মনোজ সেন

অতনু গাঙ্গুলীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় যাদবপুরে, আমার মেজকাকার বাড়িতে। মেজকা রিটায়ার করে ফরিদাবাদের ফ্যাক্টরি-কোয়ার্টার্স ছেড়ে এসে ওখানে বাড়ি করেছিলেন। আমি একদিন কলেজ সেরে ওঁর বাড়িতে গেছি, দেখি মেজকাকি শোবার ঘরে খাটের ওপর বসে তার এক বান্ধবীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে। বান্ধবীটি মেজকাকির সমবয়সিই হবেন, ভীষণ ফর্সা, গোলগাল চেহারা, মাথার চুল সবই প্রায় সাদা, পরনে লালপাড় সাদা শাড়ি আর লালরঙের ব্লাউজ। গল্প চলেছে আর সেইসঙ্গে মেজকাকি অনবরত পান সেজে যাচ্ছে আর তার বান্ধবী খচখচ করে জাঁতি দিয়ে প্রবল বেগে সুপুরি কেটে যাচ্ছেন। আমি ঘরে ঢুকে ওই দৃশ্য দেখে বেরিয়ে এলুম। মেজকা পেছনের বাগানে মালিকে একটার পর একটা ভুলভাল ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলেন। আমি তাঁর কাছে চলে গেলুম।
একটু বাদেই দেখি মেজকাকি বাগানে আসছে, সঙ্গে একটা ছোকরা সাহেব। সে ছ-ফুটের ওপর লম্বা, বিশাল স্বাস্থ্যবান শরীর, চোখ দুটো নীল তবে মাথার চুল কালো। মহাবিপদ। আমি আবার সাহেব-সুবো দেখলে বেজায় ভয় পাই। একে তো ইংরিজি বলতে হয়, তার ওপরে ওরা যে কী বলে সেটা ভালো ধরতেই পারি না। তার ওপর দেখি মেজকাকি ওই সাহেবটাকে নিয়ে আমার দিকেই আসছে।
মেজকাকি বলল— শোন ভেনো, এই হল অতনু। ও এসেছে ওর মাকে নিয়ে যেতে। তা নিয়ে যাব বললেই তো আর হয় না। ছত্রিশ নম্বরের মহাদেববাবুর বাজার করতে গিয়ে মেছুনিদের সঙ্গে হাতাহাতির গল্পটা সবে জমে উঠেছে, বুঝলি? তার ওপরে এখনও আমার পঞ্চাশটা পান সাজা বাকি। এ সময় তো আর ওর মাকে যেতে দেওয়া যেতে পারে না— না কী বলিস?
তারপর অতনু নামক সাহেবটির দিকে ফিরে বলল— এ হল ভেনো, মানে ভানু। আমার ভাসুরপো। একেবারে তোর সমবয়সি। যোগেশচন্দ্র কলেজে পড়ে, তোরই মতো পলিটিকাল সায়েন্স। তোরা একটু গল্প কর। আমি আর আধঘণ্টার মধ্যেই তোর মাকে ছেড়ে দেব।
অতনু সহাস্যে পরিষ্কার বাংলায় বলল— ঠিক আছে, মাসিমা। আপনার কোনো চিন্তা নেই। তবে মহাদেবমেসোর ব্যাপারটা চুকে গেলেই কিন্তু মাকে ছেড়ে দেবেন। যা পান সেজেছেন! তাতে গোটা দশেক কম পড়লে কিছু অসুবিধে হবে না। বাকিটা না হয় আমি কাল এসে সেজে দিয়ে যাব।
সেই হল আমার অতনুর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত। প্রথমে আপনি দিয়ে শুরু, এখন তুই। অতনুর বাবা গৌরাঙ্গ গাঙ্গুলী মেজকার প্রতিবেশী। নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ পরিবারের মানুষ, ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পোস্ট গ্রাজুয়েট পড়বার জন্য আমেরিকায় গিয়েছিলেন। সেখানে অতনুর মাকে বিয়ে করেন। ভদ্রমহিলা জার্মান-আমেরিকান, নাম উরসুলা। বিয়ের আগে কেমন ছিলেন, জানি না। এখন তো একেবারে বাঙালি হয়ে গেছেন। পুজো-আচ্চা করেন, রবীন্দ্রসংগীতের ভক্ত আর পটলের দোলমা যা রাঁধেন তা একেবারে অসাধারণ।
অতনুও কিছু কম যায় না। তার পৈতে তো আছেই, বাড়ির পুজোর অনুষ্ঠানগুলোর অনেকগুলো সে নিজেই করে। অনেক পুজোর মন্ত্র তার কণ্ঠস্থ। আর কখন কী করতে হবে, না করতে হবে, সে সম্পর্কেও তার জ্ঞান কিছু কম নয়। সে ইংরিজি বলে আমেরিকান অ্যাকসেন্টে অথচ তার সংস্কৃত উচ্চারণে কোনো ত্রুটি নেই। তার চেহারায়, চালচলনে বা স্বভাবে এই বৈপরীত্যের জন্য তাকে অনেক সময় অনেক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। সে সব অভিজ্ঞতার একটা এখানে বলছি।
সেবার কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সরস্বতী পুজোর ছুটিতে অতনু গিয়েছিল মেমারির কাছে কাঁঠালপুকুর বলে একটা গ্রামে। কাঁঠালপুকুর একটা বেশ বর্ধিষ্ণু জায়গা, অনেকগুলো পাকা বাড়ি, পরিষ্কার রাস্তা, খোলামেলা গ্রাম। একপাশে একটা ছোটো নদী আছে, তার নাম সঙ্কটা। খুব যে চওড়া তা নয়, তবে টলটলে জল, বেশ স্রোতও আছে। এই সঙ্কটার ধারে গ্রামের জমিদার চাটুজ্জেদের বসতবাড়ি। এই বাড়ির ছেলে শ্রীমন্ত অতনুর সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। সে-ই নিমন্ত্রণ করেছিল তার কয়েক জন বন্ধুকে তাদের বাড়ির পুজো দেখবার জন্য।
চাটুজ্জে বাড়ি যে খুব একটা বিশাল ইমারত তা নয়, তবে বেশ বড়োই বলা চলে। একতলা-দোতলা মিলিয়ে কুড়ি-বাইশটা ঘর, মাঝখানে ঠাকুরদালান, তার একপাশে অতিথিশালা। সামনে-পেছনে বাগান, গোশালা, গ্যারেজ, রান্নাঘর ইত্যাদি। পাঁচিল ঘেরা জমিটা বিঘে তিনেক তো হবেই। জমিদারি চলে যাবার পরেও চাটুজ্জেদের যে অর্থাভাবে পড়তে হয়নি, সেটা বেশ বোঝা যায়।
পুজোর আগের দিন বিকেল বেলা অতনুরা যখন ওখানে পৌঁছল, তখন বাড়িতে অনেক লোক। বাচ্চাকাচ্চাদের হুল্লোড়, মেয়েদের উচ্চকিত হাসি, বড়োদের ব্যস্তসমস্ত গতিবিধি বাড়িটাকে সরগরম করে রেখেছে।
ঠাকুরদালানের পুজোমণ্ডপের একপাশে একটা প্রকাণ্ড ইজিচেয়ারে আধশোয়া অবস্থায় শ্রীমন্তের ঠাকুরদাদা শ্রীশচন্দ্র পুজোর কাজকর্ম দেখাশোনা করছিলেন। তিনি নাতির বন্ধুদের সাদরে অভ্যর্থনা করলেন বটে কিন্তু অতনুকে দেখে তাঁর ভুরু দুটো একটু কোঁচকাল। সবার সঙ্গে অতনু যখন তাঁকে প্রণাম করতে গেল, উনি তাড়াতাড়ি কোঁচা দিয়ে পা দুটো ঢেকে দিলেন। তাঁর একমুখ পাকাদাড়ি অস্বস্তিটা গোপন করতে পারল না।
শ্রীশচন্দ্র নাতিকে বললেন— তোমার বন্ধুদের মালপত্র এখানেই রাখতে বলো। কানাই আর শিবু ওগুলো যার যার ঘরে পৌঁছে দেবে। এখন তুমি বন্ধুদের গ্রামটা একটু ঘুরে দেখিয়ে দাও। ছ-টার সময় আসবে। তখন চা দেওয়া হবে।
সেইরকমই করা হল। শ্রীমন্ত বন্ধুদের নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা পথ যেতে-না-যেতেই একটি লোক ছুটতে ছুটতে এসে শ্রীমন্তকে বলল— তোমাকে বড়োকর্তা ডাকতেছেন গো। তাড়াতাড়ি এসো। তোমার বন্ধুরা এখানেই একটু থাক। বড়োকর্তা বললেন, সময় বেশি লাগবে না।
শ্রীমন্ত চলে গেল। অতনু বন্ধুদের বলল— বড়োকর্তা ভেবেছেন, আমি খ্রিস্টান সাহেব। খুব সম্ভব আমাকে পুজোবাড়িতে ঢুকতে দেবেন না। আমাকে এখানে আনবার জন্য শ্রীমন্ত বকুনি খাবে।
শ্রীমন্ত যখন ফিরে এল, দেখা গেল যে অতনুর অনুমানই ঠিক। ম্লান হেসে শ্রীমন্ত বলল— ঠাকুরদাদার সঙ্গে একচোট ঝগড়া করে এলুম। একটা ম্লেচ্ছ সাহেবকে আনার জন্য বকতে গিয়েছিলেন আমাকে। আমি বললুম, ম্লেচ্ছ হবে কেন? অতনু গাঙ্গুলী ব্রাহ্মণসন্তান।
ঠাকুরদাদা বললেন— আমাদের দেশের লোকের কখনো নীল চোখ হয়?
আমি বললুম— হবে না কেন? কেলেকিষ্টি রামচন্দ্রেরই তো নীল চোখ ছিল। সেটাই তো একটা মিসিং নীলপদ্মের জায়গায় দিতে গিয়েছিলেন। আর এ তো ভীষণ ফর্সা। আমার কথায় ঠাকুরদাদা খুব যে একটা আশ্বস্ত হয়েছেন, তা মনে হল না। আসলে অতনুর দুরন্ত সাহেব সাহেব ফিচারগুলো মেনে নিতে পারছেন না। যাহোক, শেষপর্যন্ত বলেছেন যে তোর জন্যে অতিথিশালায় একটা ঘর ঠিক করতে। সেটা সিঙ্গল সিটেড ঘর। তোরা বাকি সকলে অন্য ঘরে থাকবি। সবাই তোকে ওয়াচ করবে, তারপরে ঠিক করা হবে যে তোকে পুজোমণ্ডপে ঢুকতে দেওয়া হবে কী হবে না।
অতনু সন্দিগ্ধ হয়ে বলল— সবাই ওয়াচ করবে মানে? কে সবাই?
শ্রীমন্ত কথাটা যেন এড়িয়ে গেল। বলল— সবাই মানে আমাদের সবাই। ভয় নেই, তোর কোনো অসুবিধে হবে না। বলে অন্য কথা পেড়ে বন্ধুদের গ্রাম দেখাতে শুরু করল।
অতনুর ঘরটা অতিথিশালার একধারে। যেকোনো হস্টেলের সিঙ্গল সিটেড ঘরের থেকে সামান্য ছোটোই হবে। বড়োজোর দশ ফুট বাই পাঁচ ফুট। ঘরের দু-পাশে দুটো জানলা, শীতের জন্য তাদের ঘড়খড়ি পাল্লাগুলো বন্ধ রয়েছে। ঘরের ভেতরে একটা সিঙ্গল তক্তপোশ আর একটা আলনা। তক্তপোশের একপাশে ওর ব্যাগটা রাখা ছিল।
সারা বিকেল মাঠে-ঘাটে ঘুরে, সন্ধে বেলা অতিথিশালার পাশের মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলে আর রাত্রে গুরুভোজনের পর অতনু খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। শ্রীমন্ত যখন ওকে ওর ঘরে নিয়ে এল, তখন শোবার জন্য ওর সমস্ত শরীর উদগ্রীব হয়ে ছিল।
ঘরে ঢুকতে গিয়ে একটা ধাক্কা খেল অতনু। সমস্ত ঘরটা অসম্ভব গুমোট, নিঃশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। অথচ, শ্রীমন্তকে বেশ স্বাভাবিক বলেই মনে হল। এটা অবশ্য অসম্ভব ব্যাপার কিছু নয়। ছোট্ট ঘর, সব দরজা-জানলা বন্ধ, তার ভেতরটা গুমোট হতেই পারে। অতনু তাড়াতাড়ি একটা জানলা খুলে দিল। দেখা গেল বাইরে একটা অদ্ভুত কুয়াশা। মনে হচ্ছিল সেটা যেন নড়ছে, চড়ছে, ঘোঁট পাকাচ্ছে। আকাশে চতুর্থীর নখের মতো সরু একফালি চাঁদটাকে প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। অতনু ভাবল কুয়াশাটা ঘরের ভেতরে চলে আসবে। তা কিন্তু এল না। জানলার বাইরেই একটা অস্বচ্ছ পর্দার মতো দুলতে লাগল।
শ্রীমন্ত বলল— জানলাটা খুলে রাখবি? ঠান্ডা লেগে যেতে পারে কিন্তু।
অতনু বলল— সন্ধ্যা করে নিই। তারপরে বন্ধ করব। বলে ব্যাগ থেকে একটা ধুতি বের করল।
তুই এখন সন্ধ্যা করবি? রাত হয়ে গেছে, শুয়ে পড়। জানিস না বিদেশে নিয়মো নাস্তি?
—তা হয় না। আজ পর্যন্ত কখনো সন্ধ্যা বাদ যায়নি। রাত হয়েছে তো কী? সন্ধে বেলা করতে না পারলে দশবার গায়ত্রী মন্ত্র জপ করে নিলেই হল। আমেরিকায় যখন যাই তখনও বাদ দিই না। বলে খোলা জানলাটার দিকে চোখ পড়তেই অতনু দেখল কুয়াশার ভেতরে নড়াচড়ার গতিটা যেন বেড়ে গেছে।
সন্ধ্যা করার পর প্রাণায়াম করে আচমন করার সঙ্গেসঙ্গে ঘরের গুমোটটা যেন অনেকটাই কেটে গেল। ঠান্ডাটাও একটু বাড়ল। তখন, জানলাটা বন্ধ করে দেওয়াই স্থির করল অতনু।
পরদিন সকালে অতনু যখন বন্ধুদের সঙ্গে পুজোমণ্ডপে গেল, তাকে কেউ বাধা দিল না। তবে প্রণাম করার সময় যেন অভ্যাসবশতই কোঁচা দিয়ে পা ঢেকে রাখলেন শ্রীশচন্দ্র। ঠিকই বলেছে শ্রীমন্ত। অতনুর প্রবল সাহেব সাহেব আকৃতিটাকে উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না।
ওরা যখন মণ্ডপে ঢোকে তখন তার এককোণে একটা উত্তেজিত আলোচনা চলছিল। দেখা গেল উত্তেজনাটা ক্রমশ বাড়ছে। একটু বাদে শ্রীমন্ত দৌড়ে এসে অতনুকে বলল— একবার আমার সঙ্গে আয় তো।
বলে ওকে টানতে টানতে শ্রীশচন্দ্রের কাছে নিয়ে গেল।
শ্রীশচন্দ্র দারুভূত জগন্নাথের মতো ইজিচেয়ারের ওপর স্থির হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর চোখ দুটো রক্তবর্ণ, মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো থমথম করছে। দেখে মনে হচ্ছিল উনি এক্ষুণি একটা বোমার মতো ফেটে পড়বেন।
শ্রীমন্ত বলল— ঠাকুরদা, আমাদের আজকের বিপদ থেকে যদি কেউ উদ্ধার করতে পারে তো সে এই অতনু।
শ্রীশচন্দ্র রক্তচক্ষু করে নাতির দিকে তাকালেন। কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু তার আগে তাঁর পাশে দাঁড়ানো একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক বললেন— তুমি একথা বলছ কেন? এই ছেলেটি পুজো করতে পারবে?
শ্রীমন্ত বলল— নিশ্চয়ই পারবে মেজকাকা। ও বড়ো বড়ো পুজো করে, শ্রাদ্ধ-ট্রাদ্ধ করে, আর সরস্বতী পুজো করতে পারবে না? কি রে অতনু, পারবি না?
অতনু ঘাড় নেড়ে বলল— পারব।
শ্রীমন্তর মেজকাকা বললেন— মন্ত্রের বই লাগবে?
—লাগবে না। আমার সরস্বতী পুজোর সব মন্ত্রই মুখস্থ আছে।
হঠাৎ শ্রীশচন্দ্রের মুখের কঠিন রেখাগুলো একটু কোমল হয়ে এল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন— 'দ্যাখো অতনু, আমি মহাবিপদে পড়েছি। আমার সম্মান ধুলোয় মিশে যেতে বসেছে। আমাদের পুরোহিত কাঁঠালপুকুর হাই স্কুলের হেডপণ্ডিত দীননাথ ভটচায্যি। তিনি আজ সকাল থেকে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে আমাদের বাড়ির কাজকর্ম দেখাশুনো করে তাঁর ছেলে বিশ্বনাথ। সে আবার আজ সকালের ট্রেনে কলকাতায় চলে গেছে ডাক্তারবদ্যির সন্ধানে। এঁরা ছাড়া আর একজন পুরোহিত আছেন, কিন্তু ফন্টে হারামজাদা তাঁকে আসতে দেবে না। ও জানে, এইবার পুজো না-হলে আমার নাকটা মাটিতে ঘষে দেওয়া যাবে।
অতনু শ্রীমন্তকে জিজ্ঞেস করল— ফন্টে কে?
শ্রীমন্ত ফিসফিস করে বলল— ঠাকুরদার খুড়তুতো ভাইয়ের ছেলে। শরিক-শত্রুপক্ষ!
শ্রীশচন্দ্র এদিকে বলে চলেছেন— দ্যাখো যদি তুমি উদ্ধার করতে পারো। আমাদের এখানে আর যে সব পুরোহিত আছে তারা একবর্ণ সংস্কৃত জানে না, ঠংঠং করে ঘণ্টা বাজিয়ে, একগাদা বিড়বিড় করে অংবংচং বকে, তুমি নাও মা ফুলের ভার, আমাকে দাও মা বিদ্যের ভার বলে পুজো শেষ করে। আমি তাদের এ বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিতে পারি না। হয়তো তুমি পারবে। শুনলুম, তোমার সন্ধ্যাবন্দনার মন্ত্রোচ্চারণ অত্যন্ত সুন্দর। দ্যাখো, চেষ্টা করে।
অতনু আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল— আমার মন্ত্রের প্রশংসা করলে কে আপনার কাছে?
শ্রীশচন্দ্র এ প্রশ্নের জবাব দিলেন না। শ্রীমন্তকে বললেন— মন্টু, একে সরকারমশাইয়ের কাছে নিয়ে যাও। ওকে জোড়ের ধুতি-চাদর দিতে বলো।
অতনু বিনীতভাবে বলল— সেইসঙ্গে একজোড়া খড়ম।

লম্বা চওড়া অতনু যখন গরদের ধুতি-চাদর পরে খড়ম খট খটিয়ে পুজোমণ্ডপে এসে ঢুকল, হঠাৎ যেন মন্ত্রবলে উপস্থিত সকলের কলরব বন্ধ হয়ে গেল। সবাই হাঁ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। আর সে যখন ভরাট উদাত্ত গলায় মন্ত্রোচ্চারণ শুরু করল, তখন ঠাকুরদালানের ছাদে পায়রাদের ডানার ঝটপট শব্দ ছাড়া আর টুঁ শব্দটি নেই। শ্রীশচন্দ্র পর্যন্ত তাঁর ইজিচেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। বেলা যত বাড়তে লাগল, ভিড়ও তত বাড়তে লাগল। জানা গেল, শরিকদের পুজোমণ্ডপ নাকি ফাঁকা হয়ে গেছে। সবাই চলে এসেছে এ তরফে, তার ফলে ও তরফ রেগে আগুন হয়ে আছে। অঞ্জলি দেবার সময় তো রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে গেল।
সব যখন শেষ হল, বন্ধুরা অতনুকে প্রায় কাঁধে তুলে অতিথিশালায় নিয়ে গেল। শ্রীশচন্দ্র পর্যন্ত এই ছেলেমানুষি দেখে বিরক্ত তো হলেনই না, বরং একটা প্রশ্রয়ের হাসি হাসতে লাগলেন। তার আগে অবশ্য তিনি সবাইকে রাত্রে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করে বসে আছেন।
সন্ধের মুখে একটা বাচ্চা ছেলে এসে অতনুর হাতে একটা চিঠি দিল। চিঠিটা শ্রীমন্তের লেখা। সেটা এইরকম—
অতনু, পালা! আমাদের ওঁনারা তোকে বেজায় পছন্দ করে ফেলেছেন। বাবা বললেন, আমার সেজজ্যাঠামশায়ের ছোটো মেয়ের সঙ্গে তোর বিয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। তার দশ বছর বয়েস, কলকাতার গোখেল স্কুলে পড়ে। সেজজ্যাঠামশাই বা জ্যেঠিমার এ ব্যাপারে করণীয় কিছুই নেই কারণ ওঁদের আদেশ অমান্য করার ক্ষমতা কারুর নেই। তোর মতামতেরও কোনো প্রয়োজন নেই। ওঁদের জীবদ্দশায় ভালো ছেলে ধরে নিয়ে এসে এ বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে ঘাড়ে ধরে বিয়ে দেবার অনেক ঘটনাই ঘটেছে। এ ব্যাপারে ওঁরা এক্সপার্ট। থানাপুলিশ করে কোনো লাভ হবে না কারণ এ তল্লাটে আইন, কানুন, পুলিশ, মিলিটারি সব-ই শ্রীশচন্দ্র চাটুজ্জে। আর তিনি ওঁদের আদেশ অমান্য করবেন না— শত হলেও ওঁরা তাঁর পূর্বপুরুষ।
অতএব এই মুহূর্তে বেরিয়ে পড়। তোর ব্যাগটা এখানেই থাক, শুধু কিছু টাকা সঙ্গে নিবি। জমিদারি যাবার আগে যাদের আমরা পাইক বলতুম তাদের এখন দরওয়ান বলি। তারা লাঠি-সড়কি নিয়ে রেডি হচ্ছে। তোর ঘর ঘিরে ফেলবার আগেই বেরিয়ে পড়। এক্ষুনি। তোর ব্যাগ আমি পরে পৌঁছে দিয়ে আসব।
তুই যেন সাঁঝের ঝোঁকে বেড়াচ্ছিস এইরকম ভাব করে এদিক-ওদিক ঘুরবি। সঙ্কটার উলটোদিকে পূর্বদিকে দেউড়ির দিকটা ফাঁকা। ওদিকে বাগান। ওখানে একটু ঘুরে সুযোগ বুঝে দেউড়ি পেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে উলটোদিকের আমবাগানের মধ্যে যদি ঢুকে পড়তে পারিস তাহলে দরওয়ানেরা তোর পেছনে যাবে না, কারণ ওই বাগানটা ফন্টে-কাকার। দাঁড়াবি না কিন্তু। নাক বরাবর দৌড়বি। তাহলে স্টেশনে পৌঁছে যাবি। এখন পর পর কয়েকটা ট্রেন আছে। সামনে যেটা পাবি সেটাতেই উঠে পড়াবি। টিকিট-ফিকিটের কথা পরে ভাবিস। বড়োরাস্তা ঘুরে আমাদের লোকেদের স্টেশনে যেতে যে সময় লাগবে তার আগেই তোকে কেটে পড়তে হবে।
চিঠি পড়ে তো অতনুর মাথার চুল খাড়া! তার বন্ধুদেরও তথৈবচ। সবাই তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়ল। যেন কিছুই হয়নি, এরকম একটা ভাব করে বেড়াতে বেড়াতে ওরা পুবদিকের বাগানে চলে গেল। সত্যিই ওদিকে লোকজন কম। কয়েকটা চাদর মুড়ি দেওয়া রোগাপটকা মালি ঘোরাঘুরি করছিল। সবাই মাথা নেড়ে নেড়ে সপ্রশংস দৃষ্টিতে ফুলগাছগুলো দেখতে লাগল। অতনু ইচ্ছে করে দেউড়ির দিকে পেছন ফিরে রইল। যাতে কেউ সন্দেহ না-করে।
পবিত্র ফিসফিস করে বলল— দেউড়িতে মাত্র একটা হোঁৎকামতো গুঁপো দরওয়ান আছে। তুই যখন পালাবি, ওকে আমরা সামলাব।
অজয় বলল— ওই গাছটার নীচে দ্যাখ, কী রকম অদ্ভুত একটা ধোঁয়ার পিণ্ড জমাট বেঁধে রয়েছে। শীতকালে বাতাস ভারী হয়ে যায় বলে এরকম হয়, কিন্তু ওই ধোঁয়াটা যেন কেমন। দেখলে ভয় করে।
অতনুর বুকটা ধড়াস করে উঠল। আড়চোখে তাকিয়ে দেখল একটু দূরে একটা তেঁতুলগাছের নীচে মাটি থেকে ইঞ্চি ছয়েক ওপরে ভাসমান গত রাত্রের দেখা নিরলম্ব কুয়াশাটা। কালকের মতোই সেটা নড়ছে-চড়ছে, ঘোঁট পাকাচ্ছে। কখনো সরু হয়ে লম্বা হয়ে যাচ্ছে আবার কখনো মোটা হয়ে বেঁটে হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাপার দেখে অতনু আর দাঁড়াল না। 'আমি যাচ্ছি, তোরা এ দিকটা সামলা' বলে হঠাৎ ফুলের বেড-টেড মাড়িয়ে, একগাদা ফ্লক্স আর প্যানসি চেপ্টে দিয়ে, গোটা চারেক গাঁদা গাছ ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল দেউড়ির দিকে। দরওয়ানটা একটা টুলে বসে গোঁফে তা দিচ্ছিল। সে ব্যাপারটা বুঝে খচমচ করে উঠে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতে অতনু সাঁ করে তার সামনে দিয়ে ছুটে দেউড়ি পার হয়ে, রাস্তা পেরিয়ে আমবাগানের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দরওয়ানটা 'পালাল! পালাল!' বলে ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাতে লাগল ঠিকই কিন্তু সত্যিই আমবাগানের ভেতরে ঢুকল না। রাস্তার ওপরে লাফাতে লাগল।
বেশ কিছুটা দৌড়ে একটু দম নেবার জন্য দাঁড়াল অতনু। দম নেবে কী? পেছন ফিরে যে দৃশ্য দেখল তাতে তো ওর একেবারে আক্কেল গুড়ুম!
সন্ধ্যার ম্লান আলোয় অতনু দেখল সাদাটে কুয়াশাটা বাতাসে ভেসে ভেসে একটা হিংস্র ক্ষুধার্ত হাঙরের মতো তার দিকে তেড়ে আসছে। তার এপাশ-ওপাশ থেকে মাঝে মাঝে যেন অতনুর গলা টিপে ধরার জন্য সরু লিকলিকে কতগুলো শুঁড়ের মতো প্রত্যঙ্গ বেরুচ্ছে আবার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। এমনকী সেই কুয়াশার ভেতর থেকে বহুদূর থেকে ভেসে আসা একটা ক্ষীণ কিন্তু ক্রুদ্ধ কোলাহলও যেন শোনা যাচ্ছে।
আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না অতনু। বিরাট একটা লাফ মেরে 'গেছি রে!' বলে একটা আর্তনাদ করে আবার প্রচণ্ড জোরে ছুট লাগল। তখন যদি স্টপওয়াচ নিয়ে ওর স্পিড মাপা যেত, তা বোধ হয় দেখা যেত যে অনেক অলিম্পিক রেকর্ড-ই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
স্টেশনটা খুব দূরে নয়। অতনু যখন পৌঁছল তখন একটা ট্রেন সদ্য রওনা হয়েছে। ও লাফ দিয়ে একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে একটা নস্যিরঙের র্যাপার মুড়ি দেওয়া লোকের পাশে বসে পড়ল। জানলা দিয়ে দেখল প্ল্যাটফর্মের ধারে একটা গাছের নীচে কুয়াশাটা জমাট বেঁধে যেন নিষ্ফল রাগে ফুঁসছে।
নস্যিরঙের র্যাপার বলল— আর কেয়া দেখতা হায় সাহেব? এখানকার আদমি-লোগকো পলিউশনকে নিয়ে কোনো চিন্তাই নেহি হায়। কাঁচা কয়লা দেকে উনুন জ্বালায়গা আর ঐসা মাফিক ধোঁওয়ায় সকলের স্বাস্থ্যকা বারোটা বাজায়গা। দেখিয়ে না, উনুনওয়ালা কতক্ষণ চলা গিয়া তার ঠিক নেহি হায় অথচ ওই ধোঁয়াটা ওইখানমে এখনও ঘোঁট পাকাতা হায়।
গল্প শেষ করে অতনু বলল— জানিস ভেনো, শ্রীমন্তকে অনেক চাপাচাপি করলুম ওই কুয়াশার মতো জিনিসটা কী বা কেমন করে ওর সেই 'ওঁদের' সঙ্গে ওর ঠাকুরদার যোগাযোগ হয় সে কথা বলবার জন্য। কিছুতেই বলল না। আমি ওসব জানি না বলে এড়িয়ে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন