ঠাকুরদাদার বিপদ

মনোজ সেন

আমার ঠাকুরদাদার একটা অদ্ভুত আর বিস্ময়কর ক্ষমতা ছিল। তিনি কারোর মুখ হয়তো ভুলে যেতে পারতেন কিন্তু তার গলা কক্ষনো ভুলতেন না। কাজেই, কারোর মুখ দেখে তাকে চিনতে না পারলেও, গলা শুনে ঠিক চিনে ফেলতেন।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

একবার হাওড়া স্টেশনে নেমে মালপত্র নিয়ে বাইরে এসেছেন। অমনি একদল ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ান এসে তাঁকে নিজের নিজের গাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে টানাটানি শুরু করে দিল।

ঠাকুরদাদা বললেন— না, না, তোমাদের গাড়িতে যাব না। ওই তো ইসমাইল আছে, আমার চেনা লোক, আমি ওর গাড়িতে যাব।

বলতেই ভিড়ের ভেতর থেকে একজন বয়স্ক গাড়োয়ান হাসিমুখে এগিয়ে এসে ঠাকুরদাদার বাক্স-বিছানা তুলে তার গাড়ির দিকে রওনা হল। যেতে যেতে বলল— আপনি আমাকে চেনেন, বাবু? কী করে চিনলেন? আমি তো আপনাকে মনে করতে পারছি না।

ঠাকুরদাদা বললেন— তুমি একসময়ে ফেনি স্টেশনে গাড়োয়ানি করতে না? আমি তখন বেশ কয়েক বার ওখানে গেছি। প্রত্যেকবারই আমি তোমার গাড়ি নিয়েছি।

শুনে ইসমাইলের হাত থেকে ঠাকুরদাদার বাক্সটা ঠক করে মাটিতে পড়েই গেল। লোকটি বলল— বলেন কী বাবু? সে তো আজ পঁচিশ বছর আগেকার কথা! ফেনির কথা আমারই কিছু মনে নেই। আর আপনি আমাকে এখনও মনে রেখেছেন?

ঠাকুরদাদা বললেন— তোমাকে কি আর মনে রেখেছি? তোমার গলার স্বরটা শুধু মনে আছে।

এই ক্ষমতার জন্যে তাঁকে একবার ভীষণ বিপদে পড়তে হয়েছিল।

সেটা ১৯৩০ বা ওইরকম সময়ের কথা। আমার বাবা ঠাকুরদাদাকে নিয়ে এলাহাবাদে গিয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন মা আর দাদা। দাদার তখন বছর দুয়েক বয়েস হবে। উদ্দেশ্য ছিল হাওয়া বদল আর তীর্থ করা।

সে যুগে, আজকের মতো সর্বত্র এত হোটেল, টুরিস্ট লজ বা ইয়ুথ হস্টেলের ছড়াছড়ি তো ছিল না। কেউ বেড়াতে গেলে মাসখানের মতো সময় হাতে করে যেতেন, একটা আস্ত বাড়ি বা কয়েকটা ঘরভাড়া করা হত, সঙ্গে যেত বিছানাপত্র, চাল, ডাল, স্পিরিট স্টোভ, থালা-বাটি-গেলাস, গ্রামোফোন, গুটি কয়েক রেকর্ড, কিছু গল্পের বই, পানের বাটা, এমনকী বঁটি পর্যন্ত।

আমার বাবাও সেইরকমভাবে এলাহাবাদে একটা মহল্লার একটি একতলা ছোটো বাড়ি ভাড়া করে একমাসের ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। বাড়ির সামনে একটা বারান্দা ছিল। ঠাকুরদাদা রোজ ভোর বেলা আর সন্ধে বেলা সেখানে ইজিচেয়ার পেতে বসে সামনে রাস্তায় লোক চলাচল দেখতেন। তাঁর ধবধবে সাদা চুল-দাড়ি দেখে পাড়ার লোকেরা ওই পথে যাওয়ার সময় তাঁকে নমস্কার করত, দু-একজন এক-আধটা কথাও বলত। তাঁর আর একটা কাজ ছিল সাধুসন্ন্যাসী ও ভিখারিকে ভিক্ষা দেওয়া। সেইজন্যে থলে ভরতি খুচরো পয়সা তাঁর কোলের ওপর রাখা থাকত।

দিনগুলো বেশ ভালোই কেটেছিল। গোলমাল বাঁধালেন এক সন্ন্যাসী।

সেদিনও সন্ধে বেলা যথারীতি ঠাকুরদাদা বারান্দায় বসে ছিলেন। হঠাৎ এক বিশালাকৃতি জটাজুটধারী সন্ন্যাসী একহাতে কমণ্ডুলু আর অন্যহাতে একটা লম্বা ত্রিশূল নিয়ে বারান্দার পাশে এসে দাঁড়ালেন। বজ্রনির্ঘোষে হিন্দিতে বললেন— সন্ন্যাসীকে কিছু দান করা হোক।

ঠাকুরদাদা কিছুক্ষণ পিটপিট করে তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন— তুমি সরোজিনীর জামাই না?

বলতেই, সাধুবাবা আঁতকে উঠলেন। প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। ত্রিশূলটা দিয়ে কোনোরকমে সামলে নিয়ে ঠাকুরদাদাকে ভালো করে দেখে নিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন— আরে, সেনকাকা, আপনি এখানে?

বলে, সাধুবাবা বারান্দায় উঠে এসে ঠাকুরদাদাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে তাঁর পায়ের কাছে বসে পড়লেন। বললেন— ইশ কত বছর বাদে দেখা হল, তা বিশ বছর তো হবেই। আপনাকে শেষ দেখেছি আমার শাশুড়ির শ্রাদ্ধে। আপনার চেহারাটা কিন্তু একই আছে, কেবল আপনার দাড়িগোঁফ একেবারে পেকে গেছে।

এরপর কিছু পুরোনো দিনের স্মৃতিচারণ করবার পর ঠাকুরদাদা বললেন— তুমি না ফিলজফি অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেছিলে? তারপরে এসব কী?

সন্ন্যাসী বললেন— কী আর বলব, সেনকাকা। বিএ পাশ করে কোথাও একটা চাকরি পেলাম না। ব্যাবসা করব, তার মূলধনই বা কোথায়? শেষপর্যন্ত, সপরিবারে না খেয়ে মরবার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন, একজনের পরামর্শে এখানে এসে এই ভেক নিয়েছি।

—তাতে কোনো লাভ হয়েছে?

—হ্যাঁ, তা হয়েছে। এখন আমার বেশ ভালোই রোজগার হয়। মাসে মাসে বাড়িতে যে টাকা পাঠাই তাতে সংসার চলে যায়। ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়ছে, বাড়িটার আধখানা পাকা করে ফেলা গেছে, দুটো গোরুও কেনা হয়েছে। কী আর বলব, আপনাদের আশীর্বাদে এখন আর তেমন কষ্ট নেই।

শুনে ঠাকুরদাদা মহা খুশি হয়ে সন্ন্যাসীর মাথায় হাত রেখে বললেন— দীর্ঘায়ু হও, বাবা। আশীর্বাদ করি তোমার যেন লক্ষ্মী লাভ হয়।

তার পরদিন হুলুস্থুল কাণ্ড বেঁধে গেল।

ভোর না-হতেই দেখা গেল পাড়ার মহিলারা গঙ্গায় স্নান করে নতুন কাপড় পরে থালায় করে ফল-মিষ্টি ইত্যাদি নিয়ে ভজন গাইতে গাইতে ঠাকুরদাদার দিকেই আসছেন। তাঁরা বারান্দায় উঠে এসে ঠাকুরদাদার পায়ের কাছে থালাগুলো রেখে মেঝেতে বসে পড়ে তাঁকে ধর্মোপদেশ দিতে অনুরোধ করলেন। কয়েক জন আবার তাঁর গলায় গাঁদাফুলের মালাও পরিয়ে দিলেন।

ঠাকুরদাদা তো স্তম্ভিত। তিনি যতই বলেন যে তিনি দীর্ঘদিন অবসর নেওয়া সরকারি দপ্তরের কর্মচারী, তাঁর পক্ষে ধর্মোপদেশ দেওয়া একেবারে অসম্ভব ব্যাপার, কে শোনে কার কথা। পাড়াসুদ্ধ লোক দেখেছে যে এ তল্লাটের সবচেয়ে বড়ো সাধুমহারাজ তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছেন আর তিনি তাঁর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছেন। এর থেকে এ কথা বুঝতে কারোর আর বাকি নেই যে তিনি একজন ছদ্মবেশী মহাযোগী মহাপুরুষ। হিমালয় থেকে নেমে এসেছেন। তিনি অস্বীকার করলে কী হবে, তাঁর মতো মহাত্মার শ্রীমুখের উপদেশ না-শুনে তাঁরা কিছুতেই নড়বেন না। তাঁদের মতো পাপীতাপীকে তাঁকে উদ্ধার করতেই হবে।

গোলমাল শুনে বাবা আর মা বাইরে বেরিয়ে এসে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে, উপদেশ-টুপদেশ পরে হবে বলে, কোনোরকমে ঠাকুরদাদাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।

সকালটা তো কাটল। সন্ধে বেলা একেবারে তাণ্ডব লেগে গেল। দলে দলে লোক বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খোলকর্তাল বাজিয়ে তারস্বরে নেচে নেচে কীর্তন গাইতে শুরু করে দিল। মাঝে মাঝে চলল মহাপুরুষের জয়ধ্বনি আর তাঁকে দর্শন দেওয়ার জন্য চিৎকার করে আহ্বান। কান পাতে কার সাধ্যি। গলিতে গাড়িঘোড়া বন্ধ হয়ে গেল। এইরকম চলল প্রায় মধ্যরাত্রি পর্যন্ত।

খবর পেয়ে বাড়িওয়ালা এসে গিয়েছিলেন। তিনি ব্যাপার দেখে বললেন— বাঁচতে চান তো আজ রাত্রেই পালান। স্টেশনে গিয়ে যে ট্রেন পাবেন তাতেই উঠে পড়বেন, সে ট্রেন কলকাতা, দিল্লি, বোম্বাই, মাদ্রাজ যেখানেই যাক না কেন। আপনারা মালপত্র বেঁধে ফেলুন। রাত তিনটের সময়, আমি দুটো ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে পেছনের গলিতে আসব। আমার লোকজন মাল গাড়িতে তুলে দেবে। টুঁ শব্দটি না-করে আপনারা চাদর মুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসবেন। এভাবে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। আজ যা হয়েছে, হয়েছে। কাল ব্যাপার আরও গুরুতর হবে। কেউ শুনবেই না যে আমাদের ওই সাধুটি আপনার মামাতো ভাই-এর জামাই। ভাববে, আপনি ওদের ঠেকানোর জন্য ভাঁওতা দিচ্ছেন। বরং, কাল সকালে আমি সবাইকে বলে দেব যে যোগীমহারাজ যোগবলে আকাশপথে হিমালয়ে ফিরে গেছেন। তাহলে, সবাই সন্তুষ্ট হবে।

বাবার সেবারের ছুটি এইভাবেই শেষ হয়েছিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%