নগার ডাকাতি

মনোজ সেন

অনেক অনেকদিন আগে লতাবাগান গ্রামে পণ্ডিত হরনাথ তর্কতীর্থ টোল চালাতেন। আশেপাশের দশটা গ্রামের লোক তাঁর নাম জানত। সে যে শুধু তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য তাই নয়, প্রচণ্ড সত্যবাদী বলেও তাঁর খ্যাতি ছিল। সবাই জানত, হরনাথ তর্কতীর্থ মরে যাবেন তবুও মিথ্যে কথা বলবেন না। ঘোর বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি কখনো অসত্য কথা বলেননি। এইসব কারণে পণ্ডিতমশায়ের বয়েস খুব বেশি না হলেও সবাই তাঁকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করত। সে দেশের রাজা তাঁর ছাত্র ছিলেন। তিনিও তাঁকে গভীর সম্মান করতেন। তাঁর টোল চালাবার জন্য সিধে পাঠাতেন।

তর্কতীর্থের কুঁড়েঘরটা ছিল লতাবাগানের একটেরে। সেখানেই টোল। বাড়িতে থাকতেন পণ্ডিতমশাই আর তাঁর স্ত্রী সরস্বতী। দু-চারজন গরিব ছাত্রও তাঁর বাড়িতে থাকত। তর্কতীর্থ তাদের নিজের ছেলের মতো দেখতেন। তাঁর বাড়ির পরেই ফাঁকা জমি আর তার পরে জঙ্গল। দরিদ্র ব্রাহ্মণ চোর-ডাকাতের ভয় করতেন না। ভয় ছিল বন্য জন্তুর। সেজন্য, তাঁর বাড়ি আর উঠোন ঘিরে কাঁটাঝোপের বেড়া দেওয়া ছিল আর সন্ধের পর বেড়ার ঝাঁপ বন্ধ করে সেটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হত।

সেদিন ছিল অমাবস্যা। রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে ঘরের দাওয়ায় বসে তর্কতীর্থ প্রদীপের আলোয় একটা পুঁথি পড়ছিলেন। সকলে তখন শুয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে একটা নিশাচর পাখির কর্কশ ডাক ছাড়া চারদিক নিস্তব্ধ। পড়তে পড়তে হঠাৎ তাঁর কানে এল বেড়ার ওপাশে কিছু ভারী পায়ের শব্দ। জন্তুজানোয়ার নয়, মানুষ। এত রাতে কারা এল দেখবার জন্য পণ্ডিতমশাই আসন ছেড়ে উঠতে যাচ্ছেন, শুনলেন বেড়ার দরজা খুলে কেউ তাঁর বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে তাঁর দিকে আসছে।

পণ্ডিতমশাই আবার আসনে বসে পড়লেন আর অন্ধকারের মধ্যে কে আসছে সেটা দেখবার চেষ্টা করতে লাগলেন। যে লোকটা তাঁর দাওয়ার সামনে এসে দাঁড়াল, প্রদীপের আলোয় তাকে দেখে পণ্ডিতমশায়ের তো চক্ষুস্থির!

মাঝবয়সি লোকটা ঘোর কৃষ্ণবর্ণ আর প্রকাণ্ড ষণ্ডা জোয়ান। তার হাতে একটা লম্বা লোহার সড়কি, সারা গায়ে তেল মাখা, পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ধুতি, খালি গা, কুতকুতে চোখ, মুখে একজোড়া বিরাট গোঁফ আর মাথার বাবরি চুলের ওপরে লাল কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা।

লোকটা মোটা গলায় বলল— পেন্নাম হই, পণ্ডিতমশাই। আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?

পণ্ডিতমশাই নির্বিকার মুখে বললেন— তুমি একজন ডাকাত, সেটা বুঝতে পারছি। তার বেশি পরিচয় আমার জানা নেই।

ডাকাত বুক ফুলিয়ে বলল— আমার নাম নগেন গায়েন। এই তল্লাটে সবাই আমাকে নগা ডাকাত বলে জানে।

—তা হতে পারে। তবে, তুমি তো দেখছি ডাকাতি করবার জন্য প্রস্তুত হয়ে বেরিয়েছ। সেক্ষেত্রে, আমার বাড়িতে তোমার আবির্ভাবের কারণটা তো ঠিক বুঝতে পারলুম না, বাপু। তোমার কি ধারণা হয়েছে যে আমার বাড়িতে সোনাদানা বস্তাবন্দি করে রাখা রয়েছে?

—আজ্ঞে না, পণ্ডিতমশাই। আপনার বাড়িতে যা আছে তা পঞ্চাশ বার লুট করলেও আমার যে পড়তায় পোষাবে না, তা আমি ভালো করেই জানি। আমি এসেছি অন্য কারণে। আপনার কাছে আমার একটা খবরের দরকার আছে।

—কী খবর চাও?

—দেখুন, পণ্ডিতমশাই, আপনি তো আমাদের রাজামশায়ের গুরু এবং কুলপুরোহিত। এবার বলুন তো, রাজবাড়ির কোষাগারে ঢোকার গুপ্তপথের সন্ধান জানেন নাকি একমাত্র রাজামশাই আর আপনি। রানিমা বা তাঁর ছেলেপুলেরাও জানেন না, এ কথাটা কি ঠিক?

ভয়ানক গম্ভীর মুখে পণ্ডিতমশাই বললেন— হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। তুমি জানলে কী করে?

—খুব সহজে। রাজামশায়ের খাজাঞ্চি উদ্ধব রায়কে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বাঁশ দিয়ে ডললুম আর সে গড়গড় করে বলে দিলে।

—কী সর্বনাশ! তোমার কাছে দেখছি কোনো কুকর্মই অসাধ্য নয়।

—ঠিক কথা। তাহলে, এবার ওই গুপ্তপথে ঢোকার উপায়টা আমাকে বলে দিন। ওটা আমার জানা খুব দরকার।

—তোমার যদি দরকার থাকে তো তুমি নিজে খুঁজে নাওগে যাও। আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন? আমি তোমাকে বলব না। আর, সেই জন্য তুমি যদি আমাকে মেরে ফেলতে চাও তো মেরে ফেলতে পারো। তুমি বোধ হয় জানো না যে আমার মৃত্যুভয় বলে কিছু নেই।

একগাদা এবড়ো-খেবড়ো হলদে দাঁত বের করে হাসল নগা। বলল— আপনাকে মারতে যাব কোন দুঃখে? আপনার মতো একটা শুঁটকো পণ্ডিতকে মেরে খালি হাতে বাড়ি ফেরার জন্য তো আর এতটা পথ আসিনি। কোষাগারে ঢোকার পথটা না-জেনে ফিরি কী করে, বলুন? তবে, নেহাতই যদি না বলেন, তাহলে অবশ্য যাওয়ার আগে আপনার গিন্নি আর ছাত্রগুলোকে মেরে এই টোল আর বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে রেখে যাব। নগা ডাকাতের হুংকার শুনলে এ গাঁয়ের একটি লোকও আপনার সাহায্যে এগিয়ে আসবে না। একা আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ব্যাপারটা দেখবেন।

—বটে? আচ্ছা, ধরো আমি তোমাকে বললুম। কিন্তু আমি তো তোমাকে ভুলপথে পাঠাতে পারি। তুমি বুঝবে কী করে?

মাথা নেড়ে নগা বলল— তা আপনি করবেন না। আমরা জানি যে, কোনো অবস্থাতেই আপনি মিথ্যেকথা বলতে পারেন না।

নগার কথা শুনে পণ্ডিতমশাই কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন— বেশ, গুপ্তপথের সন্ধান আমি তোমাকে দেব। কিন্তু, একটা শর্ত আছে।

—কী শর্ত?

—শর্তটা হল যে আমাকে তোমার সঙ্গে যেতে বাধ্য করবে না। যদি করো, তাহলে রাজামশাই ঠিকই জানতে পারবেন। তখন বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমাকে শূলে চড়াবেন আর বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবেন। তোমাকে কিছু যদি না-বলি, তাহলে তুমিও তাই করবে। কাজেই শর্ত না মানলে তোমাকে কিছু না বলাই শ্রেয় হবে।

নগা তাড়াতাড়ি বলল— না, না, পণ্ডিতমশাই, আপনার শর্ত আমি মেনে নিচ্ছি। আপনি যদি সাধারণ মানুষ হতেন তাহলে আপনাকে গলায় গামছা দিয়ে টেনে নিয়ে যেতুম। কিন্তু, আমরা জানি যে আপনার ওপরে অত্যাচার করে কোনো লাভ হবে না। আপনি ভাঙবেন তবু মচকাবেন না।

—আমি তোমাকে গোপন পথের কথা বলে দেবার পর তুমি আমার ওপরে জোর করবে না তো?

নগা ডাকাত হাতজোড় করে বলল— এটা কী কথা বললেন, পণ্ডিতমশাই? আমি ডাকাত হতে পারি কিন্তু দশগাঁয়ের লোক জানে যে আজ পর্যন্ত নগার কথার নড়চড় হয়নি, কোনোদিন হবেও না।

পণ্ডিতমশাই বললেন— বেশ কথা। বলে, ফিসফিস করে নগাকে গুপ্তপথের হদিশ বলে দিলেন।

নগা সবকথা মন দিয়ে শুনল। তারপর বলল— শুধু এতে তো হবে না পণ্ডিতমশাই। দরজা খোলার মন্তরটাও তো বলতে হবে। ওখানে শুনেছি জগদ্দল দরজা। সেটা ভাঙতে গেলে তো তার শব্দে রাজবাড়ি সুদ্ধু লোক আর যত রাজ্যের পাইক-পেয়াদা সেখানে এসে উপস্থিত হবে। অথচ, মন্তর বললে দরজা নাকি হুড়ুৎ করে খুলে যায়।

পণ্ডিতমশাই বললেন— অঃ, সে-কথাটাও জেনে গেছ? তবে শোনো। যখন দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, তখন প্রথমে জোরে জোরে বলবে, ওঁ হ্রং ভ্রীং ঘুট, তাহলে দরজা খুলে যাবে। তারপরে বলবে, ওঁ ঝিড়িং গিড়িং ফট। তাহলে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ হবে। ভুল করে মন্ত্রগুলো উলটোপালটা করে ফেল না যেন। তাহলে কিন্তু সব গোলমাল হয়ে যাবে।

নগা মাথা নেড়ে বলল— ভুল হবে না, পণ্ডিতমশাই। বলে বিড়বিড় করে মন্ত্র দুটো মুখস্থ করে ফেলল। তারপর, পণ্ডিতমশাইকে একটা নমস্কার করে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে গেল।

নগা বেরিয়ে যেতেই ঘরের ভেতর থেকে সরস্বতী বেরিয়ে এলেন। বললেন— এটা কী করলে? আমাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য আমাদের উপকারী রাজামশায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে? আমাদের না-হয় বাঁচালে, কিন্তু তোমার ছাত্রদের মধ্যে হয়তো কেউ নগা আর তোমার কথাবার্তা শুনেছে। তারা তো বাইরে গিয়ে রটাবে যে তুমি কৃতঘ্ন, বিশ্বাসঘাতক। সেটা সইতে পারবে?

পণ্ডিতমশাই মাথা নেড়ে বললেন— বিশ্বাসঘাতকতা করিনি। সব ঠিক হয়ে যাবে তুমি দেখো। কেবল, একটা জায়গায় খটকা রয়ে গেল। আজ থেকে বহুবছর আগে আমার বৃদ্ধ প্রপিতামহ তন্ত্রাচার্য ঈশ্বর জগন্নাথ আগমবাগীশ কতগুলো মন্ত্র দিয়ে ওই দরজা বেঁধে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় যে মন্ত্রটা নগাকে শেখালুম সেটা তো কখনো ব্যবহার হয়নি, এখন এত বছর বাদে সেটা কাজ করবে কি না সে বিষয়ে একটু সন্দেহ হচ্ছে। যদি কাজ না করে তাহলে বিপদ।

—এতদিন মন্ত্রটা যদি ব্যবহার নাই হয়ে থাকে, তাহলে দরজাটা খোলা হয় কী করে? চাবি দিয়ে বুঝি? বুঝতে পেরেছি। নগা যাতে চাবির জন্য রাজামশায়ের অন্দরমহলে গিয়ে উপস্থিত না-হয়, তাই তুমি ওকে মন্ত্রটা দিলে, তাই না?

হরনাথ তর্কতীর্থ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না-দিয়ে চিন্তিত মুখে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাওয়ায় বসে রইলেন।

ঝোপঝাড় ভেঙে নগা আর তার দলবল রাজবাড়ির পেছনে বাগানের পাঁচিলের কাছে পৌঁছল। সেটা টপকে ভেতরে ঢুকে তারা চলে গেল একটা প্রকাণ্ড বটগাছের সামনে। তার একগুচ্ছ ঝুরি আর কাঁটাঝোপ সরিয়ে দেখা গেল গাছের মূলকাণ্ডের গায়ে একটা দরজা। কেউ বলে না-দিলে সেটা চেনা একেবারে অসম্ভব। শাবলের চাড় দিয়ে দরজা খোলা হল। তার পেছনে একটা সুড়ঙ্গ পথ। সেটা নেমে গেছে মাটির নীচে। মশাল জ্বালিয়ে নগা আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা ভেতরে ঢুকল।

সুড়ঙ্গটা যেখানে শেষ হয়েছে সেটা একটা বড়ো ঘর আর তার একপাশে বিরাট শালকাঠের মজবুত দরজা। সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নগা বলল— ওঁ হ্রং ভ্রীং ঘুট। বলামাত্র দরজাটা কড়কড় করে খুলতে শুরু করল। তখন নগা বলল— ওঁ ঝিড়িং গিড়িং ফট। বলতে বলতে দরজাটা পুরো খুলে গেল।

দরজার পেছনে একটা বড়োসড়ো ঘর, নিরেট পাথরের দেওয়াল। সেখানে মশাল রাখার খাঁজ কাটা আছে। ঘরের মেঝেয় সাত-আটটা লোহার সিন্দুক। নগা বলল— কেউ আগে সিন্দুক খুলবি না। আগে মশালগুলো খাঁজের মধ্যে রাখ। দু-জন সড়কি নিয়ে দরজায় পাহারা দে। বাকি সবাই সড়কি আর লাঠি তৈরি করে রাখ যাতে ওই গর্ত দিয়ে কেউ নেমে এলে আমাদের কোণঠাসা ইঁদুরের মতো অবস্থা না-হয়। সিন্দুকগুলো খুলব আমি।

সেইমতো ব্যবস্থা হল। প্রথম সিন্দুকটা খুলে নগা একেবারে স্তম্ভিত। সেটা সোনা আর রুপোর টাকায় ভরতি। দ্বিতীয়টাও সেইরকম। তৃতীয়টায় গয়নাগাঁটি। তার পরেরটায় সোনা-রুপোর তৈজসপত্র। কোনোটাতে হিরে-মণি-মুক্তো। নগা আর তার লোকেরা উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপতে লাগল।

নগা কোনোরকমে বলল— হারু, হাঁ করে কী দেখছিস? থলেগুলো বের কর। সেগুলো ভরতে হবে না?

বলতে বলতে নগা যেই টাকা ভরতি সিন্দুকটায় হাত ঢুকিয়েছে অমনি একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় খেয়ে সে মেঝের ওপর হাত-পা তুলে ছিটকে পড়ল। চট করে সামলে নিয়ে রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল— অ্যাই, অ্যাই, কে মারল রে? কার এতবড়ো সাহস?

দলের সবাই সমস্বরে বলল— আমরা কেউ মারিনি, সর্দার।

—মারিসনি তো আমার গালে এমন জোরে লাগল কী করে, শুনি?

একজন বলল— বোধ হয় তাড়াহুড়োয় সিন্দুকের ডালাটায় লেগে গেছে।

—হুম, তাই হবে। বলে নগা যেই আবার সিন্দুকে হাত দিয়েছে, কে যেন পেছন থেকে ওর ঘাড়ে এমন রদ্দা মারল যে তার মুখ টাকার স্তূপের ভেতরে সিধিয়ে গেল।

সবাই আবার সমস্বরে বলল— অত হাঁক-পাক কোরো না, সর্দার। সময় আছে। আস্তে আস্তে করো।

বিকৃত মুখে ঘাড়ে হাত বুলোতে বুলোতে নগা বলল— নাঃ, আমার দ্বারা হচ্ছে না। তোরা সক্কলে থলে নে, আর ভরতে শুরু কর।

তখন ঘরের মধ্যে একেবারে দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। কেউ শূন্যে উঠে দড়াম করে মেঝের ওপরে আছড়ে পড়তে লাগল, কেউ 'ওরে বাবারে, মরে গেলুম রে' বলে লাফাতে লাফাতে ঘরের চারদিকে দৌড়তে লাগল, কেউ এক বার এ দেওয়ালে আর এক বার ও দেওয়ালে মাথা ঠুকতে লাগল, কেউ-বা মেঝের ওপর পড়ে গাঁক গাঁক করতে করতে হাত-পা ছুড়তে লাগল। আর সক্কলে মিলে ষাঁড়ের মতো চ্যাঁচাতে শুরু করে দিল। নগা বলতে গিয়েছিল যে অমন চ্যাঁচালে রাজবাড়ি সুদ্ধু লোক জেগে যাবে। কিন্তু সে কথা বলবার আগেই আবার ঘাড়ে প্রচণ্ড রদ্দা খেয়ে সেও মাটিতে পড়ে হাউমাউ করে চিৎকার জুড়ে দিল। যে দু-জন দরজার কাছে পাহারা দিচ্ছিল, তারা পালাতে গিয়ে আর পালাতে পারল না। ছিটকে ঘরের ভেতরে এসে পড়ল। সে একেবারে হুলুস্থুল ব্যাপার।

বাগানের দিক থেকে প্রবল চ্যাঁচামেচি শুনে রাজবাড়ি সুদ্ধু সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। রাজামশাই হাই তুলতে তুলতে খোলা তরোয়াল হাতে কোটাল আর তাঁর পাইক-বরকন্দাজদের নিয়ে বটগাছটার কাছে চলে এলেন। ততক্ষণে আওয়াজ বন্ধ হয়েছে। দেখা গেল অদ্ভুত দৃশ্য। গাছের তলায় একপাশে কতগুলো মুস্কো লোক হাত-পা ছড়িয়ে, কেউ চিৎপাত হয়ে, কেউ-বা উপুড় হয়ে পড়ে রয়েছে।

রাজামশাই তো স্তম্ভিত। বললেন— দেখো তো, এরা কারা।

মশালের আলোয় লোকগুলোকে দেখে বরকন্দাজরা বলল— এরা তো ডাকাত, রাজামশাই! বেজায় মার খেয়ে সব ক-টা অজ্ঞান হয়ে রয়েছে। আর, মুখের যা অবস্থা হয়েছে তাতে এদের মা-মাসিরাও মাসখানেকের আগে এদের চিনতে পারবে কি না, সন্দেহ আছে। আহারে, নাক-চোখ-মুখ সব একাকার হয়ে গিয়েছে। এরা এখানে এলই-বা কী করে আর এদের এমন মারই বা দিলে কে?

রাজামশাই চোখ মুছতে মুছতে বললেন, সে কথা পরে ভেবো। আগে এদের ভালো করে পিছমোড়া করে বাঁধো, তারপরে মুখে জল ঢেলে জ্ঞান ফেরাও।

সে রকমই করা হল। ডাকাতদের যারই জ্ঞান ফেরে সেই 'ভূত ভূত' বলে চেঁচিয়ে লাফ দিয়ে উঠে পালাতে যায়। কিন্তু পালাবে কোথায়? হাত-পা তো বাঁধা।

রাজামশাই জিজ্ঞাসা করলেন— তোমাদের সর্দার কে?

ডাকাতরা বলল— আজ্ঞে, ওই যে উনি যাঁর জ্ঞান ফেরানোর জন্যে মুখে কলসি কলসি জল ঢালা হচ্ছে।

—কী নাম তোমাদের সর্দারের?

—আজ্ঞে, ছিরি নগেন্দরনাথ গায়েন।

এইবার রাজামশায়ের ঘুম ছুটে গেল। বললেন— কী সর্বনাশ! তোমরা নগা ডাকাতের দল নাকি?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, রাজামশাই। লোকে আমাদের তাই বলে বটে।

ইতিমধ্যে ছিরি নগেন্দ্রনাথ গায়েনের জ্ঞান ফিরে এসেছে। বরকন্দাজরা তাকে টানতে টানতে রাজামশায়ের কাছে নিয়ে এল। তার ছিরি দেখে রাজামশায়ের কষ্টই হল। নাকটা বেঁকে গেছে, চোখ দুটো আর দেখাই যাচ্ছে না, কপাল আর ঠোঁট ফুলে ঢোল, হাত-পাগুলো কেমনধারা যেন ত্যাড়াব্যাঁকা হয়ে গেছে।

রাজামশাই তাকে জিজ্ঞাসা করলেন— অ্যাই, তুমি নগা ডাকাত?

নগা কাঁদতে কাঁদতে বলল— হ্যাঁ, রাজামশাই।

—তোমার মুণ্ডুটা অমন বেঁকিয়ে রেখেছ কেন? ওটা কি জন্মাবধিই ওরকম নাকি?

—না, রাজামশাই। ঘাড়ে এমন রদ্দা খেয়েছি যে মুণ্ডু সোজা করতে পারছি না। ভূতের রদ্দা, সে কী সোজা ব্যাপার?

রাজামশাই কোটালকে ডেকে বললেন— এরা কেবল ভূত ভূত করছে। মনে হচ্ছে মার খেয়ে বা অন্য কোনো কারণে ওদের সকলের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। এদের এখন কারাগারে নিয়ে যাও। সকাল হলে রাজসভায় নিয়ে এসো। সেখানে ওদের সবকথা শুনব আর তারপরে বিচার হবে।

কোটাল বললেন— রাজামশাই, এই নগা আর তার দলের অত্যাচারে আশেপাশের সব ক-টা রাজ্যের লোক ত্রাহি ত্রাহি করছে। ওর ভয়ে আমরা সারারাত ঘুমোতে পারি না। ধনী-দরিদ্র কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। কত লোক যে ওদের জন্যে সর্বস্বান্ত হয়েছে তার সীমা নেই। অনেক চেষ্টা করেও এতদিন কেউ ওদের আটকাতে পারেনি। এখন যখন ওদের বাগে পেয়েছি, আমরা সবাই আশ মিটিয়ে হাতের সুখ করে নিতে চাই। আপনি দয়া করে বাধা দেবেন না। তারপরে আমরা রাজসভায় নিয়ে যাব।

রাজামশাই বললেন— ওদের তো নড়াচড়া করবারও ক্ষমতা নেই। তার ওপরে আরও মারলে মরে যাবে যে।

—কিচ্ছু মরবে না। আপনি দেখুন না, ওরা নড়াচড়া করতে পারে কিনা।

তখন বরকন্দাজরা সবাই মিলে ডাকাতদের গায়ে আচ্ছা করে জলবিছুটি ঘষে দিল আর অমনি তারা, 'ওরে বাবারে, গেলুম রে, মলুম রে', বলে বেঁকেচুরে নাচতে শুরু করে দিল।

তারপরে যা হল সে আর বলে কাজ নেই।

ভেউভেউ করে কাঁদতে কাঁদতে নগা রাজামশায়ের পায়ে পড়ে বলল— আপনি তো আমাদের শূলেই দেবেন। তার আগে আমার একটি অনুরোধ রাখবেন, রাজামশাই?

—কী অনুরোধ? রাজামশাই জিজ্ঞাসা করলেন।

—মশানে যাবার আগে একটি বার আমি হরনাথ পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা করতে চাই। আপনি আমাকে সেই অনুমতিটা দিন, রাজামশাই।

অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে রাজামশাই বললেন— সেকী? তুমি পণ্ডিতমশায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাও? ঠিক আছে, তাই হবে। তবে মশানে যাবার আগে কেন? এখুনি চলো। রাত তো প্রায় শেষ হয়ে এল। আমরা ওঁর বাড়ি পৌঁছুতে পৌঁছুতে উনি উঠে পড়বেন।

পুবদিকে রাঙা আলোর আঁচল উড়িয়ে ঊষা আসছেন। পাখিরা ঘুম ভেঙে কলরব করে তাঁর আগমনী গাইছে। পণ্ডিতমশাই দাওয়ায় বসে মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। উদবেগে সারারাত ঘুমোতে পারেননি। ভোর বেলার ঠান্ডা বাতাস তাঁর তপ্ত মুখে যেন তাঁর স্বর্গতা মায়ের সস্নেহ হাতের স্পর্শ মাখিয়ে দিচ্ছিল।

সেইসময় ছোট্ট একটি রাখাল ছেলে ছুটতে ছুটতে এসে বলল— পণ্ডিতমশাই, পণ্ডিতমশাই, আমাদের রাজামশাই লোকলস্কর নিয়ে এইদিকে আসছেন। তাঁর বরকন্দাজরা কতগুলো হুমদো মতন লোককে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। ইসস, লোকগুলোর কী অবস্থা! বরকন্দাজরা তাদের মেরে একেবারে কাঁঠাল পাকিয়ে দিয়েছে।

বলতে না-বলতেই রাজার দলবল পণ্ডিতমশায়ের বাড়ির সামনে এসে পড়ল। রাজামশাই পালকি থেকে নেমে জুতো খুলে ভেতরে ঢুকলেন। পণ্ডিতমশাই ততক্ষণে দাওয়া থেকে নেমে এসেছেন। রাজামশাই তাঁকে প্রণাম করে বললেন— গুরুদেব, কাল নগা ডাকাতের দল আমাদের বাগানে ঢুকেছিল। বোধ হয়, তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাজকোষ লুঠ করা। সে তো তারা পারেইনি, উলটে কোনো রহস্যময় কারণে প্রচণ্ড মার খেয়ে গাছের তলায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল। আমার গোড়াতেই সন্দেহ হয়েছিল যে রাজকোষ রক্ষা পাওয়ার পেছনে আপনার কোনোরকম ক্ষমতা কাজ করেছে। পরে যখন নগা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইল তখন স্থির নিশ্চয় হলুম যে আমার সন্দেহে কোনো ভুল ছিল না। আমি ওকে নিয়ে এসেছি। আপনি ওর কথা শুনুন, আমি পরে আপনার সঙ্গে কথা বলব।

হরনাথ বললেন— সে-কী? তুমি রাজা, তোমার কাছে তো কোনো কথা গোপন থাকতে পারে না। তুমি এখানেই থাকবে। নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে যা কিছু আলোচনা তা তোমার সামনেই হবে।

রাজামশায়ের আদেশে নগাকে পণ্ডিতমশায়ের সামনে আনা হল। সে তাঁকে সাষ্টাঙ্গে নমস্কার করে বলল— পণ্ডিতমশাই, শূলে যাবার আগে আপনাকে শেষ দেখা দেখতে এলুম। আপনার অনেক গুণের কথা আমি শুনেছি, কিন্তু আপনি যে আমাদের ভূতের মারও খাওয়াবেন আবার পেয়াদার মারও খাওয়াবেন, এতটা বুঝতে পারিনি। কোনো রাজা-মহারাজারও এ কাজ করার সাধ্যি ছিল না।

হরনাথ রাজামশাইকে জিজ্ঞাসা করলেন— ওদের কি শূলেই দেবে?

রাজামশাই বললেন— নাঃ, যা ঘটেছে তারপরে ওদের শূলে দেবার কোনো প্রয়োজন দেখি না। তবে, আমি ওদের জন্য আরও বড়ো শাস্তি ভেবে রেখেছি।

—সে আবার কী?

—এই নগার বংশগত পেশা হল খোল বাজিয়ে কীর্তন গাওয়া। ও যখন গানের দল গড়ে গাওনা শুরু করল, দেখা গেল যে যে-ই তাদের কীর্তন শোনে সে-ই ভীষণ ক্ষেপে যায় আর ওদের খোল-টোল ভেঙে দিয়ে মারতে তাড়া করে। বার কয়েক বেধড়ক প্রহার খেয়ে ও দলবলসুদ্ধু গান ছেড়ে ডাকাতি করতে শুরু করে দিল। সেইজন্যে আমি স্থির করেছি যে ওকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেবো আর ওর কাজ হবে রোজ সকালে কারাগারের সমস্ত বন্দিদের কীর্তন শোনানো।

তাই শুনে নগা আবার হাউহাউ করে কান্না জুড়ে দিল। সে কাঁদে আর বলে, ওরে বাবারে, এর চেয়ে যে শূলে যাওয়া ছিল ভালো। এত বড়ো শাস্তি আমাকে দেবেন না রাজামশাই। রোজ সকালে? ওরে বাবারে!

নগাকে নিয়ে কোটাল আর বরকন্দাজরা চলে যাবার পর, রাজামশাই হরনাথকে বললেন— গুরুদেব, আপনার শক্তিতেই আজ আমাদের রাজকোষ রক্ষা পেয়েছে। সেটা কীভাবে হল, তা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।

পণ্ডিতমশাই বললেন— আমার শক্তিতে কিছুই হয়নি। তুমি তো জানো যে আমার পূর্বপুরুষ ঈশ্বর জগন্নাথ আগমবাগীশ এই রাজ্যের কোষাগারের দ্বার মন্ত্র দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন। সেটা খোলার মন্ত্রটা তুমি জানো। আরও কয়েকটা মন্ত্র কিন্তু আছে। বংশপরম্পরায় সেই মন্ত্রগুলো এখন আমার আয়ত্তে। তাদের মধ্যে একটা আছে যেটা দরজার সামনে উচ্চারণ করলে পাতালবাসী অপদেবতারা জেগে উঠবে আর কেউ যদি রাজকোষের অর্থ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে বা করতে যায় তাহলে তারা বাধা দেবে আর ঘাড়ে ধরে সেই অর্থ যথাস্থানে রেখে দিতে বাধ্য করবে।

—কী সেই মন্ত্র, গুরুদেব? আমি কি সেটা জানতে পারি না?

পণ্ডিত হরনাথ তর্কতীর্থ গম্ভীর গলায় বললেন— না, রাজা। এই মন্ত্রের যাতে কোনোরকম অপব্যবহার না-হয়, সেই জন্য অন্য কাউকে সেটা না জানানোর আদেশ আছে আমার ওপর।

রাজামশাই মাথা চুলকে বললেন— বেশ কথা, গুরুদেব। আমার জানার দরকার নেই, কিন্তু নগা তো জেনে ফেলেছে। অবশ্য, তাতে আর কিছু যায় আসে না। সে যা মার খেয়েছে, তারপরে মন্ত্র তো দূরস্থান, সে যে তার পিতৃনামও বিস্মৃত হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%