একজনের জন্য তো সকলকে বিপদে ফেলা যায় না।

যেতে যেতে বিকেল নাগাদ হঠাৎ আমার মামার শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়ল। এত খারাপ যে তখুনি একটু দুধ খাওয়ানো বিশেষ দরকার নইলে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে যেতে পারে। অথচ সঙ্গে একফোঁটাও দুধ নেই। মামা আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছে দেখে দাদামশাই দিদিমাকে বললেন— আমাকে একটা পাত্র দাও, আমি পা চালিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি কোনো গ্রাম আছে কি না। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমার কোনো বিপদ হবে না। আর, হলে হবে। আমি এই দৃশ্য সহ্য করতে পারছি না।

দাদামশাই শ্লথগতি গোরুর গাড়ির কনভয় পেছনে ফেলে হনহন করে সামনে এগিয়ে গেলেন। যাচ্ছেন আর ভাবছেন, হে ভগবান, এতটুকু একটা শিশুকে কে এত কষ্ট দিচ্ছ। তার যন্ত্রণা যে চোখে দেখা যাচ্ছে না। ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করো।

ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ, কোথাও গ্রামের চিহ্নমাত্র নেই, লোকজন তো নেই-ই। দাদামশায়ের সব আশা যখন বিলীয়মান, হঠাৎ একটা স্থানীয় লোক জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল, তার হাতে একটা পাত্র। লোকটি দাদামশায়কে বলল— দুধ নেবেন, দুধ লাগবে আপনার?

দাদামশাই তো হাতে স্বর্গ পেলেন। বললেন— হ্যাঁ, হ্যাঁ, লাগবে বইকি। দাও, আমার এই পাত্রটার মধ্যে ঢেলে দাও।

তাই করল লোকটি। তখন দাদামশায় পকেটে হাত দিয়ে দেখেন পয়সা আনতে ভুলে গেছেন তাড়াহুড়োয়। লোকটিকে বললেন, এই দ্যাখো, আমি তো টাকা আনতে ভুলে গেছি। তুমি আমার পেছনে পেছনে এসো। ওই সামনেই আমার গাড়ি আসছে। ওখানে গিয়েই আমি তোমাকে দাম দিয়ে দেব। বলে পাত্র হাতে হনহন করে উলটোদিকে হাঁটা লাগলেন। গাড়িতে পৌঁছে দিদিমার হাতে পাত্রটা দিয়ে টাকা নিয়ে পেছন ফিরে দেখেন, কেউ নেই।

দাদামশাই বলতেন— এখন তোরাই বল, কে আমাকে দুধ এনে দিয়েছিল? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কেউ হতে পারে? ভক্তের করুণ প্রার্থনায় সাড়া না-দিয়ে পারেননি তিনি।

আমরা বলতুম— আর একজন হতে পারে দাদু। সে ব্যাটা দাগি চোর। জেল ভেঙে দুধ চুরি করে পালাচ্ছিল। ভেবেছিল, তোমাকে বিক্রি করে দু-পয়সা কামাবে। তুমি তো ইউনিফর্ম পরে ছিলে না, তাই প্রথমে তোমাকে চিনতে পারেনি। পরে দেখল, ও বাবা, এ যে জেলারসাহেব। একসময় না একসময় তো এঁর কাছে গিয়ে আবার পড়তেই হবে। এখন যদি পয়সা নিই তাহলে তখন কী আর রক্ষে থাকবে। মেরে পিঠের চামড়া তুলে নেবেন। তার চেয়ে কেটে পড়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শুনে দাদামশাই আমাদের লাঠি নিয়ে তাড়া করতেন, আমরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতুম।

অন্য একবার, এক শহরের জেল থেকে আর এক শহরের জেলে একটা অত্যন্ত জরুরি খবর পরদিন ভোর বেলার মধ্যে পৌঁছে দেবার ভার পড়ল দাদামশায়ের ওপর। আদেশটা যখন এল, তখন বিকেল হয়ে গেছে। গাড়িঘোড়া জোগাড় করা তখন আর সম্ভব নয়। জঙ্গলের রাস্তা, বিপদ-আপদের কোনো শেষ নেই। একেবারে একা যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। দাদামশাই তখন স্থির করলেন যে সারারাত রানার বা ডাকহরকরার সঙ্গে দৌড়বেন। তাঁর দুর্দান্ত স্বাস্থ্য ছিল, বয়েসও কম। কাজেই, ব্যাপারটা অসম্ভব কিছু ছিল না। রানার সারারাত দৌড়য় যাতে সে পরদিন ভোররাত্রে অন্য শহরে পৌঁছে যেতে পারে। তার হাতে থাকে লন্ঠন আর কাঁধে ঝুমঝুমি লাগানো বর্শায় বাঁধা চিঠির থলি। সে যখন দৌড়য়, তখন তার ঝমঝুমির ধাতব ঝুমঝুম আওয়াজ আর লণ্ঠনের আলো বন্য জন্তু-জানোয়ারদের সহজে কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কারণ এই দুটো জিনিসই তারা অত্যন্ত অপছন্দ করে। তা ছাড়া, তার আত্মরক্ষার জন্য বর্শাটা তো আছেই। সুতরাং, তার সঙ্গে দৌড়নোর, সুবিধে হল, একজন সঙ্গী তো পাওয়া যাবেই তার ওপর বাঘ-ভাল্লুকেরও ভয়ও কম হবে।

সেইরকমই হল। রানারের সঙ্গে সারারাত দৌড়লেন দাদামশায়। তখন ভোর হয়ে আসছে, শহরটা আর বেশি দূরে নেই, তখন দেখা গেল যে রাস্তাটা সামনে দুটো ভাগ হয়ে গেছে। শহরটা ছিল একটা নদীর অন্যপারে। মূল রাস্তাটা সেই নদীর ওপরে একটা ব্রিজ পেরিয়ে চলে গেছে শহরের দিকে আর অন্য একটা সরু কাঁচা রাস্তা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুটা গিয়ে পড়েছে একটা খেয়াঘাটে।

দাদামশায় রানারকে বললেন— তুমি তো ব্রিজের রাস্তায় যাবে, তাতে শহরে পৌঁছুতে একটু দেরি হবে। আমি এই কাঁচা রাস্তা দিয়ে চলে যাচ্ছি, খেয়াঘাটে গিয়ে মাঝিকে ঘুম থেকে তুলে নদী পেরিয়ে একবারে শহরের ভেতরে পৌঁছে যাব।

রানার বলল— ও রাস্তায় যাবেন না। শুনেছি এদিকে একটা মানুষখেকো বাঘ বেরিয়েছে। বিপদ হতে পারে।

দাদামশায় বললেন— দুত্তোর মানুষখেকো! ওই তো খেয়াঘাট দেখা যাচ্ছে। বাঘ যদি থাকেও, সে কিছু টের পাওয়ার আগেই একদৌড়ে পৌঁছে যাব। তুমি কিছু ভেব না, আসলে আমার হাতে সময় বড়ো কম। বলে, দাদামশায় কাঁচা রাস্তা দিয়ে দৌড়তে শুরু করলেন।

খেয়াঘাটের কাছাকাছি আসতেই দাদামশায়ের নজরে পড়ল একটা ঝোপের পাশে একটা বিরাট বাঘ শুয়ে আছে। সে ঘুমোচ্ছিল। দাদামশায়ের পায়ের শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেছে আর এক চোখ খুলে তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে।

দাদামশায় দেখলেন বাঘটার সঙ্গে তাঁর যা দূরত্ব তাতে দৌড়ে পার পাওয়া যাবে না। গাছে উঠবেন, তারও উপায় নেই কারণ বেশি উপরে ওঠার আগেই সে লাফ দিয়ে তাঁকে ধরে ফেলবে। একটিমাত্র উপায় আছে। তা হল, প্রাণপণে দৌড়ে গিয়ে খেয়াঘাটের মাঝির ঘরে ঢুকে পড়া। অতএব, চিৎকার করে মাঝিকে ডাকতে ডাকতে বাঘের সামনে দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড় লাগালেন দাদামশায়। বাঘটাও খচমচ করে উঠে তাঁকে তাড়া করল।

এমনি কপাল, দাদামশায় দেখলেন খেয়াঘাটের মাঝির ঘরে বিরাট তালা ঝুলছে। কোনো কারণে সে বোধ হয় ছুটি নিয়েছিল সেদিন। এদিকে বাঘটাও প্রায় এসে পড়েছে। উপায়ান্তর না-দেখে ভগবানের নাম করতে করতে নদীর বরফ-ঠান্ডা জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দাদামশাই আর সঙ্গেসঙ্গে জ্ঞান হারালেন। তবে অজ্ঞান হবার আগে দেখলেন যে বাঘটা তাঁর পেছনে পেছনে জলে নামছে।

যখন জ্ঞান ফিরল, দাদামশাই দেখলেন যে তিনি একটা গোয়ালঘরে শুয়ে আছেন আর কয়েকটি মেয়ে তাঁর শুশ্রূষা করছে।

ঘটনাটা ঘটেছিল এইরকম। সেদিন ছিল ছট পুজো। গোয়ালিনীরা ভোররাত্রে উঠে কলসি নিয়ে গিয়েছিল নদীর ঘাটে জল আনতে। সে যুগে তো প্লাস্টিক ছিল না, কলসিগুলো ছিল কাঁসার। সেই কলসিতে জল ভরতে গিয়ে তারা দেখে, এক বাবু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঝাঁপ দিল নদীতে আর তার পেছনে একটা বাঘ। দেখেই তো তারা তাদের হাতের মোটা মোটা রুপোর বালা দিয়ে কলসির ওপর ঠংঠং করে মেরে মেরে মহা শোরগোল বাধিয়ে দিল। বাঘ আবার এই শব্দ সহ্য করতে পারে না। কাজেই সে জল থেকে উঠে ল্যাজ তুলে জঙ্গলের ভেতরে ভাগলবা। তখন গোয়ালিনীরা জ্ঞানহীন দাদামশায়কে তুলে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল।

গল্প শেষ করে দাদামশায় বলতেন, সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তাঁরই আদেশে বৃন্দাবনের গোপিনীরা গোয়ালিনী সেজে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন।

আমরা বলতুম— একদম বাজে কথা দাদু। সারারাত দৌড়ে নিশ্চয়ই তোমার খিদে আর ঘুম দুটোই খুব পেয়েছিল। অফিসে যাওয়ার আগে গোয়ালাদের বাড়ি দুধ আর মিষ্টি প্রচুর পরিমাণে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলে। যখন ঘুম ভাঙল, দেখলে বেজায় দেরি হয়ে গেছে। তখন এই বাঘের গল্পটা বানালে।

আমাদের কথা শুনে দাদামশায় প্রথমে ভীষণ রেগে যেতেন তারপরেই হেসে ফেলতেন। বলতেন— নাঃ, তোদের দ্বারা কিচ্ছু হবে না।

তাঁর এই কথাটা অতন্ত নিরঙ্কুশ সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%