মনোজ সেন

উত্তরাঞ্চল প্রদেশের ভোগরাই গ্রামের নাম এখনও সর্বত্র খুব পরিচিত নয় তবে ভবিষ্যতে হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। হিমালয়ের এই অঞ্চলে যারা ট্রেকিং করে, তারা এর নাম জানে। আগে এখানে হেঁটে যেতে হত, এখন বাস চলাচলের উপযোগী রাস্তা হয়ে গেছে।
গ্রামটি একটি প্রশস্ত উপত্যকার ওপরে। তার চারপাশে গাঢ় সবুজ জঙ্গলে ঢাকা আকাশছোঁয়া পাহাড়গুলো মনে হয় যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। তাদের ফাঁকে ফাঁকে দেবতাত্মা হিমালয়ের অনেকগুলো শুভ্র তুষারমণ্ডিত চুড়ো উঁকি দিয়ে গ্রামটির সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে দেখে। গ্রামটির কাছেই একটি বেশ উঁচু ঝরনা আছে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে মিনিট পনেরো লাগে। তার পাশেই রয়েছে মহাকাল শিবের একটি অতি প্রাচীন মন্দির।
সরকারি তৎপরতায় গ্রামটিকে একটি পর্যটনকেন্দ্র করে গড়ে তোলার কাজ চলছে কয়েক বছর ধরে। একটা ইউথ হস্টেল আগে থেকেই ছিল, তার ওপরে আরও কয়েকটা হোটেল তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে। বছর দুয়েক হল, কলকাতার প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টাল ইন এখানে রিট্রিট নামে একটি সুদৃশ্য চারতারা হোটেল বানিয়েছে। তবে লোকজন আশানুরূপ আসছে না। সেজন্য তারা সপরিবারে সাংবাদিক দীপঙ্কর চৌধুরিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল যাতে তিনি কলকাতায় ফিরে কাগজে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো রিট্রিট সম্পর্কে কিছু লেখেন। পুজোর ছুটি চলছিল। কাজেই অতসীর সঙ্গে সাগর আর শ্রীলতাও দীপঙ্করের সঙ্গী হয়ে গেল।
রিট্রিট ভোগরাই গ্রামের থেকে একটু দূরে জঙ্গলের ভেতরে। হোটেলের চৌহদ্দি বেশ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একটা বাড়ি নয়, অনেকগুলো কটেজ গাছপালার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কটেজগুলোর মধ্যে যাতায়াতের জন্যে রয়েছে পাথরে বাঁধানো সরু পায়ে চলার পথ। প্রত্যেকটি কটেজের সামনে ফুলের বাগান আর ভেতরে আরামপ্রদ থাকবার ব্যবস্থা। এ ছাড়াও রয়েছে সুইমিং পুল, জিমনেশিয়াম, লাইব্রেরি, বই-এর দোকান, কিউরিও শপ ইত্যাদি।
কাঠগুদাম থেকে জিপে ভোগরাই পৌঁছুতে রাত হয়ে গেল। রাত্রের খাওয়া সেরে বিছানায় শোওয়ামাত্র সকলে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন ঘুম ভাঙল। না, পাখির ডাকে নয়, লোকজনের চ্যাঁচামেচিতে। ব্যাপারটা কী জানবার জন্য দরজা খুলে বাইরে এলেন দীপঙ্কর, সঙ্গে সাগর। দেখা গেল হোটেলের কিছু উত্তেজিত কর্মচারী কলরব করতে করতে তাঁদের কটেজের সামনে দিয়ে চলেছে, আর তাদের পেছনে পেছনে আসছেন ওই সাতসকালেই স্যুটেড-বুটেড হোটেলের ম্যানেজার ভবানীপ্রসাদ রায়, একজন ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশ ইন্সপেক্টর আর জনা চারেক বন্দুকধারী কনস্টেবল।
আগেরদিন রাত্রে ভবানীপ্রসাদের সঙ্গে দীপঙ্করের পরিচয় হয়েছিল। তাঁকে ডেকে দীপঙ্কর জিগ্যেস করলেন— কী হয়েছে মি. রায়? এতসব পুলিশ-টুলিশ এসেছে কেন?
ভবানীপ্রসাদ টাকমাথা মোটাসোটা মানুষ। দীপঙ্করের প্রশ্ন শুনে টাই-এর নট ঠিক করতে করতে বললেন— আর বলবেন না মশাই। যতসব বিচ্ছিরি ঝামেলা। এসব একটু মিটে যাক। আপনারা ব্রেকফাস্ট করে আমার অফিসে আসুন, তখন সব বলব।
ব্রেকফাস্টের পর, কিচ্ছু কিনবেন না বলতে বলতে অতসী কিউরিও শপে চলে গেলেন। সাগর আর শ্রীলতাকে নিয়ে দীপঙ্কর গেলেন রিসেপশন কাউন্টারের পেছনে ভবানীপ্রসাদের অফিসে। রায়সাহেব তখন গম্ভীরভাবে কতগুলো কাগজপত্র দেখছিলেন। অতিথিদের ঢুকতে দেখে সেসব সরিয়ে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে সকলকে অভ্যর্থনা জানালেন।
দীপঙ্করের প্রশ্নের উত্তরে রায়সাহেব জানালেন যে তাঁর একজন গেস্ট অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে মারা গেছেন। না, হোটেলে নয়, বাইরে জঙ্গলে। গেস্টটির নাম ড. চিন্ময় গুহ, বাড়ি শ্যামবাজারের মুনীন্দ্র মিত্র লেনে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক। ড. গুহ এর আগেও কয়েক বার এই হোটেলে এসেছেন। অত্যন্ত নিরীহ, নির্বিরোধ মানুষ। সারাদিন পাহাড়ে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। কেবল রাত্রে ঘরে শুতে আসতেন। মাঝে মাঝে দু-তিনদিন তাও আসতেন না। গতকাল দুপুরে যথারীতি উনি হোটেল থেকে বেরিয়ে যান। রাত্রে ফিরে না-আসায় কেউ উদবিগ্ন হয়নি। তাঁর যে-কোনো বিপদ হয়েছে তা কারোরই মনে হয়নি।
আজ ভোর না-হতে ভোগরাই থানার ওসি সুলেমান কুরেশি সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে এসে হাজির। কাল রাত্রে একজন কনট্রাক্টরের লোক একটা রক্তমাখা ছিন্নভিন্ন শার্ট আর ড. গুহর একটা ব্যাগ থানায় জমা দেয়। এখান থেকে মাইল দুয়েক দূরে একটা বড়ো লেবার কলোনি আছে। তার পেছনে জঙ্গলের ভেতরে সে ওগুলো কুড়িয়ে পায়। কুরেশি ড. গুহর ঘর সার্চ করে সেটা সিল করে দিয়ে গেছেন। ব্যাপার দেখে মনে হচ্ছে যে ড. গুহ কোনো হিংস্র বন্যজন্তুর আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।
সাগর জিজ্ঞাসা করল— এ অঞ্চলে বন্যজন্তুর আক্রমণের ঘটনা কি আগে কখনো ঘটেছে?
ভবানীপ্রসাদ বললেন— আমি কখনো শুনিনি। তবে চারদিকে এত ঘন জঙ্গল। ওপর থেকে ভালুক বা নীচ থেকে বাঘ এখানে চলে আসতেই পারে।
—আপনি যে লেবার কলোনিটার কথা বললেন সেটা ঠিক কোথায়?
—ওটা এখানে আসার বাস-রাস্তার ধারে একটা টিলার ধারে। চারদিকে যত কন্সট্রাকশনের কাজ চলছে, তার ওয়ার্কাররা ওখানে থাকে।
—ওখানে যারা থাকে তারা কি কখনো বাঘ-ভাল্লুকের উপস্থিতি টের পেয়েছে?
—মনে হয় না। সেরকম কিছু হলে খবর পেতুম।
—ইতিহাসের অধ্যাপক পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন কেন?
—এখানে নাকি কোনো এককালে একটা বৌদ্ধবিহার না কী যেন ছিল? সেটারই সন্ধান করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল।
ভবানীপ্রসাদের অফিস থেকে বেরিয়ে সুইমিং পুলের কাছে এসে দেখা গেল তার ধারে হোটেলের বাসিন্দাদের একটি উত্তেজিত জটলা। সকলেই অবাঙালি, সবাই সমস্বরে ড. গুহর মারা যাওয়া নিয়ে কথা বলছেন। কার কথা কে শুনছেন বোঝা দুষ্কর।
এই জটলার থেকে একটু দূরে একটা টেবিলে দু-জন মাঝবয়সি ভদ্রলোক অত্যন্ত চিন্তিতমুখে চুপচাপ বসে ছিলেন। একজন কিঞ্চিৎ স্থূলকায়, চোখে রিমলেস সোনার ফ্রেমের চশমা আর পরনে পাজামা-পাঞ্জাবির ওপরে মহার্ঘ কাশ্মীরি শাল। অন্যজনের দোহারা চেহারা, পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি-জহরকোট আর শাল। তাঁরা কেন যে অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেননি, সেটা বোঝা গেল না।
এই দু-জনের পাশে একটা খালি টেবিলে দীপঙ্কর ছেলেমেয়েকে নিয়ে বসে পড়লেন। সাগরকে প্রশ্ন করলেন— ভবানীপ্রসাদের সঙ্গে আলোচনায় কিছু বুঝলি?
সাগর গলাটা একটু উঁচু করে বলল— কিছুই না। কেবল, কতগুলো জায়গায় খটকা লেগেছে।
—যথা?
—এক নম্বর, পুলিশ অত সকালে এল কেন? এরকম তো সাধারণত হয় না। দু-নম্বর, দু-মাইল দূরে জঙ্গলের মধ্যে কোনো বন্যজন্তুর শিকার; একজনের ঘর সার্চ করতে চারটে রাইফেলধারী সেপাই আনবার দরকার পড়ল কেন? দারোগা কি আশঙ্কা করছিলেন যে বন্যজন্তুটা ওই ঘরের মধ্যে বসে আছে? তিন নম্বর, ড. গুহ যে বৌদ্ধবিহার খুঁজছিলেন, সেটা কার কাজ? নিজের না বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের? বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি হত, তাহলে তারা তাঁকে নিশ্চয়ই চারতারা হোটেলে রাখত না। তাহলে, ধরে নেওয়া যেতে পারে যে এটা নিজের জন্যই। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে যে এত খরচ করে কোনো সহকারী ছাড়াই তিনি এই কাজটি করছিলেন কেন? চার নম্বর, ড. গুহ যে মৃত তার প্রমাণ হিসেবে যা দেখানো হয়েছে সেটা তাঁর একটা রক্তমাখা শার্ট। কেন? বাকি জামাকাপড় কোথায় গেল? সেগুলো কি ভালুকবাবাজি তাঁর ছেলেকে দেওয়ার জন্য নিয়ে গিয়েছেন?
সাগর তার বক্তব্য শেষ করা মাত্র পাশের টেবিলের ভদ্রলোক দু-জন হাততালি দিয়ে উঠলেন। রিমলেস চশমা বললেন— সাবাস! তুমি তো বড়ো হলে মস্ত ডিটেকটিভ হবে হে। এ তো রীতিমতো প্রতিভা।
বলতে বলতে দু-জনে তাঁদের চেয়ার টেনে এনে দীপঙ্করের টেবিলে বসে পড়লেন। পরিচয়পর্ব শেষ হলে জানা গেল যে রিমলেস চশমার নাম প্রফেসর জয়নারায়ণ বসাক, মৌলানা আব্দুল মজিদ কলেজে ইতিহাস পড়ান আর অন্যজনের নাম ড. রমারঞ্জন সিংহ। ওঁরা দীর্ঘদিনের বন্ধু, সবসময় একসঙ্গে বেড়াতে বের হন।
প্রফেসর বসাক বললেন— তুমি যে রহস্যের লিস্ট দিলে তাতে আমরা আরও গোটা দুয়েক আইটেম যোগ করতে চাই। হয়তো তাতে তোমার অ্যানালিসিস-এ সুবিধে হবে।
সাগর সহাস্যে বলল— কী আইটেম?
—তুমি তো চার নম্বরে শেষ করেছিলে, এবার পাঁচ নম্বর। হোটেলের খাতায় চিন্ময় গুহর যে ঠিকানা দেওয়া আছে, সেটা ভুয়ো। আমি খাস শ্যামবাজারের লোক, আমাদের ওখানে বন কেটে বসত বলতে পারো। শ্যামবাজার-বাগবাজারের প্রতিটি গলিঘুঁচি আমার নখদর্পণে। আমি হলফ করে বলতে পারি যে শ্যামবাজারে মুনীন্দ্র মিত্র লেন বলে কোনো রাস্তা নেই, কস্মিনকালেও ছিল না। তারপর ছ-নম্বর। আমার এই বন্ধুটি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে গত চার বছর যাবৎ অর্থনীতি পড়াচ্ছে। ও বলছে যে ওখানে চিন্ময় গুহ নামের কোনো অধ্যাপক নেই। চারবছর আগে যদি থেকে থাকেন তো সেটা আলাদা কথা। সেক্ষেত্রে জানা দরকার যে, এতবছর বাদে সেই পরিচয় জাহির করবার কারণটা কী?
সাগর জিগ্যেস করল— আপনারা কবে এখানে এসেছেন? ওই লোকটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কি?
—আমরা পরশু রাত্রে এসেছি, সস্ত্রীক। কাল ব্রেকফাস্ট করবার জন্য ডাইনিং রুমে যখন যাই, তখন লোকটা আমাদের পাশের টেবিলেই বসেছিল। লম্বা-চওড়া স্বাস্থ্যবান লোক, তামাটে গায়ের রং, উশকো-খুশকো কাঁচা-পাকা চুল, পরনে জিনস আর গলাবন্ধ রংচঙে সোয়েটার। বয়েস তিরিশ থেকে পঁয়তিরিশের মধ্যে। দেখে বাঙালি বলে মনে হয়েছিল, কিন্তু যেচে আলাপ করতে যাইনি। আমার গিন্নির আবার কৌতূহল বড্ড বেশি। তিনি নাকি দেখেছেন যে লোকটা খেতে খেতে একটা ম্যাপ দেখছিল। তারপরে আর তাঁকে দেখিনি।
—আচ্ছা, আপনি তো ইতিহাস পড়ান। আপনার কি মনে হয় যে এখানে কোনো প্রাচীন বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসস্তূপ থাকা সম্ভব?
—হ্যাঁ, সেটা খুব সম্ভব। চীন থেকে ফা-হিয়েন বা হিউ-এন-সাঙের মতো যেসব পরিব্রাজক অতীতে ভারতবর্ষে আসতেন বৌদ্ধ তীর্থক্ষেত্রগুলো দর্শন করতে, তাঁদের একাধিক পথের মধ্যে একটির ওপরে এই ভোগরাই গ্রামটি পড়ে। যাঁরা আফগানিস্তান বা গান্ধার থেকে খাইবার পাস পেরিয়ে পুরুষপুর বা পেশোয়ার হয়ে কুশীনগর, বুদ্ধগয়া ইত্যাদি দেখে গৌড় বা কর্ণসুবর্ণ হয়ে তাম্রলিপ্তে গিয়ে দেশের জাহাজ ধরতেন, তাঁরা চাইলে এখানে বিশ্রাম নিতে পারতেন। এ-অঞ্চলের আদিবাসীদের প্রাচীন ভাষায় ভোগরাই শব্দের মানে— খুব ভালো সরাইখানা। অবশ্য সেই রাস্তাটা আজ আর খুঁজে পাওয়া যাবে কি না সে-ব্যাপারে সন্দেহ আছে।

অধ্যাপক বসাকের কথা শুনতে শুনতে সাগর অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়ল। সেটা অধ্যাপক লক্ষ করলেন। বললেন— কী হল? আমার কথায় চিন্তার খোরাক পেলে বলে মনে হচ্ছে যেন?
—না, না, ও কিছু নয়। আপনাদেরও তো দেখে খুব চিন্তিত বলে মনে হচ্ছিল। সেটা কি ঠিক?
—হ্যাঁ, আজ সকালে সব খবর শুনে আমরা চিন্তা করছিলুম যে পুলিশের কাছে গিয়ে সবকথা বলা আমাদের উচিত হবে কি না। আবার এও ভাবছিলুম যে কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে এসে গায়ে পড়ে পুলিশ ছুঁয়ে যদি ছত্রিশ-ঘা হয়, তখন এই বিদেশ-বিভুঁয়ে সেটা সামলাতে পারব তো?
দীপঙ্কর বললেন— না, না, আপনারা কেন যাবেন? আপনারা যা বললেন, সে তো পুলিশ তদন্ত শুরু করলেই বেরিয়ে আসবে। খামোকা ওদের পরিশ্রম লাঘব করতে যাবেন কোন দুঃখে? তা ছাড়া সত্যিই তো, এর মধ্যে জড়িয়ে পড়লে আপনাদের হাঁড়ির হাল হয়ে যেতে পারে। আর লোকটা যখন বাঘের পেটেই গেছে তখন সে পাজিই হোক বা জালই হোক, পুলিশ আর তা নিয়ে মাথা খামাবে বলে তো মনে হয় না।
কথাটা শুনে দুই বন্ধু নিশ্চিন্ত হলেন বলে মনে হল। ড. সিংহ বললেন— আপনি সাংবাদিক, এসব ব্যাপার আপনিই ভালো জানবেন। এবার আমরা তাহলে উঠি? আমাদের গৃহিনীরা গেছেন মাউন্ট ভিউ হোটেলে শাড়ির একজিবিশন দেখতে। এখন সেখান থেকে তাঁদের উপড়ে বের করে আনা বিশেষ প্রয়োজন।
অধ্যাপকদের প্রস্থানের পর দীপঙ্কর বললেন— তুই বুঝেছিলি যে ওঁরা বাঙালি, আর এ-ব্যাপারে ওঁদের কিছু বক্তব্য থাকতে পারে, তাই জোরে জোরে কথা বলছিলি, তাই না?
সাগর বলল— ঠিক ধরেছ।
—আমি যেটা বুঝতে পারছি না, তা হল যে ওই লোকটা যদি বর্ধমান ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত নাই হয় তাহলে সে ড. সিংহকে চিনল কী করে আর কেটে পড়তেই বা গেল কেন?
—সেটা দু-ভাবে হতে পারে। এক, লোকটা এখানে কোনো একজন আসতে পারে জেনে রোজ হোটেলের রেজিস্টার চেক করতে গিয়ে ড. সিংহের পরিচয় পায় অথবা দুই, রিসেপশনিস্ট তাঁকে ডেকে বলে যে বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে আর একজন অধ্যাপক এখানে এসেছেন। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটাই আমার ঠিক বলে মনে হয়।
শ্রীলতা বলল— আহা রে, পালাতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিল লোকটা।
সাগর বলল— তোর দুঃখিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমার ধারণা যে লোকটা মরেনি, এখানেই কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে।
—তা কী করে হয়, দাদা? ওর ছেঁড়াখোঁড়া শার্টটাই কি প্রমাণ করে না যে, লোকটা আর বেঁচে নেই?
—না, বরং তার উলটোটাই প্রমাণ করে।
অতসী বললেন— কতবার বারণ করেছি যে ছেলেটাকে এইসব খুনখারাবির মধ্যে যেতে দিও না, তা শুনবে কী কেউ আমার কথা? সুপ্ত প্রতিভা জাগাতে গিয়ে যে লেখাপড়া লুপ্ত হতে বসেছে সে-কথা কী কেউ ভাবে? সামনে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা, সেটা কি কারুর মনে আছে?
দীপঙ্কর হাসতে হাসতে বললেন— আবার কী হল? ছুটিতে বেড়াতে এসে লেখাপড়ার কথা উঠছে কেন? পরীক্ষা-টরীক্ষা কলকাতায় ফিরে। এখন একটু রিল্যাক্স করুক না।
—রিল্যাক্স? এই রিল্যাক্স করার ছিরি? সকাল থেকে চোখ কপালে তুলে বসে আছে ছেলেটা, কথা বললে সাড়া দেয় না। হাঁ করে বসে রহস্যভেদ করছেন। দেখলে গা-পিত্তি জ্বলে যায়।
শ্রীলতা বলল— আঃ, মা। দেখছ দাদা চিন্তা করছে। এইসময় চ্যাঁচামেচি করো না তো।
—তুই আর পোঁ ধরিসনি বাপু। দাদা চিন্তা করছে, তাতো দেখতেই পাচ্ছি। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে তাড়িয়ে হন্যে হয়ে গেল।
দীপঙ্কর বললেন— ঠিক, ঠিক। তা হ্যাঁরে, সাগর, অনেক তো চিন্তা করলি। আর কত করবি?
সাগর বলল— দ্যাখো বাবা, সকাল বেলায় প্রফেসর বসাক আমাদের একটা মোক্ষম ক্লু দিয়েছেন, কিন্তু সেটা যে কী তা কিছুতেই ধরতে পারছি না।
শ্রীলতা একটা চকোলেটের বার এগিয়ে দিয়ে বলল— এটা খা। খেতে-খেতেই দেখবি বুদ্ধিটা ফট করে খুলে যাবে।
সাগর চকোলেট নিয়ে খেতে শুরু করল। একটু বাদেই লাফ দিয়ে বিছানার ওপর উঠে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে উঠল— পুরুষপুর! পেয়ে গেছি। বুঝতে পারছিলুম যে পুরুষপুরটা খুব ইম্পর্টান্ট, কিন্তু কীভাবে সেটা ধরতে পারছিলুম না।
শ্রীলতা একচক্কর নেচে নিয়ে বলল— এখন ধরতে পেরেছিস তো? পারতেই হবে। বলেছিলুম না যে চকোলেট খেলেই বুদ্ধিটা ফট করে খুলে যাবে?
অতসী বললেন— তোদের এই পাগলামি বন্ধ করবি? এত আদিখ্যেতা আর সহ্য হচ্ছে না।
সাগর বলল— বাবা, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছি। কয়েকটা জায়গায় একটু ফাঁক রয়ে গেছে। সেগুলো ভরাট না-করা পর্যন্ত কিছু বলা বোধ হয় উচিত হবে না।
দীপঙ্কর বলল— ফাঁকগুলো ভরাট করার জন্য কী করা দরকার?
—চিন্ময় গুহের শার্টটা একবার দেখা দরকার।
—বেশ তো, চল এখন একবার থানায় গিয়ে কুরেশির সঙ্গে কথা বলে দেখি। আমার পরিচয় পেলে দেখতে দিলেও দিতে পারে।
অতসী আর্তনাদ করে উঠলেন— এই ভর সন্ধে বেলায় তোমরা থানায় যাবে?
দীপঙ্কর মাথা চুলকিয়ে বললেন— যাই-না। কাছেই তো, হাঁটাপথ। যাব আর আসব।
ওসি সুলেমান কুরেশি থানায় ছিলেন না, তাঁকে কোয়ার্টাস থেকে ডেকে আনা হল। বেশ খাতির করেই দীপঙ্কর আর তাঁর ছেলেমেয়েদের বসালেন। দীপঙ্করের কথা শুনে অত্যন্ত পুলকিত হয়ে বললেন— এই ছেলেটি সখের ডিটেকটিভ? খুব ক্রাইমের ওপরে বই পড়ে বুঝি? আমি ওকে নিশ্চয়ই সাহায্য করব। কিন্তু এই কেসে রহস্য তো তেমন কিছু নেই। ওই চিন্ময় গুহ নামের লোকটা একটা ফ্রড। এখানে সে যে কী করছিল তা আমি জানি না। তার কাগজপত্র পরীক্ষা করে যে সেটা জানব তারও উপায় নেই, কারণ তার ঘর সার্চ করে কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে, চেনা লোকের কাছে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে পালাতে গিয়ে মারা পড়েছে, সেটা জানতে পেরেছি। ভালোই হয়েছে, আপদ চুকেছে।
দীপঙ্কর কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। সাগর বাধা দিয়ে বলল— সে তো বটেই। তবে আপনি যদি আমার দু-একটা প্রশ্নের উত্তর দেন তো খুব ভালো হয়।
—নিশ্চয়ই দেব। বলো, কী জানতে চাও?
—আপনি কী করে জানলেন যে লোকটা ফ্রড? আর ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সে পালিয়েছে?
—আজ দুপুরে কলকাতায় মেসেজ পাঠাই চিন্ময় গুহর বাড়িতে তার মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার জন্য। একটু পরেই খবর পাই যে ঠিকানাটা ভুল। তখন বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে ফোন করি। সেখান থেকে জানা গেল যে ওই নামে কোনো অধ্যাপক ওখানে নেই। তখন হোটেলে ফোন করে জানতে পারি যে ওখানে ওই ইউনিভার্সিটিরই একজন অধ্যাপক আছেন আর রিসেপশনিস্ট মহিলা গুহকে সেই খবরটা দেয়। এরপর দুয়ে-দুয়ে চার।
—মি. রায়ের কাছে জানা গেল যে বাসরাস্তার ধারে লেবার-কলোনির পিছনে জঙ্গলের ভেতরে চিন্ময় গুহর রক্তমাখা শার্ট আর ব্যাগ পাওয়া গেছে। আপনি যদি অনুমতি করেন তো সেগুলো আমি একবার দেখতুম।
—সেগুলো তো এখানে নেই। এই কিছুক্ষণ আগে আমার লোক সেগুলো নিয়ে দিল্লি চলে গেল ফোরেনসিক পরীক্ষা করানোর জন্য। ফোরেন্সিক পরীক্ষা কাকে বলে জানো তো?
সাগর সহাস্যে বলল— হ্যাঁ, জানি। আচ্ছা, কোনো হিংস্র জন্তু গুহসাহেবকে আক্রমণ করেছিল বলে আপনার মনে হয়? ভালুকদের তো এখন ঘুমোনোর সময়। আর, হতে পারে বাঘ। এখানে যে বাস-রাস্তা দিয়ে সারারাত বড়ো বড়ো মালবোঝাই ট্রাক, ট্র্যাক্টর, ক্রেন বা অন্যান্য কন্সট্রাকশনের মেশিনপত্র প্রচণ্ড শব্দ করে চলাচল করছে, তার ত্রিসীমানায় কোনো বাঘ কি আসতে পারে কখনো?
কুরেশি ব্যাজার হয়ে বললেন— তা আমি কী করে বলব? বাঘ-ভাল্লুক তো আর আমার সঙ্গে পরামর্শ করে জঙ্গলে ঘুরতে বেরোয় না। তুমি কী জানতে চাইছ সেটা পরিষ্কার করে জিগ্যেস করো তো।
—তাই করব। তবে, তার যে উত্তর আপনি দেবেন সেটা শুধু আমাদের এই ক-জনের মধ্যেই থাকবে। আমার বাবা সাংবাদিক হলেও তিনি তা প্রকাশ করবেন না কারণ তা করলে আমাদেরই দেশের ক্ষতি হবে। আর, কেবলমাত্র আমার কৌতূহল মেটানোর জন্য যদি আপনি জবাব না দেন, তাহলেও কোনো অসুবিধে নেই। আমরা তো আর কয়েক দিনের মধ্যেই জানতে পারব যে আমার সন্দেহটা ঠিক না ভুল।
দীপঙ্কর ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে বললেন— ব্যাপারটা কী বল তো? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
কুরেশি দীপঙ্করকে পাত্তা না-দিয়ে একটু রূঢ়ভাবেই সাগরকে বললেন— বক্তৃতা না-দিয়ে আসল কথাটা কী তা বলবে?
—হ্যাঁ। আমার ধারণা গুহসাহেব বর্ধমান থেকে আসেননি, এসেছেন দিল্লি থেকে। তিনি এখন খুব সম্ভবত আপনার বাড়িতেই আছেন। আপনারা দিল্লি থেকে ফোর্স আসবার অপেক্ষা করছেন। এলেই, রেড শুরু করবেন। আমার অনুমানটা কি সঠিক?
সাগরের কথা শুনতে শুনতে কুরেশি এমন মুখব্যাদান করলেন যে তাঁর চোয়ালটা প্রায় টেবিলে ঠেকে যাওয়ার মতো অবস্থা হল। কোনোরকমে সামলে নিয়ে কাষ্ঠ হেসে বললেন— তোমার এহেন অনুমানের কারণটা জানতে পারি?
—কারণ অনেকগুলো। তারা এইরকম। প্রথম, একজন প্রফেসর, তাঁর যতই ব্যক্তিগত টাকাপয়সা থাক না-কেন, তাঁর রিসার্চের জন্য একটা দামি ফোরস্টার হোটেলে এসে বার বার উঠবেন না। তিনি যা দিয়ে রিসার্চ করছেন বলে বলেছেন, সেটার থেকে যদি প্রচুর অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকত, তাহলে হয়তো এটা মেনে নেওয়া যেতে পারত। একটা বৌদ্ধবিহারের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার সেরকম কোনো ব্যাপার নয়।
—তা কেন? ওই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কোনো গুপ্তধন তো থাকতে পারে, তাই না?
—হয়তো পারে। তবে, সেটা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের থাকবার জায়গা না-হয়ে কোনো রাজপ্রাসাদ-টাসাদ হলে সেই সম্ভাবনাটা প্রবলতর হত। এখানে সেরকম কোনো রাজপ্রাসাদ কস্মিনকালেও ছিল বলে ইতিহাসে লেখে না। এর থেকে এটা বোঝা যাচ্ছে যে বৌদ্ধবিহার বাজে কথা, গুহসাহেব এখানকার জঙ্গলে অন্য কিছু খুঁজছিলেন আর থাকবার জন্য এই হোটেলটা বেছে নিয়েছিলেন। তার অন্যতম কারণ এখানে যাঁরা এসে ওঠেন তাঁরা কেউ অন্য কারুর ব্যাপারে নাক গলান না। এমনকী বাঙালিরাও, এই যে দাদা আপনিও বাঙালি আমিও বাঙালি, বলে এ ওর ঘাড়ে পড়েন না। আর এটা হতে পারে যে, এই হোটেলটাও তাঁর নজরদারির লিস্টের মধ্যে ছিল। কেন সেটা পরে বলছি। এবার দ্বিতীয় কারণ। ভদ্রলোক তো এখানে ধরা পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পালালেন। কিন্তু, বন্যজন্তুর হাতে মারা যেতে গেলেন কেন?
—এটা কী একটা কথা হল, ডিটেকটিভ সাহেব? উনি কি বন্যজন্তু ডেকে এনে মারা গেছেন?
—অনেকটা তাই। ছেঁড়া শার্টের গল্পটা একটু কাঁচা হয়ে গেছে। এই শীতে উনি কি শার্ট গায়ে জঙ্গলে ঘুরছিলেন? প্রফেসর বসাকের কথায় জানা গেল সে-সকালে তাঁর পরনে ছিল মোটা রংচঙে সোয়েটার। জঙ্গলে রাত্রি বেলা তার ওপরে নিশ্চয়ই কোট, ওভারকোট ইত্যাদি ছিল। সেগুলো গেল কোথায়? পাওয়া গেল শুধু শার্টটা? তার মানে বোঝা যাচ্ছে যে ভদ্রলোক হোটেল থেকে পালালেন বটে কিন্তু ভোগরাইতেই থেকে গেলেন এবং, সেটা পুলিশের মদতে আর পুলিশকে মদত দেওয়ার জন্য।
—পুলিশকে মদত দেওয়ার জন্য? তা কী করে হয়?
—আপনারা গুহসাহেবের শার্ট আর ব্যাগ পেয়েছেন রাত্রি বেলা আর আজকেই ভোর না-হতে হোটেলের বাসিন্দারা কোথাও বেরিয়ে যাওয়া আগেই একগাদা লোকজন সঙ্গে নিয়ে হইচই করতে করতে হোটেলে গিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। এই অস্বাভাবিক ঘটনা থেকে প্রমাণ হয় যে আপনার বা পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল হোটেলের সবাইকে জানানো যে গুহসাহেবের মৃত্যু হয়েছে এবং সে-ব্যাপারে আপনারা নিশ্চিত। কিন্তু একথাটা খেয়াল করেননি যে, গুহসাহেব যে আপনাদেরই লোক সেটাও এর থেকে বোঝা যেতে পারে। আরও একটা কথা। যে লোকটির ওপরে গুহসাহেব নজর রাখছিলেন, তাকেও আপনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে কোনো একজন বিশেষ লোককে আপনারা সন্দেহ করছেন না। করলে, হোটেলসুদ্ধু লোকের ঘুম ভাঙিয়ে হইচই করার দরকার পড়ত না।
—লোকটি কে তাও তুমি বুঝতে পেরেছ না কি?
—বোধ হয় পেরেছি। গুহসাহেবের বার বার এই হোটেলে ওঠা থেকে মনে হয় তিনি ম্যানেজার ভবানীপ্রসাদ রায়। তিনিই একমাত্র কন্সট্যান্ট ফ্যাক্টর।
বিচলিত গলায় কুরেশি বললেন— এসব একদম বাজে কথা। বাইরের কোনো লোকের সঙ্গে এসব কথা আলোচনা করবে না। আমি তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
মৃদু হেসে সাগর বলল— আপনার সাবধান করে দেওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি তো প্রথমেই বলেছি যে আমাদের আলোচনার কথা আর কেউ জানতে পারবে না, আমার বাবা সাংবাদিক হলেও নয়। সে যাকগে। তাহলে একটা কথা স্পষ্ট হল যে গুহসাহেব আপনাদেরই লোক। আর জাল ড. গুহের লুকিয়ে থাকার শ্রেষ্ঠ জায়গা পুলিশের কোয়ার্টাস ছাড়া আর কী হতে পারে?
গভীর ভ্রূকুটি করে কুরেশি বললেন— চিন্ময় গুহ কি খুঁজছিলেন জানো?
—খুব সম্ভবত, একটা রাস্তা, যেটা বহু শতাব্দী আগে লুপ্ত হয়ে গেছে বলে সকলের ধারণা। রাস্তাটা আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে হিমালয়ের ভেতর দিয়ে ভোগরাই ছুঁয়ে জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে চলে গেছে নেপালে। প্রফেসর বসাক পুরুষপুর বা পেশোয়ারের নাম না করলে সেটা হয়তো আমার পক্ষে ধরাটা শক্ত হত। মনে হয়, স্মাগলাররা এই পথের সন্ধান জানতে পেরেছে আর অতীতের মতোই এই ভোগরাইকে তাদের একটি স্টেশনে পরিণত করেছে। আমার ধারণা এটা ড্রাগ পাচারের রাস্তা, কারণ এর একদিকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান আর অন্যদিকে নেপাল, বিহার, বাংলাদেশ, বর্মা, থাইল্যান্ড ইত্যাদি। আর রাস্তাটা ছাড়া গুহসাহেব খুঁজছিলেন এই চোরাচালান চক্রের পাণ্ডাদের।
—তারা কারা তাও জানো না কি?
—না, সেটা জানি না। তবে গুহসাহেব জানেন। আর, তাদের ধরবার জন্যই উনি বাঘ-ভাল্লুকের গল্প বানিয়ে এখানে থেকে গেছেন। নইলে, সোজা দিল্লি ফিরে যেতেন।
দীপঙ্কর জিজ্ঞেস করলেন— আদৌ গল্পটা বানাবার দরকার কী ছিল? স্রেফ গা-ঢাকা দিলেই তো পারতেন।
—আমার ধারণা, এই চক্রের পাণ্ডারা সন্দেহ করছে যে তাদের ওপরে কেউ নজর রাখছে। গুহসাহেবের জঙ্গলে ঘোরাঘুরি যে তাদের সন্দেহ বাড়াচ্ছে সেটা ধরে নেওয়া যেতেই পারে। গুহসাহেবের মৃত্যুসংবাদের গল্পটা তাদের রিল্যাক্স করতে সাহায্য করবে।
কুরেশির ঘরের একপাশে একটা দরজার পরদা সরিয়ে ভেতরে এলেন একজন মধ্যবয়স্ক, উশকো-খুশকো চুল, স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক। বললেন— আমি ওপাশ থেকে সব শুনেছি। তোমার সব অনুমানই ঠিক, কেবল একটি ছাড়া। আমি দিল্লি থেকে আসিনি।
ছেলেমেয়েকে নিয়ে প্রবলবেগে চকোলেট খেতে খেতে বিজয়গর্বে ঘরে ঢুকলেন দীপঙ্কর। অতসীকে একটা চকোলেট দিয়ে বললেন— তোমার ছেলে একেবারে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়নি। তার কিছু প্রাপ্তিযোগও ঘটেছে। কী পেয়েছে দ্যাখো। একটা নোটবই আর একটা দামি কলম। দুটোর ওপরেই ছোটো ছোটো করে লেখা 'ইন্টারপোল'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন