মনোজ সেন

সে অনেকদিন আগেকার কথা। মহেন্দ্রনগর রাজ্যে অনন্তপুর গ্রামের কেষ্ট নস্করের গোরুটা হঠাৎ একদিন রাত্রে গোয়াল থেকে বেরিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ভোর বেলা মাঠে-ঘাটে ঘুরে কেষ্ট যখন গোরুটাকে পেলেন না, তখন তাঁর গ্রামের লোকেদের গিয়ে বললেন— আমার গোরুটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে সে শালকোঁড়া বনের দিকে চলে গেছে। আমি সেদিকেই যাব ভাবছি। তোমরা আমার সঙ্গে আসবে?
সবাই কেষ্ট নস্করকে খুব ভালোবাসত। তারা সমস্বরে বলল,— নিশ্চয়ই। একা-একা তোমার ওই বনের মধ্যে যাওয়া হতেই পারে না।
কেষ্ট নস্করের সঙ্গে তখন গ্রামসুদ্ধু লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে শালকোঁড়া বনের দিকে চলল। বনটা বড়ো, তবে গভীর জঙ্গল কিছু নয়। বড়ো বড়ো গাছ আছে বটে, তবে ঝোপঝাড়ই বেশি। নস্কর আর তাঁর লোকজন হই-হই করতে করতে আর লাঠি দিয়ে ঝোপগুলো খোঁচাতে খোঁচাতে বনের ভেতরদিকে এগোতে শুরু করল। ব্যাপার দেখে গ্রামের ছোটোরাও লাফাতে লাফাতে এসে তাদের বাবা-কাকাদের সঙ্গে জুটে গেল। বেশ একটা হুলুস্থুল পড়ে গেল।
এই সময়ে অনন্তপুরের পাশের গ্রাম শীতলদিঘির কিছু হাটুরে লোক শালকোঁড়া বনের পাশ দিয়ে হাটে যাচ্ছিল। গোলমাল শুনে তাদের খুব কৌতূহল হল। তারা অনন্তপুরের বাসিন্দা গোবিন্দকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞাসা করল— তোমরা কী খুঁজছ গো?
গোবিন্দ আবার শীতলদিঘির লোকেদের একদম পছন্দ করত না। সে বললে— তোমাদের সে কথা বলতে যাব কেন হে? যাও, যাও, নিজের কাজে যাও।
তাই শুনে হাটুরেদের কৌতূহল আরও বেড়ে গেল। তারা কাকুতি-মিনতি করে বলল— আহা, বলোই-না! আমাদের অমন পরপর ভাবছ কেন? আচ্ছা, ঠিক আছে, এই একটা পেয়ারা খাও। ডাঁসা আর খুব মিষ্টি। এইবার বলো।
গোবিন্দ পেয়ারা খেতে খেতে বলল— এই একটা বড়ো সাদা মতন জিনিস। ভীষণ দামি। ব্যস, আর কিছু বলতে পারব না। বলে, সে এক দৌড়ে বনের ভেতরে চলে গেল।
হাটুরেরা পড়ল মহা সমস্যায়। বড়ো সাদা মতন জিনিস, ভীষণ দামি। সেটা কী হতে পারে?
একজন বললে— বুঝেছি। ভীষণ দামি বড়ো সাদা জিনিস মানে কোনো দামি পাথর। হিরেও হতে পারে। তবে কি বনের ভেতরে গুপ্তধনটন লুকোনো আছে আর সবাই মিলে সেটাই খুঁজতে এসেছে? নিশ্চয়ই তাই। তাহলে আমরাই বা বাদ যাই কেন? বনের ভেতরে লুকোনো গুপ্তধন তো যে পাবে তার। চলো, আমরাও আমাদের গাঁয়ের লোকেদের ডেকে আনি।
এই কথা বলামাত্র সবাই মিলে দৌড়ল তাদের গ্রামের দিকে। একটু বাদেই দেখা গেল শীতলদিঘির লোকজন শাবল, কোদাল, খন্তা ইত্যাদি নিয়ে ছুটতে ছুটতে আসছে। শালকোঁড়া বনে ঢুকেই তাদের কেউ মাটি কোপাতে শুরু করে দিল, কেউ ঝোপগুলো খোঁচাতে লাগল, আবার কেউ-বা মোটা মোটা গাছগুলো ফাঁপা কি না সেটা বোঝবার জন্য তাদের গায়ে বাঁশ দিয়ে ঢকাং-ঢকাং করে পেটাতে লাগল।
এদিকে হয়েছে কী, শীতলদিঘির দু-জন, পঞ্চানন আর দুলাল, মহেন্দ্রনগরের সৈন্যদলে কাজ করত। সকাল বেলা তারা এল না দেখে সেনাপতি একজন সেপাইকে তাদের বাড়িতে পাঠালেন তাদের খোঁজ করবার জন্য। সে শীতলদিঘিতে এসে দেখে গ্রামের মধ্যিখানে মহিলারা একজোট হয়ে খুব উত্তেজিতভাবে কী যেন আলোচনা করছে। তাদের ভেতর থেকে দুলালের স্ত্রীকে খুঁজে বের করে সে জিজ্ঞাসা করল— দুলাল আজ কাজে যায়নি কেন?
দুলালের স্ত্রী পেট-আলগা মানুষ। সে তড়বড় করে বলল— কেন যাবে? তুমি শোনোনি বুঝি যে শালকোঁড়া বনে গুপ্তধন পাওয়া গেছে? সে ওখানে গেছে সেইসব আনবার জন্য।
—গুপ্তধন পাওয়া গেছে না কি? বলো কী? কীরকম গুপ্তধন?
—আমি তো শুনলুম সেসব বেজায় দামি দামি হিরে-মানিক। এই ধরো, হাঁসের ডিমের মতো মুক্তো, আধলা ইটের মতো চুনি, হাতের তেলোর মতো পান্না, কদবেলের মতো হিরে, আরও কত কী। তাদের একটা পেলেও কাউকে আর সাতপুরুষ করে খেতে হবে না। আমি তো ওঁকে বলেছি যে আমাকে একটা হিরে বসানো বিছেহার গড়িয়ে দিতেই হবে, হ্যাঁ। আমার বলে কত দিনের শখ!
পুরো কথাটা আর শোনা হল না। খানিকটা শুনেই সেপাই বাবাজি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগাল রাজবাড়ির দিকে।
দেখতে-না-দেখতে কথাটা মহেন্দ্রনগরের রাজা প্রচণ্ড সিংহের কানে উঠল। উনি তৎক্ষণাৎ সেনাপতি আর মন্ত্রীমশাইকে ডেকে পাঠালেন। তাঁরা দু-জনে তখন রাজবাড়ির রান্নাঘরে রাঁধুনিঠাকুরের মাথায় হাত বুলিয়ে গোপনে ইলিশমাছের ডিমভাজা খাচ্ছিলেন। রাজামশায়ের ডাক পেয়ে প্রবলবেগে মুখ মুছতে মুছতে দৌড়ুলেন অন্তঃপুরের দিকে।
প্রচণ্ড সিংহ অলিন্দে চিন্তিতভাবে পায়চারি করছিলেন। দু-জনে কাছে আসতে নাক কুঁচকে বললেন— আমার রাজ্যে যখন ভয়ংকর সব ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে, তখন আপনারা ইলিশমাছ খাচ্ছেন। লজ্জা করে না আপনাদের?
সেনাপতি বললেন— আজ্ঞে, ইলিশমাছ নয় মহারাজ, আমরা ইলিশমাছের ডিমভাজা খাচ্ছিলুম। ওই, মানে খুব খিদে পেয়েছিল কিনা!
মন্ত্রীমশাই সেনাপতিকে চিমটি কেটে বললেন— তুমি থামো। কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে, মহারাজ?
রাজামশাই বললেন— কোথায় থাকেন সবাই? আপনারা কি জানেন, যে শালকোঁড়ার বনে গুপ্তধন বেরিয়েছে?
মন্ত্রীমশাই আর সেনাপতি সমস্বরে বললেন— কই, না তো!
—কোত্থেকে আর জানাবেন! ইলিশমাছের গন্ধ পেলে কী আর আপনাদের কোনো জ্ঞানগম্যি থাকে? যাকগে, সেসব বেরিয়েছে আর অনন্তপুর এবং শীতলদিঘির লোকেরা সেই গুপ্তধন সংগ্রহ করতে বনের ভেতর ঢুকেছে। এ সব কী হচ্ছে? শুনলুম, ওখানে না কি অত্যন্ত মহার্ঘ্য মণিমাণিক্যাদি পাওয়া গেছে; যার এক-একটারই মূল্য লক্ষ স্বর্ণমুদ্রারও বেশি। সেইসব রত্ন ওই গেঁয়ো লোকগুলো ভোগ করবে আর আমি এখানে বসে বসে বুড়ো আঙুল চুষব?
মন্ত্রীমশাই বললেন— না, না, তা কখনোই হতে দেওয়া যায় না। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না মহারাজ। আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা নিচ্ছি।
—বটে। তা কী ব্যবস্থা নেবেন?
মন্ত্রীমশাই মাথা চুলকে বললেন— তাই তো। কী ব্যবস্থা নেব? শালকোঁড়া বন তো আমাদের রাজ্যের বাইরে।
রাজামশাই কপাল চাপড়ে বললেন— এই না-হলে আমার মন্ত্রী। শালকোঁড়া বনে যেমন আমার অধিকার নেই তেমনি আর কারুরই তো নেই। এমনকী ওপাশের উপবর্তন রাজ্যেরও নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের ওখানে অভিযান চালাতে কোনো অসুবিধে আছে?
মন্ত্রীমশাই মাথা নেড়ে বললেন— আজ্ঞে না, তা নেই। তবে কি না...
—তবের কথা পরে হবে। আপনি এই মুহূর্তে সৈন্যদল প্রস্তুত করুন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শালকোঁড়া বন ঘিরে ফেলতে হবে যাতে কেউ বেরুতে না-পারে।
সেনাপতি মিনমিন করে বললেন— আজ্ঞে ইয়ে হয়েছে, সৈন্যরা সবে দুপুরের ভাতটা খেতে বসেছে। তার ওপরে আজ বড়ি দিয়ে পালংশাকের তরকারি হয়েছিল। এক্ষুনি না-বেরিয়ে বিকেলের দিকে গেলে হত না?
প্রচণ্ড সিংহ প্রচণ্ড হুংকার দিয়ে বললেন— আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। যা বলছি তাই করুন।
সেই হুংকার শুনে মন্ত্রীমশাই আর সেনাপতি পড়ি কী মরি ছুট লাগালেন।
উপবর্তন রাজ্যের রাজা দুর্দান্ত সিংহও ইতিমধ্যে খবর পেয়ে গেছেন। তিনিও তাঁর মন্ত্রী আর সেনাপতিকে ডেকে পাঠালেন। বললেন— মহেন্দ্রনগর থেকে আমাদের গুপ্তচর কী খবর পাঠিয়েছে, তা তো আপনারা জানেন। এক্ষুনি সৈন্য সাজান। যত শীঘ্র সম্ভব আমাদের শালকোঁড়া বনে যেতে হবে। মহেন্দ্রনগরের ওই হতচ্ছাড়া পচা সিঙ্গি শালকোঁড়া বনের ধনভাণ্ডার হাতিয়ে নেওয়ার আগেই আমাদের ওখানে গিয়ে পড়তে হবে।
মন্ত্রীমশাই জিজ্ঞাসা করলেন— আচ্ছা মহারাজ, শালকোঁড়া বনে এত ধনরত্ন এল কোত্থেকে?
রাজামশাই গ্রাম্ভারি চালে বললেন— দেখুন, ওই ধনরত্নের যা বর্ণনা শুনলুম তাতে মনে হয় যে ওসব কোনো সাধারণ লোকের বা ছোটোখাটো রাজাগজার সম্পত্তি নয়। কোনো রাজচক্রবর্তী সম্রাটের কাছেই ওই ধনভাণ্ডার থাকতে পারে।
—কোনো রাজচক্রবর্তী সম্রাটের ধনভাণ্ডার শালকোঁড়া বনে আসতে যাবে কোন দুঃখে, মহারাজ?
—আসতেই পারে। আমার যতদূর জানা আছে, এ ধরনের সম্পদ ছিল পাটলিপুত্রের সম্রাট ধননন্দের কাছে। তাঁর ঐশ্বর্যের কোনো সীমা ছিল না। তাঁর ধনভাণ্ডারে এত স্বর্ণমুদ্রা ছিল যা একজন লোক সারাজীবনেও গুনে উঠতে পারত না। যখন চন্দ্রগুপ্তের কাছে ধননন্দ যুদ্ধে হেরে যান, তখন পালিয়ে যাওয়ার পথে তিনি আর তাঁর পরিজনরা এই অখ্যাত বনে তাঁর ধনরত্নের কিছু অংশ ভবিষ্যতে কাজে লাগবে এই আশায় লুকিয়ে রেখে থাকতেই পারেন।
—অদ্ভুত, মহারাজ, আশ্চর্য আপনার জ্ঞান আর ধীশক্তি!
দুর্দান্ত সিংহ বললেন— হেঁ হেঁ, ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন আর তাহলে দেরি করবেন না। আপনারা সৈন্যশিবিরে চলে যান।
দুই রাজ্যের সৈন্যদল প্রায় একইসময়ে শালকোঁড়া বনে এসে পৌঁছল। রাজারা আর সেনাপতিরা ঘোড়ার পিঠে, বাকি সৈন্যরা দুপুরের খাওয়াটা না-হওয়ার জন্য ব্যাজার মুখে থপাস-থপাস করতে করতে পেছনে পেছনে এল।
দুর্দান্ত সিংহ বললেন— এ কী, রাজা প্রচণ্ড, তুমি এখানে কী মনে করে?
প্রচণ্ড সিংহ বললেন— আমার রাজ্যের কিছু লোক এই বনে ঢুকেছে। আমি তাদের নিয়ে যেতে এসেছি। কিন্তু, তুমি এখানে এই ভরদুপুরে কোন রাজকার্যে এসেছ?
দুর্দান্ত সিংহ আর ভদ্রতা করতে পারলেন না। বললেন— দ্যাখ পচা, মিথ্যে কথা বলা তোর ছোটোবেলাকার স্বভাব। তুই এসেছিস সম্রাট ধননন্দের সম্পদ হস্তগত করতে। ওই সম্পদ আমার, তুই এর এক কণাও পাওয়ার অধিকারী নোস।
—বটে! ওই যে সম্রাট বললি, তার সম্পত্তি তোর আর তাতে আমার কোনো অধিকার নেই, কেন সেটা জানতে পারি কি?
—অবশ্যই। তার কারণ, সম্রাট ধননন্দ আর অজাতশত্রু আমার পূর্বপুরুষ, সেইজন্য।
—দ্যাখ দেঁতো, তুই আর হাসাসনি। তোর ঊর্দ্ধতন চোদ্দোপুরুষে কেউ অমন বিদঘুটে নামওয়ালা সম্রাট ছিলেন, সেকথা শুনলে আমার বেড়ালটাও মুচ্ছো যাবে। এখন ডেঁপোমি না-করে যা বলছি শোন। শালকোঁড়া বনে যা আছে তা আমার। কারণ, আমার রাজ্যের লোকেরা এখানে প্রথম এসেছে। ব্যস, এর ওপরে আর কোনো কথাই হতে পারে না।
—পচা, এটা ভালো হচ্ছে না বলছি। তুই এখান থেকে যাবি, না তোকে মেরে তাড়াতে হবে।
—দেঁতো, তোর আস্পর্দ্ধা কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, মার না-খেলে তোর বুদ্ধি খোলে না। দেখছি সেই ব্যবস্থাই নিতে হবে।
—ঠিক আছে, তাহলে যুদ্ধই হোক। তাতে যদি রক্তগঙ্গা বয়ে যায়, তাই যাবে।
—ঠিক আছে, যুদ্ধই হোক।
কাছেই একটা বটগাছের ছায়ায় এক সন্ন্যাসীঠাকুর নাক ডাকিয়ে দিবানিদ্রা দিচ্ছিলেন। গোলমাল শুনে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। হাই তুলতে তুলতে এসে দুই যুযুধান সৈন্যদলের মাঝখানে দাঁড়ালেন। বললেন— কী ব্যাপার? একটা দাঙ্গাহাঙ্গামার গন্ধ পাচ্ছি যেন?
দুই রাজা সমস্বরে বললেন— আপনি সরে যান, ঠাকুরমশাই। আজ ওই হতচ্ছাড়া মিথ্যেবাদীটার মুণ্ডু যদি না-কেটেছি তো কী বলেছি!
সন্ন্যাসীঠাকুর বললেন— মুণ্ডু কাটা হবে অখন। আগে শুনি এই যুদ্ধবিগ্রহের কারণটা কী?
দুই রাজার মুখে কারণ শুনে সন্ন্যাসীঠাকুর হাসতে শুরু করলেন। বললেন— কে বলেছে তোমাদের যে শালকোঁড়া বনে সম্রাট ধননন্দের সম্পদ লুকোনো আছে?
দুর্দান্ত সিংহ বললেন— মহেন্দ্রনগর থেকে আমার গুপ্তচর খবর পাঠিয়েছে।
শুনে প্রচণ্ড সিংহ রেগে কাঁই। চিৎকার করে বললেন— কী, আমার রাজ্যে তুই গুপ্তচর লাগিয়েছিস? কে সেই হতভাগা? আজ তারই একদিন কী আমারই একদিন!
সন্ন্যাসীঠাকুর বললেন— সে পরে দেখা যাবে। আগে বলো দেখি, রাজা প্রচণ্ড সিংহ, তোমাকে এহেন সংবাদটি দিলে কে?
প্রচণ্ড সিংহ ব্যাজার মুখে বললেন— খবরটা এনেছে আমাদের এক সৈন্য। শীতলদিঘি গ্রামের এক মহিলার কাছে সে জানতে পারে যে সেই গ্রামের লোকেরা এই বনে এসেছে এক বিশাল গুপ্তধনের খোঁজে। তারা আবার সংবাদটি পায় অনন্তপুর গ্রামের লোকেদের কাছে।

শুনে সন্ন্যাসীঠাকুর হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়লেন। বললেন— এইরকম একটি উড়ো কথার ভিত্তিতে তোমরা দুই রাজা একেবারে সসৈন্যে যুদ্ধ শুরু করতে চলেছ? বাবা, তোমাদের খুরে-খুরে দণ্ডবৎ।
ঠিক এইসময় দেখা গেল অনন্তপুর গ্রামের লোকেরা হইহই করে একটি সাদা গোরু তাড়াতে তাড়াতে আর পেয়েছি পেয়েছি বলে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে বন থেকে বেরিয়ে আসছে। তারা দুই সৈন্যদলকে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে থেমে গেল।
তাদের পেছনে পেছনে শীতলদিঘির লোকেরাও বেরিয়ে এল। তারা জিজ্ঞাসা করল— গুপ্তধন পেয়ে গেছ? কই, দেখি।
শুনে অনন্তপুরের লোকেরা অবাক। বলল— গুপ্তধন? কীসের গুপ্তধন? আমরা তো কেষ্টদার গোরু খুঁজতে গিয়েছিলুম।
—সে কী? তোমাদের গোবিন্দচন্দর যে বললে তোমরা ওখানে বড়ো বড়ো হিরে খুঁজতে গিয়েছিল?
গোবিন্দ হাত-পা ছুঁড়ে বলল— কক্ষনো আমি সেকথা বলিনি। আমি শুধু বলেছি যে আমরা একটা বড়ো সাদা মতন ভীষণ দামি জিনিস খুঁজতে যাচ্ছি। তা, কেষ্টজ্যাঠার গোরুটা কি তাই নয়?
এই কথোপকথন শুনে সন্ন্যাসীঠাকুর হাসতে হাসতে শুয়েই পড়লেন। উবুড় হয়ে পড়ে মাটি থাবড়ান আর বললেন— হো-হো, হা-হা, সম্রাট ধননন্দ থেকে একেবারে গোরু! হায়-হায়, হো-হো, হা-হা!
দেখতে-দেখতে তাঁর সাদা দাড়ি ধুলোয় ধূসর হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ বাদে হাসি সামলে দাড়ি ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন সন্ন্যাসীঠাকুর। দুই অধোবদন রাজাকে সম্বোধন করে বললেন— হে রাজন্যগণ, তোমরা এবার বাড়ি যাও। গিয়েই আচ্ছা করে মাথায় হুঁকোর জল ঢেলো আর রোজ ব্রাহ্মীশাক সেদ্ধ করে খেও। এতে আর কিছু না-হোক, তোমাদের ঘটে বুদ্ধি একটু বাড়বে।
প্রচণ্ড সিংহ কোনোরকমে লজ্জিত মুখ তুলে বললেন— বুঝলি দেঁতো, একটু ভুল হয়ে গেছিল। তা সে তো মানুষমাত্রেরই হতে পারে। আমি বলি কী, এখন এক কাজ করা যাক। এতটাই যখন এসেছিস, তখন আর একটু কষ্ট করে আমার বাড়িতে চল। তোর সৈন্যরাও চলুক। সবাই মিলে দুপুরের খাওয়াটা ওখানেই সারা যাবে। তোর রানিবউদিও সেদিন বলছিল যে অনেকদিন দাঁতু ঠাকুরপোকে দেখি না।
দুর্দান্ত সিংহ বললেন— তুই যখন বলছিস তখন তো যেতেই হয়। তোর কথা কি আর কোনোদিন ঠেলতে পেরেছি আমি?
দু-পক্ষের সৈন্যদল এই কথা শুনে সহর্ষে দুই রাজার নামে জয়ধ্বনি দিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন